ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (২য় খন্ড)

৯ম পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা { ২য় খন্ড }

#পর্ব_৯

#Writer_Nuraya_Mehnaz

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে চারপাশের সবকিছু শান্ত ও নিস্তব্ধ হয়ে আছে। বস্তির ঘরের টিনে হিমেল হাওয়ার কারণে অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে।

শীতের এই কনকনে বাতাসের ঝাপটা শরীরকে যেন হিম করে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় হায়াতের চোখের পাতা একমুহূর্তের জন্যও এক হতে পারেনি। ওমরের অফিসের সেই কলিগের কথাগুলো নিয়ে সে ভাবনায় আছে। একদিকে স্বামীর মুক্তির ক্ষীণ আশা অন্যদিকে এক বিশাল ষড়যন্ত্রের অন্ধকার গহ্বর। হায়াত শোয়া থেকে উঠে বসে বলে,

“আমি জানি এই পথটি আমার জন্য সহজ হবে না। এখানে প্রতিটি পদক্ষেপে আমায় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। তবুও আমি আমার স্বামীর জন্য সবকিছু করতে রাজি।”

হায়াত ওজু করে আবার জায়নামাজে বসল। শেষ রাতের এই নিস্তব্ধতায় কেবল আল্লাহর সাথেই মনের সব কথা বলা যায়। হায়াত সিজদাহ্ তে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল,

“হে আরশের মালিক! তুমি তো ইউসুফ (আ.)-কে অন্ধকূপ থেকে মিশরের সিংহাসনে বসিয়েছিলে। তুমি মুসা (আ.)-এর জন্য নীল নদকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলে। আজ এই অসহায় বান্দার সামনে যে ষড়যন্ত্রের বীজ তৈরি হয়েছে, তুমি কি তা পার করে দেবে না?”

——————————

পরদিন সকালে হায়াত সঠিকভাবে পর্দার মাধ্যমে নিজেকে আবৃত করে শহরের এক জনাকীর্ণ পার্কে এসে পৌঁছাল। ওমরের কলিগ আবদুল্লাহর কথা মতো সে এই ঠিকানায় এসেছে। ঠিক দশ মিনিট বাদে মাথায় টুপি আর সাধারণ পোশাকে একজন লোক এসে আয়েশার পাশে দাঁড়াল। লোকটির চোখে-মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ।

“হায়াত বোন?” লোকটির কন্ঠ কাঁপছিল।

হায়াত মৃদুস্বরে উত্তর দিল,”জ্বি আমি হায়াত।”

আব্দুল্লাহ এদিক ওদিক তাকিয়ে পকেট থেকে একটি ছোট পেনড্রাইভ বের করে খুব সাবধানে হায়াতের ব্যাগের ওপর রাখল।

“এখানে সব আছে। রোহান স্যার কীভাবে ওমরের ল্যাপটপে রিমোট অ্যাক্সেস নিয়ে ফাইলগুলো প্ল্যান্ট করেছিলেন, সেই সময়ের স্ক্রীন রেকর্ডিং আর লগ ফাইল আমি জোগাড় করেছি। এমনকি আইটি হেডের সাথে তার আর্থিক লেনদেনের কল রেকর্ডও এখানে আছে।”

“আপনি কেন এত ঝুঁকি নিচ্ছেন আব্দুল্লাহ ভাই?”

​আব্দুল্লাহর চোখে পানি চলে এল। সে নিচু স্বরে বলল, "বোন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। ওমরের মতো একজন নিরপরাধ নেককার মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে শামিল হয়ে আমি তাকে জেলে পাঠিয়ে রাতে ঘুমাতে পারছি না। আমার ছোট মেয়েটা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে, তখন আমার মনে হয়—যদি কাল আমি কোনোভাবে ধরা পড়ি, তবে আমার পাশে কে দাঁড়াবে? আল্লাহ বলেছেন—

'আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।' (সূরা আল-বাকারা, ২:৪২)

তবে সাবধান, রোহান স্যার জানতে পারলে আমার এবং আপনার—উভয়েরই প্রাণের সংশয় আছে।”

আব্দুল্লাহ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই হায়াতের মনে হলো কেউ তাকে অনুসরণ করছে। পার্কের গেট দিয়ে বের হতেই সে দেখল দুটি কালো বাইক তার রিকশার পিছু নিয়েছে। হায়াতের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। তার ব্যাগের ভেতর এখন ওমরের মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি। যদি এই পেনড্রাইভটি রোহানের হাতে পড়ে, তবে ওমর কে সে বাঁচাতে পারবে না।

রিকশাচালককে হায়াত দ্রুত সামনের গলি দিয়ে চালাতে বলল। বাইকের ছেলেগুলো গলি ঘুপচির ভেতর তাকে প্রায় ধরে ফেলছিল। হায়াত মনে মনে তিলাওয়াত করল—

​'ওয়া জা'আলনা মিম বাইনি আইদিহিম সাদ্দাও ওয়া মিন খালফিহিম সাদ্দান ফা আগশাইনাহুম ফাহুম লা ইয়ুবসিরুন।'

(অর্থ : আমি তাদের সামনে ও পিছনে একটি প্রাচীর নির্মাণ করেছি এবং তাদের দৃষ্টি ঢেকে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না।” — সূরা ইয়াসিন, ৩২:০৯)

​ঠিক তখনই একটি বিশাল ট্রাক এসে গলির মুখটি আটকে দিল। বাইক দুটি আর এগোতে পারল না। হায়াত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে করতে একটি ভিড়ভাট্টার বাজারে ঢুকে পড়ল এবং সেখান থেকে অন্য একটি রিকশা করে সরাসরি আমিনা আপুর কাছে পৌঁছাল।

অন্যদিকে কারাগারে সেলের প্রধান আসামি, যাকে সবাই কালা জহির বলে চেনে সে আজ ওমরের হাঁটু ঘেঁষে বসে আছে। জহিরের গায়ে অজস্র ক্ষতের দাগ, তার হাত দুটিতে বহু মানুষের রক্তের দাগ লেগে আছে। কিন্তু আজ সেই ভয়ংকর মানুষটির চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।

ওমর তাকে বলছে, “জহির ভাই, দুনিয়ায় মানুষের তৈরি আদালত হয়তো আপনাকে ফাঁসি দেবে, কিন্তু দয়াময় আল্লাহর দরজা এখনো আপনার জন্য উন্মুক্ত।

ওমর কিছু সময় চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করে,

“আপনি কি জানেন না, সেই ব্যক্তির গল্প যে নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করার পর তওবা করেছিল এবং আল্লাহ তাকে মাফ করে দিয়েছিলেন? (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩৪৭০)।

"​বনি ইসরাঈল যুগে এক ব্যক্তি ছিল, যে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছিল। হঠাৎ তার মনে আল্লাহর ভয় এবং অনুশোচনা জাগল। সে তার পাপের জন্য তওবা করতে চাইল।

​সে লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, "এই এলাকায় সবচেয়ে বড় জ্ঞানী বা ইবাদতগুজার কে আছে?"

লোকেরা তাকে এক 'আবেদ' (যিনি সারাদিন ইবাদত করেন কিন্তু গভীর জ্ঞান কম) ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে দিল। খুনি ব্যক্তিটি সেই আবেদের কাছে গিয়ে বলল,

"আমি ৯৯ জন মানুষকে মেরেছি। আমার কি তওবার কোনো সুযোগ আছে?"

​আবেদ অবাক হয়ে বলল, "না, কোনো সুযোগ নেই!"

এ কথা শুনে রাগের মাথায় ওই লোক আবেদকেও হত্যা করল। এতে তার খুনের সংখ্যা পূর্ণ হলো ১০০।

​

​কিন্তু তার মনের অস্থিরতা কমলো না। সে আবার মানুষের কাছে গিয়ে একজন বড় আলেমের খোঁজ চাইল। তাকে একজন আলেমের কাছে পাঠানো হলো। লোকটা আলেমের কাছে গিয়ে বলল,

"আমি ১০০ জন মানুষকে হত্যা করেছি। আমার কি ক্ষমা পাওয়ার কোনো পথ আছে?"

​সেই বিজ্ঞ আলেম বললেন, "অবশ্যই আছে! তোমার আর তওবার মাঝখানে কে বাধা হয়ে দাঁড়াবে?"

আলেম তাকে একটি পরামর্শ দিলেন, "তুমি এই এলাকা ছেড়ে অমুক জনপদে চলে যাও। সেখানে একদল মানুষ আছে যারা আল্লাহর ইবাদত করে। তুমি তাদের সঙ্গে গিয়ে ইবাদত শুরু করো। নিজের পুরনো পাপিষ্ঠ এলাকায় ফিরে যেও না, কারণ ওটা খারাপ জায়গা।"

​

​আলেমের কথা শুনে লোকটি সেই নেককারদের এলাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কিন্তু পথিমধ্যে অর্ধেক রাস্তা পার হওয়ার আগেই তার মৃত্যুর সময় চলে এল। সে মৃত্যুবরণ করল।

​

​তখন তার রূহ বা আত্মা নিয়ে জান্নাত এবং জাহান্নামের ফেরেশতাদের মধ্যে তর্ক শুরু হলো।

​জাহান্নামের ফেরেশতারা বলল, "সে কখনোই ভালো কাজ করেনি। সে পাপিষ্ঠ, তাই সে জাহান্নামে যাবে।"

​জান্নাতের ফেরেশতারা বলল: "সে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসছিল, তাই সে জান্নাতে যাবে।"

​এমন সময় আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতাকে মানুষের বেশে পাঠালেন বিচার করার জন্য। তিনি বললেন, "তোমরা দুই দিকের রাস্তা মেপে দেখো। লোকটা কোন এলাকার বেশি কাছে? যে এলাকার সে কাছে হবে, তাকে সেই এলাকার মানুষের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।"

​হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তাআলা নেককারদের এলাকাকে বললেন কাছে চলে আসতে এবং পাপিষ্ঠ এলাকাকে বললেন দূরে সরে যেতে। মেপে দেখা গেল, লোকটি ভালো মানুষদের এলাকার দিকে এক বিঘত পরিমাণ বেশি কাছে ছিল। (অন্য রেওয়ায়েত অনুযায়ী, সে তওবার আকুতি নিয়ে বুকের ভরে হামাগুড়ি দিয়ে ওই দিকেই এগোচ্ছিল)।

​আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন এবং জান্নাতের ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে গেল।"

​

তাই বলছি ভাই, " ​আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হতে নেই। ​সাথী বা পরিবেশ ভালো হওয়া জরুরি। ​সঠিক জ্ঞানহীন ব্যক্তি (আবেদ) ফতোয়া দিলে বিপদ হতে পারে, তাই সঠিক আলেমের পরামর্শ নিতে হয়। আল্লাহ চান বান্দা অনুতপ্ত হয়ে তাঁর কাছে ফিরে আসুক।”

জহির কেঁদে উঠে বলল, "ওমর সাহেব, আমি কি কোনোদিন জান্নাতের সুবাস পাব? আমি তো অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখিনি।”

ওমর পরম মমতায় তার কাঁধে হাত রাখল।

"ভাই, তওবার এক ফোঁটা চোখের পানি জাহান্নামের সমুদ্র সমান আগুন নেভানোর জন্য যথেষ্ট। আপনি আজ থেকে নামাজ শুরু করুন।”

সেই রাতে হাজতের দশজন দাগী কয়েদির হৃদয়ে ঈমানের নূর জ্বলতে শুরু করল। তারা ওমরের ইমামতিতে এশার নামাজ আদায় করল।

কারাগারের পুলিশরা অবাক হয়ে দেখল—যে সেলে সারারাত গালিগালাজ আর মারামারি হতো, সেখানে আজ পিনপতন নীরবতা আর কান্নার সুর।

​শহরের অন্য প্রান্তে ওমরের বাবা চৌধুরী সাহেব তাঁর বিশাল ড্রয়িংরুমে একা বসে আছেন। হায়াত তার বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর থেকে তার মনে শান্তি নেই। তিনি গোপনে ওমরের অফিসের খোঁজ নিয়েছেন এবং জানতে পেরেছেন যে ওমরকে আসলে ফাঁসানো হয়েছে। তার আভিজাত্যের অহংকার আজ এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি।

​তিনি কি তাঁর একমাত্র ছেলেকে জেলখানায় পচতে দেবেন, নাকি তাঁর বংশের তথাকথিত 'সম্মান' বিসর্জন দিয়ে সেই 'তওবাকারী' মেয়েটির পাশে দাঁড়াবেন?

হঠাৎ তাঁর মোবাইলে একটি ছবি পাঠানো হলো। তারই এক বিশ্বস্ত কর্মচারী ছবিটা পাঠিয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—হায়াত একটি ছোট টিনের ঘরের সামনে বসে একা শুকনো রুটি খাচ্ছে, কিন্তু তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। চৌধুরী সাহেবের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, যে সুখ তিনি কোটি টাকার প্রাসাদে খুঁজে পাননি, সেই সুখ হায়াত হয়তো খুঁজে পেয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাঝে।

​তিনি তাঁর ড্রাইভারকে ডেকে বললেন, "গাড়ি বের করো। আমরা আয়েশা ইনস্টিটিউটে যাব। তবে কাউকে জানাবে না।”

​আয়েশা ইনস্টিটিউটে আমিনা আপুর সাথে বসে হায়াত ল্যাপটপে পেনড্রাইভের ভিডিওগুলো দেখছিল। প্রতিটি ভিডিওতে রোহানের পৈশাচিকতা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ।

আমিনা আপু বললেন, "হায়াত, এই প্রমাণগুলো যদি আমরা কোর্টে জমা দিতে পারি তবে শুধু ওমরই মুক্তি পাবে না রোহানকেও জেলে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের হাতে সময় খুব কম। কাল ওমরের জামিন শুনানি।”

হায়াত জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকাল।

"আল্লাহর পথের মুসাফিরদের জন্য পরীক্ষা যত কঠিন হয়, তাদের প্রতিদান তত বড় হয়। ওমর আজ জেলখানায় দ্বীনের মশাল জ্বালিয়েছেন আর আমি বাইরে ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ছি। আমাদের এই বিচ্ছেদ আসলে আমাদের ভালোবাসাকে আরও পবিত্র করে তুলছে। কাল আমাদের বিজয়ের দিন, ইনশাআল্লাহ। কারণ আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—

​'নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।' (সূরা আল-ইনশিরাহ, ৯৪:০৬)”

হঠাৎ ইনস্টিটিউটের গেটে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। হায়াত আর আমিনা আপু অবাক হয়ে নিচে তাকিয়ে দেখলেন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ওমরের বাবা চৌধুরী সাহেব। তাঁর হাতে ওমরের ছোটবেলার একটি ছবি।

#চলবে_ইনশাআল্লাহ

কি মনে হয় ওমরের বাবা কি হায়াতের পাশে দাঁড়াবে? নাকি হায়াতের কাছে আসার পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য? 🙂

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন