ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৫৩তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫৩.

অস্থির ভঙ্গিতে রাস্তাজুড়ে পায়চারি করছে সাইফ। রাস্তার দু ধারে সারি সারি সুপারি আর খেজুর গাছ। লোক সমাগম কম। শেষ বিকেলের মিঠে আলোতে চারিপাশটা মোহনীয় লাগছে। আচমকা রাস্তার অপর পাশে একটা রিকশা এসে থামতেই সাইফ পায়চারি থামিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ায়৷ রিকশা হতে নেমে আসে শীতের স্নিগ্ধতার মতো স্নিগ্ধ একটা মুখ। গায়ে লাল রঙের থ্রি পিস জোড়ানো। শীত হতে মুক্তি পেতে তার উপর নিয়েছে শাল। মায়াবী চোখগুলোতে ঘন কাজল।

সাইফ ঢোক গিললো দূর হতে নিশাকে দেখে। মনে প্রশ্ন জাগে এতো সাজ আয়োজন কার জন্য? সাইফের মতো অধমের জন্য? ছোট্ট নিছক ভাবনাটা মনে উঁকি দিতেই সাইফের নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে। মুখটা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

রাস্তার অপর পাশে নিশা তখন রিকশা ভাড়া মিটিয়ে সাইফের দিকে ঘুরে তাকায়। মেয়েদের ভূষণ হিসেবে মুখে শোভা পাচ্ছে লাজের আভা। হুশ ভুলে রাস্তা পাড় হওয়ার জন্য এক পা বাড়াতেই নেয় ঠিক তখনই শাঁ শাঁ শব্দ তুলে একটা গাড়ি ঠিক তার সামনে দিয়ে যায়।

নিশা ভীত হয়ে দ্রুত দুই কদম পিছনে চলে যায়। সম্পূর্ণ ঘটনাটা রাস্তার অপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাইফ দেখেছে। দ্বিতীয় দফায় তার নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়। এক মুহুর্তের জন্য বুক কামড়ে উঠে। নিশা নিজেকে সামলে নিয়ে রাস্তা পাড় হওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলেই সাইফ দ্রুত এপাশ থেকে মাথা নেড়ে মানা করে। হাতের ইশারায় বুঝায় সে আসছে।

নিশা থেমে যায়। নিজের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে রয়। লং ড্রাইভের জন্য উপযুক্ত রাস্তা হওয়ায় একটু পর পরই শাঁই শাঁই করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। সাইফ অতি সাবধানে রাস্তা পাড় করে নিশার সামনে এসে দাঁড়ায়। অধিকারবোধের সঙ্গে কোনো অনুমতি ব্যতীতই নিশার ডান হাতটা নিজের বাম হাতের দখলে নিয়ে অন্যরকম স্বরে বলে,

“ নিঃশ্বাস আটকে দিয়েছিলেন। “

অবলীলায় কি সহজ স্বীকারোক্তি! নিশার সাধারণ মনের অনুভূতিরা গাঢ় হয়। মনের সুপ্ত কোণে বয়ে যায় ভালো লাগার হাওয়া। কিছু বলার সুযোগ পায় না আর। সাইফ সাবধানে ওর হাত ধরে রাস্তা পাড় হওয়া শুরু করে। যেনো এর থেকে বড় দায়িত্ব ওর দ্বিতীয়টা নেই!

নিরাপদে রাস্তা পাড় করে অপর পাশে পৌঁছাতেই সাইফ ঘুরে নিশার মুখের পানে তাকায়। গাঢ় স্বরে বলে,

“ আপনাকে স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে ইয়াসমিন। “

সাইফের এরকম স্পষ্ট কথায় কি ছিলো নিশার জানা নেই। তবে হঠাৎই লজ্জার পারদ কয়েক মাত্রা বেড়ে গেলো তার। ঠোঁট জুড়ে ঝুলতে থাকে অপ্রতিরোধ্য লাজুক হাসি। সাইফ সেই হাসি দেখে। নিঃশব্দে দৃশ্যটুকু অবলোকন করে বলে,

“ জরুরী ভিত্তিতে আপনার আব্বু অর্থাৎ আমার স্যারের থেকে সময় চেয়ে চার ঘন্টার সময় পেয়েছি ইয়াসমিন। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি সামনা-সামনি আপনার মুখ থেকে স্বীকারোক্তিটুকু শোনার জন্য। সামনা-সামনি না শুনলে শান্তি পেতাম না। “

নিশা লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলে,

“ আবার বলতে হবে? “

“ জি। “

নিশার কিশোরী মন আচমকা লজ্জায় বাজে ভাবে আড়ষ্ট হয়। গতকাল ওই তীব্র উৎকণ্ঠার মুহুর্তে ফোনে নিজের মনের কথা বলার সময় এক বিন্দু লজ্জা লাগে নি তার। কিন্তু আজ এই মুহুর্তে ঠিক একই কথাটা বলতে এক আকাশ সমান লজ্জা এসে ভর করেছে তার উপর।

সাইফ গাঢ় স্বরে ডাকে,

“ ইয়াসমিন? “

নিশা চোখ তুলে তাকায়। পরপর বলে উঠে,

“ আমি আপনার শেকড় হবো। “

সাইফের ঠোঁট, মুখ, চোখ জুড়ে তখন প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস। তার শক্ত দু হাত অতি সন্তর্পণে ছুঁয়ে দেয় নিশার অবাধ্য চুলগুলোকে। যত্নের সহিত সেগুলোকে কানের পিছনে গুজে দিয়ে ফের নিশার গালে হাত রাখে।

নিশার শরীরে অদৃশ্য কাঁপুনি দিয়ে উঠে। সাইফকে এগুতে দেখে ভীত হয় সে। তার ক্লাসমেটদের টিফিন টাইমের আলাপন প্রায়ই শুনে সে। কিভাবে তাদের প্রেমিকরা হুটহাট তাদের অধরে কর্তৃত্ব চালায়। সেসব আলাপন শুনতেই সবসময় নিশার কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হতো। এই মুহুর্তে সাইফও যদি একই কাজ করার চেষ্টা করে নিশা ভীষণভাবে অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে।

কিন্তু নিশাকে ভুল প্রমাণ করে সাইফ তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। সঙ্গে সঙ্গে নিশা চোখ জোড়া বুজে নেয়। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে হাসি। ভুল মানুষকে সে হ্যাঁ বলে নি। মানুষটা ভুল নয়।

সাইফ ফিসফিসিয়ে বলে,

“ এই শেকড় কখনো ছাড়ছি না। “

সাইফের এরকম ফিসফিসিয়ে বলা কথায় নিশার অদ্ভুৎ মৃত্যু হয়। আজনমের অনুভূতিময় মৃত্যু।

__________

চার সিঁড়ি সমান পোর্চের রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বাণী। দিঘির মতো শীতল দৃষ্টি মেলে দেখছে উঠোন জুড়ে দৌড়ে বেরানো বহ্নিকে। ছোট শুভ্র দেহে শোভা পাচ্ছে কালো ফ্রকটা। তার উপর রয়েছে সাদা কার্ডিগান। ঘাড় সমান চুলগুলোকে পরিপাটি করে আঁচড়ে একটা কালো রাউন্ড ব্যান্ড পড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মাথায়।

পরিহিত জামা কাপড় গুলো কিছু নতুন শপিং ব্যাগে করে বাণীর নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়েছে আজ দুপুরে। বাণী দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো। ব্যাগের ভেতর কি আছে তা চেক করবে কি-না তা নিয়ে বেশ সংশয়ে ছিলো। তাকে সেই সংশয় থেকে উদ্ধার করতেই হয়তো মেজর শাহরিয়ার দূর্জয় তখন ছোট করে ম্যাসেজ পাঠায়,

“ এতো ভাবাভাবির কিছু নেই। পারসেলটা তোমার উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছি। ভেতরে যা আছে তা তোমাদেরই। “

আচমকা বহ্নির ডাকে বাণীর ধ্যান ভাঙ্গে,

“ মাম্মা, লুক! “

বাণী পোর্চ ছেড়ে উঠোনে নেমে আসে। বহ্নির কাছে এগিয়ে যায়। বহ্নি খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিলো উঠোনে অযত্নে বেড়ে উঠা একটা ফুল গাছকে। যেই গাছে কিনা হালকা বেগুনি রঙের তিনটে ফুল এসেছে। বাণী কাছে আসতেই বহ্নি প্রশ্ন করে,

“ এই ফুলের নাম কি মাম্মা? “

বাণী ফুলটাকে দেখে। কিন্তু বহু ভেবেও এর নাম মনে করতে পারে না। অবশ্য তার কখনো ফুলের প্রতি আগ্রহ ছিলও না তেমন একটা। গোলাপ, শাপলা, কৃষ্ণচূড়া এমন চার পাঁচটে ফুল ছাড়া আর কোনো ফুলের নাম জানে না সে। বাণী হতাশ গলায় বলে,

“ আমার জানা নেই মা। “

বহ্নি কিছুক্ষণ ভেবে বলে,

“ আমরা মেজরকে কল করে জিজ্ঞেস করি? “

বাণী মাথা নেড়ে বলে,

“ মেজর ব্যস্ত মা। “

বহ্নি আবার ফুল নিয়ে খেলতে থাকে। আচমকা বাণীর চোখ পড়ে উঠোনের লোহার গেটটের অপর পাশে। রাস্তার অপর পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন পুরুষ। কেমন এক দৃষ্টি মেলে বাণী আর বহ্নির দিকে তাকিয়ে ছিলো। বাণী তাকাতেই সঙ্গে সঙ্গে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। দ্রুত আড়াল হয়ে যায় ঝোপঝাড়ের ভীড়ে।

দৃশ্যটুকু দেখতেই বাণী ভীত হয়। দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। বহ্নির হাত ধরে টেনে তাড়া দিয়ে বলে,

“ সন্ধ্যা নেমে আসছে। ভিতরে চলো। “

বাড়ির ভেতর প্রবেশ করেই দ্রুত দরজা জানালা আটকে দেয় বাণী। নিজের ফোন হাতে নিয়ে দ্রুত কন্ট্যাক্ট লিস্টে যায়। ইংরেজিতে Durjoy লিখে সেভ করা নাম্বারটায় ডায়াল করে। এটা দূর্জয়ের ব্যক্তিগত নাম্বার। আরো একটা নাম্বার আছে বাণীর কাছে। সেটা Major Durjoy লিখে সেভ করা।

ফোন রিং হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কল রিসিভ হয়। বাণী ভীত গলায় বলে,

“ বাড়ির বাহিরে কেউ আছে। নজর রাখছে আমাদের উপর। “

কথাটুকু শুনে দূর্জয় বলে,

“ শান্ত হও। কি হয়েছে বলো। “

বাণী দ্রুত পুরো ঘটনাটুকু বলে। কিভাবে লোকটা দূর থেকে তার আর বহ্নির উপর নজর রাখছিলো, বাণীকে তাকাতে দেখেই কিভাবে আড়াল হয়ে পড়েছে। পুরোটা বলে। সব শুনে দূর্জয় শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,

“ লোকটা দেখতে কেমন? “

“ গায়ের রঙ কালো। হাইট হয়তো ৫’৯ হবে। মুখে গোফ আছে। সঙ্গে কপালের একপাশে… “

“ কাটা দাগ আছে তাই-তো? “

বাণী ত্রস্ত গলায় বলে,

“ হ্যাঁ, হ্যাঁ। “

হঠাৎই বাণীর সম্বিত ফিরে। সে প্রশ্ন করে,

“ তুমি কিভাবে জানো? “

“ ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওইটা আমার লোক। মাসুদ। “

বাণী যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচে। সে দাঁড়ানো থেকে ধপ করে সোফায় বসে পড়ে। বহ্নি তার কাছেই ছিলো। সে বাণীকে এভাবে বসতে দেখে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে মাম্মা? “

ফোনের অপর পাশ হতে দূর্জয় বহ্নির কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। নরম স্বরে প্রশ্ন করে,

“ বহ্নি পাশে আছে? “

“ হু। “

“ কথা বলা যাবে? “

বাণী সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা এগিয়ে বহ্নির কাছে দিয়ে বলে,

“ মেজর, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। “

বহ্নি উৎফুল্ল হয়ে ফোনটা নিয়ে কানে চেপে ধরে,

“ ইয়ো মেজর! “

আদুরে স্বরের ব্যতিক্রমী সম্বোধন শুনে ফোনের অপর পাশের মানুষটা শত ব্যস্ততার মধ্যেও মৃদু হাসে।

__________

দু'জন নারীর হাসির শব্দে কেবিনটা মুখোরিত। বেডে হেলান দিয়ে বসে ভ্রু কুচকে সেই দৃশ্য দেখছে প্রত্যয়। মেজাজটা তার বেজাই খারাপ। অসহ্যকর মেয়েটা সারাদিন জুড়ে সবার এটেনশন

সিক করে যাচ্ছে। অসুস্থ প্রত্যয়, সবার উচিত প্রত্যয়ের দিকে ধ্যান দেওয়া, কিন্তু তার আব্বু আম্মু তিন বেলা খাবারের সঙ্গে এক প্লেট করে নিজেদের এটেনশন এই মেয়েটাকে বিলিয়ে যাচ্ছে।

প্রত্যয় আপন মনে বিড়বিড়িয়ে উঠে,

“ এই সুযোগ দেওয়া, সুপাত্রী হওয়া এইসব তোমার নাটক, আমি ভালো করেই জানি। “

তার বিড়বিড়িয়ে বলা কথাগুলো অস্পষ্ট ভাবে জেসি আর ফিজার কানে পৌঁছায়। তারা নিজেদের আলাপ থামিয়ে প্রত্যয়ের দিকে ফিরে তাকায়। ফিজা বেগম প্রশ্ন করে,

“ কিছু বলেছো বাবা? “

প্রত্যয় বিরক্তি নিয়ে জবাব দেয়,

“ আমি আর কি বলবো? তোমরা বলতে থাকো, আমি শুনি। তাছাড়াও এই কেবিনে বসে আর কি-ই বা করার আছে আমার? “

জেসি আর ফিজা আবার নিজেদের মতো গল্পে মেতে উঠে। আচমকা কল আসতেই ফিজা বেগম ফোন হাতে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। কেবিনে রয়ে যায় শুধুমাত্র জেসি। প্রত্যয় এবার বলে,

“ এসব নাটক করার জন্য আংকেলের সঙ্গে ব্যাক করো নি? “

জেসি অবাক হয়ে বলে,

“ নাটক করছি? তোমার কি আমাকে কোনো অভিনেত্রী মনে হয়? অবশ্য তোমার দোষ নেই, আমার ভিজুয়্যাল দেখতে কোনো এক্ট্রেসের থেকে কম নয়। “

প্রত্যয় রাগে চোখ পাকিয়ে তাকায়। জেসি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে হেলতে দুলতে প্রত্যয়ের বেডের পাশের টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। পানির বোতলটা নিয়ে পানি খেতে যাবে এমন সময় প্রত্যয় তার এক হাত শক্ত করে চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“ শুনো মেয়ে, আগামীকাল সকালেই চট্টগ্রাম ফিরে যাবে তুমি। তুমি আর তোমার নাটক দুটোই অসহ্যকর লাগছে আমার। আমি তোমাকে আর এখানে দেখতে চাই না। “

জেসিরও এই পর্যায়ে রাগ উঠে। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে যায় গতরাতে তার আব্বুর বলা কথা,

“ একটু দায়িত্ব নিতে শিখো। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে শিখো। বিশ্বাস রাখো এই দুটো জিনিস জীবনে ভালো থাকার মন্ত্র। “

জেসি নিজের রাগটুকুকে গিলে নেয়। উল্টো অন্য হাতে প্রত্যয়ের পাশে রেখে ঠেক দিয়ে সামান্য ঝুকে। অত:পর হাসি হাসি মুখ করে বলে,

“ শুনো ছেলে, তোমার প্রমোশন হয়েছে। কুত্তা থেকে সুপাত্র। ভাগ্য ভালো থাকলে ভবিষ্যতে আরো প্রমোশনের সুযোগ আছে তোমার। তুমি যদি কুত্তা থেকে সুপাত্রে প্রমোশন পেতে পারো তবে আমিও একদিন নাটকবাজ থেকে সুপাত্রীতে প্রমোশন পেতে পারি। ইউ নেভার নো। “

প্রত্যয় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে আচমকা। ধীর স্বরে প্রশ্ন করে,

“ হুট করে আমার পিছনে পড়লে কেনো? “

জেসি হেসে বলে,

“ অনেক ভেবে দেখলাম, যেই ছেলে বিপদ দেখেও যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালায় না সে ভবিষ্যতে আমাকেও ছেড়ে পালাবে না। এন্ড দ্যাটস হোয়াট আই ওয়ান্ট৷ প্রোপার কমিটমেন্ট। “

প্রত্যয় বলে,

“ দেশকে আমি ভালোবাসি, সে কারণে পালাই নি। কিন্তু তোমরা প্রতি আমার সেরকম কোনো অনুভূতি নেই। “

জেসি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গুণগুনিয়ে উঠে,

“ তু সাবার তো কার মেরি ইয়ার

যারা সাস তো লে দিলদার

চাল ফিকার নু গোলি মার

ইয়ার হে দিন জিন্দাই দে চার

হোলে হোলে হো যায়েগা পেয়ার। “

প্রত্যয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এই মেয়ে আর মাসুদ হলো একই জাতের। কখনোই ভালো হবে না।

__________

সৈন্যদের আওতায় কারাবন্দী হওয়াটা ভারী দূর্ভাগ্যকর এক বিষয়। কারণ সৈন্যরা কোনো আসামীকে বাগে পেলে কখনো তাকে নিজেদের খাস আপ্যায়ন হতে বঞ্চিত করে না। কারাগারে সেই আসামীকে বিভিন্ন পদ দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়। একেক পদের একেক স্বাদ। যেই আসামীর অপরাধের পরিমাণ যত বেশি তার আপ্যায়নের জন্য পদের পরিমাণও তত বেশি।

শরীরে তাজা ক্ষত নিয়ে মেঝেতে বসে আছে রক্তাক্ত দেহটা। শরীরের তাজা ক্ষতগুলো আজ সকালের আপ্যায়নেরই প্রমাণ। এতো আপ্যায়নের পরও দেহের মালিক ঝুকতে রাজি নয়। শরীরের যন্ত্রণা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নিচ্ছে তবুও সামান্য আরামের আশায় মেঝেতে শরীর এলাবে না।

আজকাল ঘুম হতে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করে সে। দু চোখ বুজলেই স্বপ্নের রাজ্যে একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় সে। গলা ফাটানো চিৎকারে চারিদকটা গুমোট করে তুলে সেই নবজাতক। কান্নার উৎস খুঁজতে গেলেই সে একটা খুড়ে রাখা কবরের ভেতর একটা লাশ দেখতে পায়। এক সুদর্শন যুবকের লাশ। কিছুটা ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখে সেই সুদর্শন যুবকের মুখখানা। সায়াহ্ন তালুকদার। বাণী তালুকদারের ভাই। আবারও চারিদিক থেকে ভেসে আসে সেই নবজাতকের কান্নার স্বর। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়ার পূর্বেই চারিদিকটা আঁধারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। স্বপ্নের ইতি টানতে ঘুম ভেঙে যায়।

সেলের বাহিরের করিডর ধরে কারো আগমনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পদধ্বনি তো তাই বলছে। হিরণ ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়। সেলের দরজাটা খুলে যায়। ভেতরে প্রবেশ করে মেজর শাহরিয়ার দূর্জয়। আজ আর ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় নেই। বরং ইউনিফর্মের জায়গায় গায়ে শোভা পাচ্ছে ফর্মাল শার্ট, প্যান্ট। হাত দুটো পকেটে গুজে হিরণকে ভালো করে দেখে সে। অত:পর বিদ্রুপ করে বলে,

“ ভেবেছিলি খুব বড়ো তীর মেরে ফেলেছিস, তাই-না? কিন্তু আফসোস তোর চক্রান্ত ধূলিসাৎ হয়েছে। আল্লাহর রহমতে একজন সিভিলিয়ানেরও রক্ত ঝরে নি। “

হিরণ হাসে। অদ্ভুৎ সেই হাসি। গাল জুড়ে দাঁড়ি গুলো অনেকটাই ঘন আর বড়ো হয়েছে তার। বহ্নি এই অবস্থায় তাকে দেখলে নিশ্চয়ই চোখ মুখ কুচকে বলতো,

“ ইয়াক পাপা। তোমাকে মনস্টারের মতো দেখাচ্ছে। “

দূর্জয় হিরণের হাসি দেখে। বুঝতে পারে না এই হাসির কারণ। হিরণ এমনই। কঠিন অবস্থায়ও বেহায়ার মতো হাসিটা তারা স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। দূর্জয় আর ঘাটায় না। অসভ্যটার শাস্তি এখন আদালত ঠিক করবে। কিছুদিনের মধ্যেই একে আদালতে চালান করে দেওয়া হবে।

দূর্জয় বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলেই পিছন থেকে হিরণ আস্তে করে বলে,

“ গতকালের এট্যাকটা কি আসলেই ডুমস ডের এট্যাক ছিলো মেজর দূর্জয়? “

দূর্জয় থামে। অদ্ভুৎভাবে পিছনে ফিরে তাকায়। হিরণ এক হাতের সাহায্যে নিজের ঘাড়ের পাশটা মালিশ করতে করতে বলে উঠে,

“ প্রত্যেকটা সিনেমাই রিলিজ পাওয়ার আগে একটা ট্রেলার রিলিজ হয়। তা জানেন তো মেজর দূর্জয়? “

সূক্ষ্ণ ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে দূর্জয় যান্ত্রিক বস্তুর মতো অনড় হয়ে তাকিয়ে রয়। হিরণ আপনমনে নিজের মতো শিস বাজাতে থাকে। এই সুরটা তার খুব প্রিয়। ছোটবেলা থেকে এই শিসের সুর দ্বারা সবাই হিরণকে চিনে। বাণীও চিনতো। সুরটা শুনতেই কেমন ভয়ে সিটিয়ে যেতো।

দূর্জয়ের মস্তিষ্কের ভেতরটা আচমকা দপদপ করে উঠে। মনে পড়ে যায় বহ্নির বলা কথাগুলো।

“ পাপা মাম্মাকে অনেক জোরে মারছিলো। দেয়ালে মাম্মার মাথা ধরে হিট করছিলো। মাম্মার নাক দিয়ে রক্তও পড়ছিলো। “

দূর্জয় রাগটুকু আর সংবরণ করে না। হিংস্র বাঘের ন্যায় এগিয়ে যায়। হিরণের মাথার চুলগুলোকে এক থাবায় মুঠি করে ধরে দেয়ালে সোজোরে আঘাত করা শুরু করে। হিংস্র স্বরে বলে উঠে,

“ একজন সৈন্য শহীদ হয়েছে কাল। নিজের দেশের সাথে বেইমানি করছিস জানোয়ারের বাচ্চা। দেশটা আর দেশের মানুষ গুলো কি ক্ষতি করেছে তোর? টেল মি! “

হিরণ জবাব দিতে পারে না। প্রতিটা আঘাতে মাথাটা ভনভন করছে তার। দূর্জয় আবার বজ্রস্বরে বলে উঠে,

“ কারমা বলতে কিছুতে বিশ্বাস করিস? কাল তা-ই হয়েছে। তুই যখন শপিং মলে বিস্ফোরণ ঘটানোর আনন্দ উদযাপন করছিলি, ঠিক ওই সময় বাণীর এপার্টমেন্টেও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে। আগুনে দাউদাউ করে সব পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছে। “

তীব্র মাথার যন্ত্রণার মধ্যেও দূর্জয়ের বলা কথা গুলো হিরণের কানে এসে পৌঁছায়। মুহুর্তেই তার বুক জ্বলে উঠে। সে হতবিহ্বল হয়ে চোখ মেলে তাকায়। যন্ত্রণা ভরা গলায় জানতে চায়,

“ আমার বাণী? আমার মেয়ে? ওরা ঠিক আছে? “

দূর্জয় হিরণের প্রশ্নের জবাব দেয় না। আরো জোরে দেয়ালের সঙ্গে মাথায় দুটো আঘাত করে। এই পর্যায়ে হিরণের মাথা ফেটে পিছন দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। দেয়ালে সেই রক্তের ছাপ দেখা যায়। হিরণের সেসব দিকে খেয়াল নেই। সে ত্রস্ত গলায় প্রশ্ন করে,

“ এন্সার মি। ওরা কেমন আছে? “

দূর্জয় নিজেকে ধাতস্থ করে হিরণকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। হিরণ তখন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বাণী আর বহ্নির অবস্থা জানতে চাইছে। দূর্জয় শীতল হয়ে কিছুক্ষণ হিরণের পানে তাকিয়ে থেকে বড়ো বড়ো কদম ফেলে সেল থেকে বেরিয়ে যায়। কিছু মানুষের শাস্তি ও যন্ত্রণা এমনই হওয়া উচিত।

সেলের ভেতর থাকা হিরণ তখন পাগল প্রায়। আগুনে বাণী এবং বহ্নির পুড়ে যাওয়ার দৃশ্যটুকু চোখের সামনে ভেসে উঠতেই চিৎকার করে জানতে চায়,

“ পায়ে পড়ি দূর্জয়। প্লিজ টেল মি। টেল মি ওরা ঠিক আছে। “

__________

রাতের খাবার সেড়ে রান্নাঘরে নিজের আর বহ্নির প্লেট ধুয়ে রেখে বের হয় বাণী। রুমে ফিরে আসতেই দেখে বহ্নি নেই। সে অবাক হয়। মেয়েটা আবার কোথায় গেলো? চারিদিকে চোখ বুলিয়ে খুঁজে। কোথাও নেই। বাণী রুম থেকে বেরিয়ে লিভিং রুমে যেতে নিলেই লক্ষ্য করে দূর্জয়ের রুমের দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। মুহুর্তেই বাণীর বুক ধক করে উঠে। বহ্নি ওই রুমে যায় নি তো আবার? দূর্জয় রুমের দরজা কেবল নব দ্বারা আটকে গিয়েছিলো। লক করে নি। হয়তো এই ভরসায়ই যে বাণী আর বহ্নি তার ব্যক্তিগত রুমে উঁকিঝুঁকি দিবে না। এখন? এখন বাণী কি জবাব দিবে?

বাণী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। সম্পূর্ণ পরিপাটি ছিমছাম করে গুছানো একটা রুম। কিন্তু বাণীর চোখ আটকায় আলমারির সামনে মেঝেতে বসে থাকা বহ্নির পানে। মুহুর্তেই বাণী স্থবির বনে যায়। বহ্নির কোলের গিটারটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়। অস্ফুটে বলে,

“ অসম্ভব। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন