এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৬৭.
ক্যালেন্ডারের বুক থেকে একটা সপ্তাহ যেনো চোখের পলকেই কেটে গেলো। এই একটা সপ্তাহে স্পেশাল ফোর্সের পরিচালিত অপারেশনে দেশের বুকে কালো অধ্যায়ের রচয়িতা হামলাকারীদের খুঁজে খুঁজে আটক করা হয়েছে। প্রত্যেক সৈন্যের মধ্যে হামলাকারীদের প্রতি পুষে রাখা অদম্য ক্ষোভই হয়তো তাদের ইচ্ছে শক্তি বাড়িয়ে দেওয়ার টনিক হিসেবে কাজ করেছে। যার ফলস্বরূপ এতো দ্রুত তারা অপরাধীদের আটক করতে সক্ষম হয়েছে।
এই একটা সপ্তাহ কোনো সৈন্যই ঠিক করে নিজেদের পরিবার, পরিজন কিংবা আপনজনদের সময় দিতে পারে নি। তার কারণ হলো একরোখা কর্ম জীবনের তীব্র ব্যস্ততা।
তবে আজ কারো কোনো ধরনের ব্যস্ততা নেই। আছে অফুরন্ত সময়। বিশেষ একটা দিন বলে কথা। তারিখটা ১৮ ই ডিসেম্বর। প্রত্যয় এবং জেসির বাগদানের অনুষ্ঠান। যদিও বন্ধুর মৃত্যু শোক এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারে নি প্রত্যয়। তবে অনুষ্ঠানের ডেটটাও পেছানো আর সম্ভব ছিলো না তার পক্ষে। ইতিমধ্যে দুই পক্ষ হতেই সব মেহমানদের দাওয়াত দেওয়ার কাজটা সম্পন্ন হয়েছিলো। শেষ মুহুর্তে এসে তাদের মানা করে দেওয়াটা বেমানান দেখাতো।
অনুষ্ঠানটা ঘরোয়া ভাবে করলেও প্রত্যয় পরিবারের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের কাছের মানুষদের দাওয়াত দিতে ভুলে নি। বিশেষ দিনে সকল বিশেষ মানুষদের উপস্থিতিই তার কাম্য।
__________
ঘড়িতে তখন বিকেল চারটা বাজে। বহ্নি রেডি হয়ে লিভিং রুম জুড়ে ছোটাছুটি করছে। হাতে তার একটা রিমোট। সেই রিমোট দ্বারা চালিত গাড়িটাকে নিয়ে পুরো ঘর জুড়ে পায়চারি করাটাই এই মুহুর্তে তার কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ৷ লিভিং রুমের সোফায় বসে থাকা দূর্জয়ও সম্পূর্ণ রেডি। গায়ে জড়িয়েছে নিজের পছন্দের কালো রঙের একটা শার্ট। হাতে রয়েছে প্রিয় রয়্যাল রয়েন্সের সিলভার রঙের ঘড়িটাও। সোফায় বসে ঢাকা ফেরত সুহালা বেগমের সঙ্গে কলে কথা বলার পাশাপাশি সতর্ক দৃষ্টি মেলে বহ্নিকেও পরখ করছে।
সুহালা বেগম কথার মাঝে প্রশ্ন করে,
“ বহ্নি কোথায়? সামনে আছে? থাকলে ওকে ডেকে দাও। কথা বলবো। “
দূর্জয় বহ্নিকে ডেকে বলে,
“ বহ্নি। কাম হেয়ার। দীদা কথা বলবে আপনার সাথে। “
বহ্নি সঙ্গে সঙ্গে খেলা ছেড়ে দৌড়ে আসে। এই নতুন জীবনটা বেশ উপভোগ করছে সে। কত কত নতুন মানুষ চারিদিকে আছে তার! সবাই তাকে কত আদর করে! বাহিরে ঘোরাঘুরি নিয়েও কোনো বাধা নেই তার। যদিও মেজর জোর করে তাকে আর মাম্মাকে ঐ নট সো ইয়াম্মি খাবার গুলো খাওয়ায়, কিন্তু মেজরও এতটা খারাপ না। বরং দীদা যাওয়ার পর দু'দিন তাকে রাতে নাইট টাইম স্টোরি শুনিয়েছে।
বহ্নি কাছে এসে দাঁড়াতেই দূর্জয় তাকে টেনে কোলে নিয়ে হাঁটুর উপর বসায়। ফোনটা বহ্নির হাতে দিয়ে নিজেই আনাড়ি হাতে বহ্নির এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিতে থাকে। বাণী এসে যদি দেখে যে খেলার চক্করে বেঁধে দেওয়া চুলগুলোর এই অবস্থা করেছে তাহলে ঝাড়ি একটাও মাটিতে পড়বে না।
বহ্নি ফোন কানে চেপে ধরেই প্রফুল্ল গলায় বলে,
“ ইয়ো দীদা! “
দূর্জয় এবং ফোনের অপর পাশে থাকা সুহালা বেগম দুজনেই বহ্নির অদ্ভুৎ সম্বোধনে না চাইতেও হেসে দেয়। চট্টগ্রামে থাকা অবস্থায় সুহালা বেগম বহ্নিকে বলেছিলো যে তিনি এখন বহ্নির দাদী হয়। সেই দাদী শব্দটাকেই উল্টো করে এই মেয়ে নিজের মতো দীদা শব্দ আবিষ্কার করে সারাদিন এটাই ডাকা শুরু করে। সুহালা বেগম অবশ্য বাধা দেন নি। বাচ্চা মানুষ যা ডেকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে তা-ই ডাকতে দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বহ্নি কথা শেষ করে ফোনটা রাখতেই দূর্জয় বলে,
“ এবার চুপ করে বসে থাকুন। আপনার মাম্মা এসে যদি দেখে যে, খেলার চক্করে আপনি নিজের চুল এলোমেলো করে ফেলেছেন আবার, তাহলে জানেন তো কি হবে? থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার! “
বহ্নি চোখটা সরু করে বলে,
“ তুমি আছো কেনো? ইউ শুড সেভ মি। আমি আমার মাম্মা তোমার সাথে শেয়ার করছি না? “
দূর্জয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ মায়ের যোগ্য মেয়ে। “
বহ্নি ফের প্রশ্ন করে,
“ তুমি কি বললে? “
“ আপনি দিন দিন পাকনি বুড়ি হয়ে যাচ্ছেন বহ্নি। “
বহ্নি মুখ ফুলিয়ে বলে,
“ ওহ গড মেজর! তুমি এতো ডাম্ব? একটা ফাইভ ইয়ারের বাচ্চা বুড়ি কিভাবে হয়? “
বহ্নির কথার ভঙ্গি দেখে দূর্জয় হেসে দেয়। সেই মুহুর্তে রুম থেকে বেরিয়ে লিভিং রুমের সামনে এসে দাঁড়ায় বাণী। দূর্জয় আনমনে চোখ তুলে এক পলক দেখে নিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। পরমুহূর্তেই আবার চোখ তুলে তাকায়। এবার আর দৃষ্টি সরাতে পারে না।
মেরুন রঙের শাড়ি গায়ে জড়ানো নারীকে দেখে মনে মনে থমকায় দূর্জয়। তা প্রকাশ পায় তার চোখের অভিব্যক্তিতে। বাণী কিঞ্চিৎ লজ্জা পেয়ে তাড়া দেখিয়ে বলে,
“ যাবে না? “
দূর্জয় মাথা নেড়ে বহ্নিকে কোল থেকে নামিয়ে সোফায় বসিয়ে গিয়ে দু জোড়া জুতা নিয়ে আসে। প্রথম জোড়া জুতাটা বহ্নির। দূর্জয় বহ্নির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে জুতাটা পড়িয়ে দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজেও সোফায় বসে নিজের জুতা পড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাণী নীরবে দেখে সবটা। মনের সুপ্ত কোণে ভালো লাগা কাজ করে। দু'দিন আগেও সে ভাবতো সে ছাড়া বহ্নির আর কেউ নেই। কিন্তু ধীরে ধীরে তার সেই ধারণা পাল্টাচ্ছে। দূর্জয় নিজে আয়োজন করে সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। কথায় কথায় মুখে বহ্নিকে নিজের মেয়ে বলে কখনো দাবী না করলেও, কাজের মাধ্যমে নিঃসংকোচে বহ্নিকে নিজের মেয়ের মতোই ট্রিট করছে। আর কি চাই বাণীর?
__________
জেসি আর প্রত্যয়ের বাগদানে একপ্রকার হুলুস্থুল কান্ড বেধে গিয়েছে। ছেলে পক্ষের তরফ থেকে হাতেগোনা মেহমান হলেও, মেয়ে পক্ষের আত্মীয় স্বজন মিলিয়ে মেহমানের সংখ্যা পঞ্চাশ এর ঘর ছাড়িয়েছে। ভাগ্যিস আলাউদ্দিন সাহেব আয়োজনটা এপার্টমেন্টের ছাদে করেছেন। নাহয় হযবরল অবস্থা হয়ে যেতো এক প্রকার।
পুরুষেরা সব ছাদে অবস্থান করলেও মহিলা এবং বাচ্চারা মিলে দখল করেছে বাসার চারটা বেডরুম এবং লিভিং রুমটা। জেসির মা আর ভাবী সেদিকটা তদারকি করতে ব্যস্ত। এতো ভীড়ের মাঝে বাণী বেশ অস্বস্তি অনুভব করছিলো। এতো গুলো অপরিচিত মানুষের ভীড়ে কেমন জড়তা কাজ করছিলো তার ভেতর। জেসির সঙ্গে তার যা-ও পরিচিত কিন্তু জেসিও এই মুহুর্তে আত্মীয়দের দ্বারা ঘেরা। তার কাছে ঘেঁষার সুযোগ নেই।
উপস্থিত মহিলাদের অনেকেই বাণীর দিকে উৎসুক দৃষ্টি মেলে তাকাচ্ছে। শুনেছে প্রত্যয়ের সিনিয়র মেজরের স্ত্রী এই নারী। এতটুকু তথ্যই তাদের কৌতূহলের জন্য যথেষ্ট। একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা আগ্রহ দমাতে না পেরে প্রশ্ন করে বসে,
“ তোমার বিয়ের কতো বছর হলো? “
বাণী থতমত খেয়ে যায়। উত্তর দিতে পারে না কোনো। মহিলার আগ্রহ আরো বেশি হওয়ার কারণ হলো, তিনি দেখেছেন বাণীর একটা বাচ্চা আছে। খুব সম্ভবত বাচ্চাটার বয়স ৫ কিংবা ৬। সুতরাং বিয়ে নিশ্চয়ই অন্তত পক্ষে আরো ৭ বছর আগে হয়েছে? কিন্তু ৭ বছর আগে তো পদ অনুযায়ী মেজরের বিয়ের অনুমতি পাওয়ার কথা না! মূলকথা উনি হিসাব মিলাতে পারছে না।
উনি আরো কিছু প্রশ্ন করবে তার আগেই বহ্নি এসে বাণীর হাত ধরে টেনে আদুরে স্বরে বলে,
“ আমি মেজরের কাছে যাই মাম্মা? “
বাণী মেয়েকে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে বলে,
“ না মা। উপরে এখন সবাই ব্যস্ত। মাম্মার সাথে থাকো তুমি। “
বহ্নির কথাটা আশেপাশের আন্টিদের কান এড়ায় না। একজন আগ্রহী গলায় প্রশ্ন করে,
“ মেয়ে কি নিজের পাপাকে মেজর বলে ডাকে নাকি? “
বাণী কিছু বলার পূর্বেই বহ্নি অবাক গলায় বলে,
“ মেজর তো আমার পাপা না, মেজর তো শুধুই মেজর। তাই না মাম্মা? “
উপস্থিত মহিলারা অবাক হয়। বাণীর অস্বস্তি হচ্ছিলো। সে কোনো মতে বলে,
“ দূর্জয় আমার হাজব্যান্ড। আমাদের রিসেন্টলি বিয়ে হয়েছে। ও বহ্নির বায়োলজিক্যাল ফাদার না। “
একজন মহিলা সুর টেনে বলে,
“ ওওও। “
বাণীর খুব অস্বস্তি লাগছিলো। এতগুলো মহিলার তার এবং তার মেয়ের প্রতি মনযোগে সে দমবন্ধকর অনুভব করছিলো। বাণী যে-ই না উঠে যেতে নিবে সেই মুহুর্তে তার পাশের সোফায় বসা একজন মহিলা বহ্নিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
“ তোমার আসল ফাদার না হলেও তো সে এখন তোমার মাম্মার হাজব্যান্ড। মাম্মার হাজব্যান্ডকে তো পাপাই বলতে হয়। এভাবে মেজর ডাকলে খারাপ শোনায় তা। “
বাণী আর অপেক্ষা করে না। তাড়া দেখিয়ে বলে,
“ আমি একটু আসছি। “
বলেই বহ্নির হাত ধরে টেনে সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। দরজার বাহিরে আসতেই বাণী নিশার মুখোমুখি হয়। নিশা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে,
“ কোথায় যাচ্ছো ভাবী? “
বাণী আরেক দফা ইতস্তত অনুভব করে। এরকম ভাবী ডাকে সে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু নিশার ভাষ্যমতে তার ভাইয়াকে বিয়ে করার দরুন বাণী এখন আপু থেকে ভাবীর পজিশনে প্রমোশন পেয়েছে। বাণীকে নিরুত্তর দেখে নিশা আবার বলে,
“ ভাবী আর ইউ ওকে? “
বাণী মাথা নেড়ে বলে,
“ ভেতরে অনেক মানুষ। অস্থির লাগছিলো। ছাদে যাবে তুমি? “
নিশা ভেবে দেখে অপরিচিত এতো মানুষের ভীড়ে বসে থাকার তুলনায় ছাদে যাওয়াটা বেটার অপশন। সেখানে অন্তত পরিচিত মুখ তো পাবে! আব্বু, দূর্জয় ভাইয়া আর সাইফ। সাইফের কথা মনে পড়তেই নিশার মুখখানা লজ্জায় রাঙা হয়।
__________
ছাদে এসে এতো পুরুষের ভীড়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দূরে এককোণে রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেদিকে এগিয়ে যায় বাণী। সঙ্গে রয়েছে বহ্নিও। দূর্জয় হট্টগোল ছেড়ে কিছুটা নীরবতার জন্যই এই দূরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। প্রত্যয় এবং জেসির জন্য সে খুশি হলেও, এতো মানুষের ভীড়ে সে কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছিলো। সে নিষ্প্রভ পরিবেশ প্রেমী মানুষ।
পাশে কারো উপস্থিতি টের পেতেই দূর্জয় তাকিয়ে দেখে বাণী এবং বহ্নি এসে দাঁড়িয়েছে। মা মেয়ের মলিন মুখখানা দেখে ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
“ মন খারাপ কেনো? “
বাণী কেবল বলে,
“ নিচে অস্বস্তি লাগছিলো এতো মানুষের ভীড়ে। “
দূর্জয় কিছুক্ষণ বাণীর দিকে তাকিয়ে রয়। তেরো বছর আগের বাণীর স্বভাব ছিলো হাজার ভীড়েও সাবলীল ভঙ্গিতে মেতে থাকা। অথচ আজকের বাণীর মাঝে কত সংকোচ! দূর্জয় বহ্নিকে প্রশ্ন করে,
“ খারাপ লাগছে বাচ্চা? “
বহ্নি মলিন মুখে মাথা নেড়ে বলে,
“ পা ব্যথা করছে। “
বহ্নি মিথ্যে বলে নি। অতিরিক্ত দৌড়াদৌড়ি করার ফলে তার আসলেই পা ব্যথা করছিলো। দূর্জয়কে খানিকটা চিন্তিত দেখায়। সে কিছু একটা ভেবে বহ্নিকে কোলে তুলে নেয়। বহ্নি দু'হাতে ঘাড় জড়িয়ে কাধে মাথা হেলে দেয়। দূর্জয় বাণীর দিকে তাকিয়ে বলে,
“ নিচে চলো। গাড়ির ভেতর নিরিবিলি কিছুক্ষণ বসে রেস্ট করো। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে জাস্ট উপরে চলে আসবো। “
বাণী গলা নিচু করে বলে,
“ খারাপ দেখাবে না? “
“ মেয়ের অসুবিধার কথা আমাদেরই ভাবতে হবে। অন্য কেউ সেই কাজটা করবে না। আর অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে উপরে এসে পড়বো তো। “
বাণী আর কথা বাড়ায় না। দূর্জয় কেবল নিচে যাওয়ার আগে ফারদিনকে বলে যায় যে, তারা নিচে পার্কিং এরিয়াতেই আছে। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে যেনো কেবল দূর্জয়কে একটা কল দেয়।
__________
সন্ধ্যা নেমে খোলা আকাশের নিচে ছাদের চারিদিকটা কৃত্রিম আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠতেই মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো। গোলাপি গাউন জাতীয় পোশাক গায়ে জড়ানো জেসি ছাদে পা রাখতেই তার চোখ পড়ে ছাদে তৈরী ছোট স্টেজ জাতীয় জায়গার উপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যয়ের দিকে। তার আব্বুর পছন্দের সুপাত্রকে সবসময়ের মতো দেখতে ক্লাসের সবথেকে ভদ্র বাচ্চার মতোই মনে হচ্ছে। নিজের অদ্ভুৎ ভাবনায় জেসি ঠোঁট টিপে হাসে। এগিয়ে যায় সামনের দিকে। নিজের অপেক্ষমাণ ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায় অতি নিভৃতে।
আন্টি বদলের অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন করতালিতে চারিপাশটা মুখোর করে তুলেছে ঠিক সেই মুহুর্তে প্রত্যয়ের চোখ পড়ে স্টেজের নিচে এতো মানুষের ভীড়ে দাঁড়িয়ে থাকা চার বন্ধুর দিকে। স্বভাবত প্রত্যয় আবেগী নয়। কিন্তু আচমকা তার চোখ ছলছল করে উঠে। প্রিয় চার বন্ধুর পাশে চোখের সামনে ভেসে উঠে আরো দুটো মুখ। রিদওয়ান আর সাদাতের। আজকে তো ওদেরও এখানে উপস্থিত থাকার কথা ছিলো। তাই না? জীবন এতটা অনিশ্চিত যে কার কখন ডাক পড়ে যায় তা কেউই জানে না। কারণ মৃত্যুই হচ্ছে মানুষের জীবনের ধ্রুব সত্য। যেই সত্য কেউই বদলাতে পারবে না।
এই অনিশ্চিত জীবনে যেখানে এক সেকেন্ডের ভরসা নেই সেখানে ভবিষ্যতের আশায় বসে থাকাটা বোকামি। প্রত্যয় মুহুর্ত অপচয় না করে নিজের পাশে বসে থাকা জেসির পানে তাকায়। নিচু স্বরে বলে,
“ একটা কথা বলার ছিলো। “
জেসি প্রত্যয়ের পানে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চায় কি বলার আছে? প্রত্যয় দ্বিধাহীন গলায় বলে,
“ প্রেমে তুমি একা পড়ো নি জেসি। আমিও পড়েছি। তোমার প্রেমে পড়েছি। “
জেসি অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়। হঠাৎ এই মুহুর্তে এই কথাটা বলার পিছনে কি বিশেষ কোনো কারণ আছে? হয়তো আছে! জেসি কিছু না বলে চোখ ফিরিয়ে নেয়। সবার অগোচরে কেবল প্রত্যয়ের হাতের পিঠে হাত রেখে ফিসফিসিয়ে বলে,
“ ভয় খুব অদ্ভুৎ জিনিস তাই না? মনের কথা মুখে এনে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। “
__________
জুলফিকার মুজতবার সাথে সাথে থাকার দরুন নিশা এক মুহুর্তের জন্যও সাইফের কাছে ঘেঁষার সুযোগ পায় নি আজ। চোখে চোখে কিংবা ফোনের ম্যাসেজে লুকোচুরি করে কথা বললেও কাছ থেকে কথা না বলার আক্ষেপে মনটা তার মলিন হয়ে আছে। সবাই যখন খাওয়া দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত ঠিক সেই মুহুর্তে নিশার ফোনে একটা ম্যাসেজ আসে।
“ ছাদের ডানপাশে আছি। এদিকে কেউ নেই। অপেক্ষায় আছি ইয়াসমিন। “
নিশা চারিদিকে তাকিয়ে জুলফিকার মুজতবাকে মিছে এক ছুতো দেখিয়ে দ্রুত খাওয়া শেষ করে সবার অগোচরে ছাদের ডানপাশটায় চলে যায়। এদিকটায় তেমন একটা আলো নেই। তবে চাঁদের আলোয় চারিপাশটা একদম অস্পষ্ট নয় এখনো। কিছুটা এগিয়ে সাইফের অবয়ব দেখতেই নিশা দ্রুত তার কাছে এগিয়ে যায়। সাইফ নিশাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলে,
“ উপরের ছাদে উঠতে পারবেন ইয়াসমিন? “
নিশা বড়ো বড়ো চোখ মেলে সাইফের পাশের দেয়ালে খাড়া মইয়ের মতো সিঁড়ির দিকে তাকায়। বিস্মিত গলায় বলে,
“ সিঁড়ির পাশেই রেলিং সাইফ। পা ফসকে গেলে সোজা উপরে চলে যাবো আমি। এতো ভীতি নিয়ে উপরে উঠা সম্ভব না। “
সাইফ আশ্বস্ত করে বলে,
“ ভয়ের কিছু নেই তো। আমি… “
নিশা পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে ফোঁড়ন কেটে অস্থির গলায় বলে,
“ আপনি বনে বাদরে ঘুরে বেড়ানো মানুষ। আপনার ভয় ডর কম হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব না। আপনি জানেন আমার পোকামাকড়, অন্ধকার, ভূত, উচ্চতা, আগুন এসবে ফোবিয়া আছে? এভাবেই আমি সারা বিকাল ধরে ভয়ে ছাদের কিনারে ঘেঁষছি না। ভয়ে পা কাঁপছে। তার উপর… “
সাইফ নিশার দু গালে হাত রেখে এবার নরম গলায় বলে,
“ শান্ত হোন। ভয় পাবেন এরকম কিছু করবো না। বিশ্বাস রাখুন ইয়াসমিন। “
নিশা কিছুটা ঠান্ডা হয়। সাইফ এবার নিজে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিশার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে রসিক সুরে বলে,
“ আমাদের বাচ্চা কাচ্চা তাদের মা'য়ের মতো হলে খুব ঝামেলা হবে ইয়াসমিন। এক ভীতুকে নাহয় সামলে নিলাম। কিন্তু পরে এতগুলো ভীতুর ভয় দূর করতে হিমশিম খাবো না, বলুন? “
নিশা কথা গুলো শুনতেই লজ্জা এবং রাগে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করতে নেয়। সাইফ তড়িঘড়ি করে তার হাত ধরে টেনে নিজের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বলে,
“ আরে কোথায় যাচ্ছেন? আচ্ছা, সরি। আর ফাইজলামি করবো না। আই প্রমিজ। “
নিশা তখনো লজ্জায় মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রেখেছে। সাইফ লজ্জা রাঙা মুখটা দেখে এগিয়ে এসে দুই হাতের সাহায্যে নিশার খোলাচুল গুলো দু কানের পিছনে নিয়ে গুজে দেয়। নিশা মুখ ফিরিয়ে সাইফের পানে তাকায়। সাইফের দৃষ্টি জোড়া মুহুর্তেই মুগ্ধতায় ছেয়ে যায়। তার মন বলে উঠে লেফটেন্যান্ট কর্নেলের এই ভীতু, বোকা মেয়েটার মতো নিষ্পাপ, নির্মল, মায়া মাখা মুখের মানুষটা শুধুই এবং একান্তই তার। এই পবিত্র মনের মানুষটাকে পাওয়ার বিনিময়ে জীবনের প্রায় পঁচিশটা বছরের একাকিত্ব ভুলে যাওয়া খুব কঠিন কোনো কাজ নয়।
নিশার অস্থির দৃষ্টি নিজের প্রতি স্থির করতেই বোধহয় সাইফ রাশভারী গলায় আবৃতি করে উঠে,
“ তুমি পোকামাকড় ভয় পাও বলে,
আমি কীটনাশক হতে রাজি।
তুমি অন্ধকার ভয় পাও বলে,
আমি আলো হতে রাজি।
তুমি ভূতে ভয় পাও বলে,
আমি রক্ষাকবচ হতে রাজি।
তুমি উচ্চতা ভয় পাও বলে,
আমি পায়ের নিচে জমিন হতে রাজি।
তুমি আগুন ভয় পাও বলে,
আমি পানি হতে রাজি।
শুনেছি প্রেমে লোভী হতে নেই।
কিন্তু শুনে রাখো মেয়ে,
তোমার প্রেমিক খুব লোভী।
এতকিছুর বিনিময়ে তুমি কেবল গাছ হয়ে পাশে থেকো।
উত্তপ্ত দুপুরে কিছুটা ছায়া দিও।
ঘোর বৃষ্টিতে কিছুটা আশ্রয় দিও।
তিক্ত গরমে শীতল হাওয়া দিও।
ভয় কিসের মেয়ে?
আমি তো আছি! “
নিশা ভরা চোখে সাইফের দিকে তাকিয়ে আছে। তার হঠাৎ করে খুব কান্না পায়। অসহ্যকর ভালো লাগায় দমবন্ধকর অনুভূতি হচ্ছে তার। এই তামাটে গায়ের চঞ্চল স্বভাবের মানুষটা লিখিত, অলিখিত সব ভাবেই তার ভাবতেই হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। অনুভূতির তাড়নায় নিশা নিজেই এগিয়ে গিয়ে সাইফকে জড়িয়ে ধরে। নিজের সরু হাতের আলিঙ্গনে জাপটে ধরে ধরা গলায় বলে,
“ আপনি আমার আশেপাশে থাকলে আমার কান্না পায় খুব। কখনো খুশিতে, কখনো কষ্টে। এরকম কেন হচ্ছে? “
সাইফ উত্তর দেয় না। কেবল হেসে প্রিয়তমাকে স্নিগ্ধ আবেশে জড়িয়ে নেয়। নিশা উত্তরের অপেক্ষাও করে না। কেবল চোখ বুজে বুকের বা পাশের ধুকপুক করতে থাকা হৃৎস্পন্দন গুলো শুনতে থাকে।
__________
রাত তখন প্রায় দশটার কাছাকাছি। জেসিদের বাসা থেকে বেরিয়ে বেশ অনেকক্ষণ বাহিরে ঘুরাঘুরি করে সবেমাত্র পরিবার সমেত বাড়ির সামনে এসে গাড়ি ব্রেক করলো দূর্জয়। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাণীকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ তুমি দরজা খুলে ভেতরে যাও। আমি গাড়ি পার্ক করে বহ্নিকে নিয়ে আসছি। “
বাণী এক মুহুর্ত পিছনে ফিরে মেয়ের মলিন মুখটা দেখে পার্স হাতে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। দূর্জয় দক্ষ হাতে গাড়িটা পার্ক করে নির্দিষ্ট জায়গায়। অত:পর নিজে গাড়ি থেকে নেমে পিছনের দরজা খুলে হাসি মুখে বহ্নিকে বলে,
“ কমন ম্যান এট ইউর সার্ভিস ইউর হাইনেস। আপনাকে কোলে করে নামাবো নাকি নিজে নিজে নামতে চান আপনি? প্রিন্সেস কি চায়? “
অন্যসময় হলে এতো আদুরে কথায় বহ্নি গলে সবগুলো দাঁত বের করে হাসতো। তবে আজ সেরকমটা হলো না। কেবল নিজের দু হাত এগিয়ে দিয়ে বুঝায় সে কোলে করে নামতে চায়। দূর্জয় এগিয়ে বহ্নিকে কোলে নিলেও আর নিচে নামায় না। বরং উঠোন ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করে,
“ কি হয়েছে কিডডো? কেউ কিছু বলেছে? মাম্মা কি আপনাকে বকেছিলো? “
বহ্নি এবার দূর্জয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ মাম্মার হাজব্যান্ডকে কি পাপা ডাকতে হয় মেজর? কিন্তু তুমি তো আমার পাপা না। তাহলে ওই আন্টিটা কেনো বললো, তোমাকে পাপা ডাকতে? “
দূর্জয় থম মেরে কিছুক্ষণ বহ্নির ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়ে রয়। সারাদিন ধরে বাচ্চার মলিন মুখ দেখে সে আঁচ করতে পেরেছিলো কিছু একটা হয়েছে। এইবার পুরোপুরি ঘটনাটা বুঝতে পারে সে। দূর্জয় নীরবে হেঁটে বহ্নিকে নিয়ে গাড়ির সামনে যায়। বহ্নিকে গাড়ির ফ্রন্ট বোনাটে বসিয়ে নিজেও তার মুখোমুখি দাঁড়ায়। কিছুটা বুঝানোর মতো করে বলে,
“ আপনার মাম্মার হাজব্যান্ড অর্থাৎ আমি টেকন্যাকিলি আপনার ফাদার হই এটা সত্য। কিন্তু
আমাকে আপনি কি ডাকবেন ইট ইজ আপ টু ইউ। ইউ ক্যান কল মি হোয়াটএভার ইউ লাইক। “
বহ্নি ভাবুক হয়ে জানতে চায়,
“ কিন্তু কারো দুইটা ফাদার কি করে হয়? আমার তো অলরেডি পাপা আছে। “
দূর্জয় এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
“ আপনি এখনো ছোট বহ্নি। রিলেশনশিপ গুলো একটু কম্পলিকেটেড। আরেকটু বড়ো হোন, বুঝতে শিখুন। আমি আর মাম্মা আপনাকে সব বুঝিয়ে বলবো। আপাতত একটা কথা জেনে রাখুন, কারো কথায় বাধ্য হয়ে কখনো আমাকে পাপা, বাবা, আব্বু কিংবা কিছু ডাকতে হবে না আপনার। কখনো যদি আপনার নিজ থেকে ডাকতে ইচ্ছে হয় তখনই একমাত্র ডাকবেন। ওকে? “
বহ্নি হ্যাঁ বোধক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। অত:পর কিছুক্ষণ চুপ করে মলিন মুখে বলে,
“ তোমাকে একটা সিক্রেট বলি মেজর? “
দূর্জয় মাথা নেড়ে বলে,
“ শিওর। “
বহ্নি কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় বলে,
“ আই হেইট পাপা, বাট আই মিস হিম অলসো। ইজ ইট রং? “
দূর্জয় নির্বাক কিছুক্ষণ বহ্নিকে দেখে। বাস্তবিক জীবনের ভয়ংকর রূপ সম্পর্কে অজ্ঞাত শিশুটার মাথায় একটা চুমু দিয়ে বলে,
“ ইট ইজ নট রং। “
চলবে…