ফন্ট সাইজ:
থিম:
উল্টা পাল্টা সংসার

১২তম পর্ব

লেখক: আরিয়ানা আরিফা

উল্টাপাল্টা সংসার

আরিয়ানা আরিফা

১২.

অয়ন টুরে অফিসের বাসে গেল না।তার বাইকে মালিহা আর অকুকে চাপিয়ে নিয়ে গেল।মালিহা অবশ্য উপরে উপরে যাবে না,যাবে না বললেও, ভিতরে ভিতরে সে বেজায় খুশি।যদিও সেই খুশির ছিটেফোঁটাও অয়নকে দেখালো না।বরং চলন্ত বাইকে কত্তবার চেঁচিয়ে বলল,

-বাইক থামান।বলেছি না যাবো না আপনার সাথে।নামান আমাকে।আমাকে রাফির সাথে বেরুতে হবে।

অয়ন এই রাফির নাম যতবার শুনেছে, ততবারই বাইকের স্পিড বাড়িয়েছে।অকুকে বলেছে,

-অকু,তোর মাম্মাকে একটা কামড় দে।

অকু পাপ্পা অন্তঃপ্রাণ।পাপ্পা যা বলবে সে তাই'ই করবে।পাপ্পার বাক্যকে শিরধার্য করে সে 'তাই তাই তাই' করতে করতে মাম্মাকে কামড় দিয়েছে।বেশ জোরেই দিয়েছে।মালিহাও কম কি!অকু যতবার কামড় দিয়েছে সে ও ততবার অয়নকে খামছি দিয়েছে।এক্কেবারে জোরসে!

________

মায়িদা এক্সাম শেষে এসে জানলো অকুরা টুরে গিয়েছে।কই ভাবলো,আজ অকুর সাথে অনেক্ষণ বকরবকর করবে।নোভাইন্নাকে গালি দেওয়ার জন্য তাকে নিউ নিউ কয়টা গালি শিখাবে।এক নাম্বারে এই নোভাইন্নাকে দেখলেই ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মত সারাক্ষণ ম্যা ম্যা করতে বলবে।এসব কিছুই এখন শিখানো হবে না বলে তার মন খারাপ হলো।মায়িদার মন খারাপ হলে সাবানা বাড়ির সবাইকে তার ধমকাইতে ইচ্ছে করে।এখনও করছে।সে 'উহুম উহুম' করে কেঁশে প্রথম ধমকটা মারলো রাফিকে।রাফি সোফায় বসে বসে টিভিতে খেলা দেখছে।যদিও আজ সে গোওওল গোওওল বলে চিক্কর মারছে না।তারও আজ মন খারাপ।সে ভাবলো,মাল্লুকে নিয়ে অরির পছন্দের সবকিছু কিনে আজ হুলস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে ফেলবে।তারপর সুন্দর করে সেজেগুজে অরিকে ঠুস করে প্রপোজ একটা করে বসবে।সেসব কিছুই হলো না।অয়ন বাবাজীবন উল্টো তার উপর কিছুক্ষণ চোটপাট দেখিয়ে মাল্লুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।রাফির মনে হচ্ছে,এই অয়ন বেটা তার আর অরির বিয়েতে বিশাল একটা ঝামেলা বাঁধাবে।

-হেই ব্রো,কিসের স্যার আপনি?সারাক্ষণ বসে বসে খেলা দেখেন।কোনো কাজ কাম নাই আপনার?দেখি উঠুন,সামনের ওই পুকুরটাতে সবাই মাছ ধরছে।ওইখানে গিয়ে মাছ ধরে আনুন।লুঙ্গি পরে যান।লুঙ্গি আছে?

রাফি হতভম্বের মত তাকিয়ে থাকলো।এর আগে মায়িদাকে তার সাথে কথা টথা বলতে দেখে নি।আজ কথা বলছে কেন?তাও ধমকিয়ে ধমকিয়ে।

-কী হলো?কিছু জিজ্ঞেস করলাম তো নাকি?লুঙ্গি আছে না নাই?

রাফি দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলল,

-নাই।

-দাঁড়ান।

দাঁড়ান বলে মায়িদা তার আব্বার রুমে গেল এবং আব্বার একটা বেঁটেখাটো লুঙ্গি নিয়ে ফিরল।যদিও এই লুঙ্গি লম্বু রাফির ছোট হবে,তবুও সে রাফির দিকে লুঙ্গিটা ছুড়ে ধমকে বলল,

-পড়ে নিন।কুইক।

বলেই মায়িদা আর দাঁড়ালো না।আগুন ওয়ালা লকেটটা গালে দিয়ে দ্বিতীয় শিকারের সন্ধান করল।কিছুক্ষণ বাদেই দ্বিতীয় শিকারের খোঁজ পাওয়া গেল।শিকারের নাম নুসাইবা জাহান অরি।যে আপাতত নিজের পিংকিশ রুমের খাটে বসে বসে রামেন গিলছে।এই মেয়ে হচ্ছে রামেন পাগলি।এক্কেবারে ভয়ানক পাগলি যাকে বলে তেমন।একবার কী হলো?সাবানা বাড়িতে চোর এলো।অরি পানি খেতে গিয়ে চোরকে তাদের ওয়াড্রপ একটার লকার খুলতে দেখে আতকে উঠল।সে চুপিচুপি দ্বিতীয় চোরের মত রান্নাঘরে গিয়ে রামেনের প্যাকেট সব বোগলদাবা করে দৌঁড়ে রুমে কম্বল মুড়ি দিয়ে শোয়ে পড়ল।সেই রামেনের প্যাকেটের কুচুরকাচুর শব্দে চোর অবশ্য আর চুরি করতে পারলো না।তাকে মারার জন্য কেউ 'দা-বটি' বের করছে ভেবে 'মা-গো-মা' বলে লাফিয়ে লাফিয়ে পালালো।সে যায় হোক!মায়িদা অরির খাটের উপর বসে বিছানায় কয়েকটা বারি মেরে বলল,

-এই অরিপা,এগুলা কী খাও হ্যাঁ?তোমার মনওয়ালা সারাক্ষণ খেলা দেখে 'গোওওল গোওওও' বলে চিক্কর মারে,তুমি সারাক্ষণ এই বস্তু গিলে 'ইয়াম্মি ইয়াম্মি' বলে চিক্কর মারো।দুইজনই এত চিক্কর মারলে তো হবে না।

অরি খাওয়া থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,

-মনওয়ালা মানে?

মায়িদা ধমক দিয়ে বলল,

-এত বড় দাম্বী হয়ে গেলা, অথচ মনওয়ালা মানে শিখলা না!আজিব!মনওয়ালা মানে হচ্ছে যে তোমাকে মন দিয়ে বসে আছে সে।

অরি এবার ভাইয়ের মত আরো ভ্রু কুঁচকে বলল,

-মন দিয়ে বসে আছে?

-অবশ্যই বসে আছে।আজ তো তোমাকে লাভ ইউ জানু ও বলে ফেলতো।আপার জন্য বলতে পারলো না।কাল বলবে।সেজেগুজে রেডি হয়ে থেকো।

বলেই মায়িদা চুল ঘুরিয়ে ঘারিয়ে ধপধপ করে চলে গেল।অরি আশ্চর্য হয়ে বিড়বিড় করল,'লাভ ইউ জানু!'

_________

অয়নরা সাবানা বাড়িতে যখন ফিরল তখন রাত্তির বারোটা বাজে।অকু পাপ্পার চুল মুঠ করে ধরে ঘুমুচ্ছে।মালিহারও ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।সে ঘুমে বারবার ঢুলে ঢুলে অয়নের ঘাড়ে পড়ছে।অয়ন রুমে ঢুকে দুই বাচ্চাকে শোয়ালো।মালিহা বিছানা পেতেই ঘুমের রাজ্যে ট্রান্সফার হলো। অকু এখন মাম্মাকে ঝাপ্টে ধরে ঘুমাচ্ছে।অয়ন কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ওয়াশরুমে ঢুকল।তারপর ফ্রেশ ট্রেশ হয়ে মালিহার পড়ার টেবিলে বসলো।সেখানে একটা পিংকিশ রঙের ডাইরি দেখা যাচ্ছে।এই ডাইরি অয়ন মাঝেই মাঝেই পড়ে।পড়তে পড়তে মালিহার মতন সে ও মুচকি মুচকি হাসে।

'এখন আষাড় মাস।ভয়ানক বৃষ্টি।এমন ভয়ানক বৃষ্টিতে আমি একটা ভয়ানক খবর পেলাম।আম্মার কাছে শুনলাম ব্ল্যাক মুনের জন্য নাকি পাত্রী দেখা হচ্ছে।জেঠুর এক বান্ধবীর মেয়ে।জেঠুর অনেক বান্ধবী।কোন বান্ধবীর মেয়ে বুঝতে পারছি না।আম্মার ফোনে মেয়ের ছবি দেখলাম।অসম্ভব সুন্দর একখান চেহারা।মেয়েটাকে দেখে আমার খুবই হিংসা হতে লাগলো।বারকয়েক মেয়েটার ছবির দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলাম।মায়িদার থেকে শেখা গালিগুলো আস্তে আস্তে ঝাড়লাম।অবশ্য বেশিক্ষণ এই গালি ঝাড়া লাগলো না।বিকেলের দিকে খবর পেলাম,মেয়েপক্ষ না করে দিয়েছে।মেয়ের নাকি ব্ল্যাক মুন ব্ল্যাক বলে পছন্দ হয় নি।এই কথা শুনে আমি এত্ত হাসলাম।ব্ল্যাক মুনের দরজার সামনে কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করে গাইলাম,

'ও হালাচাঁন গলার মালা

পেট ফুরেদ্দে তোঁয়ার লাই।'

ব্ল্যাক মুন কিছুই বললো না।এই বেটা আস্ত খবিশ।একটা মেয়ে সারাক্ষণ তার পিছু পিছু ঘুরে ঘুরে একটা গান গাইছে,মুচকি মুচকি হাসছে।অথচ দেখো,বেটার কোনো হেলদোল নাই।যেনো মনে হয় প্রতিদিনই কত মেয়ে বেটার পিছু পিছু ঘুরে গান গায়,লাভ ইউ লাভ ইউ বলে চেচাঁয়।আশ্চর্য!'

অয়ন ডাইরি বন্ধ করে হাসলো।মনে করার চেষ্টা করলো এই মেয়েকে সে কবে ভালোবেসেছে?কবে এই মেয়ের জন্য তার মনেও উথাল পাথাল প্রেম এসেছে?মনে পড়েছে।তাদের বিবাহের পনেরো নাম্বার দিন।কেন প্রেমে পড়লো সেদিন?অয়নের আর ভাবতে ইচ্ছে করছে না।তার ঘুমন্তপরীর দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।ইচ্ছে কে প্রাধান্য দেওয়া হলো।মালিহার ব্ল্যাক মুনকে গালে হাত দিয়ে তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল।

_________

আজ সকাল সকাল সাবানা বাড়িতে নিউ কাহিনীর উদ্ভব ঘটেছে।জুবিন কোথা থেকে এক মেয়েকে বিবাহ করে এনেছে।এই বিবাহে বাড়ির সবার মধ্যে একটা হৈ হৈ রব রব ব্যাপার দেখা গেলেও সাবানা বাড়ির দুই জমজ ভাইয়ের মধ্যে তার ছিঁটেফোঁটাও দেখা গেল না।দুই ভাই'ই গালে হাত দিয়ে সোফায় পাশাপাশি রণগম্ভীর মুখে বসে আছে।আজ তাদের মধ্যে একটা মিল মোহাব্বত দেখা যাচ্ছে।কিছুক্ষণ বাদে বাদে তারা ফুসুরফাসুর করে বলছে,

-কিছুতেই এই বিয়ে মানা যাবে না।না না না।কিছুতেই নাহ্!

রাফি ভ্রু কুঁচকে অরির দিকে তাকিয়ে বলল,

-তোমাদের বাড়িতে দেখি প্রতিদিনই একটা একটা নাটক চলে।আজকের নাটকের নাম কী?

অরি কিছু বলার আগেই পিছন থেকে মায়িদা বলল,

-নাটকের নাম হচ্ছে 'উল্টাপাল্টা বিবাহ।'

বলেই সে উল্টাপাল্টা বিবাহের নায়িকার দিকে তাকালো।নায়িকাটা অসাধারণ।দেখতে পুতুলে কন্যার মত।মায়িদা কন্যার পিঠ চাপড়ে বলল,

-হেই দোস্তো,নাম কী?

কন্যা মায়িদার এরকম অদ্ভুত আচরণ দেখে চোখ ঝাপ্টালো।চেনা নাই জানা নাই, পিঠ চাপড়ে দোস্তো বলে দিচ্ছে।কন্যার ভালো লাগলো।এসেছে দেখে শুধু একের পর এক রম্য কাহিনী দেখছে।এই কাহিনীতে কেউ তার সাথে কথা বলছে না,কেবল তার সদ্য আবির্ভাব হওয়া বরকে একের পর প্রশ্ন করতে দেখছে।কন্যা মায়িদার দিকে চোখ নিবদ্ধ করে বলল,

-আমি আয়লা।

-কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে পুরো নাম বলতে হয় জানো না?শুধু আয়লা কী?আগে পরে কিছু নাই?নাকি ঘুর্ণিঝড় আয়লা?

-সাজিয়া তাবাসসুম আয়লা।

_____

~চলবে...

(সাবানা বাড়িতে শুধু বিবাহ হচ্ছে।পাঠিকাদের বিবাহের দাওয়াত রইল।সবাই পেট ফুরে খেয়ে যাবেন। মালিহার বাপ জেঠু হয়তো আপনাদের দিকে গম্ভিরমুখে তাকিয়ে থাকবে এবং বলবে 'আচানক'।এই আচানকে কিছু মনে করবেন না।দাওয়াত মঞ্জুর করবেন কেমন?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন