#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ০৯
🌿🌿🌿
ভোরের আলোটা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছিল কিয়ারার ঘরে।
জানালার পর্দা সামান্য নড়ছে—ঠিক সেই কোণটা যেখানে গতরাতে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।
লোকটার উপস্থিতি যেন এখনো বাতাসে ভাসছে… সেই গন্ধ, সেই নিঃশ্বাস, সেই ছোঁয়া।
কিয়ারা চোখ মেলেই দেখল মেঝেতে একটা শুকনো গোলাপের পাপড়ি পড়ে আছে।
ওর ঠোঁট নরমভাবে ফিসফিস করে উঠল—
ঃ- আপনি গতরাতেও এসেছিলেন… তাই না, মাহাদ?... তবে কেন এই লুকোচুরি?.. কি চলছে আপনার মাথায়??...
কিয়ারা উঠে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের দিকে তাকালো। কোনো পরিবর্তন হয়নি, শুধু বুকের খাঁজে থাকা কালো তিল টা নীলবর্ণ ধারণ করেছে। এটা ঐ উন্মাদ লোকটার কাজ ও নিশ্চিত, কারণ এটা তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আর এই দাগ টাই প্রমাণ করে যে, তিনি কালকেও এসেছিলেন। কিন্তু ও কেন কিছু বুঝতে পারেনি??...
এর মধ্যেই দরজায় টোকা পড়তেই নামিরা আপু ডাক দিলেন…
ঃ- এই কিয়ারা! ঘুম ভাঙল নাকি?... নিচে সবাই অপেক্ষা করছে!
ঃ- আসছি আপু,
মৃদু হেসে উত্তর দিল ও।
তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুছাতে গিয়ে কিয়ারার চোখ পড়ল নিজের মুখে—
চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ, নিঃশব্দ রাতের প্রমাণ।
ও নিজেকে বলল,
ঃ- কেউ বুঝবে না আমি কতটা ভেতরে ভেঙে আছি। মাহাদ, আপনি এই লুকোচুরি খেলা কেন খেলছেন??..
বাড়ি আজ যেন উৎসবমুখর।
রান্নাঘরে চাচী, ফুপি, ছোটরা মিলে কোলাহল।
চুলায় ভাজা পুরি, দুধের গন্ধ, হাসি-আড্ডায় মেতে আছে সকলে।
কিয়ারা নিচে নামতেই ওর মা গলা বাড়িয়ে বললেন…
ঃ- এই কিয়ারা, তোর এতক্ষণে আসার সময় হলো??...! দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস টা আর গেলো না তোর?... তোর জন্য গরম দুধ রেখেছি।
ঃ- উফ্ মা, আমি ছোটবাচ্চা নাকি?...
ঃ- মায়ের কাছে সন্তান সবসময়ই আমাদের বাচ্চা, এই বাড়ির প্রাণ।
সবাই হেসে উঠল।
বড় চাচী বললেন,
ঃ- তোরা আসছিস বলেই এত আনন্দ! না হলে এই বাড়িটা একেবারে নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। তুই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে নে তো। চেহারার তো বারোটা বাজিয়ে ফেলেছিস।
কিয়ারার চোখ তখন দেয়ালের ফ্রেমে —
সেখানে নীলাভ ভাইয়ার একটা ছবি, হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।
ওর বুকটা হালকা ভার হয়ে গেল।
ঃ- নীলাভ ভাইয়া এখন কেমন আছেন?... ভাইয়া কি আর দেশে আসবেন না??... ও প্রশ্ন করল।
বড় চাচী উত্তর দিলেন,
ঃ- ভালো আছে যে মা, কানাডায় তো এখন পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। টরন্টোর এক ইউনিভার্সিটিতে প্রজেক্টের কাজ করছে। ও তো সবসময়ই নিজের মতো করে চলত। তাই তো, কেউ ওকে থামাতে পারেনি। তুই-ও অনেকটা ওর মতো।
ছোট চাচী হেসে বললেন…
ঃ- ওর মতো হলেও তুই যেন এমন করে দূরে চলে যাস না মা। ঘরেই সুখ থাকে। তোরাই তো বাড়ির প্রাণ। তোদের বিয়ে দিয়ে কাছেই রেখে দেবো।
কিয়ারা হালকা হাসল, কিন্তু মনে মনে ভাবল—
ঃ- ঘরেই কি সত্যিই সুখ থাকে, চাচী?... কেউ একবার গেলে, ফিরে আসে কি?... কাছে রাখার সুযোগ যে আমি আগেই খুইয়ে ফেলেছি। উন্মাদ লোকটা তো পারলে এখনই তুলে নিয়ে যায়।
— — —
রাতে পুরো বাড়িটা যেন আলোকিত।
ফুপি, চাচী, সবাই মিলে রান্নাঘরে রীতিমতো উৎসবের ছোঁয়া।
চিকেন রোস্ট, পোলাও, ফিরনি—সব একসাথে সাজানো।
ডাইনিং টেবিলের আলোয় কিয়ারার মুখ উজ্জ্বল, কিন্তু ওর চোখের কোণে এখনো এক চাপা শূন্যতা।
ঃ- চাচীমা, এই খাবারগুলোর স্বাদ ওখানে পাই না।
ঃ- ওরে, ঢাকায় তো বড় বড় হোটেলে খাস! তারপর তোরা নিজেরা কি হিজিবিজি রান্না করে খাস!.. এই বাড়ির যত্ন, এই ভালোবাসা সেখানে কোথায় পাবি পাগলী?!..
সবাই হেসে উঠল।
ফুপি কিয়ারার মাথায় হাত রেখে বললেন,
ঃ- মা, তুই শান্তিতে থাকিস। তোর হাসিটাই যেন থাকে সবসময়।
কিয়ারা হেসে বলল…
ঃ- হ্যাঁ ফুপি… তোমাদের দোয়া’য় আমি শান্তিতেই আছি।
কিন্তু জানালার ওপাশে অন্ধকারে যেন কেউ তাকিয়ে আছে ওর সেই হাসির দিকে।
বাতাসে এক অদ্ভুত কম্পন—
যেন কেউ নিঃশব্দে বলছে,
ঃ- না, রায়া… তুমি শান্তিতে নেই। আমি অনুভব করতে পারছি। কিন্তু আমি নিরুপায় কলিজা, তোমাকে খুশি রাখতে পারছি না। আর কিছুদিন ধৈর্য্য ধারণ কর, আমি সবকিছু আবার আগের মতো ঠিক করে দেবো।
— — —
রাত তখন গভীর। উত্তরার রাস্তাগুলো ফাঁকা, বাতাসে হালকা ঠান্ডা হাওয়া।
কালো গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে কিয়ারাদের বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে।
ইঞ্জিন বন্ধ, জানালায় হালকা কুয়াশা জমে উঠছে।
গাড়ির ভেতরে মাহাদ নিঃশব্দে বসে আছে—চোখ স্থির মোবাইলের পর্দায়।
ওর ফোনে তখন কিয়ারাদের বাড়ির চারপাশের লাইভ ক্যামেরা ফিড খুলে আছে।
ওরই সেট করা, ওরই লোক দিয়ে বসানো।
কিয়ারার ঘরের জানালার পাশেই ছোট্ট একটা সেন্সর ঝুলছে—দেখতে কেউ বুঝবে না, কিন্তু মাহাদ জানে, ঠিক কোন কোণায় ওটা আছে।
এক মুহূর্তের জন্য পর্দায় আলো নড়ে ওঠে।
ওই আলোয় কিয়ারার মুখটা দেখা যায়—চুল খোলা, হালকা বেগুনী রঙের নাইটড্রেসে, জানালার পাশে বসে আছে।
মাহাদ নিঃশ্বাস চেপে ধরে তাকিয়ে থাকে।
ওর চোখে একধরনের আকুলতা, আবার অপরাধবোধও মিশে আছে।
ও ভাবে, "তুমি জানো না রায়া, আমি এখনই তোমার দরজার ঠিক বাইরে আছি..."কিন্তু আফসোস তোমার কাছে যেতে পারছি না,, আমি তোমাকে ছুঁতে পারছি না রায়া!..
ওর আঙুল স্ক্রিনের পর্দায় কিয়ারার মুখের উপর ছুঁয়ে যায়,
যেন স্ক্রিন ভেদ করে ছুঁয়ে ফেলবে ওকে।
নরম কণ্ঠে বলে ওঠে, “তুমি ঘুমাওনি এখনো…। নিশ্চয়ই আমার অপেক্ষায়.. ।
পর্দায় দেখা যায়, কিয়ারা জানালার পাশে হালকা মাথা নিচু করে বসে আছে, হাতে ওর ফোনটা, যেটার স্ক্রিনে—মাহাদের ছবি।
ওর ঠোঁট কাঁপছে, চোখ লালচে।
মাহাদের বুকের ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে।
ও গাড়ি থেকে বের হয়, ছায়ার মতো হেঁটে যায় বাড়ির গেটের দিকে।
সিকিউরিটি গার্ড তখন ঘুমিয়ে, আশেপাশে নীরবতা।
মাহাদ গেটের কোণ ঘেঁষে দাঁড়ায়, ফোনে এখনো কিয়ারার ঘর দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ কিয়ারা উঠে জানালার কাছে আসে, পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকায়—
দু’জনের চোখের দূরত্ব তখন কাচের ওপারে, তবু যেন একে অপরকে অনুভব করছে।
কিয়ারা জানে না মাহাদ ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
আর মাহাদ জানে, ওকে না দেখেও কিয়ারার মন জানে—ওর পাশে কেউ আছে।
মাহাদ ফিসফিস করে বলে,
ঃ- তুমি ভাবছো আমি চলে গেছি... কিন্তু আমি তো যাইনি, রায়া। তোমার টানে আবার ফিরে এসেছি এতো দূরে।
চাঁদের আলো গাড়ির বডিতে পড়ে মৃদু ঝিকিমিকি করছে,
আর সেই নিঃশব্দ রাতে ক্যামেরার ফিডে কেবল একটাই দৃশ্য—
দু’জন মানুষ, একে অপরের অজান্তে, তীব্র ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে দূরত্বের পর্দার আড়ালে।
— — —
রাত তখন নিস্তব্ধ।
চাঁদের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে কিয়ারার মুখে সোনালি ছায়া ফেলেছে। বাতাসে বেলী ফুলের গন্ধ। ঘরটা নিস্তব্ধ, যেন সময়ও এখানে একটু থেমে আছে।
বারান্দার দরজাটা খুব আস্তে খুলল মাহাদ।
শব্দ পর্যন্ত হলো না—শুধু দরজার কবজার হালকা কণ্ঠে একটা নিঃশব্দ নিঃশ্বাস। ওর চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল বিছানার দিকে।
কিয়ারা ঘুমাচ্ছে। ওর বুক উঠছে-নামছে শান্ত ছন্দে, চোখের পাতা কাঁপছে সামান্য—যেন কোনো স্বপ্নের মধ্যে কিছু দেখছে।
মাহাদ পা টিপে টিপে এগিয়ে আসে। ওর হাতে একটা গোলাপ, ভেজা শিশিরে চকচক করছে।
চাঁদের আলোয় কিয়ারাকে দেখে মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে যায় সে। এত শান্ত, এত নির্ভার দেখায় ওকে—যেন সারা পৃথিবীর সমস্ত ঝড় থেকে একটু আশ্রয় নিয়েছে এই ঘুমের ভেতর।
ওর মনের ভেতর ঢেউ খেলে যায়—
এই মেয়েটাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি... কিন্তু এখনো তাকে জানাইনি। জানাতে পারবও না। অন্তত এখন নয়।
ও চুপিচুপি এগিয়ে যায়, কিয়ারার পাশে বসে। ওর চুল মুখে এসে পড়েছে, মাহাদ ধীরে ধীরে ওটা সরিয়ে দেয়, আঙুল ছুঁয়ে যায় ওর গাল। সেই স্পর্শে যেন কিয়ারার ঠোঁট কেঁপে ওঠে।
ঘুমের ভেতরেই কিয়ারা ফিসফিস করে কিছু বলে—
"…মাহাদ?"
মুহূর্তটা থমকে যায়।
ওর নামটা শুনে মাহাদের বুকের ভেতর কেমন একটা শব্দ হয়, যেমন জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা হঠাৎ মাটিতে পড়লে হয়।
ওর চোখে একরাশ অস্থিরতা। হাত বাড়িয়ে দিতে চায়, আবার থেমে যায়।
না, না আজ না। আজও না।
ও কিয়ারার কপালে খুব আস্তে একটা চুম্বন করে।
চাঁদের আলোয় সেই ছোঁয়া যেন প্রতিশ্রুতি হয়ে ঝলমল করে ওঠে।
তারপর ও উঠে দাঁড়ায়, নিঃশব্দে জানালার কাছে গিয়ে গোলাপটা রেখে দেয়।
বেরিয়ে যাবার আগে দরজার কাছে একবার ফিরে তাকায়—
কিয়ারা ঘুমের ভেতরেই মুচকি হাসছে।
দরজা আস্তে বন্ধ হয়ে যায়, বাতাসে গোলাপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
— — —
সূর্যের প্রথম আলো জানালার ফাঁক গলে এসে কিয়ারার মুখে পড়েছে।
ওর চোখ ধীরে ধীরে খুলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য বুঝতেই পারল না, সকালটা কেন যেন অন্যরকম লাগছে।
ঘরের বাতাসে হালকা গোলাপের ঘ্রাণ—একটা অচেনা শান্তি ছড়িয়ে আছে চারপাশে।
ওর চোখ পড়ল জানালার পাশে রাখা লাল গোলাপটার দিকে।
একদম নতুন, শিশিরে ভেজা।
ওর বুক কেঁপে উঠল।
কে দিল এটা?… রাতটা তো আমি একাই ছিলাম… তাই না?
হঠাৎ গত রাতের কিছু টুকরো মনে পড়ে গেল—
অন্ধকারে একটা ছায়া, গাল ছোঁয়া হালকা ঠাণ্ডা স্পর্শ, আর স্বপ্নের ভেতর উচ্চারিত একটা নাম—
মাহাদ…
কিয়ারা গাল ছুঁয়ে দেখল, মনে হলো এখনো সেই উষ্ণতা রয়ে গেছে।
ওর ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।
ঃ- আপনি আজও এসেছিলেন… তাই না মাহাদ?” ও ফিসফিস করে বলল, নিজের মনেই।
তারপর গোলাপটা হাতে তুলে নিয়ে চোখ বন্ধ করল।
ভেতরটা কেমন জানি কাঁপছে, ভয় আর মায়া—দু’টোরই অদ্ভুত মিশ্রণ।
ও জানে না, মাহাদ সত্যিই এসেছিল কিনা।
কিন্তু জানালার কোণে পড়ে থাকা মাটির দাগ, দরজার ধারে হালকা পায়ের ছাপ আর বাতাসে ভাসতে থাকা সেই সুপরিচিত পারফিউম এর ঘ্রাণ—
সব মিলিয়ে যেন বলে উঠল—
কেউ এসেছিল… চুপিচুপি, ওর ঘুম ভাঙার আগেই… আবার ফিরে গিয়েছে।
কিয়ারা গোলাপটা বুকের কাছে চেপে ধরল, চোখে হালকা জল এসে জমল, কিন্তু ঠোঁটে হাসি—
একটা আশার হাসি।
— — —
সকালের হালকা রোদ কাচের জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল। কিয়ারা ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করছিল—চা, পরোটা, হালকা হাসি-রসিকতা। চারপাশে ভোরের শান্তি, তবে কিয়ারার মনে ঘুমপাড়ানি ভাব আর ছোটখাটো উত্তেজনা মিশে আছে।
হঠাৎ—ফোন বেজে ওঠে। কিয়ারার বাবা কল লিস্টে নাম দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
নাঈমের ফোন!.. তাও আবার এই অসময়ে?.. কোনো সমস্যা হলো না তো??..
ঃ- হ্যালো… নাঈম, বাবা এতো সকালে ফোন দিলে যে?” বাবা কণ্ঠে অস্থিরতা মেশানো, ধীর।
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কণ্ঠটি কেঁপে কেঁপে বেরোচ্ছে,
ঃ- বাবা, নানাভাই হার্ট অ্যটাক করেছেন। আমরা এভার কেয়ার হসপিটালে আছি। উনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। অবস্থা সংকটজনক।
কিয়ারার বাবার হাত কেঁপে ওঠে, চোখের পাতা হঠাৎ আঁকড়ে ধরে।
ঃ- কী! কখন হয়েছে?.. কীভাবে হয়েছে?” তিনি বলে ওঠেন, কণ্ঠে আতঙ্ক।
কিয়ারা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়, চা উল্টো হয়ে যায়। বুকের ভিতর অদ্ভুত চাপ—মাথা ঘুরে যাচ্ছে।
ঃ- কী হয়েছে আব্বু?.. ভাইয়ার নানাভাই এর?... কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, চোখে ভয়।
ওর মা চুপচাপ উঠে গিয়ে বাবার পাশে দাঁড়ান, হাত কেঁপে কাঁধে রাখে। টেবিলে বসা সবাই চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে।
ওর বাবা ফোন ধরে বললেন…
ঃ- আমরা এখনই বের হচ্ছি।
বাড়িতে তখন যারা যারা ছিল, গুষ্টি শুদ্ধ সবাই গাড়ি নিয়ে দ্রুত হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রাস্তায় বাতাস যেন আরও কাঁপছে। কিয়ারার হাত টানছে, বুকে একটি ব্যথা লেগে আছে। “কেন এই সব আজ?” মন বড্ড কাঁদছে।
হসপিটালে পৌঁছে বাবা দ্রুত রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
ঃ- মাহফুজ খান সাহেব কোন তলায় আছেন?..
রিসেপশনিস্ট জানালো…
Evercare Hospital-এর পঞ্চম তলার আইসিইউতে ভর্তি আছেন ফিরোজ খান সাহেব, নাঈমের নানাভাই।
কিয়ারার চোখে জল, বাকিদের অবস্থাও কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে।
“আমি কি করতে পারি?”... কিয়ারা ফিসফিস করে বলে।
তারপর ওরা সবাই লিফটে উঠে পঞ্চম তলায় উঠে এলো।
সেই মুহূর্তে ওরা সবাই আইসিইউর সামনে এসে দাঁড়ায়।
কিয়ারার বাবা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, নাঈমের কাঁধে হাত রাখে,
ঃ- আমি এখানে আছি… আমরা সবাই আছি। চিন্তা করো না উনি দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবেন।
আইসিইউ রুমের দরজা বাইরে দাঁড়িয়ে সবাই অস্থির। হৃদয় ব্যথা, চোখে জল—সকালের হালকা আলো যেন হঠাৎ অন্ধকারে মিশে গেছে। কিয়ারা মনে মনে স্বপ্নের মতো সবটা থমকে যাওয়াটা অনুভব করে।
রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে বাবা বলেন,
ঃ- এটা কিভাবে হলো?..
ঃ- সকালে দাদাভাই খুব তাড়াতাড়ি উঠেন। উনি ফজরের নামাজের পরে আর ঘুমান না। কিন্তু আজকে সকালে অনেকক্ষণ পরেও যখন দাদাভাই ডাইনিং টেবিলে আসলো না, তখন আমি দাদাভাই কে ডাকতে উনার রুমে গিয়ে দেখি দাদাভাই বিছানায় পড়ে আছেন। তারপর আমার চিৎকার শুনে সবাই এসে ওই অবস্থাতেই দাদাভাই কে হসপিটালে নিয়ে আসে। তারপর জানতে পারলাম, দাদাভাই এর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।
এতক্ষণ মুক্তা বলছিল কথাগুলো। ওর কথায় আবারো উপস্থিত সকলের চোখে জল চলে এল। নাঈমের নানুমনি খুব কান্নাকাটি করছেন, ভদ্রমহিলা বারবার বলছেন, সুস্থ মানুষ টার এটা কি হয়ে গেল।
বাকি মহিলারা উনাকে ধরে শান্তনা দিচ্ছেন। খান বাড়ির সকলেই এখানে উপস্থিত রয়েছেন, শুধু কায়রা আপু ছাড়া।
কারণ আপু নিজেই অসুস্থ, এখানে আসলে সবার কান্নাকাটি দেখে নিজেও কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়ে পড়তো । তাই ওকে বাড়িতে রেখে এসেছে, সবাই চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে, মহিলা রা সবাই সিটে বসে আছে, ছেলেরা সবাই কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ পায়চারী করছে। সবার চোখে মুখেই অজানা হতাশা আর আতঙ্ক। কারণ ডক্টর এখনো সন্তুষ্টিজনক কোনো খবর দেননি।
সেই সকালে পুরো বাড়ি যেন থমকে গেছে—হাসপাতালের করিডর, কেবিনের রেড লাইট , ব্যস্ত ডাক্তাররা—সব কিছু মিলিয়ে কেবল একটাই অনুভূতি: ভয়, আতঙ্ক, এবং পরিবারের একতার শক্তি।
— — —
নাঈম সকাল থেকেই মাহাদ কে ফোন করে যাচ্ছে, কিন্তু ফোনে পাচ্ছেই না। ওর পকেটে
রং ফোনটা কেঁপে ওঠে।
ঃ- কিরে এতো বার কল দিয়েছিলি কেন??...
ঃ- হারামজাদা তোর ফোন কোথায় থাকে??... কতবার ফোন দিয়েছি?..
কণ্ঠে তীব্র উন্মাদনা, হঠাৎ হাঁপিয়ে ওঠা নিঃশ্বাস।
মাহাদ গম্ভীর হয়ে বলল…
ঃ- কি হয়েছে বলবি তো??... এভাবে চোটপাট করছিস কেন?...
এই পর্যায়ে নাঈমের চোখ ভিজে এলো, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল…
ঃ- মাহাদ… নানাভাই হার্ট অ্যাটাক করেছেন। এখন হাসপাতালে…”
মাহাদ ফোন কেটে দিয়ে গাড়িতে ঝাঁপ দেয়। ইঞ্জিন গর্জন করছে, কিন্তু তার মন দ্রুত আরও দ্রুত।
“না… এটা হতে পারে না!” আমি কেন ফোন ধরলাম না?.!..
সে নিজের সঙ্গে বলছে, কাঁপছে, হৃদয় ধকল করছে।
ড্রাইভের প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছে পৃথিবী থেমে গেছে। মাথায় অজানা ব্যথা, কানে কেবল কিয়ারার কাঁদার শব্দ বাজছে।
“আমি এখনই চলে আসছি… দাদাভাই এর কিচ্ছু হবে না।
হাসপাতালে পৌঁছে মাহাদ তাড়াহুড়ো করায় লিফটের দরজার দিকে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা খেয়েছে , বাম কাঁধে প্রচন্ড ব্যথাও পেলো বোধদয় ,কিন্তু কোনো পরোয়া না করেই সিঁড়ি বেয়ে পঞ্চম তলায় উঠে এলো।
পঞ্চম তলায় এসেই প্রথমে নজরে এলো একটা কান্না চেপে রাখায় লাল হয়ে যাও মুখশ্রী।
কিয়ারা চাপা স্বরে কাঁদছে, কিরণ তাকে আঁকড়ে ধরেছে।
মাহাদ দ্রুত এগিয়ে এসে কিয়ারার সামনে দিয়ে চলে গেল আইসিইউর সামনে।
মাহাদ নাঈমের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর ওকে জিজ্ঞেস করল, কিভাবে কি হলো?.. কখন হলো?... ওকে আরো আগে জানানো হয়নি কেন??...
ঃ- তোকে কতবার ফোন করেছি?... তুই ফোনটাই তুললি না। তাহলে আর কিভাবে জানাতাম তোকে?... তোর ফ্ল্যাট অবধি যাওয়ার সময় সুযোগ ছিল না তখন ভাই!...
নাঈম করুন স্বরে বলে উঠলো।
নানার কেবিনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বাবা, মা, ভাই,বোন সবাই চোখে জল ধরে—এমন এক মুহূর্ত যখন সময় থেমে গেছে।
মাহাদ কেবল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আইসিইউর সামনের দিকটায়।
সেই সকালে হাসপাতালের করিডোরে যেন একটা যন্ত্রনাময় দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে। ওখানে উপস্থিত থাকা প্রত্যেকের এখন একটাই প্রত্যাশা, ডক্টর যেন বেরিয়ে এসে ওদের কে কোনো খারাপ সংবাদ না দিয়ে সন্তুষ্টজনক কিছু বলেন। সবাই বসে বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন, একটা ভালো সংবাদের প্রত্যাশায়।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ