ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৭৩তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৭৩.

সকাল সকাল নাস্তার টেবিলে বসতেই জুলফিকার মুজতবা পাশের চেয়ারে বসা মেয়েকে আড়চোখে পরখ করেন। বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছে বলে মনে হচ্ছে নিশাকে। জুলফিকার মুজতবা নাস্তা করতে করতে মেয়ের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মৃদু হাসি এবং মুখের ভঙ্গিও লক্ষ্য করেন। অত:পর বেশ সাবলীল গলায় প্রশ্ন করে বসে,

“ ছেলেটা কে? “

আকস্মিক প্রশ্নে মুখে অরেঞ্জ জ্যাম মাখা পাউরুটি মুখে পুরে রাখা নিশার গলায় খাবার আটকায়। শুকনো গলায় খাবার আটকে যাওয়ার ফলে তার কাশির ভারিক্কি উঠে। জুলফিকার মুজতবা বিচলিত হয় না। বরং পানিতে ভরপুর গ্লাসটা মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে ইশারা করে যেনো পানিটুকু খায়। ভীত নিশা কোনো রকম পানি পান করে নিজের আব্বুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

“ কোন ছেলের কথা বলছো আব্বু? “

“ যার সঙ্গে প্রতি রাতে কলে কথা বলো। “

চুরি করতে গিয়ে চোর ধরা পড়লে মুখভঙ্গি যেরকম হয় নিশার মুখখানাও তখন একই রকম দেখাচ্ছিলো। আব্বু কিভাবে টের পেলো? নিশা তো অত্যন্ত আস্তে এবং ফিসফিসিয়ে কথা বলে। আব্বুর তো টের পাওয়ার কথা নয়! নিশা গলা কিছুটা ভিজিয়ে এলোমেলো উত্তর সাজিয়ে বলতে নেয়,

“ আব্বু আমি আসলে… “

“ ইউ আর এ ব্যাড লায়ার নিশা। তাই অযথা মিথ্যা বলার চেষ্টা করবে না। আমি চাইলেই দু'দিন তোমাকে ফলো আপে রেখে ছেলেটার পরিচয় জানতে পারতাম। কিন্তু আমি তোমার মুখে সত্যিটা জানতে চাইছি। আশা করছি আমার থেকে কিছু লুকাবে না তুমি। “

নিশা জানে আর লুকানোর চেষ্টা করেও কোনো লাভ নেই। তাই সে বলে,

“ আব্বু, আমি তোমার থেকে কিছু লুকাতাম না। ট্রাস্ট মি। আমরা সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার এডমিশন এক্সামের ঝামেলাটা শেষ হলেই ভেবে রেখেছিলাম তোমাকে সব জানাবো। “

জুলফিকার মুজতবা ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ মেয়েকে দেখে প্রশ্ন করে,

“ ছেলে কি চট্টগ্রাম শহরেই থাকে? “

“ জি। “

“ সম্পর্কটা কতদিনের? “

নিশা মাথা নিচু করে ইতস্তত গলায় জবাব দেয়,

“ কিছু মাসের। “

জুলফিকার মুজতবা এবার নাস্তায় মনযোগ পেশ করে বলে,

“ নাস্তা সেরে ছেলেটাকে কল দিবে। জানাবে আমি দেখা করতে চাই। আজ, এই মুহুর্তেই। যদি বুকে সাহস নিয়ে আমার মুখোমুখি হতে পারে তাহলে বিবেচনা করে দেখবো। আর যদি বুকে সৎ সাহস নিয়ে আমাকে ফেস করতে না পারে তাহলে বলে দিবে আর কখনো যেনো মুখ তুলে আমার সামনে না আসে। দ্যা এন্ড বলে এই চ্যাপ্টার ক্লোজ করবে। “

আব্বুর কথার পিঠে নিশা কিংকর্তব্যবিমুঢ় বনে যায়। জুলফিকার মুজতবাকে বলার মতো একটাও কথা খুঁজে পেলো না সে। বাকিটুকু নাস্তা নীরবে খেতে খেতে মনে মনে নিজেকে দোষারোপ করে। তার আরেকটু সাবধান হওয়া উচিত ছিলো। সাইফ কি আসতে রাজি হবে? আর সাইফকে দেখে আব্বুরই বা রিয়েকশন কেমন হবে? আব্বু যদি বাংলা সিনেমার চৌধুরী সাহেবের মতো আচরণ করে? উফফ! আর ভাবতে পারছে না নিশা। মাথা ফেটে যাবে মনে হচ্ছে তার।

নাস্তা সেরেই রুমে ফিরে নিশা দ্রুত সাইফের নাম্বার ডায়াল করে। প্রথম দু'বার কল হলেও সাইফ রিসিভ করে না। নিশা অস্থির হয়ে উঠে। তৃতীয় বার কল করতেই এবার কলটা রিসিভ হয়। সাইফ বলে উঠে,

“ আমি ওয়াশরুমে ছিলাম… “

“ সাইফ আপনাকে এই মুহুর্তে বাসায় আসতে হবে। আর্জেন্ট। দ্রুত আসুন। “

নিশার অস্থির স্বর শুনে সাইফ চিন্তিত সুরে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে ইয়াসমিন? এভ্রিথিং অলরাইট? আপনি ঠিক আছেন? “

“ আব্বু জেনে গিয়েছে সাইফ। উনি জানেন আমার কারো সঙ্গে সম্পর্ক আছে। আপনার নাম যদিও এখনো জানে না। তবে বলেছে এই মুহুর্তে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। আপনি আসলে উনি বাকিটা বিবেচনা করবেন আর নাহলে চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দিতে বলেছেন। আপনি আসবেন না সাইফ? এই মুহুর্তে আসতে পারবেন? “

সবটা শুনে সাইফ শান্ত হলো। নিশ্চিন্ত গলায় বলে,

“ আরে বাহ! শশুর আব্বা একদম আমার কার্বন কপি। হেব্বি চালু। যদিও আমার মেয়ে প্রেমে পড়লে আমি প্রথম দেখাতেই বুঝে যেতাম। এই দিক দিয়ে আমি শশুর আব্বার থেকে আগায় থাকবো। “

সাইফের গা ছাড়া কথায় নিশা রাগ হয়। গরম গলায় বলে,

“ সবসময় ফাইজলামি ভালো লাগে না সাইফ। আমার এদিকে জান যায় অবস্থা। আর আপনি মজা নিচ্ছেন? “

“ প্রথম কথা হচ্ছে আপনি একটু ঠান্ডা হোন। এতো ভয় পেলে চলে? তামজিদ সাইফ যেই মেয়ের প্রেমিক সেই মেয়ে হবে নির্ভীক। এমন ছেলে হাজার বছরে একবার পৃথিবীতে আসে। সাধনা করে মেয়েরা এমন প্রেমিক চায়। গিয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে চিল করুন। আমি আসছি। আর শুনুন। পারলে শশুর আব্বাকে একটু পর পর ঠান্ডা পানি খাওয়ান। ইউ নো? মাথা ঠান্ডা থাকবে তাহলে। “

__________

সাইফ এসে পৌঁছালো ঠিক এক ঘন্টা পর। জুলফিকার মুজতবা তখন লিভিং রুমে বসে ফোনে জরুরী আলাপে ব্যস্ত ছিলো। কলিং বেলের শব্দ পেয়ে নিশা গুটিগুটি পায়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসে। লিভিং রুমের সামনে এসে একবার জুলফিকার মুজতবার দিকে তাকায় অনুমতির আশায়। জুলফিকার মুজতবা ফোনে কথা বলা অবস্থায়ই চোখের ইশারায় বলে দরজা খুলতে। নিশা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যায়। দরজা খুলতেই দেখে সাইফ দাঁড়িয়ে আছে। দু হাত ভর্তি হাবিজাবি প্যাকেট। দেখেই বুঝা যাচ্ছে মিষ্টির প্যাকেট।

নিশার হাতে প্যাকেট গুলো ধরিয়ে দিয়ে সাইফ ধীরে সুস্থে ঘরে প্রবেশ করে। হাতের কিছুটা বামে ঘুরে এগিয়ে যেতেই লিভিং রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। জুলফিকার মুজতবা কথা বলতে বলতে আনমনে সামনে তাকাতেই খানিকটা চমকে যায়। মুহুর্তেই নিজের বিস্ময়তা চেপে গিয়ে স্বাভাবিক সাজার চেষ্টা করে। মনে তখনো উনার অবিশ্বাস কাজ করছে। সাইফ আর নিশার যোগসূত্র কোনো ভাবেই মেলাতে পারছেন না।

জুলফিকার মুজতবা কথা শেষ করে ফোনটা রেখে সাইফের দিকে তাকায়। সাইফ সৌজন্যমূলক হেসে বলে,

“ আসসালামু আলাইকুম স্যার। আমি তামজিদ সাইফ। মিস ইয়াসমিনের প্রেমিক এবং আপনি চাইলে আপনার ভবিষ্যৎ জামাতা আরকি। “

সাইফের অদ্ভুৎ পরিচয় পর্বে জুলফিকার অবাক হয় না। এই ছেলেটাকে উনি যতদূর চিনে সেই হিসেবে এরকম অদ্ভুৎ কথা সাইফের সঙ্গে মানানসই। তিনি গম্ভীর স্বরে বলে,

“ হ্যাভ এ সিট। “

সাইফ ধন্যবাদ বলে জুলফিকারের মুখোমুখি একটা সোফায় এসে ভদ্র ছেলের মতো বসে। নিশা ভীত ভঙ্গিতে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। জুলফিকার মুজতবা তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ মেহমান এসেছে আম্মু। রান্নাঘরে যাও। নাস্তা পানির ব্যবস্থা করো। “

নিশা যাওয়ার আগে কেবল নিচু গলায় সাইফকে প্রশ্ন করে,

“ আপনার চায়ে চিনি কয় চামচ দিবো? “

সাইফ স্বাভাবিক গলায় বলে,

“ আপনার যা ভালো মনে হয় ইয়াসমিন। “

জুলফিকার মুজতবা লক্ষ্য করে সাইফের নিশাকে আপনি বলে সম্বোধন করাটা। নিশা চলে যেতেই জুলফিকার বলে,

“ আমার মেয়ের পক্ষে তো প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া সম্ভব নয়। তারমানে প্রস্তাবটা নিশ্চয়ই তোমার পক্ষ থেকে ছিলো? “

“ জি স্যার। “

“ এসব প্রেম ভালোবাসার চিন্তাও আমার মেয়ের মাথায় আসার কথা নয়। তারমানে এসব নিশ্চয়ই তুমি ওর ব্রেইনে ইনপুট করেছো? “

সাইফ হাসে সামান্য। তারপর বলে,

“ ইয়াসমিন অত্যন্ত সরল স্যার। কথাটা আমরা দু'জনই জানি। কিন্তু তাই বলে উনার ব্রেইনওয়াশ করি নি আমি। আমি শুধু নিজের মনের কথা জানিয়েছিলাম। প্রস্তাব গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ উনার উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি। উনি নিজ থেকে আমাকে নিজের উত্তর জানিয়েছেন। জানিয়েছেন যে আমাদের ফিলিংস মিচুয়্যাল। “

জুলফিকার নীরব থেকে প্রশ্ন করে,

“ নিশাকে নিয়ে তোমার প্ল্যান কি? “

“ প্রমোশনের অপেক্ষায় আছি স্যার। আল্লাহর ইচ্ছা এবং আপনার সম্মতিরও অপেক্ষা করছি। তারপর ইয়াসমিনকে বউ বানিয়ে আমাদের বাসায় নিয়ে যাওয়াটাই আমার প্ল্যান। “

সাইফের সোজাসাপ্টা কথায় বারবার নিজের সাজানো প্রশ্ন ভুলে বসছেন জুলফিকার সাহেব। ছেলেটা খুব স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। জুলফিকার মুজতবা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট টের পাচ্ছেন ছেলে মোটেও মিথ্যা বলছে না। তার অকপটে কথার মাঝে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। তবুও জুলফিকার মুজতবা বলে,

“ বিয়ে করা মানে শুধু কবুল বলা না। দায়িত্ব নিতে জানাটাও গুরুত্বপূর্ণ। ওর দায়িত্ব নিতে পারবে তুমি? সেরকম প্রস্তুতি আছে? “

“ জি স্যার। আর্মিতে কাজ করার দরুণ বউকে নিয়ে কোয়াটারে থাকার সুযোগ আছে যদিও। কিন্তু আমার ইচ্ছা আমাদের নিজেদের একটা বাসা হবে। জানেনই তো আমার কখনো নিজের বাসা ছিলো না। হোস্টেল, মেস এসবে থেকেই বড়ো হয়েছি। আর তাছাড়া ঘর তো পরিবার দিয়েই হয়। আগে পরিবার ছিলো না তাই ঘরও ছিলো না। তবে আমার একাউন্টে ভালো একটা এমাউন্ট জমা পড়ে আছে। আর প্রায় এক বছর চাকরিটা কন্টিনিউ করলেই কাঙ্ক্ষিত এমাউন্টটা পূরণ হবে। তারপর একটা এপার্টমেন্টে ইউনিট কেনার ইচ্ছা আছে। চট্টগ্রাম শহরেই কিনবো ইনশাআল্লাহ। ইয়াসমিনও এই শহরটাকেই বেশি ভালোবাসে। বাকি দায়িত্বও ইনশাআল্লাহ সামলে নিবো। ইয়াসমিনকে নিয়ে কখনো অভিযোগের সুযোগ দিবো না আপনাকে। “

জুলফিকার মুজতবার প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক দেখা গেলো। মেয়ের প্রেমিক বলেই বিন্দুমাত্র ছোট করে কিংবা অদ্ভুৎ কথা বলে সাইফকে বিভ্রান্ত করলো না। বরং চুপচাপ সাইফকে দেখছেন তিনি। সাইফ নিজ থেকেই আবার বলে উঠে,

“ ফ্যামিলির মর্ম আমি আর ইয়াসমিন দু'জনেই ভালো করে বুঝি স্যার। আমাদের দুজনের ইন্টেনশন আর ইচ্ছে পানির মতো স্বচ্ছ। ব্রোকেন ফ্যামিলি থেকে বিলং করার কারণে ইয়াসমিন মারাত্মক বিষন্নতায় ভুগে। আমি নিজের সঙ্গে উনার ফ্যামিলিটাও পূরণ করতে চাইছি। প্রত্যেক ঈদে কিংবা বিশেষ দিনে উনার মনে একটা দ্বিধা কাজ করে, যে আম্মুর সঙ্গে আজকের দিনটা থাকবে নাকি আব্বুর সাথে। আমি চাইনা উনি সেরকম কোনো দ্বিধা নিয়ে বিশেষ দিনগুলো অপূর্ণতার অনুভূতি কাটাক। আমাদের বিয়ের পর প্রত্যেকটা বিশেষ দিনে উনার আব্বু কিংবা আম্মুর মাঝে একজন বেছে নিতে হবে না। বরং আপনারাই নাহয় তখন নিজেদের মেয়ের খুশিটাকে বেছে নিয়ে আমাদের বাসায় আসবেন। আমার আর কিছু বলার নেই স্যার। বাকিটা আপনার এবং ম্যাডামের সিদ্ধান্ত। আপনারা মেয়ের প্যারেন্টস। আপনাদের সম্পূর্ণ রাইট আছে উনার ভালো মন্দের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। “

জুলফিকার মুজতবা আর কিছু বলার পূর্বেই নিশা ট্রে হাতে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে। ট্রে টা টি টেবিলে রাখতে রাখতে সে পরিস্থিতি আন্দাজের জন্য একবার নিজের আব্বুর দিকে তাকায়। জুলফিকার মুজতবার ফোনটা বেজে উঠায় উনি ফোনটা সবে হাতে নিয়েছেন। মুখভঙ্গি স্বাভাবিক না গম্ভীর তা ঠাওর করতে হিমশিম খাচ্ছে নিশা। সে আড়চোখে এবার সাইফের পানে তাকায়। সাইফ তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। নিশাকে তাকাতে দেখেই সে হেসে চোখ টিপে। নিশা ভীমড়ি খায়। ডর ভয় নেই নাকি লোকটার? যার কাছে মেয়ে চাইতে এসেছে তার সামনে বসেই তার মেয়েকে চোখ টিপ মারছে! কি দুঃসাহসিক!

__________

গত দুপুরে পরিবার সমেত চট্টগ্রামে ফিরেছে দূর্জয়। সঙ্গে এসেছেন সুহালা বেগমও। যদিও সুহালা বেগমের আসার কথা ছিলো না। তবে উনার আসার পিছনে একটা বিশেষ কারণও রয়েছে। কারণটা অবশ্য এখনো উনি কাউকে জানায় নি। তবে সময়মতো কাজটা সারবেন তিনি।

রাতে খেতে বসেই দূর্জয় কথা তুলে সে প্ল্যান করেছে মা, স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে এখানকার কোনো এক সী বীচে ঘুরতে যাবে কালকে। সুহালা বেগম সুযোগে বলে উঠে,

“ আমি যাবো না। “

দূর্জয় অবাক হয়ে জানতে চায়,

“ কেনো? “

সুহালা বেগম আফরার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,

“ আমার আর আফরার আলাদা প্ল্যান আছে। তাই না আফরা? “

আফরা হেসে মাথা নাড়ে। এই নতুন নাম ধরে কেউ ডাকলে খুব মজা পায় সে। নামটা শুনতেও বেশ কুল লাগে তার কাছে। আগের নামটাও তার পছন্দের ছিলো। কিন্তু মাম্মা তো বুঝিয়েছে যে ওই নামটার অর্থ ভালো ছিলো না। সেজন্যই তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তাই আফরাও আর তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে নি। ভদ্র বাচ্চার মতো সবটা বুঝে নিয়েছে।

বাণী সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,

“ কি প্ল্যান? “

আফরা জবাব দেয়,

“ নেক্সট দু'দিন আমি আর দীদা একসঙ্গে ঘুরবো। আমাদের সাথে আর কেউ এলাউড না। মাম্মাও না, বাবাও না। “

বাণী আর দূর্জয় অবাক হয়ে সুহালা বেগমের দিকে তাকায়। সুহালা বেগম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,

“ এখন কি আমি আমার নাতনির সঙ্গে দুটো দিন নিজের মতো স্পেন্ডও করতে পারবো না? “

বাণী মাথা নেড়ে বলে,

“ তা বলি নি মা। অবশ্যই স্পেন্ড করুন। কিন্তু আফরাকে একা আপনি সামলাতে পারবেন? “

সুহালা বেগম হেসে বলে,

“ কেনো পারবো না? দুটো ছেলে বড়ো করেছি না? আর আফরা তো একদম গুড গার্ল। ও প্রমিজ করেছে দীদার সব কথা মেনে চলবে। তুমি জানো না, দীপ্ত ছোটবেলায় মারাত্মক দুষ্ট ছিলো। ওকেও আমি একা হাতে সামলাতাম। “

দূর্জয় খাবার খেতে খেতে বলে,

“ সমস্যা নেই। তোমরা ঘুরো। দু'দিন পরেই নাহয় আমরা একসাথে সী বীচে যাবো। “

সুহালা বেগম আঁতকে উঠে,

“ আমাদের কারণে প্ল্যান কেনো চেঞ্জ করবে তুমি? বরং একটা কাজ করো, তুমি আর বাণী গিয়ে দুটো দিন সুন্দর যে-কোন বীচ থেকে ঘুরে আসো। ওখানে অনেক সুন্দর রিসোর্টও আছে। একটা রিসোর্ট বুক করে নাও দু'দিনের জন্য। আমরা আমাদের মতো ঘুরলাম, তোমরা তোমাদের মতো। “

বাণী এবং দূর্জয় এতক্ষণে সুহালা বেগমের ইঙ্গিত বুঝতে পারে। দূর্জয় বাণীর সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। মৃদু অস্বস্তি নিয়ে মা'য়ের দিকে তাকায়। বাণী কি ভাবছে কে জানে! হয়তো মনে করছে তাকে তার মেয়ে থেকে দূরে রেখে ধরে বেধে দূর্জয়ের সঙ্গে ঘুরতে পাঠাতে চাচ্ছে।

আফরা বলে উঠে,

“ ইয়েস। ইউ গাইস ক্যান ইঞ্জয়। আমি আর দীদা এলোন টাইম স্পেন্ড করবো। “

দূর্জয় মানা করতে নিলেই সেই মুহুর্তে বাণী বলে উঠে,

“ আচ্ছা। কিন্তু তোমাকে দীদার সব কথা শুনতে হবে। আর মেডিসিন সব টাইম মতো নিতে হবে। ওকে বাচ্চা? “

আফরা মাথা নেড়ে বুঝায় সে সব কথা শুনতে রাজি। দূর্জয় বাণীর কথা শুনে বিস্মিত হলেও কিছু বলে না। খাওয়া শেষে রুমে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর বাণী রুমে আসতেই প্রশ্ন করে,

“ তুমি মামণির মন রাখতে রাজি হয়েছো। তাই-না? “

বাণী স্বাভাবিক গলায় বলে,

“ মন থেকেই রাজি হয়েছি। কেন? আমি একা তোমার সঙ্গে গেলে বিরক্ত হবে তুমি? “

দূর্জয় বাণীকে কিছুক্ষণ সূক্ষ্ণ নজরে পরখ করে বলে,

“ আফরাকে ছাড়া দুটো দিন তুমি থাকতে পারবে? “

“ মা ওর খেয়াল রাখবে। আমার ভরসা আছে। “

“ সেটা আমিও জানি। আমি তোমার কথা জানতে চাইছি। তুমি থাকতে পারবে? “

“ আগেও তো মেয়েকে ছাড়া থেকেছি। তখন যদিও মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে মন ছটফট করেছে। এবার তো আর সেই চিন্তা নেই। শি ইজ ইন সেফ হ্যান্ডস। “

দূর্জয় বেশ কিছুক্ষণ বাণীকে দেখে বলে,

“ এজ ইউর উইশ। “

বাণী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মনে মনে সে গভীর ভাবনায় বিভোর। সে ভালো করেই জানে মা তাকে আর দূর্জয়কে কিছুটা একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ করে দিতে চাচ্ছে। যেটা সম্পূর্ণ ভুল নয়। বিয়ের পর থেকে সে আর দূর্জয় হাজব্যান্ড ওয়াইফের থেকে বেশি আফরার প্যারেন্টস হিসেবেই থাকছে। আফরা নাহয় তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দূর্জয়ও তো এই সম্পর্কটা থেকে কিছুটা হলেও ডিজার্ভ করে। তার ও তো নিজের ওয়াইফের সঙ্গে দুটো দিন একান্তে কাটাতে ইচ্ছে হতেই পারে। যদিও দূর্জয় কখনোই তা মুখ ফুটে বলবে না। সম্পর্কটা স্বাভাবিক করে তুলতে হলে স্বার্থপরের মতো বাণী কেবল নিজের দিকটা দেখলেই তো হবে না। তাকে সবটাই দেখতে হবে। নিঃস্বার্থ ভাবে যেই মানুষটা নিজের সম্পূর্ণ জীবনটাই বাণী আর আফরার জন্য মনোনীত করলো, সে অন্তত এই দুটো দিন তো বাণীর কাছ থেকে প্রাপ্যই তাই না?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন