ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (২য় খন্ড)

১৫তম পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা { ২য় খন্ড }

#পর্ব_১৫

#Nuraya_Mehnaz_নূরায়া_মেহনাজ

[ লেখিকার নাম ব্যতীত কপি করা নিষেধ 🚫]

রাত তখন প্রায় পৌনে এগারোটা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। টিনের চালে বৃষ্টির অবিরাম ঝুমঝুম শব্দে চারপাশ যেন এক রহস্যময় নীরবতায় ডুবে আছে। ঠিক সেই সময় দরজায় হঠাৎ ঠক... ঠক... ঠক... শব্দ ভেসে আসতেই ওমরের বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা দোলা দিয়ে উঠল। রহমান কাকার সতর্কবার্তা তার মনে পরে গেল। সে শান্ত থাকার চেষ্টা করে হায়াতের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

— "আপনি বেডরুমেই থাকুন। আমি দেখে আসছি, এত রাতে কে এসেছে।"

হায়াত উদ্বিগ্ন চোখে স্বামীর দিকে তাকালেও আর কিছু বলল না। ওমর ধীর পায়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। গভীর শ্বাস নিয়ে ওমর দরজা খুলল। দরজা খুলতেই সে বিস্ময়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে।

দেখল, আমিনা আপু দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর গায়ে ভিজে রেইনকোট, মাথা থেকে টপটপ করে বৃষ্টির পানি পড়ছে। মুখজুড়ে স্পষ্ট উৎকণ্ঠার ছাপ, যেন কোনো বিষয়ে আতঙ্ক হয়ে তিনি ছুটে এসেছেন।

ওমর বিস্মিত কণ্ঠে বলল,

— "আমিনা আপু! আপনি? এত রাতে? বাইরে তো ভয়ানক বৃষ্টি হচ্ছে! এই সময় আপনি এখানে?”

আমিনা আপু ভেতরে এসে ভেজা রেইনকোট খুলে দরজার পাশের স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে রাখলেন। তাঁর চেহারায় উদ্বেগের ছাপ এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, ওমরের বুকের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল।

তিনি চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,

— "ওমর, আমার মনে হচ্ছে পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। একটু আগেই হাসপাতালের ডা. জাহানের সঙ্গে কথা হয়েছে। হায়াতের আগামীকালের রুটিন চেকআপের যে শিডিউল ছিল, সেটা আপাতত বাতিল করতে হবে।"

কথাটা শুনে ওমরের কপাল কুঁচকে গেল। উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল,

— "হঠাৎ কেন, আপু? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?”

— "রহমান কাকা যা বলেছিলেন, মনে হচ্ছে সেটাই সত্যি হতে চলেছে। একটু আগে হাসপাতালের ডা. জাহানের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি সরাসরি কিছু বলতে পারেননি, তবে ভরসাযোগ্য একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছি রোহান হাসপাতালের ভেতরের কয়েকজন কর্মচারীকে নিজের দলে টেনে নিয়েছে।"

তিনি আরও নিচু স্বরে বললেন,

— "আগামীকাল হায়াতের সোনোগ্রাফি আর রক্ত পরীক্ষার সময় কোনোভাবে ওকে সবার কাছ থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। হাসপাতালের এক বিশ্বস্ত নার্স গোপনে খবরটা আমাকে জানিয়েছেন। বিষয়টা এতটাই সংবেদনশীল যে, সামান্য ভুলও ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।"

আমিনা আপুর কথা শুনে ওমরের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখেমুখে ক্ষোভের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠলেও সে নিজেকে সংযত রাখল। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে গভীর শ্বাস নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,

— "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন... মানুষ প্রতিশোধের নেশায় কতটা নিচে নামতে পারে, তা রোহানকে না দেখলে বিশ্বাসই করা কঠিন।"

একটু থেমে দৃঢ় স্বরে আবার বলল,

— "তবে আপু, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আমরা কোনোভাবেই ওদের ষড়যন্ত্রে পা দেব না। আগামীকালের চেকআপ ওই হাসপাতালে হবে না। প্রয়োজন হলে আমি একজন বিশ্বস্ত মহিলা চিকিৎসককে বাসায় নিয়ে আসব, অথবা এমন কোনো নিরাপদ জায়গায় যাব, যেখানে ওদের নাগাল পৌঁছাবে না। হায়াত আর আমাদের সন্তানের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমি কোনো ধরনের ঝুঁকি নেব না, ইনশাআল্লাহ।"

কথাগুলো বলার সময় ওমরের কণ্ঠ ছিল শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত কণ্ঠের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল একজন দায়িত্বশীল স্বামীর অটল দৃঢ়তা। তার চোখের ভাষাই যেন বলে দিচ্ছিল—প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে হলেও সে হায়াত ও তাদের সন্তানকে রক্ষা করবে।

এতক্ষণ হায়াত নীরবে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ওমর আর আমিনা আপুর সব কথাই শুনছিল। ধীরে ধীরে সে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। অদ্ভুত বিষয় হলো, তার চোখেমুখে ভয়ের কোনো ছাপ ছিল না। বরং মুখজুড়ে ছড়িয়ে ছিল গভীর প্রশান্তি, যেন সমস্ত দুশ্চিন্তা সে মহান আল্লাহর ওপর সঁপে দিয়েছে। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি, আর চোখে ছিল অটল তাওয়াক্কুলের দীপ্তি।

শান্ত কণ্ঠে হায়াত বলল,

— "যে রব আমার সন্তানকে আমার গর্ভে নিরাপদে লালন করছেন, সেই রবই আমাদের রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট। বিপদ আসতে পারে, পরীক্ষা আসতে পারে কিন্তু আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোনো অনিষ্টই আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। তাই ভয় নেয়, আমাদের আরও বেশি দোয়া করতে হবে, আরও বেশি সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখতে হবে।"

হায়াতের দৃঢ় কণ্ঠ শুনে ওমর আর আমিনা আপু কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এমন সংকটের মুহূর্তেও তার ঈমান, ধৈর্য আর আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা যেন ঘরের ভারী পরিবেশটাকে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তিতে ভরে দিল।

হায়াত ধীর পায়ে হেঁটে এসে ওমরের পাশে দাঁড়াল।ওমরের হাতটি তার নিজের হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— "আপনি এত অস্থির হয়ে পড়ছেন কেন? মানুষের ষড়যন্ত্র কি কখনো আল্লাহর ফয়সালার চেয়ে বড় হতে পারে? মানুষ পরিকল্পনা করে, কিন্তু সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী তো একমাত্র আল্লাহ। তিনি যদি আমাদের হেফাজত করেন, তাহলে দুনিয়ার কোনো শক্তিই আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।"

হায়াতের কণ্ঠে ভয় ছিল না; ছিল অটল ঈমান, তাওয়াক্কুল আর মহান রবের প্রতি গভীর আস্থা। হায়াতের কথাগুলো শুনে ওমরের অস্থির মনও যেন কিছুটা প্রশান্ত হয়ে এল।

ওমর গভীর দৃষ্টিতে হায়াতের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই মুখে ভয় কিংবা দুশ্চিন্তার কোনো ছাপ নেই।

হায়াত বলল,

— "আপনার কি মনে আছে যখন ফেরাউন সৈন্যবাহিনী নিয়ে হজরত মুসা (আ.)-এর পিছু নিয়েছিল? সামনে ছিল বিশাল সাগর, আর পেছনে ছিল মৃত্যুর আশঙ্কা। তখন সবাই যখন নিরাশ হয়ে পড়েছিল, মুসা (আ.) দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন, 'কখনোই নয়! নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে আমার রব আছেন, তিনি অবশ্যই আমাকে পথ দেখাবেন।' (সূরা আশ-শু'আরা, ২৬:৬২)।"

হায়াত মৃদু হেসে ওমরের হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

— "আমাদের জীবনেও হয়তো পরীক্ষা আসবে। মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমরা যদি তাঁর ওপর ভরসা রাখি, তাহলে তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তাই ভয় নয়, আমাদের উচিত দোয়া, সবর আর তাওয়াক্কুলকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরা।"

হায়াতের প্রতিটি কথা যেন ওমরের অস্থির হৃদয়ে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই তার বুকের ভেতরের ভার যেন অনেকটা হালকা হয়ে গেল। সে অনুভব করল, একসময় জীবনের নির্মম আঘাতে ভেঙে পড়া সেই অসহায় মেয়েটি আজ আর আগের মতো নেই। আল্লাহর হিদায়াত, ঈমান আর ধৈর্য তাকে এক দৃঢ়চেতা, প্রজ্ঞাবান ও পরিণত নারী হিসেবে গড়ে তুলেছে। মাতৃত্বের পবিত্র দায়িত্ব আর রবের প্রতি গভীর নির্ভরতা যেন তার ব্যক্তিত্বকে আরও আলোকিত করে তুলেছে।

পরদিন খুব ভোরেই ওমর নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেমে পড়ল। সেই রাতেই সে বুঝে গিয়েছিল, রোহানের লোকজন নিশ্চয়ই তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে। তাই এবার সে তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য একটি কৌশল আঁটল।

সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পর চৌধুরী সাহেবের গাড়িটি প্রতিদিনের মতোই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। গাড়ির কাচ কালো থাকায় বাইরে থেকে ভেতরে কে আছে, তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। পরিকল্পনা অনুযায়ী গাড়িটি হাসপাতালের দিকে রওনা দিল, যাতে নজরদারিতে থাকা লোকজনের মনে হয় হায়াত ওই গাড়িতেই চেকআপের জন্য যাচ্ছে।

অন্যদিকে, সম্পূর্ণ গোপনে আরেকটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করল ওমর। তার দীর্ঘদিনের পরিচিত ও বিশ্বস্ত ডা. তাসনিম। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ভিন্ন পথ দিয়ে বাসায় এসে পৌঁছালেন। পরিবারের কয়েকজন বিশ্বস্ত সদস্য ছাড়া এই পরিকল্পনার কথা আর কেউ জানত না।

ডা. তাসনিম বাসায় পৌঁছে হায়াতের শারীরিক অবস্থা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গর্ভের সন্তানের সুস্থতা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। সবকিছু এতটাই নীরবে সম্পন্ন হচ্ছিল যে, বাইরে থেকে কেউ বুঝতেই পারল না রোহানের সাজানো ষড়যন্ত্রের জবাবে ওমর ইতোমধ্যেই আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে।

ডা. তাসনিম অত্যন্ত যত্ন ও সতর্কতার সঙ্গে হায়াতের প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করলেন। এরপর আল্ট্রাসোনোগ্রাফি মেশিনে বাচ্চার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। হঠাৎই ঘরজুড়ে ভেসে উঠল ছোট্ট হৃদয়ের ছন্দময় ধুক... ধুক... ধুক... স্পন্দন। সেই ক্ষুদ্র প্রাণের হৃদস্পন্দন মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশ বদলে দিল। উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে মহান আল্লাহর কুদরতের এই বিস্ময়কর নিদর্শন অনুভব করতে লাগল। ওমরের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল মনিটরের দিকে। সেখানে তার সন্তানের ছোট্ট অস্তিত্ব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। অজান্তেই তার চোখ দুটো ভিজে উঠল। বুকের ভেতর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো—

— "আলহামদুলিল্লাহ... সব প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।"

হায়াত ধীরে ধীরে নিজের হাত বাড়িয়ে ওমরের হাত শক্ত করে ধরে রাখল। দু'জনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলিত হলো। কোনো কথা বলার প্রয়োজন ছিল না; তাদের নীরবতাই যেন হাজারো অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছিল। নিজেদের ভালোবাসার এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি, মহান আল্লাহর দেওয়া সেই অমূল্য আমানতের হৃদস্পন্দন শুনে দু'জনের হৃদয়ই কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল। মনে মনে তারা একই দোয়া করল—

"হে আল্লাহ, আমাদের এই সন্তানকে সুস্থ, নেককার ও দ্বীনের খাদেম হিসেবে কবুল করুন। তাকে আপনার হেফাজতে রাখুন এবং আমাদেরকে তার উত্তম অভিভাবক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।”

ডা. তাসনিম রিপোর্টগুলো আরেকবার ভালোভাবে দেখে মুচকি হেসে বললেন,

— "আলহামদুলিল্লাহ, মা ও শিশুর অবস্থা সম্পূর্ণ ভালো আছে। বাচ্চার বৃদ্ধি ও অবস্থান দুটোই স্বাভাবিক। তবে আগামী দুই মাস আপনাদের একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। হায়াতকে কোনোভাবেই মানসিক চাপ দেওয়া যাবে না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে, সময়মতো পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং ভারী কোনো কাজ করা একেবারেই চলবে না। ইনশাআল্লাহ, এভাবেই যত্ন নিলে সবকিছু ভালো থাকবে।"

ডা. তাসনিমের মুখে সুসংবাদ শুনে ওমর গভীর কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল, আর হায়াতের ঠোঁটেও ফুটে উঠল হাসি। এতক্ষণ বাইরে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন চৌধুরী সাহেব। সুসংবাদ শুনেই তিনি ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। স্নেহভরে হায়াতের মাথায় হাত রেখে আবেগমাখা কণ্ঠে দোয়া করলেন,

— "আল্লাহ তাআলা তোমাকে এবং আমার নাতি বা নাতনি দু'জনকেই তাঁর পরম হেফাজতে রাখুন। তোমাদের জীবনে রহমত, বরকত ও নেকি দান করুন। সুস্থ-সুস্থভাবে যেন এই আমানত পৃথিবীর আলো দেখতে পারে। আমীন।"

চৌধুরী সাহেবের দোয়া শুনে হায়াতের চোখ ভিজে উঠল। সে শ্রদ্ধাভরে তাঁর হাত দুটো ছুঁয়ে বলল,

— "আমীন। আল্লাহ আপনার দোয়াগুলো কবুল করুন, আব্বুজান।”

এদিকে হাসপাতালে রোহানের ভাড়াটে লোকগুলো অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর সন্দেহ করতে শুরু করল। চৌধুরী সাহেবের গাড়িটি ঠিকই হাসপাতালে পৌঁছেছিল, কিন্তু গাড়ির ভেতরে হায়াতকে কোথাও দেখা গেল না। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তারা নিশ্চিত হলো তারা প্রতারিত হয়েছে। তাদের একজন দ্রুত ফোন করে পুরো বিষয়টি রোহানকে জানাল। খবরটি শুনে রোহানের মুখ ক্রোধে বিকৃত হয়ে উঠল। তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে গেল। প্রচণ্ড রাগে সে হাতের কাঁচের গ্লাসটি সজোরে দেয়ালে ছুড়ে মারল। মুহূর্তের মধ্যেই গ্লাসটি অসংখ্য টুকরোয় ভেঙে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। রাগে-ক্ষোভে দাঁত চেপে রোহান গর্জে উঠল,

— "ওমর! আবারও তুই আমার পরিকল্পনা ভেস্তে দিলি!"

সে টেবিলের ওপর সজোরে মুষ্টি আঘাত করে হিংস্র কণ্ঠে বলল,

— "কিন্তু এটা শেষ নয়। তুই যতবার আমার হাত থেকে বাঁচবি, আমি ততবার আরও ভয়ংকরভাবে ফিরে আসব। এবার আমি এমন আঘাত করব, যা তুই সারাজীবন ভুলতে পারবি না।"

রোহানের চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল। তার ভেঙে পড়া প্রতিটি পরিকল্পনা যেন তাকে আরও উন্মত্ত, আরও হিংস্র করে তুলছিল।

ঠিক তখনই রোহানের মোবাইল ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে নতুন একটি বার্তা এসে পৌঁছাল। সে বিরক্ত মুখে মেসেজটি খুলতেই চোখ স্থির হয়ে গেল।

«"যার বিরুদ্ধে তুমি ষড়যন্ত্র করে চলেছ, তাকে কখনো একা ভেবো না। আল্লাহ যাকে হেফাজত করেন, তার অনিষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই। এখনও সময় আছে অন্যায় থেকে ফিরে এসো, আত্মসমর্পণ করো। অন্যথায় তোমার কর্মের পরিণতি তোমাকেই ভোগ করতে হবে।"»

মেসেজটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোহানের মুখের রঙ পাল্টে গেল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। তার মনে হতে লাগল, যেন অদৃশ্য কেউ প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সে তড়িঘড়ি করে নম্বরটিতে কল ব্যাক করল, কিন্তু ফোনটি ইতোমধ্যেই বন্ধ। কয়েক মুহূর্তের জন্য রোহানের বুকের ভেতর অজানা এক ভয় দানা বাঁধল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁত চেপে ফোনটি মুঠোয় চেপে ধরল।

•••

বিকেলে ঘর জুড়ে এক সুন্দর পরিবেশ তৈরি হলো। জানালার বাইরে বৃষ্টিধোয়া গাছের সবুজ পাতায় সূর্যের সোনালি আলো ঝিলমিল করছিল। চারপাশে যেন নতুন করে প্রাণের স্পর্শ লেগেছে।

ঘরের এক কোণে বসে আমিনা আপু আর হায়াত মিলে বাচ্চাদের জন্য ছোট ছোট পোশাকে যত্ন করে নকশা করছিল। নতুন অতিথিকে ঘিরে দু'জনের চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল নির্মল আনন্দ আর অফুরন্ত মায়া। মাঝেমধ্যে দু'জনের হাসির শব্দে পুরো ঘর প্রাণবন্ত হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই ওমর ধীর পায়ে এসে হায়াতের পাশে বসল। কিছুক্ষণ তার কাজের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বলল,

— "বিবিজান দেখলেন তো? গতকাল যে ভয় আমাদের হৃদয়কে ভারী করে তুলেছিল, আজ আল্লাহর রহমতে সেটাই কত বড় স্বস্তি আর আনন্দে পরিণত হয়েছে। সত্যিই, আল্লাহ যখন সহজ করে দেন, তখন সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিও এক মুহূর্তে বদলে যেতে পারে।”

হায়াত মৃদু হেসে জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির পর ধুয়ে-মুছে যাওয়া প্রকৃতিটা যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নিজের উদরের ওপর হাত রাখতেই বাচ্চাটা আবারও নড়ে উঠল। সেই অনুভূতিতে তার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

সকাল থেকে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। গত রাতের উদ্বেগ, আজকের সতর্কতা, তারপর সন্তানের সুস্থতার সুসংবাদ। সবকিছু মিলিয়ে সে গভীরভাবে উপলব্ধি করল, মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনাই সর্বোত্তম।

হায়াত ধীরস্বরে বলল,

— "আলহামদুলিল্লাহ... হে আমার রব, আপনি আমাদের প্রতি কত অনুগ্রহশীল! আপনার রহমত ছাড়া আমরা কিছুই নই। আমাদের পরিবারকে সবসময় আপনার হেফাজতে রাখুন, আমাদের সন্তানকে নেককার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং সত্য ও হকের পথে অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।"

দোয়া শেষ করে হায়াত আবারও জানালার বাইরে তাকাল। আকাশের কালো মেঘ সরে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠেছে নির্মল নীলের এক অপূর্ব আভা। সেই দৃশ্য দেখে তার মনে হলো জীবনের আকাশেও যতই কালো মেঘ জমুক না কেন, আল্লাহর রহমতের সূর্য একদিন ঠিকই উদিত হয়।

সে মনে মনে উপলব্ধি করল, জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধগুলো জেতার জন্য সবসময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় অবিচল ঈমান, সত্যের পথে অটল থাকা, ধৈর্য আর মহান আল্লাহর ওপর নিখাদ তাওয়াক্কুলের।

#চলবর_ইনশাআল্লাহ

[ আলহামদুলিল্লাহ, আজকের পর্ব এখানেই শেষ।

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা গল্পটা শুধু একটি গল্প নয়। এটি ঈমান, তাওয়াক্কুল, তাওবা, পারিবারিক ভালোবাসা, ধৈর্য এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসার এক হৃদয়স্পর্শী যাত্রা। এখানে যেমন আছে রহস্য, সাসপেন্স আর ষড়যন্ত্র, তেমনি আছে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা। প্রতিটি পর্বের মাধ্যমে আমি চেষ্টা করছি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এমন কিছু বার্তা তুলে ধরতে, যা আমাদের বাস্তব জীবনেও উপকারে আসতে পারে, ইনশাআল্লাহ। আপনাদের কাছে আমার ছোট্ট একটি অনুরোধ—যদি মনে হয় এই গল্পটি কারও ঈমানকে শক্ত করবে, কাউকে ভালো কিছুর দিকে উৎসাহিত করবে বা তার হৃদয়ে আশার আলো জ্বালাবে, তাহলে অবশ্যই গল্পটি শেয়ার করবেন। হয়তো আপনার একটি শেয়ারের মাধ্যমে আরেকজন মানুষও এই গল্পের উপকারী বার্তাগুলো পড়ার সুযোগ পাবে।

আজকের পর্বটি কেমন লাগল? সামনে কী ঘটতে পারে বলে মনে হচ্ছে? অবশ্যই রিঅ্যাক্ট আর কমেন্ট করে জানাবেন। সবশেষে, আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি—তিনি আমাদের সবাইকে সত্যের পথে অটল রাখুন, আমাদের পরিবারকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের অন্তরকে তাঁর নূরে আলোকিত করে দিন। আমীন। 🤲🌿

ইনশাআল্লাহ, খুব শিগগিরই দেখা হবে পরবর্তী পর্বে। 🤍]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন