ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (২য় খন্ড)

১ম পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

[ এক ]

শহরের অভিজাত এলাকার এক অন্ধকার ফ্ল্যাটে বসে কাঁপছে হায়াত। তার হাতে থাকা স্মার্টফোনটি থেকে অনবরত নোটিফিকেশন আসছে—তার কিছু একান্ত ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও কে বা কারা ভাইরাল করে দিয়েছে। হায়াতের অপরাধ ছিল কেবল ভুল মানুষকে বিশ্বাস করা। যে মানুষটির বুকে সে শান্তির আশ্রয় খুঁজেছিল, সেই আজ তার সাজানো জীবনে কালবৈশাখী ঝড় হয়ে নেমে এসেছে। যাকে ভালোবেসে সে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করতে চেয়েছিল, আজ সেই মানুষটিই তার চারপাশের চেনা জগতটাকে এক জীবন্ত নরকে পরিণত করেছে।

বাইরে বৃষ্টি নামছে। হায়াত টলমল পায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঝাপসা মিররের ওপারে যে মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে, তাকে সে চিনতে পারে না। বৃষ্টির পানিতে চোখের কাজল আর মেকআপ ধুয়ে একাকার হয়ে কালচে দাগে ভরে গেছে গাল দুটো। হায়াত নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ভাবল,

—“এই জীবন রেখে আর লাভ কী? যে সমাজে কলঙ্কের দাগ একবার কপালে লেপ্টে যায়, সেখানে কি আর কোনোদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সম্ভব?

হায়াত কাঁপা কাঁপা হাতে ড্রয়ার থেকে ঘুমের ওষুধের পাতা বের করল,যা তাকে এই মুহূর্তে অসহ্য যন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি দিতে পারে। যখনই সে ঘুমের ওষুধ মুখে দিতে যাবে ঠিক তখনই ​ খোলা জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির কোনো এক বৃদ্ধার কণ্ঠে পবিত্র আল-কুরআনের তিলাওয়াত ভেসে আসল—

—“​আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।”

(সূরা আন-নিসা, ৪:২৯)

হায়াতের হাতের ফাঁক দিয়ে ওষুধগুলো পড়ে গেল। হায়াতের মনে হলো, এই অন্ধকার ঘরে সে একা নয়; কেউ একজন তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস শুনছে, কেউ তাকে অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া থেকে টেনে ধরছে। হায়াতের শরীর ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। হায়াত আবার তাকাল তার প্রতিবিম্বের দিকে। ​আয়নার সেই অসহায় মেয়েটি এবার অঝোরে কাঁদছে। কিন্তু এ কান্না অপমানের নয়, এ কান্না যেন আত্মিক শুদ্ধির—এক নতুন লড়াইয়ের শুরু।

[ দুই ]

পরদিন সকালে হায়াত যখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন পাড়ার লোকজন তারদিকে বাঁকা চাহনিতে আড়চোখে দেখছে আর তাকে নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে, যা হায়াতের মনে তপ্ত সিসার মত বিঁধল।

“দেখ দেখ ,এটাই সেই মেয়ে! এসব মেয়ের জন্যই সমাজ রসাতলে যাচ্ছে।”

“ পর্দা করা তো দূরের কথা, শালীনতার কোনো বালাই নেই। এখন মুখ লুকিয়ে লাভ কি?

একজন তো সরাসরি সামনে এসে বলেই ফেলল,

"তোমাদের মতো কলঙ্কিত মেয়েদের এই এলাকায় থাকার অধিকার নেই।”

​হায়াত মাথা নিচু করে কিছুসময় সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন হায়াত চোখ বন্ধ করে কল্পনা করল আয়েশা রহমানের সেই কথাটি যেটা সে একবার ইউটিউবে শুনেছিল।

“মানুষের বিচার অস্থায়ী, আল্লাহর বিচারই চূড়ান্ত। মানুষ তোমাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তোমাকে আরশে আজীমের ছায়ায় জায়গা দিতে পারেন।”

হায়াত অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর এসে পৌঁছাল “আয়েশা ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট”-এর গেটে। । সেখানে আয়েশার খুবই প্রিয় ছাত্রী আমিনা দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমিনার চোখে সেই একই ভালোবাসা, একই মমতা ফুটে উঠেছে , যা একসময় আয়েশার ছিল।

​হায়াত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

"আমি পাপিষ্ঠা, আমার চরিত্র কলঙ্কিত। সমাজ আমাকে লাথি মারছে। আপনাদের এই পবিত্র জায়গায় কি আমার মতো কলঙ্কিনীর জায়গা হবে?”

​আমিনা সারার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,

— "বোন আমার, তুমি জানো না আমাদের নবী (সা.) কী বলে গেছেন? তিনি বলেছেন—

​‘প্রত্যেক আদম সন্তানই পাপী, আর পাপীদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা তওবা করে (আল্লাহর দিকে ফিরে আসে)।’

(সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস নং ২৪৯৯)

​তুমি নিজেকে কলঙ্কিত বলছো? মনে রেখো, আল্লাহ যখন কাউকে ক্ষমা করেন, তখন তার অতীত ধুয়ে মুছে সাফ করে দেন। আল্লাহ বলেন—

​‘ হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’

(সূরা আয-জুমার, ৩৯:৫৩)”

[ তিন ]

সেদিন বিকেলে মাদ্রাসার বারান্দায় বসে হায়াত ভাবছে, “ ভাগ্যের এই নিদারুণ পরিহাস আসলে কোনো অভিশাপ না, বরং এক অদৃশ্য আশীর্বাদ। যে যন্ত্রণার আগুনে সে এতদিন পুড়েছে, তা তাকে শেষ করে দেয়নি; বরং ঝরিয়ে দিয়েছে তার মনের সব দুর্বলতা আর গ্লানি। আগুনের পরশমণি যেমন লোহাকে সোনা করে, এই অপমানও তাকে ভেতর থেকে এক অপরাজেয় শক্তিতে বলীয়ান করে তুলেছে। মানুষের ঘৃণা আমাকে অনেককিছু বুঝতে শিখিয়েছে । আজ আমি ইসলামকে আমার ঢাল হিসেবে বেছে নিলাম। আমি হব আয়েশা আপুর সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্নের উত্তরাধিকারী, যে শিখিয়ে দেবে — ​"মানুষের জীবনের খারাপ পরিস্থিতি তাকে সাময়িকভাবে অসহায় করে দিতে পারে, কিন্তু তার মনের শক্তি ও সাহস কখনো বিলীন হয় না। ঠিক যেমন ধুলোবালি হিরের উজ্জ্বলতা কেড়ে নিতে পারে না—একটু যত্ন আর লড়াই করলেই সেই হিরে আবার নূরের মতো আলো ছড়াতে বাধ্য।”

—“ আমি আর পালাবো না। যারা আমাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছে, যে মানুষটা আমার সরলতাকে পুঁজি করে আমাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে, তাদের সামনে আমি এখন এক অন্য রূপে দাঁড়াব। কলঙ্ক কেবল তাকেই স্পর্শ করে, যে নিজেকে কলঙ্কিত মনে করে। কিন্তু যে নিজেকে স্রষ্টার কাছে সঁপে দিয়েছে, তাকে তুচ্ছ করার সাধ্য কার?”

হায়াত এক শান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল সময় নিয়ে। অপরাধবোধের সেই ভারী পাথরটা বুক থেকে নামিয়ে রাখল সে। আজ থেকে তার লড়াইটা হবে নিজের সাথে নিজের—নিজেকে নতুন করে গড়ার লড়াই।

[ চার ]

সন্ধ্যায় চারদিক থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। হায়াত ওজু করে জায়নামাজে দাঁড়াল।তার শরীর হঠাৎ করে থরথর করে কাঁপতে লাগল। এতদিন পর এক অদ্ভুত লজ্জা আর কুণ্ঠা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। যে কপালটা সে কেবল দুনিয়াবী মোহের কাছে নত করেছিল, আজ সেখানে স্রষ্টার সামনে দাঁড়ানোর সাহসটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।

নামাজ শেষে হায়াত আল্লাহর দরবারে হাত তুলল,

​“হে আমার রব! আমি তোমার দেওয়া পবিত্র ভালোবাসার সংজ্ঞা বুঝিনি। যে হৃদয়ে কেবল তোমারই নাম থাকার কথা ছিল, সেখানে আমি এক নশ্বর মানুষকে বসিয়েছিলাম। যে সম্পর্কের কোনো বৈধতা ছিল না, যে পথে কেবল অবাধ্যতা আর পঙ্কিলতা ছিল—আমি তাকেই আমার মঙ্গল ভেবে ভুল করেছি। আমি নিজের অস্তিত্বকে বিলিয়ে দিয়েছিলাম এক মিথ্যে মরীচিকার পেছনে।”

​হায়াতের দু’চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই হারাম সম্পর্কের প্রতিটি স্মৃতি এখন তাকে দংশন করছে। যে মানুষটির মোহে সে অন্ধ হয়েছিল, সেই মানুষটির দেওয়া অপমানের কথা ভাবলেই তার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ​সে কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বলতে লাগল,

​"আমি অপরাধী, মালিক! আমি নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। আমি আবেগের বন্যায় নিজের সম্মান আর তোমার সন্তুষ্টি—দুটোকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। আজ আমি রিক্ত হাতে তোমার দুয়ারে ভিখারি হয়ে দাঁড়িয়েছি। তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো, তবে এই পৃথিবীর কেউ আমাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না। আমাকে পবিত্র করে দাও, আমার এই অপবিত্র স্মৃতির বোঝাগুলো আমার অন্তর থেকে মুছে দাও।”

মোনাজাত শেষ করে সে যখন তার অশ্রুভেজা মুখে হাত বুলাল, তখন তার মনে হলো—তার আত্মাটা যেন শান্তি অনুভব করছে। এক নিষিদ্ধ প্রেমের নরক থেকে সে যেন এক চিরন্তন শান্তির স্থানে পা রেখেছে।

[ পাঁচ ]

হায়াত আজ প্রথমবার প্রপার পর্দা করে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আলমারি থেকে বের করা কালো রঙের বোরকা, হিজাব এবং হাত মোজা, পা মোজা পড়ে সে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, তখন তার নিজের কাছেই নিজেকে নতুন মানুষ মনে হচ্ছে।

আগে হায়াত চুল ছেড়ে, মডার্ন ড্রেস পড়ে বাইরে যেত এবং সকলের মনোযোগের মূল হেতু হতো। আগের কার্যকলাপের জন্য মনে মনে সে আল্লাহর কাছে তওবা করল।

—“আয়েশা আপু বলেছিল, পর্দা করা মানে নিজেকে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং নিজেকে অমূল্য রত্ন হিসেবে ঘোষণা করা।”

হায়াত রেডি হয়ে যখন নিচে নেমে এল তখন তার বাবার কড়া কণ্ঠস্বর কানে এল।

#চলবে_ইনশাআল্লাহ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা { ২য় খন্ড }

#পর্ব_১

#লেখনিতে_নূরায়া_মেহনাজ

[ আসসালামু আলাইকুম। আগের পর্বের কাহিনী অর্থাৎ #নূরের_পথে_ফিরে_আসা ১ম খন্ড চাইলে আবার পড়ে নিতে পাড়েন। লিংক কমেন্টে দেওয়া আছে। আশা করছি আপনাদের থেকে ভালো রেসপন্স পাবো। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন