#নূরের_পথে_ফিরে_আসা
#লেখনিতে_নূরায়া_মেহনাজ
#পর্ব_১৮
আয়েশার মায়ের মৃত্যুর একমাস পূর্ণ হতে চললো। ঠিক এরমধ্যেই আয়েশার জীবনে এল আরেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড়। “নূরের ছায়া” - র একটি প্রজেক্টে আর্থিক গড়মিলের অভিযোগ উঠল। আয়েশা এর বিন্দুবিসর্গ না জানলেও বিষাক্ত আঙ্গুলগুলো তার দিকেই উঠল। আশেপাশের মানুষজন থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সকলের কটুকথার তুবরি ছুটল তার দিকে।
“এই তো সেই ধার্মিক মেয়েটি ? নিজে ইসলামের কথা বলে, অথচ পরধনে হাত দেয়।”
এই অপবাদগুলো আয়েশার আত্মসম্মানে আঘাত করল বেশ। কিন্তু এবার আয়েশা বিচলিত হলো না মোটেই।
“আমি যদি নির্দোষ হই, তবে আমার মালিক নিজেই আমার হয়ে উত্তর দিবেন। ” আয়েশা শান্ত কন্ঠে বলে।
“ যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য মুক্তির পথ সৃষ্টি করেন। ”
( সূরা আত-তালাক ৬৫:২)
কয়েকটা সপ্তাহ টানা তদন্ত চলল। তদন্তের মাধ্যমে জানা গেল “নূরের ছায়া” প্রজেক্টের টাকা সরিয়েছে অন্যকেউ এবং সেটা খুবই কৌশলের সাথে, এখানে আয়েশা রহমানের কোনো হাত নেই। সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর পুলিশ আবার তদন্ত করলে আসল অপরাধী ধরা পড়ে। যে ছিল সংগঠনেরই এক প্রাক্তন অসাধু কর্মী।
তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে আদালতে। হলরুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। সেই প্রাক্তন কর্মী, যে আয়েশার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল আজ সে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে অপরাধীর কাঠগড়ায়। সবার চোখে তার জন্য ঘৃণা ছিল, কিন্তু আয়েশার চোখে ছিল তার জন্য করুণা৷ আয়েশা ধীরে ধীরে তার সামনে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। সবাই এটাই আন্দাজ করেছিল যে হয়তো আজ লোকটাকে চাপকে সোজা করবে, নাহয় অনেক অপমান করবে। কিন্তু সবার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে আয়েশা গাম্ভীর্যের সাথে লোকটিকে বলে,
“ ভাই আপনি আমার সম্মান নষ্ট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে — সম্মান আর অসম্মান দেওয়ার মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের কাজের মাধ্যমে দেন। মানুষ চাইলেই কাউকে উঁচুতে তুলতে পারে না, আর মহান আল্লাহ তায়ালা না চাইলে কেউ কাউকে নিচে নামাতেও পারে না।”
আয়েশা কিছুসময় চুপ থেকে অপরাধীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ আপনি কেন এই সামান্য কিছু কাগজের টুকরোর ( টাকা) জন্য নিজের আমলনামা পুড়িয়ে দিলেন? আপনি আমার ক্ষতি করতে গিয়ে আসলে নিজেরই বড় ক্ষতি করে ফেলেছেন। আপনি কি সেই দিনটির কথা একবারো ভাবেননি, যেদিন প্রতিটি গোপন ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হবে?”
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“ সেদিন তারা আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, যেদিন তাদের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকবে না।” ( সূরা গাফির ৪০:১৬)
আজ দুনিয়ার আদালতে আপনি ধরা পড়েছেন৷ হয়তো কয়েকদিন জেল খাটবেন। কিন্তু মহান আল্লাহর আদালতের কাঠগড়া থেকে বাঁচবেন কি করে? সেখানে তো কোনো মিথ্যা সাক্ষী বা জালিয়াতি চলবে না।
আয়েশা এবার তার গাম্ভীর্যটা কমিয়ে মায়াময় কন্ঠে বলল,
“ শুনুন ভাই, আপনি অপরাধ করেছেন তাই বলে যে আমি আপনার খারাপ চাইবো এমনটা না। আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম — কেবল এই আশায় যে, হয়তো আপনার হৃদয়ে তওবার উদয় হবে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) - কে তো কাফেররা কত কষ্ট দিয়েছিল। উহুদের ময়দানে তাঁর দাঁত মোবারক শহীদ হয়েছিল তবুও তিনি বলেছিলেন,
“হে আল্লাহ! আমার জাতিকে হেদায়েত দান করো, কারণ তারা জানে না ( তারা কি করছে)।”
আমিও আপনার জন্য সেই দোয়ায় করছি। এখনও সময় আছে, সঠিক পথে ফিরে আসুন। দুনিয়ার শাস্তি তো ছোট, কিন্তু আখিরাতের শাস্তি খুবই ভয়াবহ। মহান আল্লাহ বলেন,
“ নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদের ওপর অত্যাচার করে, এরপরে তওবাও করে না তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। ”
( সূরা আল-বুরুজ ৮৫:১০)
আমি চাই না আপনি সেই শাস্তির ভাগী হোন। আমি চাই আপনি এই ভুল থেকে শিক্ষা নিন এবং নিজের বাকি জীবনটা আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিন।
আয়েশা যখন তার কথাগুলো শেষ করল, তখন সেই অসাধু কর্মীর চোখের পানি মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে আয়েশার কাছে মাফ চাইল। আদালতের হলরুমে সবাই আয়েশার প্রশংসা করল এবং তারাও এখান থেকে কিছু শিখতে পারল, যে কীভাবে একজন অন্যায়কারীকে সঠিক পথ দেখিয়ে ক্ষমা করতে হয়। ক্ষমা করতে পারা এক মহৎ গুণ৷
★
গভীর রাত। চারদিকে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে আছে। বাইরে থেকে রাতের নিশাচর পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে। আয়েশা তার মায়ের ব্যবহৃত পরনো জিনিসপত্রগুলো ছুঁয়ে দেখছে। আয়েশা মায়ের ব্যবহৃত কুরআনটি খুলে সেখানে আলতো হাতে ছুঁয়ে দিল। হঠাৎ একটি নোট তার হাতে এল। কাগজে কিছু লেখা আছে যা আমেনা বেগমেরই হাতের লেখা। আয়েশা কাগজটি খুলে পড়ল —
“ আম্মা আমার, যদি কখনো তুই নিজেকে একা মনে করিস বা একাকিত্বে ভুগিস। তখন মাথায় কোনো খারাপ চিন্তা নিয়ে আসবি না। সবসময় মনে রাখবি মহান আল্লাহ তায়ালা সবসময় সাথে আছেন। আমি তো আর সবসময় এসব বলার জন্য থাকবো না রে আম্মা!”
আয়েশার চোখের পানি সেই কাগজের ওপর আছড়ে পড়ল।
“ হে আল্লাহ! আমার মা আজ আমার পাশে নেই, কিন্তু তার দোয়ার চাদর যেন আমায় আজীবন আগলে রাখে।”
“যারা বিশ্বাস করে এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের মাধ্যমে তাদের অনুসরণ করে, আমি তাদেরকে (জান্নাতে) একত্র করব।”
(সূরা আত-তূর ৫২:২১)
বিপদ কাটিয়ে আয়েশা আবার দ্বীনের কাজে আত্মনিয়োগ করা শুরু করে । এবার সে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করল— “মা ও মেয়ের নূরের বন্ধন” । যেখানে মায়েরা ও মেয়েরা সম্মিলিতভাবে আত্মশুদ্ধি ও দাওয়াতের তালিম নেবে।
“মা এবং বোনেরা আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি এক মায়ের কন্যা হিসেবে। যিনি আমাকে সবসময় আল্লাহর দেখানো পথে চলতে উপদেশ দিয়েছিলেন। তিনি আজ নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া নূর আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছে। আমি অনুভব করেছি, একটি সমাজ বা একটি রাষ্ট্র শুধু আইন দিয়ে বদলানো যায় না—সমাজ বদলানো শুরু হয় একটি ঘর থেকে, আর সেই ঘরের কেন্দ্রবিন্দু হলেন মা।”
আয়েশার চোখে এক অদ্ভুত প্রত্যয়। আয়েশা আরো বলল,
“আমাদের সমাজ তখনই আমূল বদলে যাবে, যখন প্রতিটি মায়ের হৃদয়ে কুরআনের প্রদীপ জ্বলবে এবং প্রতিটি মেয়ে সেই আলোকে পরম উত্তরাধিকার হিসেবে ধারণ করবে।”
আয়েশা তখন এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কুরআনের সেই চিরন্তন সত্যটি তুলে ধরল।
“মা হলেন সন্তানের প্রথম মাদ্রাসা। মা যদি কুরআনের নূরে আলোকিত হন, তবে সেই আলো তাঁর সন্তানের চরিত্রে প্রতিফলিত হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’
(সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬)
এই রক্ষার দায়িত্ব কার? এই দায়িত্ব আমাদের মায়েদের। মা যখন জায়নামাজে বসে চোখের অশ্রু ফেলেন, সেই চোখের অশ্রু সন্তানের তাকওয়া (আল্লাহভীতি) জন্ম নেয়। আর কন্যাদের আমি বলতে চাই—আপনারা শুধু সাজগোজ আর বাইরের সৌন্দর্যের উত্তরাধিকারী হবেন না। আপনারা উত্তরাধিকারী হোন সেই পর্দা, সেই লজ্জা এবং সেই জ্ঞানের যা আপনাদের সম্মানকে আকাশের উঁচুতে নিয়ে যাবে।”
“রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।’ কেন জানেন? কারণ মা হলেন সেই কারিগর, যিনি একটি মানবসন্তানকে জান্নাতের যোগ্য করে গড়ে তোলেন। তাই আমার পরিকল্পনা হলো—আমরা ঘরে ঘরে ‘নূরের পাঠশালা’ তৈরি করব। যেখানে মায়েরা কুরআন শিখবেন এবং মেয়েরা সেই নূরের মশাল বহন করে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেবেন।”
আয়েশার কথাগুলো শুনে অগণিত মা তাঁদের কন্যাদের জড়িয়ে ধরলেন, আর মেয়েরা তাঁদের মায়েদের হাত চেপে ধরল। সেদিনের সেই ঘোষণাটি কেবল একটি বক্তৃতা ছিল না, তা ছিল একটি আদর্শিক বিপ্লবের শুরু—যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ‘নূরের পথে ফিরে আসা’র গল্প বলবে।
এক জ্যোৎস্না প্লাবিত রাতে আয়েশা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করল তার ফেলে আসা দীর্ঘ পথ। মৃদু বাতাসে তার মাথায় রাখা ওড়না টা উড়ছিল। সে ফিসফিস করে বলল— “হে আল্লাহ, তুমি আমায় অন্ধকার থেকে নূরের পথে এনেছো। আমার পরীক্ষাগুলোকে তুমি আমার শক্তিতে রূপান্তর করেছো।”
আয়েশা তার ঘরে এসে টেবিলে বসল। তার ডায়েরিটা খুলে সেখানে লিখতে শুরু করল —
❝আল্লাহর পথে ফেরার নাম শুধু একবারের তাওবা নয়, বরং এটি এক অনন্ত অভিযাত্রা— যেখানে প্রতিটি কষ্ট শেখায় ধৈর্য, প্রতিটি বিচ্ছেদ শেখায় তাওয়াক্কুল, আর প্রতিটি পরীক্ষা শেখায় আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।❞
❝নূরের পথে ফিরে আসা❞ মানে নিজের ভেতরের সব অন্ধকারকে আল্লাহর নূরে রূপান্তরিত করা।
#চলবে_ইনশাআল্লাহ
[ আর মাত্র দুইটা পর্ব আসবে গল্পের তারপর সমাপ্তি দিয়ে দিব🫶]