ফন্ট সাইজ:
থিম:
উল্টা পাল্টা সংসার

১৩তম পর্ব

লেখক: আরিয়ানা আরিফা

#উল্টাপাল্টা_সংসার

~আরিয়ানা আরিফা

১৩.

জুবিন এবং আয়লার বিবাহের কাহিনীটা এরকম।জুবিন প্রায়ই বাড়ি থেকে হাওয়া হয়ে এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়।এবার ঘুরতে ঘুরতে একটা গ্রামে গেল।গ্রামের নাম গঙ্গাপুর।হিন্দুয়ানী নাম।বাংলাদের বেশিরভাগ গ্রামের নামই হিন্দুয়ানী।সেই গঙ্গাপুর গ্রামের এক বিশাল বাড়িতে বিরাট ধুমধাম করে বিবাহের অনুষ্ঠান হচ্ছে।জুবিনের আগে থেকেই দাওয়াত ছাড়া বিয়ে খাওয়ার রেকর্ড আছে।সেই রেকর্ড মোতাবেক সে একটা ভাবসাব নিয়ে গেট দিয়ে ফুরুৎ করে ঢুকে পড়লো।কেউ জিজ্ঞেস করলেই বিনয়ে লুতুপুতু হয়ে বলল,'আমি বরপক্ষ!'

সময় গড়ালো।বিবাহের সময় পার হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বরদের বাড়ির কাউকে আসতে দেখা গেল না।অনেক্ষণ বাদে জানা গেল,বর পালাতক হয়েছে।তার নাকি অন্য মেয়ের সাথে চক্কর ছিল।ব্যস!এই চক্কর ওয়ালা কথা শুনে কন্যার বাপের মেজাজ গেল হট হয়ে।তার একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যতের ব্যাপার।আচমকা কেউ একজন তাকে জানালো, বিয়েতে বরপক্ষের একজন উপস্থিত আছে।সুন্দর মুন্দর চেহারা।ভুল করে বরের আগে চলে এসেছে।কন্যার বাপ বাক্যখানা বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং ডেভিল মার্কা এক হো হো হাসি দিলেন।ভাবখানা এমন,'পেয়েছিইইই!' জুবিন তখন আয়েশী ভঙ্গিতে রোস্ট চিবোচ্ছিল।সেই চিবানো অবস্থায়'ই তাকে বোগলদাবা করে বিয়ের স্টেজে কন্যার পাশে বসিয়ে দেওয়া হলো।চারিদিক ফের হৈ হৈ রব রব।সবাই একসুরে বলছে,'রোস্ট বর এসেছে,রোস্ট বর এসেছে।'এই রোস্ট বর শুনে আয়লা ভ্রু কুঁচকে দেখলো তার জামাই বদলে গেছে এবং বদলে যাওয়া জামাই স্টেজে বেশ আরাম করে বসে হাতে থাকা রোস্ট চিবোচ্ছে।আয়লা আনমনেই ভ্রু কুঁচকে বলল 'রোস্ট বর!' তারপর? তারপর আর কী!সেদিন সেই রাত্তির দশটা বাজে নতুন এক জুটি মিস্টার রোস্ট বর এবং মিসেস ঘুর্ণিঝড় আয়লার বিবাহ সম্পন্ন হলো।এই আচানক বিবাহের কাহিনী ব্যক্ত করিয়া জুবিন পরপর দুইটা চড় খেল।ডানগালের চড়টা দিয়েছে জালাল সাহেব এবং বাম গালেরটা দিয়েছে জহির সাহেব।জালাল চড় দিয়ে ধপধপ পা তুলে চলে গেলেও জহির গেলেন না।তিনি আদরের তিন নাম্বার ভাইয়ের দিকে অগ্নি রূপ চক্ষু নিয়ে বললেন,

-মাইনষের বাইত দাবাত ছাড়া বিয়া খাইতে যাস?সরম লাগে না।খচ্চরের খচ্চর।

বলে তিনিও দুই নাম্বার ভাইয়ের মত ধপধপ পা তুলে চলে গেলেন।তার খুবই রাগ লাগছে।ভাইকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়ে মানুষের বাড়িতে দাওয়াত ছাড়া বিয়ে খেতে শুনেই তার মেজাজটা চ্যাত চ্যাত করে উঠছে।অবশ্য এসবে সাবানা বাড়ির অন্য কেউ চ্যাত চ্যাত করছে না।বরং জমজ দুই ভাই হাওয়া হতেই তারা খুশিতে হেলেদুলে নাচ ধরল।সবাই ভিন্ন ভিন্ন গান গেয়ে গেয়ে নাচছে।মায়িদা অরিকে এবং মালিহাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গাইছে,

'নান্টু ঘটকের কথা শুইনা

অল্প বয়সে করলাম বিয়া।'

মেরিন এবং জুলেখাও লাফিয়ে লাফিয়ে নাচছে আর গাইছে,

'দুষ্টু কোকিল ডাকে রে

কু কু কু কু কু কু

মনে বাঁশি বাজে রে

কু কু কু কু কু কু

দুষ্টু কোকিল ডাকে রে

কু কু কু কু কু কু'

এদের দেখাদেখি রাফিরও নাচার শখ হলো।সঙ্গী হিসেবে কাউকে না পেয়ে শেষে অয়নের কাছে গেল।অয়ন সোফার একপাশে বসে সাবানা বাড়ির সবার পাগলামি দেখছে এবং ভ্রু কুঁচকে তাকাচ্ছে।হঠাৎ রাফি তাকে দাঁড় করিয়ে উল্টাপাল্টা ঘোরানো শুরু করলো এবং গাইতে থাকলো,

'জিও পাগলা লা লা লা লা,

ও জিও জিও পাগলা লা লা

লা লা'

অকু বেচারা মাথা চাপড়ে সবার কান্ডকারখানা দেখে বলল,

'পাগল পলিবার।'

এই 'পাগল পরিবার' বলে সেও উঠে দাঁড়ালো এবং মোটু পাতলুর ডাক্তার ঝাটকার মতো দুই হাতের দুই আঙুল উপরে উঠিয়ে নেচে নেচে গাইলো,

--ডিংকু নাত্তুর

ডিংকু নাত্তুর

ডিংকু নাত্তুর, না না!

ডিংকু নাত্তুর, ডিংকু নাত্তুর, না।

________

রাত দুইটা বাজে সাবানা বাড়ির সকলের নাচা গানা ফিনিশ হলো।অয়ন প্রথমে রাফিকে কষিয়ে এক ধমক মারলো।এই ছেলে তাকে কথা'ই বলতে দিচ্ছিলো না,লম্পজম্প করে ঘোরাচ্ছিলো তো ঘোরাতেই ছিল।ধমক খেয়ে রাফি হো হো করে হেসে চলে গেল।মায়িদা, অরি এবং তাদের মায়েরাও যে যার রুমের দিকে গেল।অকু জুবিনের কোলে ঘুমুচ্ছে।অয়ন অকুকে কোলে তুলে নিয়ে মালিহাকে ধরে নিয়ে গেল।জুবিন একটা হামি ছেড়ে আয়লার দিকে তাকিয়ে বলল,

-বউ চলো।ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাবো।চলো চলো।

চলো চলো বলেও জুবিন গেল না।বরং সেখানেই আয়লার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।আয়লা হতবাক হয়ে তার রোস্ট বরের দিকে তাকালো।জামাইটা বেশ সুন্দর পেয়েছে সে।তাকে দেখলেই মনে হয়, এ যেন দাদীর থেকে শোনা সেই রাজপুত্তুর।যে ঘোড়ায় চড়ে টগবগিয়ে আসে।রাজকন্যাকে টুস করে মালা পড়িয়ে ঠুস করে নিজের রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যায়।অনেক অনেক ভালোবাসে।

_______

অয়ন সকাল সকাল মালিহাকে ঘুম থেকে তুলেই বলল,

-তুমি কী আজ রাফির সাথে যাচ্ছ?

মালিহা ঘুমু ঘুমু চোখে অয়নের দিকে তাকালো।কাল অনেক দেরিতে ঘুমানোর ফলে তার চোখ ফুলে আছে।সেই ফুলকো চোখে সে অয়নকে ঠিকমত দেখতে পাচ্ছে না।মালিহা আবার চোখ বুঁজতেই অয়ন ফের ডাকলো।

-কী হলো?শুনতে পাচ্ছো না?আমি অফিসে চলে যাব।তাড়াতাড়ি বলো,তুমি কী আজ রাফির সাথে যাচ্ছ?

মালিহা ঘুমের ভিতরেই বলল,

-হু!

এই হু শুনে অয়ন ঝট করে মালিহাকে উঠে বসালো।ওয়াশরুম থেকে মগে করে পানি এনে মালিহার মুখ ধুইয়ে দিতেই তার ঘুম ছুটে গেল।কিছু বলতে নিতেই অয়ন ওয়াড্রপ থেকে একটা শাড়ি এনে মালিহার হাতে দিয়ে বলল,

-তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।

মালিহাকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফের বলল,

-বোকার মত তাকিয়ে আছো কেন?কুইক!আমার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।কী হলো?রেডি হচ্ছো না কেন?

মালিহা শেষে বেক্কলের মত রেডি হলো এবং ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে আবার শুয়ে পড়লো।অয়ন এবার বিরক্ত হয়েই মালিহাকে কোলে তুলে নিল।মালিহা ড্যাবড্যাব করে সেদিকে তাকিয়ে বলল,

-আরেএএ,কী করছেন?

অয়ন হাঁটা ধরল।জহির সাহেব উঠে গাছে পানি দিচ্ছিলেন।তার ছেলের এই কান্ড দেখে চোখে হাত দিয়ে বললেন,

-আস্তাগফিরুল্লাহ!এগেন কিয়া?

অয়ন বাপের 'এগেন কিয়াতে' পাত্তা না দিয়ে জোরে জোরে বলল,

-আব্বা, অকুকে দেখে রেখো।আমরা বেরুচ্ছি।

জহির সাহেব ফের বললেন,

-আস্তাগফিরুল্লাহ!

অয়ন মালিহাকে বাইকের উপর বসিয়ে বাইক স্টার্ট মারলো।বলল,

-শক্ত করে ধরো।

মালিহা হা করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভীষণ লজ্জা পেল।তার জামাইটার আজ কী হলো ভাবতে ভাবতে ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা গান শুনতে পেল,

'ও হালা চান গলার মালা, পেটফুরেদ্দে তোঁয়ার লাই..."

-কী হলো?শক্ত করে ধরতে বলেছিনা?

মালিহা এবার তার ব্ল্যাকমুনকে ঝাপটে ধরল।বাইক চলছে ধীর গতিতে।মালিহা অয়নের পিঠে মাথা রেখে আস্তে করে বলল,

-ভালোবাসি ব্ল্যাকমুন!

_______

আজ নোভান তার মাকে নিয়ে সাবানা বাড়িতে উপস্থিত হলো।উপস্থিতিতের কারণ, মায়িদাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া।মায়িদা অকুকে বসে বসে নোভানকে দেওয়ার জন্য কয়টা গালি শিখাচ্ছে।

-বল,বান্দর।

অকু বাঁদরের মতো লাফিয়ে বলল,

-তান্দর!

মায়িদা আবার বলল,

-খবিশ বল?

-তবিশ।

-ম্যা ম্যা বল?

-ত্যা ত্যা।

মায়িদা বিরক্ত হয়ে বলল,

-তুই সবকিছুতে এমন ত নিয়ে আসছিস কেন?

-আর তানবোনা।

মায়িদা মাথা চাপড়াতেই নোভানকে তার রুমে দেখা গেল।নোভান আয়েশ করে খাটের উপর বসে বলল,

-চলেন।আপনাকে আজ আমাদের সাথে যেতে হবে।

মায়িদা কিছু বলার আগেই অকু মায়িদার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

-মাদা কোতাও তাবে না।তুমি তাও।

নোভান একটু হেসে বলল,

-আম্মা তো উনাকে আজ নিয়েই যাবে।

অকু মুখ লাল করে বলল,

-তুমি এততা ত্যা ত্যা।

-মানে?

-মানে তুমি এততা তান্দর।

-তুমি এততা তনুমান।

-তুমি এততা তবিশ!

-তুমি এততা গাধা!

-তুমি এততা....

অকুর 'তুমি এততা..' চলতেই থাকলো।মায়িদা ওকে থামিয়ে নোভানের দিকে তাকিয়ে বলল,

-হেই নোভাইন্না ব্রো,চলো।

-চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন