#নূরের_পথে_ফিরে_আসা
#লেখনিতে_নূরায়া_মেহনাজ
#পর্ব_১৭
সময় কত দ্রুত গতিতে চলে যায়! ইস্তাম্বুলের সেই ঐতিহাসিক কনফারেন্সে পর আয়েশার নাম এখন শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নেই বরং বিশ্বজুড়ে এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছে৷ “নূরের ছায়া” এখন এক আন্তর্জাতিক দাওয়াতি মহীরুহ।
সবকিছু এক প্রশান্ত ছন্দে চলছিল৷ কিন্তু এক সকালে আয়েশা জানতে পারল তার মা গুরুতর অসুস্থ, হসপিটালে ভর্তি। সে দ্রুত হসপিটালে যায়। হসপিতালে পৌঁছে বাবার কাছ থেকে কেবিন নং শুনে সে দৌঁড়ে কেবিনে গিয়ে দেখে মা হসপিটালের শুভ্র বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। পাশে ডাক্তার বসে আছেন৷
“ বাবা? মা এত অসুস্থ তুমি আমাকে বলোনি কেন?”
আশরাফ সাহেব মেয়ের কথায় ধীরস্থির ভাবে বললেন,
“আম্মু তুমি এখন বিভিন্ন কাজের জন্য বাইরে থাকো। যখন তখন কি তোমাকে ফোনে ডাকা যায় বলো? তুমি না আবার টেনশনে পড়ে অসুস্থ হয়ে যাও। তাই ভেবেছিলাম তোমাকে পড়ে জানাব।”
“ তবুও বাবা। তুমি কিন্তু ঠিক করো নাই। এবার থেকে আমাকে সবকিছু জানাবে। ফরিদা খালা ফোন না করলে তো আমি জানতেই পারতাম না।”
আয়েশা মায়ের কাছে গিয়ে বসল। ডাক্তার চেকআপ করছেন৷ হঠাৎ ডাক্তার বললেন -
“ End-stage cancer ”
ডাক্তারের উচ্চারিত এমন ভয়ঙ্কর কথা শুনে সকলের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। যে মা তাকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার উপদেশ দিয়েছিলেন, যার নিভৃত দোয়ায় তার জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত বদলে গিয়েছিল। আজ সেই মমতাময়ী মায়ের এ-কি অবস্থা!
আশরাফ সাহেব ডাক্তারের কথা শুনে বুকে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। আয়েশা অস্থির কন্ঠে ডাক্তারকে বলে,
“ এটা কীভাবে সম্ভব ডাক্তার আঙ্কেল? আমরা তো কখনো এমন কিছু দেখিনি মায়ের মধ্যে, হুট করে এসব কি হয়ে গেল। প্লিজ কিছু বলুন। আপনার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে।”
“আয়েশা আমি একজন ডাক্তার। তুমি এভাবে ভেঙে পড়ো না। দোয়া করো বেশি বেশি আল্লাহর কাছে। এমন ধরণের পেশেন্ট কে বাঁচানো সম্ভব না যেখানে তোমার মা লাস্ট স্টেজে আছেন। তাছাড়া এসবের অনেক লক্ষণ রয়েছে যেটা হয়তো-বা তোমরা অদেখা করেছো।”
ডাক্তার আরো বললেন, “ ক্যান্সারের অনেক লক্ষণ আছে যেমন ধর- সবসময় ক্লান্তি অনুভব করা ,দুর্বলতা, বুকে অসহ্য ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি ( অনেক সময় কাশির সাথে রক্ত আসে) , মানসিক বিভ্রান্তি। এছাড়াও কিছু লক্ষণ আছে। আমার মনে হয় তোমার মা ভালো বলতে পারবেন।”
আয়েশা মায়ের শীর্ণ হাতটি ধরে অবরুদ্ধ কন্ঠে বলল, “মা তুমি চিন্তা করো না। আল্লাহ চাইলে সব ঠিক করে দিবেন। কিন্তু তুমি আমাদের কিছু বলোনি কেন?” কাঁদতে কাঁদতে আয়েশা বলে।
আয়েশার কথায় এক চিলতে মলিন হাসলেন আমেনা বেগম। অত্যন্ত দুর্বল কন্ঠে বললেন, “
“রোগ দেওয়ার মালিক আল্লাহ৷ যিনি দিয়েছেন তিনিই সুস্থ করবেন৷ আর যেটা ঠিক হবে না সেটা বলেও বা কি লাভ? একদিন না একদিন তো আমাদের সকলকেই চলে যেতে হবে। আমার সকল চিন্তা তো শুধু তোর জন্য। মরার আগে একটাই কথা বলব — তুই যেন হরহামেশা আল্লাহর পথে অটল থাকিস৷ কোনো পরিস্থিতিতে হার মানবি না আম্মা৷ ”
হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলো আমেনা বেগমের। আয়েশা এবং তার বাবা আমেনা বেগমের বুকে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। আয়েশা অস্থির হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তার কে ডাকতে লাগল।
“ মা ও মা কি হয়েছে? কষ্ট হচ্ছে তোমার খুব? কিচ্ছু হবে না তোমার মা। একটু সহ্য করো এই তো ডাক্তার আসছে মা। মা দয়া করে আমাকে একা ফেলে যেও না মা। আমি…. আমি তোমার ছোট্ট সেই মেয়েটি কীভাবে থাকব তোমাকে ছাড়া!
“ও… খোদা আমার মায়ের কষ্ট দূর করে দাও খোদা।”
খোদা বুঝি শুনলেন আয়েশার কথা! আমেনা বেগম শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পাঠ করলেন,
“ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ”
তারপর তিনি প্রশান্ত হৃদয়ে আস্তে আস্তে চোখের পাতা বন্ধ করে নিলেন আজীবনের জন্য।
আয়েশার হৃদয় তখনি হাহাকার করে উঠল। সময়টা যেন তার কাছে স্তব্ধ হয়ে গেল। আশরাফ সাহেব তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর হাত দুহাতে নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে ডুকরে কাঁদছেন।
হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ কেবিনে মনিটরের একটানা দীর্ঘ শব্দটা (Beep) আয়েশার কানে যেন তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। ডাক্তার মাথা নিচু করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। আয়েশা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর যখন হুঁশ ফিরল, সে আছড়ে পড়ল মায়ের নিথর দেহের ওপর।
আয়েশা চিৎকার করে উঠল। গলায় কাছে কান্না আটকে আসছিল। সে মায়ের কপালে চুমু দিয়ে, মুখ ঘেষে আর্তনাদ করে বলতে লাগল —
“ মা! তুমি কথা বলছ না কেন মা? ও মা একটিবার চোখ খোলো! আমায় বকা দাও মা, তবুও একটি বার তাকাও। আমি কার কাছে যাব মা? আমার মন খারাপের সকল কথা কার কোলে মাথা রেখে বলব মা? এই বিশাল দুনিয়ায় কার দোয়ায় আমি রক্ষা পাবো মা?”
আয়েশা মায়ের হাত দুটো নিজের গালে চেপে ধরে পাগলের মতো বলতে লাগল,
“ মা তুমি তো আমাকে সবসময় ভালো উপদেশ দিতে। তোমার জায়নামাজে ফেলা চোখের পানিতেই তো আমার হিদায়েত হয়েছিল। আজ আমি যখন তোমার উপদেশগুলো মেনে চললাম। আল্লাহর পথে এলাম। তখনই তুমি আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছো। আমি… আমি অনেক দুর্ব্যবহার করেছি মা তোমার সাথে আমাকে তুমি ক্ষমা করে দেও মা। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। তুমি কেন আমাকে একা করে চলে গেলে মা। আমি যে মা হারা এতিম হয়ে গেলাম, আমি বড্ড একা হয়ে গেলাম!”
আয়েশা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কপালে আবারো চুমু খেয়ে আসমানের দিকে তাকিয়ে এক বুকফাটা আহাজারিতে বলল,
“"হে আমার রব! তুমি আমার সব নিয়ে নাও, কিন্তু আমার মা-কে কি আরও কটা দিন আমার পাশে রাখা যেত না? মা ছাড়া এই পৃথিবীটা যে আমার কাছে ঘুটঘুটে অন্ধকার! কার কাছে গিয়ে এখন আমি শান্তি খুঁজব? কার হাসিতে আমি জান্নাতের ঘ্রাণ পাব?”
ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে আয়েশার সেই আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তার সেই ভয়ঙ্কর বিলাপ যেন বাতাসকে ভারী করে তুলছিল।
"মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত , আজ আমার মাথার উপর থেকে সেই জান্নাতের ছায়াটাই সরে গেল! ওগো দয়াময় আল্লাহ, তুমি আমার মাকে তোমার রহমতের কোলে তুলে নাও। আমি ধৈর্য ধরার চেষ্টা করছি, কিন্তু আমার কলিজা যে ছিঁড়ে যাচ্ছে মা... ও মা... একটিবার শুধু ডাকো আমায়।”
★
মায়ের জানাজা শেষে বাড়িতে আয়েশা একা ফিরল। আর তার বাবা আশরাফ সাহেব আছেন তার স্ত্রীর কবরের কাছে।
আয়েশা যখন শূন্য বাড়িতে ফিরে এল তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা তাকে ঘিরে ধরল। সে বাড়ির প্রতিটি জায়গায় তার মাকে কল্পনা করতে লাগল। তার মা ছোটবেলায় তাকে ঘুম থেকে পরম আদরে তুলবে তারপর নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে স্কুলে দিয়ে আসবে। কত কত স্মৃতি। এইতো সেদিনেরই এক ঘটনা আয়েশার খুব বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করছিল। সেদিন তার মা একটু অসুস্থ ছিল বটে, হয়তো এই মরণঘাতী ক্যান্সারেরই কোনো লক্ষণ ছিল। তো সেদিন মা তার এই অসুস্থ শরীর নিয়ে তাকে ভালোবেসে রান্না করে নিজ হাতে বিরিয়ানি খাইয়ে দিয়েছিল। আহা! সেদিন যে কি পরম শান্তি অনুভব করেছিলাম তা প্রকাশ করা যায় না।
আয়েশা দু'হাতে মুখ ঢেকে ফ্লোরে বসে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদছে। আর বিলাপ করছে।
“ তোমার মতো কেউ ভালোবেসে আমাকে আর কখনো রান্না করে খাওয়াবেনা মা। তোমার মতো করে কেউ আমাকে বুঝবে না এই দুনিয়ায়।”
বাড়িতে তখন আয়েশার নানুরা, মামা-মামী সকলে ভেতরে ঢুকে আয়েশাকে এভাবে কাঁদতে দেখে ছুটে এল। সবাই তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, কিন্তু আয়েশার ব্যথিত হৃদয়ের হাহাকার কেবল মহান আল্লাহই জানতেন।
আয়েশা রাতে নামাজ শেষে আল্লাহর দরবারে হাত তুলল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখে পানি নিয়ে বলল,
“হে আল্লাহ, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পার্থিব আশ্রয় হারিয়েছি… কিন্তু আমি জানি, তুমি তো আছো। তুমিই আমার রব, তুমিই চিরস্থায়ী।”
আয়েশা মনে করল মায়ের মৃত্যুর আগে তার বলা কথাগুলোকে। মায়ের মৃত্যু, মায়ের কথাগুলো যেন আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্যকে আরও ইস্পাতকঠিন করে তুলছে।
#চলবে_ইনশাআল্লাহ
[ আসসালামু আলাইকুম। ব্যস্ততার মধ্যে এতটুকুই লিখতে পেরেছি। তবে আজকের পর্বটি লিখতে লিখতে কান্না করে ফেলেছি 🙂। যাইহোক পর্বটি কেমন লাগছে অবশ্যই জানাবেন।]