#আমার_ব্যারিস্টার_সাহেব🎓
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#পর্বঃ- ২৯
☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣
🚫⛔নাম ও হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।⛔
☣☘ᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔᚔ☘☣
ডক্টর ফরিদা খাতুনের সেই আনন্দের খবরের পর চৌধুরী ভিলার পুরো আবহাওয়াটাই যেন এক লহমায় বদলে গেল। পুরো বাড়ির কেন্দ্রে এখন শুধুই সিদরা। রান্নাঘরের হাঁড়িপাতিল ছোঁয়া তো দূরের কথা, সিদরাকে দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেও এখন তাওহীদের কড়া নিষেধাজ্ঞা শুনতে হয়!
আজ মঙ্গলবার। শ্রাবণের রিমঝিম বৃষ্টির পর ঢাকার আকাশটা বেশ মেঘলা, আবহাওয়াও শীতল।
সকাল নয়টা।
সিদরা বেডরুমে আরামদায়ক একটা হালকা নীল রঙের সুতির ড্রেস পরে ইজিচেয়ারে বসে ছিল। ওনার কোলে একটা নরম তোশক আর হাতে এক বাটি ড্রাই ফ্রুটস ও বাদাম।
দরজা খুলে ঘরে ঢুকল তাওহীদ। ওনার গায়ে আজ ধূসর রঙের থ্রি-পিস স্যুট, হাতে একটা বড় ব্ল্যাক লেদার ফাইল। আজ সুপ্রিম কোর্টে ওনার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্পোরেট কেসের শুনানি আছে। কিন্তু আদালতে যাওয়ার আগে ওনার মূল ডিউটি হলো নিজের গর্ভবতী স্ত্রীর যত্ন তদারকি করা।
তাওহীদ ধীর পায়ে সিদরার সামনে এসে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে সিদরার হাতের বাটিটা নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে সিদরার দুটো নরম হাত নিজের চওড়া হাতের তালুতে তুলে নিল।
"সিদরা, অ্যাপেল জুসটা শেষ করেছ? আর ডক্টর যে ফোলিক অ্যাসিডের ট্যাবলেটটা দিয়েছিল, ওটা খেয়েছ তো?" তাওহীদ সিদরার চোখের দিকে তাকিয়ে পরম মায়ায় জিজ্ঞাসা করল।
সিদরা একটু মিষ্টি হেসে ওনার দিকে তাকাল। ওনার মুখে গর্ভকালীন এক অদ্ভুত গোলাপি আভা ফুটে উঠেছে, যা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে।
সে হালকা অভিমানের সুরে আপনি করে বলল, "ব্যারিস্টার সাহেব... আপনি কি প্রতিদিন কোর্টে যাওয়ার আগে এভাবে সিআইডির মতো জেরা করবেন? আমি খালার সামনেই জুস আর ওষুধ খেয়ে নিয়েছি। আপনি অযথা চিন্তা করছেন। আপনার তো আজ ইম্পর্টেন্ট কেস আছে, দেরি হয়ে যাচ্ছে না?"
তাওহীদ সিদরার গাল দুটো পরম অনুরাগে আলতো করে চেপে ধরল। সে নিজের সানগ্লাসটা কোটের পকেটে রেখে তুমি করে বলল—
"আমার কাছে সুপ্রিম কোর্টের শত কোটি টাকার কেসের চেয়েও অনেক বেশি ইম্পর্টেন্ট হলো তোমার আর এই অনাগত পুঁচকের খেয়াল রাখা। আর হ্যাঁ, আমি রাশেদ আব্বাকে বলে দিয়েছি, তুমি আজকে কোনোভাবেই সাভার প্রজেক্টের অনলাইন মিটিং এটেন্ড করবে না। রফিককে বলা আছে, সে সব ফাইল এখানে পৌঁছে দেবে।"
সিদরা তাওহীদের এই একগুয়ে কিন্তু অপরিসীম ভালোবাসায় ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে আর না করতে পারল না। সে তাওহীদের টাই-এর নটটা একটু সোজা করে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, "আপনি দিনে দিনে ভীষণ একগুয়ে আর একনায়ক হয়ে উঠছেন, তাওহীদ।"
"শুধু তোমার ওপর," তাওহীদ এক ঝটকায় সিদরার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে ওনার কাঁচা গোলাপের মতো স্নিগ্ধ ঠোঁটে এক দীর্ঘ, উষ্ম ও ব্যাকুল ভালোবাসা এঁকে দিল।
সিদরা আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওনার দু হাত তাওহীদের স্যুটের ল্যাপেল আঁকড়ে ধরল।
চুম্বন শেষে তাওহীদ একটু সরে এসে সিদরার কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। ওনার নিশ্বাসের উত্তাপ সিদরার গালে লাগতেই সিদরা লজ্জায় লাল হয়ে ওনার বুকে মুখ লুকাল।
তাওহীদ সিদরার পেটের ওপর পরম মায়ায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, "আজ কোর্টে একটা বড় ঘোষণা দিতে যাচ্ছি সিদরা। তোমার আর আমাদের সন্তানের নামে একটা নতুন সামাজিক ফাউন্ডেশনের ট্রাস্ট-অ্যাক্ট জমা দেব।"
সিদরা অবাক হয়ে মাথা তুলল, "নতুন ফাউন্ডেশন?!"
"হ্যাঁ, 'সিদরা-তাওহীদ ওয়েলফেয়ার ফান্ড'। যেখানে সমাজের প্রতিটি দুঃস্থ মা ও শিশুর চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ এই ফান্ড থেকে দেওয়া হবে। দাদুর ট্রাস্টের পাশাপাশি এটি হবে আমাদের ব্যক্তিগত ভালোবাসার উপহার," তাওহীদ গর্বিত হেসে বলল।
সিদরার চোখ দুটো আবারো আনন্দের জলে ভিজে উঠল। যে মেয়েটা একদিন নিজের কোনো পরিচয় পাওয়ার আশা করেনি, আজ তার নামে পুরো দেশের হাজার হাজার অসহায় মা সাহায্য পেতে চলেছে!
দুপুর একটার দিকে তোহফা স্কুল থেকে ফিরল। তোহফা এখন আর সিদদাকে কোনো কাজের ঝামেলা করতে দেয় না। ছোট বাচ্চাটা বেশ দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে।
সে সোজা ঘরে ঢুকে সিদরার কোলের পাশে এসে বসল এবং সিদরার পেটে হাত রেখে খুব আস্তে করে বলল, "আম্মু, ছোট বাবু কি এখন ঘুমাচ্ছে? আমি কিন্তু ওর জন্য আমার স্পেশাল বার্বি ডল আর ড্রয়িং কালারগুলো গুছিয়ে রেখেছি!"
সিদরা তোহফাকে কাছে টেনে নিয়ে ওনার কপালে চুমু খেল, "তোহফা মামণি, তোর ছোট ভাই বা বোন কিন্তু তোকে পেয়ে খুব খুশি হবে। সে তো তোর সাথেই প্রথম খেলা শিখবে।"
ঠিক তখনই নিচে গাড়ি থামার শব্দ হলো।
আদালতের কার্যক্রম শেষ করে তাওহীদ বেশ সকালেই বাড়ি ফিরে এসেছে। ওনার পেছনে ওনার জুনিয়র ল-ইয়ার শাকিল আর ট্রাস্টের সেক্রেটারি রফিক।
তাওহীদ সোজাসুজি রুমে ঢুকে সিদদাকে দেখে মুচকি হাসল। ওনার হাতে এক বিশাল তোড়া গাঢ় লাল গোলাপ!
সে তোহফাকে আদর করে চকলেট দিয়ে রাশেদ চৌধুরীর কাছে পাঠাল, আর নিজের হাতে গোলাপের তোড়াটা সিদরার কোলে তুলে দিল।
"আজ কোর্টে নতুন ট্রাস্ট ফান্ড অনুমোদিত হয়েছে সিদরা! সব ল-ইয়ার আর জজ সাহেবরা তোমাকে অনেক দোআ ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন," তাওহীদ বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল।
সিদরা লাল গোলাপের সুবাস নিয়ে তাওহীদের দিকে তাকাল। সে তাওহীদের হাতটা ধরে টেনে নিজের পাশে বসাল।
"আপনি প্রতিদিন আমাকে এভাবে চমকে দেন কেন বলুন তো? আমি এত ভালোবাসা কোথায় রাখব, ব্যারিস্টার সাহেব?" সিদরা গদগদ গলায় বলল।
তাওহীদ সিদদাকে নিজের চওড়া বুকের ভেতর এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। সে সিদরার চুলে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে পরম অনুরাগে বলল—
"আমার ভালোবাসার কোনো শেষ নেই সিদরা। তুমি কেবল সুস্থভাবে আমাদের সন্তানকে এই পৃথিবীতে নিয়ে এসো, তারপর দেখবে আমি তোমাকে সারা দুনিয়ার সুখে কীভাবে ভাসিয়ে দিই।"
বিকেলের হালকা রোদে দুটি হৃদয়ের ভালোবাসা যেন আরও গাঢ় ও নিবিড় হয়ে উঠল। কিন্তু ওরা কেউ জানত না, এই পরম আনন্দের দিনগুলোর মাঝেই আগামীতে কেমন মিষ্টি পারিবারিক চ্যালেঞ্জ আর মজার অভিজ্ঞতা আসতে চলেছে!
ᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔᚔᚓᚔᚓᚔᚓᚔ
সিদরার গর্ভাবস্থার চারটে মাস পার হয়ে এখন পঞ্চম মাসে পা দিয়েছে। এই পাঁচ মাসে চৌধুরী ভিলার রূপপুরো বদলে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের তুখোড় ব্যারিস্টার তাওহীদ চৌধুরীকে এখন কোর্টের কেস ফাইলের চেয়েও বেশি ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় সিদরার ডায়েট চার্ট, চেক-আপের তারিখ আর মধ্যরাতের অদ্ভুত সব বায়না সামলাতে!
আজ শুক্রবারের রাত। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দুইটো বাজে।
বাইরে হালকা হালকা বৃষ্টি পড়ছে, ঘরের এসিটা বেশ ঠান্ডা একটা পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। তোহফা পাশের ঘরে খালা আর দাদুর সাথে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
তাওহীদ সারাদিনের ধকলের পর সিদরাকে নিজের চওড়া বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সিদরা ওনার বুক থেকে মাথা তুলে বসে পড়ল। ওনার মুখটা একদম গম্ভীর, আর চোখ দুটো ছলোছলো!
তাওহীদ সাথে সাথে চোখ খুলে সিদরার দিকে তাকাল। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে সিদরার দু হাত ধরে আকুল গলায় বলল, "কী হয়েছে সিদরা?! কোথাও কোনো ব্যথা হচ্ছে? বমি ভাব লাগছে? আমি কি ডক্টরকে কল করব?!"
সিদরা চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে মাথা নাড়াল। সে নিচের ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরে অত্যন্ত নরম, অভিমানী ও লাজুক গলায় আপনি করে বলল—
"না... কোনো ব্যথা হচ্ছে না, ব্যারিস্টার সাহেব। কিন্তু আমার... আমার এই মুহূর্তে কাঁচা আম দিয়ে বানানো একদম টক-ঝাল তেঁতুলের আচার খেতে ইচ্ছে করছে!"
তাওহীদ এক সেকেন্ডের জন্য চোখ বড় বড় করে সিদরার দিকে তাকিয়ে রইল।
"তেঁতুলের আচার?! রাত দুটো বাজে সিদরা!" তাওহীদ একটু অবাক হয়ে হেসে ফেলল।
সিদরার চোখে সাথে সাথে পানি চলে এলো। সে মুখ ঘুরিয়ে অভিমানের সুরে বলল, "আমি জানতাম! আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না! ডক্টর বলেছে আমার যা খেতে ইচ্ছে করবে তা দিতে হবে, আর আপনি হাসছেন? ঠিক আছে, আমার আর কিছু খেতে হবে না! আপনার এই নতুন বাবুটাও কিছু খাবে না!"
কথাটা বলেই সিদরা বিছানার অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে পড়তে গেল।
তাওহীদ আর সামলাতে পারল না। সে এক ঝটকায় সিদরার কোমর আলতো করে ধরে ওনাকে আবার নিজের কাছে টেনে আনল। প্রখ্যাত ব্যারিস্টার সাহেব আজ নিজ ঘরে নিজের স্ত্রীর এই অহেতুক মিষ্টি রাগের সামনে একদম নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলেন!
তাওহীদ সিদরার ফর্সা গালে জমে থাকা এক ফোঁটা চোখের জল পরম মায়ায় নিজের ঠোঁট দিয়ে চুষে নিল। সে সিদরার চিবুকটা ধরে উঁচিয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল ও অনুরাগী কন্ঠে তুমি করে বলল—
"পাগলী একটা! আমি তো শুধু ভেবেছিলাম এত রাতে আচার খেলে তোমার গ্যাস্ট্রিকের প্রবলেম হবে কি না। কিন্তু আমার বউ আর আমার পুঁচকে যখন বায়না করেছে, তখন পুরো ঢাকা শহর ঘুরে হলেও আমি সেই আচার এনে দেব।"
সিদরা একটু চোখ তুলে তাকাল, "সত্যি এনে দেবেন? এখন কোথায় পাবেন?"
"তুমি শুধু দশ মিনিট অপেক্ষা করো," তাওহীদ সিদরার কপালে একটা মিষ্টি চুমু খেয়ে নিজের ট্রাউজার আর জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে নিল।
রাত সওয়া দুটো।
চৌধুরী ভিলার রান্নাঘরের আলো জ্বলছে। তাওহীদ নিজে ফ্রিজ আর স্টোর রুমের সব বয়াম এক এক করে খুঁজছিল। শেষমেশ একদম ওপরের সেলফে হোম-মেড খালার লুকিয়ে রাখা আচারের বয়ামটা পেয়ে গেল সে!
প্লাস্টিকের বয়াম খুলে তাওহীদ নিজে একটা ছোট কাঁচের বাটিতে কাঁচা আম ও তেঁতুলের টক-ঝাল আচার ঢালল। কিন্তু খালি মুখে তো আচার দেওয়া যাবে না, তাই সাথে কিছু হালকা বিস্কুট আর এক গ্লাস গরম দুধও ট্রে-তে সাজিয়ে নিল সে।
রুমে ফিরতেই সিদরা দেখে তাওহীদ হাতে ট্রেই নিয়ে ঢুকছে। সিদরার ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই এক অনাবিল আনন্দে ঝলমল করে উঠল!
তাওহীদ ট্রে-টা ট্রে-টেবিলে রেখে সিদরার পেছনে দুটো তুলতুলে বালিশ গুজে দিল। সে নিজে এক চামচ আচার সিদরার ঠোঁটের সামনে ধরল।
সিদরা পরম তৃপ্তিতে আচারটুকু মুখে দিতেই ওনার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। টক-ঝালের সেই স্বাদ পেয়ে সে এক মিষ্টি হাসি হেসে তাওহীদের দিকে তাকাল।
"কেমন হয়েছে, চেয়ারম্যান সাহেবা?" তাওহীদ সিদরার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞেস করল।
"ভীষণ টেস্ট! আপনিও একটু খেয়ে দেখুন না!" সিদরা চামচটা তাওহীদের ঠোঁটের সামনে ধরল।
তাওহীদ একটু মুখ কুঁচকে বলল, "ওহ নো! আমার ওই ভয়ানক টক সইবে না।"
"খাবেন না মানে? আপনাকে খেতেই হবে!" সিদরা জেদ ধরে বসে পড়ল।
তাওহীদ আর না করতে পেরে সিদরার হাত থেকে একটুখানি আচার মুখে দিতেই ওনার চোখ-মুখ কুঁচকে একাকার হয়ে গেল! সিদরা তা দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। গত পাঁচ মাসে সিদরার এমন প্রাণখোলা অকৃত্রিম হাসি তাওহীদ আর দেখেনি।
তাওহীদ আচার খেয়ে মুখ সামলে সিদরার গ্লাসের দুধটা ওনার হাতে তুলে দিল, "আচার খাওয়া শেষ, এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো এই দুধটুকু শেষ করো। নইলে কাল সকালে আমার ডক্টরের ক্লাসে জবাবদিহি করতে হবে।"
সিদরা তাওহীদের কথা মতো দুধটুকু খেয়ে গ্লাসটা রেখে দিল।
এবার তাওহীদ সিদদাকে খুব সাবধানে নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। সিদরার পেটটা এখন কিছুটা স্পষ্ট ও গোলাকার হয়ে উঠেছে। তাওহীদ নিজের চওড়া হাতের তালুটা সিদরার পেটের ওপর রাখল।
হঠাৎ করেই তাওহীদের হাতের তালুর নিচে একটা হালকা স্পন্দন অনুভব হলো!
একটু ধাক্কা! ছোট্ট এক অনির্বচনীয় নড়াচড়া!
তাওহীদ চকিত চোখে সিদরার দিকে তাকাল। ওনার চোখ দুটো আজ আনন্দে ও বিস্ময়ে ছলোছলো করে উঠল!
"সিদরা! ও... ও কি কিক করল?!" তাওহীদ এক শিশুর মতো উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল!
সিদরা লাজুক হেসে মাথা নাড়াল, "হ্যাঁ, আপনার বাচ্চা টের পেয়ে গেছে যে ওনার আব্বু ওনার আম্মুকে কতটা ভালোবাসে। তাই ও ভেতর থেকে সাড় দিল।"
তাওহীদ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে সিদরার পেটের ওপর আলতো করে নিজের মুখ নামিয়ে এক পরম মমতায় ও পরম অনুরাগে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল।
"থ্যাঙ্ক ইউ সিদরা... আমার জীবনের এই প্রতিটা অনুভূতি এত সুন্দর করে তোলার জন্য থ্যাঙ্ক ইউ," তাওহীদের কন্ঠটা আবেগ ও আনন্দে বেশ ভারী হয়ে এলো।
সে সিদদাকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে বিছানায় সাবধানে শুইয়ে দিল। সিদরা তাওহীদের চওড়া বুকের ভেতর নিজের মুখটা লুকিয়ে এক গভীর সুখে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
বাইরে শ্রাবণের মিষ্টি বৃষ্টি আর ভেতরে দুই হৃদয়ের চিরন্তন রূপকথা এক পরম পূর্ণতা পেল।
পরদিন সকাল দশটা।
চৌধুরী ভিলার বড় ডাইনিং টেবিল। রাশেদ চৌধুরী পেপার পড়ছিলেন, আর তোহফা তার স্কুলের কালারিং বুক নিয়ে বসে ছিল।
তাওহীদ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। আজ ওনার পরনে হালকা রঙের ক্যাজুয়াল শার্ট। কিন্তু ওনার মুখমণ্ডল জুড়ে যেন এক বিজয়ের হাসি।
রাশেদ চৌধুরী চশমার ফাঁক দিয়ে তাওহীদের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন, "কী রে তাওহীদ? কাল রাতে তোদের ঘর থেকে গভীর রাতে কিসের এত কাঁচের বয়ামের শব্দ আসছিল? সিদরা মা কি আবার কোনো নতুন বায়না করেছে নাকি?"
তাওহীদ একটু হাত কচলিয়ে বাবাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, "না মানে আব্বা... ও জাস্ট একটু আচার খেতে চেয়েছিল, তাই..."
তোহফা কালারিং বুক থেকে মুখ তুলে বলল, "দাদু! আব্বু তো কাল রাতে আম্মুর জন্য রান্নাঘরে চুপিচুপি ঢুকছিল, আমি ডোর দিয়ে দেখেছি!"
রাশেদ চৌধুরী অট্টহাসি হেসে উঠলেন, "পাপের ভাগী হতে চাস না তোহফা মামণি! তা তাওহীদ, সুপ্রিম কোর্টের ডক-এ দাঁড়িয়ে বড় বড় অপরাধীদের কাবু করতে পারিস, কিন্তু বউয়ের আচারের বায়নার কাছে তুই একদম কাবু, তাই না?"
বাড়ির সব কাজের লোক আর খালার মুখেও এক মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। চৌধুরী ভিলার যে বাড়িতে একসময় নিস্তব্ধতা আর থমথমে ভাব ছিল, আজ সেখানে কেবলই হাসির রোল আর ভালোবাসার গুঞ্জন।
ঠিক তখনই সিদরা ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। ওনার পরনে সুতির গোলাপি আবায়া, গায়ে ওড়না সুসংযতভাবে জড়ানো। ওনার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত দ্যুতি।
তাওহীদ সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে সিদরার হাত ধরে ওনাকে সাবধানে চেয়ারে এনে বসাল।
"তুমি নিচে নামতে গেলে কেন সিদরা? আমি তো ট্রে-তে করে তোমার নাস্তা ওপরেই পাঠিয়ে দিতাম," তাওহীদ আলতো কড়া সুরে বলল।
সিদরা রাশেদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, "আব্বু দেখুন না আপনার ছেলে আমাকে একদম বন্দি করে রাখতে চায়! আমি একটু সবার সাথে বসে নাস্তা করতে পারব না?"
রাশেদ চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন, "তাওহীদ, তুই বউকে বেশি শাসন করিস না তো! সিদরা মা এখন একদম ঠিক আছে।"
সকালের মিষ্টি কফির ধোঁয়া আর পরোটার সুবাসে পুরো চৌধুরী ভিলায় যেন এক নতুন দিনের শুভ সূচনা হলো।
কিন্তু এই অনাবিল পারিবারিক আনন্দের মাঝেও, সিদরা আর তাওহীদের এই সুন্দর ভালোবাসার জীবনে আরও কতো মিষ্টি রূপান্তর, তোহফার নতুন ভাই বা বোনের আগমন এবং সাভার ট্রাস্টের নতুন প্রজেক্টের গল্প কীভাবে এগিয়ে যাবে?
✤✣ᚔᚔ✤✣
—চলবে–
✤✣ᚔᚔ✤✣