ফন্ট সাইজ:
থিম:
Blood Touch

৪র্থ পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

᪥🩸#𝑩𝒍𝒐𝒐𝒅𝒕𝒐𝒖𝒄𝒉🩸᪥

#𝗪𝗿𝗶𝘁𝗲𝗿_𝗠𝗮𝗿𝗶𝗮𝗺_𝗛𝗼𝘀𝘀𝗮𝗶𝗻

#𝐏𝐚𝐫𝐭⦄• 𝟎4

✿❃ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ❉ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ❃✿

🚫⛔হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

✿❃ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ❉ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ❃✿

পরবর্তী কয়েকটা দিন মিস্টহ্যাভেন শহরটা যেন এক নিথর স্তব্ধতায় ডুবে রইল। দিলরুবা হসপিটালে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। সে এখন তার ঘরের নিভৃতে সেই পুরনো কালো চামড়ায় বাঁধানো বইটার ভেতরেই ডুবে থাকে। বইটা যেন কেবল একগুচ্ছ কাগজ নয়, ওটা একটা জীবন্ত সত্তা—যা প্রতিটি পাতায় দিলরুবাকে তার নিজেরই এক অচেনা আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

মাঝরাত। মোমবাতির শিখাটা জানালার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসে থরথর করে কাঁপছে। দিলরুবা বইটির মাঝখানের একটি বিশেষ পরিচ্ছেদে এসে থমকে গেল। পাতাটি অন্যান্য পাতার চেয়ে অনেক বেশি মসৃণ, যেন মানুষের চামড়া দিয়ে তৈরি। সেখানে রূপোলি অক্ষরে ফুটে আছে এক বিস্ময়কর সত্য:

❝শতাব্দীতে একবার এমন এক সত্তার জন্ম হয়, যার শিরায় বয় 'পিউর ব্লাড' (Pure Blood)। সে ভ্যাম্পায়ার নয়, সে মানবীও নয়—সে হলো আদিম শক্তির আধার। তার রক্তে কোনো বিষ নেই, আছে সৃষ্টির আদিম সুধা। এই রক্ত কোনো ভ্যাম্পায়ার পান করলে সে অমরত্বের এক নতুন স্তরে পৌঁছায়, আর কোনো মানুষ পান করলে সে পায় অলৌকিক জীবন।❠

দিলরুবা নিজের হাতের তালুটা উল্টে দেখল। ল্যাম্পের আলোয় তার নীল শিরাগুলো আজ লতানো গাছের মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে। সে বুঝতে পারল, কেন তার রক্ত ল্যাবের পরীক্ষায় ওভাবে অদ্ভুত আচরণ করেছিল। এটা কোনো সংকর বা দূষিত রক্ত নয়—এটি মহাকালের এক দুষ্প্রাপ্য আশীর্বাদ, যা প্রতি একশ বছরে কেবল একজনের শরীরেই প্রবাহিত হয়।

বইয়ের পরবর্তী অংশে আরও বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে:

❝পিউর ব্লাড বাহকের চোখের মণি হবে আকাশের মতো নীল, কিন্তু যখন তার ভেতরের শক্তি জাগ্রত হবে, তখন সেই নীলের মাঝে একটি রক্তিম ঘূর্ণি দেখা দেবে। তার ছোঁয়ায় মৃত মাটি প্রাণ পাবে, কিন্তু তার কান্না আকাশকে বিষণ্ণ করে তুলবে।❠

দিলরুবা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে তার চশমাটা অনেক আগেই ফেলে দিয়েছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে সে নিজের চোখের দিকে তাকাল। গাঢ় নীল মণি দুটোর একেবারে কেন্দ্রে, সুঁচের অগ্রভাগের মতো একটি ক্ষুদ্র লাল বিন্দু টকটকে আগুনের মতো জ্বলছে। এটিই তবে সেই চিহ্ন!

সে তার হাতের তর্জনীটা দাঁত দিয়ে সামান্য কামড় দিল। এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে এল। সেই রক্ত সাধারণ লাল নয়, বরং তাতে একটা মুক্তোর মতো নীলচে আভা মিশে আছে। রক্তের ঘ্রাণটা ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়তেই ঘরের কোণে শুকিয়ে যাওয়া টবের গোলাপ গাছটা হঠাতই সজাগ হয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই মরা ডাল থেকে কচি সবুজ পাতা বেরিয়ে এল এবং একটা কুঁড়ি উঁকি দিল—যার রঙ রক্তের মতো লাল।

দিলরুবা শিউরে উঠল। সে বুঝতে পারল, কেন সেই পরিত্যক্ত ক্যাসেলের ঘাতক তাকে ওভাবে খুঁজছিল। সে কোনো সাধারণ শিকার নয়, সে এক মহামূল্যবান সম্পদ।

বইটির শেষ পাতায় একটি হাতে আঁকা ম্যাপ ফুটে উঠল। ম্যাপটি সাধারণ কোনো ম্যাপ নয়; ওটা রক্তে আঁকা। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মিস্টহ্যাভেনের গভীর অরণ্যের একেবারে হৃদপিণ্ড যেখানে স্পন্দিত হয়, সেখানে বিশাল এক ক্যাসেল। আর সেই ক্যাসেলকে ঘিরে আছে হাজার হাজার লাল টকটকে রক্তাক্ত গোলাপের বাগান।

সেই ম্যাপের নিচে একটি সতর্কবাণী লেখা:

❝সতর্ক থাকো পিউর ব্লাড। তোমার রক্তের ঘ্রাণ এখন বাতাসে। বনের নেকড়েরা আজ রাত জাগবে, আর কুয়াশার আড়ালে থাকা সেই প্রাচীন রাজপুত্র তার গোলাপ বাগানকে প্রস্তুত করছে কেবল তোমারই জন্য।❠

দিলরুবা জানালা দিয়ে বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে তাকাল। সে অনুভব করতে পারছে, বনের প্রতিটি গাছ যেন তাকে ডাকছে। পাইন বনের ভেতর দিয়ে বয়ে আসা বাতাসের শব্দে সে শুনতে পাচ্ছে এক গম্ভীর হৃদস্পন্দন। সে জানে না কার সেই হৃদস্পন্দন, কিন্তু তার নিজের শরীরের 'পিউর ব্লাড' সেই অজানা ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে নেচে উঠছে।

সে তার কালো ওভারকোটটা তুলে নিল। বইটা ব্যাগে ভরে সে পা বাড়াল দরজার দিকে। তার মা মিসেস জেসিকা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। উনার চোখে জল, কিন্তু মুখে কোনো বাধা নেই। তিনি জানেন, পিউর ব্লাড যখন তার গন্তব্য চিনে নেয়, তখন তাকে আটকে রাখার ক্ষমতা কারোও নেই।

ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ

পরদিন সকালে মিস্টহ্যাভেনে এক অদ্ভুত শান্ত আবহাওয়া বিরাজ করছিল। দিলরুবা তার রহস্যময় কালো বইটি আর নিজের নতুন অর্জিত সত্যগুলো নিয়ে সারা রাত জেগে থাকলেও, তার চোখে কোনো ক্লান্তি নেই। বরং তার শরীরের ভেতর বইতে থাকা সেই 'পিউর ব্লাড' তাকে এক অমানুষিক সতেজতা দান করছে। সে তার সেই গাঢ় ফ্রেমের চশমাটা আবার চোখে পরে নিল—এখন তার নীল চোখের সেই রক্তিম ঘূর্ণি ঢেকে রাখাটা খুব জরুরি।

সে যখন সেন্ট্রাল হসপিটালের করিডোরে পা রাখল, দেখল পরিবেশটা আজ অন্যদিনের চেয়ে বেশ চনমনে। রিসেপশনে নার্সদের মধ্যে এক চাপা ফিসফিসানি আর উত্তেজনার গুঞ্জন।

হসপিটালের করিডোরে ওষুধের তীক্ষ্ণ গন্ধের সাথে আজ অন্য এক ধরণের ঘ্রাণ মিশে আছে। দামী তামাক আর কোনো প্রাচীন বৃক্ষের ছালের মিশ্রিত এক ভারী সুগন্ধ। দিলরুবা যখন তার কেবিনের দিকে এগোচ্ছিল, তখন নার্স সারা প্রায় দৌড়ে তার কাছে এল।

❝ডক্টর হানিফ! আপনি কি শুনেছেন? আজ বোর্ড থেকে একজন নতুন কনসালটেন্ট এসেছেন। তিনি নাকি সরাসরি রোমানিয়ার কোনো এক বিখ্যাত একাডেমি থেকে ট্রান্সফার নিয়ে এসেছেন।❠

সারার চোখেমুখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা মাখা।

দিলরুবা শান্ত গলায় বলল,

❝ভালোই তো। হসপিটালে ডাক্তার কম ছিল। উনার নাম কী?.?..❠

❝ডক্টর এড্রিয়ান ডার্কউড।❠

সারা নামটা উচ্চারণ করার সময় এক ধরণের শিহরণ অনুভব করল।

❝উনি ডিরেক্টরের কেবিনে আছেন। এখনই হয়তো রাউন্ডে বের হবেন।❠

দিলরুবা মাথা নেড়ে নিজের কেবিনে ঢুকে পড়ল। কিন্তু তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হয়েছে। তার পিউর ব্লাড যেন তার শিরার ভেতর সামান্য উত্তাল হয়ে উঠছে—এ এক সতর্কবার্তা, যা সে আগে কখনো পায়নি।

খানিক বাদে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে এক জরুরি তলব এল। একজন বয়স্ক রোগীর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। দিলরুবা দ্রুত সেখানে পৌঁছে দেখল, একজন দীর্ঘকায় পুরুষ ইতিমধ্যেই রোগীর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটার পরনে নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা কালো শার্ট আর তার ওপর ধবধবে সাদা অ্যাপ্রন।

❝ডক্টর হানিফ, দেখা হয়ে ভালো লাগল। এই হসপিটালে এসেই আপনার অনেক সুনাম শুনেছি। আমি এড্রিয়ান…❠

লোকটা যখন কথা বলল, তার কণ্ঠস্বর যেন কোনো গভীর গহ্বর থেকে উঠে আসা এক রাজকীয় প্রতিধ্বনি।

দিলরুবা থমকে দাঁড়াল। এড্রিয়ান তার দিকে ফিরে তাকাল। তার চেহারাটা যেন কোনো গ্রীক ভাস্করের খোদাই করা মূর্তির মতো ধারালো। তার গায়ের চামড়া দিলরুবার মতোই ফ্যাকাশে, কিন্তু তার চোখ দুটো সম্পূর্ণ কালো—অতল অন্ধকারের মতো। সেই চোখে কোনো মায়া নেই, আছে এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ।

❝রোগীর কন্ডিশন স্ট্যাবল নয়, ডক্টর হানিফ। উনার হৃদপিণ্ড রক্ত পাম্প করতে ভুলে যাচ্ছে❠

এড্রিয়ান এক পা এগিয়ে এল।

❝আমি শুনেছি আপনার নাকি এক ধরণের 'মিরাকল টাচ' আছে। আপনি কি একবার চেষ্টা করবেন?.?..❠

এড্রিয়ানের চোখের চাহনি দিলরুবার চশমার কাঁচ ভেদ করে সরাসরি তার নীল মণির দিকে আঘাত করল। দিলরুবা বুঝতে পারল, এই লোকটা সাধারণ কেউ নয়। সে যখন রোগীর নাড়ি পরীক্ষা করার জন্য হাত বাড়াল, এড্রিয়ান খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করছিল।

দিলরুবা অনুভব করল, এড্রিয়ানের উপস্থিতি এই ওয়ার্ডের অক্সিজেন শুষে নিচ্ছে। লোকটার শরীর থেকে কোনো তাপ বেরোচ্ছে না, বরং সে যেন এক হিমশীতল বরফখণ্ড।

দিলরুবা তার আঙুলের ডগা দিয়ে রোগীর বুক স্পর্শ করল। সে অবচেতনভাবেই তার ভেতরের সেই 'পিউর ব্লাড'-এর শক্তিকে আহ্বান করল। এক মুহূর্তের জন্য তার আঙুলের নিচে এক স্পন্দন অনুভূত হলো—সেই মৃতপ্রায় হৃদপিণ্ডটা একবার প্রবলভাবে ধক করে উঠল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে এড্রিয়ান হঠাৎ দিলরুবার কবজি চেপে ধরল।

❝বড্ড বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন ডক্টর❠ এড্রিয়ানের আঙুলগুলো দিলরুবার চামড়ায় ছ্যাকার মতো ঠেকল।

❝সব জীবন কি বাঁচানোর যোগ্য?.?..❠

দিলরুবা হাত সরিয়ে নিল। তার শিরদাঁড়া দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। এড্রিয়ানের ওই ছোঁয়ায় সে এক পলকের জন্য এক বিশাল লাল গোলাপের বাগানের ঝলক দেখতে পেল—যেন এক অন্ধকার প্রাসাদের ছায়া তার চোখের সামনে দিয়ে বয়ে গেল।

এড্রিয়ান মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না। সে নিচু স্বরে শুধু দিলরুবা শুনতে পায় এমনভাবে বলল,

❝আপনার নীল চোখ দুটো বড় মায়াবী, মিস হানিফ। তবে মিস্টহ্যাভেনে রহস্যময় চোখগুলোর জন্য রাতটা খুব একটা নিরাপদ নয়।❠

দিলরুবা কথা না বলে দ্রুত ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এল। সে বুঝতে পারল, এই নতুন ডক্টর এড্রিয়ান কেবল একজন চিকিৎসক হয়ে এখানে আসেনি। সে হয়তো সেই পাহাড়ি ক্যাসেলের কোনো বার্তাবাহক, অথবা নিজেই কোনো শিকারী। হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে দিলরুবা অনুভব করল, তার সেই প্রাচীন বইয়ের প্রতিটি ভবিষ্যৎবাণী এক এক করে সত্যি হতে শুরু করেছে।

ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ

হসপিটালের সেই ঘটনার পর দিলরুবার মনে হলো, মিস্টহ্যাভেনের বাতাস যেন ক্রমে ভারী হয়ে আসছে। ডক্টর এড্রিয়ানের সেই বরফশীতল স্পর্শ আর তার রহস্যময় চাহনি দিলরুবাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি দিচ্ছিল না। সে নিজের কেবিনে ফিরে এসে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল। তার হাতের কবজিতে এখনো এড্রিয়ানের আঙুলের ছাপগুলোর জায়গায় এক ধরণের কালচে আভা দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ছোঁয়ায় হওয়ার কথা নয়

বাইরে তখন গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছে। কুয়াশাগুলো আবার হসপিটালের জানালার কাঁচে আছড়ে পড়ছে। দিলরুবা তার ব্যাগের ভেতর থেকে সেই প্রাচীন কালো বইটা বের করল। বইটা এখন যেন তপ্ত হয়ে উঠেছে। সে দ্রুত পাতা ওল্টাতে লাগল, যদি এড্রিয়ান বা এই ধরণের কোনো আগন্তুকের কোনো উল্লেখ সেখানে পাওয়া যায়।

বইয়ের একেবারে শেষের দিকে একটি ছোট অনুচ্ছেদ তার নজরে এল:

❝যখন পিউর ব্লাড পূর্ণতা পায়, তখন তার আলোর আকর্ষণে ছায়ারা লোকালয়ে নেমে আসে। তারা মানুষের বেশে ঘরে ঢোকে, দেবতার বেশে মন্দিরে বসে। তারা আসে কেবল ওই সুধাটুকুর লোভে। সাবধান, যাদের চোখের মনিতে কোনো আত্মার ছায়া নেই, তাদের থেকে দূরে থেকো।❠

দিলরুবার মনে পড়ে গেল এড্রিয়ানের সেই মৃত এবং অন্ধকার চোখ দুটো। সেখানে কোনো প্রতিচ্ছবি পড়ে না। সে বুঝতে পারল, এড্রিয়ান কোনো সাধারণ ডাক্তার নয়; সে হয়তো সেই প্রাচীন ক্যাসেলের কোনো এক উচ্চপদস্থ সদস্য, যে পিউর ব্লাডকে পাহারা দিতে বা পরীক্ষা করতে এসেছে।

হঠাৎ তার কেবিনের দরজায় তিনটে ধীর লয়ে টোকা পড়ল।

ঠক... ঠক... ঠক...

দিলরুবা বইটা দ্রুত ড্রয়ারে লুকিয়ে ফেলল।

❝কে বাইরে?.?..❠

দরজাটা আস্তে করে খুলে গেল। কিন্তু সেখানে এড্রিয়ান নয়, দাঁড়িয়ে আছে নার্স সারা। মেয়েটার চোখেমুখে কেমন এক ঘোরের মতো ভাব, যেন সে কারো সম্মোহনে আচ্ছন্ন।

❝ডক্টর হানিফ... রিসেপশনে আপনার জন্য একটা পার্সেল এসেছে। কেউ একজন দিয়ে গেছে‌।❠

সারা যান্ত্রিকভাবে কথাগুলো বলে একটা লম্বাটে প্যাকেট টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল। তার হাঁটাচলাও কেমন যেন স্বাভাবিক নয়।

দিলরুবা খুব সাবধানে প্যাকেটটা খুলল। ভেতরে কোনো সাধারণ উপহার নেই। সেখানে রয়েছে একটি দীর্ঘ বোতলের নীল তরল, যার গায়ের লেবেলে কিছুই লেখা নেই। কিন্তু সেই বোতলের ভেতরে ভাসছে একটি টকটকে লাল রক্তাক্ত গোলাপ। গোলাপটি জীবন্ত, যেন এখনই বাগান থেকে ছিঁড়ে আনা হয়েছে। আর সেই গোলাপের পাপড়ি থেকে এক ফোঁটা গাঢ় লাল রস চুঁইয়ে নিচে নীল তরলে মিশছে।

গোলাপটি দেখার সাথে সাথে দিলরুবার ঘরের ল্যাম্পের আলোটা নিভে গেল। কেবল সেই বোতলের নীল তরল থেকে এক মায়াবী আভা বের হচ্ছে। দিলরুবা অনুভব করল, তার শিরায় থাকা পিউর ব্লাড সেই গোলাপের উপস্থিতিতে চঞ্চল হয়ে উঠছে। সে যেন এক অদ্ভুত ঘ্রাণ পাচ্ছে—আদিম, কাম্য এবং ভয়ানক।

সে জানালার পর্দা সরাতেই দেখল, হসপিটালের নিচে পার্কিং লটে একটি কালো ভিন্টেজ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডক্টর এড্রিয়ান। সে ওপরের দিকে, অর্থাৎ দিলরুবার জানালার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা শীতল হাসি। সে তার হাত তুলে দিলরুবাকে যেন এক অদৃশ্য সেলাম জানাল, তারপর নিঃশব্দে গাড়িতে গিয়ে বসল।

দিলরুবা বুঝতে পারল, এড্রিয়ান তাকে প্রচ্ছন্ন এক সংকেত দিয়ে গেল। সে আর দেরি করল না। হসপিটালের ডিউটি মাঝপথেই ফেলে সে বেরিয়ে এল। আজ তার গন্তব্য বাড়ি নয়। আজ সে সেই ঘ্রাণ অনুসরণ করবে যা ওই গোলাপটি থেকে আসছে।

সে যখন হসপিটালের বাইরে বের হলো, দেখল পুরো মিস্টহ্যাভেন শহরটা কুয়াশায় একদম ঢেকে গেছে। দৃষ্টিসীমা মাত্র কয়েক হাত। কিন্তু দিলরুবার নীল চোখের জন্য কোনো বাধা নেই। সে বনের সেই নিষিদ্ধ পথের দিকে পা বাড়াল। সেই গোলাপের পাপড়িগুলো যেন তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বনের ভেতরে ঢুকতেই সে দেখল, বনের সাধারণ পাইন গাছগুলো যেন দুপাশে সরে গিয়ে তাকে পথ করে দিচ্ছে। মাটির ওপর ঝরে থাকা শুকনো পাতাগুলো ভিজে লাল হয়ে আছে, যেন কেউ সেখানে রক্ত ঢেলে দিয়েছে। কিন্তু কাছে গিয়ে সে দেখল, ওগুলো রক্ত নয়—ওগুলো সেই রক্তাক্ত গোলাপের পাপড়ি, যা তার পথপ্রদর্শক হিসেবে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

যত সে বনের গভীরে যাচ্ছে, বাতাসের তাপমাত্রা তত কমছে। হঠাৎ সে এক বিশাল তোরণের সামনে এসে থামল। তোরণটি পাথরের তৈরি নয়, বরং হাজার হাজার লাল গোলাপের লতা দিয়ে বোনা। সেই গোলাপগুলো কেবল ফুল নয়, তাদের কাঁটাগুলো তলোয়ারের মতো ধারালো।

সেই তোরণের ওপাশেই দেখা যাচ্ছে সেই ক্যাসেল—যার চূড়া মেঘ ভেদ করে আকাশে উঠে গেছে। ক্যাসেলের প্রতিটি জানালায় জ্বলছে নীলচে বাতি।

দিলরুবা যখন সেই গোলাপের তোরণ স্পর্শ করল, তার আঙুল থেকে এক ফোঁটা পিউর ব্লাড ঝরে পড়ল একটি গোলাপের ওপর। সাথে সাথে পুরো বাগান যেন এক অমানুষিক আর্তনাদ করে জেগে উঠল। গোলাপগুলো নড়াচড়া শুরু করল, লতাগুলো পিছু হটে তাকে ভেতরে যাওয়ার পথ করে দিল।

সে ক্যাসেলের প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। ভেতরের ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যা এড্রিয়ানের মতো নয়, বরং আরও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং প্রাচীন—

❝অনেক দেরি করে ফেললে, পিউর ব্লাড। তোমার অপেক্ষাতেই তো আমার এই বাগান শতাব্দী ধরে রক্তাক্ত হয়ে আছে।❠

দিলরুবা ভেতরে পা রাখল। সে জানত না, এই ক্যাসেলের ভেতরেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি লুকিয়ে আছে। আর সেখানেই প্রথমবারের মতো সেই কুয়াশাঘেরা রহস্যময় অস্তিত্বের সাথে তার মোলাকাত হতে চলেছে।

✤ᚔᚓᚔᚓ✤✥

চলবে—?.?...

✤ᚔᚓᚔᚓ✤✥

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন