ফন্ট সাইজ:
থিম:
উল্টা পাল্টা সংসার

১৯তম পর্ব

লেখক: আরিয়ানা আরিফা

উল্টাপাল্টা সংসার

~আরিয়ানা আরিফা

১৯.

মালিহা আজ একটা বেগুনি রঙের শাড়ি পড়েছে।বেগুনি রঙে এই মেয়েকে অসাধারণ লাগে।একদম অনিন্দ্য সুন্দরী।শাড়িখানা পড়ে সে অকুর সাথে গল্পগুজব করছে।

-অকু,দেখো তো,মাম্মাকে কেমন লাগছে?

অকু মাম্মাকে চোখ ঝাপটে দেখলো। বড়দের মত গালে হাত দিয়ে মুখের এক্সপ্রেশন চেঞ্জ করে বলল,

-পাপ্পা বেসি সুন্নর।

-আমি সুন্দর নাহ?

মালিহার বাচ্চা বাচ্চা প্রশ্ন।অকু মায়ের দিকে আরেকবার তাকালো।এবার পাক্কা তিন মিনিট মাকে পর্যবেক্ষন করে বলল,

-সুন্নর আচো।

তারপর খানিক চুপ থেকে আবার বলল,

-তবে,পাপ্পা বেসিইইইই!

-পাপ্পা কী বেশি?

অয়নের কৌতুহলি কন্ঠ।মাত্র অফিস থেকে ফিরেছে সে।মালিহা অয়নের হাত ধরে তার পাশে দাঁড়িয়ে অকুকে আবার জিজ্ঞেস করল,

-এবার বলো,কেমন?

অকু এবার সময় ব্যয় করলো না।ফটাফট মুখটাকে লাজাবাব স্টাইল বানিয়ে বলল,

-মচতকার।

এই শব্দটা সে মায়িদার কাছ থেকে শিখেছে।যদিও তার মনে হচ্ছে শব্দটা এরকম না।কীরকম তাহলে?তফতকার?বতকার?চত্তার?ধুর হচ্ছে না!অয়ন বিড়বিড় করতে থাকা ছেলেকে কোলে তুলে নিলো।সে সপ্তাহে একদিন অফিস থেকে আসার সময় ছেলের জন্য চকলেট আনে।আজও সেই একদিন।ছেলের হাতে চকলেটটা দিতেই ছেলে চিল্লিয়ে উঠল।পাপ্পাকে অনেকগুলা চাম্মি দিয়ে তার প্রিয় 'ডিংকু নাত্তুর' ডান্স দিলো।ডান্স শেষে দৌঁড়ে কোথায় জানি চলে গেল।নিশ্চিত অরির কাছে।আগে চকলেট পেলে প্রথমে মায়িদাকে দেখাতো সে,এখন মায়িদা নেই বিধায় অরিকে দেখাচ্ছে।

মালিহা অয়নের থেকে অফিস ব্যাগ নিয়ে টেবিলে রাখল।অয়নের হাত থেকে ঘুড়ি খুলে দিল,টাই খুলে দিল।আলনা থেকে একটা তোয়ালে এনে অয়নের হাতে দিয়ে বলল,

-ফ্রেশ হয়ে আসুন।

অয়ন ভ্রু কুঁচকে মালিহার কান্ড দেখল।মনে হচ্ছে না,এই মেয়ে আজ একটু বেশি'ই আহ্লাদ করছে?

-কী হলো?হা করে কী ভাবছেন?ফ্রেশ হয়ে আসুন।

অয়ন বুঝলো,তার বউয়ের আজ কোনো আবদার আছে।এই আবদারের সুযোগ নিতে হবে।অয়ন জানে,মালা এখন তার সব কথা'ই হাতের কড়ে কড়ে শুনবে।সে দুষ্ট এক হাসি দিয়ে ঘাড়ে তোয়ালে ঝুলাতে ঝুলাতে ফ্রেশ হতে চলে গেল।মালিহা এই হাসির অর্থ জানে।সে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে খাটে পা ঝুলিয়ে বসলো।এই লোক এখন তাকে ক্ষেপানোর চেষ্টা করবে।আগের বারের মত কিছুক্ষন বাদে বাদে বলবে,

-এই মালা,মাথা টিপে দাও তো।

-মালা,এক কাপ তিতা তিতা কফি খাওয়াওতো।

মালিহা কফি করে আনলে বলবে,

-আরেএএ,এটা তুমি খেয়ে ফেলো তো।ইচ্ছে করছে না এখন।শুনো,আবার মাথাটা টিপে দাও তো।

আরো অনেক অনেক ভাবে বিরক্ত করার চেষ্টা করবে তাকে।মালিহাও বিরক্ত হবে।নিশ্চিত সেই বিরক্তি নিয়ে আগের বারের মতন অয়নের সাথে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ঝগড়াও করবে।

অয়ন ফ্রেশ হতে পাক্কা বারো মিনিট লাগালো।খাটের উপর মালিহাকে ভাবনায় বিভর হয়ে বসে থাকতে দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো।খানিক গলা খেঁকারিও দিলো।উদ্দেশ্য তার ভাবনারত বউয়ের দৃষ্টি আকর্ষন।মালিহা বুঝলো তার কপালে আজ শনি রবি সোম সব আছে।সে আলাভোলা চোখে স্বামী মহাশয়ের দিকে তাকালো।অয়নের মুখ এবার সিরিয়াস।তাকে দেখে মনে হচ্ছে,তাদের এই ছোট্ট রুমটাতে এখন বোর্ড এক্সাম চলছে এবং এই এক্সামে সে হল টিচার হিসেবে স্টুডেন্টদের গতিবিধি লক্ষ করছে।যেকোনো সময় স্টুডেন্টদের কান বরাবর দুই তিনটা ঘা লাগিয়েও দিতে পারে।মালিহা উঠে অয়নের মাথা ভালো করে মুছে দিতে দিতে বলল,

-এত বড় ছেলে হলেন,অথচ এখনো ঠিক করে মাথা মোছা শিখলেন না!দেখি বসুন।অনেক লম্বা হয়েছেন।

অয়ন বসলো।মালিহা চটপটে হাতে স্বামীর মাথা মুছে দিতে লাগলো।তার ভাবখানা এমন,'বিবাহের পর স্বামীর মাথা মুছা'ই স্ত্রীদের এক ও অদ্বিতীয় কর্তব্য।' অবশ্য মালিহা এই কর্তব্য মন থেকে স্বামী সেবা করার জন্য করছে না।সে তো করছে স্বামীর মন গলানোর জন্য।তার স্বামীরও বোধহয় মন গললো।অয়নকে পলকহীন মুগ্ধ নয়নে তার বউটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল।তার আদুরে বউ।অয়নের ইচ্ছে করছে বউটাকে জোরসে একটা চাম্মি দিতে।কিন্তু না,এখন দিলে চলবে না।এখন তাকে সিরিয়াস থাকতে হবে।হবে হবে হবে।এই হবে হবে করেও অয়ন সিরিয়াস থাকতে পারলো না।সে সত্য সত্যই মালিহাকে জোরসে একটা চাম্মি দিয়ে দিলো।মালিহা অবাক হতবাক হয়ে বুঝলো,আজ তার শাস্তি মওকুফ করা হয়েছে।আজি এই রবিবারের রাত্রীতে তার স্বামী তাকে সকল ধরনের আবদার করার সুযোগ করে দিয়েছে।মালিহা খিলখিল করে হেসে উঠলো।অয়নের গলা জড়িয়ে বলল,

-শুনেন না,আমাদের চট্টগ্রাম টুরে নিয়ে যাবেন?

অয়ন চট্টগ্রামের কথা শুনে মুখ কুঁচকালো।যবে থেকে শুনেছে,রাফি বেটা ওই চট্টগ্রাম থেকে এসেছে,তবে থেকে তার চট্টগ্রাম সহ্য হচ্ছে না।মনে হচ্ছে চট্টগ্রামে এরকম আরো কয়েকটা রাফি আছে।যে রাফিরা শুধু তার বউয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলে তাকে রাগানোর চেষ্টা করবে।উফ!অয়ন মুখ কঠোর করে বলল,

-ওইখানে যাওয়া যাবে না।

-কেন যাওয়া যাবে না?

-অন্যকোথাও গেলে চলো।চট্টগ্রাম যাওয়া যাবে না।ওইটা আমার অপছন্দ।

-অপছন্দ মানে?

-ওইখানের মানুষ আমার পছন্দ নাহ।

মালিহা এবার আশ্চর্য হয়ে বলল,

- আব্বা,আম্মা,মায়িদা,আমি, আমরাও তো ওইখানের।আপনার কি আমাদের পছন্দ না?

অয়নের কাঠকাঠ জবাব,

-আমার রাফিকে পছন্দ না।

মালিহা এবার ভ্রু কুঁচকালো।মাথা চাপড়ে বলল,

-রাফি আবার আপনার সাথে কী করলো?

-আমার সাথে কী করবে?আমার সাথে কিছু করতে আসলে ওর বত্রিশটা থেকে চব্বিশটা দাঁত ফেলে দিবো না?ও তো তোমার সাথে কিছু করার চেষ্টা করছে।

-আশ্চর্য!আমার সাথে কী করার চেষ্টা করছে?

-তুমি বুঝতে পারছো না?

-নাহ!

-থাক বুঝা লাগবে না।

বলেই মালিহাকে ছাড়িয়ে অয়ন ঘুমানোর চেষ্টা করলো।তার মাথা এখন হট হয়ে আছে।রাফির কথা আসলেই তার বিরক্তি উঠে যায়।অয়নের বিরক্তি আরেকধাপ বাড়াতেই বোধহয় এই রাত্তিরে স্বয়ং রাফি তাদের রুমে এসে উপস্থিত হলো।এসেই মালিহার হাত ধরে তাড়াঘুড়া করে বাইরে নিয়ে গেল এবং রেখে গেল অয়নের বোম হয়ে যাওয়া চেহারা।যেই বোমটা কিছুক্ষণ বাদেই ধুম ধাম করে ফাঁটবে।

রাফি তার ফোনে হাত চেপে মালিহাকে আস্তে আস্তে বললো,

-দোস্তো,আব্বাকে একটু বুঝা।উনি কোথার কোন মাইয়া ঠিক করে রাখছে।আমাকে নাকি কাল সকাল সকাল ওইখানে গিয়েই ওই মাইয়াকে বিয়ে করতে হবে!তুই বল,এটা সম্ভব?তুই তো জানিস,আমার তোর কাজিনকে বিয়ে করার শখ।

-তো বল,তুই যে অরিকে বিয়ে করতে চাস।

-তোর কী ধারণা, আমি বলি নি?

-বলেছিস?

রাফির হুদাই মেজাজ গরম হচ্ছে।সে ভ্রু কুঁচকে বলল,

-তুই আমার বাপরে চিনোস না?উনি জীবনে আমার কথা শুনছে?

মোবাইল থেকে এবার চিক্করের আওয়াজ ভেসে এলো।রাফির বাপ চিল্লিয়ে বললেন,

-কিরে গাধা,কার সাথে কথা বলাবি?সে কি হেলিকপ্টার করে আসছে নাকি?আমার ফোনে এমবি নাই।তাড়াতাড়ি বল।

রাফি চট করে মোবাইলটা মালিহার হাতে দিয়ে দিলো।মালিহা রাফির দিকে কতক্ষণ কটমট চোখে তাকিয়ে মোবাইল কানে নিয়ে বলল,

-আসসালামু...

-কে তুমি?

মোবাইলের অপর পাশ থেকে ধমকের আওয়াজ এলো।মালিহা ফোন নামিয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,

-তোর বাপ একটা হিটলার।

আবার ফোন কানে ধরে বলল,

-আংকেল, আমি মালিহা।

আংকেল খুবই খুশি হলেন।মালিহা মেয়েটাকে উনার পছন্দ।একসময় তো ভেবেছেন একেই ছেলের বউ বানাবেন।কিন্তু, তা তো আর হওয়ার নয়।মেয়েটার যে হুটহাট করে তার কাজিনের সাথে বিয়ে হয়ে গেল!তিনি বেশ আফসোসের সুরে বললেন,

-মালিহা মা,তুমি?কেমন আছো?

মালিহা হেসে হেসে বলল,

-এই তো আংকেল ভালো। আপনি ভালো আছেন?

-আর ভালো।ওই গাঁধা আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছে?সারাক্ষণ কানের কাছে 'অরিকে বিয়ে করবো,অরিকে বিয়ে করবো' লাগাই রাখছে।অরি নাকি তোমার কাজিন?

-হুম আংকেল।বিয়েটা দিয়ে দিন?

আংকেল এবার খেঁকিয়ে উঠলেন।ছেলের পছন্দে তিনি কিছুতেই বিয়ে দিবেন না।নেভার এভার।

-ওই গাঁধা এবার তোমাকে লাগিয়ে দিয়েছে।দেখি গাঁধাটাকে দাও তো।

মালিহা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।মোবাইলখানা রাফির হাতে দিতে চাইলে রাফি নিলো না।উলটো 'না না' করে আবার মালিহার দিকে ঠেলে দিলো।মালিহাও আবার একইভাবে রাফির দিকে ঠেললো।এভাবে অনেকক্ষণ তাদের ঠেলাঠেলি চলল।আংকেল আরেকবার চিল্লিয়ে বললেন,

-মা,আমার এমবি শেষ হচ্ছে।কই গাঁধাটা?

এমন সময় অয়নকে আসতে দেখা গেল।রাফি আর মালিহাকে এমন ঠেলাঠেলি করতে দেখে তার মেজাজ এবার তুঙ্গে উঠল।সেই তুঙ্গে চড়া মেজাজ নিয়ে মালিহাকে টেনে নিজের কাছে এনে রাফির দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কঠোর কন্ঠে বলল,

-কী সমস্যা তোমার?

রাফি অয়নের এরকম রূপ দেখে মাথা চাপড়ালো।এই ছেলে সিরিয়াস টাইমে জেলাসি দেখাতে চলে এসেছে।রাফি হাসার চেষ্টা করে বলল,

-আমার কোনো সমস্যা না।আমরা একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলাপ করছি।এখানে জেলাসির কিছু নাই ভাই।

অয়ন এবার আরো চটে গেল।হাল্কা চেঁচিয়ে বলল,

-ওকে নিয়ে কিসের সিরিয়াস আলাপ?তোমাকে বলেছি না,ওর থেকে দূরে থাকবা?

রাফিরও মেজাজ খারাপ ছিল।অনেক্ষণ ধরে ভাবছিল, এই মেজাজটা কারো উপর ঝাড়তে হবে।সেই ভাবনা থেকে রাফিও কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,

-কেন দূরে থাকবো?মাল্লু আমার দোস্তো লাগে।তাই না মাল্লু?

মালিহা থতমত খেয়ে মাথা দুলিয়ে বলল,

-হু হু!

ব্যস!এবার কিছু একটা হবে!অয়ন বাবাজীবনের মুখ ভয়ানক লাল দেখা যাচ্ছে।বোধহয় সাবানা বাড়িতে এবার একটা বোম ফাঁটবে।তবে এই বোমটা ফাঁটার আগে মোবাইল থেকে আরেকবার আওয়াজ ভেসে আসলো,

-ধুরু,গাধার দল।কইলাম আমার এমবি শেষ হচ্ছে।এই, তোদের ঝগড়া শোনার জন্য আমি একশ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে এমবি কিনেছিলাম?

~চলবে...

(আজকের পর্ব শুধু মালিহা-অয়ন।ইঞ্জয় করুন পাঠকবাসী।হ্যাপি রিডিং।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন