ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার ব্যারিস্টার সাহেব

২৮তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

#পর্বঃ- ২৮

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

🚫⛔নাম ও হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔🚫

☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣

কক্সবাজারের সেই মায়াবী সমুদ্রতীর, ইনানীর মিষ্টি সূর্যাস্ত আর একান্তে কাটানো নিবিড় ভালোবাসার দিনগুলো শেষ করে চৌধুরী ভিলায় ফিরল তাওহীদ, সিদরা আর তোহফা। তবে এবার যেন ওনাদের মধ্যে কোনো ক্লান্তি ছিল না; বরং দুজনের চোখে-মুখেই ছিল এক অনাবিল সুখ, শান্তি আর নতুন উদ্দীপনার ছোঁয়া।

ঢাকা শহরের পরিচিত কোলাহল আর চৌধুরী ভিলার সুপরিচিত চত্বর আজ আরও বেশি আপন মনে হচ্ছিল। রাশেদ চৌধুরী দরজায় দাঁড়িয়ে ওনাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে ভেতরে ডেকে নিলেন। তোহফা তো বাড়ি ফিরেই দাদুকে নিজের কুড়িয়ে আনা সমুদ্রের রকমারি শামুক-ঝিনুক দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

দুই দিন পর। শুক্রবার সকাল দশটা।

সাভারের সেই সুপ্রশস্ত ও সবুজ শ্যামল প্রাঙ্গণে আজ উৎসবের আমেজ। আশরাফ আলী ট্রাস্টের অর্থায়নে এবং তাওহীদ চৌধুরীর সার্বিক সহায়তায় আজ উন্মোচিত হতে যাচ্ছে—‘মুনতাহা মহিলা ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র ও হাসপাতাল’।

প্রাঙ্গণ জুড়ে বিশাল প্যান্ডেল, রঙিন বেলুন আর শত শত আমন্ত্রিত অতিথির উপস্থিতি। এই পুনর্বাসন কেন্দ্রটি কেবল একটি চার দেয়ালের ভবন নয়; এখানে সমাজের নিগৃহীত, অসহায় নারী ও এতিম শিশুরা পাবে বিনামূল্যে সুচিকিৎসা, শিক্ষা এবং সম্মানজনকভাবে বাঁচার রসদ।

মঞ্চের ওপর আজ প্রধান আকর্ষণ সিদরাতুল মুনতাহা চৌধুরী।

সিদরার পরনে আজ এক চমৎকার মেরুন রঙের অভিজাত মসলিন থ্রি-পিস, মাথায় ওড়নাটি খুব সুসংযত ও সুন্দর করে হিজাবের মতো জড়ানো। ওনার নেকাবের আড়ালে থাকা চকচকে চোখ দুটি আজ এক অন্যরকম আত্মবিশ্বাসে ভাসছিল। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী, সুপুরুষ ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী। ওনার গায়ে ব্ল্যাক স্যুট, মুখে এক অহংকারী অথচ পরম মায়াবী বিজয়ীর হাসি।

মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়াল সিদরা। পুরো প্যান্ডেল জুড়ে এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।

সিদরা নিজের সামনে থাকা মাইক্রোফোনে অত্যন্ত স্পষ্ট, নম্র অথচ অটল কণ্ঠে বলতে শুরু করল—

❝আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার নিজের অতীতের কথা খুব মনে পড়ছে। আমি যখন ছোট ছিলাম, দাদুকে হারানোর পর মনে হতো এই দুনিয়াটা বুঝি বড় একা আর নিষ্ঠুর। কিন্তু জীবনের প্রতিটা ঝড়ের পর আলো আসে। আজ আমি অত্যন্ত গর্বের সাথে বলতে পারি, সমাজের প্রতিটি অসহায় মেয়ে, প্রতিটি এতিম শিশু আজ থেকে এই কেন্দ্রে তাদের নিজের ঘর খুঁজে পাবে। ওনারা একা নন।❠

সিদরা বক্তব্য থামিয়ে এক মুহূর্তের জন্য পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তাওহীদের দিকে তাকাল। ওনার চোখ দুটো আজ অসীম অনুরাগে টলমল করছিল। সে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল—

❝আর এই পুরো স্বপ্নটা বাস্তবে রূপ দিতে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি আমার জীবনসঙ্গী, আমার অভিভাবক—ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী। উনি আমাকে কেবল বিপদে রক্ষা করেননি, উনি আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছেন। ওনার মতো একজন মানুষ আমার পাশে আছেন বলেই আজ আমি এখানে দাঁড়াতে পেরেছি।❠

পুরো প্যান্ডেল এক মুহূর্তে করতালি আর প্রশংসাধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল! সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার ফ্ল্যাশগুলো একাধারে জ্বলতে লাগল।

তাওহীদ ধীর পায়ে সিদরার পাশে এসে দাঁড়াল। সে জনসমক্ষে সিদরার হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম ভালোবাসায় চেপে ধরল। তাওহীদের চোখের ভাষায় স্পষ্ট লেখা ছিল—

❝তুমিই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি, সিদরা।❠

বিকেল পাঁচটা। চৌধুরী ভিলার নিজস্ব বাগান।

অনুষ্ঠান সফলভাবে শেষ হওয়ার পর তাওহীদ ও সিদরা এখন চৌধুরী ভিলার খোলা বাগানে হাঁটছিল। বিকেলের মিষ্টি রোদ গাছের পাতার ফাঁক গলে ওনাদের ওপর এসে পড়ছিল। তোহফা বাগানের এক কোণে দাদুর সাথে নতুন ফ্লাওয়ার পটে পানি দিচ্ছিল।

তাওহীদ সিদরার হাত ধরে একটা বড় মেহগনি গাছের ছায়ায় এসে থামল।

সে সিদরার ফর্সা মুখশ্রীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তুমি করে বলল,

❝আজ তোমাকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখে আমার বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছিল, সিদরা। যে মেয়েটা একদিন নিজের পরিচয় দিতে ভয় পেত, আজ সে হাজার হাজার মেয়ের ভরসার প্রতীক। তুমি সত্যিই অনন্য।❠

সিদরা একটু লাজুক হাসল। সে তাওহীদের খুব কাছে এগিয়ে এসে, ওনার শার্টের কোণাটা আলতো করে চেপে ধরে পরম মায়ায় আপনি করে বলল—

❝আমি যা কিছু হয়েছি বা হতে পেরেছি, তা সবই আপনার এই অচলা ভালোবাসার জন্য, ব্যারিস্টার সাহেব। আপনি যদি সেদিন হাতটা না ধরতেন, আমি তো সেই অন্ধকারেই হারিয়ে যেতাম। আপনার এই বুকে মাথা রাখার অধিকার না পেলে আজ আমি কোথায় থাকতাম?❠

তাওহীদ আলতো করে সিদরার নেকাবটা সরিয়ে ওনার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ওনার ঠোঁটের সেই পরিচিত উষ্ম পরশে সিদরা আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

তাওহীদ সিদরার চিবুক ধরে নিজের দিকে তুলে ধরে ফিসফিস করে বলল,

❝আর আমি তোমাকে পেয়ে আমার জীবনের আসল অর্থ খুঁজে পেয়েছি, সিদরা। তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও, তুমি আমার এই রুক্ষ জীবনের একমাত্র বসন্ত।❠

সিদরা তাওহীদের চওড়া বুকে নিজের মুখটা এলিয়ে দিল। বাগানের মিষ্টি বাতাস আর পাখির কিচিরমিচিরে পুরো দুপুরটা যেন এক রূপকথার ছন্দে মেতে উঠল।

বিগত দিনের সমস্ত লড়াই, ইশরাতের অতীত রহস্য, শত্রুদের চক্রান্ত—সব আজ ধুলোয় মিশে গেছে। অবশিষ্ট রইল কেবল এক অটুট বন্ধন, অপরিসীম শ্রদ্ধা আর সীমাহীন ভালোবাসা।

ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ

সাভারের পুনর্বাসন কেন্দ্র ও হাসপাতালের উদ্বোধনের পর দেখতে দেখতে দুটো সপ্তাহ কেটে গেল। চৌধুরী ভিলার প্রতিটি কোণে এখন এক অন্যরকম আনন্দ ও শান্তির পরশ।

আজ শনিবারের স্নিগ্ধ সকাল। হালকা শ্রাবণের মেঘের আড়াল থেকে রোদের মিষ্টি আলো চৌধুরী ভিলার জানালার কাঁচ ঘেঁষে এসে সিদরার আলমারির ওপর পড়ছে।

সকাল সাড় আটটা।

সিদরা রান্নাঘরে দাঁড়িয়েছিল। আজ

তাওহীদের জন্য নিজ হাতে স্পেশাল ফিরনি বানাচ্ছিল সে। জাফরান, কাজু আর পেস্তার মিষ্টি সুবাসে পুরো রান্নাঘর মৌ মৌ করছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই দুপুরের দিকে ফোটা দুধে এলাচ দেওয়ার সময়, ফিরনির গাঢ় সুবাস সিদরার নাকে লাগতেই ওনার মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল।

সিদরা সাথে সাথে রান্নাঘরের কিচেন স্ল্যাবটা এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরল। পেটের ভেতর থেকে এক তীব্র অস্বস্তি আর বমি ভাব এক লহমায় ওনার গলা পর্যন্ত উঠে এলো!

❝ম্যাডাম! কী হয়েছে আপনার?!❠

খালার হাত থেকে একটুর জন্য বাটিটা পড়ে যাচ্ছিল।

সিদরা হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে দৌড়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ ওকাওকি করার পর সে যখন বেসিনের আয়নায় তাকাল, ওনার ফর্সা মুখশ্রী তখন একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল তাওহীদ। আজ শনিবারে ওনার কোর্ট বন্ধ, তাই ক্যাজুয়াল শার্ট আর ট্রাউজার পরে শান্ত মনেই রুমে ঢুকছিল সে। কিন্তু সিদদাকে ওভাবে আয়না ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর ওনার ফ্যাকাশে মুখ দেখে তাওহীদের মনের ভেতরটা মুহূর্তেই দুশ্চিন্তায় মোচড় দিয়ে উঠল।

সে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে সিদরার দু কাঁধ শক্ত করে ধরে অত্যন্ত আকুল ও উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

❝সিদরা! কী হয়েছে তোমার? মুখ অত ফ্যাকাশে লাগছে কেন? তুমি কি অসুস্থ?!❠

সিদরা দুর্বল হেসে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল,

❝না... তেমন কিছু না, ব্যারিস্টার সাহেব। গত দু-তিন দিন ধরে সকালে কেমন যেন মাথাটা ঘোরে, আর একটু বমি ভাব হয়। হয়তো কাল রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি, তাই...❠

তাওহীদ এক সেকেন্ডও সিদরার কথা শুনল না। সে সোজা সিদদাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বেডরুমে এসে বিছানায় সাবধানে শুইয়ে দিল।

❝তুমি এক পা-ও নড়বে না। আমি এখুনি ডক্টর ফরিদা খাতুনকে ফোন করছি।❠

তাওহীদের কণ্ঠে সেই চেনা ব্যারিস্টারি কড়াকড়ি, কিন্তু চোখের কোণায় কেবলই প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য এক ব্যাকুল দুশ্চিন্তা।

সিদরা বিছানায় শুয়ে তাওহীদের এই পাগলামি দেখে ঠোঁট চেপে হাসল। এই লোকটা পুরো দুনিয়ার সামনে যত গম্ভীর আর শক্তই থাকুক না কেন, সিদরার সামান্য একটু শরীর খারাপ হলেই উনি বাচ্চা ছেলেদের মতো অধৈর্য হয়ে পড়েন।

ঘণ্টাখানেক পর।

চৌধুরী ভিলার দোতলার মাস্টার বেডরুম।

ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ডক্টর ফরিদা খাতুন সিদদাকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। রুমের বাইরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল তাওহীদ। ওনার পেছনে দাঁড়ানো রাশেদ চৌধুরী আর তোহফা।

তোহফা দাদুর হাত ধরে ছোট মুখে প্রশ্ন করল,

❝দাদু, আম্মুর কী হয়েছে? আম্মুর কি খুব কষ্ট হচ্ছে?❠

রাশেদ চৌধুরী তোহফার মাথায় হাত বুলিয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন। ওনার অভিজ্ঞতা আর ডক্টরের মুখের তৃপ্তির হাসি দেখেই উনি যেন একটা মিষ্টি গুঞ্জন আঁচ করতে পারছিলেন।

কিছুক্ষণ পর ডক্টর ফরিদা খাতুন রুমের দরজা খুলে বাইরে এলেন। ওনার মুখে এক চওড়া, আনন্দময় হাসি।

তাওহীদ সাথে সাথে এগিয়ে এসে ব্যাকুল গলায় বলল,

❝ডক্টর, সিদরা ঠিক আছে তো? কোনো ইনফেকশন বা বড় কোনো প্রবলেম নয় তো? প্রেব্লেম থাকলে আমরা এখনই ভালো কোনো হসপিটালে নিয়ে যাব!❠

ডক্টর ফরিদা একটু হেসে তাওহীদের কাঁধে হাত রাখলেন,

❝শান্ত হন, ব্যারিস্টার সাহেব! সুপ্রিম কোর্টে এত কঠিন কেস লড়েন, আর স্ত্রীর সামান্য খবরেই এত হাইপার হয়ে যাচ্ছেন? শুনুন, আপনার স্ত্রীর কোনো রোগ হয়নি। অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি—সিদরাত মা তিন মাসের গর্ভবতী! আপনি বাবা হতে চলেছেন তাওহীদ সাহেব!❠

কথাটি শোনামাত্রই যেন পুরো চৌধুরী ভিলার সময় থমকে গেল!

তাওহীদ স্তব্ধ হয়ে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে রইল। যে মানুষটার মুখ থেকে এক মুহূর্তের জন্য কথা আটকায় না, সেই প্রখ্যাত ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরী আজ একদম বাকরুদ্ধ! ওনার হৃদয়যন্ত্রটা যেন এক অজানা মহা-আনন্দে তোলপাড় করে উঠল।

❝সত্যি বলছেন ডক্টর?!❠

রাশেদ চৌধুরী খুশিতে ডক্টরের হাত ধরে ফেললেন,

❝আলহামদুলিল্লাহ! পরম করুণাময়ের শতকোটি শুকরিয়া!❠

তোহফা লাফিয়ে উঠে বলল,

❝ইয়েই! আমি এবার বড় বোন হব! আমার সাথে খেলা করার জন্য ছোট পিচ্চি বাবুন আসবে!❠

ডক্টর ফরিদা কিছু জরুরি ভিটামিন আর আয়রন ট্যাবলেটের প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে চলে গেলেন।

রুমের ভেতর তখন শুধুই এক নিবিড় নিস্তব্ধতা। সিদরা বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে বসে ছিল। ডক্টরের মুখ থেকে নিজের সন্তানসম্ভবা হওয়ার খবরটা শোনার পর থেকে ওনার দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে আনন্দের অশ্রু। ওনার নিজের দু হাত আলতো করে রাখা নিজের পেটের ওপর।

তাওহীদ অত্যন্ত ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলো। সে দরজার কাছে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন এই আনন্দটা সত্যি নাকি স্বপ্ন, তা বিশ্বাস করতেই ওর কিছুটা সময় লাগছিল।

অতঃপর সে পা বাড়িয়ে সিদরার বিছানার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তাওহীদ সিদরার দুটি কাঁপাকাঁপা হাত নিজের চওড়া হাতের তালুর ভেতর তুলে নিল। সে সিদরার চোখের জল নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে পরম মায়ায় মুছে দিল। ওনার নিজের চোখ দুটোতেও আজ জল টলমল করছিল—এক পরম তৃপ্তির জল।

❝ব্যারিস্টার সাহেব...❠

সিদরা অত্যন্ত নরম, কাঁপানো ও গদগদ গলায় ফিসফিস করে বলল, ❝আমাদের ভালোবাসার নতুন কুঁড়ি আসছে...❠

তাওহীদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ঝুঁকিয়ে এসে সিদরার কপালে এক দীর্ঘ, গভীর ও ব্যাকুল চাটু এঁকে দিল। ওনার ঠোঁটের সেই উষ্ম পরশ যেন সিদরার আত্মা পর্যন্ত স্পর্শ করল।

তাওহীদ সিদরার দুই গাল চেপে ধরে, ওনার চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত নিচু ও কাঁপানো গলায় তুমি করে বলল—

❝সিদরা... তুমি আমাকে কী দিলে তা হয়তো আমি কোনো ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। এতিমখানার চার দেয়ালে কাটানো যে মেয়েটিকে এই চৌধুরী ভিলায় নিয়ে এসেছিলাম, আজ সেই মেয়েটি আমার এই পুরো পরিবারকে পূর্ণতা এনে দিল। তুমি আমাকে বাবা বানাতে চলেছ, সিদরা!❠

সিদরা লাজুক হেসে তাওহীদের কাঁধে নিজের মুখটা গুঁজে দিল।

তাওহীদ পরম যত্নে সিদরার পিঠে নিজের হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। সে সিদরার পেটের ওপর নিজের ডান হাতটা আলতো করে রাখল।

❝আজ থেকে কোনো কাজ নয়, সিদরা। কোনো ধকল নয়। আগামী ছ-সাত মাস তুমি শুধুই বিশ্রামে থাকবে, আর তোমার এই সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার স্বামী ২৪ ঘণ্টা তোমার গোলামি করবে!❠

তাওহীদ একটু দুষ্টুমি করে বলে উঠল।

সিদরা তাওহীদের বুকে মুখ রেখেই খিলখিল করে হেসে উঠল,

❝কী যে বলেন না আপনি! আপনি কোর্ট সামলাবেন না আমার সেবা করবেন?❠

❝আমার কোর্টের চেয়ে, আমার পুরো দুনিয়ার চেয়ে এখন তুমি আর আমাদের এই অনাগত সন্তান অনেক বেশি মূল্যবান।❠

তাওহীদ পরম অনুরাগে সিদরার থুতনি ধরে ওনার মিষ্টি ঠোঁটে এক নিবিড় ভালোবাসার ছোঁয়া দিল।

বিকেল বেলা। পুরো চৌধুরী ভিলায় যেন ছোটখাটো এক উৎসব শুরু হয়ে গেছে। রাশেদ চৌধুরী নিজে মিষ্টির প্যাকেট আনিয়ে ড্রাইভার, খলিফা আর বাড়ির সব কাজের লোকদের মিষ্টিমুখ করালেন।

বিকেলের রক্তিম আলো যখন চৌধুরী ভিলার বাগানে এসে পড়ছিল, সিদরা ব্যালকনিতে একটা আরামদায়ক ইজিচেয়ারে বসে ছিল। ওনার পরনে এক নরম গোলাপি রঙের ঢিলেঢালা সুতির আবায়া, মাথায় সুন্দর করে চাদর জড়ানো।

তাওহীদ ট্রাস্টের আর কোর্টের সমস্ত ফাইল বাতিল করে দিয়ে পুরো বিকেলটা সিদরার পাশে এসে কাটছিল। সে সিদরার পেছনে দাঁড়িয়ে ওনার কাঁধে আলতো করে হাত রেখেছিল।

তোহফা এসে সিদরার কোলের কাছে বসে সিদরার পেটে কান রেখে শুনছিল,

❝আম্মু, ছোট বাবুটা কি এখনই আমার সাথে কথা বলবে না?❠

সিদরা তোহফার নরম গালে হাত রেখে আদর করে বলল,

❝এখন নয় মামণি, আরও কিছুদিন পর সে যখন বের হবে, তখন সারাদিন তোর সাথে খেলা করবে।❠

তাওহীদ সিদরার পাশে ঝুঁকে এসে ওনার কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

❝তোহফার মতো যদি আরেকটা পুতুল মেয়ে হয়, তবে তো আমার এই চৌধুরী ভিলার পুরো রাজত্বই নারীদের দখলে চলে যাবে!❠

সিদরা ওনার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বলল,

❝আর যদি আপনার মতো এক কড়া ব্যারিস্টার ছেলে হয়? যে সারাদিন শুধু তার বাপের মতো গম্ভীর হয়ে থাকবে?❠

❝তবে তো বেশ হয়! ছোট ব্যারিস্টার এসে তার বাবার মতোই তার মায়ের প্রেমে হাবুডুবু খাবে!❠

তাওহীদ এক ঝটকায় সিদরার কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো করে কামড় বসাতেই সিদরা লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

❝আহ! তোহফা দেখছে তো!❠

সিদরা চোখ বড় বড় করে বলল।

তোহফা দু হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলে বলল,

❝আমি কিছু দেখছি না! আমি দাদুর কাছে যাচ্ছি!❠

বলে সে হেসে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তোহফা চলে যেতেই তাওহীদ সিদরাকে এক নিমেষে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে টেনে নিল। সূর্যাস্তের লালচে আলো ওনার দুজনের ওপর এসে এক স্বর্গীয় আবহ তৈরি করল।

জীবনের সমস্ত মেঘ কেটে গিয়ে আজ ওনাদের ভালোবাসার ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে এক পূর্ণাঙ্গ, সুখী পরিবারের মিষ্টি প্রতিচ্ছবি। ভালোবাসার এই বন্ধন এখন আরও অটুট, আরও পবিত্র।

✤✣ᚔᚔ✤✣

—চলবে—

✤✣ᚔᚔ✤✣

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন