ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার ব্যারিস্টার সাহেব

১৬তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ১৬

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

🚫⛔নাম ও‌ হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

কোর্ট রুম থেকে বের হওয়ার পর করিডোরের আলোয় তাওহীদ সিদরার দিকে তাকাল। সিদরা তখনো নিজের ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখের কোণার জল মুছছিল।

তাওহীদ তার ব্রিফকেসটা একহাতে নিয়ে সিদরার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। সে অত্যন্ত নরম ও গভীর গলায় বলল,

❝সিদরা... আজ তুমি যেভাবে জজের সামনে নিজের বক্তব্য দিলে, তা একজন বড় ব্যারিস্টারের চেয়েও অনেক বেশি প্রভাবশালী ছিল। তোমার দাদুর আত্মা হয়তো আজ সত্যিই শান্তি পাচ্ছে।❠

সিদরা নেকাবের আড়াল থেকে তার সেই স্নিগ্ধ ও মায়াবী চোখ দুটো তুলে তাওহীদের দিকে তাকাল,

❝আমি তো শুধু আমার মনের কথা বলেছি ব্যারিস্টার সাহেব। কিন্তু আপনি যেভাবে আজ আমার জন্য লড়লেন, আমার এই পরিচয়টা ফিরিয়ে দিলেন—এর ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।❠

তাওহীদ একটু হাসল, তার সেই পাথুরে হৃদয়ের সবটুকু বরফ গলে আজ সেখানে এক চিলতে ভালোবাসার রোদ খেলা করছে। সে বলল,

❝সংসারে স্ত্রীর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে স্বামীর কোনো ঋণ থাকে না সিদরা। চলো, আব্বা আর তোহফা ঘরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ চৌধুরী ভিলায় এক নতুন উৎসব হবে।❠

তারা যখন সুপ্রিম কোর্টের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন বিকালের নরম সোনাঝরা রোদ এসে সিদরার কালো আবায়ার ওপর পড়ল। চৌধুরী ভিলার এই নতুন দাম্পত্যের সুর আজ এক অটুট ও সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াল।

সুপ্রিম কোর্টের ৫ নম্বর এজলাসের সেই ঐতিহাসিক আদেশের পর চারটে দিন পার হয়ে গেছে। হাইকোর্টের দেওয়া সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ এবং অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আদেশের কপিটি যখন অফিশিয়ালি আমজাদ আলীর বকশিবাজারের ঠিকানায় পৌঁছাল, তখন পুরো আলী পরিবারে যেন এক নীরব সুনামী বয়ে গেল। আঠারো বছর ধরে যে রাজকীয় সাম্রাজ্য তারা অন্যের এতিম মেয়ের হাড়ভাঙা খাটুনি আর চোখের জলের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে তুলেছিল, তা আজ এক লহমায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

তবে জাবেদ আলী এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে খুব ভালো করেই জানে, সরাসরি তাওহীদ চৌধুরীকে হুমকি দিয়ে বা মাঝরাস্তায় গুণ্ডা পাঠিয়ে কোনো লাভ হয়নি; উল্টো পুলিশ এখন তাদের ওপর কড়া নজর রাখছে। তাই এবার সে এক নতুন এবং অত্যন্ত ধূর্ত চাল চালার পরিকল্পনা করল। সে বুঝতে পেরেছে, এই মামলার মূল চাবিকাঠি হলো সিদরা নিজে। সিদরা যদি কোনোভাবে কোর্টে গিয়ে জজের সামনে দাঁড়িয়ে বলে যে সে এই সম্পত্তি নিজের ইচ্ছায় তার চাচা ও ভাইদের দিয়ে দিচ্ছে এবং মামলা প্রত্যাহার করতে চায়, তবে তাওহীদ চৌধুরী ব্যারিস্টার হয়েও আর কিছুই করতে পারবে না।

কিন্তু সিদরাকে রাজি করানো বা তার কাছে পৌঁছানো তো সহজ নয়। সে থাকে চৌধুরী ভিলার কড়া সুরক্ষায়। তাই জাবেদ এবার ধরল এক আবেগের পথ। সে তার নিজের আপন ছোট বোন, অর্থাৎ সিদরার ফুফাতো বোন লাবণীকে এই খেলায় ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল। লাবণী সিদরার ছোটবেলার সেই আবছা স্মৃতির একটা অংশ, যার সাথে সিদরার চার বছর বয়স পর্যন্ত বেশ সখ্যতা ছিল। লাবণী অবশ্য তার ভাইদের এই আঠারো বছর আগের জালিয়াতির কথা পুরোপুরি জানত না, তাকে জাবেদ বোঝাল যে তাওহীদ চৌধুরী জোর করে তাদের পরিবারকে ধ্বংস করার জন্য সিদরাকে ব্যবহার করছে।

বুধবার দুপুর তখন আড়াইটা। চৌধুরী ভিলার ড্রয়িংরুমে সিদরা বসে তোহফাকে দুপুরের হোমওয়ার্ক করাচ্ছিল। তোহফা খাতার ওপর পেনসিল দিয়ে আঁকিবুঁকি করতে করতে বলল,

❝আম্মু, দেখো তো আমার এই পাখিটা কেমন হয়েছে? এটার ডানাগুলো কিন্তু তোমার আবায়ার মতো কালো!❠

সিদরা তোহফার কথায় আলতো হেসে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কলিংবেলটা বেজে উঠল। হোম-মেড খালা গিয়ে দরজা খুলতেই বাইরে একজন সাতাশ-আটাশ বছরের সাধারণ সুতি শাড়ি পরা অত্যন্ত ম্লান চেহারার নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। ওনার চোখে জল, হাত দুটো কাঁপছে।

সিদরা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পর্দার আড়ালে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

❝খালা, কে এসেছেন?❠

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নারী, অর্থাৎ লাবণী, সিদরার গলার আওয়াজ শুনেই ড্রয়িংরুমের ভেতরে কয়েক পা এগিয়ে এলো। সে সিদরার নেকাব পরিহিত অবয়বের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আকুল কন্ঠে কেঁদে উঠে বলল,

❝মুনতাহা আপা! তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি তোমার ছোট ফুফুর মেয়ে, লাবণী! আঠারো বছর পর আমি আমার হারানো আপাকে খুঁজে পেয়েছি!❠

‘মুনতাহা’ নামটা শোনামাত্রই সিদরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এতিমখানায় তাকে সবাই ‘সিদরা’ বলে ডাকত, শুধু তার দাদু আর পরিবারের মানুষেরাই তাকে ‘মুনতাহা’ বলে ডাকত। সিদরা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার স্মৃতির ধূসর পাতা থেকে এক ছোট্ট মেয়ের অবয়ব ভেসে উঠল, যে তার সাথে ছোটবেলায় পুতুল খেলত।

সিদরা ধীর পায়ে পর্দার আড়াল থেকে বের হয়ে এলো। সে নিজের মুখের নেকাবটা আলতো করে সরিয়ে লাবণীর মুখের দিকে তাকাল। হ্যাঁ, মুখের আদলটা ঠিক ফুফুর মতোই। সিদরার চোখ দুটোও ভিজে উঠল। সে লাবণীর হাত দুটো ধরে বলল,

❝লাবণী? তুমি... তুমি এখানে কীভাবে এলে?❠

লাবণী সিদরাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তবে এই কান্নার পেছনে যে জাবেদ আলীর নিখুঁত স্ক্রিপ্ট কাজ করছে, তা সিদরা জানত না। লাবণী কাঁদতে কাঁদতে সোফায় বসল এবং বলল,

❝আপা, তুমি বেঁচে আছ শুনে আমার যে কী আনন্দ হয়েছিল! কিন্তু পরক্ষণেই শুনলাম তোমার স্বামী ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী আমাদের পুরো পরিবারকে জেলখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। আব্বা তো বুড়ো মানুষ, ওনার কোমর ভাঙা, উনি এই বয়সে কোর্ট-কাছারির ধাক্কা সইতে পারছেন না। জাবেদ ভাইয়া আর বাকিরা নাকি না বুঝে ওসব পেপারস করেছিল। কিন্তু এখন তো ওনারা সব সম্পত্তি তোমাকেই ফিরিয়ে দিতে চান। তুমি দয়া করে তোমার স্বামীকে বলো এই মামলাটা তুলে নিতে। আমরা ঘরের মানুষ, ঘরের ভেতরেই সব মিটিয়ে ফেলি আপা। ভাইয়াদের জেলে পাঠালে আমাদের পুরো বংশের মুখ চুন হয়ে যাবে।❠

লাবণীর এই কান্না আর আকুল আবেদন সিদরার সরল মনকে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় ফেলে দিল। সে আঠারো বছর ধরে পরিবারের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিল। আজ যখন নিজের ফুফাতো বোন এসে এভাবে কাঁদছে, তখন তার ভেতরের মাতৃত্ব ও কোমলতা জেগে উঠল। সে ভাবল, আসলেও তো ওনারা আমার রক্তের সম্পর্কের মানুষ। ওনাদের জেলে পাঠিয়ে আমি কী পাবো?

ঠিক তখনই চৌধুরী ভিলার মেইন গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী। কোর্টের হাফ-সিল্কের গাউনটা তার হাতে ঝুলছিল। ড্রয়িংরুমে এক অপরিচিত মেয়েকে সিদরার হাত ধরে কাঁদতে দেখে এবং সিদরার মুখের সেই দ্বিধাগ্রস্ত ভাব লক্ষ্য করে তাওহীদের চোখ দুটো এক মুহূর্তে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

সে তার ভারী বুটের আওয়াজ তুলে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার গম্ভীর কণ্ঠস্বরে পুরো ঘরের বাতাস এক নিমেষে ঠাণ্ডা হয়ে গেল,

❝সিদরা! ইনি কে? আর আমাদের ঘরে বসে কী বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে?❠

তাওহীদের এই হঠাৎ প্রবেশে লাবণী কিছুটা ভয় পেয়ে সিদরার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। সিদরা তাওহীদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় বলল,

❝ব্যারিস্টার সাহেব... ইনি আমার ফুফাতো বোন, লাবণী। ও বলছিল যে ওনারা নাকি সব সম্পত্তি আমাকে এমনিই ফিরিয়ে দিতে চান। আমাদের আর কোর্টে যাওয়ার দরকার নেই। ওনারা ঘরের মানুষ...❠

❝ঘরের মানুষ?❠

তাওহীদ এক কুৎসিত উপহাসের হাসি দিল।

সে তার হাতের ব্রিফকেসটা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রেখে সোজা লাবণীর চোখের দিকে তাকাল। একজন ঝানু লয়ারের সেই এক্স-রে চাউনির সামনে লাবণী নিজের চোখ নামিয়ে নিল।

তাওহীদ অত্যন্ত ধীর এবং বরফের মতো শীতল গলায় বলল,

❝মিস লাবণী, আপনার বড় ভাই জাবেদ আলী আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার জন্য, তাই তো? আঠারো বছর আগে যখন এই চার বছরের নিষ্পাপ শিশুটিকে মাঝরাতে এক অন্ধকার এতিমখানায় ফেলে আসা হয়েছিল, তখন আপনাদের এই 'ঘরের মানুষ' এর রূপটা কোথায় ছিল? তখন কি আপনার ফুফু বা আপনার ভাইয়েরা এই মেয়ের রক্তের সম্পর্কের কথা ভাবেনি? আজ যখন হাইকোর্ট আপনাদের সবকটা চুরির অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে, যখন জেলের ভাত খাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে—তখন আপনারা বোনকে পাঠিয়েছেন আপোষ করার নাটক করতে?❠

তাওহীদের এই ধারালো ও সত্য কথার সামনে লাবণী আর একটা কথাও বলতে পারল না। সে বুঝতে পারল, এই ব্যারিস্টারের চোখ ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।

তাওহীদ সিদরার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত প্রটেক্টিভ ও গভীর কন্ঠে বলল,

❝সিদরা, অপরাধীদের কোনো ঘর বা রক্ত হয় না। এরা আঠারো বছর ধরে তোমার হক মেরে খেয়েছে। আজ যদি তুমি আবেগের বশে এই মামলা তুলে নেন, তবে তা শুধু তোমার সাথে নয়, তোমার প্রয়াত দাদুর সেই পবিত্র আত্মার সাথেও এক মস্ত বড় বিশ্বাসঘাতকতা হবে। আমি জাবেদ আলীর এই সস্তা চাল সফল হতে দেবো না।❠

সে লাবণীর দিকে ফিরে সোজা দরজার দিকে ইশারা করে বলল,

❝মিস লাবণী, আপনি এখন আসতে পারেন। আর আপনার ভাইকে গিয়ে বলবেন, আগামী ১০ তারিখের শুনানিতে আমি ওনাকে জেলের ভেতরে পাঠানোর সব ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছি। গুড ডে।❠

লাবণী আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে দ্রুত ব্যাগ নিয়ে চৌধুরী ভিলা থেকে প্রায় দৌড়ে বের হয়ে গেল।

ড্রয়িংরুমটা আবার শান্ত হলে সিদরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখন অনুশোচনার জল। সে বুঝতে পেরেছে, সে কতটা বড় ভুল করতে যাচ্ছিল। তাওহীদ ধীর পায়ে সিদরার সামনে এসে দাঁড়াল। সে সিদরার ওড়নার কোণাটা ধরে আলতো করে ওর চোখের জল মুছে দিল—এই প্রথম তাওহীদ সবার সামনে সিদরার প্রতি নিজের অধিকার ও ভালোবাসা প্রকাশ করল।

সে অত্যন্ত মৃদু ও মায়াবী সুরে বলল,

❝সিদরা... তুমি বড্ড সরল। এই কঠিন দুনিয়ার মানুষগুলোকে তুমি এখনো চেনোনি। কিন্তু যতদিন আমি আছি, তোমার এই সরলতার সুযোগ কাউকে নিতে দেবো না। তুমি শুধু তোমার র এই স্বামীর ওপর ভরসা রাখুন।❠

সিদরা তাওহীদের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো পাথুরে ব্যারিস্টার ছিল না, ছিল শুধু তার পরম আপন ‘ব্যারিস্টার সাহেব’।

ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ

লাবণী চলে যাওয়ার পর চৌধুরী ভিলার ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা কাটাতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল। তোহফা তখন সোফায় বসে একা একাই ওর ড্রয়িং খাতা ওল্টাচ্ছিল। বাইরের দুনিয়ার এই জটিলতা, এই লোভ আর জালিয়াতির অন্ধকার এখনো ওর ওই নিষ্পাপ মনটাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সিদরা সোফায় বসে তোহফাকে জড়িয়ে ধরে নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় চলছিল। সে আজ নিজের অজান্তেই এক মস্ত বড় ভুল করতে যাচ্ছিল, যা থেকে তাওহীদ তাকে এক নিমেষে বাঁচিয়ে নিয়েছে।

সন্ধ্যা নেমে আসার পর রাশেদ চৌধুরী নিজের ঘরে মাগরিবের নামাজ পড়তে গেলেন। তোহফাকেও হোম-মেড খালা ওপরে নিয়ে গেছেন হাত-মুখ ধুইয়ে একটু হালকা নাস্তা খাওয়াতে। পুরো দোতলাটা যখন নিঝুম, সিদরা তখন তাওহীদের স্টাডি রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

রুমের দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে একটি মাত্র টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে, যার মৃদু হলদেটে আলোয় তাওহীদের গম্ভীর মুখাবয়বটা আরও বেশি তীক্ষ্ণ দেখাচ্ছিল। সে ব্লেজারটা খুলে চেয়ারের পেছনে রেখেছে, শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। টেবিল জুড়ে সিদরার দাদুর সেই ট্রাস্টের কাগজপত্র, ল্যান্ড রেজিস্ট্রি অফিসের সার্টিফাইড কপির স্তূপ। তাওহীদ খুব মনোযোগ দিয়ে ডায়েরিতে কী যেন নোট করছিল।

সিদরা দরজায় আলতো করে টোকা দিল। তাওহীদ চোখ তুলে তাকাল। সিদরার মাথায় এখন নেকাব নেই, কেবল সুতির ওড়নাটা পরম মায়ায় চুলে জড়ানো। তার সেই মায়াবী চোখ দুটোতে অপরাধবোধ আর একধরণের অব্যক্ত আকুলতা।

❝ভেতরে আসব, ব্যারিস্টার সাহেব?❠

সিদরা খুব মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল।

তাওহীদ হাতের কলমটা রেখে সোজা হয়ে বসল। তার চোখের সেই লয়ারের কঠোরতা আজ এক নিমেষে উধাও। সে শান্ত সুরে বলল,

❝এসো সিদরা। দরজায় নক করার তো কোনো প্রয়োজন নেই, এটা তোমারও ঘর।❠

সিদরা ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে এলো। সে টেবিলের পাশে না দাঁড়িয়ে তাওহীদের ঠিক মুখোমুখি একটা কাঠের চেয়ারে বসল। টেবিল ল্যাম্পের আলোটা সিদরার ফর্সা মুখের একপাশে এসে পড়েছে, যা তার সৌন্দর্যকে আরও স্নিগ্ধ করে তুলছিল।

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু গলায় বলল,

❝আজকে দুপুরে... আমি যদি আপনার কথা না শুনে লাবণীর আবেগের ফাঁদে পা দিয়ে দিতাম, তবে হয়তো অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেত। আমি আসলেই খুব বোকা, মানুষ চিনতে আমার বড্ড ভুল হয়। আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন?❠

তাওহীদ সিদরার দিকে তাকাল। এই মেয়েটির সরলতা, তার এই নিষ্পাপ মনটাই তো চৌধুরী ভিলার এই চার দেয়ালকে আঠারো বছর পর একটা আসল ‘ঘর’ বানিয়েছে। তাওহীদ টেবিলের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে সিদরার দুটো হাত নিজের দুহাতের ছোঁয়ায় আগলে নিল। এবার আর কোনো সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নয়, এবার এক অদ্ভুত অধিকার আর তীব্র অনুরাগে সে সিদরার হাতটা ধরে রইল।

❝আমি তোমার ওপর রাগ করিনি সিদরা।❠

তাওহীদ অত্যন্ত নিচু, মায়াবী আর গভীর কন্ঠে বলল,

❝আমি শুধু ভয় পেয়েছিলাম। আমি ভয় পেয়েছিলাম যে এই স্বার্থপর দুনিয়ার মানুষেরা তোমার এই পবিত্র মনটাকে আবার কোনো আঘাত না দিয়ে বসে। তুমি বোকা নও সিদরা, তুমি হলে এই সমাজের এক বিরল মানুষ, যে আঠারো বছর কষ্ট পেয়েও নিজের মনের ভেতর কোনো হিংসা বা প্রতিশোধের আগুন পুষে রাখেনি। আর মানুষ চেনার দায়িত্ব তো তোমার নয়, সেই দায়িত্ব আজ থেকে এই ব্যারিস্টারের।❠

তাওহীদের এই প্রথম সরাসরি এবং এতটা রোমান্টিক স্বীকারোক্তি শুনে সিদরার ফর্সা গালে এক হালকা গোলাপী আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে লজ্জায় চোখ নিচু করে ফেলল। তাওহীদের হাতের উষ্ণতা তার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাচ্ছিল। বিয়ের পর এই প্রথম সিদরা অনুভব করল, সে শুধু এই ঘরের বউ বা তোহফার আম্মু নয়, সে এই মানুষটার মনের একমাত্র ঘরণী।

সে তার হাতটা সরিয়ে না নিয়ে আলতো করে তাওহীদের চোখের দিকে তাকাল। সেই পাথুরে ব্যারিস্টারের চোখে আজ শুধু সিদরার জন্য এক সমুদ্র ভালোবাসা টলমল করছে। সিদরা ফিসফিস করে বলল,

❝আপনার এই কাজের ঘরে আমি কি এক কাপ কফি এনে দেবো? রাত তো অনেক হচ্ছে।❠

তাওহীদ সিদরার হাতের আঙুলগুলোতে নিজের আঙুল গলিয়ে দিয়ে মৃদু হাসল,

❝কফি তো রোজই খাই সিদরা। আজ কফি নয়, আজ বরং তোমার ওই গুনগুন করে গাওয়া কোনো একটা নাশীদ শুনব। শুনবে না তোমার এই ব্যারিস্টার সাহেবকে?❠

সিদরা লজ্জায় মাথা আরও নিচু করে ফেলল, তার ঠোঁটের কোণে এক মিষ্টি তৃপ্তির হাসি। অন্দরের এই স্টাডি রুমে আজ আইনি কাগজপত্রের মাঝেই এক নতুন ভালোবাসার বসন্তের ছোঁয়া লাগল।

পরদিন সকাল এগারোটা। ভালোবাসার সেই মিষ্টি রেশ কাটার আগেই তাওহীদের চেম্বারে এক নতুন রাজনৈতিক ঝড় আছড়ে পড়ল।

তাওহীদ যখন নিজের ডেস্কে বসে সুপ্রিম কোর্টের অন্য একটা কর্পোরেট কেসের ড্রাফটিং করছিল, ঠিক তখনই তার ব্যক্তিগত ফোনে একটি অত্যন্ত হাই-প্রোফাইল নাম্বার থেকে কল এলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে—মিস্টার আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী।

তাওহীদ ভ্রু কুঁচকে কলটা রিসিভ করল,

❝আসসালামু আলাইকুম, মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়।❠

ওপাশ থেকে এক অত্যন্ত ভারী, ধূর্ত এবং কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

❝ওয়ালাইকুম আসসালাম, ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী। কেমন আছেন? আপনার আব্বা রাশেদ সাহেবের শরীর ভালো? তা, আপনাকে আজ বিকেল চারটেয় আমার সচিবালয়ের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে একটু চায়ের দাওয়াত দিতে চাচ্ছিলাম। আপনার উত্তরের ওই আলী সাহেবের ল্যান্ড ডিস্পিউটের কেসটা নিয়ে একটু কথা ছিল। জাবেদ আলী আমার বেশ ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী। আমি চাই না জাস্ট একটা পারিবারিক ভুলের জন্য আমাদের এই সুসম্পর্কটা নষ্ট হোক। আশা করি আপনি আসবেন।❠

মন্ত্রী কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফোনটা কেটে দিলেন। এটা কোনো সাধারণ দাওয়াত ছিল না, এটা ছিল ক্ষমতার এক প্রচ্ছন্ন হুমকি। জাবেদ আলী শেষ চাল হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে তাওহীদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে।

✤✣ᚔᚔ✤✣

—চলবে—

✤✣ᚔᚔ✤✣

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন