ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৫৮তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫৮.

সকাল সকাল ফোনের নোটিফিকেশন বারে জেসির পাঠানো ম্যাসেজটা ভীড় করতেই প্রত্যয় অবাক হয়। ম্যাসেজটা ওপেন করতেই দেখে সেখানে গোটা বাংলায় লেখা,

“ তোমার কষ্ট করে আর অপেক্ষা করতে হবে না। বিয়ে নিয়ে অযথা চিন্তাটাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। আমি আজকে বাবা আর ভাইয়া বাসায় ফিরলে মানা করে দিবো। চিন্তা নিও না। তোমার সুপাত্রের ইমেজটা নষ্ট করবো না। “

সবেমাত্র নাস্তার টেবিলে এসে বসেছিলো প্রত্যয়। ম্যাসেজটা দেখতেই কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রয়। ফিজা বেগম তখন নিজ হাতে ছেলের জন্য বানানো স্যুপ নিয়ে টেবিলে এসে হাজির হোন। ছেলের সামনে নাস্তা সার্ভ করতে করতে আপনমনে বলতে থাকে,

“ ভাবীর কাছে শুনলাম জেসির নাকি সাইনুসাইটিসের সমস্যা আছে। মেয়েটার জন্য এতো মায়া লাগছে। আমার আর তোমার আব্বুর কথা চিন্তা করে নিজে এই ঠান্ডার মাঝে ক'টা দিন হসপিটালে ছিলো। এখন কি জ্বরটাই না বাঁধিয়ে বসে আছে! আজ নাকি ভাবী ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। “

প্রত্যয় চুপচাপ শুনে। প্রত্যুত্তর করে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরাফাত সাহেব এসে নাস্তার টেবিলে উপস্থিত হয়। ছেলের শরীরের খবর নিয়ে বলে,

“ পরের সপ্তাহেই তোমার চট্টগ্রামে না ফিরলে হচ্ছে না? আরো একটা সপ্তাহ ছুটি নাও। বাসায় থেকে রেস্ট নাও, মা'য়ের যত্ন নাও। “

প্রত্যয় এবারও কিছু বলে না। সে নীরবে নাস্তায় মনযোগ নিবেশ করেছে তখন। আচমকা খাওয়া থামিয়ে আরাফাত সাহেবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

“ জেসিকে কি তুমি শুধু নিজের বন্ধুর মেয়ে হিসেবেই পছন্দ করেছো? “

আরাফাত সাহেব খাওয়া থামিয়ে হতভম্ব দৃষ্টি মেলে একবার ছেলের দিকে তাকায়। অত:পর সামনের চেয়ারে বসা নিজের স্ত্রীর পানে তাকায়। ফিজা বেগম তখন ঠোঁট টিপে হাসতে ব্যস্ত। যাক! ছেলের অবশেষে ইন্টারেস্ট জাগলো!

আরাফাত সাহেব স্বাভাবিক গলায় বলে,

“ আমি নিজের বাড়ির জন্য পুত্রবধূ খুঁজছিলাম। আর আমার পুত্রবধূ হওয়ার জন্য আমার বন্ধুর মেয়ে হওয়া ম্যান্ডাটরি ছিলো না, বরং সুপাত্রী হওয়া জরুরী ছিলো। “

প্রত্যয় দ্বিধাপূর্ণ গলায় প্রশ্ন করে,

“ তোমার কাছে ওকে সুপাত্রী মনে হয়? “

“ হ্যাঁ। কোনো সন্দেহ নেই তাতে। “

প্রত্যয় এবার নিজের মা'য়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

“ তুমিও কি আব্বুর সাথে একমত? “

“ হ্যাঁ। মেয়েটা প্রাণোচ্ছল, কথাবার্তাও সুন্দর আর সবথেকে জরুরি কথা হচ্ছে সৎ। আমাদের ইম্প্রেস করার জন্য বিন্দুমাত্র কৃত্রিম আচরণ করে নি। তোমার ভাইয়া মারা যাওয়ার পর আমাদের এখন একমাত্র সম্বল তুমি। তোমার জন্য নিশ্চয়ই আমরা কোনো যেনো তেনো মেয়ে পছন্দ করবো না? “

প্রত্যয় এবার মাথা নিচু করে আরো দু চামচ স্যুপ মুখে দেয়। অত:পর আচমকাই খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ফোনটা হাতে নিয়ে উপরের দিকে যেতে নিলেই ফিজা বেগম পিছু ডাকে,

“ স্যুপটা তো শেষ করে যাও। “

“ পরে খাবো আম্মু। “

নিজের রুমে ফিরেই প্রত্যয় দ্রুত একটা নাম্বার ডায়াল করে। প্রথমে নাম্বারটা বিজি দেখালেও কিছুক্ষণের মাঝেই কলব্যাক করে। প্রত্যয় কিছু বলবে তার পূর্বেই অপর প্রান্ত হতে ক্ষিপ্ত স্বর বলে উঠে,

“ তোর কি দুনিয়াতে আর কাম নাই বাপ? জানি ঘরে আজাইরা শুইয়া বইয়া আছোস। করার মতো কিছু পাইতাসোস না। তাই বইলা তুই আমারে শান্তিতে প্রেমটাও করতে দিবি না? “

প্রত্যয় প্রথমে অবাক গলায় জানতে চায়,

“ তুই প্রেম করছিস? কবে থেকে? আমি জানি না কেনো? “

“ তুই এইসব বাদ দিয়া আগে বল ফোন কেন দিসোস। আমার কাম আছে। বেশি সময় নাই হাতে। “

“ দোস্ত, ধর কেউ নিজের সমস্যার কথা চিন্তা না করে আগে আমার কথা চিন্তা করলো, আমার কথা ভাবলো, আমার খেয়াল রাখলো, এইটা কিসের লক্ষ্মণ? “

সাইফ তখন চরম বিরক্ত। এই ছাগল মার্কা প্রশ্ন করার জন্য এই ছেলে তারে ফোন দিসে? কাজের ফাঁকে ১২ মিনিট ফ্রি টাইম পেয়েছিলো সাইফ। সেই ১২ টা মিনিট একটু নিজের মতো করে না কাটিয়ে সে নিজের ইয়াসমিনের জন্য বরাদ্দ করে রেখেছিলো। আর এই ছেলে সেই বরাদ্দকৃত সময়ের মাঝে এসে বাগড়া দিলো শুধুমাত্র এই প্রশ্ন করতে। সাইফ চোখ মুখ কুচকে বলে,

“ এইটা পাগল হওয়ার লক্ষ্মণ। যে এইসব করসে সে-ও পাগল, আর যার জন্য করসে সে-ও পাগল৷ তাদের অতিব জরুরী ভিত্তিতে বিয়ে দিলেই একমাত্র এই সমস্যার সমাধান মিলবে। “

প্রত্যয় এবার সিরিয়াস স্বরে বললো,

“ একদম ফাইজলামি করবি না। আই এম সিরিয়াস। “

“ এই শালা! তোর কি মনে হয় আমি আমার মূল্যবান সময় অপচয় কইরা এনে মশকরা করতেসি? মশকরা তো তুই করতেসোস। এতো বছর বিএমএতে কামলা খাইটা আর্মি হইলাম কারণ ভাবসিলাম এই সেক্টরে বলদ কম। কিন্তু তুই বলদে আমারে বারবার কোনটা কিসের লক্ষ্মণ জিগায় মাথা খাইতেসোস। আমারে কি তোর ডাক্তার মনে হয়? নিজের লক্ষ্মণ নিজে মিলা। আমার প্রেমে আরেকবার বাগড়া দিলে তোর পোলাপাইন দুনিয়ার মুখ দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওই গুলারে শিখায় দিমু তোরে যাতে বাপ না ডাইক্কা মামা ডাকে। বালছাল যত্তসব। “

বলেই ফোনটা কেটে দেয় সাইফ। প্রত্যয়ের মুখের বিরক্তির ভাবটা বেড়ে যায়। ছেলেটা প্রেমে পড়ে খুব রুড হয়ে গিয়েছে। নিজের রুম জুড়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করে প্রত্যয়। হাসফাস করছে সে। কিছুক্ষণ পায়চারি করে ধপাশ করে বিছানায় বসে পড়ে। কি ভেবে যেনো গুগলের সার্চ অপশনে গিয়ে লিখে,

“ what does it mean when a girl cares about me genuinely? “

আধুনিক উত্তরদাতা গুগল যেই উত্তর প্রদর্শন করে তা দেখে প্রত্যয় নিশ্চুপ হয়ে বসে রয়। মনে মনে কয়েকবার আওড়ায় উত্তরটা,

“ It simply means she's worried about you. Having said that, she definitely has feeling for you. Don't overthink it. Go get her and you’ll have your answer. “

প্রত্যয় এবার ফোনটা রেখে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। সূক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে একবার আগাগোড়া নিজেকে পরখ করে। তার হাইট যথেষ্ট ভালো, ওয়েটটাও পারফেক্ট, মুখশ্রীর অবকাঠামো নজরকাড়া, চুলগুলোও খুব ভদ্র স্টাইলে কাটা, কেবল কপালের পাশে ক্ষতের যা দাগ রয়েছে। তবে সেটাও দেখতে মোটেও কুৎসিত নয়, বরং প্রত্যয়ের সাহসিকতার চিহ্ন বহন করছে এই ক্ষত। নিজেকে খুব ভালো করে পরখ করে প্রত্যয়ের মনে হয় গুগলের উত্তর সত্য হওয়া কোনো অসম্ভব জাতীয় বিষয় নয়। তার মতো সুদর্শন ছেলেকে দেখে যে-কেউ গালাগালি ছেড়ে সুপাত্রী হয়ে যাবে।

আচমকা প্রত্যয় কিছু একটা ভেবে দ্রুত নিজের ওয়ালেট আর ফোনটা পকেটে ভরে নেয়। আলমারি খুলে নিজের পাসপোর্টটাও সঙ্গে নিয়ে সে আরেক বার আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। যথেষ্ট ডিসেন্ট দেখাচ্ছে তাকে। জামা বদলিয়ে সময় অপচয় করার কোনো প্রয়োজন নেই।

আর এক মুহুর্ত বিলম্ব না করে প্রত্যয় দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে যায়। খাবার টেবিলটা ক্রস করে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে নিলেই আরাফাত সাহেব ডাকেন,

“ কোথায় যাচ্ছো তুমি? “

“ চট্টগ্রাম যাচ্ছি আব্বু। চিন্তা করো না, ফ্লাইটেই যাবো। এয়ারপোর্টে গিয়ে টিকিট বুক করে নিচ্ছি আমি। “

জবাব দিতে দিতে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে পায়ে শু পড়ে নিয়ে প্রত্যয় বেরিয়ে পড়ে। টেবিলে বসে থাকা দম্পতি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রয় ছেলের যাওয়ার পানে।

__________

বাণী নতুন যেই বাসায় উঠেছে সেটা ছাদের সঙ্গে লাগোয়া। সাত তলার বাসাটিতে কোনো লিফট নেই। সিঁড়ি ধরে উঠতে নামতেই জীবন আঙ্গার হয়ে যায়। কিন্তু এতো কম ভাড়ায় আপাতত অন্য কোথাও বাসা পাওয়াও সম্ভব ছিলো না তার জন্য।

গতরাতের ঘটনার পর থেকেই বাণী আরো নীরব বনে গিয়েছে। মুখটা গুমোট হয়ে আছে তার। চুপচাপ বহ্নিকে নাস্তা করিয়ে, রেডি করিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছে কেবল। সিঁড়ি ধরে দ্বিতীয় তলায় নামতেই মুখোমুখি হয় রিহাব ভাইয়ের। রিহাব হলো সিথীর হাজবেন্ড, এই বাড়ির প্রকৃতি বাড়িওয়ালা।

রিহাবকে দেখতেই বাণী ক্ষীণ স্বরে সালাম দেয়। রিহাব সালামের জবাব দেয় না, বরং বাকা চোখে বাণীকে একবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে। সঙ্গে সঙ্গে বাণীর পুরো শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠে। সে দ্রুত বহ্নিকে নিয়ে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে আসে।

এ আর নতুন কিছু না তার জন্য। গত কয়েক মাসে এরকম বহু সিচুয়েশনের সম্মুখীন হয়েছে সে। যখনই কেউ শুনে যে বাণী সিঙ্গেল মাদার তখনই তাকে বাকা নজরে দেখে। পিছনের ঘটনা না জেনেই সবাই নিজের মনে আলাদা আলাদা ঘটনা সাজিয়ে ফেলে বাণীকে ঘিরে। বাণী তা জানে, বুঝে। কিন্তু এড়িয়ে চলা ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পায় না সে। নিজের মেয়েটাকে এই সমাজের বাহিরে নিয়ে বড়ো করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে এসব দেখেও না দেখার ভান করে চলে। যত সম্ভব নিজেকে গুটিয়ে রাখে সবার থেকে। লোকচক্ষু এড়িয়ে চলার যথাসাধ্য চেষ্টা করে।

__________

দিনে দুপুরে ঢাকা এসে পৌঁছেছে দূর্জয়। মেজাজটা বেজাই গরম তার গতরাত থেকে। তবে সেই গরম মেজাজটা কারো সামনে প্রকাশ করছে না সে। সঠিক জায়গায় ক্ষোভ মেটানোর অপেক্ষায় তা মনে পুষে রেখেছে। তার মেজাজ গরমের কারণ গতকাল রাতে দ্বিতীয় দফা বাণীর থেকে পাওয়া রিজেকশন নয়। যতক্ষণ মন না চাইবে বাণী অমত জানাতেই পারে। তা-তে বিন্দুমাত্র অসুবিধা নেই দূর্জয়ের। তার সমস্যা অন্য জায়গায়, অন্য কারণে।

সেলের সামনে এসে দাঁড়াতেই সে গম্ভীর স্বরে শুধায়,

“ লক খুলো। “

সেলের পাহারায় নিযুক্ত নিরাপত্তা কর্মী আমতা আমতা করে বলে,

“ স্যার, ভেতরের লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেসে। আপনার ভিতরে না যাওয়াই ভালো। “

দূর্জয়ের কপালের মাঝে ভাজ পড়ে। সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে,

“ যা বলার সরাসরি বলো। “

“ স্যার ভেতরের আসামীটা খালি আত্মহত্যা করতে চায়। অর্ডার অনুযায়ী আমরা ওর হাতে হ্যান্ডকাফ আর পা শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি যাতে আত্মহত্যা করার চেষ্টা না করতে পারে। “

“ বুঝেছি। লক খুলো তুমি। “

“ স্যার আপনার সেফটির কথা ভেবেই বলছিলাম। “

দূর্জয় এবার কিছুটা রেগে বলে,

“ আমার সেফটি সম্পর্কে আমি যথেষ্ট কনসার্ন। তোমাকে যা বলা হচ্ছে চুপচাপ তা করো। “

নিরাপত্তা কর্মীটা এবার নীরবে সেলের দরজাটা খুলে দেয়। দূর্জয় স্বাভাবিক পায়ে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় মেঝেতে বসে থাকা মানুষটাকে। দু হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পড়ানো। পা দুটোও শিকল দ্বারা বাঁধা। দূর্জয়ের যদি জানা থাকতো যে প্রেগন্যান্সির সময় বাণীকে কিভাবে বেঁধে রাখা হতো তাহলে ওর ক্ষিপ্ত মন এই মুহুর্তে এই দৃশ্যটা দেখে খুব শান্তি অনুভব করতো।

কারো অস্তিত্ব অনুভব করতেই হিরণ চোখ তুলে তাকায়। দু চোখ লাল রক্তবর্ণের ধারণ করেছে তার। নির্ঘুম রাত কাটানোর জন্য নাকি কে জানে!

হিরণের মুখটা দেখতেই দূর্জয়ের গত রাতের কথা মনে পড়ে যায়। বাণীর সেই ভীত দৃষ্টি, বিভৎস চিৎকার। সঙ্গে সঙ্গে দূর্জয়ের মনে সুপ্ত ইচ্ছে জাগে শক্ত রডের আঘাতে এই ক্রিমিনালটার শরীরের সবগুলো হাড় গুড়ো গুড়ো করে দিতে।

হিরণকে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দেখাচ্ছে। সে আনমনে প্রশ্ন করে,

“ ওই আগুনের উত্তাপে ওদের খুব কষ্ট হয়েছিলো, তাই না? “

দূর্জয় জবাব দেয় না। সে নীরবে নিজের শার্টের হাতা গোটাতে থাকে। হিরণ তখন একের পর এক প্রশ্ন করে বিলাপ পাড়তে ব্যস্ত।

“ আচ্ছা কেউ ওদের বাঁচালো না কেন? আশেপাশে কোনো মানুষ ছিলো না? পৃথিবীর এতো গুলো মানুষের মাঝে একটা মানুষের কানেও ওদের আর্তনাদ পৌঁছালো না? “

দূর্জয় একটাও প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। ক্রিমিনালদের সঙ্গে সে মুখ কম হাত চালাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে গলা হাকিয়ে বাহিরের নিরাপত্তা কর্মীকে ডাকে। উক্ত কর্মী ভেতরে উঁকি দিতেই শীতল গলায় অর্ডার শুধায়,

“ দরজাটা লক করে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকো। ভেতর থেকে যতই আওয়াজই আসুক না কেনো, কেউ যেনো প্রবেশ না করে। আই রিপিট কেউ না। “

নিরাপত্তা কর্মীটা আদেশটা মাথা পেতে নিয়ে বেরিয়ে যায়। দূর্জয় এগিয়ে যায় ধীর পায়ে। মনের ক্ষোভ মেটাতে আলাদা কোনো সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই তার। তার দানবীয় শক্তির হাত এবং পা দু'টোই যথেষ্ট। হিরণের উদ্ভ্রান্তের ন্যায় কথা থেমে যায় প্রচন্ড শব্দে বাম গালে প্রথম চড়টা পড়তেই। কানটা যেনো তব্দা লেগে গেলো। চোখের সামনে সবটা ঝাপসা দেখতে শুরু করে সে। সে দুপুরে আকাশে উত্তপ্ত সূর্য না থাকলেও সেলটার ভেতর থেকে উত্তপ্ত চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এসেছে। যেই চিৎকারে যেকারো শরীরে কাঁটা দিয়ে যাবে।

__________

বিশাল এপার্টমেন্টটার গ্যারেজে এসে থামলো গাড়ি। সন্ধ্যা তখন নেমেছে কেবল। জেসি ধীর গতিতে বের হয় গাড়ি থেকে। তার পিছু পিছু তরু ও আকাশও নামে। যদিও জেসির মা'রই আজ তার সঙ্গে হসপিটালে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর যান নি। তরুই গিয়েছে। সঙ্গে আকাশকেও নিয়ে গিয়েছিলো। কারণ তরুর ধারণা তার ছেলেটা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সারাদিন এই দু'জনকে নিয়ে বিভিন্ন টেস্টের জন্য হসপিটাল জুড়ে দৌড়াতে দৌড়াতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে।

লিফটে উঠে দাঁড়াতেই তরু আপন মনে বলতে থাকে,

“ এখুনি বাসায় গিয়ে আমি ছয়টা ডিম সিদ্ধ বসাবো। দুইজন চুপচাপ মুখ বন্ধ করে তা খাবে। সামান্য নাক ছিটকালে আমি আজকে আব্বুর কাছে বিচার দিবো। সারাদিন খাবার নিয়ে প্যাঙছামি দু'জনের। ডিম দুধ না খেয়ে শরীরের এই অবস্থা করেছো তোমরা। “

তরুর কথা শুনে আকাশ চোখ মুখ থমথমে করে আড়চোখে নিজের ছোট ফুপ্পির দিকে তাকায়। জেসিও তখন বিরক্তি নিয়ে লিফটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার সুন্দর শিক্ষিত ভাবীটা বিয়ের পর টিপিক্যাল বাঙালি মায়েদের মতো হয়ে গিয়েছে। সমস্যা যা-ই হোক না কেনো তার আলটিমেট সলিউশন হচ্ছে ডিম সিদ্ধ, গরম দুধ, ভাত বাড়িয়ে খাওয়া ইত্যাদি।

লিফট এসে পৌঁছায় নির্দিষ্ট ফ্লোরে। কলিংবেল বাজিয়েই জুতা খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তিনজন। জেসির মা আফসানা বেগম হাসি হাসি মুখ করে দরজা খুলে। তরু দরজা থেকেই নালিশ শুরু করে,

“ আপনার মেয়ে আর নাতিকে ভাত বাড়িয়ে দিবো আজকে থেকে আম্মু। ওদের কোনো নাখরা আমি আর সহ্য করবো না। দুইজনের… “

বাকি কথাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যায় তরুর। লিভিং রুমে বসে থাকা প্রত্যয়কে দেখতেই মুখটা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। জেসি তখন পিছন পিছন প্রবেশ করতে করতে বলে,

“ থামলে কেনো ভাবী? আরো বলো। শুনতে ভালো লাগছিলো। “

বাড়ির ভেতর পা রাখতেই জেসির মুখটাও আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যয় তখন ফালুদার বাটি হাতে বসে। আকাশ তাকে দেখতেই দৌড়ে গিয়ে বলে,

“ হ্যালো আংকেল। “

“ হাই। “

তরু আর জেসি কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ঘরে প্রবেশ করে। আফসানা বেগম তখন বলে উঠে,

“ সেই বিকেল থেকে বসে আছে ও। তোমাদের কল করতে চেয়েছিলাম। মানা করে বললো একদম ডাক্তার দেখিয়ে আস্তে ধীরে আসুক। “

জেসি শুকনো মুখে হ্যালো বলে নিজের রুমে চলে যায়। তরু প্রত্যয়ের শারীরিক অবস্থার কথা জেনে নিয়ে আকাশকে সহ রুমে চলে যায় হাত মুখ ধুয়ে আসতে। আফসানা বেগম তখন নাস্তা নিয়ে হট্টগোল কান্ড বাঁধিয়ে বসেছেন। প্রত্যয় আচমকা সাহস করে নমনীয় স্বরে বলে,

“ আন্টি কিছু মনে না করলে, জেসির সাথে একটু কথা ছিলো আমার। বলা যাবে কি? “

আফসানা বেগম সঙ্গে সঙ্গে বলে,

“ হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি ওকে ডেকে দিচ্ছি। তুমি বসো। “

আফসানা বেগম তড়িঘড়ি করে জেসির রুমের দিকে এগিয়ে যায়। জেসি তখন জামা কাপড় বদলে সবে বসেছে। আফসানা বেগম এসে শুধায়,

“ প্রত্যয় নাকি তোমার সাথে কথা বলবে। গিয়ে দেখো কি বলে। খুব জরুরী কিছু হয়তো। আমিও তো ভাবছিলাম যে এই অবস্থায় ছেলেটা চট্টগ্রাম এসে পড়লো কেনো? “

জেসি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্কার্ফ গায়ে জড়িয়ে রুম থেকে বের হয়। ধীরে সুস্থে হেঁটে গিয়ে প্রত্যয়ের সামনে বসে বলে,

“ তোমার নামে উল্টাপাল্টা কিছু বলি কি-না তা পর্যবেক্ষণ করতে এসেছো? এতো অবিশ্বাস? “

“ উঁহু। তোমাকে পর্যবেক্ষণ করতে এসেছি। “

“ আমাকে মানে? “

“ সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করবো, উত্তরটাও সোজাসাপ্টা চাই। ইউ লাইক মি? বিয়েতে মত আছে তোমার? মত না থাকলে বলে দাও, এখুনি চলে যাবো। আর মত থাকলে জানাও, এনগেজমেন্টের ডেট ফিক্স করে যাবো। “

আচানক কথায় জেসি হতবাক হয়। বুদ্ধিহীনের ন্যায় বসে রয়। বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না সে। প্রত্যয় মাথায় আঘাত পেয়েছে তা জেসির অজানা নয়। কিন্তু মাথায় আঘাত পেলে সেটার প্রভাব এতদিন পর দেখা যাচ্ছে কেনো? প্রত্যয় ফের বলে,

“ দ্রুত উত্তর দাও। “

জেসি ফট করে উঠে দ্রুত পায়ে নিজের রুমে চলে যায়। প্রত্যয় হতভম্ব হয়ে বসে রয়। গুগলের মতে তো এই মেয়েটা তাকে পছন্দ করে। তাহলে এভাবে উঠে চলে গেলো কেন? এভাবে উঠে চলে যাওয়াকে কি প্রত্যয় রিজেকশন ধরে নিবে? আর কিছু ভাবার পূর্বেই প্রত্যয়ের ফোনে নোটিফিকেশনের শব্দ বেজে উঠে। ফোন হাতে নিয়ে ম্যাসেজ ওপেন করতেই দেখে সেখানে লেখা,

“ ভেবে দেখলাম তুমি এতটাও খারাপ না। সারাজীবন সহ্য করার মতো বিরক্তিকর তুমি। তাই তোমার উপর দয়া করে মতটা দিয়েই দিলাম। “

প্রত্যয় চোখ মুখ কুচকে বসে রয়। একটা মত দিতে গিয়েও এই মেয়ে এমন অভিনয় করছে যেনো সে প্রত্যয়কে দয়া করে বিয়েতে রাজি হয়েছে! অথচ মনে মনে ঠিকই পছন্দ করে। মানে সাপ মারবে কিন্তু লাঠি ভাঙতে রাজি নয়।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন