ফন্ট সাইজ:
থিম:
উল্টা পাল্টা সংসার

২০তম পর্ব

লেখক: আরিয়ানা আরিফা

#উল্টাপাল্টা_সংসার

~আরিয়ানা আরিফা

২০.

সাবানা বাড়িতে বোম না ফাঁটলেও কারো ভীষণ শখের একখান মোবাইল ফাঁটলো।কার মোবাইল?অরিকে বিয়ে করতে চাওয়া এবং সারাক্ষণ গোওওল গোওওল বলে চিক্কর মারা রাফির মোবাইল।রাফি ভগ্ন হৃদয়ে,দুঃখভারাক্রান্ত মননে,অশ্রুসিক্ত নয়নে অপলক মোবাইলখানার দিকে তাকিয়ে আছে।তাকে দেখে মনে হচ্ছে, এক্ষুনি সে অকুর মতো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলবে।মালিহার ভীষণ মায়া হলো।সে জানে,এই মোবাইলটা রাফি তার প্রথম উপার্জন থেকে কিনেছিল।মালিহা অয়নের দিকে তাকালো।যে আপাতত ডোন্টকেয়ার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ভাবখানা এমন, সে নির্বিগ্নে আরো শ খানেক ফোন ফেঙে নাশ নাশ করে দিতে পারবে।মালিহার মেজাজ ইনফিনিটি হলো।অয়ন তার হাতখানা শক্ত করে ধরে রেখেছে।মালিহা নিজের হাতখানা অতি কষ্টে ছাড়িয়ে অয়নের দিকে আঙুল তুলে বলল,

-কী সমস্যা কী আপনার?শুরু থেকে দেখছি ওকে আপনি সহ্যই করতে পারছেন না।দিনদিন অনেক উগ্র হয়ে যাচ্ছেন আপনি।এসব কী ধরনের ফাতরামি!আশ্চর্য!

-রাগাবা না মালা।

অয়নের শান্ত কন্ঠ।মালিহা পাত্তা দিলো না।তার রাগ লাগছে ভীষন।সে আবারও আঙুল তুলে বলল,

-আমাকে তো জীবনেও ভালো টালো বাসেন নি।উল্টো আমি যতবার ভালোবাসি বলেছি ততবার এমন একটা ভাব করেছেন,যেন আপনি আমাকে চিনেনই না।জীবনে কোনদিন দেখনও নি।তাহলে এখন এত্ত জেলাসির বিষয় আসছে কোথা থেকে?এটা মোটেই জেলাসি না।আপনি আসলে যা তা হয়ে যাচ্ছেন দিনদিন।

বলেই নিচ থেকে ভাঙাচুরা মোবাইল খানা তুলে নিয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে ধমকে বলল,

-এই রাফি, এদিকে আয়।এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে নাহ।

মালিহা অরির রুমে ঢুকলো।রাফিও তার পিছু পিছু সেখানে গেল।ড্রয়িংরুমে এবার শুধু একজনকে দেখা গেল। অয়ন।যে কিনা ভয়ানক রাগে এই মাত্র পাশে দন্ডায়মান বিশাল একটা ফুলদানি ভাঙল।ঝনঝন করে আওয়াজ হলো অনেক।এই আওয়াজে জমজ দুই ভাই নিচে নামলো।অয়নের এইরকম ভয়ানক রূপ দেখে দুই ভাই'ই আক্কেলগুড়ুম হয়ে তাকালো।জালাল সাহেব এগিয়ে এসে বললেন,

-কিরে অনু,কী সমস্যা?ভাঙচুর করছিস কেন?

অয়ন কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,

-আপনার মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন।

বলেই সে হনহন করে রুমে ঢুকে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো।জহির সাহেব ভাইয়ের কাঁদে হাত দিয়ে অবাক হয়ে বললেন,

-আঁর শান্ত শিষ্ট,লেজ বিশিষ্ট হোলাগার কী অইছে?হিগা এরকম রাইগজে কিল্লাই?

জালাল সাহেবও ভাইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন,

-আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে বলল কেন?মালু তো কিছুই করে না।

জহির সাহেব এবার অবাক হয়ে বললেন,

-তুই কিয়া কইতি চারি,বেগগেন দোষ আঁর হোলার?তোর মাইয়ার কোনো দোষ নাই?

-তুমি ভালো করেই জানো, আমার মেয়ে তোমার ছেলেকে অনেক ভালোবাসে।তোমার ছেলে এ না ওরে ভালো বাসে না।হুদাই ঝগড়া করার চেষ্টা করে।অবশ্য তোমার ছেলে বলে কথা।ঝগড়া করবে না তো কী মালুরে কোলে নিয়ে বসে থাকবে?

জহির সাহেব তেঁতে উঠলেন।দুই মিনিটের ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

-তুই কি আঁরে অপমান কইত্তি চারি?

-এটাকে তোমার অপমান মনে হচ্ছে?সাবানা বাড়িতে এখন দেখি সত্য কথা'ই বলা যাবে না।সত্য কথা বললেই কেউ সেটা নিজের দিকে টেনে অপমান বলে চালিয়ে দিবে।আহারে!আব্বা আসলে ঠিকই বলতেন।সত্য কথার ভাত নাই।

-তুই আঁরে আবারও অপমান কররি।তোরে স্মরণে রাইখতো অইবো,আঁই তোর বড্ডা ভাই।বড্ডা ভাইয়ের লগে এরকম করি কতা কইতে তোর সরম লাগে না?খবিশ!

জালাল সাহেব রেগে মেগে বললেন,

-খবিশ বলবা না।এইখানে খবিশের কী হলো?তুমি জানো না, আমি প্রতিদিন সাবান দিয়ে ডলে ডলে দুই ঘন্টা দুই মিনিট যাবত গোসল করি।তুমি'ই না তিনদিনে একদিন গোসল করো।তাও তিন মিনিটে।প্রাকটিক্যাললি তাহলে খবিশ কে হলো?অবিয়াসলি তুমি!

-আঁই খবিশ?

-অবশ্যই তুমি খবিশ।

-তুই খবিশ।তোর মাইয়া খবিশ।তোর বউ খবিশ।তোর স্কুলের পেমিকা টিনা খবিশ।

সাবানা বাড়িতে এই রাত্তির দশটা বাজে দ্বিতীয়বারের মতন ঝগড়া শুরু হলো।প্রথম ঝগড়ার যদি একটা নাম দেওয়া হয়,তাহলে নামটা হবে 'অয়নের জেলাসি।' দ্বিতীয় ঝগড়ার নাম কী হবে?খবিশ?নাকি 'জমজা ভাইয়ের গোসল'?

________

পরদিন সকাল নয়টায় সাবানা বাড়িতে আরেক জুটির পদার্পন ঘটলো।জুটির নাম নোভান-মায়িদা।নোভানকে এখন খুব গম্ভীর মনে হচ্ছে।মায়িদা বারকয়েক নোভানের গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো।এই ছেলের মিনিটে মিনিটে মুড সুইং হয়।একবার একেক রকম রোল প্লে করে সে।ভার্সেটাইল এক্টর যাকে বলে।মায়িদা আজ নোভানের জামা পরেনি।নিজের একটা সবুজ রঙের টপস পরেছে এবং লং ঢিলেঢালা জিন্স।এগুলোতে অবশ্য তাকে খুব একটা মানাচ্ছে না।এই মেয়েকে ছেলেদের শার্ট প্যান্টেই বেশি মানাই।

জুলেখা,মেরিন নতুন জামাইকে দেখেই আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেলেন।মায়িদার দিকে কোনোরকম মনোযোগ না দিয়ে দুইজনই নোভানের খেদমত করতে লেগে গেলেন।তাকে সুন্দর করে টেবিলে বসালেন।জুলেখা বাইরে থেকে লেবু পেড়ে এনে শরবত বানিয়ে নোভানকে খাওয়ালেন।মেরিন ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বের করে দিল।সকালে কচুর তরকারি আর রুটি বানিয়েছিলেন, তা দিল।আরো চটপট করে দুই জা মিলে অনেক কিছু রান্না করতে লাগলো।মায়িদা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে নোভানের দিকে তাকালো।এই ছেলে বেশ আয়েশ করে খাচ্ছে।মনে হচ্ছে দুনিয়াতে তার সামনে কেবল দুইটা জিনিস আছে।এক রুটি,দুই কচুর তরকারি।মায়িদা চোখ ফিরিয়ে আপার রুমে গেল।আপাকে হোপ করে খাটের উপরে বসে থাকতে দেখা গেল।অয়ন অফিসের জন্য রেডি হচ্ছে।নির্বিগ্নে। মালিহার দিকে না তাকিয়ে,তার সাথে কোনোরকম কথা টথা না বলে।অকু পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে।মায়িদা চট করে এসে হোপ করে বসে থাকা মালিহাকে জড়িয়ে ধরল।তার হুট করে খুবই কান্না পাচ্ছে।আপাকে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদতে ইচ্ছে করছে।মায়িদা কাঁদার আগেই মালিহা কেঁদে ফেললো।বোনের গালে কয়েকটা চাম্মি দিয়ে কান্না ভেজা কন্ঠে বলল,

-মায়দু,আমার বোনু।

মায়িদা বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে ধমকে বলল,

-কাঁদবি না একদম।শাট আপ।

মালিহা শাট আপ না হয়ে আরো জোরে জোরে কাঁদলো।তার কান্নার আওয়াজে অকুও উঠে পড়লো।চোখ ডলে ঝাপসা ঝাপসা মায়িদাকে দেখতেই তার কোলে ঝাপিয়ে পড়লো।মায়িদার গলা জড়িয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলল,

-মাদা,ইয়েএএএ!

অয়ন ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাদের আহ্লাদ দেখলো।তার চোখে মুখে তীব্র বিরক্তি।মায়িদা এবার অয়নের দিকে ফিরে বলল,

-হেই কালিয়া ভাই!কী খপ্পর?

অয়ন মুখ গম্ভীর করে বলল,

-জব্বর!

-আপার সাথে ঝগড়া হইছে?খবরদার আমার আপার মন খারাপ করাবেন না।করালে কিন্তু....

বলেই হাত দিয়ে পা ভাঙার হুমকি দিয়ে বলল,

-হি হি!

এই হি হি কে অয়ন পাত্তা দিলো না।অকুকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ আদর করে অফিসের দিকে চলে গেল।মালিহার দিকে একবার ফিরলও না।মালিহারও সেই রাগ।যতই সে বরকে ভালোবাসুক,বরের পিছু পিছু গান গেয়ে ঘুরোক তবুও সে তার রাগে অটল পর্বত।কিছুতেই এই অয়ন নামক অভদ্দরলোকের সাথে সে আর কথা টথা বলছে না।না না না!

সকাল সকাল অরি রাফির ফোন নিয়ে ফোন ঠিক করা লোকের কাছে গিয়েছিল।অরির ফোনও প্রায় নষ্ট হয়ে যায় বলে এই লোকদের সাথে তার বেশ পরিচয় আছে।কাল মালিহা অনেক করে বলল,

-সকালে ওর ফোনটা ঠিক করতে দিয়ে আসিস তো।তোর ভাইটা যে কী!আমার অনেক লো ফিল হচ্ছে ভাই!

রাফি অবশ্য ফোন নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবলো না।শুরুতে একটু কান্না টাইপ আসলেও এখন সে ইঞ্জয় করছে বিষয়টা।ফোন ছাড়া কয়দিন কেমন চলে দেখা যাক।এই দেখা যাক করেও সে ফোন ছাড়া চলছে না।সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠেই অরির ফোন আনলো।বর্তমানে তার রুম থেকে কেবল 'গোওওওল গোওওওল' করা চিক্কর ভেসে আসছে।অরি মাথা চাপড়ে সামনে আগালো।মাত্র ফোনের দোকান থেকে এলো সে।নোভানকে সোফার উপর লম্বা হয়ে শোয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে সেদিকে গেল।মেরিন এবং জুলেখাকে জামাইয়ের গায়ে জোরে জোরে বাতাস করতে দেখা যাচ্ছে।অরি সেদিকে হতভম্বের মত তাকিয়ে বলল,

-উনার কী হইছে?

মেরিন, জুলেখা কিছু বলার আগেই নোভান মিনমিন করে বলল,

-আমার বউটাকে একটু ডেকে আনেন তো।প্লিইইইজ।

অরি নোভানের প্লিইইজ শুনলো।হতভম্ব হয়েই মায়িদাকে খুঁজতে খুঁজতে মালিহার রুমে গেল।দুই বোন অকুকে মাঝখানে বসিয়ে হেসে হেসে গল্প করছে।অরি কী বলতে এসেছিল ভুলে গেল।সে ও সুন্দর করে মায়িদার পাশে গিয়ে বসলো।হো হা করে তিন রমনী গল্প করতে লাগলো।তাদের দেখে এই মূহুর্তে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে মনে হচ্ছে।হাসতে হাসতে একটা আরেকটার গায়ের উপর পড়ে যাচ্ছে।অকু কিছুক্ষণ বাদে বাদে এই তিন রমনীকে গালে হাত দিয়ে দেখছে এবং মায়িদাকে ঠাস ঠাস করে পাপ্পা দিচ্ছে।পাক্কা বিশ মিনিট তাদের গল্পগুজবের পরে অরির নোভানের 'প্লিইইজ' মনে পড়লো।সে মাথা চাপড়ে নিজেকে 'ভুলুরাম' গালি দিয়ে মায়িদাকে বলল,

-তোর জামাই'র কী জানি হয়েছে!দেখলাম সোফার উপ্রে লম্বা হয়ে শোয়ে আছে।আম্মা,চাচী উনাকে বাতাস করছে।

মায়িদা সাধারণত নাটক করার কোনো সুযোগ'ই ছাড়ে না।এই মাত্র তাদের একটা বাংলা ছবি নিয়ে কথা হচ্ছিল।যেখানে শাবনুর একটা 'নায়ায়ায়া' বলে চিক্কর মেরে ঘুরে পড়ে যায়।মায়িদা অবশ্য ঘুরে পড়লো না।সে না....বলে চিক্কর মেরে স্বামীর কাছে পৌঁছালো।মালিহা পিছন থেকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মারলো 'ধুম তানা না না না!' তাদের সবাইকে আজ শয়তানে লাড়া দিয়েছে।তারা ঠিক করেছে, সবকিছুতেই আজ তারা কমেডি করবে।অরি মায়িদার মুখের সামনে হাত দিয়ে ক্যামেরার মত ধরে বলল,

-অ্যাকশন।

মায়িদা নাটক শুরু করলো।মেরিনের কাঁধে মাথা রেখে বলল,

-নায়ায়ায়া,আম্মা..তোমরা আমার সোয়ামীর সাথে কী করেছো?

বলেই নোভানের পাশে গিয়ে বসলো।অরিও তার পিছু পিছু লটকে লটকে ক্যামেরা রূপি হাত নিয়ে গেল।মালিহা এবার ধুম তানার বদলে স্যাড একটা টিউন বের করলো।মায়িদা নোভানের হাত ধরে উলোটপালোট করতে করতে বললো,

-এই সোয়ামিইইইই,কী হইছে তোমার?উঠোওওও! উঠোওওও না!

এবার আমার কী হবে গোওওও।

বলেই নোভানের শার্টের হাতা দিয়ে হুদামুদাই চোখ মুছলো।মালিহা এসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

-কাঁদিস না বোন।কাঁদিস না।

বলে সে ও একটু কাঁদার অ্যাকটিং করল।এদিকে অরি পারছে না তার নকল ক্যামেরাটা মুখের ভিতরে ঢুকিয়ে দিতে।সে একবার নোভানের হা করে তাকিয়ে থাকা মুখে ক্যামেরা ধরছে,তো আরেকবার পিছনে দাঁড়িয়ে থেকে নির্বীকার ভঙ্গিতে বাতাস করা দুই মহিলার দিকে ধরছে।এই মহিলাদের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, এই সাবানা বাড়িতে প্রায়'ই এরকম নাটক ফাটক হয়।এমন সময় অকুর কন্ঠ শোনা গেল।মায়িদা যেরকম 'না না' করে চিক্কর মেরে মেরে আসলো,অকু সেরকম মাদা মাদা করে চিক্কর মেরে আসছে।

~চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন