ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৫৪তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫৪.

হিরণ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় আচরণ করছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ভয়ংকর এক দৃশ্য। আগুন। উত্তপ্ত আগুনে ঝলসে যাচ্ছে চারিপাশ। সেই আগুনের ভেতর থেকে চিৎকার করছে বাণী আর বহ্নি। ইতিমধ্যে তাদের চেহারা লাল বর্ণ ধারণ করেছে। শুভ্র দেহী মেয়ে দুটোর শরীর পুড়ে ধীরে ধীরে কালচে হয়ে যাচ্ছে। বাকিটা… বাকিটা আর ভাবতে পারে না হিরণ। দু'হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে।

মাথায় আঘাতের যন্ত্রণা তাকে একটুও পীড়া দিতে পারছে না। যতটা পীড়া তাকে অন্তরের দহন দিচ্ছে। হিরণ হাসফাস করে। অক্সিজেনের অভাববোধ করছে সে। চারিদিকে এলোমেলো দৃষ্টি মেলে তাকায়। কাউকে পায় না। জীবনে প্রথম বারের মতো উপলব্ধি করে, সে বড্ড অসহায়। কাকে ডাকবে সে সাহায্যের জন্য? কে তাকে সাহায্য করবে? কেউ না। ইহজগতের কাছে সে ঘৃণিত এক চরিত্র। উপরওয়ালা? সেসবে তো হিরণ কখনো বিশ্বাসই করে না।

তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে হিরণ দু হাতে মাথার চুল চেপে ধরে মেঝেতে গা এলিয়ে দেয়। পুরো শরীরটা কুজো করে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। অদ্ভুৎ করুণ আর্তনাদ করে উঠে সে। সেই আর্তনাদের স্বর পৌঁছে যায় চার দেয়াল ভেদ করে সেলের বাহিরে। দু জন নিরাপত্তা কর্মী বাহির থেকে বিস্ময়কর দৃষ্টি মেলে দেখে সেই দৃশ্য। মনে মনে প্রশ্ন জাগে কি হয়েছে এই লোকটার? প্রতিদিন তো এই লোকটাকে কতই না শারীরিক আঘাত দেওয়া হয়। তখন তো এভাবে দুনিয়া কাঁপানো আর্তনাদ করে না। আজ কি হলো?

হিরণের চিৎকার প্রতিটা দেয়ালে ঝংকার তুলে। যে-কেউ শুনলে মনে করবে যেনো কোনো নিকৃষ্ট পাপীকে জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছে। সেই দমফাটা চিৎকারে বিরক্ত হয় নিরাপত্তা কর্মীরা। তিন জন ভেতরে প্রবেশ করে। রাগী স্বরে ধমকে হিরণকে চুপ হতে বলে। হিরণের মস্তিষ্কে সেসব কথা পৌঁছায় না। নিরাপত্তা কর্মীরা বিরক্ত হয় এবার পড়ে থাকা দেহটাকে শক্ত বুট শুয়ের আঘাতে দমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু একটা লাত্থিও হিরণকে স্পর্শ করছিলো না। সে জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন এই মুহুর্তে। মনে হচ্ছে তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মানুষ দুটো আর নেই এই ভাবনাটুকুই যথেষ্ট হিরণের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে। হিরণের চিৎকার ধীরে ধীরে থামে। চোখ জোড়া বুজে পড়ে রয় সে। চোখের সামনে ভেসে উঠে অতীত।

কোনো এক বৃষ্টিস্নাত মধ্য রাতের ঘটনা। হিরণ নিজের রুমে সোফায় বসে ছিলো। পাশের রুম হতে ভেসে আসছে বাণীর চিৎকার। দু'হাত পা বাধা অবস্থায় তড়পাচ্ছে, চিৎকার করছে। সেই চিৎকার হিরণ নীরবে শুনে। তবে তার কাছে করার মতো কিছুই ছিলো না। ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট তখন বাণী। সামান্য সুযোগ পেলেই আত্মহত্যার চেষ্টা করে। সারাটা দিন তাকে প্রতিহত করাটা অসম্ভব ছিলো হিরণের কাছে। বাধ্য হয়ে এই পন্থা।

ধীরে ধীরে চিৎকারের মাত্রা কমে আসে। হিরণ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ঘুমিয়ে পড়েছে কি-না দেখার জন্য পাশের রুমের দিকে পা বাড়ায়। রুমে যেতেই দেখতে পায় বাণী বিছানার সঙ্গে লেপ্টে আছে। এখন আর হাত পা ছোড়াছুঁড়ি করছে না। ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে হিরণ এগিয়ে যায়, গায়ে কম্বল টেনে দিতে। কিন্তু কাছে যেতেই টের পায় বাণী ঘুমায় নি, বরং নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। অদ্ভুত ভঙ্গিতে এলোমেলো নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

হিরণ ত্রস্ত হয়ে এগিয়ে যায়। দ্রুত ভঙ্গিতে বাণীর হাত ও পায়ের বাধন খুলে দেয়। হাত ছাড়া পেতেই বাণী দু'হাতে সামান্য উঁচু পেটটা খামচে ধরে ছটফট করতে থাকে। চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে অস্ফুটে মা বলে কাঁদতে থাকে। হিরণ অস্থির হয়ে উঠে। বাণীকে আঁকড়ে বুকে নিয়ে নেয়। চিন্তিত স্বরে জানতে চায়,

“ ব্যথা করছে? ডাক্তার ডাকবো? “

নিস্তেজ বাণী তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও জেদ দেখিয়ে নিজেকে হিরণের থেকে ছাড়িয়ে নেয়। বসে কুজো হয়ে ছটফট করতে থাকে। হিরণ বাণীর মুখোমুখি হয়ে বসে। তার চোখ ছলছল করছে। বাণীকে ধরারও সাহস পাচ্ছে না। অতিরিক্ত চেঁচামেচির ফলে সাময়িক পেট ব্যথা উঠেছিলো। ধীরে ধীরে ব্যথাটা কমে আসতেই বাণী পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। হুশ ভুলে অসাড় দেহটা সামনের দিকে সামান্য ঝুকে। মাথাটা গিয়ে ঠেকে হিরণের বুকে। হিরণ আগলে ধরে। হুশ থাকলে বাণী কখনোই এই কাজটা করতো না। তবুও হিরণ প্রশান্তি অনুভব করে। সেই সঙ্গে সূক্ষ্ণ ব্যথা। ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে সে বাণীর হাত পায়ের দিকে তাকায়। বেধে রাখার ফলে লাল, কালসিটে মিলিয়ে দাগ পড়ে গিয়েছে। হিরণ পাথরের ন্যায় বসে রয়। বাণীর গায়ের আঘাতের দাগ গুলো তার ভালোবাসার গালে সজোরে চড়ের ন্যায় ছিলো। চোখে আঙুল দিয়ে হিরণকে বলছিলো,

“ তোর ভালোবাসা এই মেয়েটার জন্য কতটা সঙ্গিন তা দেখে নে। “

অতীত থেকে বেরিয়ে আসে হিরণ। অবচেতন মন আওড়ায় তার ভালোবাসা কেবল বাণীর জন্য সঙ্গিন ছিলো না, বরং তার জন্যেও সঙ্গিন। এতটাই সঙ্গিন যে, হিরণের জীবন মরণ এখন ওই দুটো মানুষের অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে।

__________

মেজর দূর্জয়ের জরুরী তলবে পাঁচজন লেফটেন্যান্ট এসে উপস্থিত হয়েছেন মিটিং রুমে। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলো জুলফিকার মুজতবা সহ আরো বেশ ক'জন সিনিয়র কর্ণেল। প্রত্যেকের চোখে মুখে উৎকণ্ঠা। সকলে এসে উপস্থিত হতেই জুলফিকার বলেন,

“ বলো দূর্জয়। কি বলবে বলে সবাইকে ডেকেছো তুমি? “

দূর্জয় কোনো ভনিতা না করে স্পষ্ট গলায় বলে,

“ বসুমতী শপিং কমপ্লেক্সের এট্যাকটা ট্রেলার ছিলো, মূল এট্যাক এখনো পেন্ডিং অবস্থায় আছে। “

সবাই বিস্মিত হয়। একজন কর্ণেল বলে উঠে,

“ কি বলছো তুমি এসব? “

দূর্জয় কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে ডেস্কের ওপর থাকা একটা ল্যাপটপ ওপেন করে একটা ভিডিও প্লে করে। স্ক্রিনে ভেসে উঠে সিসিটিভি ফুটেজের নির্দিষ্ট সময়ের ক্লিপ। ফুটেজটা হিরণকে যেই সেলে রাখা হয়েছে সেখানকার চিত্রপটের। সম্পূর্ণ ক্লিপটুকু দেখতেই সৈন্যরা থমথমে মুখে একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করে।

সিনিয়র একজন কর্নেল চিন্তার ভারটুকু বইতে না পেরে বসে পড়েন। শান্ত স্বরে বলে,

“ এর শেষ কোথায়? দেশটা এদের কি ক্ষতি করেছে? জনগণ বিশ্বাস হারাতে বসেছে আমাদের প্রতি। ওরা এটা দেখবে না যে আমাদের বাহিনী কতো গুলো রাত নির্ঘুম পাড় করছে তাদের জীবন রক্ষার জন্য। ওরা শুধু জানবে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতেও গাদ্দাররা দেশের মাটিতে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। “

দূর্জয় শীতল গলায় বলে,

“ ইনশাআল্লাহ আমরা সবটা সামলে নিবো স্যার। “

সাদাতও পেছন থেকে বলে উঠে,

“ জি স্যার। শপিং কমপ্লেক্সের হামলাটার মতো এই হামলাও আমরা সফল হতে দিবো না। “

সাঈফ ভ্রু কুচকে বলে,

“ একটাও ক্লু রাখে নি ওরা। খুব পাকা খেলোয়াড়। যতবার আমরা এদের আস্তানা খুঁজে বের করার জন্য কোনো ক্লু ধরে এগিয়েছি ততবারই বিফল হয়েছি। “

জুলফিকার মুজতবা গম্ভীর স্বরে বলে,

“ কারণ সেই ক্লু গুলো হিরণের মর্জিতেই সাজানো। যেনো আমরা সেই ক্লু ফলো করে নিজেদের সময় অপচয় করি। যাদের দিয়ে ও আসল হামলাটা করানোর ফন্দি এঁটেছে তাদের আস্তানার কোনো হদিস খুঁজে পাওয়ার উপায় রাখে নি সে। “

সাইফ বিজ্ঞের ন্যায় জুলফিকার মুজতবার কথা শুনে। এরকম একটা সিরিয়াস সিচুয়েশনেও ভবিষ্যৎ শশুরের কথায় মুগ্ধ না হয়ে পারে না সে। জুলফিকার স্যার একদম তার মতোই চতুর, সহজে মোদ্দা ধরতে পারে। ইয়াসমিনকে প্রশ্ন করতে হবে, তিনি কি সবসময় নিজের আব্বুর মতো কাউকেই জীবন সঙ্গী হিসেবে চাইতো কি-না? নাহলে শশুর জামাই ইকুয়্যাল লেভেলের বুদ্ধিমান কিভাবে হবে?

দূর্জয় বলে,

“ প্রতিটা বিভাগে অবস্থানরত সৈন্যদের এলার্ট করতে হবে আমাদের। আসন্ন বিপদ ঠেকাতে সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বন্ধ বাড়ানোর জন্যও আপিল করতে হবে। রাজধানীর প্রতিটা পয়েন্টে নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরী। আমার মনে হয়, হিরণের টার্গেট হবে অতিরিক্ত জনবহুল জায়গা গুলো। যত বেশি মানুষের জীবন ঝুঁকিতে থাকবে, ততই তৃপ্তি পাবে ও৷ “

সকলে দূর্জয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে। সৈন্যরা নিজেদের মধ্যে আরো গুরুত্বপূর্ণ আলাপে মনযোগী হয়। তাদের ফুরসত নেই। মস্তিষ্কে আর পিঠে খুব ভার বয়ে বেড়াচ্ছে তারা। এতগুলো মানুষের ভরসার ভার, এতগুলো মানুষের জীবনের ভার। সবটা তাদের দায়িত্ব এখন। যেকোনো মূলেই একটা বড় অঘটন তাদের রুখতে হবে।

__________

মিটিং সেড়ে কেবল বের হলো সাদাত। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ঘরে মা'কে কল করবে বলে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দেখে একটা আননোন নাম্বার হতে ন বার মিসড কলের নোটিফিকেশনটা জ্বলজ্বল করছে। সাদাত ভ্রু কুচকে তা দেখে। সর্বশেষ কলটা এসেছে ঠিক সাতাশ মিনিট আগে। সাদাতের ফোনটা সাইলেন্ট মুডে ছিলো বলে সে টের পায় নি।

গুরুত্বপূর্ণ কোনো কল হতে পারে ভেবে সে কল ব্যাক করে। মিনিট গড়ানোর পূর্বেই কলটা রিসিভ হয়। অপরপ্রান্ত হতে একটা ক্যাটক্যাটে নারী স্বর বলে উঠে,

“ এই ছেলে, কতক্ষণ ধরে ফোন দিচ্ছি তোমাকে! রিংটোনের আওয়াজ কি কানে পৌঁছায় নি তোমার? “

সাদাত বিস্মিত হয়ে ফোনটা কানের থেকে একহাত দূরে সরিয়ে ধরে। কণ্ঠটা এবং কথার ধরণটা চিনতে ভুল করে না সে। এই ধমকাধমকিটা না দেশ ছেড়ে বিদায় হয়েছিলো? আবার এই দেশের মাটিতে ফিরে এসেছে কি সেকেন্ড হ্যান্ড এম্বারাসমেন্ট এবং প্যানিক এট্যাক দিয়ে সাদাতের জীবনটা আঙ্গার করতে? সাদাত বিস্ময়তা কাটিয়ে ফোনটা কানে চেপে ধরে শান্ত স্বরে শুধায়,

“ ফোন সাইলেন্ট ছিলো। বলো, কেনো কল দিয়েছো? “

বিরক্ত এবং রাগ মিশ্রিত স্বরটা অপর পাশ হতে আবার ধমকে উঠে,

“ এয়ারপোর্টে আছি আমি। তোমার দেশের এয়ারপোর্ট কতৃপক্ষ আমার লাগেজটা হারিয়ে ফেলেছে। ভাবা যায় কতটা ইরেস্পন্সিবল? আই উইল স্যু দেম। “

সাদাত দ্বিতীয় দফা অবাক হয়। এই মহিলার লাগেজ হারানো গিয়েছে এতে সাদাতের কি করার থাকতে পারে? সাদাত তো আর এয়ারপোর্টের সর্বোচ্চ পদের অথরিটি নয়। তবে তার কাছে এরকম অভিযোগের মানে কি? সাদাত ভদ্র সুরে বলে,

“ ভুল নাম্বারে কল করেছো তুমি। তোমার উচিত এই ব্যাপারে বিমানবন্দর কতৃপক্ষের কাছে কমপ্লেইন করা। তাতেও কাজ না হলে থানায় গিয়ে জিডি করা। আ'ম শিওর কোথাও না কোথাও থেকে অবশ্যই তুমি হেল্প পাবে। “

“ এক্সকিউজ মি! ইউ থিংক আমি এখন এয়ারপোর্ট থেকে থানায় চক্কর কাটবো? এতটুকু ম্যানারস নেই তোমার মধ্যে! ওহ গড! এই ছেলে তুমি ভুলে গিয়েছো, চার মাস আগে জঙ্গলে আই সেভড ইউ? আমি না থাকলে ওই জোকটা তোমার শরীরের সকল রক্ত পান করে নিতো। তারপর… “

সাদাত ফোঁড়ন কাটে,

“ এনাফ! যথেষ্ট হয়েছে। আসছি আমি। কত নাম্বার টার্মিনালে? “

কথাটুকু শেষ করেই দ্রুত রওনা হয় সাদাত। আর কিছুক্ষণ দেরি করলে দেখা যাবে এই মহিলা পুরো এয়ারপোর্ট মাথায় তুলে ফেলেছে!

__________

রাতের শেষ ভাগ। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সুহালা বেগমের পাতলা ঘুমটা আচমকা ভেঙে যায়। অনুভব করে ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে তার। খুলে রাখা চুলগুলো খোপায় বেধে তিনি রুম থেকে বেরিয়ে আসে। নিচে নেমে রান্নাঘরের দিকে এগুতেই টের পায় রান্নাঘরের লাইটটা জ্বলছে। সুহালা বেগমের ভ্রু কুচকে আসে। তিনি ধীরপায়ে হেঁটে রান্না ঘরে পা রাখতেই দেখেন একজন যুবক ক্যাবিনেটের সামনে একটা কফির জার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। জার হতে চামচে কফি তুলে মগে মেশাচ্ছে। গায়ে তার কালো রঙা টি শার্ট আর ট্রাউজার কেবল। নিজের স্বাভাবিক বেশভূষা ছেড়ে হোম বয় লুকে আছে।

সুহালা বেগম বলেন,

“ আমাকে ডাকো নি কেন? “

দূর্জয় চমকায় না। কাজে মনযোগী থেকেই শান্ত গলায় জবাব দেয়,

“ কারণ বাবা ছোটবেলা থেকেই শিখিয়েছেন, মামণি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কখনো বিরক্ত না করতে। “

সুহালা বেগম অভিমানী সুরে বলে,

“ বাবার শিখানো বুলি মনে আছে, শুধু আমার কথাই মনে নেই তাই না? “

দূর্জয় এবার হাতের জারটা রেখে ফিরে চায়। চোখে মুখে ক্লান্তির বদলে স্নিগ্ধতা। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। এগিয়ে এসে একহাতে মা'কে জড়িয়ে ধরে বলে,

“ আই মিসড ইউ এন্ড আই মিসড মাই হোম। “

সুহালা বেগম হেসে বলে,

“ তুমি গিয়ে বসো। আমি কফি বানিয়ে আনছি। “

দূর্জয় বাঁধ সেধে বলে,

“ আই ক্যান ডু দ্যাট মাইসেল্ফ। তুমি গিয়ে ঘুমাও এখন। কাল সকালে তোমাকে ব্যস্ত রাখবো আমি। সকালে যাওয়ার আগে তোমার হাতের নাস্তাটা মিস করতে চাই না। “

সুহালা বেগম অবাক হয়ে বলে,

“ কালই ফিরে যাবে তুমি? “

“ দশ-টা বাজে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। “

সুহালা বেগমের মন খারাপ হলেও তিনি এই ব্যাপারে আর কথা বাড়ায় না। এসবে অভ্যস্ত আছেন তিনি। তাই কেবল পানি খেয়ে নিজের রুমে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। যাওয়ার আগে ফিরে বলে উঠে,

“ তোমার ফুপ্পিকে আমি মানা করে দিয়েছি। হেনা আপার মেয়ের সঙ্গে আর ওই ব্যাপারটা আগাবে না সাফ জানিয়েছি। উনি ভালোই ক্ষেপেছেন আমার প্রতি। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, যে তিনি দেখতে চান আমার খুঁতখুঁতে স্বভাবের ছেলে কোন রাজকুমারীকে বউ করে আনবে। “

দূর্জয় এই কথার পিঠে কোনো প্রতুত্তর করে না। সুহালা বেগম নিজের মতো রুমে ফিরে যান। কফির কাপটা হাতে নিয়ে দূর্জয় নিজের রুমটায় ফিরে আসে। বারান্দায় গিয়ে রেলিঙের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। মনে মনে চলছে অদ্ভুৎ সব ভাবনা। সেল্ফ রিয়েলাইজেশন ব্যাপারটা তার রাতের ঘুম অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে বলা চলে। হাতে দুটো অপশন আছে তার। মনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দু'পা পিছিয়ে যাওয়া। আর নাহয় নিজের মনকে স্রোতের সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া। দূর্জয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কফির কাপে চুমুক বসিয়ে নিশুতি আকাশের পানে চায়। আকাশ যেনো সঙ্গে সঙ্গে দূর্জয়কে দেখে ঠাট্টার সুরে বললো,

“ প্রকৃতি বড়ো অদ্ভুৎ দূর্জয়। তেরোটা বছর আগে যেই মেয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলো না তোমার, আজ সেই মেয়েটাই তোমার আগ্রহ, চিন্তা ও মায়ার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়রনি। “

দূর্জয় নীরব রয়। আকাশের দিকে নির্লিপ্ত তাকিয়ে রয়। তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে হাজারটা চিন্তা। অবাধ্য মন তাকে শাসায়,

“ শি ওয়াজ রেপড। “

দূর্জয় ক্ষীণ স্বরে বলে,

“ ওর দোষ নেই তাতে। “

মন দমে না। তাকে রিয়েলিটি চেক দিতে শুধায়,

“ তেরো বছর আগের বাণী এবং বর্তমানের বাণীর মাঝে আকাশ পাতাল ফারাক আছে দূর্জয়। শি ইজ সেন্সিটিভ। ইউ ক্যান্ট হ্যান্ডেল হার। “

দূর্জয় অস্ফুটে বলে উঠে,

“ আই উইল হ্যান্ডেল হার কেয়ারফুললি। “

অসভ্য মনটা ফের তাকে ছুড়ে দেয় আরেকটা ভাবনা,

“ ও একা নয়। একটা বাচ্চাও আছে ওর। “

এবার দূর্জয় আপনমনে পরিষ্কার গলায় বলে উঠে,

“ আই ক্যান হ্যান্ডেল বোথ অফ দেম ড্যালিকেটলি। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন