ফন্ট সাইজ:
থিম:
উল্টা পাল্টা সংসার

২২তম পর্ব

লেখক: আরিয়ানা আরিফা

#উল্টাপাল্টা_সংসার

আরিয়ানা আরিফা

২২.

রাফির 'বিয়ে করলে একজনকেই করব,না হলে করব না' এই বাণী তার বাপ মহাশয় শুনলেন না।বরং কাল রাত্তির একটা বাজেই ভীষণ রাগ দেখিয়ে, বোগলদাবা করে তার একমাত্র উচ্ছন্নে যাওয়া নালায়েক বাচ্চাটাকে চট্টগ্রাম নিয়ে গেলেন।এখন বাজে সকাল দশটা।ঠিক বিকাল চারটার দিকে ছেলের বিবাহ দিয়ে দিবেন তিনি।কার সাথে দিবেন?অবশ্যই সেই বধূয়া অরি নই।অরির প্রচন্ড মন খারাপ লাগছে।ইচ্ছে করছে অনেক প্যাকেট রামেন খেয়ে নোভানের মত লোড হয়ে শুয়ে থাকতে।একটা ঘুম দিতে পারলে ভালো হতো।এক ঘুমে দিন শেষ হয়ে রাত ঘনিয়ে যেত।রাফি কে মনে মনে প্রবল পছন্দ করা অরি ঘুম থেকে উঠে খবর পেত,গোওওওল গোওওওল করে চিক্কর করা মানবের বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে।সেই মানব এখন আরেকজনকে মিসেস রাফি বানিয়েছে।তারপর অরি নামক মেয়েটা কী করতো?দু দুবার স্যারদের প্রেমে পড়া মন এবং ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ফের ঘুমিয়ে পড়তো?নাকি ভ্যা ভ্যা করে বসে বসে কাঁদতো?

সে যায় হোক।অরি যখন খুবই হতাশার মধ্যে আছে,বারবার রুমের এদিক থেকে ওদিকে হন্টন জারি রাখছে,ঠিক তখনকার কথা।ফোনে একটা টুং আওয়াজ আসলো।এই টুং আওয়াজ অর্থাৎ মেসেজ খানার প্রেরক রাফি।প্রাপক অরি মেসেজটা ওপেন করলো,

'এই অরি,তাড়াতাড়ি মাইজদী সুপার মার্কেটের সামনে আসো তো।অনেক কষ্টে আমার হিটলার বাপের শহর থেকে তোমার শহরে এসেছি।কেন এসেছি,বুঝতে পারছো অবশ্যই?শুনো,আসার সময় মাল্লুকে নিয়ে আসিও।সাক্ষী তো লাগবে।আমি আবার সিনেমার মত রাস্তা থেকে কাউকে ধরে এনে বলতে পারবো না, 'কাকা, আমার বিয়ের সাক্ষী হবেন?'

শুনো,তাত্তাড়ি আসো।আমার হিটলার বাপ যেকোনো সময় হিটলারগিরি দেখাতে চলে আসবেন।সো,কুইক কুইক।বিয়ে করে আবার আমাকে ম্যাচ দেখতে হবে।আজকে আমার ফেভ্রেট দলের খেলা আছে।'

অরি হতবাক হয়ে মেসেজ খানার দিকে তাকিয়ে রইলো।বিয়ে?পালিয়ে বিয়ে?সে দ্রুত টাইপ করলো,

-পালিয়ে বিয়ে করব?

-তো?তোমার আপত্তি আছে?

-অবশ্যই আপত্তি আছে।আমি কি আপনাকে একবারও বলেছিলাম,জনাব রাফি স্যার, আমি আপনাকে ভালোবাসি?বলেছিলাম?বলি নিই।তাহলে আমার সাথে বিয়ের প্রশ্ন কেন আসছে?তা ও আবার পালিয়ে?

-অরি,আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো এবং প্রবল ভাবেই বাসো।

অরি কিছু টাইপ করল না।মেসেজ সিন করে বসে থাকলো।ওপাশ থেকে ফের টুং আওয়াজ আসলো,

-তোমার কাছে সময় কেবল চল্লিশ মিনিট আছে।এই চল্লিশ মিনিটে তাড়াতাড়ি আসবা।আর শুনো,তোমার আব্বা বাইরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছেন।মাল্লুকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ো।জলদি।

অরি দ্বিতীয়বারের মত হতবাক হয়ে টাইপ করল,

-আব্বা গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছেন?

রাফি এবার মেসেজ বাদ দিয়ে কল করলো।অরি দ্রুত কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ধমকের কন্ঠে আসলো,

-তোমার আব্বার কথা পরে বলবো।তাড়াতাড়ি আসো তো। মার্কেটের সামনে আসবা।এখান থেকে তোমার পছন্দের একটা লাল উড়না নিব।সেই উড়না মাথায় পড়িয়ে তোমাকে মিসেস রাফি বানাবো।জলদি আসো,কুইক।

অরি কল রেখে কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসে থাকলো।সে খুবই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।মালিহাকেও কিছু বলা যাবে না।এই মেয়ে মায়িদাকে বলবে।মায়িদা পেটের ভিতর কিছুই রাখতে পারে না।সে নিশ্চিত তার এটম বম ভাইকে বলে দিবে।তারপর? তারপর অরির হাড্ডি ফাসলি সব এক করে বুড়িগঙ্গার গন্ধযুক্ত পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে।অরি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো।যা হবার হবে।একটা বিয়েই তো।তাছাড়া এটাতো আর সত্যি সত্যি পালিয়ে বিয়ে টাইপ হচ্ছে না।তার আব্বা তো জানেই।অরি মাথায় একটা হিজাব পেঁচিয়ে গাড়িতে চেপে বসলো।দেখা যাক কী হয়!

শাবানা বাড়ির এক কণ্যা অরি যখন সুপার মার্কেটের সামনে পৌঁছালো তখন ঠিক দুপুর এগারোটা।রাফিকে ঠাস ঠাস করে হাত তালি বাজিয়ে মশা মারতে দেখা গেল।অরি কাছে যেতেই বলল,

-তোমাদের নোয়াখালীতে ভাই বহুত মশা!

বলেই অরির হাত পাকড়াও করে ছুটে মার্কেটের ভিতর ঢুকলো।অরির পছন্দের লাল উড়না কিনে দিবে বললেও সে নিজের পছন্দের কিনল।অরির হিজাবের উপর তা চাপিয়ে দিয়ে বলল,

-উহু,বউ বউ তো লাগছে না এখনো।সমস্যা নাই।বিয়ের পরে লাগবে।চলো।

চলো বলে দুইজন কাজি অফিসের সামনে গিয়ে থামলো।অরি কী করবে বুঝতে পারছে না।আবেগে ভেসে তো চলে এলো!এবার?কাজী অফিসের ভিতর থেকে জোরে জোরে গানের আওয়াজ আসছে,

'নান্টু ঘটকের কথা শুইনা,

অল্প বয়সে করলাম বিয়া।'

-ওয়াক!কী ক্রিঞ্জ!

অরির নাক মুখ কুঁচকে বলা কথাটা শুনে রাফি হেসে হেসে বলল,

-কিসের ওয়াক?বিবাহের দিনে এসব ওয়াক ফোয়াক করতে হয় না।এই দিনে সবকিছু ইঞ্জয় করতে হয়।বুঝলা?

অরি বুঝলো না।সে আবারও ওয়াক করলো।রাফি অরিকে কাজী অফিসের ভিতরে বসিয়ে বলল,

-মাল্লুকে তো আনলা না।বসো এখানে।একটা সাক্ষী বোগলদাবা করে আনি।

রাফি গেল এবং এলো।রাস্তার পাশে একটা ভিক্ষুক বসে ছিল,তাকেই সে উঠিয়ে এনেছে।ফ্রিতে অবশ্য আনে নি।টাকা খাইয়ে এনেছে।আজকাল কেউই ফ্রিতে কিছু করে না।তারপর? তারপর চট্টগ্রাম থেকে পালাতক রাফির নোয়াখালীর এক কণ্যার সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল।রাফি আবার অরির হাত বোগলদাবা করে ছুটতেই অরি বলল,

-কোথায় যাচ্ছি এখন?

-কোথায় আবার!চট্টগ্রাম।আমার হিটলার বাপকে দেখাতে হবে না?

-আগে আমাদের বাড়ি যাই?

রাফি কিছু একটা ভাবলো। তারপর বললো,

-ওকে চলো।দাঁড়াও,আগে একটু ঘুরাঘুরি করি।

____________

অকু অনেক্ষণ যাবত বড়দের মতন ছাদে হাঁটাহাঁটি করছে।সে অবশ্য একলা নাহ।মায়িদাও হাঁটছে তার সঙ্গে।দুইজন ফুসুরফুসুর করে গল্প করছে।

-এই অকু,তোর কয় বছর রে?

অকু হাতের কড়ে কড়ে কিসব গুনে গুনে বলল,

-আট।

-আট বছর?ও বাপ!তুই তো তাহলে বিশাল বড় হয়ে গেছিস।

-অবত্যই।

অকুর গর্বের সহিত জবাব শুনে মায়িদা বলল,

-তাহলে তো আর চক্কেত খেতে পারবি নাহ।আফসোস!

-কেন?

-আট বছরের ছেলেরা চক্কেত খায় না,জানিস না?

-কেন থায় না?

-কারণ তারা তো বড় হয়ে গেছে।তুই কখনো বড়দের চক্কেত খেতে দেখেছিস?

-তেকেচি।মাম্মা থায়।

-তোর মাম্মা বড় নাকি!অয় তো এহনো ছোট।ল্যাদা বাবু।

-আমিও ত্যাদা বাবু।

-আশ্চর্য! তুই কেন ল্যাদা বাবু হবি?তোর বয়স না আট।আট বয়সের কেউ ল্যাদা বাবু হয় নাকি!

অকুর চোখে মুখে কান্না কান্না ভাব।সে কিছুতেই ভাবতে পারছে না,সে আর মাম্মার মত চক্কেত খেতে পারবে না।মাম্মা চক্কেত খাবে, সে বসে বসে দেখবে।অকু মায়িদার হাত ধরে ঠোঁট উলটে বলল,

-মাম্মার কত বচর?

-ওর তো তেইশ বছর।

-তাহলে আমারও তেইস।

-তোরও তেইশ?

অকু মায়িদার দিকে পলক ঝাপটে ঝাপটে বলল,

-হুম হুম!

এমন সময় নোভানকে আসতে দেখা গেল।এই ছেলের মন প্রাণ আজ ফুরফুরা।মায়িদার দিকে তাকিয়ে সে বলল,

-কী করেন?

-হন্টন।তুমিও হাঁটো নভু।

-আমারতো হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।

-তাহলে কী করতে ইচ্ছে করছে?

-বুঝতে পারছি না।

-বুঝতে কেন পারছো না?

-আরেএএ, সেটাও তো বুঝতে পারছি না।

মায়িদা শুধু নোভানের সাথে বকরবকর করছে দেখে অকু রাগ হলো।নোভানের হাত ধরে ছাদের দরজার সামনে দিয়ে আসলো।আঙুল তাক করে বলল,

-যাও একান তেকে।

নোভান হেসে অকুর সামনে বসে বলল,

-চলে যাবো?

-হু!

-ওকে নিয়ে যাই?

নোভানের মায়িদার দিকে তাকিয়ে বলা কথা শুনে অকু দুইদিকে মাথা নেড়ে বলল,

-নাহ!

-তাহলে তোমাকে নিয়ে যাই?

-নাহ।

অকুর নাহ অবশ্য নোভান দ্য মুড সুইং এর কারখানা শুনলো না।সে অকুকে ঠাস করে কোলে নিয়ে ঠুস করে ছাদ থেকে নেমে পড়লো।অকু অবাক, হতবাক হয়ে যখন তাকে কামড় দিতে যাবে নোভান তখন বলল,

-চক্কেত খাবে?

-হুম।

অকুর নিষ্পাপ জবাব।আর যায় হোক,চক্কেতকে তো সে জীব্বনেও নাহ বলবে না।

________

রাফি আর অরি পুরো নোয়াখালী চষে বেড়ালো।নতুন নতুন বিয়ে হলে বর কনের মধ্যে যেরকম লজ্জা লজ্জা ভাব দেখা যায় তাদের মধ্যে তা মোটেই দেখা গেল না।দুইজনকে দেখে মনে হলো, এদের আরো অনেকবার বিয়ে হয়েছে।কমসেকাম দশবার তো হবেই!অরি তো ডাইরেক আপনি থেকে তুমিতে চলে গেলো।ও কিছুক্ষণ বাদে বাদে বলতে লাগলো,

-এই শুনছো?দেখো,ওইটা কী?আরেএ এটা সুন্দর না?

রাফির এই ঘুরাঘুরির মাঝে একবারও খেলা দেখার কথা মনে পড়লো না।মনে পড়লে অবশ্য খবর ছিল!যায় হোক!তাদের ঘুরাঘুরি যখন ফিনিশ হলো তখন বিকাল পাঁচটা।শাবানা বাড়িতে নতুন এক বর কণের পদর্পন ঘটলো।বাড়ির সবাইকে চোখ বড় বড় করে বর কণের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল।জহির সাহেবের সমস্ত কাহিনীতে সম্মতি থাকলেও তিনি এখন এমন একটা ভাব করলেন যেন,হা!তিনি তো কিছুই জানেন না!এসব কী কারবার?পালিয়ে বিয়ে?তা ও তাদের শাবানা বাড়িতে?অয়নকেও অফিস থেকে আসতে দেখা গেল।এখন? এখন কী হবে?অয়ন তার জীবনে প্রবল অপছন্দ করা রাফিকে যখন বোনের বর হিসেবে জানবে তখন ?অরিকে আবার সত্যি সত্যিই বুড়িগঙ্গার পানিতে নৌকার মত ভাসতে দেখা যাবে না তো?

~চলবে!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন