উল্টাপাল্টা সংসার
আরিয়ানা আরিফা
২৩.
শাবানা বাড়িতে বিরাট হাঙ্গামা লেগে গেল।অয়ন ঠাস করে তার বোনের গালে একটা চড় মেরে বসলো।তার রাগের পারদ অসীম।যে ছেলেটাকে সে দুই চক্ষে তো দূর, এক চক্ষেও সহ্য করতে পারে না,সেই বাত্তামিজ ছেলেটাকে তার বোন নাকি বিয়ে করে বসে আছে।আবার তা খুবই গর্বের সাথে বলছে।ফাজিলের ফাজিল!
-অয়ন, আমার কথা শুনো।থাপড়া থাপড়ি করছো কেন?
রাফির এগিয়ে এসে শক্ত কন্ঠে বলা কথা শুনে অয়ন তার দিকে ফিরল।আর, আর?রাফি বাবাজীবনের গালেও ঠাস করে একটা তালি বাজানো হলো।রাফি চোখ মুখ কুঁচকে তাকালো।এই অয়ন ব্যাটা এরকম কেন?মুখের থেকে বেশি হাত চালায় কেন?কোথায় ঘরের ভিতরে একটা সমবয়সী ছেলে পেয়েছে।তাকে সারাক্ষণ দোস্তোর মত ট্রিট করবে।তা না!উলটো শত্রুর মত বিহেভ করছে।একবার ঠাস করে তার মোবাইল ভেঙে ফেলছে,উল্টাপাল্টা কথা শুনাচ্ছে,রাগ দেখিয়ে তার বউকে মারছে। এখন, এখন তাকেও সবার সামনে দিলো এক থাপ্পড়?রাফির গাল ব্যথা করছে।এই ব্যাটাকে চট্টগ্রামের বিশেষ একটা গালি দিতে ইচ্ছে করছে।যদিও এখন গালি দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।যে ছেলের বোনকে সে বিয়ে করে মিসেস রাফি বানিয়েছে,সে ছেলেকে গালি দিবে?অসম্ভব!এই অসম্ভব ভেবেও রাফি গালি দিলো।একদম আস্তে বিড়বিড়িয়ে।কেউ না শুনলেও মায়িদা এই বিড়বিড়িয়ে বলা গালি শুনে ফেললো।সে চোখ মুখ অত্যন্ত মাসুম করে বলল,
-কাকে গালি দিয়েছেন রাফি ভাই?
রাফি থতমত খেয়ে মায়িদার দিকে তাকালো।অবাক ভাব ধরে বলল,
-গালি?
-হুম।কাকে দিয়েছেন?
-কই?আমি তো জীবনেও কাউকে গালি দিই নাহ!
-দেন নাহ?
-নাহ।
মায়িদা চেহারা আরো নান্নি মুন্নি মাসুম বাচ্চার মত করে বলল,
-ওহ!তাহলে বোধহয় আমিই ভুল শুনেছি।আমার কেন জানি মনে হলো, আপনি কালিয়া ভাইকে একটা চরম অভদ্র গালি দিয়েছেন।
___________
রাত নয়টা।শাবানা বাড়ির হাঙ্গামা শেষ হয়েছে।জহির সাহেব কৌশলে সব সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।চেষ্টা তো করতেই হতো।উনি নিজেই যে কারবারি করে রাফিকে পালিয়ে বিয়ে করার বুদ্ধি দিয়েছেন।কেন দিয়েছেন?জহির সাহেব ভাবতে বসলেন।যদিও কোনো ব্যাখ্যা পেলেন না।উনি মাঝে মাঝেই কিসব উল্টাপাল্টা কর্মকান্ড করে ফেলেন!এখন উনার ছেলেটাকে কে মানাবে?উনার বাত্তামিজ ছেলেটা যে পুরা বোম হয়ে আছে।রাফির মুখে যখন শুনলো, এই বিয়েতে জহির সাহেবেরও মত ছিল, তখন!তখন তো ছেলে এমন একটা লুক দিয়ে হনহন করে বাইরে চলে গেল।এখনো এলো নাহ।ছেলেটা এত রাগ কই থেকে যে পেয়েছে?
বিগত এক ঘন্টা ধরে অরি মালিহাকে মানানোর চেষ্টা করছে।কিন্তু পারছে না।মালিহা ঠিক করেছে,জীব্বনেও এই মেয়েটার সাথে আর কথা টথা বলবে নাহ।কী সুন্দর পালিয়ে বিয়ে করে এসেছে!আরেএ,মালিহা কে তো অন্তত বলতে পারতো!সে কি অরি যাতে কবুল বলতে না পারে, সেজন্য তার মুখ চেপে ধরে বসে থাকতো!হাহ!রাফির প্রতিও ভীষণ রাগ লাগছে।তাকে কি একবার বলা যেত নাহ?খবিশের খবিশ!
-এই শোন না!তুই বল,আমি কখনো তোকে কিছু না বলে করেছি?
-করিস নি?তাহলে আজ বিয়ে কে করলো?আমি আর তোর ভাই বিয়ে করেছি?
-তুই এরকম রেগে যাচ্ছিস কেন?
মালিহা আবার হোপ হয়ে গেল।অরি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ফের বলল,
-দেখ,তোকে যদি বলতাম, তাহলে কোনো না কোনো ভাবে মায়িদা জানতো'ই।ও জানলে কী হতো, বুঝছিস?
-কী হতো?
মায়িদা দরজার সাথে হেলান দিয়ে অবাক স্বরে বলল।তার ভাবখানা খুবই মাসুম।অরি সেই মাসুম চেহারার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তখন নিচ থেকে শোরগোলের আওয়াজ আসলো।ড.রিপনের চিল্লানোর আওয়াজ আসছে নাহ?সর্বনাশ!
রিপন সাহেব খুবই রেগে আছেন।তার নালায়েক পুত্র যখন তাকে ফোন করে বলেছে,
-আব্বা,আমি তো অরিকে বিবাহ করে ফেলেছি।
তখন থেকেই উনি রেগে আছেন।তার স্ত্রী রাবেনা উনাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।একটা হাতপাখা দিয়ে মাথার উপরে জোরে জোরে বাতাস করছেন।কিন্তু এই বাতাসেও রিপন সাহেব শান্ত হচ্ছেন না।রাফির গালে দ্বিতীয়বারের মত ঠাস করে আওয়াজ হলো।এবং? এবং তৃতীয়বার!হুম,তৃতীয়বারও তাকে চড় খেতে হলো।দুই নাম্বার চড় তার বাপ দিয়েছে এবং তিন নাম্বারটা তার মামা দিয়েছে।মামার মেয়ের সাথেই তার বিবাহ হওয়ার কথা ছিল।যদিও রাফি জানে, সেই মেয়েরও আরেকজনের সাথে চক্কর চলে।রাফির গালে প্রচন্ড ব্যথা করছে।তার মনে হচ্ছে,আজ বিশ্ব চড় দিবস।আজ সবাই একে একে তাকে চড় মেরে যাবে এবং সে হা করে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।রিপন সাহেব চেঁচিয়ে বললেন,
-নালায়েক!এসব করতে নোয়াখালীতে এসেছিস?বাপ মারে বাদে বিয়াও করে ফেললি!তোরে তো...
বলেই তিনি আরেকটা চড় মারার জন্য হাত উঠালেন।রাবেনা সেই হাত চট করে ধরে ফেলে বলল,
-শান্ত হোন।বিয়ে তো করে ফেলেছে।এখন এসব বলে কোনো লাভ আছে?তাছাড়া, আমার বন্ধুর মেয়ে।ভালোই তো।
মামা এবার চেঁচালেন।বললেন,
-কী বলো আপা?ভালোই তো?আমার মেয়েকে দেখলা না,কী কান্নাকাটিই না করছে ও!
-ও যে ড্রামাবাজ,কান্নাকাটি করবে না তো কী করবে!
রাফির এমন কথা শুনে মামা আরো চেঁতে গেলেন।
-খবরদার উল্টাপাল্টা কথা বলবি না। আমার মেয়ের জীবনটাতো শেষ করে দিলি।
-কিসের শেষ করে দিলাম?তোমার মেয়ে গলির ওই গুন্ডাটাকে যে মন দিয়ে বসে আছে সেই খোঁজ নিয়েছো?কাল তো তোমার মেয়েও পালাবে।
মামা হতবাক হয়ে রাফির দিকে তাকালেন।রাফি যে মিথ্যে কথা বলে না, তিনি জানেন।উনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।ওই মন্টু গুন্ডা!ছ্যাহ ছ্যাহ!তিনি আপা দুলাভাইকে রেখেই আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে দৌঁড় মারলেন।জহির সাহেব শান্ত কন্ঠে বললেন,
-দ্যাখেন,আমরা সুন্দর করি ব'ই কতা কই।
-কী সুন্দর করে বসে কথা বলব?আপনি আমার ছেলেটার মাথা খেয়েছেন!লজ্জা করে না আপনার?মেয়েকে আমার নালায়ের ছেলেটার পিছনে লাগিয়ে দিয়েছেন!ছিহ!
-ছিহ!ছিহ!
জালাল সাহেবের রিপনের কন্ঠে তালমিলিয়ে বলা ছিহ শুনে জহির সাহেব তেঁতে উঠলেন।ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-তুই কতা কইবি না।
-আমার মুখ, আমার কথা,আমি বলব।তোমার সমস্যা আছে?রাফিকে যে পালিয়ে বিয়ে করার আইডিয়া তুমি দিয়েছো, বলব?
-যাহ এহান থেইক্কা।
-যামু না।আমার জামাই অয়নকে তো রাগা'ই বাইর কইরা দিলা।আমাকে পারবা না।
-তুই দিনদিন ম্যালা বেদ্দপ অই যারি জাল্লা।তোরে আঁই হরে দেখুম।
-পরে কী দেখবা, এখন দেখো।
-বেদ্দপের ঘরের বেদ্দপ।
-তুমি বেদ্দপ।
-কী বললি?
জালাল সাহেব চিল্লিয়ে আবার বললেন,
-বেদ্দপ বলছি, শুনো না?
ব্যস!ড.রিপনের সামনেই দুই ভাইয়ের ভয়ানক ঝগড়া লেগে গেল।একজনের কথার পিঠে আরেকজনের কথা ধুমধারাক্কা চলছে তো চলছেই।ড.রিপন মাথায় হাত দিয়ে ভাবলেন,এ কোন পাগলা গারদে তার ছেলে বিয়ে করলো!
-চলবে....