#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ১৭
☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣
🚫⛔নাম ও হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫
☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣
বিকেল ঠিক চারটে। তাওহীদ সম্পূর্ণ প্রফেশনাল ব্ল্যাক স্যুটে, একহাতে তার সেই রহস্যময় লেদার ফাইলটা নিয়ে মন্ত্রীর বিলাসবহুল কার্যালয়ে প্রবেশ করল। মন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাহেব তার রাজকীয় সোফায় বসে চুরুট ফুঁকছিলেন, আর ওনার পাশের সোফায় অত্যন্ত দম্ভের সাথে বসে ছিল জাবেদ আলী। তাওহীদকে ঢুকতে দেখে জাবেদ এক কুৎসিত বিজয়ের হাসি দিল।
❝আসুন, ব্যারিস্টার সাহেব! বসুন।❠
মন্ত্রী সাহেব হাসিমুখে বললেন, তবে সেই হাসির আড়ালে ছিল ক্ষমতার অহংকার।
তাওহীদ কোনো সোফায় না বসে টেবিলের ঠিক সামনে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই, বরং এক দুঁদে আইনজীবীর স্থিরতা।
সে বলল,
❝ধন্যবাদ মন্ত্রী মহোদয়। তবে আমি এখানে কোনো সামাজিক আড্ডার জন্য আসিনি। আপনি একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীকে ওনার রানিং কেস নিয়ে কথা বলতে ডেকেছেন, যা আইনি পরিভাষায় ‘কনটেম্পট অফ কোর্ট’ বা আদালতের অবমাননার শামিল। আপনি কী বলতে চান, দয়া করে সংক্ষেপে বলুন।❠
তাওহীদের এই সরাসরি ও কড়া জবাবে মন্ত্রীর মুখের হাসি এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। জাবেদ আলীও সোজা হয়ে বসল।
মন্ত্রী চুরুটটা অ্যাশট্রেতে রেখে গম্ভীর গলায় বললেন,
❝মিস্টার চৌধুরী, বেশি বাড়াবাড়ি ভালো নয়। জাবেদ আলীরা এই শহরের মস্ত বড় ট্যাক্সপেয়ার। আঠারো বছর আগে কী দলিল হয়েছে না হয়েছে, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জলঘোলা করলে আপনার আর আপনার বাবার ক্যারিয়ারে কিন্তু বড় ধরণের টান পড়তে পারে। আমি বলছি, আপনারা কোর্টের বাইরে একটা মিউচুয়াল সেটেলমেন্টে আসুন। জাবেদ আলী আপনার স্ত্রীকে ১০ কোটি টাকা নগদ দেবে, আর আপনার স্ত্রী কোর্টে গিয়ে মামলা তুলে নেবে। এটাই ফাইনাল।❠
জাবেদ আলী একধাপ এগিয়ে এসে বলল,
❝হ্যাঁ তাওহীদ সাহেব, ১০ কোটি টাকা একটা এতিম মেয়ের জন্য অনেক। বোরকা পরে কোর্টে গিয়ে আঠারো বছর আগের কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ কী? টাকাটা নিন, আর শান্তিতে সংসার করুন।❠
ক্ষমতা আর টাকার এই নোংরা পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী এক উচ্চস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে মন্ত্রীর বিশাল কার্যালয়টা যেন কেঁপে উঠল।
তাওহীদ তার হাতের সেই কালো লেদার ফাইলটা মন্ত্রীর টেবিলের ওপর সশব্দে ছুড়ে মেরে বলল—
❝মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়! আপনি ১০ কোটি টাকার লোভ দেখাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের সেই উত্তরাধিকারীকে, যার দাদুর রেখে যাওয়া ট্রাস্টের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা! আর জাবেদ আলী, আপনি ভেবেছেন ক্ষমতার এই চাদরের নিচে লুকিয়ে আপনি পার পেয়ে যাবেন? এই ফাইলের ভেতর শুধু জালিয়াতির পেপারস নেই, এতে আজ সকালে ডিরেক্টরেট অফ ভ্যাট অ্যান্ড ট্যাক্স থেকে আনা আপনার এই মন্ত্রীর বেনামী অ্যাকাউন্টে পাঠানো গত ৫ বছরের চুরির টাকার সমস্ত স্টেটমেন্টও আছে! আপনি যে মন্ত্রীর জোরে লাফাচ্ছেন, সেই মন্ত্রীর নিজের চেয়ারই এই ফাইলের জোরে এক মিনিটে কেঁপে উঠবে।❠
তাওহীদ মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও কাঁপানো গলায় বলল,
❝আজ থেকে ঠিক তিন দিন পর, ১০ তারিখের ফাইনালে শুনানিতে আমি শুধু জাবেদ আলীকে জেলের ভেতরে পাঠাব না, জালিয়াতির সাহায্যকারী হিসেবে এই ক্ষমতার চেয়ারটাকেও আমি কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো। গুড ডে, মিস্টার মিনিস্টার!❠
তাওহীদ এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে নিজের কোটটা ঠিক করে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে মন্ত্রীর রুম থেকে বের হয়ে গেল। রুমের ভেতরে তখন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান আর জাবেদ আলীর মুখ চুন হয়ে গেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, তারা কোনো সাধারণ লয়ারের গায়ে হাত দেয়নি, তারা এক জ্যান্ত সিংহের লেজে পা দিয়েছে।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। তাওহীদ যখন চৌধুরী ভিলায় ফিরল, তখন তার পুরো শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল। ক্ষমতার এই নোংরা লড়াই তার মাথাটাকে প্রচণ্ড জ্যাম করে রেখেছিল। সে নিজের ঘরে ঢুকে কোট আর টাইটা খুলে খাটের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সোফায় মাথা নিচু করে বসল।
ঠিক তখনই রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সিদরা। তার হাতে এক বাটি গরম পানি আর একটা নরম তোয়ালে। সে তাওহীদের এই পরিশ্রান্ত ও রণক্লান্ত রূপটা দেখে এক মূহূর্তে বুঝে গেল যে আজ বাইরে এক মস্ত বড় ঝড় বয়ে গেছে।
সিদরা কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে তাওহীদের ঠিক সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। সে গরম পানিতে তোয়ালেটা ভিজিয়ে পরম মমতায় তাওহীদের হাত দুটো মুছে দিতে লাগল। সিদরার এই হাতের কোমল ছোঁয়া আর তার গায়ের সেই হালকা সুগন্ধ তাওহীদের ভেতরের সমস্ত রাগ আর ক্লান্তি এক সেকেন্ডে উধাও করে দিল।
তাওহীদ সিদরার দিকে তাকাল। সিদরা মুখ তুলে তাওহীদের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম, আকুল এবং ভালোবাসাপূর্ণ গলায় বলল,
❝আজকে বাইরে অনেক বড় লড়াই করে এসেছেন, তাই না? আপনার এই চোখ দুটো বলছে আপনি অনেক ক্লান্ত। আমার জন্য আপনি নিজের জীবনটাকে এভাবে বাজি রাখছেন কেন, ব্যারিস্টার সাহেব? আমার এই সম্পত্তি দরকার নেই।❠
তাওহীদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সিদরার ফর্সা মুখটা নিজের দুহাতের অঞ্জলিতে তুলে নিল। সিদরার চোখের সেই মায়া আজ তাওহীদের পাথুরে বুকটাকে সম্পূর্ণ গলিয়ে দিয়েছে।
সে সিদরার খুব কাছে ঝুঁকে এসে, ওর কপালে থাকা সেই ছোট্ট তিলটার ওপর নিজের ঠোঁটের এক দীর্ঘ, গভীর ও ভালোবাসাপূর্ণ স্পর্শ এঁকে দিল। সিদরা চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার সারা শরীর তখন কাঁপছিল এক পরম নির্ভরতা আর ভালোবাসার আতিশয্যে।
তাওহীদ সিদরাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
❝কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি সিদরা। এই পাঁচ বছরের অন্ধকারের পর আল্লাহ তোমাকে আমার জীবনে পাঠিয়েছেন এই চৌধুরী বাড়ির আলো হিসেবে। তোমার এই ব্যারিস্টার সাহেব নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোমার প্রতিটা অধিকার রক্ষা করবে।❠
সিদরা তাওহীদের চওড়া বুকের ভেতর নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল। আঠারো বছর ধরে যে মেয়েটি একাকীত্বের মরুভূমিতে হেঁটেছিল, সে আজ নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে নিরাপদ ভালোবাসার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।
ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ
ভালোবাসার সেই গভীর ও পবিত্র স্বীকৃতির পর চৌধুরী ভিলার ভেতরের রূপটা যেন এক লহমায় বদলে গেল। এতদিনের যে পাথুরে দূরত্ব, যে গম্ভীর নীরবতা এই চার দেয়ালকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল—তা আজ এক অদ্ভুত মায়াবী আলোয় ধুয়ে মুছে গেছে। তবে এই অন্দরের আনন্দের সমান্তরালে, বাইরে যে এক ভয়ঙ্কর বিষাক্ত ঝড় দানা বাঁধছিল, তা বাড়ির কেউই তখনো আঁচ করতে পারেনি।
৯ তারিখের রাত। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে দশটা। পরদিন অর্থাৎ ১০ তারিখ সকালে সুপ্রিম কোর্টের সেই বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল হিয়ারিং, যেখানে জাবেদ আলী আর আমজাদ আলীর আঠারো বছরের জালিয়াতির সাম্রাজ্য চিরতরে ধুলোয় মিশে যাওয়ার কথা। পুরো বাড়ি আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়িই শান্ত হয়ে গিয়েছিল। রাশেদ চৌধুরী নিজের ঘরে কেসের শেষ মুহূর্তের কিছু নোটস দেখে এগারোটা বাজতেই শুয়ে পড়েছেন। তোহফাও সিদরার হাতের হালকা চাপড় খেতে খেতে নিজের কিউট রাজকীয় বিছানায় পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।
তাওহীদ তার স্টাডি রুমে বসে শেষবারের মতো ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ বোলাচ্ছিল। তার পরনে হালকা ধূসর রঙের ট্রাউজার আর কালো টি-শার্ট। আজ তার চোখে কোনো ক্লান্তি নেই, বরং জাবেদ আলী আর সেই দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীকে আইনের খাঁচায় পুরে ফেলার এক তীব্র ও তীক্ষ্ণ চাউনি।
ঠিক তখনই দরজার আড়াল থেকে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা আদা-লেবুর চা নিয়ে ঘরে ঢুকল সিদরা। তার পরনে একটি সাধারণ কিন্তু মার্জিত ল্যাভেন্ডার রঙের সুতির থ্রি-পিস, চুলে আলতো করে একটা ক্লিপ আটকানো। নেকাব ছাড়া তার এই স্নিগ্ধ মুখশ্রীর দিকে তাকালে তাওহীদের মনে হয়, এই পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল যেন এক সেকেন্ডে থমকে যায়।
সিদরা চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে তাওহীদের ঠিক পাশে এসে দাঁড়াল। সে তাওহীদের চিন্তিত কপালের দিকে তাকিয়ে নিজের নরম হাতটি আলতো করে তার কাঁধের ওপর রাখল।
❝চায়ের কাপটা নিন, ব্যারিস্টার সাহেব। মাথাটা একটু হালকা হবে।❠
সিদরা অত্যন্ত মৃদু ও মায়াবী গলায় বলল।
তাওহীদ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে সিদরার দিকে তাকাল। সে চায়ের কাপটা না নিয়ে এক ঝটকায় সিদরার হাতটি ধরে তাকে নিজের খুব কাছে টেনে নিল। সিদরা সামলাতে না পেরে তাওহীদের চওড়া বুকের ওপর এসে পড়ল। তার ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর অনুরাগে এক মুহূর্তে লাল হয়ে উঠল।
❝ব্যারিস্টার সাহেব... ছাড়ুন, কেউ দেখে ফেলবে।❠
সিদরা ফিসফিস করে বলল, যদিও তার নিজের হাত দুটো তাওহীদের শার্টের কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল।
তাওহীদ সিদরার কোমরে নিজের এক হাত জড়িয়ে ধরে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে গভীর গলায় বলল,
❝এই ঘরে কেউ আসবে না সিদরা। আর আজ আমি কোনো ব্যারিস্টার নই, আজ আমি শুধু তোমার এই চোখের মায়ার বন্দি একজন সাধারণ মানুষ। কালকের পর থেকে তোমার জীবনের সমস্ত অন্ধকার কেটে যাবে। আমি তোমাকে তোমার দাদুর সেই সম্মান পুরোপুরি ফিরিয়ে দেবো।❠
সিদরা তাওহীদের বুকে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে এক গভীর স্বস্তির শ্বাস ফেলল,
❝আমার ওই সম্পত্তির চেয়েও আপনাকে পাওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জাজমেন্ট, ব্যারিস্টার সাহেব। আপনি পাশে থাকলে আমার আর কোনো কিছুর লোভ নেই।❠
তাওহীদ সিদরার কপালে আর এক মায়াবী স্পর্শ দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের নিচের তলা থেকে একটা বিকট শব্দ ভেসে এলো—ঝনঝন!
মনে হলো বিশাল কাঁচের জানালা বা সদর দরজার পাশের কোনো বড় কাঁচ ভারী কিছু দিয়ে এক আঘাতে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
এক সেকেন্ডের মধ্যে তাওহীদ আর সিদরা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল। তাওহীদের লয়ারের মস্তিষ্ক মুহূর্তের মধ্যে সজাগ হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় সিদরাকে নিজের পেছনের দিকে আড়াল করে স্টাডি রুমের জানালা দিয়ে নিচের মেইন গেটের দিকে তাকাল।
বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় দেখা গেল, চৌধুরী ভিলার সদর দরজার সামনে তিনটে কালো পালসার মোটরসাইকেল আর একটা লোগো ছাড়া মাইক্রোবাস এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়িগুলো থেকে নেমে আসছে প্রায় ৭-৮ জন সশস্ত্র যুবক, যাদের হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র আর রামদা। তাদের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। তারা কোনো স্লোগান দিচ্ছে না, অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় প্রফেশনাল হিটম্যানদের মতো বাড়ির পেছনের ও সামনের সিকিউরিটি লাইটগুলো এক এক করে রড দিয়ে পিটিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে।
❝ওরা এসে গেছে সিদরা!❠
তাওহীদের কণ্ঠস্বর এক নিমেষে বরফের মতো ঠাণ্ডা ও ইস্পাতকঠিন হয়ে উঠল। জাবেদ আলী আর সেই মন্ত্রী শেষ মুহূর্তে কেসের পেপারস চুরি করতে আর তাওহীদকে চিরতরে স্তব্ধ করতে আন্ডারগ্রাউন্ডের ক্যাডার পাঠিয়েছে।
সিদরা আতঙ্কে তাওহীদের হাত শক্ত করে চেপে ধরল,
❝ব্যারিস্টার সাহেব! আব্বু... তোহফা! ওরা ওপরে আসছে!❠
❝শান্ত হও সিদরা, একদম প্যানিক করবে না।❠
তাওহীদ সিদরার দুই কাঁধ ধরে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল,
❝তুমি এখনই সোজা তোহফার ঘরে যাও। দরজা ভেতর থেকে ডাবল লক করবে। আর আব্বুকেও ওখানেই নিয়ে যাও। ঘরের ভেতরের কোনো লাইট অন করবে না। আমি নিচে যাচ্ছি।❠
❝না! আমি আপনাকে একাকী নিচে যেতে দেবো না! ওদের হাতে অস্ত্র আছে!❠
সিদরার চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল পড়ছে। নিজের স্বামীকে এভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে তার মন সায় দিচ্ছিল না।
তাওহীদ সিদরার গালে হাত রেখে অত্যন্ত গভীর ও ভালোবাসাপূর্ণ চাউনি দিয়ে বলল,
❝তোমার এই ব্যারিস্টার সাহেব শুধু আইনের ধারা বোঝে না সিদরা, নিজের পরিবারকে কীভাবে প্রটেক্ট করতে হয় তাও খুব ভালো করে জানে। ট্রাস্ট মি, কিচ্ছু হবে না। জাস্ট গো!❠
সিদরা আর সময় নষ্ট না করে অন্ধকারের মধ্য দিয়েই তোহফার ঘরের দিকে ছুটে গেল। ওদিকে তাওহীদ তার স্টাডি রুমের ড্রয়ার থেকে একটি অত্যন্ত নিখুঁত, কালো রঙের লাইসেন্সড নাইন-এমএম পিস্তল বের করল। রাশেদ চৌধুরীর আমল থেকেই এই বাড়িতে সুরক্ষার জন্য এই অস্ত্রটি রাখা ছিল, যা তাওহীদ প্রতি বছর রিনিউ করে। আজ সেই অস্ত্রের প্রয়োজন পড়েছে।
নিচের তলায় তখন সদর দরজা ভাঙার চেষ্টা চলছে—ধড়াম! ধড়াম! ভারী রামদার কোপ পড়ছে কাঠের দরজায়।
তাওহীদ খুব নিঃশব্দে সিঁড়ির রেলিংয়ের আড়ালে এসে পজিশন নিল। সে তার ফোন বের করে এক ক্লিকে তেজগাঁও জোনের ডিসি মঈনকে লাউডস্পিকারে মেসেজ পাঠাল,
❝কোড রেড, চৌধুরী ভিলা। ক্যাডারস ইনসাইড দ্য প্রিমিজেস। সেন্ড ব্যাকআপ নাও!❠
দরজাটা এক বিকট শব্দে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল তিনজন কালো মুখোশধারী ক্যাডার। তাদের হাতের রামদার ফলায় ড্রয়িংরুমের অন্ধকারের মাঝেও এক তীব্র হিংস্রতার আলো চমকে উঠছিল। তাদের একজন ফিসফিস করে বলল,
❝ওপরের ঘরে চল। জাবেদ ভাই কইছে, ব্যারিস্টার আর ওর বউরে একদম শেষ কইরা ফাইলপত্র লইয়া নামতে হইব।❠
তারা যখনই সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখল, ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে এক গমগমে, বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো—
❝আর এক পা-ও যদি ওপরে বাড়াও, তবে তোমাদের লাশ এই চৌধুরী ভিলার ড্রয়িংরুম থেকে মর্গে যাবে। আই রিপিট, জাস্ট ওয়ান মোর স্টেপ!❠
ক্যাডাররা চমকে উঠে ওপরের দিকে তাকাতেই দেখল, সিঁড়ির একদম মাথায় অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক জ্যান্ত সিংহ—ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী, যার হাতের পিস্তলের নলটা সরাসরি তাদের বুকের দিকে তাক করা।
✤✣ᚔᚔ✤✣
—চলবে—
✤✣ᚔᚔ✤✣