#নূরের_পথে_ফিরে_আসা
#লেখনিতে_নূরায়া_মেহনাজ
#পর্ব_১৫
সময়ের স্রোত বয়ে চলে, কিন্তু বিশ্বাসের পরীক্ষা কখনো শেষ হয় না। আয়েশা এখন এক পরিচিত নাম। ইসলামী দাওয়াত, সমাজকে বদলে দেওয়ার কাজ আর তওবার পথে চলে আসা মানুষের হৃদয়ে সে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে। তবে যারা মহান আল্লাহর পথে চলেন, তাদের পরীক্ষা হয় আরও গভীর, আরও সূক্ষ্ম। যেন তাদের ঈমান আরও দৃঢ় হয় আরও মজবুত হয়।
একদিন আয়েশা অফিসে বসে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো পর্যালোচনা করছিল। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ভেসে এল এক আতঙ্কিত কন্ঠ,
“ আপু, আমাদের একটি ইসলামিক ভিডিও নিয়ে মিডিয়ায় নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হয়েছে! অনেকে বলছে আমরা নাকি এসব করে ভন্ডামি করছি আবার এটাও বলছে আপনি এইসব কিছুই করছেন সকলের কাছে ফেমাস হওয়ার জন্য।”
কথাগুলো শুনে কিছুসময়ের জন্য আয়েশার হৃদয় থমকে গেল। সোশ্যাল মিডিয়া ওপেন করে দেখল। অনেকেই কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছে। আয়েশা সেগুলো দেখল যেখানে সবাই বলছে,
“এগুলো সব লোক দেখানো নাটক ছাড়া কিছুই না।”
“ মিথ্যা হিদায়াত সব।”
“ সবই পাবলিসিটি স্টান্ট।”
সকলের এমন কুরুচিপূর্ণ কথায় আয়েশা অঝোরে কাঁদতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ তার কুরআনের একটি আয়াতের কথা মনে পড়ল ,
“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব। ভয়, ক্ষুধা ও ধন-সম্পদের ক্ষতি দ্বারা এবং ধৈর্যশীলদের পুরস্কার দাও।”
( সূরা আল-বাকারা ২:১৫৫)
আয়েশা তখনি তার চোখের পানি মুছে ফেলল।
“হে মহান রাব্বুল আলামিন!” আমি যা-কিছু করেছি তা তোমারই সন্তুষ্টির জন্য। মানুষের মন জয় করার জন্য না। তুমি তো তোমার বান্দার মনের সকল গোপন উদ্দেশ্য বুঝতে পারো। এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। আলহামদুলিল্লাহ।”
রাতে আয়েশা মায়ের ঘরে এসে দেখল মা বসে তসবিহ পড়ছে। সে মায়ের কাছে গিয়ে তার কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে কিছুসময় শুয়ে ছিল। আমেনা বেগম মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
“কি হয়েছে আমার আম্মার?”
আয়েশা মায়ের কথায় কিছুই বলল না চুপচাপ শুয়ে রইল। আমেনা বেগম হয়তো বুঝলেন মেয়ের মনের অবস্থা। তিনি মেয়ের কপালে পরম মমতায় ঠোঁটের পরশ দিয়ে বলতে লাগলেন,
“ বেটি, আল্লাহর পথে যারা আছেন এবং তার জন্য যারা কাজ করেন, তাদেরকে তিনি সবসময় হেফাজত করেন৷ তুই শুধু রবের উপর তাওয়াক্কুল কর। দেখবি ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আয়েশা চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ মা আমি কিছুতে ভয় পাই না। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব কষ্ট লাগে, যখন মানুষ আমার উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলে। সন্দেহ করে যে আমি যা কিছু করছি সবকিছু ব্যহিক অর্জনের জন্য করছি।”
“ আম্মা তুই তো এখন কুরআন পড়িস। তুই কি কুরআনের এই আয়াতটা পড়িস নাই, যেখানে বলা হয়েছে,
“ আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, মহান আল্লাহ তায়ালা তার জন্য যথেষ্ট।”
( সূরা আত-তালাক ৬৫:৩)
আয়েশা হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“ তুমি ঠিক বলেছ মা। মানুষের কাজই তো সমালোচনা করা। কিন্তু এর ভয়াবহতা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। যার কারণে তারা অন্যের সমালোচনা করতে দুইবার ভাবে না৷ এখন আমি বুঝতে পারছি এত সহজে আমাকে ভেঙে পড়লে চলবে না। আমি সবকিছু মহান করুণাময় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম।”
আমেনা বেগম মেয়ের কথায় খুশি হলেন এবং দোয়া করলেন আয়েশার মধ্যে যেন সবসময় এরকম বুঝ থাকে।
পরদিন সংবাদপত্রে আয়েশার বিরুদ্ধে মিথ্যা এক প্রতিবেদন প্রচার করা হলো। পত্রিকায় লেখা হয়েছে।
“আপনাদের সকলের প্রিয় আয়েশা যাকে এখন সকল দেশের মানুষই চেনেন। সে তার আগের জীবনে কেমন ছিল তা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি৷ কিন্তু হঠাৎ তার এই পরিবর্তন হওয়াটা আপনারা কি স্বাভাবিকভাবে দেখছেন? তিনি ইসলামের পথে সবাইকে দাওয়াত দেওয়ার পাশাপাশি সমাজের অনেক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আর সেগুলোর জন্য অনেক টাকা অপচয় তিনি করছেন৷ কোথায় পাচ্ছেন তিনি এত টাকা। যে টাকার মাধ্যমে তিনি সব গরীব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন সে টাকাগুলো কি আদৌও বৈধ পথে ইনকাম করা টাকা? নাকি এগুলো মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নেওয়ার এক নতুন ধর্মীয় ব্যবসা?”
তাদের বিরুদ্ধে এসব নিউজ দেখে টিমের সবাই ভেঙে পড়ছে৷ কেউ রাগ থেকে অনেক বাজে কথা বলছে যারা এমন নিউজ লিক করছে৷ আবার অনেকে কষ্ট পেয়ে চুপ করে আছে৷ আয়েশা তাদের সবাইকে শান্তনা দিচ্ছে এবং বলছে,
“ তোমরা সকলে এভাবে ভেঙে পড়ছো কেন? এতে করে কি হবে জানো? আমাদেরকে সবাই দুর্বল ভেবে আরও আঘাত করতে আসবে। একটা কথা মনে রেখো আমরা কোনো অন্যায় বা খারাপ কাজ করিনি৷ আমাদের উদ্দেশ্য সৎ, যেখানে কোনো খারাবি নেই। আমাদের কাজ, আমাদের উদ্দেশ্য পানির মতো স্বচ্ছ আর যে কাজ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা'র সন্তুষ্টর জন্য করা হয় তাকে কোনো অপ্রচার থামাতে পারে না।”
তারপর আয়েশা সবাইকে নিয়ে একসাথে দোয়া পড়ল,
“ হে আমার প্রতিপালক! আমাদের ধৈর্য দান করুন। আমাদের পদক্ষেপ দৃঢ় করুন৷ আর কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন৷”
( সূরা আল-বাকারা ২:২৫০)
★
রাত তখন গভীর৷ সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আয়েশা চুপচাপ নামাজে সিজদায় পড়ে আছে।
“ হে আল্লাহ! আমি জানি, প্রতিটি পরীক্ষা তোমার রহমতের দরজা খুলে দেয়। যদি তুমিই আমার উদ্দেশ্য জানো, তবে মানুষের ভুল বোঝাবুঝি আমাকে থামাতে পারবে না।”
আয়েশার হঠাৎ মনে পড়ল নবী ইউসুফ (আ.) - এর ঘটনা —
ইউসুফ (আ.) ছিলেন এক বরকতময় বংশের উত্তরাধিকারী। পিতা হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর হৃদয়ে ইউসুফ (আ.)-এর জন্য ছিল গভীর স্নেহ। তাঁর সৌন্দর্য, জ্ঞান এবং নির্মল আচরণ সহজেই সবার মন জয় করত। কিন্তু এখানেই জন্ম নিল এক বিষাক্ত ঈর্ষা—তাঁর আপন ভাইদের মনে। তারা বিশ্বাস করত, তাদের পিতা ইউসুফ (আ.)-কেই বেশি ভালোবাসেন।
ঈর্ষার আগুনে জ্বলে তারা এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র করল। তারা ইউসুফ (আ.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করল, কিন্তু শেষে তাকে এক গভীর কূপে নিক্ষেপ করে ফিরে এলো। তারা এক রক্তাক্ত শার্ট নিয়ে এসে পিতাকে মিথ্যা বলল যে, প্রিয় পুত্রকে হিংস্র বাঘে খেয়ে ফেলেছে। ইয়াকুব (আ.) পুত্রের শোকে কাতর হলেন, কিন্তু আল্লাহর ওপর তাঁর আস্থা ছিল অটুট।
কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। তিনি ইউসুফ (আ.)-কে রক্ষা করলেন। একদল মিশরীয় বণিক সেই কূপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে উদ্ধার করল। এভাবে এক সম্মানিত নবীর পুত্রকে মিশরের হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হলো একজন দাস হিসেবে। মিশরের এক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি, আযীয, তাঁকে কিনে নিলেন এবং নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করলেন।
— মিথ্যা অপবাদের অগ্নিপরীক্ষা —
ইউসুফ (আ.) যখন যৌবনে পদার্পণ করলেন, তাঁর সৌন্দর্য ও জ্ঞান আরও প্রস্ফুটিত হলো। তাঁর নির্মলতা দেখে আযীযের স্ত্রী জুলায়খা তাঁর প্রতি তীব্রভাবে মুগ্ধ হলেন। তিনি ইউসুফ (আ.)-কে পাপের প্রলোভন দিলেন, কিন্তু আল্লাহর ভয়ে ইউসুফ (আ.) দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করলেন।
ইউসুফ (আ.)-এর তাকওয়া (আল্লাহভীতি) তাঁকে রক্ষা করল, কিন্তু জুলায়খা তখন তাঁর পবিত্রতার ওপর কলঙ্ক লেপন করলেন। তিনি মিথ্যা অভিযোগ করলেন যে, ইউসুফ (আ.) তাকে প্রলোভিত করতে চেয়েছেন। ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করে ইউসুফ (আ.)-কে পাঠানো হলো কারাগারে।
কারাগারেও ইউসুফ (আ.) তাঁর নবীসুলভ চরিত্র, ধৈর্য ও জ্ঞান দিয়ে আলো ছড়ালেন। (সংক্ষিপ্ত)
আয়েশা ভাবল, “নবী ইউসুফ (আ.) যিনি মিথ্যা অভিযোগেও ধৈর্য ধরেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন। হয়তো আমিও কোনো ক্ষুদ্র পরীক্ষায় আছি, যাতে আল্লাহ তায়ালা আমার অন্তরকে আরো শক্তিশালী করে তোলেন।”
—-------------------------------------------
কয়েকদিন পর এক সাংবাদিক নিজে গবেষণা করে জানালেন, সব অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আরো লিখেছেন,
“ নূরের ছায়া ” প্রতিষ্ঠানটি আসলে সমাজের জন্য একটি বরকতময় প্রতিষ্ঠান।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতিবাচক মন্তব্যগুলো খুব দ্রুত মিলিয়ে গেল। এবং এরপরে আরো বেশি মানুষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে আয়েশার পাশে দাঁড়াল। আয়েশা এসবকিছু দেখে চোখ বন্ধ করে বলল,
“হে আল্লাহ! তুমি আমার পক্ষে সাক্ষী হয়েছো।”
“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।”
(সূরা আশ-শারহ ৯৪:৬)
★
আয়েশা এখন আরও বেশি শান্ত এবং মনকে আরও বেশি শক্ত করেছে। আয়েশা তার টিম মেম্বারদের উদ্দেশ্য বলল,
“আমাদের কাজ হবে আরও স্বচ্ছ, আরও সুন্দর। আমরা মানুষের মাঝে সত্য, সহানুভূতি আর আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দেব। আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো “তাওয়াক্কুল” ( আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা )।”
সবাই একসাথে বলে উঠল, “ইনশাআল্লাহ।”
রাতে চাঁদের আলোয় আয়েশা জানালার পাশে বসে আছে হাতে একটি ডায়েরি নিয়ে। ডায়েরিটা খুলে সেখানে লেখা শুরু করল,
“ জীবনের সকল পরীক্ষা আসলে মহান আল্লাহর তায়ালার ভালোবাসার প্রকাশ। তিনি তোমাকে ভাঙতে চান না, বরং তোমাকে গড়ে তুলতে চান। তাই যখন তুমি কিছু হারাও, তখন ভেবো না ‘আমি কেন হারালাম’ বরং বলো— এর মধ্যে নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত আছে।”
আয়েশা চোখ বন্ধ করে আকাশের পানে তাকিয়ে বলল,
"হে আল্লাহ, আমাকে এমন বানাও, যেন প্রতিটি পরীক্ষায় তোমার নিকট আরও কাছে যেতে পারি।”
#চলবে_ইনশাআল্লাহ