ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৫৯তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫৯.

সম্ভাব্য হামলার তদন্তের জন্য তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশ, র‍্যাব, সেনাবাহিনীর তিনটি দল লাগাতার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়াও দেশের সাতটি বিভাগে চলছে কড়া নজরদারি এবং টহল। পুলিশ, র‍্যাব এবং সেনাবাহিনীর সেই তদন্তে বিভিন্ন অপরাধী ধরা পড়লেও আতঙ্কবাদীদের আস্তানাটা এখনো ধরা পড়ছে না। কোন ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে এরা লুকিয়ে আছে তা সকলের অজানা। সকলের মনে প্রাণে কেবল একটাই দোয়া, যেনো খুব বড়ো কোনো অঘটন থেকে মহান আল্লাহ যেনো সবাইকে হেফাজত করেন।

সবেমাত্র মেজর শাহরিয়ার দূর্জয় এর আওতায় একটা সার্চ অপারেশন সম্পাদন করে বের হলো ছয় লেফটেন্যান্ট সহ গোটা একটা টিম। চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল হতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে কিছু পলাতক আতঙ্কবাদীকে। আপাতত এদের সেনাবাহিনীর খাস রিমান্ডে নেওয়া বাকি। সেখানেই এদের থেরাপি দিয়ে পেট থেকে যথাসম্ভব তথ্য বের করা হবে।

সেনাবাহিনীর গাড়িটার পেছনে মুখোমুখি উঠে বসে ছয়জন লেফটেন্যান্ট। সামনে ড্রাইভারের পাশের প্যাসেঞ্জার সিটটায় বসে আছে মেজর শাহরিয়ার দূর্জয়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা জানালার বাহিরে নিবদ্ধ। মনে চলছে গভীর চিন্তা। আজ একটা সপ্তাহ ধরে তীব্র ব্যস্ততায় তার সময় কাটছে। যতক্ষণে সে সামান্য ফ্রি হয় ততক্ষণে বাণীর স্কুল ছুটি হয়ে যায়। দেখা পাওয়া দুষ্কর। বাণীর কথা ভেবে দূর্জয় নিজেও সামনে যাচ্ছে না আপাতত। এটা সত্য যে সে বাণীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, তবে তা নিয়ে সে মোটেও তার উপর প্রেশার ক্রিয়েট করতে চাইছে না। মেয়েটা যত খুশি সময় নেক। দূর্জয় তো আছেই অপেক্ষা করার জন্য।

আচমকা ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠতেই দূর্জয়ের ধ্যান ভাঙ্গে। সে ফোনটা বের করতেই দেখে স্ক্রিনে মাসুদের নাম্বার। সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে সে। অপর পাশ থেকে মাসুদ ব্যস্ত গলায় শুধায়,

“ স্যার, ম্যাডাম মাথা ঘুরিয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়েছে। আমি উনাকে ওসমানী সিটি হসপিটালে নিয়ে এসেছি। কিন্তু বাচ্চাটা আই মিন বহ্নি আমাকে ভরসা করতে পারছে না। কান্নাকাটি করছে। কি করবো? “

দূর্জয় বিচলিত না হয়ে বরং মাথা ঠান্ডা রেখে বলে,

“ আমি আসছি। ফোনটা বহ্নিকে দাও। “

বহ্নির নাম শুনতেই পিছনে বসে থাকা পাঁচ লেফটেন্যান্ট বিস্ময় নিয়ে একে অপরের মুখে চাওয়াচাওয়ি করে। সাইফ ব্যতিক্রম। সে অবাক হয় না। বরং তাকে দেখে মনে হচ্ছে, এ যেনো হওয়ারই ছিলো। ফোনটা বহ্নির কাছে দিতেই অপর পাশ থেকে ফোপাঁনোর শব্দ শুনতে পায় দূর্জয়। সে কণ্ঠে অপ্রতিরোধ্য স্নেহ মিশিয়ে বলে,

“ কান্না করবেন না। আমি আসছি তো। একটু শান্ত হয়ে আংকেলটার কাছে থাকুন। উনি অপরিচিত নয়। মেজরের বন্ধু। “

বহ্নিকে কিছুটা শান্ত করে ফোনটা রাখে দূর্জয়। পাশে বসে ড্রাইভ করতে ব্যস্ত সৈন্যকে বলে,

“ গাড়ি ওসমানী সিটি হসপিটালের দিকে নিয়ে চলুন। “

আদেশটুকু বর্তিয়েই দূর্জয় পিছু ফিরে লেফটেন্যান্টদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে,

“ আপনাদের কারো আপত্তি আছে? “

সাইফের ঠোঁটের আগায় যেনো উত্তর প্রস্তুতই ছিলো। সে বিলম্ব না করে বলে,

“ না স্যার। উই আর অল ওকে। “

দূর্জয় ফের নীরব ভঙ্গিতে সামনে ফিরে বসে। গত বিশ ঘন্টা ধরে সে নির্ঘু্ম রয়েছে। প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো বিন্দুমাত্র বল খুঁজে পাচ্ছে না শরীরে। তার উপর শীতের কারণে শরীর কেমন ঝিম মেরে আছে। কিন্তু এই বলহীন দেহের মনের ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে। যা বাহির থেকে দেখে বুঝার সাধ্যি কারো নেই।

__________

দূর্জয়রা যখন হসপিটালে এসে পৌঁছায় তখন প্রায় বিকেল। লেফটেন্যান্টরা নিজ থেকে দূর্জয়ের সাথে এসেছে। যদি কিছুর প্রয়োজন হয়! করিডোর ধরে দ্রুত পায়ে ইমারজেন্সি ইউনিটের দিকে এগোনো ইউনিফর্ম পরিহিত যুবকদের দিকে সবাই বারবার ফিরে তাকাচ্ছে। মনে আগ্রহ ও প্রশ্ন জাগছে। সৈন্যদের গুরুতর কোনো কেস বুঝি?

দূর্জয় ইমারজেন্সি ইউনিটের সামনে আসতেই দেখে একপাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে মাসুদ দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠিক পাশের বেঞ্চিটাতেই মাথা নত করে বসে জুস এবং চিপস খাচ্ছে বহ্নি। দূর্জয় এগিয়ে যায়। বহ্নির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলে,

“ ভয় পেয়েছিলেন আপনি? “

বহ্নি চোখ তুলে তাকায়। দূর্জয়কে দেখতেই ভরসা খুঁজে পায়। এই লোকটা আশেপাশে থাকলে সে নিজেকে সেফ ফিল করে। মেজর যেহেতু এসে পড়েছে এখন মাম্মাও নিশ্চয়ই ঠিক হয়ে যাবে? ভাবনটা মাথায় উঁকি দিলেও আবার বাণীর মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। বহ্নি আহ্লাদে কেঁদে উঠে বলে,

“ মাম্মা অনেক ব্যথা পেয়েছে। “

দূর্জয় বহ্নির ছোট হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে তাতে আলতো করে চুমু খেয়ে আদুরে গলায় বলে,

“ মাম্মা ঠিক হয়ে যাবে। আপনি লাঞ্চ করেছেন? “

বহ্নি মাথা নেড়ে না বলে। দূর্জয় উঠে মাসুদের কাছে এগিয়ে যায়। আদুরে স্বর পাল্টে মুহুর্তেই গম্ভীর স্বরে বলে,

“ শুরু থেকে ডিটেইলস বলো এখন। “

“ স্যার, ম্যাম স্কুল থেকে বেরিয়ে বাসায় ফিরছিলো। উনাকে দেখে ডিস্টার্বড মনে হচ্ছিলো। কিছু দূর যেতেই রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে যান। পাকা রাস্তা তো, মাথাও ফেটে গিয়েছে। “

“ বহ্নিকে নিয়ে যাও ক্যান্টিনে। লাঞ্চ করে নি এখনো। লাঞ্চ করিয়ে আনো। “

কথাটুকু শেষ করে দূর্জয় আর কিছু না বলে দ্রুত পায়ে ইমারজেন্সি ইউনিটে প্রবেশ করে। লেফটেন্যান্টরা এতক্ষণ সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলো। দূর্জয় ভেতরে যেতেই সাইফ এগিয়ে আসে। মাসুদের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলে,

“ হাই, আমি লেফটেন্যান্ট সাইফ। বহ্নিকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। আমাকে চেনে ও, তাই আমার সঙ্গে বেশি কম্ফোর্ট ফিল করবে। “

মাসুদ মানা করে না। তবে মনে মনে ঠিক করে সে নিজেও সঙ্গে যাবে। হাজার হোক স্যারের অর্ডার!

সাইফ এগিয়ে এসে বহ্নির পাশে বসে। বহ্নি আড়চোখে একবার সাইফকে দেখে চোখ মুছে আবার চিপস খাওয়ায় মনযোগ দেয়। সাইফ হাত বাড়িয়ে বহ্নির চিপসের প্যাকেট থেকে একটা চিপস নিতে চাইলেই বহ্নি দ্রুত দূরে সরে যায়। সে দেবে না। সাইফ ঢং করে বলে,

“ ভেবেছিলাম তোমাকে এখানের সবথেকে মজার বিরিয়ানি খাওয়াবো। কিন্তু তুমি মেবি ইন্টারেস্টেড না। “

বহ্নি সঙ্গে সঙ্গে সাইফের দিকে তাকায়। কিছু একটা ভেবে নিজের হাতের চিপসের প্যাকেটটা সাইফের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,

“ তুমি চিপস খাও ষ্টুপিড আংকেল, আমি বিরিয়ানি খাবো। “

অপমানে মুহুর্তেই সাইফের মুখটা থমথমে হয়ে যায়। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লেফটেন্যান্টরা সাইফের চুপসে যাওয়া মুখ দেখে চাপা হাসছিলো। তাদের দিকে তাকাতেই বহ্নির আচানক চোখ গিয়ে আটকায় সাদাতের দিকে। সুদর্শন যুবকটাকে দেখতেই সে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রয়! এই আংকেলকে সে আগে কখনো দেখে নি কেনো? কি সুন্দর! একদম মার্ভেল মুভির হিরো গুলোর মতো!

__________

ভারী চোখ গুলো মেলে পিটপিট করে তাকায় বাণী। মনে হচ্ছে যেনো এক গভীর ঘুম থেকে উঠেছে। চারিপাশ হতে ভেসে আসছে মানুষের চাপা কথাবার্তার আওয়াজ। প্রথম দফায় চোখ খুলতে নিয়েও লাইটের আলোয় চোখ কুচকে বুজে ফেলে সে। দ্বিতীয় দফায় ধীরে ধীরে তা মেলে তাকায়।

ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে চারিপাশে তাকাতেই দেখতে পায় তার হাতে ড্রিপ লাগানো। ফিরোজা রঙের থ্রি পিসটা সম্পূর্ণ কম্বলে ঢাকা। বেডের দু'দিকে বিশাল পর্দা টানা। বাকি দু পাশে রয়েছে দেয়াল। কিন্তু বাণীর চোখ গিয়ে আটকায় দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এলোমেলো দূর্জয়ের দিকে। মাথাটা দেয়ালের সঙ্গে এলিয়ে চোখ বুজে রেখেছে। হাত দুটো বুকের কাছে আড়াআড়ি ভাজ করা। চেহারায় সুস্পষ্ট কিছুটা চিন্তা এবং ক্লান্তির ছাপ।

বাণী মাথা তুলে বসতে চায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মাথার পেছনের দিকটা ব্যথা করে উঠে তার।

উঠে বসার বৃথা চেষ্টা বাদ দিয়ে বাণী শুয়েই রয়। মনে করার চেষ্টা করে কি হয়েছিলো। স্কুল থেকে ফেরার পথে আচমকা চোখের সামনে সবটা ঝাপসা হয়ে উঠে তার। তারপর আর কিছু মনে নেই। মুহুর্তেই বাণী অস্থির হয়ে উঠে। বহ্নি তার সঙ্গে ছিলো। তাহলে বহ্নি কোথায়?

বাণী আরেকবার আশেপাশে তাকায়। পরপর উঠে বসার চেষ্টা করে। কিছুটা শব্দ পেতেই দূর্জয় সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকায়। সে ঘুমায় নি বরং কিছু সময়ের জন্য চোখ বুজে রয়েছিলো। চোখ দুটো ভীষণ জ্বালা করছে। সে বাণীকে উঠে বসতে দেখে এগিয়ে আসে। বাণী ততক্ষণে বেডে পা ঝুলিয়ে বসেছে। দূর্জয় শান্ত স্বরে বলে,

“ রিল্যাক্স। বহ্নি ঠিক আছে। বাহিরেই আছে। ইমারজেন্সি ইউনিট হওয়ায় ওকে ভেতরে আসার পারমিশন দেবে না। “

বহ্নি ক্ষীণ স্বরে আওড়ায়,

“ ও একা বাহিরে? “

“ না। আমার লেফটেন্যান্টরা আছে। বহ্নি ওদের কোম্পানি বেশ ইঞ্জয় করছে। আমি দশ মিনিট অন্তর অন্তর চেক করে আসছি। চিন্তা নিও না। “

বাণী কিছুটা ধাতস্থ হয়ে স্থির হয়ে বসে। দূর্জয় একটা পানির বোতল খুলে এগিয়ে দেয় বাণীর দিকে। শান্ত গলায় বলে,

“ প্রেশার অত্যাধিক লেভেলের লো তোমার। হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও লো। এতটা অযত্ন কেন বাণী? “

বাণী জবাব দেয় না। নীরবে পানির বোতলটা হাতে নিয়ে কিছুটা পানি খায়। গলাটা বেশ শুকিয়ে ছিলো তার। দূর্জয় আরো এক দফা প্রশ্ন করে,

“ কিসের দায়ে নিজেকে এভাবে শেষ করে দিচ্ছো? “

বাণী এবারও জবাব দেয় না। নীরব রয়। মনে পড়ে যায় গত কালের ঘটনা।

স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া দাওয়া করে বাণী আর বহ্নি ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ছাদ থেকে কাপড় আনার কথা খেয়াল ছিলো না তার। যখন ঘুম ভাঙে তখন সন্ধ্যা। মাগরিবের আজানের ধ্বনি চারিদিকে শোনা যাচ্ছে। বাণী দ্রুত মাথায় ওড়না প্যাঁচিয়ে বেরিয়ে যায় কাপড় আনতে। ছাদের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে তখন রিহাব নামক লোকটা সিগারেট ফুঁকতে ব্যস্ত ছিলো। পানির টাংকির অপর পাশে হওয়ায় বাণী তা খেয়াল করে নি। সে যখন এক এক করে কাপড় নিচ্ছিলো আচমকা শরীরে অশালীন ছোঁয়া অনুভব করে। বাণীর হাতের কাপড় গুলো পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সে ছিটকে দূরে সরে যায়। ঘুরে তাকিয়ে রিহাবের মুখটা দেখতেই সে হতভম্ব হয়ে যায়। রিহাবের মুখে সে কি বিশ্রী হাসি!

কিসের শংকায় জানা নেই তবে বাণী তখন ত্রস্ত পায়ে দৌড়ে ঘরে গিয়ে দরজা জানালা সব আটকে বসে ছিলো। সে কি দমবন্ধকর অনুভূতি! বাণীর খুব মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো। উপলব্ধি করতে পেরেছিলো এই গোটা বিশ্বের কোনো কোণেই সে নিরাপদ নয়। সবাই সুযোগের অপেক্ষায়। সুযোগ পেলেই বাণীকে বিষাক্ত ছোবলে মুমূর্ষু করে তুলতে প্রস্তুত।

সেই রাতে বাণী সাহস করে সিথী আপার নাম্বারে কল করে পুরো ঘটনা জানায়। উনার স্বামীর আসল মুখোশ সম্পর্কে জানায়। মহিলা কোন মাটির তৈরী তা বাণীর জানা নেই, কিন্তু মুহুর্তেই বড় বোনের মতো স্নেহ করা মহিলাটি রূপ বদলে ফেলে। বাণীকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না। বরং বলে বাণী মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে। আসল সমস্যাটা বাণীর নিজের চরিত্রেই। নাহলে কি এরকম বাপ ছাড়া সন্তান জন্ম দেয়? আবার মাঝরাত্রে কি-না তার এপার্টমেন্টে কোন পুরুষ মানুষও আসে!

বাণী সেই মুহুর্তে ক্ষেপে উঠেছিলো। কিন্তু মহিলা বাণীর তেজ দেখে তাকে সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেয় তিনি আর বাণীকে নিজের বাসায় দেখতে চায় না। যতদ্রুত সম্ভব এই বাসা খালি করে দিতে। বাণীও তখন রাগের বশে বলে ফেলেছিলো এরকম চরিত্রহীনের বাসায় থাকতে সে-ও আগ্রহী নয়।

কিন্তু সকাল হতেই বাণী উপলব্ধি করে আরো একবার সে কূল কিনারা হীন সমুদ্রের মাঝে আটকা পড়েছে। তীরে পৌঁছানোর জন্য কোনো বৈঠা নেই তার কাছে। আর না সে সাতার জানে। এই বিষাক্ত, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি হতে মুক্তি পেতে বাণী স্কুলে যায়। কিন্তু সেখানেও শান্তি পায় না সে। সিথী নামক মহিলাটা ইতিমধ্যে বাণীর নামে কুৎসা রটিয়ে দিয়েছে তখন কলিগদের মাঝে। প্রতিটা কলিগ বাণীকে নিয়ে ফিসফিস করে সমালোচনায় মত্ত ছিলো, বাকা চোখে তাকাচ্ছিলো। বাণী এই মানসিক যন্ত্রণাটা আর নিতে পারছিলো না। দাঁতে দাঁত খিচে কোনো মতে ক্লাসগুলো শেষ করে বেরিয়ে আসে সে। বহ্নিকে নিয়ে স্কুল ছেড়ে বের হতেই অনুভব করে এই শীতেও তার ঘাড় ঘামছে। শরীরটাও মৃদু কাপছে। তারপর… তারপর সবটা ঝাপসা।

দূর্জয়ের ডাকে বাণী বর্তমানে ফিরে আসে। চোখ তুলে তাকায়। দূর্জয় সম্ভবত কিছু বলছিলো। কথাগুলো বাণীর কানে স্পষ্ট পোঁছায় না। সে নির্লিপ্ত দৃষ্টি মেলে দূর্জয়কে দেখতে থাকে। তার মন তাকে বলছে স্বার্থপরের ন্যায় এই নিখুঁত ছেলেটার জীবনে নিজের ছাঁয়া যেনো না মাড়ায় বাণী। আর তার মস্তিষ্ক তাকে বলছে যে কখনো কখনো সমুদ্রের উত্তাল ঢেউতে দক্ষ ডুবুরিও নিজেকে সামলাতে হিমশিম খায়। প্রতিটা ঢেউ তাকে আছড়ে তীর হতে দূরে সরিয়ে নেয়। নিজের অতল গহীনে টেনে নেওয়ার খেলায় মত্ত হয়। সেরকম পরিস্থিতিতে বাঁচার জন্য ডুবুরির প্রয়োজন হয় সাহায্যের। সেই সাহায্য নেওয়ার ফলে ডুবুরিটা কখনো ছোট হয়ে যায় না। তবে সাহায্যকারী ঠিকই সম্মানীয় হয়ে যায়। বাণীর মনে প্রশ্ন জাগে, দূর্জয়ই কি তার জীবনের সেই লাইফ জ্যাকেট?

দূর্জয় নিজের কোনো প্রশ্নের জবাব না পেয়ে চুপ হয়ে যায়। নীরবে দেখতে থাকে ফর্সা আদলের মুখটায় অযত্নে গড়ে উঠা রক্তশূণ্য এবং দূর্বলতার ছাপ। বাণী সেই মুহুর্তে বলে উঠে,

“ তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও কেনো? “

বাণীর প্রশ্ন শুনে দূর্জয় কিছুটা চমকায়। ফের ক্লান্ত স্বরে স্নিগ্ধতা মিশিয়ে জবাব দেয়,

“ পাঁচ নং ধাপে পৌঁছে গিয়েছি বলে। “

বাণী দূর্জয়ের কথার অর্থ বুঝে না। সে মাথা নত করে ফেলে। চোখের কার্নিশে তার অশ্রু এসে ভীড় করে। রুদ্ধস্বরে বলে,

“ আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না দূর্জয়। আমি জানি আমি তোমার যোগ্য না। কিন্তু আমার বেঁচে থাকাটা দুষ্কর হয়ে উঠছে। “

দূর্জয়ের কি হলো কে জানে! সে আলতো হাতে বাণীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,

“ জীবনটা তোমার বাণী। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার নেই। তবে তুমি কতটুকু যোগ্য সেই হিসেবটা না-হয় আমাকেই ঠিক করতে দাও। “

“ তুমি শুদ্ধ। আমি দাগে জর্জরিত। সেই দাগ তোমার জীবনেও লাগবে। “

বাণী দৃষ্টি তুলছিলো না। কিন্তু দূর্জয় তার চোখে চোখ রাখতে ব্যকুল তখন। সে বেডের একপাশে থাকা বাণীর সাদা ওড়নাটা তুলে হাতে নেয়। অত:পর তা বাণীর গায়ে আলগোছে পেঁচিয়ে দিয়ে এক হাঁটু ভেঙে তার সামনে বসে। নিজে চোখ তুলে বাণীর বিষাদ মাখা চোখ দুটো দেখে। অত:পর হাজার বছরের তৃষ্ণার্তের ন্যায় তাকিয়েই রইলো। চোখ দুটো বাণীর পানে স্থির থাকলেও ঠোঁট নাড়িয়ে আপনাআপনি বলে উঠে,

“ তুমি আমার দেখা সবথেকে সাহসী, স্বচ্ছ এবং শুদ্ধতম নারী বাণী। “

আর দশটা নারীর মতো বাণী লজ্জায় লাল হলো না৷ বরং বাণীর দু চোখ বেয়ে তখন দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে নেয়। দূর্জয় নিজের ডান হাত বাড়িয়ে হাতের তালুতে সেই অশ্রু বিন্দু জমালো। অত:পর হাতটা সরিয়ে নিতে নিলেই বাণী কম্পিত ভঙ্গিতে সেই শ্যাম বর্ণের হাতের তালুতে নিজের বাম হাত রাখে। দূর্জয় বিস্মিত হয়। পরপর সচল মস্তিষ্ক ব্যাপারটা উপলব্ধি করতেই হাতের বন্ধন দৃঢ় করে। বাণী দূর্বল গলায় বলে,

“ ভরসাটুকু আমার শেষ সম্বল ছিলো। তা আজ তোমাকে দিলাম। সামলে রেখো। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন