ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৭২তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৭২.

রাতের অন্ধকার নেমেছে তখন চট্টগ্রাম শহরের বুকে। শীতল আবহাওয়াটা খুব প্রকোপ রূপ ধারণ করেছে। গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠে। বাধভাঙ্গা এই শীতের মাঝেও এক জোড়া তরুণ তরুণীর প্রেম বাধ মানছে না। ফিসফিস করে কথার ঝুলি খুলে বসেছে তারা।

ফোনের এপাশের তরুণী অতি আদুরে স্বরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজিয়ে বসেছেন। কথাগুলো অনেকটা এরকম,

“ শুনুন, বিয়ের পর আপনার কোথাও পোস্টিং হলেও আমি চট্টগ্রামেই থাকবো। আমার মনে হয় কি জানেন? এই শহর, এখানকার আবহাওয়া আর সমুদ্র ছেড়ে দূরে গেলেই আমি মারা পড়বো। চট্টগ্রামের বাহিরে টেকা আমার পক্ষে সম্ভবই না। আমি স্বার্থপরের মতো নিজের কথা ভেবে চট্টগ্রামে থেকে গেলে কি আপনি খুব রাগ করবেন? বউ ছাড়া দূরে থাকতে কি আপনার খুব অসুবিধা হবে? “

ফোনের অপর পাশের তরুণ সজাগ গলায় উত্তর দেয়,

“ সত্যি বলবো? আজকাল আমারও মনে হয় এই শহর ছেড়ে দূরে যেতে আমার খারাপ লাগবে। দূরে গেলেও মনটা এই সমুদ্রের তীরেই রয়ে যাবে। ইয়াসমিনের কাছে থেকে যাবে। “

নিশা খানিক লাজুক হাসে। পর মুহুর্তেই মন খারাপ করে বলে,

“ যেকোনো সময়ই আপনার ডাক পড়বে তাই না? চট্টগ্রামের মিশন’টা তো শেষ। এখন অন্য জেলায় যাওয়ার পালা তাই না? “

“ আমি শিওর না। আমার কাজ হচ্ছে শুধু অর্ডার মানা। যে-ই অর্ডারই দিক না কেন তা মানতে বাধ্য আমি। “

নিশার মনটা আবার খারাপ হয়ে যায়। একজন সৈন্যের মেয়ে হওয়ার দরুণ এই ব্যাপারটা সে বেশ ভালো করেই বুঝে। তাই সাইফকে এই ব্যাপারে কিছু বলে না সে। তবে তার ভয় হয়। শুনেছে দূরে গেলে নাকি সম্পর্কের সুতোয় টানা পড়ে। একটা সময় সুতোটা পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়। যদি তার আর সাইফের বেলায়ও তাই হয়?

নিশা না-হয় সাইফের অপেক্ষা করতে পারবে। কিন্তু সাইফ? উড়নচণ্ডী স্বভাবের লোকটা নিশার ভালোবাসাতেই আটকে থাকতে পারবে তো? দূরত্বটা সাইফের ভালোবাসাকে ম্লান করে দিবে না তো? প্রশ্ন গুলো নিশাকে ভাবায়। অভার থিংকিং এ ব্যস্ত নিশার নীরবতা সাইফ বুঝতে পারে। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে সে বলে উঠে,

“ আমি ভালোবাসা ভাগ করতে শিখি নি ইয়াসমিন। মনে জমানো অনুভূতি, আবেগ কিংবা ভালোবাসা যা-ই বলেন না কেনো, তা বিলানোর জন্য মানুষ পাইনি কখনো। জীবনের চব্বিশটা বছর পাড় করে এসে যখন কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে পেলাম, তখন নিজের সবটুকু শুদ্ধ অনুভূতি বিলিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করি নি। উজার করে সবটা আপনার নামেই দলিল করে রেখেছি। তাই কোনো ধরনের ভয় মনে থাকলে তা মুছে ফেলুন। যা আপনার তা আপনারই থাকবে। মুছবেও না, কারো ভাগও বসবে না। “

সাইফের কথায় জাদু আছে নাকি জানা নেই নিশার। তবে প্রত্যেকবার এই লোকটার কথাগুলো তার কাছে মেডিসিনের মতো কাজ করে। নিশার ভয়, সংশয়, দ্বিধা সবই সেই মেডিসিনের ন্যায় কথার কার্যকারিতায় দূর হয়ে যায়। নিশা হঠাৎ নিষ্প্রভ গলায় বলে উঠে,

“ রিসেন্টলি একটা জিনিস পড়েছি জানেন? “

“ কি জিনিস? “

“ মৃত্যুর পর নাকি ৭ মিনিট পর্যন্ত একটা মানুষের ব্রেইন সেল সচল থাকে। “

“ সিরিয়াসলি? আমার জানা ছিলো না। মেডিক্যালের ব্যাপারে আমার ধারণা কম। “

“ আমারও জানা ছিলো না। জাস্ট নিউজফিডটা স্ক্রল করার সময় একটা আর্টিকেল সামনে আসে। ওইট পড়ে জানতে পেরেছি। “

“ ওহো। বাই দ্যা ওয়ে, ওই ৭ মিনিট ব্রেইন সেলটা ঠিক কি কাজ করে? নাকি নাম্ব হয়ে যায়? “

“ উঁহু। নাম্ব হয় না। আমি পড়েছি ওই ৭ মিনিট নাকি ব্রেইন সেল জীবনের সব সুন্দর স্মৃতিগুলোকে ফ্ল্যাশব্যাক মেমোরির মতো প্লে করে। “

“ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো! “

নিশা এবার নিবিড় স্বরে বলে,

“ এই স্টেটমেন্টের সত্যতা কতদূর আমার জানা নেই। কিন্তু স্টেটমেন্টটা যদি সত্যি হয়, তাহলে আপনি আমার জীবনের সেই ৭ মিনিট হবেন বলে আমি মনে করি। “

নিশার সোজাসাপ্টা কথার পিঠে স্তব্ধ বনে যায় সাইফ। পরমুহূর্তে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে তীর্যক হাসি। প্রেমে কাবু প্রেমিকার আবেগ মিশ্রিত বোকা ও অদ্ভুৎ সব কথাবার্তা তাকেও কাবু করে ফেলে।

__________

কত দিন-ই বা হলো সাদাতের মৃত্যুর? একটা মাসও এখনো পেরোয় নি। অথচ অমানুষ গুলো ইতিমধ্যে সাদাতের পরিবারের পিছনে হাত ধুয়ে পড়েছে। বুঝে নিতে চাইছে জায়গা জমির ভাগ। সদ্য ছেলে হারানো সাদাতের মা এই পরিস্থিতিতে নেই যে এসব জমির ঝামেলা নিয়ে বোঝাপড়া করবেন। উনার কাছে এই মুহুর্তে পুরো পৃথিবীটা থেকেও যেনো নেই। আর সায়রা? সে-তো হাত পায়ে লম্বা হলেও বয়স এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে এখনো যথেষ্ট ছোট। তাই পরিবারের দিকে তেড়ে আসা কঠিন এই সমস্যার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সাওদা। দায়িত্বটা তো এখন তারই। ভাইয়া তো তাকেই বলে গিয়েছে যে মা আর সায়রার খেয়াল রাখতে। সে-ই কথা ফেলার সাধ্য কি সাওদার আছে?

কিন্তু দুটো দিনেই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যেনো সে। প্রতিদিন এরকম অনেক বিষয়ের সাক্ষী হচ্ছে সে যা সম্পর্কে এতদিন তার কোনো ধারণাই ছিলো না। ভাইয়াটা কি মানুষ ছিলো নাকি অন্য কিছু? এতো জোট ঝামেলা সে সামলাতো, অথচ বাসায় কাউকে কখনো টেরও পেতে দিতো না। কিভাবে পারতো এতো নিখুঁত ভালো থাকার অভিনয় করতে?

আজকের তিক্ত দিনটার সূচনা হয়েছে সাওদার এক চাচীর আগমনের মাধ্যমে। প্রথম বিশ মিনিট মহিলা দু চারটে শান্তনা বাক্য আওড়ালেও ধীরে ধীরে উনি নিজের কথার মোড় ঘুরান। সাওদার মায়ের কানে তুলে দেয় সাওদার জন্য এক প্রস্তাবের কথা। ভালো মানুষীর সুর টেনে বুঝাতে থাকেন সাওদার বিয়েটা দিলে ঠিক কি কি উপকারিতা পাবেন তারা। মাথার উপর বাপ ভাইয়ের ছায়াহীন একটা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে অন্য ঘরে তুলে দেওয়া কতটা কঠিন সেই সম্পর্কেও ধারণা দেন তিনি।

পাশের রুম হতে চাচীর সুর টেনে বলা কথাগুলো সাওদা শুনতে পায়। মেয়ে যেহেতু হয়েছে সেহেতু ঘরে বিয়ের প্রস্তাব আসতেই পারে। কিন্তু সাওদার সমস্যাটা হলো চাচীর নিয়ত আর প্রস্তাব রাখা পাত্রকে নিয়ে। প্রথমত সে ভালো করেই জানে, এসব জমিজমার ব্যাপারে সে অমানুষ গুলোর পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই বিয়ের মাধ্যমে তাকে দ্রুত দূর করতে চাইছে তার চাচী এবং চাচাতো ভাইরা। আর দ্বিতীয়ত যেই পাত্রর প্রস্তাব নিয়ে ভদ্রমহিলা হাজির হয়েছে সেই পাত্র আর কেউ-ই নয় বরং তারই এক চাচাতো ভাই। কিঞ্চিৎ পরিমাণ সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

সবটা শুনে সাওদা চুপ থাকতে পারে না। শরীরে বহমান ফুটন্ত গরম রক্ত নিয়ে পাশের রুমে এসে উপস্থিত হয়ে সোজাসাপ্টা বলে উঠে,

“ আমাকে নিয়ে এতো ভাবার জন্য ধন্যবাদ চাচী আম্মা। কিন্তু আমি এখন বিয়ে করতে আগ্রহী নই। সুতরাং আমার জন্য ভাবাভাবির কাজটা আপনার আর করতে হবে না। “

ধিংড়ি মেয়ের কাটকাট জবাবে পান চিবুতে ব্যস্ত মহিলার গায়ে ফোস্কা পড়ে। তিনি জ্বলে উঠে বলেন,

“ কি দিনকাল আসলো রে বাবা! মাইনষের ভালা চাইলেও দোষ। এ লো ছেড়ি, আমার পোলার জন্য তোর প্রস্তাব আইছে এইডা তো তোর সাত কপালের ভাগ্য। শুকরিয়া আদায় না কইরা চটাং চটাং জবাব দেস। কিয়ের এতো অহংকার তোর? “

সাওদা ফুসে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে,

“ আপনার ছোটলোক ছেলের প্রস্তাবে শুকরিয়া জানানোর মতো কিছুই আমি খুঁজে পাই নি চাচী আম্মা। সবটা আপনাদের সাজানো ফাঁদ। বিয়েকে পুঁজি করে আমার বাপ ভাইয়ের ভাগের জমিটুকু হাতিয়ে নিতে চাচ্ছেন। আমার ভাই বেঁচে থাকতেও যেমন পারেন নি, আমি বেঁচে থাকতেও পারবেন না। তাই বৃথা চেষ্টা বন্ধ করুন। “

সাপের মতো ফোসফাস করতে করতে এইবার সেই মহিলা গর্জে উঠে,

“ সাদাতের মা। এমন কুলাঙ্গার এক একটা পেটে ধরসো নি তুমি? বুঝতে পারসি তো কার ভাষায় কথা কইতাসে তোমার মাইয়ারা। ভাইয়ে এসব শিখায় দিয়া গেসে তাই না? উপরে উপরে সাধু সাইজ্জা, তলে তলে ভাইয়ে এসব গুটি পাকাইসে। “

সাদাতের মা কিছু বলতে নিবে তার আগেই সাওদা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। মাত্রারিক্ত রাগ সামলাতে না পেরে হাতের কাছে থাকা রিমোটটা মহিলার কপাল বরাবর ছুড়ে মারে। তেড়ে এসে বলে,

“ আমার ভাইয়ের নাম মুখে নিলে জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো। “

সাওদার মা এগিয়ে এসে দ্রুত মেয়েকে থামানোর চেষ্টা করেন। ওদিকে চাচী নিজের কপাল চেপে ধরে অস্রব্য ভাষায় গালাগাজ এবং অভিশাপ বাক্য ছুড়তে ছুড়তে বেরিয়ে যান। সাওদাকে দমানো মুশকিল হয়ে পড়ছিলো। অতিরিক্ত মানসিক চাপ তাকে উগ্র ও হিংস্র করে তুলেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো যেনো একশো জ্বিনের শক্তি তার উপর ভর করেছে।

সাদাতের মা'র ধৈর্য্য শক্তি বাঁধ মানে। রাগে তিনি মেয়ের গালে এলোপাথাড়ি দু চারটে চড় দিয়ে বলে,

“ এই শিক্ষা দিসি তোরে আমি? এই শিক্ষা দিসি? বড়দের গায়ে হাত তুলোস তুই? তুই যে-ই মহিলার গায়ে হাত তুলসোস ওই মহিলা এখন সবাইরে বইলা বেড়াইবো আমি আমার পোলাপাইনরে কোনো শিক্ষা দেই নাই। এইডাই চাইতি তুই? আর ওই মহিলারে তুই চিনোস? সরাসরি কুফরি কালামের সাথে জড়িত। অপমানের ঝাল মিটাইতে ওই মহিলা এখন কালোজাদু করাইলে? বাঁচবি তুই? বল বাঁচবি? “

দরজার আড়ালে দাঁড়ানো সায়রা তখন ভয়ে কাঁদছিলো। সাওদা আর এক দন্ড অপেক্ষা করে না। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। গায়ে জড়ানো ওড়নাটা মাথায় টেনে দিক বেদিক ভুলে দৌড়ানো শুরু করে সে। সব অসহ্যকর লাগছে তার।

সাওদার পা জোড়া গিয়ে থামে বাউন্ডারি তোলা একটা জমির বাহিরে। জমিটা তাদেরই। বাউন্ডারির ভেতর এই জমিতেই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে তার বাবা আর ভাইয়ের লাশ শায়িত অবস্থায় আছে। এই জমিটার দখল নেওয়ার জন্যই অমানুষ গুলো ওঁৎ পেতে আছে। সাওদা নিশ্চিত কোনো মতে ওরা এই জমির ভাগ পেলে তার বাবা আর ভাইয়ার শেষ ঠিকানাটুকুরও আর অস্তিত্ব থাকবে না।

সাওদা একবার ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও শেষমেশ আর ভেতরে যায় না। তার মা বলে কবরস্থানে মেয়ে মানুষের না যাওয়াই ভালো। কতগুলো ইটের স্তুপের উপর হাঁটু ভাজ করে বসে পড়ে সাওদা। জীবনের ঠিক এই মুহুর্তে একটা বুঝদার কাধের অভাব খুব পোড়াচ্ছে তাকে। বাবা চলে যাওয়ার পর ভাইয়ার কাধে মাথা রেখে অনায়াসে কাদতে পেরেছিলো ও। কিন্তু আজ যখন খুব কান্না পাচ্ছে তখন ভরসা করার মতো কোনো কাধ নেই তার কাছে। অপ্রতিরোধ্য ভাবটা চিড়ে বুকে জমে থাকা কান্না গুলো বেরিয়ে আসে। সাওদা দু'হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে উঠে। কান্নার দমকে তার সম্পূর্ণ শরীর কাপছে। কেবলমাত্র বন্ধুর কবর জিয়ারত সেড়ে বাউন্ডারির টিনের দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে আসা যুবকের চোখে পড়ে সে-ই দৃশ্য। সে আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে। উদাস নয়নে দেখে দৃশ্যটা।

দুটো দিন বন্ধ পাওয়ায় সে বন্ধুর কবরটা একবার জিয়ারত করতে এসেছিলো। এখানে আসার পূর্বে রিদওয়ানের কবরটাও জিয়ারত করে, তার পরিবারের সাথে দেখা করে এসেছে সে। ইচ্ছা ছিলো এখান থেকে সাদাতের বাসায় গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গেও দেখা করবে। কিন্তু এই মুহুর্তে কেনো জানি আর মন সায় দিচ্ছে না তার। সে যেভাবে নীরবে এসেছিলো, ঠিক সেভাবেই নীরবে বিপরীত রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করে। সাওদা টেরও পেলো না তা।

__________

এই যাত্রায় শান্তিকুঞ্জে আজ শেষ দিন বাণীর। আগামীকাল তারা চট্টগ্রামএ ফিরে যাবে। পাঁচ দিনের প্ল্যান করে আসলেও আফরার অসুস্থতার জন্য দুটো দিন বেশি ঢাকায় থাকা হয়েছে তাদের। ওদিকে দূর্জয়ের ছুটির আর কেবল আটটা দিন বাকি।

রাতের খাবার সেড়ে সুহালা বেগমের সঙ্গে উনার রুমে এসে হাজির হয়েছে বাণী। সুহালা বেগম বলেছিলেন বাণীকে কিছু পুরনো ফোটো এলবাম দেখাবেন। সেগুলো নিয়েই বসেছে দু'জন। এলবামের শুরুতেই দূর্জয়ের দাদা দাদীর কিছু ছবি দেখিয়ে তাদের সম্পর্কে কিছুক্ষণ গল্প করেন সুহালা। বাণী আগ্রহ নিয়ে শুনে তা। ধীরে ধীরে এলবামের পাতা উল্টোতেই সুহালা এবং রিফাতির বেশ কিছু ছবি সামনে আসে। দূর্জয়ের বাবার ছবি দেখে কিছুটা অবাক হয় বাণী। দূর্জয় অনেকটাই শাহরিয়ার রিফাতির মতোই দেখতে হয়েছে। সুহালা বেগম তখন নিজের আর স্বামীর ব্যাপারে আলাপ করছিলো। হঠাৎ বাণী আগ্রহবশত প্রশ্ন করে বসে,

“ বাবা কিভাবে মারা গিয়েছিলেন মা? “

আকস্মিক প্রশ্নটা করে বাণী নিজেই অস্বস্তিতে পড়ে যায়। মনে হয় যেনো ভুল কিছু জিজ্ঞেস করে ফেলেছে। তবে সুহালা বেগম অত্যন্ত সাবলীল ভাবে বলেন,

“ দূর্জয়ের ও লেভেল এক্সামের আগের দিকের ঘটনা। আমরা তখন সিলেটে ছিলাম। ওর বাবা তখন সীমানা অঞ্চলে মিশনে ছিলো। হঠাৎ একদিন খবর আসে ওর বাবা নাকি নিখোঁজ। দুটো ছেলে নিয়ে ওই শহরটায় একা ছিলাম আমি। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। নামাজে বসে দোয়া করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিলো না আমার কাছে। তিনটা বিভসৎকর দিন পাড় করার পর আমাদের কাছে খবর আসে হি ইজ নো মোর। উনার কারণেই মূলত আমরা সিলেটে শিফট করেছিলাম। যেহেতু উনিই আর ছিলো না তাই দূর্জয়ের পরীক্ষা শেষ হতেই আমি দুই ছেলেকে নিয়ে এই বাড়িতে শাশুড়ীর কাছে ফিরে আসি। “

বাণীর মনটা হঠাৎ খুব খারাপ হয়ে যায়। সে বিষণ্ণ নয়নে দেখতে থাকে সুহালা বেগমকে। কেউ যদি বাণীকে কখনো তার প্রিয় ব্যক্তিত্বের তালিকা বলতে বলে, তবে সেই তালিকায় সুহালা বেগমের নামও থাকবে। হঠাৎ কি ভেবে যেনো বাণী ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে আসে। জানতে চায়,

“ বাবার মৃত্যুর খবর আপনারা কত তারিখে পেয়েছিলেন মা? “

সুহালা বেগম জবাবে নির্দিষ্ট তারিখটা বলতেই বাণী কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করে। মুহুর্তেই সে বিস্মিত হয়। সুহালা বেগমের বলা তারিখের দু'দিন পূর্বেই তাদের র‍্যাগ ডে ছিলো। সেই দিনটা, যেদিন বাণী দূর্জয়ের সামনে ওই ইম্যাচিওর আচরণটা করেছিলো। ওই রকম ভয়ংকর একটা পরিস্থিতিতে বাণীর কর্মকান্ডে দূর্জয়ের ওরকম রিয়েক্ট করার কারণটাও এবার বেশ ভালো করে বুঝতে পারছে বাণী। লজ্জায় মরে যেতে মন চাচ্ছে বাণীর। যেই ছেলের বাবা কি-না তিনটা দিন ধরে নিখোঁজ ছিলো, বেঁচে আছে নাকি সেই খবরটুকুও তার অজানা, সেই ছেলের কাছে বাণীর ওই আচরণটা ঠিক কতটা বিরক্তিকর লাগতে পারে তা কিছুটা হলেও বাণী আঁচ করতে পারছে। লজ্জায় সে আর একটা কথাও বলে না।

সুহালা বেগম পেজ উল্টে তখনো নিজের মতো গল্প করে যাচ্ছেন। এলবামের পাতায় একটা ছবি দেখে থামেন তিনি। ছবিটা দূর্জয়ের বিএমএতে থাকা কালীন। ছবিতে দূর্জয়ের পাশে আরো দু'জন যুবককে দেখা যাচ্ছে। সুহালা বেগম হেসে বলেন,

“ এটা দূর্জয়ের বিএমএ ট্রেনিংয়ের সময়ের ছবি। সঙ্গে যে-ই দু'জনকে দেখছো না? ওরা দূর্জয়ের একমাত্র কাছের বন্ধু। বাম পাশের ছেলেটার নাম নিভ্রান আর ডান পাশের জন আয়াজ। “

সুহালা বেগম আরো কিছু বলতে নেন। তবে তার আগেই মৌটুসী এসে উপস্থিত হয় রুমে। বলে,

“ খালাম্মা। ভাইজান আপনারে আর ভাবীরে ছাদে যাইতে কইসে। “

সুহালা অবাক হয়ে বলেন,

“ এই রাতের বেলা? “

“ আমি তো জানি না খালাম্মা। আমারে খালি কইসে আপনাদের ডাইককা দিতে। “

বাণী প্রশ্ন করে,

“ আফরা কোথায় মৌটুসী? “

“ বহ্নি থুক্কু আফরাও ভাইজানের লগে উপরে আছে। “

সুহালা বেগম সামান্য রাগ হয়। এই রাতের বেলায় বাচ্চাটাকে নিয়ে ছাদে যাওয়ার মানে কি? কি ঠান্ডা পড়েছে বাহিরে! তার উপর মেয়ে বাচ্চাদের একটু নিয়ম কানুন মেনে চলা উচিত। ছাদ থেকে বাড়ির পিছনের পুকুর দেখা যায়। পুরো বাড়িতে কেবল ওই জায়গাটা সুহালা বেগমের খুব একটা পছন্দ নয়। মনে মনে ঠিক করেন দূর্জয়কে আলাদা করে ডেকে দুটো কড়া করে কথা শোনাবেন। মেয়ের বাপ হলে মেয়ের ভালো মন্দ সম্পর্কে সচেতনও হওয়া প্রয়োজন।

__________

গায়ে শীতের কাপড় জড়িয়ে ছাদে এসে উপস্থিত হতেই বাণী ও সুহালা বেগম দেখে ছাদের একপাশে পাটি এবং তার উপর চাদর বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা করেছে দূর্জয়। রয়েছে বেশ কিছু কুশনও। তার থেকে কিছুটা দূরেই বারবিকিউ চুলোর সেটাপ করা হয়েছে। কয়লা পুড়ে সেখানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। দূর্জয় সেই চুলোয় মুরগীর লেগ পিস গুলোতে ম্যারিনেটেড মশলা ব্রাশ করতে ব্যস্ত। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আফরা বেশ আগ্রহ নিয়ে একটা ছোট হাত পাখার সাহায্যে মৃদু বাতাস করছে।

সুহালা বেগম এগিয়ে গিয়ে অবাক গলায় বলে,

“ বারবিকিউর আয়োজন কখন করলে তুমি? আমি জানি না কেনো? “

আফরা দাঁত বের করে বলে,

“ সারপ্রাইজ! “

বাণী অবাক গলায় বলে,

“ ডোন্ট টেল মি এটা তোমাদের দু'জনের প্ল্যান ছিলো, আর আমাকে আর মা'কে এই ব্যাপারে কিছুই জানাও নি। “

দূর্জয় সামান্য হেসে বলে,

“ আমাদের ইনটেনশন শুধু তোমাদের সারপ্রাইজ দেওয়াই ছিলো। “

বাণী আফরার দিকে তাকিয়ে চোখ সরু করে বলে,

“ কি বাচ্চা? এতো তাড়াতাড়ি তুমি সাইড বদলে ফেললে? মাম্মাকে রেখে এখন বাবার সাথে সিক্রেট প্ল্যান করো তুমি, হ্যাঁ? “

দূর্জয় বলে,

“ সাইড তো মামণি চেঞ্জ করেছে। আমাকে রেখে তোমার সাথে বেশি আড্ডা চলে আজকাল। তোমাদের বেলায় দোষ নেই, আমাদের বেলায়ই সব দোষ? “

দূর্জয়ের স্বভাব বহির্ভূত কথার ধরনে বাণী বেশ মজা পায়। হেসে বলে,

“ আর ইউ জেলাস শাহরিয়ার দূর্জয়? “

“ নো আ’ম নট বাণী তালুকদার। “

সুহালা বেগম মুগ্ধ চোখে দেখে দৃশ্যটা। বিয়ের জন্য হ্যাঁ বললেও উনার মনে একটা খচখচানি ছিলো। এরকম একটা স্বাভাবিক আর সাবলীল সম্পর্ক আদৌ দুজনের মধ্যে তৈরী হবে কি-না তা নিয়ে বেশ দ্বিধা ছিলো উনার মনে। কিন্তু এই দৃশ্যটা উনার সেই দ্বিধা দূর করে দিয়েছেন। ছেলে মেয়ে দুটো নিজেদের মধ্যে সুখী থাকলেই উনি খুশি। ভালো থাকার জন্য আর কিছুর প্রয়োজন নেই তার।

প্রথম ব্যাচের চিকেন পিস গুলো হয়ে যেতেই দূর্জয় তা সার্ভ করে দেয় তিনজনের প্লেটে। নিজের আর মৌটুসী ও নোমান ভাইয়ের জন্য দ্বিতীয় ব্যাচে কিছু চিকেন পিস চুলার উপর দিয়ে সে এসে বাণীদের সামনে বসে। নিজ থেকে আগ্রহী গলায় বলে,

“ ম্যাডামদের জন্য কি এখন গান গেতে পারি? “

বাণী এবং সুহালা বেগম অবাক হয় দূর্জয়ের কথা শুনে। এই চাপা স্বভাবের ছেলেটা নিজ থেকে সেধে গান গেতে চাইছে? ব্যাপারটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? তাদের বিস্ময়তাকে পাশ কাটিয়ে আফরা প্রফুল্ল গলায় বলে,

“ ইয়েস বাবা। বাট ডোন্ট সিং বেবি শার্ক। আই হেইট দ্যাট সং, সো চাইল্ডিশ। “

দূর্জয় হেসে মাথা নাড়ে। তার চোখ গিয়ে পড়ে ছাদের এক কোণে চিলেকোঠার ঘরটার দরজার সামনে। হঠাৎ মনে হয় দরজার সামনে কিশোর বয়সের দীপ্ত দাঁড়ানো। আফরার মাঝে নিজের চঞ্চলতার ছাপ দেখে হাসি হাসি মুখ করে বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ভাইয়ের অবয়ব কল্পনা করে দূর্জয়ের ঠোঁটের কোণেও মৃদু হাসি ফুটে উঠে। সে হেসে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে বসে থাকা তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটা মানুষের পানে স্থির করে। খালি গলায় সনু নিগামের গাওয়া প্রিয় একটা গানের শেষ চরণ গুলো গায়,

“ হো ডোর সে টুটি পাতাঙ্গ জেসে

থি ইয়ে জিন্দেগানি মেরি,

আজ হো কাল হো মেরা না হো

হার দিন থি কাহানি মেরি,

এক বান্ধান নায়া পিছে সে

আব মুঝকো বুলায়ে,

আনে ওয়ালে কাল কে কিউ

ফিকার মুঝকো সাতা যায়ে।

এক এসি চুভান

ইস লামহে মে হে

ইয়ে লামহা কাহা থা মেরা?

আব হে সামনে

ইসে ছু লু যারা,

মার যাউ ইয়া জি লু যারা?

খুশিয়া চুম লু

ইয়া রো লু যারা,

মার যাউ ইয়া জি লু যারা?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন