#উল্টাপাল্টা_সংসার
~আরিয়ানা আরিফা
২৮.
নোভান গালে হাত দিয়ে মায়িদার দিকে তাকিয়ে আছে।একইভাবে মায়িদাও গালে হাত দিয়ে নোভানের দিকে তাকিয়ে আছে।তাদের দেখে সদ্য প্রেমে পড়া দুইজন কপোত-কপোতী মনে হচ্ছে।যদিও তাকিয়ে থাকার বিষয়টা প্রেম ঘটিত কোনো ব্যাপার না।আসলে,তাদের দুইজনেরই আজ মুড সুইং হচ্ছে।পুরো দুনিয়া বিরক্তিকর লাগছে তাদের কাছে।আজ শুক্রবার।মায়িদা এই শুক্রবার অকুর সাথে হন্টন ডে পালন করতে পারছে না বলে বিরক্ত হচ্ছে।নোভানেরতো বিরক্তির কোনো কারণ লাগে না।এই ছেলের হুদামুদাই মুড সুইং হওয়ার রেকর্ড আছে।নোভান মায়িদার দিকে তাকিয়েই বলল,
-ভাল্লাগে নাহ।
মায়িদাও নোভানের দিকে তাকিয়ে দ্বির্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-সেম ব্রো।
-কী করা যায় বলেন তো?
-কী করা যায়?
-আমার প্রশ্ন আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছেন কেন?
-আমার ও তো একই প্রশ্ন।
-আচ্ছা,চলেন মারপিট করি।
মায়িদা মারপিটের কথা শুনে এক লাফে উঠে দাঁড়ালো।বক্সারের মত দুই হাত সামনে এনে লাফিয়ে লাফিয়ে বলল,
-চলো।
-চলেন।
চলো,চলেন বললেও আজ তাদের মারপিট বেশিক্ষণ চললো না। মারপিটে তাদের আগ্রহ আসছে নাহ।নোভান আবার বলল,
-ধুর,ভাল্লাগে নাহ।
মায়িদা নোভানের পিঠে জোরসে একটা চাপড় মেরে ফের বলল,
-সেম ব্রো।মারপিট বাদ।অন্যকিছু ভাবো।
নোভানও মায়িদার পিঠে চাপড় মেরে বলল,
-আপনিও ভাবেন।
এই চাপড়ে মায়িদার একটা আইডিয়া আসলো।ক্লাস নাইনে থাকতে যখন তার মন খারাপ লাগতো, তখন সে মালিহার ফোনে টিকটক লগ ইন করে উল্টাপাল্টা গানে টিকটক বানাতো।সেগুলা অবশ্য পাবলিক করতো না।প্রাইভেট রাখত।
সে খাটের উপর থেকে ফোন খানা নিলো।টিকটক ডাউনলোড করে লগ ইন করতে লাগলো।নোভান ভ্রু কুঁচকে মায়িদার কান্ড দেখছে।টিকটক লগ ইন করছে দেখে তার ভ্রু আরো কুঁচকে গেল।বলল,
-ছিহ!আপনি টিকটকে নাচেন?
মায়িদা কিছু বলল না।নোভানের দিকে 'ওয়াক' টাইপ একটা লুক দিলো।তার কাছে টিকটকে নাচা মানেই ওয়াক!লগ ইন করা শেষ হলো।মায়িদা একটা গান সেট করে ক্যামেরা অন করল।নোভানকে সামনে দাঁড় করিয়ে বলল,
-এখন একটা গান চলবে।এই গানের সাথে তোমার যা মন চাইবে তাই করবে।বুঝলে?
-হুম।
নোভান মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। যদিও সে কী করবে বুঝতে পারছে না।সাথে সাথে গান বাজলো।
'Such a boring day
Such a boring people.. '
গান চলার সাথে সাথে সব আপনা আপনি হয়ে গেল।নোভান মায়িদার আঙুল ধরে ঘুরালো।তারপর দুইটা মেঝেতে বসে জোরে জোরে জিকির করার মত মাথা দুলাতে লাগলো।একটা একটাকে বালিশ ছুঁড়ে মারতে লাগলো।পুরো ঘরে এই বর কনের হো হো করে হাসির আওয়াজ ভাসতে লাগলো।
হাসির আওয়াজ বিলীন হলো একটা কলের শব্দে।মায়িদা ফোন রিসিভ করল।ওপাশ থেকে মালিহার কান্নামিশ্রিত কন্ঠে ভেসে আসলো,
-মাদু,আব্বা..আব্বা..
মায়িদা আৎকে উঠলো।নোভান মায়িদার দিকে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-কে?
মায়িদা নোভানের প্রশ্নের উত্তর দিলো না।ফোন কানে নিয়ে আস্তে করে বলল,
-কী হয়েছে আব্বার?
নোভান আবার বলল,
-কী হয়েছে?
মায়িদা তার দিকে 'চুপ থাক' লুক নিয়ে তাকালো।ওপাশ থেকে মালিহার কথা শুনে গেলো।সে কান্নার সাথে হালকা ধমকে বলল,
-তোর আব্বা না,আমার আব্বা।
-তো তোর আব্বা আমার আব্বা না?
-আরে ভাই,আমার শ্বশুর আব্বা।
মায়িদার জান একটু না অনেকটাই হালকা হলো।তবে এই মালিহা গবেটটাকে এখন একটা লাথি মারতে ইচ্ছে করছে।এ আর কোনো সময় জেঠুকে আব্বা বলবে না।বিপদের সময় আব্বা বলা শুরু করবে।গবেটের গবেট।নোভানের কথা আবার শোনা গেল,
-কী হয়েছে বলছেন না কেন?
মায়িদার খেয়াল হলো।সে আবার ফোন কানে নিয়ে বলল,
-কী হয়েছে জেঠুর?
-দুই নাম্বার হার্ট অ্যাটাক।
-ওহ!
-কী ওহ।মাইজদী হাসপাতালে আয় তাড়াতাড়ি।জানিস না,উনি এখন সবার থেকে একে একে মাফ চাইবে?
-আচ্ছা রাখ।
নোভান খাটের উপর গালে দুই হাত দিয়ে বলল,
-এবার তো বলেন কী হয়েছে?
মায়িদা মালিহার রাগ নোভানের উপর দেখিয়ে বলল,
-একটা ছেলে হয়েছে,চারটা মেয়ে হয়েছে।
-কার?
-আমার।
__________
হাসপাতালে পুরো ভিড় জমে গিয়েছে।জহির সাহেব উনার লতাপাতায় আত্মীয়দের ও ফোন করে ডেকে এনেছেন।এখন সবার থেকে একে একে মাফ চাওয়ার পর্ব চলছে।ডাক্তার বলেছেন উনার শরীরের কন্ডিশন ভালো না।যেকোনো সময় আল্লাহর ডাক আসতে পারে।এই কথা শোনার পর জুলেখা উনার পাশে বসে বসে কাঁদছেন।শুধু যে জুলেখা কাঁদছে তা না।অরিও মায়ের সাথে সুর মিলিয়ে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করছে।অরির দেখা দেখি অকুও জোরে জোরে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করছে।কিন্তু জহির সাহেবের পুত্র অয়ন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করছে না।সে ভ্রু কুঁচকে অরির দিকে তাকিয়ে আছে।যে কিনা কিছুক্ষণ বাদে বাদে ভাইয়ের দিকে আঙুল তুলে বলছে,
-তুমি একটা পাষাণ,নো দিলওয়ালা,খবিশ,আব্বার শত্রু,বেয়াদব পুত্র।আজ তোমার জন্য আব্বা হাসপাতালে।আ আ আ..
অয়নের ইচ্ছে করছে বোনকে এই হাসপাতালের ছাদ থেকে একটা আছাড় মেরে ইন্না-লিল্লাহ করে ফেলতে।সে কী করেছে?সে তো শুধু আব্বাকে বলেছে,
-শুনো আব্বা,আমি একবার বলেছি যখন অরির বিয়ে মানবো না।তখন মানবোই নাহ!তুমি কিরকম বাপ হইলা বলোতো?মেয়েকে ঢ্যাং ঢ্যাং করে পালিয়ে বিয়ে করতে বললা?তাও কার সাথে?ওই রাফি হাদারামের সাথে!সিরিয়াসলি আব্বা!সিরিয়াসলি!
এই সিরিয়াসলি শুনে নাকি অন্য কোনো কারণে জহির সাহেব বুকে হাত দিলেন এবং ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেলেন।অয়ন অবাক, হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো।সে ও তো তখন কেঁদেছে। মালিহাকে ধরে ধরে বলেছে,
-এই মালা,আমার আব্বা?
মায়িদা-নোভান আসলো।জেঠু মায়িদার আগে নোভানের থেকে মাফ চাইলেন। নোভানের হাত ধরে বললেন,
-বাবা আঁরে মাফ করি দ্যাও,আঁই হেদিন তোঁরে মনে মনে হাগলা কইছি।(বাবা আমাকে মাফ করে দাও,আমি সেদিন তোমাকে মনে মনে পাগলা বলেছি।)
নোভান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো।সে পাগলামির কিছু করেছিলো নাকি?মনে পড়ছে না।জহির সাহেব আবার বললেন,
-মাফ করলা?
নোভান উপরনিচ মাথা দুলিয়ে বলল,
-হুম হুম।
জহির সাহেব খুশি হলেন।উনার এই মাফ পর্ব শেষ হতে হতে বিকাল চারটা বাজল।ডাক্তার শাবানা বাড়ির সবাইকে বুঝিয়ে বললেন,
-দেখুন,উনি অনেক স্ট্রেস নেন।টেনশন করেন অনেক।উনাকে আর টেনশনের মধ্যে রাখবেন না।ইতিমধ্যে দুইবার অ্যাটাক খেয়েছেন।আর একবার খেলে কিন্তু বাঁচানো যাবে না উনাকে।
________
ডাক্তারের এ কথায় অনেক লাভ হয়েছে।এক লহমায় শাবানা বাড়ির সবাইকে প্রজা এবং জহির সাহেবকে রাজা বানিয়ে দিয়েছে।যে রাজা বিগত দশ মিনিট যাবত তার জমজ ভাইকে বলছে,
-তুই একটা খবিশ।
এইবার জমজ ভাই ঝগড়া করছে না।রেগে বোমও হয়ে যাচ্ছে না।বরং হো হো করে হেসে হেসে বলছে,
-আরেএএ,এটা বলার কিছু হইলো?আমি তো খবিশ'ই।
জহির সাহেব মজা পাচ্ছেন।তিনি ভাইকে দুনিয়ার যত কিছু বলে ঝগড়া করতেন সব বলা শুরু করলেন।
-তুই আগোসইল্লা।
-আরে হ্যাঁ, আমি তো জীবনেও গোসল করি নাই।তুমি কেমনে জানলা বলোতো?
-তুই বাত্তামিজ।
-হুম,হুম।
-তুই বান্দর।
-হুম।
-তুই গাঁধা।
-হুম।
জালাল সাহেব অনেক কষ্টে হুম হুম করছেন।উনার ভীষণ রাগ লাগছে।মনে হচ্ছে উনি আর বেশিক্ষণ হুম হুম করতে পারবেন না।যেকোনো সময় ভাইয়ের মাথায় ওই টিভিটা ভাঙবেন।উনাকে এই রাগের থেকে নিস্তার দিতে রাফি এলো।ঘুম থেকে উঠে এসেছে বোঝা যাচ্ছে।চোখ মুখ ফুলে আছে।রাফি জহির সাহেবের কাছে গিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
-আংকেল,আপনি ঠিক আছেন?
জহির সাহেব মুখ শক্ত করে বললেন,
-তোঁর অনগা আইয়নের সময় অইছে?
-আমি আসলে ঘুমে ছিলাম।ফোন বাজছিল যে শুনতে পায় নি।
-আচ্ছা।
জহির সাহেবের মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো।তিনি গলা উঁচিয়ে অয়নকে ডাকলেন।অয়নকে ডাকলেও,অয়নের সাথে সাথে শাবানা বাড়ির সবাইও এসে উপস্থিত হলো।জহির সাহেব হালকা কেঁশে বললেন,
-অয়ন, রাফির লগে কোলাকুলি কর।
অয়ন একটা চিক্কর মেরে বলল,
-কীহ!
-কোলাকুলি কর।
-পারবো নাহ।
জহির বুকে হাত দিয়ে একটু অভিনয় করতে যাবে এর আগেই শাবানা বাড়ির সবাই চিল্লিয়ে উঠলো।অয়নের দিকে তাকিয়ে ধমকে বলল,
-কোলাকুলি কর।
রাফি হেসে এগিয়ে গেল।অয়ন বাপের দিকে তাকিয়ে দাঁত মুখ খিঁচে এই রাফি দ্য হাদারামের সাথে কোলাকুলি করলো।রাফির পিঠে অবশ্য একটা চাপড়ও মারলো।জোরসে।সেই চাপড় খেয়ে রাফির একটু কাঁদতে ইচ্ছে করলো।সে অনেক ব্যাথা পেয়েছে পিঠে।তবে প্রেসটিজের ফালুদা সে বানালো না।না কেঁদে হো হো করে হাসতে লাগলো।জহির সাহেবও হো হো করে হাসলেন।পাশ থেকে নামাজের টুপিটা এমন ভাবে মাথায় চাপালেন,যেন মনে হচ্ছে কোনো কিং তার মাথায় মহা মূল্যবান মুকুট পরছে।জহির সাহেবের নিজেকে অবশ্য কিং'ই মনে হচ্ছে।শাবানা বাড়ির দ্য গ্রেট কিং জহির উদ্দিন।
~চলবে...