ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (২য় খন্ড)

৮ম পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা {২য় খন্ড}

#পর্ব_৮

#Writer_Nuraya_Mehnaz

কারাগারে অন্ধকার সেলে ওমরের দিন কাটতে থাকে। তার সেলে থাকা অন্য কয়েদিরা ছিল খুনি, চোর আর ছিনতাইকারী। প্রথম প্রথম তারা সবাই ওমর কে নিয়ে খুব হাসিঠাট্টা করত।

ওমর গুনগুন করে নিজ মনে জিকির করছে। পাশ থেকে একজন উচ্চস্বরে হেসে তাকে ব্যঙ্গ করে বলে,

“কিরে হুজুর! জিকির করে কি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার আশা করছিস হ্যাঁ? লাভ নাই রে লাভ নাই। নিশ্চয়ই বড় কিছু করেছিস।”

ওমর কোনো উত্তর দেয় না সে একপল লোকটির দিকে তাকিয়ে আবার নিজ কাজে মন দিল।

সেদিন রাতে জেলের মধ্যে সবাই নানাধরণের কথা বলতে ব্যস্ত। এমন সময় ওমর নিচু স্বরে সূরা আর-রহমান তিলাওয়াত শুরু করল। তার কন্ঠে মাধুর্য আর কুরআনের বাণী শুনে একে একে সব কয়েদি কথা বলা বন্ধ করে ওমরের তেলাওয়াত শুনতে লাগল। তেলাওয়াত শেষে যে কয়েদি ওমরকে নিয়ে মজা করত ব্যঙ্গ করে কথা বলত সে ওমরের কাছে এসে বলে,

“ ভাই আপনি যে সূরা টা তেলাওয়াত করলেন মনে হলো আপনার কন্ঠে যেন অদ্ভুত কিছু একটা আছে। আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন শীতল হয়ে গেছে ভাই। আমি তো জীবনে অনেক পাপ করেছি, আল্লাহ কি তার এই পাপী বান্দার দিকে ফিরে তাকাবেন?”

ওমর লোকটির হাত ধরে বলল, “ ভাই মহান আল্লাহ তায়ালা পরম দয়াময়। তিনি তো তাঁর বান্দার ফেরার অপেক্ষায় থাকেন৷ তিনি বলেছেন—

“হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছো, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন।”( সূরা আস-জুমার, ৩৯:৫৩ )

সেই ছোট্ট অন্ধকার হাজতখানাটি একটি ইসলামিক বৈঠকে পরিণত হলো। যেখানে ওমর সবাইকে নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে, ইসলাম সম্পর্কে, এছাড়াও সে তাদেরকে নামাজের বিভিন্ন সূরা শিখাতে শুরু করে। ওমর নিজ মনেই অনুভব করল যে মহান রাব্বুল আলামীন তাকে কোনো উদ্দেশ্যে এখানে এনেছেন এবং সেই উত্তম উদ্দেশ্য সম্পর্কে সে ইতোমধ্যে অবগত হয়েছে। সে অবশ্যই চেষ্টা করবে এই পথভ্রষ্ট মানুষগুলোকে আলোর পথে নিয়ে আসতে।

—---------------------------------

হায়াত সারাদিন ছোটাছুটির পর মাত্র বাসায় ফিরেছে৷ ঠিক তখনই হায়াতের বাড়ির নির্জন রাস্তায় একটি কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ির গ্লাস নামিয়ে রোহান সামান্য মাথাটা বের করে তাকিয়ে থাকে হায়াতের বাড়ির দিকে। তার মুখে লেগে আছে এক পৈশাচিক হাসি।

হায়াত জানালা দিয়ে সবই দেখল। সে সাথে সাথে সেই গাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ায়। রোহান গাড়ি থেকে নেমে হায়াতের মুখের ওপর মুখ গোল করে ফু দেয়৷ হায়াত ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তা দেখে রোহান মুখে বিশ্রি হাসি ফুটিয়ে বলে,

“কি হায়াত? উমম… আচ্ছা বলতো তোমার প্রাণপ্রিয় স্বামী ওমরের এই মুহুর্তে জেল খাটতে কেমন লাগছে?” থুতনিতে হাত দিয়ে অসহায় ভাব নিয়ে বলল রোহান।

হায়াত চুপ করে আছে৷

“ ঠিক আছে চলো একটা ডিল করি। যদি তুমি চাও তাহলে ওমর কাল সকালেই মুক্তি পাবে৷ শুধু তোমাকে আমার একটা শর্ত মানতে হবে।”

হায়াত ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ তোমার মতো শয়তানের শর্ত মানার থেকে ওমরের জেলখানাতে থাকায় বেশি শ্রেয়। তুমি কি মনে করেছো রোহান? তুমি আমাদের বিপদে ফেলে জিতে যাবে? আল্লাহ বলেছেন,

‘​‘আর তারা ষড়যন্ত্র করল এবং আল্লাহও কৌশল করলেন; আর আল্লাহই হলেন শ্রেষ্ঠ কৌশলী।

(সূরা আলে ইমরান, ৩:৫৪)।”

রোহান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

“তুমি আমাকে অপমান করে ঠিক করলে না হায়াত। এর জন্য তোমাদের পস্তাতে হবে বাজেভাবে। শান্তিতে থাকতে দেব না আমি তোমাদের। আর এটাও দেখে নেব কীভাবে তুমি ওই ওমরকে উদ্ধার করো।” বলেই সে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল।

হায়াত ঘরে এসে ওমরের একটি পাঞ্জাবি বুকে জড়িয়ে নিল। এই পাঞ্জাবিটা পরে ওমর শেষবার জুমার নামাজে গিয়েছিল। পাঞ্জাবিটা নাকে চেপে ধরতেই ওমরের শরীরের সেই চিরচেনা আতর আর ঘাম মেশানো ঘ্রাণটা পেল সে। মুহুর্তেই তার সব বাঁধ ভেঙে গেল সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। হায়াত পাঞ্জাবিটা বুকের সাথে আরো শক্ত করে মিশিয়ে জাপটে ধরল, যেন সে পাঞ্জাবি না স্বয়ং ওমরকেই জড়িয়ে ধরেছে।তার খুব ইচ্ছে করছিল ওমরের সাথে একটু কথা বলতে৷ হায়াত এবার ডুকরে কেঁদে উঠল,

“ ওমর, আপনি ছাড়া এই পৃথিবীটা আমার কাছে কত বড় জিন্দানখানা হয়ে গেছে আপনি কি বুঝতে পারছেন না?”

হায়াত যেমন ভেঙে পড়ছে ঠিক তেমন নিজেকে আবার সামলে নিচ্ছে। কারণ সে এখন একজন দ্বীনদার স্ত্রী। বিপদের সময় বিলাপ করা শয়তানের কাজ আর ধৈর্য ধরা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের গুণ। তাকে ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ যেকোনো প্রতিকূলে আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া এবং কোনো ধরনের অভিযোগ - অনুযোগ পেশ না করার নামই সবর।

হায়াত তার চোখের পানি টুকু মুছে ওজু করতে গেল। ওজু করার সময় তার মনে হলো এই পানির ফোঁটাগুলো যেন তার মনের অস্থিরতাকে কিছুটা প্রশমিত করছে, আলহামদুলিল্লাহ!

রাত যখন একটু গভীর হলো তখন হায়াত জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ল। পুরো ধরিত্রী যখন ঘুমে আচ্ছন্ন তখন সে নিজের রবের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সিজদাহ্ তে নিবেদিত হয়ে চোখের পানিতে জায়নামাজ ভিজিয়ে দিচ্ছে। সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলতে লাগল,

“হে আল্লাহ! ইউসুফ (আ.)-কে আপনি যেমন বন্দী থেকে মুক্তি দিয়ে মিশরের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন, আমার ওমরকেও আপনি তেমনি সসম্মানে ফিরিয়ে দিন। আপনি তো সত্যের পাহারাদার। আপনি তো আমাদের মনের খবর জানেন।”

নামাজ শেষে হায়াত ওমরের কোরআন শরিফটি হাতে নিল। সূরা ইউসুফ আর সূরা আর-রাহমান তিলাওয়াত করতে করতে সে তার মনের অস্থিরতাকে শান্ত করল। সে মনে মনে সংকল্প করল, যতক্ষণ না ওমর ফিরে আসছে সে নফল রোজা রাখবে এবং প্রতিটি ইফতারের সময় ওমরের মুক্তির জন্য দোয়া করবে।

পরদিন সকালে হায়াত তার ড্রয়ার থেকে নিজের বিয়ের ছোট্ট একজোড়া কানের দুল বের করল। যেটা ওমর নিজ উপার্জনে তাকে উপহার দিয়েছিল বিয়ের সময়। এটি এখন তার শেষ সম্বল। সে ভাবল এটা বিক্রি করে সে অসহায় এতিমখানায বাচ্চাদের খাওয়াবে। ছোট বাচ্চাদের দোয়া মহান রাব্বুল আলামীন কবুল করেন বেশি। তাছাড়া আমি বিশ্বাস করি “সাদাকা বিপদকে হটিয়ে দেয়।”

“আমাকে ক্ষমা করবেন ওমর আপনার দেওয়া উপহার আমি নিজের কাছে রাখতে পারছি না!” টুপ করে চোখ থেকে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল হায়াতের গালে। তারপর সে বেরিয়ে পড়ল গয়না বিক্রির উদ্দেশ্যে।

অনেক হাঁটাহাঁটির পর সে দুলটি বিক্রি করতে সক্ষম হলো। কিন্তু সোনার দোকান থেকে বের হওয়ার সময় তার বাবার সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় হায়াতের।

“কি ব্যাপার! তুমি সোনার দোকানে কি করছো? নিশ্চয়ই কিছু কিনতে আসবে না এটা তো শিউর!”

আমি যাই করি না কেনো আপনার কি?

“আমার মেয়ে তুমি হায়াত ভুলে যেও না। এত কষ্ট তুমি কার জন্য করছো? ওই জেল খাটা আসামীর জন্য? এখনো সময় আছে হায়াত ফিরে এসো এসব থেকে। এত বিলাসিতক ছেড়ে তুমি এই রাস্তায় কি সুখ পাচ্ছো? আমি বুঝতে পারছি না!”

“ভুল বললেন বাবা! আমার স্বামী কোনো আসামী নয়, তাকে মিথ্যা অপবাদে ফাঁসানো হয়েছে। ষড়যন্ত্র করেছে আমাদেরকে নিয়ে ওই রোহান। আর কি বললেন? সব ছেড়ে চলে আসবো? হাহ…..হাসালেন বাবা আপনি আমাকে!”

নিশ্চুপ হয়ে গভীর দৃষ্টি দিয়ে সে তার মেয়েকে দেখছেন।

“যে বাবা তার মেয়ের ভুলগুলোকে ক্ষমা না করে অপমান করে সমাজের মানুষের কথায়, যে মেয়েকে তার জন্মাদাতা পিতা ত্যাজ্য করতেও দু'বার ভাবেনি। তার কাছে ফিরে কেন যাবো আমি? আর আপনি যাকে আসামি বলেছেন, সে আমার সব খারাবি দেখেছে এবং আমার অতীত সম্পর্কে জেনেও আমাকে তার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছে তার পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে। সেই স্বামীর ভালোবাসাকে আমি পায়ে ঠেলতে পারবো না। তাকে আমি কখনো একা ছাড়বো না। তার হাত ধরে আমি আমার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই বাবা। তার সাথে আমি জান্নাত দেখতে চাই।”

হায়াত দু'হাতে চোখের পানি মুছে বলল,”আপনাদের কাউকে নিয়েও আমি আমার মনে কোনো রাগ রাখিনি বাবা। আপনারা যারা আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদের জন্য সবসময় দোয়া করি ভালো থাকুন আপনারা৷ আল্লাহ আপনাদের হেদায়েত দান করুন।”

হায়াত আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ছুটে চলে গেল সেখান থেকে। চৌধুরী সাহেব অপলক চেয়ে আছেন মেয়ের দিকে পলক ফেললেই যেন তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পরবে যেটা তিনি কাউকে দেখাতে চান না। তাহলে যে তার দম্ভ অহংকার সব ভেঙে যাবে।

হায়াত সারাদিন মুখে জিকির জারি রাখল— ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যলিমিন’।

সে তার ঘরটিকে একটি ছোটখাটো ইবাদতখানায় পরিণত করেছে। সে জানত, দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আরশের দরজা সবসময় খোলা থাকে।

" আগুন যখন সোনাকে পোড়ায়, তখন সোনা নষ্ট হয় না বরং খাঁটি হয়। ওমর আজ সেই আগুনের ভেতরে আছেন আর আমি বাইরের আগুনে। আমরা দুজনেই খাঁটি হচ্ছি। আমাদের এই বিচ্ছেদ আসলে আমাদের রূহের মিলনের এক মহড়া।"

​

সেদিন হায়াত ইফতারের পর নামাজ পড়ে কেবলমাত্র বালিশে মাথা রেখেছে তখনই তার ফোনটা বেজে ওঠে। হায়াত দেখল অপরিচিত একটি নাম্বার সে ফোন রিসিভ করে সালাম দেয়,

“আসসালামু আলাইকুম! কে বলছেন?

“ওয়ালাইকুম আসসালাম! আমি ওমরের অফিসের একজন ক্লার্ক বলছি।”

হায়াত ভ্রুকুটি কুঁচকে বলল,

“জ্বি বলুন! হঠাৎ কি মনে করে?”

“ হায়াত বোন, আমি জানি রোহান স্যার কীভাবে ওমরের বিরুদ্ধে সকল মিথ্যা তথ্য সাজিয়েছে। আমার এখন নিজের কাছেই খারাপ লাগছে। আমি সব প্রমাণ আপনাকে দিতে চাই, কিন্তু আমার নিজেরও প্রাণের মায়া আছে। বিষয়টা যেন রোহান স্যার কোনোভাবে জানতে না পারে৷”

হায়াত শোয়া থেকে উঠে বসল। হায়াত মনে মনে শুকরিয়া আদায় করল আল্লাহর নিকট। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন। তিনি আমাকে সাহায্য করছেন । হায়াত ওজু করে নামাজে দাঁড়াল।

“মালিক তুমি রহম করো। তুমি নূরের মালিক। তুমি পথ দেখাও আমাকে।”

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন