ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার ব্যারিস্টার সাহেব

৮ম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ০৮

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

🚫⛔নাম ও হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

চৌধুরী ভিলার সকালের সেই ব্রেকফাস্টের পর ঘড়ির কাঁটা এখন দুপুর আড়াইটা ছুঁইছুঁই। দুপুরের কড়া রোদটা গুলশানের রাজকীয় বাড়িটার কাঁচের জানালাগুলোতে এসে এক অদ্ভুত ঝিলিক মারছে। সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনারের কারণে পুরো বাড়িটা বেশ ঠান্ডা, কিন্তু বাড়ির ভেতরের পরিবেশটা আজ অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত। অন্যসময় এই সময়ে পুরো বাড়ি নিঝুম হয়ে থাকত, তাওহীদ নিজের চেম্বারে বা স্টাডি রুমে ফাইলপত্র নিয়ে ডুবে থাকত আর তোহফা খাটের ওপর একা একা পুতুল নিয়ে খেলত। কিন্তু আজ চিত্রটা একদম আলাদা।

সিদরা দুপুরের নামাজ শেষ করে রান্নাঘরে গিয়ে হোম-মেড খালার সাথে কথা বলে তাওহীদের জন্য পছন্দের পাতলা ডাল, রুই মাছের ঝোল আর গরম ভাত রেডি করিয়ে এনেছে। তোহফাকে সে নিজের হাতে অল্প অল্প করে খাইয়ে দিয়েছে। খাওয়ানোর সময় তোহফা হাজারটা বায়না করেছে,

❝আম্মুউ, আমি মাছের কাঁটা খাবো না কিন্তু! কাঁটা খেলে আমার গলায় যদি ‘খুচ’ করে ফুটে যায়? তখন তোহফা খুব কান্নু করবে!❠

সিদরা প্রতিবার হেসে হেসে তোহফার মুখ থেকে মাছের একদম ছোট কাঁটাটাও বেছে বেছে আলাদা করে পরম মায়ায় খাইয়ে দিয়েছে।

নাস্তা ও দুপুরের লাঞ্চের পর তাওহীদ নিজের ঘরে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল। ঠিক বিকেল চারটে বাজতেই তোহফা গুটিগুটি পায়ে তাওহীদের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। তার পরনে এখন একটা হলুদ রঙের ফ্রক, আর দুই পাশের ঝুঁটি দুটো একটু ঢিলে হয়ে ঘাড়ের ওপর ঝুলে আছে। সে দরজায় দুবার ছোট ছোট হাত দিয়ে ‘টুক টুক’ শব্দ করে ভেতরে উঁকি দিল।

তাওহীদ বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটা আইনি ম্যাগাজিন পড়ছিল। দরজায় মেয়ের এই কিউট উঁকিঝুঁকি দেখে সে ম্যাগাজিনটা পাশে রেখে হাসিমুখে দুহাত বাড়িয়ে দিল,

❝কী ব্যাপার, আমার তোহফামণির ঘুম ভাঙল? দুপুরে আম্মুর সাথে ঘুমিয়েছিলে?❠

তোহফা ঘরে ঢুকে তাওহীদের বিছানার ওপর ধপ করে উঠে বসল। তারপর তাওহীদের গলা জড়িয়ে ধরে তার আধো-আধো মিষ্টি গলায় বলল,

❝হুম, আমি তো আম্মুর বুকে মাথা দিয়ে একদম জাদুর মতো ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আব্বুউ... এখন তো বিকেল হয়ে গেছে। বাইরে দেখো কত সুন্দর রোদ্দুর! তুমি প্রতিদিন বিকেলে আমাকে নিচে নিয়ে যাও না? আজকে আমরা নিচে যাবো না, আজকে আমরা অনেক বড় ছাদে যাবো!❠

তাওহীদ তোহফার এলোমেলো হয়ে যাওয়া ঝুঁটিটা একটু ঠিক করে দিতে দিতে বলল,

❝ছাদে যাবে মা? কিন্তু ছাদে তো এখন একটু রোদ আছে। আর তুমি একলা ছাদে গিয়ে কী করবে?❠

❝ধুরো আব্বু! আমি একলা যাবো কেন? আমি যাবো, তুমি যাবে, আর আমার নতুন আম্মুও যাবে! আমরা তিনজন একসাথে ছাদে গিয়ে ওই আসমানের পাখি দেখব, আর আইসক্রিম খাবো!❠

তোহফা তার দুই হাত গোল করে ঘুরিয়ে ছাদের বিশালতার একটা বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করল।

তাওহীদ এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। সে ভাবল, সিদরা তো সবসময় পর্দায় থাকে। এই ভর বিকেলে সে কি ছাদে যেতে কমফোর্টেবল বোধ করবে? ঠিক তখনই দরজার ওপাশে দেখা গেল সিদরাকে। তার পরনে একটা খুব সাধারণ কিন্তু মার্জিত বেগুনি রঙের সুতি ওড়না আর সালোয়ার কামিজ। মাথায় ওড়নাটা খুব সুন্দর করে হিজাবের মতো জড়ানো। তার হাতে একটা ছোট ট্রে, যাতে তাওহীদের জন্য চিনি ছাড়া কড়া লিক্যুরের এক কাপ গরম চা।

সিদরা ঘরের ভেতর এসে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। সে তাওহীদের দিকে না তাকিয়ে চোখ নিচু করে বলল,

❝আপনার বিকালের চা।❠

তোহফা চট করে সিদরার হাতটা টেনে ধরল,

❝আম্মুউ! ও আম্মুউ! দেখো না, আব্বুকে বলছি আমাদের সাথে ছাদে যেতে, আব্বু শুধু পচা মানুষের মতো ভাবছে! তুমি আব্বুকে একটু বকে দাও না! বলো যে তোহফার সাথে ছাদে যেতে হবে!❠

সিদরা তোহফার এই আবদার শুনে তাওহীদের দিকে একটু তাকাল। তাওহীদের চোখও তখন সিদরার ওপরেই স্থির। তাওহীদ একটু গলা ঝেড়ে বলল,

❝আসলে তোহফা বলছিল ছাদে যাবে। সিদরা, বিকেলবেলা ছাদে গেলে আপনার কোনো সমস্যা হবে না তো? আমাদের ছাদটা অবশ্য বেশ বড় আর চারদিক থেকে দেওয়াল দেওয়া, বাইরে থেকে কিছু দেখা যায় না।❠

সিদরা মৃদু হাসল। নেকাব ছাড়া তার এই হাসির স্নিগ্ধতা তাওহীদের বুকের ভেতরের গম্ভীর ভাবটা এক সেকেন্ডে গলিয়ে দিল। সিদরা তোহফাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,

❝আমার কোনো সমস্যা নেই। তোহফামণি যখন যেতে চাচ্ছে, চলুন সবাই একসাথেই যাই। আমি শুধু একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছি।❠

❝ইয়েইই! আম্মু রাজি হয়ে গেছে! আব্বু হেরে গেছে, আম্মু জিতে গেছে!❠

তোহফা সিদরার গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল।

মিনিট দশেকের মধ্যে তারা চৌধুরী ভিলার বিশাল ছাদে এসে পৌঁছাল। ছাদটা সত্যিই অসাধারণ সুন্দর। রাশেদ চৌধুরী গাছপালা খুব পছন্দ করেন, তাই পুরো ছাদ জুড়ে হরেক রকমের ফুলের টব সাজানো—গোলাপ, বেলি, কামিনী আর হাসনাহেনার সুবাসে বিকেলের বাতাসটা ম ম করছে। মেঝের এক কোণায় সুন্দর দামী ঘাসের ম্যাট বিছানো আর বসার জন্য একটা কাঠের দোলনা রাখা।

সিদরা গায়ে একটা কালো রঙের বড় চাদর জড়িয়ে নিয়েছিল, আর মাথায় ওড়নাটা খুব শালীনভাবে দেওয়া ছিল। সে দোলনাটার ওপর এসে বসল। তোহফা ছাদময় প্রজাপতির মতো ছুটোছুটি শুরু করে দিল। সে কখনো একটা লাল গোলাপ ছুঁয়ে দেখছে, কখনো আবার আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলছে,

❝আম্মুউ! ওই দেখো, কত বড় একটা বক পাখি যাচ্ছে! ওটা কি মেঘের দেশে যাবে?❠

সিদরা দূর থেকে তোহফার দিকে তাকিয়ে বলল,

❝ধীরে দৌড়াও মা, পড়ে গিয়ে আবার ব্যথা পাবে তো।❠

তাওহীদ ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে কফির মগে চুমুক দিচ্ছিল। তার পরনে এখন একটা আরামদায়ক ক্যাজুয়াল শার্ট। সে তোহফাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ সিদরার দিকে তাকাল। দোলনায় বসে থাকা এই তরুণীকে আজ তার এই বাড়ির একটা অংশ মনে হচ্ছে। চার বছর ধরে এই ছাদটা ছিল একদম খাঁ খাঁ মরুভূমির মতো, যেখানে তাওহীদ শুধু একা একা সিগারেট খেত আর দীর্ঘশ্বাস ফেলত। কিন্তু আজ সিদরার উপস্থিতিতে পুরো ছাদটা যেন এক টুকরো জান্নাতের বাগানে পরিণত হয়েছে।

তাওহীদ ধীরপায়ে হেঁটে এসে দোলনার পাশে দাঁড়াল। সে অত্যন্ত মার্জিত গলায় বলল,

❝সিদরা, তোহফাকে সামলানো কিন্তু খুব কঠিন। ও দেখতে যতটা কিউট, ততটাই জেদি। কিন্তু কাল থেকে দেখছি ও আপনার আঁচল এক সেকেন্ডের জন্যও ছাড়ছে না। আপনি জাদুমন্ত্র জানেন নাকি?❠

সিদরা তাওহীদের এই রসিকতা শুনে চোখ নিচু করে একটু হাসল। সে বলল,

❝বাচ্চাদের সামলানোর জন্য কোনো জাদুর দরকার হয় না, ব্যারিস্টার সাহেব। ওদের শুধু একটু খাঁটি ভালোবাসার প্রয়োজন হয়। তোহফা তো চার বছর ধরে ওর মনের ভেতরে একটা মস্ত বড় শূন্যতা চেপে রেখেছিল। ও যখন দেখেছে যে ও যাকে ‘আম্মু’ বলে ডাকছে, সে সত্যিই ওকে বুকে টেনে নিচ্ছে—তখন ও নিজের সবটুকু মায়া দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। আসলে ও আমাকে নয়, ও ‘আম্মু’ শব্দটার ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরেছে।❠

সিদরার এই গভীর এবং পরিপক্ক কথাগুলো তাওহীদের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। সে ভাবল, আদালতের বাইরেও যে এত সুন্দর, এত সত্য একটা জগৎ আছে—তা সে সিদরাকে না দেখলে হয়তো কোনোদিন জানতেই পারত না।

ঠিক তখনই তোহফা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলো। সে এসে সিদরার কোলের ওপর চড়ে বসল এবং তাওহীদের হাতটা টেনে ধরল,

❝আব্বুউ! তুমি শুধু আম্মুর সাথে ফিসফিস করে কথা বলছো কেন? তোহফাকে দলে নাও! চলো, আমরা সবাই মিলে একটা খেলা খেলি!❠

তাওহীদ হেসে দোলনার একপাশে বসে পড়ল,

❝কী খেলা খেলবে, আমার আম্মুজান?❠

❝আমরা খেলবো... চোর-পুলিশ খেলা! আব্বু হবে চোর, আর আমি আর আম্মু হবো পুলিশ! আমরা আব্বুকে খাঁচায় বন্দি করব!❠

তোহফা তার ছোট দুটো হাত দিয়ে তাওহীদের হাত দুটো লক করার চেষ্টা করল।

তাওহীদ তার গম্ভীর কন্ঠস্বরটা একটু নরম করে বলল,

❝আচ্ছা? আমাকে বন্দি করবে? সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টারকে বন্দি করার মতো ক্ষমতা কোন পুলিশের আছে শুনি?❠

❝আমার আর আম্মুর আছে!❠

তোহফা সিদরার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল,

❝আম্মু, তুমি আব্বুর এই হাতটা ধরো, আর আমি এই হাতটা ধরি। চোরকে একদম পালানোর সুযোগ দেওয়া যাবে না!❠

সিদরা লজ্জায় একটু লাল হয়ে গেল। সে তাওহীদের দিকে তাকাতেই দেখল তাওহীদও তার দিকে তাকিয়ে এক মৃদু হাসছে। সিদরা তোহফার আবদার রাখতে তাওহীদের পাঞ্জাবির হাতাটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল,

❝হ্যাঁ, চোর একদম বন্দি হয়ে গেছে।❠

বিকেলের সেই মিষ্টি রোদে, চৌধুরী ভিলার ছাদে এক অদ্ভুত ভালোবাসার ক্যানভাস তৈরি হলো। তোহফার খিলখিল হাসির আওয়াজ বাতাসে ভাসছিল, আর তাওহীদ ও সিদরার চোখের নীরব ভাষা বলছিল—এই পরিবারটি ধীরে ধীরে এক সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে, যা দুনিয়ার কোনো ঝড় সহজে ভাঙতে পারবে না।

ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ

ছাদের সেই মিষ্টি বিকেল কাটার পর রাতটা কেটেছিল এক পরম শান্তিতে। সকালের ভোরের আলো ফুটতেই চৌধুরী ভিলায় আবার নতুন দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। আজ সপ্তাহের অন্য চারদিনের মতো সাধারণ কোনো দিন নয়, আজ তোহফার স্কুল খোলা। গত চার বছর ধরে তোহফাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, ওর টিফিন গুছিয়ে দেওয়া আর ওকে ক্লাসে ঢুকিয়ে দেওয়ার পুরো দায়িত্বটাই তাওহীদ একা সামলেছে। কিন্তু আজ চৌধুরী ভিলার অন্দরমহলে এক নতুন দোলা লেগেছে।

সকাল ঠিক সাড়ে সাতটা। সিদরা অলরেডি রান্নাঘরে গিয়ে তোহফার জন্য ওর প্রিয় ক্রিসপি চিকেন ফ্রাই আর ছোট ছোট কিউট আকৃতির আলুর চিপস বানিয়ে টিফিন বক্সে গুছিয়ে ফেলেছে। তোহফার পানির বোতলে ফ্রেশ জুস ভরে সে যখন ডাইনিং রুমে এলো, তখন দেখল তোহফা একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে টেবিলে থাবা দিয়ে কাঁদ কাঁদ মুখে বায়না ধরছে।

ওর গায়ে প্লে-গ্রুপের নেভি ব্লু কালারের ছোট স্কার্ট আর সাদা শার্টের ইউনিফর্ম, পায়ে সাদা মোজা আর কালো চকচকে জুতো। দুই পাশে দুটো ঝুঁটি আজ সিদরা নিজ হাতে খুব শক্ত করে বেঁধে দিয়েছে যাতে স্কুলের চঞ্চলতায় চুলে জট না পেকে যায়।

❝আমি এই পচা দুধ খাবো না! আব্বুউ, তুমি খালাকে বলো আমাকে চকো-দুধ দিতে! সাদা দুধ একদম ভালো না, এটা খেলে আমার বমি-বমি আসে!❠

তোহফা তার ছোট ঠোঁট দুটো উল্টে হাত-পা ছুড়ছিল।

তাওহীদ তখন অলরেডি কোর্টের কালো ট্রাউজার আর ধবধবে সাদা শার্ট পরে ডাইনিং টেবিলে বসে কফি খাচ্ছিল। মেয়ের এই সকালবেলার নখরা দেখে সে একটু চোখ রাঙিয়ে বলল,

❝তোহফা চৌধুরী! একদম দুষ্টুমি করবে না। সকালবেলা সাদা দুধ না খেলে এনার্জি আসবে কোত্থেকে? প্রতিদিন এই এক নাটক!❠

আব্বুর ধমক খেয়ে তোহফার চোখের কোণায় দু ফোঁটা জল টলমল করে উঠল। সে ঠিক তখনই সিদরাকে টিফিন বক্স হাতে আসতে দেখে চেয়ার থেকে এক লাফে নেমে সিদরার আবায়ার আঁচল জড়িয়ে ধরল,

❝আম্মুউউ! দেখো না, আব্বু আমাকে বকছে! পচা সাদা দুধ খেতে বলছে! তুমি আব্বুকে সুপ্রিম কোর্টে বন্দি করে দাও!❠

সিদরা টিফিন বক্সটা টেবিলে রেখে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে তোহফার সামনে বসল। সে তোহফার চোখের জলটা আলতো করে নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে খুব মিষ্টি করে হাসল। সে বলল,

❝আমার তোহফামণি কি জানে, এই সাদা দুধটা আসলে সাধারণ দুধ নয়? এটা হলো পরীদের দেশের স্পেশাল ম্যাজিক ড্রিংক!❠

‘ম্যাজিক ড্রিংক’ শুনে তোহফার বড় বড় চোখ দুটো আরও বড় হয়ে গেল। সে কান্না ভুলে গিয়ে বলল,

❝ম্যাজিক ড্রিংক? কিন্তু এটা দেখতে তো একদম নরমাল!❠

সিদরা গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল, ❝বাইরে থেকে নরমাল মনে হলেও এটা পেটে গেলেই তোহফা একদম সুপার-গার্ল হয়ে যাবে। ক্লাসে ম্যাম যখন কোশ্চেন করবে, তোহফা সবার আগে হাত তুলে উত্তর দিতে পারবে। আর তোহফার গায়ের শক্তি এত বেড়ে যাবে যে স্কুলের ওই বড় টেডি বিয়ারটাকেও এক হাতে তুলে ফেলতে পারবে! খাবে না আমার লক্ষ্মী সোনা?❠

সিদরার এই মিষ্টি আর কাল্পনিক গল্পের জাদুতে তোহফা এক সেকেন্ডে গলে গেল। সে সিদরার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে পুরো দুধটা শেষ করে দিয়ে মুখটা মুছে বলল,

❝দেখো আম্মু! আমি পুরোটা ফিনিশ করে দিয়েছি! এখন আমার গায়ে অনেক শক্তি!❠

তাওহীদ কফির মগে চুমুক দিতে দিতে চশমার আড়াল থেকে সিদরার এই ট্যাকটিকস দেখছিল। সে মনে মনে অবাক না হয়ে পারল না। যে দুধ খাওয়াতে তার প্রতিদিন সকালে আধা ঘণ্টা যুদ্ধ করতে হতো, সিদরা তা মাত্র দুই মিনিটে রূপকথার গল্প দিয়ে খাইয়ে দিল! তাওহীদ একটু গলা ঝেড়ে বলল,

❝সিদরা, আপনিও তৈরি হয়ে নিন। আজ আমি আপনাদের দুজনকে একসাথেই স্কুলে ড্রপ করে দিয়ে কোর্টে যাবো। আর ছুটি হলে আমিই রিসিভ করতে আসবো।❠

সিদরা মাথা নেড়ে বলল,

❝জি, আমি জাস্ট আবায়া আর নেকাবটা পরে আসছি।❠

মিনিট পনেরোর মধ্যে তাওহীদের কালো হ্যারিয়ার গাড়িটি গুলশানের একটি নামী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনে এসে থামল। স্কুলের গেটের সামনে অলরেডি অনেক মায়েরা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে এসেছেন। সবার পরনেই মডার্ন শাড়ি, সালোয়ার কামিজ বা কুর্তি। তাদের মাঝে সিদরা যখন গাড়ি থেকে নামল, তার পরনে ছিল একটি নিখুঁত কালো দুবাই সিল্কের আবায়া আর মুখের ওপর সুন্দর করে বাঁধা নেকাব, শুধু তার শান্ত ও স্নিগ্ধ চোখ দুটো দেখা যাচ্ছিল।

তোহফা সিদরার হাতটা তার দুই ছোট হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে স্কুলের গেটের দিকে এগোতে লাগল। অন্য মায়েরা সিদরার এই কড়া পর্দা দেখে কিছুটা আড়চোখে তাকাচ্ছিলেন, কিন্তু সিদরার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তার পুরো ফোকাস ছিল তোহফার দিকে।

গেটের কাছে আসতেই তোহফার ক্লাস টিচার মিস মালিহা এগিয়ে এলেন। তিনি তাওহীদকে দেখে মৃদু হেসে বললেন,

❝গুড মর্নিং, মিস্টার চৌধুরী। আজ তো দেখছি তোহফার সাথে একজন নতুন মুখ!❠

তাওহীদ সিদরার পাশে এসে খুব গর্বের সাথে এবং মার্জিত কন্ঠে পরিচয় করিয়ে দিল,

❝গুড মর্নিং মিস মালিহা। মিট মাই ওয়াইফ, সিদরাতুল মুনতাহা। আর আজ থেকে তোহফার স্কুলিংয়ের সমস্ত বিষয় সিদরাই দেখবে।❠

মিস মালিহা সিদরার দিকে তাকিয়ে হাত মেলাতে চাইলেন, কিন্তু সিদরা অত্যন্ত বিনম্রতার সাথে নিজের বুক ছুয়ে সালাম দিল,

❝আসসালামু আলাইকুম।❠

মালিহা একটু থতমত খেলেও পরক্ষণেই হেসে বললেন,

❝ওয়া আলাইকুমুস সালাম। তোহফা তো খুব লাকি! তা তোহফা, আজ তো তোমার আম্মু এসেছে, ক্লাসে লক্ষ্মী হয়ে থাকবে তো?❠

তোহফা সিদরার হাতটা একটু ঝাঁকিয়ে গর্বিত গলায় বলল,

❝মাই আম্মু ইজ দ্য বেস্ট! আম্মু আমাকে ম্যাজিক ড্রিংক খাইয়ে দিয়েছে, আজ আমি ক্লাসের সব পড়া এক মিনিটে পেরে যাবো, দেখে নিও ফুপি... আই মিন ম্যাম!❠

তোহফার এই চঞ্চলতায় সবাই হেসে উঠল। সিদরা তোহফার সামনে ঝুঁকে তার কপালে একটা চুমু খেল এবং বলল,

❝ভেতরে যাও মা। ছুটি হলে আম্মু আর আব্বু ঠিক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবো।❠

❝ওকে আম্মু! বাই আব্বু!❠

তোহফা হাত নাড়তে নাড়তে তার ছোট কাঁধের ব্যাগটা দুলিয়ে বন্ধুদের সাথে ক্লাসের দিকে ছুটে গেল।

✤✣ᚔᚔ✤✣

—চলবে—

✤✣ᚔᚔ✤✣

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন