ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৫৭তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫৭.

টেবিলের উপর স্তুপ করে রাখা বাচ্চাদের পরীক্ষার খাতা। টিচারস রুমের প্রতিটা টেবিলেরই একই দশা। বাণী মনযোগ দিয়ে খাতা দেখতে ব্যস্ত। তার পাশেই আরেকটা চেয়ারে বসে ফোনে গেমস খেলছে বহ্নি। স্কুলে প্রতিদিন বহ্নিকে সঙ্গে করেই নিয়ে আসে বাণী। এছাড়া আর উপায় নেই তার। যতক্ষণ ক্লাস টাইম চলে ততক্ষণ বহ্নিকে কলিগ ম্যামদের কেয়ারে রেখে যায়। যদিও এতে বাণীর মনে খচখচানিটা রয়েই যায়। তবুও এছাড়া আর কোনো পথ নেই তার কাছে।

দূর্জয়ের বাসা থেকে পরশুদিন চলে এসেছে সে। যদিও সেদিন রাতে দূর্জয় তার পিছু পিছু এসেছিলো গাড়ি নিয়ে। অত:পর নিজেই তাকে নতুন বাসায় এনে ড্রপ করে দিয়ে গিয়েছিলো। তারপর আর দূর্জয় বাণীর সামনে আসে নি। কলও দেয় নি একবারও।

কিন্তু পরের দিন সকালেই তার বাড়ির দ্বাড়ে একটা ফার্নিচার কোম্পানির কিছু লোক এবং দু'জন ইলেক্ট্রিশিয়ান এসে হাজির হয়। বাণী বাকরুদ্ধ হয়ে একবার লোকগুলোকে দেখে অত:পর বারান্দায় ছুটে যায়। বারান্দা হতে দেখে নিচে একটা বিশাল ট্রাক বোঝাই করে বাসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সকল ফার্নিচার আনা হয়েছে। বাণী লোকগুলোর কাছে জানতে চেয়েছিলো এসব কে পাঠিয়েছে। দূর্জয়ের নাম শুনেই সে একপ্রকার ক্ষেপে দূর্জয়কে কল করেছিলো। দূর্জয় তখন বেশ ঠান্ডা গলায় বলে,

“ আপাততর জন্য সাহায্য গ্রহণ করো। প্রতি মাসে নাহয় একটু একটু করে পরিশোধ করে দিও। তবুও জেদ দেখিও না এই মুহুর্তে। “

দূর্জয়ের কথার পিঠে বাণী চুপ হয়ে গিয়েছিলো। ওই মুহুর্তে সাহায্যটুকু গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিলো না তার। নিজের কাছে যত টাকা ক্যাশ ছিলো তা কেবল বাজার করেই শেষ হয়ে যেতো। তাই মনে মনে ঠিক করে প্রতি মাসে সে নিজের সাধ্য অনুযায়ী এই সাহায্য পরিশোধ করে দিবে।

খাতা দেখতে দেখতে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে বাণী। ব্যাচে আপাতত চার জন স্টুডেন্ট পড়ে তার কাছে। চারজনের গার্ডিয়ানই আপাতত বাণীর প্রতি সন্তুষ্ট। বাসায় বাড়তি কাজ না থাকায় দেখা যায় প্রায়ই বাণী অতিরিক্ত এক ঘন্টাও সবাইকে পড়িয়ে দেয়। তাই এই স্টুডেন্ট গুলো আপাতত হাত হাতছাড়া হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু দূর্জয়ের ওই টাকা পরিশোধের জন্য আরো তিন চারটে স্টুডেন্ট পেলে বাণীর সুবিধা হতো।

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় বাণীর মাথাটা হঠাৎ ভারী অনুভব করে। ঘাড়ের কাছটা কেমন ঝিমঝিম করছে। প্রেশারটা আবার ফল করেছে সম্ভবত। বাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বোতল থেকে কিছুটা পানি খেয়ে নেয়। এবরশনের পর থেকেই শরীরটা হুটহাট খারাপ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে প্রেশারটা। কন্ট্রোলেই থাকছে না একদম। এবরশনের কথা মনে পড়তেই বাণীর বাচ্চাটার কথা মনে পড়ে। সে অবহেলায় নিজের পেটের দিকে তাকায়। বাচ্চাটা থাকলে এখন কত মাস চলতো তার? চার মাস নাকি পাঁচ মাস? হিসাব খেয়াল নেই বাণীর। আজকাল বহু কিছুই খেয়াল থাকে না তার।

__________

ঘড়ির কাটা ঘুড়ছে আপন গতিতে। সময়ের সঙ্গে যেনো পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতের বৈরী হাওয়া। সেই হাওয়াটা গায়ে লেগে শরীরের প্রতিটা লোমকূপ ছুঁয়ে যাচ্ছে। ঘরময় ভর করছে এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা। ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাতের আকাশটা দেখছে প্রত্যয়। মনের মাঝে তার অদ্ভুৎ এক অস্বস্তি এসে ভীড় করেছে।

জেসি চট্টগ্রাম ছেড়েছে আজ সম্পূর্ণ একদিন হলো। এই একদিনে আর জেসির সঙ্গে কথা হয় নি প্রত্যয়ের। আজ সন্ধ্যায় প্রত্যয় মা'য়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছে যে ওই মেয়ের জ্বর নাকি এখনো কমে নি বরং ভালো করেই জেকে ধরেছে। খবরটুকু শুনে প্রত্যয়ের মনে হয়েছে একবার তার কল করে খবর নেওয়া উচিত। মানবতার খাতিরেই অন্তত্য। তবে পরমুহূর্তেই আবার মনের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছে।

এই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে প্রত্যয় অস্থির অনুভব করে। সেই অস্থিরতাটা মেটাতেই মনের সকল দ্বিধা একপাশে রেখে সে কল লিস্ট হতে slang user jesi লিখে সেভ করা নাম্বারটা ডায়াল করে। সময় গড়ায়। কলটা বেজে নিজস্ব সময়ের গন্ডি পেরিয়ে কেটে যায়। অপর পাশ হতে আর ফোনটা রিসিভ হয় না।

প্রত্যয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার আকাশ পানে তাকায়। খুব বেশিই কি অসুস্থ? পরমুহূর্তেই নিজেকে এই ভেবে শান্তনা দেয় যে, সে তো কল করেছে। কেউ অন্তত্য বলতে পারবে না যে প্রত্যয় অকৃতজ্ঞের মতো একটা বারও খোঁজ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কল দেয় নি।

নিজেকে এই বুঝ দিয়ে রুমের ভেতরে যাওয়ার জন্য প্রত্যয় পা বাড়ায়। ঠিক সেই মুহুর্তেই তার ফোনটা বেজে উঠে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখতে পায় জেসি কল ব্যাক করেছে। প্রত্যয় সামান্য গলা ঝাড়ে কলটা রিসিভ করে। স্পষ্ট গলায় বলে,

“ হ্যালো। “

অপর পাশ হতে ক্ষীণ জবাব আসে,

“ হাই। কেমন আছো? “

“ আলহামদুলিল্লাহ। তুমি? “

“ ভালো আছি। “

আর কোনো কথা খুঁজে পায় না প্রত্যয়। আবার সেই দমবন্ধকর অস্বস্তি তাকে জেকে ধরেছে। কি বলা উচিত এই সিচুয়েশনে তা-ও তার বিচক্ষণ মস্তিষ্ক ঠাওর করতে পারছে না। ফোনের অপর পাশে থাকা জেসি তখন নীরব। এই তীব্র জ্বরে তার মন কেমন যেনো ন্যাকা হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করছে যেনো প্রত্যয় কিছু বলুক। অন্তত্য চট্টগ্রামের বর্তমান আবহাওয়ার খবর নেওয়ার ছলেও কিছু বলুক।

বেশ কিছুক্ষণ গাঁইগুঁই করে প্রত্যয় বলে,

“ আচ্ছা। ডিস্টার্ব করার জন্য সরি। খেয়াল রেখো। বাই। “

বলেই ঠাস করে ফোনটা কেটে দেয় প্রত্যয়। জেসি অবাক হয়ে ফোনটা মুখের সামনে এনে স্ক্রিনের পানে তাকিয়ে রয়। তার ন্যাকা আত্মাটা আচমকা আরো ন্যাকামি করে বসে। চোখ টলমল করে উঠে। শরীরের দূর্বলতা, চট্টগ্রামের আবহাওয়া, ঢাকার বাসিন্দা ওই ছেলেটা সবকিছুই অসহ্যকর ঠেকছে তার। সে রাগে ফোস ফোস করতে করতে ফরহাদের নাম্বারটা ডায়াল করে। ফরহাদ কল রিসিভ করেই উৎফুল্ল গলায় বলে উঠে,

“ দোস্ত! এখন কেমন… “

বাকি কথাটা আর সম্পূর্ণ করতে পারে না ফরহাদ। তার আগেই জেসি আগুনের মতো গর্জে উঠে,

“ অসভ্য, ফাজিল, ইতর, কুত্তা, বান্দর। ভুলেও তুই আমার সামনে আসবি না আর কখনো। তোকে সামনে পেলে আমি টুকরা টুকরা করে একদম তোর শশুরবাড়ি পার্সেল করে দিবো। শালা জোচ্চোর কোথাকার। আই হেইট ইউ। “

বলেই ফোনটা কেটে দেয় জেসি। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ফরহাদ তখন হতভম্ব। সে আবার কি করলো? জেসি কাথা টেনে মুখ ঢেকে পড়ে রয়। ভাবী খাবারের জন্য ডাকতে এলেও সে রাগারাগি করে বলে খাবে না। কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার।

__________

ফিল্ডের সবুজ ঘাসের উপর বসে আছে সাইফ। আকাশ জুড়ে তখন তারার মেলা। ঘাসের ডগা গুলো শীতের কারণে শিশির জমে আদ্র হয়ে আছে। ফিসফিসিয়ে প্রেম আলাপে মগ্ন সাইফ। তার কথার স্বর আশেপাশের কোনো মানুষও শুনতে পারবে না, এতটা ক্ষীণ স্বরে বলছে। অবশ্য আশেপাশে খুব একটা মানুষও নেই। কেবল ফারদিন, জুনায়েদ এবং রাফিই রয়েছে। তারাও কিছুটা দূরে গোল হয়ে বসে উনো খেলছে।

আচমকা কথার মাঝে আরেকটা কল আসতে দেখে সাইফ ভ্রু কুচকে স্ক্রিনের পানে তাকায়। প্রত্যয়ের নামটা দেখতেই সে বিড়বিড়িয়ে বলে,

“ শালা সিঙ্গেলরা মিঙ্গেলদের সবথেকে বড়ো শত্রু। চব্বিশটা বছর সিঙ্গেল থাকার পর ফাইনালি জীবনে প্রেম আসলো। কিন্তু এই শালাদের যন্ত্রণায় সেটাও শান্তিতে করতে পারমু বইলা মনে হয় না। “

সাইফ নিশার থেকে বিদায় নিয়ে প্রত্যয়ের কলটা রিসিভ করে। সাইফ বলে,

“ তোর বিয়ের রাইতে যদি আমি প্রতি ৩০ সেকেন্ড পর পর তোর রুমের দরজা নক না করসি, তাহলে আমার নাম বদলায় আমি কুদ্দুস রাখমু। “

প্রত্যয় সাইফের কথায় তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে সিরিয়াস গলায় বলে,

“ আই নিড হেল্প দোস্ত। “

“ কি হইসে তোর? “

“ আমি একজনের সঙ্গে কথা বলতে নিয়েছিলাম। কিন্তু শুধু কেমন আছে জানতে চাওয়ার পর আর কথা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি না। মানে কথা খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু কথা না বললেও অস্থির লাগছে। মোটকথা খুব দ্বিধার মাঝে আছি। এটা কি কোনো সিরিয়াস সমস্যা? “

সাইফ ভ্রু কুচকে পুরোটা শুনে। পরপর সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,

“ তুই কি ঝগড়াঝাটি ভাবীর কথা বলতেসিস? “

প্রত্যয় বিরক্তি নিয়ে বলে,

“ ওর নাম জেসি। এসব ঝগড়াঝাটি ভাবী আবার কেমন শব্দ? “

সাইফ সুর টেনে বলে,

“ ওহ আচ্ছা। “

প্রত্যয় বলে,

“ যা জিজ্ঞেস করেছি তা বল। “

সাইফ সিরিয়াস গলায় বলে,

“ তোর কথা শুনে যা বুঝলাম, লক্ষ্মণ ভালো না। খুব সিরিয়াস একটা সমস্যা এটা। “

প্রত্যয় বিস্ময় নিয়ে বলে,

“ কি সমস্যা এটা? “

“ দিজ ইজ লাভ বন্ধু। “

প্রত্যয় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,

“ ভালো হবি না তুই। “

বলেই প্রত্যয় ফোন কেটে দেয়। সাইফ হতাশ গলায় আকাশ পানে তাকিয়ে বলে,

“ হে খোদা, দুনিয়ায় তুমি আমার আশেপাশে মানুষ রূপী একদল বলদ পাঠাইলা। আর এদের পথ দেখাইতে আমারে পাঠাইলা। কিন্তু শালারা একটাও আমার কথা সিরিয়াসলি নেয় না। এতে আমার কি দোষ? দুনিয়ায় বুদ্ধিমানের কদর দিন দিন কমে যাইতেসে। “

__________

রাত তখন ক'টা বাজে কে জানে। ঘুমে আচ্ছন্ন বাণী হঠাৎ ঘামতে শুরু করে। তীব্র শীতের মাঝেও তার পুরো শরীর ঘামছে। দুই চোখ খিচে বন্ধ করে আছে সে। ডুবে আছে স্বপ্নের জগতে। যেই স্বপ্নে তার বাস্তবতাটা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বিভীষিকাময় সেই রাত, শিমুল গাছ, গাছের নিচে রক্তাক্ত সায়াহ্নের লাশ, সেই লাশের বুকে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে থাকা বাণী। হঠাৎ কোথা থেকে হিরণ আসলো। এক থাবায় বাণীর হাত ধরে তাকে টেনে তুলে। বাণী যেতে চায় না। পা দিয়ে মাটি খামচে ধরতে চায়। কিন্তু পারে না। নিথর সায়াহ্নের লাশ হতে ক্রমে ক্রমে দূরে সরে যায় সে। বাকিটা… বাকিটা বদ্ধ আখির সামনে ভেসে উঠতেই বাণী অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। ঘুমের মাঝেই ভাইয়া, ভাইয়া বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সে। কাঁদতে কাঁদতে বিছানার চাদর খাঁমচে ধরে।

বাণীর কান্নার শব্দে বহ্নির ঘুম ছুটে যায়। সে চোখ মেলে পাশ ফিরে বাণীর এই অবস্থা দেখতেই ভীত হয়ে পড়ে। দ্রুত উঠে বসে দূরে সরে যায়। ভয়ে কাঁপতে থাকে। পরপর ভীত গলায় ডাকে,

“ মাম্মা। মাম্মা উঠো। মাম্মা। উঠো না। “

বাণীর কানে পৌঁছায় না সেই ডাক। সে অন্য এক দুনিয়ায় আছে আপাতত। বহ্নি ভয়ে এবার নিজেও ঠোঁট উল্টে নিঃশব্দে কেঁদে দেয়। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে সে আশেপাশে তাকায়। রুমের ড্রিম লাইট অন থাকায় চারিপাশটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বহ্নি দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে গিয়ে টেবিল

থেকে বাণীর ফোনটা হাতে নেয়। কনট্যাক্ট লিস্টে গিয়ে সে সামনে নিশার নাম্বার দেখে সেটাই ডায়াল করে।

__________

মধ্যরাত হওয়ায় নিশা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কলের শব্দে তার ঘুম ভাঙলেও ঘুম ঘুম ভাবটা দূর হয় না। সে চোখ বোজা অবস্থায়ই বালিশের পাশ হতে হাতড়ে ফোনটা রিসিভ করে। সঙ্গে সঙ্গে ফোনের অপর পাশ হতে ফোপাঁনোর শব্দ শুনতে পায় সে। নিশার ঘুম ভেঙে যায়। এক লাফে উঠে বসে সে। স্ক্রিনে বাণীর নাম্বারটা দেখেই সে ভীত স্বরে বলে,

“ হ্যালো? “

বহ্নি কাঁদতে কাঁদতে ভীত গলায় বলে,

“ আন্টি, মাম্মার যেনো কি হয়েছে। “

নিশা উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে আম্মু? “

“ মাম্মা ঘুমের মাঝে জোরে জোরে কান্না করছে। ডাকছি কিন্তু উঠছে না। আমার ভয় করছে। “

মাত্র ঘুম থেকে উঠায় নিশার মস্তিষ্ক তখন কাজ করছে না। কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সে কিছু না ভেবেই বলে বসে,

“ তুমি ওয়েট করো। আন্টি আসছি। পীপহোল দিয়ে আন্টি ছাড়া অন্য কাউকে দেখলে দরজা খুলবে না। ওকে আম্মু? আন্টি এখুনি আসছি। “

নিশা তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। তখনই তার মনে পড়ে সে কেবল বাণীর নতুন বাসার এরিয়ার নামটুকুই জানে৷ কোন বাসা সেটা চিনে না। আর নাঈমার বাসা থেকে বাণীর বাসার দূরত্ব প্রায় ঘন্টা খানিকের। নিশা বোকার মতো দাঁড়িয়ে রয়। কি করবে সে এখন? আব্বুও চট্টগ্রামে নেই। এই মুহুর্তে কি করবে সে? বাচ্চাটা ওইখানে একা ভয় পাচ্ছে। নিজের প্রতি বিরক্তিতে নিশা রাগে পায়চারি শুরু করে। আচমকা তার মনে পড়ে দূর্জয় ভাইয়া চট্টগ্রামে আছে। ভাইয়া বাণী আপুর বাসাও চিনে। ভাইয়াকে একটা কল দিবে?

ভাবতে ভাবতেই নিশা দূর্জয়ের নাম্বারে কল লাগায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই কলটা রিসিভ হতেই নিশা উদ্বিগ্ন গলায় শুধায়,

“ ভাইয়া তুমি ফ্রি আছো? ফ্রি থাকলে এখনই প্লিজ বাণী আপুর বাসায় যাও। “

__________

কলিং বেলের শব্দ পেতেই বহ্নি দ্রুত ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট অন করে রুম থেকে বের হয়। খাবার টেবিলের কাছ থেকে একটা চেয়ার টেনে দরজার সামনে রাখে। অত:পর চেয়ারে উঠে দাঁড়িয়ে পীপহোল দিয়ে বাহিরে তাকায়। পরিচিত মুখ দেখতেই সে চেয়ারে দাঁড়িয়ে পা উঁচু করে আগে উপরের ছিটকিনিটা নামায়। তারপর চেয়ার ছেড়ে নেমে নিচের ছিটকিনিটাও খুলে নব ঘুরায়। দূর্জয়

ভীত বহ্নিকে দেখতেই তাকে কোলে টেনে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

“ ইট'স ওকে। এসে পড়েছি। আর কান্না করবেন না। “

বলতে বলতে দূর্জয় দ্রুত বাসায় প্রবেশ করে দরজাটা আটকে দেয়। সোজা চলে যায় ড্রিম লাইটের মৃদু আলো ভেসে আসা রুমটার দিকে। রুমে পা রাখতেই ড্রিম লাইটের আলোয় দেখা দৃশ্যটা দেখতেই দূর্জয়ের শরীরটা অবশ হয়ে আসে।

বাণী তখনও হাউমাউ করে কাঁদছে। অস্পষ্ট স্বরে ভাইয়া ভাইয়া বলে আওড়াচ্ছে। কান্নার দমকে পুরো শরীর কাঁপছে তার। মুখটা কেমন রক্তশূণ্য দেখাচ্ছে।

দূর্জয়ের লাইট অন করার কথা খেয়াল রইলো না। সে বহ্নিকে বিছানার এক কোণে বসিয়ে দিয়ে দ্রুত বাণীর দিকে এগিয়ে যায়। বাণীর পাশে বসে ডাকে,

“ বাণী গেট আপ। “

বাণী উঠে না। বরং কান্নার প্রকোপ আরো বাড়ে। দূর্জয় হাত বাড়িয়েও থেমে যায়৷ অনুভব করে সে বাণীকে ছোঁয়ার সাহসও খুঁজে পাচ্ছে না। ঘুমের ঘোরে যদি আরো ভয় পেয়ে যায়? নারী কণ্ঠের হৃদয়বিদারক কান্নার স্বরটা দূর্জয়ের মস্তিষ্কে আঘাত করছে। সে ডাকার জন্য গলায় জোর খুঁজে পায় না। মাথা ঘুরিয়ে বহ্নির পানে তাকায়। বাচ্চাটাও ভয়ে সিটিয়ে আছে। কেমন নীরবে কেঁদে চলেছে।

দূর্জয় বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে নেয়। তার দূর্বল হয়ে পড়লে চলবে না। সে গলায় সামান্য জোর এনে ডাকে,

“ বাণী উঠো। স্বপ্ন থেকে বের হও। উঠো। বহ্নি কান্না করছে। ওয়েক আপ প্লিজ। “

কথাটা বলতে বলতেই দূর্জয় হাত বাড়িয়ে বাণীর গাল ছোঁয়। সঙ্গে সঙ্গে বাণীর স্বপ্ন ভেঙে যায়। আচ্ছন্নের ন্যায় চিৎকার করে সে চোখ মেলে তাকায়। দূর্জয়কে সামনে দেখতেই এক লাফে উঠে বসে দূরে সরে যায়। অশ্রুসিক্ত সেই দৃষ্টি দেখতেই দূর্জয়ের বুকের ভেতর তুমুল ভাঙচুর শুরু হয়। সে যথাসাধ্য স্বাভাবিক গলায় বহ্নিকে বলে,

“ মাম্মা ঠিক আছে বহ্নি। আপনি একটু লিভিং রুমে গিয়ে বসুন। আমি আসছি এখুনি। “

আকস্মিকতায় বহ্নির দিকে খেয়াল ছিলো না বাণীর। দূর্জয়ের কথা শুনে নিজের পায়ের পাশটায় তাকাতেই দেখে বহ্নি বিছানা ছেড়ে নীরবে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। বহ্নির অশ্রুমাখা মুখটাও বাণীর দৃষ্টির অগোচর হয় না। মনটা তার আরো বিষিয়ে উঠে। বাণী দু'হাতে নিজের চুল খামচে ধরে। হাঁটুর মাঝে মুখ গুজে ফের ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। পুরনো ক্ষতটা আবারও জীবন্ত ও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। নিজেকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অনুভব করছে সে। অস্ফুটে বলে উঠে,

“ চলে যাও তুমি। “

দূর্জয় না চাইতেও করুণ গলায় বলে বসে,

“ এই জীবনটা তুমি ডিজার্ভ করো না। এটাকে ভালো থাকা বলে না। তুমি ভালো নেই বাণী। “

বাণী ধরা গলায় বলে,

“ লিভ মি এলোন। “

“ তুমি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখেছো। একটু শান্ত হও। শরীর কাঁপছে তোমার। “

বাণী এবার অশ্রুসিক্ত মুখটা তুলে আর্তনাদ করে বলে,

“ স্বপ্ন ছিলো না। সত্যি ছিলো। পুরোটা সত্যি ছিলো। ওই… “

কান্নার দমকে বাণী আর কিছু বলতে পারে না। বলতে পারে না যে বাস্তব জীবনে সে হিরণের কবলে কেবল দু'বার পরলেও স্বপ্নে সে হাজারবার হিরণের শিকার হয়েছে। স্বপ্নটা এতটাই জীবন্ত হয় যে বাণীর পুরো স্বত্তা তা অনুভব করতে পারে। দূর্জয় তা বুঝতে পারলো কি-না বুঝা গেলো না। কেবল নিষ্প্রভ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয়। শান্ত গলায় বলে,

“ নিজেকে ঠান্ডা করার জন্য স্ট্রেস রিলিফিং বল খুব কার্যকরী। আমার কাছে আপাতত সেটা না থাকলেও হাতটা আছে। যদিও রুক্ষ কিন্তু ভরসার। “

বাণী ফ্যালফ্যাল করে একবার দূর্জয়ের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা দেখে ফের ড্রিম লাইটের সবুজ আলোয় দূর্জয়ের মুখটা দেখে। পরপর তার বুকে চিনচিনে ব্যথা হয়। বাণী যখন এই ভালোবাসা নামক অনুভূতি গুলোকে স্বাগতম জানানোর জন্য দু হাত মেলে দিয়েছিলো তখন ভাগ্য কেনো তার সঙ্গ দিলো না? আর আজ যখন বাণী পুরোপুরি নিঃশেষ, মনের কোণে বিন্দুমাত্র ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই বিলানোর জন্য, তখন ঠিক কিসের আশায় এই পুরুষটা তার দিকে ভরসার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে? কেন?

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন