উল্টাপাল্টা সংসার
~আরিয়ানা আরিফা
৩২.
দেখতে দেখতে অরির বিবাহের দিন চলে এলো।এর মাঝখানের দিনগুলোতে শাবানা বাড়ির তিন কন্যা ব্যাপক হৈ হল্লা করেছে।মায়িদা-মালিহা অরিকে নিয়ে তাদের আবেগের শহরের প্রতিটা কোণা কোণা ঘুরেছে।তাদের তিনজনের কোলে কোলে অকুও অবশ্য ঘুরেছে।যদিও অকু ঘুরা কম, ঘুমিয়েছে বেশি।এই চট্টগ্রামের বাতাসে তার শুধু ঘুমই পাচ্ছে।
জহির সাহেব সকাল থেকে নতুন পাঞ্জাবী পরে বাবু সেজে আছেন।তিনি ঠিক করেছেন, অরির বিয়েতে তাক লাগানো মজা করবেন।জুলেখার জন্য ছেলের বিয়েতে কোনো মজা টজা করতে পারেননি তিনি।সারাক্ষণ মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলেন।কিন্তু,উহুম!এখন তিনি মোটেই মুখে কুঁলুপ আটবেন না।বরং সবার সাথে নাচবেন, গাইবেন,অকুর মতন 'ডিংকু নাত্তুর ডিংকু নাত্তুর না না' করবেন।মাঝে মাঝে জালালকে কয়েকটা ভেংচিও কাটবেন।
______
অরির বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে বিন আংকেলের বাসার ছাদে।চোখ ঝলসানো আয়োজন।এই আয়োজনের পুরো ক্রেডিট অবশ্য বিন আংকেলের।তিনি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে ডেকোরেশনের লোকদের নির্দেশনা দিয়েছেন।কিছুক্ষণ বাদে বাদে মাথায় চাপড় মেরে বলেছেন,
-আরে!এটা কী করলা?এভাবে না।এই দেখো,এভাবে করতে হয়।
অরির বিয়েতে জালাল সাহেবের দুই মেয়ে জামাইয়ের আচরণে আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল।তাদের দুইজনকে মালিহা-মায়িদার পিছনে ভ্রমরের মতন লেগে থাকতে দেখা যাচ্ছে।জহির সাহেব যেরকম ভাইকে ভেংচি মারবেন ভেবেছেন,নোভান সেরকম ভাবা পর্যন্ত আটকে থাকছে না,বরং রূপকে মিনিটে মিনিটে ভেংচি কাটছে।যেখানে যেখানে রূপকে দেখা যাচ্ছে, সেখানে সেখানে মায়িদার পদধূলি সে কিছুতেই পড়তে দিচ্ছে না।রূপ মায়িদার দিকে তাকালে,চোখের ইশারায় তাকে ছাদ থেকে টপকে ফেলার হামকি ধামকিও দিচ্ছে।
অয়ন বেটা অবশ্য এসব কিছুই করছে না।সে ছাদের দোলনা একটার উপরে মালিহা এবং অকুকে নিয়ে শক্ত হয়ে বসে আছে।মালিহাকে কাজের জন্য ডাকা হলেই সে বলছে,
-আজ মালার ছুটি।
মালিহা চোখ কটমট করে তাকাচ্ছে।তীব্র কয়েকবার মালিহার সাথে কথা বলতে এসেছে।অয়ন তখন কী করেছে?মালিহার শাড়ির আঁচল দিয়ে তার মাথায় বড়সড় একটা ঘোমটা চাপিয়ে জোরে জোরে জপেছে,
-আউজুবিল্লাহ হি মিনাশ শায়তানির রাজিম।যাহ শয়তান, যাহ।হুশ হুশ!
তীব্রকে হুশ হুশ করা বাদে অয়নের কন্ঠে আজ গুণগুণিয়ে গানও শোনা গেল।অকু পাপ্পার গলা জড়িয়ে সেই গুণগুণ শুনলো,
"তোমার কানের দুল
চোখে এসে পড়ে চুল
আড়চোখে তুমি আর দেখো না
ঝুমঝুম নুপুরে,এই রোদ দুপুরে..."
অয়ন শুধু এই গানটায় গাইতে পারে।এটা হচ্ছে জুবীনের প্রিয় গান।এই গান জুবীন সবাইকে ধরে ধরে শোনায় এবং একটা বেত নিয়ে কোয়াইশ কোয়াইশ করে পাছায় বারি মেরে মেরে শেখায়।অয়নেরও ছোটবেলায় সেই বারি খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে।অবশ্য ভালো'ই হয়েছে।যদি ছোটবেলায় জুবীন তাকে এই গানটা না শেখাতো,তাহলে এখন কী সে বউয়ের উড়ুক্কু চুল,ঝুমঝুম নুপুর নিয়ে এই ভরা দুপুরে গুণগুণিয়ে গানটা গাইতে পারতো?
__________
বিকাল চারটা।কাজী সাহেব তখন থেকে বসে আছেন।আজ শুক্রবার।শুক্রবারে উনার অনেকগুলো বিয়ে পড়াতে হয়।এটা হচ্ছে তিন নাম্বার বিয়ে।এরপর আরেকটা আছে।সেটাতে যাওয়ার আগে তিন নাম্বার বিয়েটা উনাকে খালাস করতে হবে।অথচ তিনি বিয়েটা খালাস করতে পারছেন না।এখানে বর বউয়ের কোনো দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।লোকমুখে শোনা যাচ্ছে,বউ যার নাম কি না অরি,সে রুমে বসে বসে রামেন খাচ্ছে।তার নাকি অনেক ক্ষুধা পেয়েছে।ক্ষুধার্ত পেটে সে কিছুতেই কবুল বলবে না।তার এক কথা,'আগে পেট,তারপর কবুল।' অন্যদিকে বর, যার নাম কিনা রাফি হাসান,সে বরের আসনে পা তুলে বাচ্চাদের মত বসে বসে গেম খেলছে।কাজি সেদিকে চোখ মুখ কুঁচকে বললেন,
-ফিরি ফায়ার নি খেলো?
রাফি খেলায় মনোযোগ রেখে তার থেকেও বেশি চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
-ছিহ!
-তাইলে কিতা খেলো?
-টেম্পল রান।
-টেম্পু রান!টেম্পু চালাইতে হইবো?
-নাহ।
-তাহইলে?কেমনে খেলে?
রাফি আগ্রহ পেল।খেলার বিষয়ে কেউ কোনো কথা বললেই তার মজা মজা লাগে।সে মোবাইলখানা কাজীর হাতে দিয়ে বলল,
-এভাবে খেলে।এই যে এই লোকটাকে দেখছেন?ওকে জাস্ট দৌঁড়াতে হবে।দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে একটা প্যারাসুট আসবে।ওই প্যারাসুটে উঠতে পারলেই জিত্তা।
-প্যারাসুট?চুলে মাখনের ত্যাল?
-আরে ধুর।দেখুন এদিকে।
রাফি কাজীকে খেলার প্রতিটা স্টেফ বুঝাতে লাগলো।কাজী রাফীকে মহান কোনো গুরু মেনে সেই খেলা 'গুড বয়দের' মত শিখতে লাগলেন।ত্রিশ মিনিটে কাজী সাহেব পাক্কা খেলাড়ি হয়ে গেলেন।অরি যখন খাওয়া-দাওয়া শেষে তার আসনে এসে বসলো,কাজী সাহেবকে তখনও খেলতে দেখা গেল।রাফি মুখে হাত দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলো।সে হাড়ে হাড়ে বুঝলো, সবাইকে খেলা শেখাতে হয় না।বিয়ের দিন কাজীকে তো একদমই নাহ!এই যে,কাজীকে আগ্রহ নিয়ে সে খেলা শেখালো,কাজী এখন কী করছেন?তার মোবাইলখানা ফেরত দিচ্ছেন না।বরং হাত ঝাড়া মেরে বলছেন,
-এই, দাঁড়াও, আর একটু।এক্ষুনি প্যারাসুট পাইয়া যামু।হা হা হা!
জহির সাহেব বিরক্তমুখে বললেন,
-কাগা,বিয়াটাতো হরাইবেন না কিয়া?
কাকা জহির সাহেবের কথাকে মূল্য দিলেন।গেম খেলতে খেলতে বললেন,
-এই, বলো কবুল?
পাক্কা তিন ঘন্টা বাদে অরি-রাফির কবুল বলা-বলি হলো।এই কবুল বলা-বলির পিছনে বিন আংকেলের আলোয় আলোয় ভরপুর ছাদে নানারকম কাহিনি ঘটে গেল।কাহিনী গুলো সংক্ষেপে বললে এরকম।
কাজী সাহেব বিয়ে পড়িয়ে রাফির মোবাইল নিয়ে পগারপার হয়েছেন।রাফি সেই মোবাইল সমেত হাওয়া হওয়া কাজীর পিছনে দৌঁড়াতে গিয়ে 'পা পিছলে আলুর দম' হয়ে কোমর ভেঙেছে।
নোভান সারাক্ষণ মায়িদার পিছনে পিছনে লেগে থাকার দরুণ, মায়িদার হাত থেকে একটা ঘুষি খেয়েছে।ঠিক নাক বরাবর।তার নাক বর্তমানে পাঁকা টমেটোর মত লাল হয়ে আছে।
একইভাবে,তীব্র মালিহাকে মালে বলার দরুন অয়নের হাতে বিশাল একটা থাপ্পড় খেয়েছে।সেই থাপ্পড় খেয়ে তীব্র জালাল সাহেবের কাছে অভিযোগ দিয়েছে।জালাল সাহেব অভিযোগের সূত্র ধরে অয়নের গালেও পালটা দুইটা থাপ্পড় মেরেছেন।জহির সাহেব সেই থাপ্পড় মারার দৃশ্য দেখে রেগে আগ্নেওগিরি হয়ে ভাইয়ের সাথে তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়েছেন।জাল্লুর সাহস তো কম না!উনার ছেলেকে থাপ্পড় মারে!আজ জাল্লুর একদিন কী উনার যতদিন লাগে!অকু বড়দের এইসব কান্ডকারখানা বেশ ইঞ্জয় করেছে।আজ তার মোটেই ঘুম পায় নি।সে নোভানের মাথা থেকে ক্যাপটা কেড়ে নিয়ে ডক্টর ঝটকার মত দুই আঙুল উপরে তুলে নেচে নেচে গেয়েছে,
'ডিংকু নাত্তুর,
ডিংকু নাত্তুর না!'
_________
অবশেষে শাবানা বাড়ির তিন কণ্যারই আয়োজন করে বিবাহ সমাধা হয়ে গেল।জহির সাহেব আর জালাল সাহেব চোখ মুছলেন।আজ অনেকদিন বাদে উনাদের বাবার কথা মনে পড়ছে।ইশ!বাবাটা উনার একটা নাতি নাতনিরও বিবাহ দেখতে পারলেন না।আচ্ছা?জহির-জালাল কী তাদের নাতি নাতনির বিবাহ দেখতে পারবে?অকুতো এখনো কত্ত ছোট!আরগুলোর তো পৃথিবীতে আসার এখনো কোনো খবরাখবরই পেলেন নাহ।জহির-জালাল সিক্ত নয়নে অকুকে দেখতে লাগলেন।আহারে!তাদের নাতিটা কবে যে বিয়ে করবে?কবে যে তারা নাত বউকে দেখবে?কবে যে অকু তাদের সামনে বউ নিয়ে এসে বলবে,
-এই বউ,এনারা আমার দাদা,নানা।সালাম করো এনাদের।বলো আসসালামু আলাইকুম।
এই কবে টা যে কবে আসবে?জহির-জালালের আবার চোখ ভিজলো।উনারা পাঞ্জাবীর হাতা দিয়ে চোখ মুছলেন।আহারে!আজ উনাদের এত কষ্ট লাগছে কেন?
~চলবে...
____
(রিচেক করা হয় নি।ভুল থাকতে পারে লেখায়।হ্যাপি রিডিং।)