#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ১০
🌿🌿🌿
হলঘরজুড়ে হালকা জীবাণুনাশকের গন্ধ। নীল আলোয় ভেসে আছে লম্বা করিডর, দেয়ালে মনিটরের টুংটাং শব্দ কানে বাজছে।
কিয়ারার বাবা, মা , বোনেরা আর খান পরিবারের সদস্যরা সবাই বসে আছে ওয়েটিং এরিয়াতে।
প্রত্যেকের চোখমুখ ফোলা — উদ্বেগে কাঁপছে যেন।
কিছুক্ষণ পর সাদা কোট পরা একজন ডক্টর দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে আসে। গলায় স্টেথোস্কোপ, মুখে একফোঁটা গাম্ভীর্য।
সবাই একসাথে উঠে দাঁড়ায়।
ডক্টর বাইরে বেরিয়ে এসে উনাদের সামনে দাঁড়ালো। তারপর বলল…
ঃ- মি. খান এর অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন। হৃদযন্ত্রে মারাত্মক ধাক্কা লেগেছে। প্রেসার একবারে নেমে গিয়েছিল… আমরা চেষ্টা করছি স্ট্যাবল রাখার। বাকিটা উপরওয়ালার ইচ্ছে। আপনারা সবাই তার কাছে প্রার্থনা করুন।
এই বলে ডক্টর ওখান থেকে চলে গেল।
একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে চারপাশে।
মাহাদের দাদীমা মুখ চেপে ধরে বসে পড়েন, চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
নাঈম ডক্টর কে পিছন থেকে ডেকে বলল…
ঃ- ডক্টর, প্লিজ… এখন উনি সচেতন আছেন?... উনি ঠিক হয়ে যাবেন তো!?...
ঃ- না, এখনো না। ওনার বয়স হয়েছে, হার্ট অনেক দুর্বল। হয়তো বিগত কয়েক দিন উনি কোনো কিছু নিয়ে প্রচন্ড চিন্তায় ছিলেন। যেটার প্রভাব উনার উপর বেশ বাজে ভাবে পরেছে। কিন্তু আমরা হাল ছাড়ছি না। আপনারা উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করুন।
এই বলে ডক্টর হালকা মাথা নেড়ে ওখান থেকে চলে যায়।
ডক্টরের মন্তব্য শুনে সবাই নিস্তব্ধ। শুধু মাহাদের বাবার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়— ভারি, ক্লান্ত।
তিনি আস্তে করে চেয়ার টেনে বসেন, তারপর মুখে হাত চেপে বলেন—
মাহাদের বাবা কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠলো…
ঃ- সব আমার দোষ… এই সব ঝামেলা, চিন্তা… আমি যদি আগে বুঝতাম বাবার ওপর এতটা মানসিক চাপ পড়ছে, তাহলে এই অবস্থা হতো না। আমি… আমি ওনাকে এই অবস্থায় এনেছি।
মাহাদ এগিয়ে গিয়ে বাবার কাঁধে হাত রাখে।
ঃ- বাবা, প্লিজ নিজেকে দোষ দিও না… দাদাভাই ঠিক হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ!...
কিন্তু মাহাদের চোখমুখ দুশ্চিন্তায় স
শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেছে ।ও নিজেও প্রচন্ড চিন্তায় রয়েছে।
ও বাবার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
ওর দুই হাত মুঠো করে রাখা — ভেতরে কিছু একটা গুমরে উঠছে।
সে জানে, এই ঘটনার পেছনে শুধু “চাপ” না, আরো কিছু আছে… এমন কিছু, যা এখনো কেউ জানে না। হয়তোবা বাবা জানেন, কিন্তু ওকে কিছুই এখনো জানাচ্ছেন না। ও এখন শুধু বাবার সবকিছু খুলে বলার অপেক্ষা করছে।
ওর দৃষ্টি ধীরে ধীরে আইসিইউর কাঁচের দিকে যায় — ভিতরে দাদাজান শ্বাস নিচ্ছেন কষ্টে, পাশে মেশিনের শব্দ।
মাহাদের নিঃশ্বাস ভারি হয়ে ওঠে, ঠোঁটে ফিসফিস —
“আমি দোষী না, কিন্তু সবাই আমাকে দোষী ভাববে…”
কিয়ারা দূর থেকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু কাছে আসে না।
দু’জনের চোখের মাঝখানে যেন একটা কাচের দেয়াল — কাঁপছে, কিন্তু ভাঙছে না।
— — —
আইসিইউর দরজার সামনে একে একে সবাই বসে আছে। বাতাস ভারি, মনিটরের টুংটাং শব্দ যেন ছুরি হয়ে বিঁধছে বুকের ভেতর।
কিয়ারা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে, হাতের মুঠোয় ফোন, চোখ শুধু এক জায়গায় — করিডরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মাহাদের দিকে।
ওর চুল এলোমেলো, মুখে দাড়ির ছায়া, চোখ দুটো গভীর আর নিঃস্পৃহ।
মনে হচ্ছে যেন এই কয়েক ঘণ্টায় মানুষটা অনেকটা বদলে গেছে — ঠান্ডা, নির্লিপ্ত, আর নির্দয়।
কিয়ারা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
গলা শুকনো, তবু কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলে—
ঃ- মি. খান!...
মাহাদ সামান্য ঘুরে তাকায়।
কিয়ারার দিকে একবার তাকিয়ে আবার ফিরেও নেয় মুখ।
চোখে কোনো চেনা উষ্ণতা নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই — যেন এই মেয়েটাকে জীবনে কোনোদিন দেখেনি। ওর সাথে যেন তার কোনো কালে কোনো সম্পর্কই ছিল না।
কিয়ারা সামান্য কাশি দিয়ে বলল…
ঃ- আমি… জানতে চাচ্ছিলাম, দাদাভাই এখন কেমন আছেন?...
মাহাদ উত্তর দেয় না।
ওর ঠোঁট শক্ত, চোখ একবারও কিয়ারার দিকে না তাকিয়ে শুধু বলে—
ঃ- ডক্টররা জানাবে।
এইটুকু বলে পকেট থেকে ফোন বের করে কিছু একটা স্ক্রল করতে থাকে, যেন আশেপাশের কেউ নেই।
কিয়ারার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়।
ওর হাত কাঁপে, চোখ জ্বালা করে ওঠে।
দূর থেকে ওদের কে নাঈম খেয়াল করছিল, ওর পাশে নাঈম এসে দাঁড়ায়, নিচু গলায় বলে—
ঃ- কিয়ারা, ও এখন অনেক চাপের মধ্যে আছে… নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পারছো বোন!... তাই এমন করছে প্লিজ তুমি কষ্ট পেওনা।
কিয়ারা মাথা নাড়ে, কিন্তু চোখ নামায় না। ওর দৃষ্টি মাহাদের মুখে স্থির থাকে — ঠান্ডা, নির্দয়, অপরিচিত মুখে। হসপিটালে এসেছে প্রায় কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। কিন্তু এই লোকটা একবারের জন্যও ওর দিকে নজর দেয়নি।
ওর মনে হয়, এই ছেলেটাই কি সেই মাহাদ?
যে একদিন ওর দিকে তাকিয়ে কন্ঠে তীব্র অধিকার নিয়ে বলেছিল…
ঃ- তুমি সম্পুর্ন আমার, আমি তোমাকে কখনো আমার থেকে আলাদা করবো না ।
অথচ এখন!... হাহ ওই হয়তো বেশি কিছু আশা করে ফেলেছিল।
আজ সেই চোখেই শুধু শীতলতা।
কোনো অনুভব নেই, কোনো আগুন নেই — শুধু যেন এক খন্ড বরফ মানব।
মাহাদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, কোটের কলার ঠিক করে বাইরে চলে যায়।
পেছনে দাঁড়িয়ে কিয়ারা নিঃশব্দে ফিসফিস করে—
আপনি এমন করে কেন হারিয়ে যাচ্ছেন, মাহাদ…?....
চোখ বেয়ে একফোঁটা পানি পড়ে মেঝেতে।
আর ঠিক তখনই হাসপাতালের লাউডস্পিকারে বাজে ঘোষণা—
“Code Blue in ICU – Patient Mr. Khan”
সবাই উঠে ছুটে যায় সেদিকে।
আর কিয়ারার ভেতরে, সেই ইগনোরের ঠান্ডা শব্দটা যেন দাদাভাইয়ের হার্টবিটের মতো থেমে যায়।
হঠাৎ স্পিকারে ঘোষণা —
“Code Blue in ICU – Patient Mr. Khan.”
সবাই দৌড়ে যায় ভেতরের দিকে।
ডাক্তার, নার্স, স্ট্রেচার, অ্যালার্মের শব্দ — পুরো করিডর এক মুহূর্তে বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
মাহাদ হঠাৎ স্থির হয়ে যায়।
চোখে আতঙ্ক, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
এক মুহূর্তে যে মানুষটা সবার সামনে বরফের মতো ঠান্ডা ছিল, সে এখন যেন ছুটে যেতে চাইছে, কিন্তু পা কাজ করছে না।
“দাদাভাই!”— গলায় এক অদ্ভুত কাঁপন।
ওর কণ্ঠে সেই আগের তেজ নেই, শুধু অসহায়তা।
ডাক্তাররা ভেতরে CPR দিচ্ছে।
মনিটরে একের পর এক লাল লাইন ভাঁজ খাচ্ছে।
মাহাদ জানালার কাঁচে হাত রাখে—
ঃ- দাদাভাই... আমি তো কসম খেয়েছিলাম আপনার কথার বাইরে কিছু করবো না... আপনি এখন চোখ খুলুন প্লিজ…।
কিয়ারা পেছন থেকে এসে থেমে যায়।
ও দেখছে মাহাদের পিঠ কাঁপছে, শ্বাস ভারি।
একটা তীব্র দুঃখে ভরা এই লোকটা কে ও প্রথমবার দেখছে — যে নিজের ভেতরটা ছিন্ন করে ফেলছে, তবুও কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না।
ডাক্তার বেরিয়ে আসে, মুখ ভার।
সবাই দাঁড়িয়ে যায়।
ডাক্তার ধীরে বলে—
“We tried our best… but he couldn’t make it.”
আবার পুরো করিডোর নীরবতায় ছেয়ে গেল।
শুধু করিডরের ঘড়ির টিকটিক শব্দ ভেসে আসছে।
মাহাদ পেছনে এক কদম যায়।
চোখ ফাঁকা। তারপর দু’হাত মাথায় দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়ে।
চোখের জল থামানোর চেষ্টা করেও গড়িয়ে পড়ে গালে।
কিয়ারা কাছে যেতে চায়, কিন্তু থেমে যায়।
ওর মনে পড়ে কয়েক ঘণ্টা আগেই নিষ্ঠুর লোকটা ওকে চেনেইনি।
তবুও বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে—
আপনি যতই দূরে থাকুন না কেন… কষ্টটা আমাকেও ছুঁয়ে যায় মাহাদ…”
নাঈম এসে মাহাদকে ধরতে যায়, কিন্তু ও হাত সরিয়ে নেয়।
গলায় হালকা গর্জন—
ঃ- সব আমার দোষ… আমি বাবার কথা শুনতে পারতাম… দাদাভাই কে বাঁচাতে পারতাম…।
ওর কণ্ঠে হতাশা, অপরাধবোধ, আর খুব মূল্যবান কিছু হারানোর অসহায়ত্ব।
কিয়ারা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।
চোখে জল, ঠোঁটে কম্পন, আর মনেই একটাই কথা—
ঃ- আপনি যতই ইগনোর করেন, আমি আপনার এই ভাঙা দিকটাও ভালোবাসি…।
হঠাৎ আবার স্পিকারে ঘোষণা এলো —
“Code Blue in ICU – Patient Mr. Khan”
সবাই দৌড়ে যায় ভেতরের দিকে।
ডাক্তার, নার্স, স্ট্রেচার, অ্যালার্মের শব্দ — পুরো করিডর এক মুহূর্তে বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। ফিরোজ খান কে আইসিইউ থেকে বের করে কেবিনে দেওয়া হয়েছে।
মাহাদ হঠাৎ স্থির হয়ে যায়।
চোখে আতঙ্ক, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
এক মুহূর্তে যে মানুষটা সবার সামনে বরফের মতো ঠান্ডা ছিল, সে এখন যেন ছুটে যেতে চাইছে, কিন্তু পা কাজ করছে না।
“দাদাভাই!”— গলায় এক অদ্ভুত কাঁপন। ওর কণ্ঠে সেই আগের তেজ নেই, শুধু অসহায়তা।
— — —
Evercare Hospital, তখন রাত প্রায় ১১টা ।
ভেতরে সবাই নীরব। কেবিনের বেডে সাদা চাদরে মোড়া এক নিথর দেহ। দাদাভাই এর এখনো হুস ফিরে আসেনি। তাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে কিনা।
চারদিকে শুধু কৃত্রিম আলো, আর হালকা স্যালাইনের গন্ধ।
মাহাদ দাঁড়িয়ে আছে দাদাভাইয়ের মাথার কাছে।
চোখের নিচে কালচে দাগ, ঠোঁট শুকনো, কণ্ঠস্বর নিঃশেষ।
বাবা পাশে বসে আছেন চুপচাপ, হাতে তসবিহ, চোখে জল।
ঃ- আব্বু… দাদাভাই সাথে আমার শেষ কবে ভালো করে কথা হয়েছে , মনে পড়ছে না।
ওর কণ্ঠ থেমে আসে, গলায় একটুকরো কাঁপুনি।
ঃ- সব সময় বলতাম পরে কথা বলব… পরে সময় দেব… কিন্তু এখন দাদাভাই নিথর হয়ে শুয়ে আছেন এই যান্ত্রিক অক্সিজেন মাস্ক পরে।
মাহাদের বাবা মুখ তুলে তাকায়— চোখ লালচে, শূন্য।
ঃ- এসবই আমার দোষ, মাহাদ। সব আমার দোষ।
গলা ভারি হয়ে আসে তাঁর,
ঃ- আমি তোকে ছোট থেকে বলেছি আমার সিদ্ধান্ত মতো চলতে, কিন্তু কখনো বুঝিনি তুই কত চাপের মধ্যে আছিস… তোর প্রতিটা সিদ্ধান্তে আমি বাঁধা দিয়েছি…।
বাবার হাত হঠাৎ বুকের কাছে।
মাথা নিচু হয়ে আসে।
মাহাদ ছুটে যায়—
আব্বু!”
এর মধ্যেই দাদাভাই এর হার্ট রেট আপ ডাউন করতে শুরু করলো। মাহাদ চিৎকার করে ডক্টর কে ডাকলো।
ডাক্তাররা আবার দৌড়ে আসে, প্রেসার চেক, ইঞ্জেকশন, ওষুধ—
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বললেন …
ঃ- He’s stable now. But no more stress.
মাহাদ বসে পড়ে কেবিনের সামনের চেয়ারে, হাত ধরে থাকে দাদাভাই এর।
চোখে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ে।
নিজের মনেই বিড়বিড় করে—
ঃ- একটার পর একটা হারাচ্ছি আমি
তোমার কথা মেনে নিবো…, দয়া করে তুমি সুস্থ হয়ে যাও। যদি আমাকে নিজের সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ ত্যাগ করতে হয় , তাহলে তাই করবো। আর তার পরিবর্তে নাহয় তোমাদের সুখ আর নিজের আত্মার মৃত্যু চেয়ে নিবো!...
কিয়ারা দূর থেকে দেখে।
ওর বুকের ভেতরটা মোচড় দেয়।
ওর মনে পড়ে সেই রাত—যখন মাহাদ বৃষ্টিতে ভিজে ওর ঘরে ঢুকেছিল, হাসি মুখে বলেছিল “তুমি থাকলেই আমি সব পারব…”
আর আজ?...
আজ সেই মানুষটা পুরো ভেঙে পড়েছে। অথচ ওর ফিরেও তাকাচ্ছে না, আর নিজের কাছেও ঘেঁষতে দিচ্ছে না। হঠাৎ করেই কি হয়ে গেল লোকটার ??!...
আলিশা…কিয়ারার ফুফাতো বোন, হাসপাতালের একদিকের করিডরে দাঁড়িয়ে।
ওর চোখে অদ্ভুত এক রহস্যময় দৃষ্টি। ঠোঁটে সামান্য হাসি।
ফোনে একটা কল রিসিভ করে নিচু গলায় বলে—
ঃ- সব ঠিক মতো হচ্ছে মামা, এবার শুধু একটু ধাক্কা দরকার। এরপর মাহাদ নিজে থেকেই রাজি হবে…।
ওপাশ থেকে এক কর্কশ গলা—
ঃ- খুব ভালো, ওর দাদার হার্ট যদি আবার ধরা দেয়, তখনই চাপটা দিবি। ও না রাজি হলে, মিডিয়ায় সব বেরিয়ে যাবে…।
আলিশা ফোন কেটে হাসে।
চোখে ঝিলিক—
ঃ- তুমি যা ভাবছ তেমনটা মোটেই নয় মাহাদ, সবই তোমার পরিবারের ভালোর জন্য করা হচ্ছে। তবে তোমার কিচ্ছু হতে দেবো না, তোমাকে পাওয়ার জন্যে এই আলিশা সবকিছু করতে পারে সবকিছু.. । আর তাতে যদি কাউকে ভাসাতে হয়?!.. তাহলে আমি আলিশা নির্দ্বিধায় তাঁতে রাজি আছি। এখন সেই মানুষটি যেই হোক না কেন। তোমার আর আমার মাঝে কাউকে আসতে দেবো না আমি… ।
— — —
রাতটা গভীরে পড়তেই এভারকেয়ার হাসপাতালের লাইটগুলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল — করিডরের নীল আলো, মেশিনের টুংটাং, নার্সদের দ্রুত পদচারনা। হাসপাতালের ওয়েটিংএর ছোট্ট রুমে পরিবারটা জমে আছে; সবাই মিমাংসাহীন, কৌতূহলে স্নায়ুযুদ্ধ করছে।
ডাক্তাররা বলেছে — এখন রোগী অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে আছে, ভিড় বাড়ালে নজর রাখা যাবে না, রোগীর বিশ্রামও কষ্ট হবে। তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো: সবাই সারারাত হাসপাতালে থাকতে পারবে না।
মাহাদের বাবার কণ্ঠে কাঁপন আছে, ওর মা মিসেস. মিতালী খান দ্রুত বললেন…
ঃ- আমরা ভাগ হয়ে যাই — যাদের সরাসরি এখানে যেকোনো মুহূর্তে দরকার হতে পারে, তাদের এখানে রেখে বাকি সবাই খান ম্যানশনে যাবেন। ফোন দিয়ে সবাই খবরাখবর রাখব নাহয়।
কিয়ারা রা সবাই উঠে দাঁড়ালো। নাঈম ফোনে কথা বলছে কায়রার সাথে, মাহাদ কেবল চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে , কারণ তাকেও বাকিদের সাথে খান ম্যানশনে ফিরে যেতে বলছে।
লোকটা গম্ভীর গলায় বলল…
ঃ- আমি এখানেই থাকবো। নাঈম, তুই ফিরে যা বাসায় কায়রা আছে। আমার সাথে অয়ন, মানাফ , মায়ান থাকবে । তুই সবাই কে নিয়ে এখন খান ম্যানশনে ফিরে যা, প্রয়োজন হলে ফোন করবো তোকে।
মাহাদ কে নিজের কথায় অনঢ় দেখে, বাকিরা কেউ আর অমত করলো না। কিন্তু মাহাদের দাদী(মাহফুজা খান) বেঁকে বসলেন। মানে তিনি কিছুতেই স্বামী কে এখানে রেখে যাবেন না।
অবশেষে সবাই বহু কষ্টে উনাকে মানিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।
মাহাদের চাচা নিজে কে সামলে নিলে বললেন…
ঃ- তাহলে আমারা বাকিরা সবাই খান ম্যানশনে যচ্ছি। সারারাত ফোনে সবাই সংযুক্ত থাকবো। আর তবুও তোদের কোনো প্রয়োজন হলে তখনই ডেকে নিবি। চলুন বেয়াই মশাই!...
কিয়ারার বাবা কে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি। তারপর সবাই একে একে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এলো খান ম্যানশনের উদ্দেশ্যে।
তাদের সিদ্ধান্তটা বাস্তববুদ্ধি ও সংস্কারের মেলবন্ধন—হাসপাতালে থাকা মানে রোগীর কাছাকাছি থাকা, খান ম্যানশনে থাকা মানে বাহিরের ঝামেলা সামলানো। যেহেতু তিনি একজন মন্ত্রী পরিবারের প্রধান সদস্য। তার সাথে সাবেক মন্ত্রী বলে কথা। প্রেস মিডিয়া তো ঘটনা কাভার করতে আসবেই। তাই সেই দিকটাও তো সামলাতে হবে!..
একটি মূহুর্ত: বিদায় এবং অজ্ঞতাবশত প্রতিশ্রুতি..
গাড়ি রওনা হওয়ার সময় কিয়ারা বাইরে এসে সবাইকে দেখে — চোখে একটা ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ় হাসি; মাহাদকে দেখে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল…
“সাবধানে থাকবেন।”
মাহাদ শুধু মাথা নেড়ে বলে,
ঃ- তোমার সেই চিন্তা না করলেও হবে।
কিয়ারা প্রচন্ড কষ্ট পেলো এভাবে বলায়, ওর কন্ঠস্বর ভারী হয়ে আসছে। কোনো ভাবে কান্না আটকে বলল…
ঃ- আমি অপেক্ষা করব।
— যেন সে জানে, কিন্তু ভেতরটা একরাশ শূন্যতা গ্ৰাস করে নিয়েছে।
গাড়ি ধোঁয়া তুলে চলে যায়, হাসপাতালে থাকা মানুষের কণ্ঠে আরেকটু নিঃশ্বাস—সময় কেটে যাচ্ছে, রাত দীর্ঘ।
— — —
হসপিটালে মাহাদ — দাদার পাশে, পুরো রাতেই সাপোর্টিং টুকনো। ওর চোখ কখনো গলায় পড়ে, কখনো মনিটরে।
মায়ান নিজের দাদাভাই এর পাশেই হাত ধরে বসে আছে, চোখের পাতা কাঁপছে; মাঝে মাঝে ঘুরে মাহাদ কে দেখছে। ভাইয়ের মধ্যে ওরাও কিছু পরিবর্তন খেয়াল করছে।
একজন ঘনিষ্ঠ নার্স রয়েছে সর্বক্ষণ— যার দায়িত্ব রাতের ভেতরে প্রাথমিক সহযোগিতা করা।
তারা সবাই হাসপাতালের ছোট একটি প্রাইভেট ওয়েটিং রুমে জড়ো হলো — যেখানে দাদার কেবিনের কাছাকাছি রাখা সম্ভব, আর রাতে নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া বেশি ভিউয়ার ঢুকবে না।
হলজুড়ে — কাঁটা কাঁটা নীরবতা; কিশোরদের কণ্ঠ কেঁপে ওঠা; মাঝে মাঝে ডাক্তারের আসা যাওয়ার শব্দ। সবাই চলে যাওয়ার পর তিন ভাই হসপিটালের নামাজের রুমে এশারের নামাজ আদায় করে নিল। তারপর মোনাজাতে প্রাণ প্রিয় দাদাভাই এর জন্য একনিষ্ঠ ভাবে দোয়া করলো।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ১০
🌿🌿🌿
হলঘরজুড়ে হালকা জীবাণুনাশকের গন্ধ। নীল আলোয় ভেসে আছে লম্বা করিডর, দেয়ালে মনিটরের টুংটাং শব্দ কানে বাজছে।
কিয়ারার বাবা, মা , বোনেরা আর খান পরিবারের সদস্যরা সবাই বসে আছে ওয়েটিং এরিয়াতে।
প্রত্যেকের চোখমুখ ফোলা — উদ্বেগে কাঁপছে যেন।
কিছুক্ষণ পর সাদা কোট পরা একজন ডক্টর দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে আসে। গলায় স্টেথোস্কোপ, মুখে একফোঁটা গাম্ভীর্য।
সবাই একসাথে উঠে দাঁড়ায়।
ডক্টর বাইরে বেরিয়ে এসে উনাদের সামনে দাঁড়ালো। তারপর বলল…
ঃ- মি. খান এর অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন। হৃদযন্ত্রে মারাত্মক ধাক্কা লেগেছে। প্রেসার একবারে নেমে গিয়েছিল… আমরা চেষ্টা করছি স্ট্যাবল রাখার। বাকিটা উপরওয়ালার ইচ্ছে। আপনারা সবাই তার কাছে প্রার্থনা করুন।
এই বলে ডক্টর ওখান থেকে চলে গেল।
একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে চারপাশে।
মাহাদের দাদীমা মুখ চেপে ধরে বসে পড়েন, চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
নাঈম ডক্টর কে পিছন থেকে ডেকে বলল…
ঃ- ডক্টর, প্লিজ… এখন উনি সচেতন আছেন?... উনি ঠিক হয়ে যাবেন তো!?...
ঃ- না, এখনো না। ওনার বয়স হয়েছে, হার্ট অনেক দুর্বল। হয়তো বিগত কয়েক দিন উনি কোনো কিছু নিয়ে প্রচন্ড চিন্তায় ছিলেন। যেটার প্রভাব উনার উপর বেশ বাজে ভাবে পরেছে। কিন্তু আমরা হাল ছাড়ছি না। আপনারা উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করুন।
এই বলে ডক্টর হালকা মাথা নেড়ে ওখান থেকে চলে যায়।
ডক্টরের মন্তব্য শুনে সবাই নিস্তব্ধ। শুধু মাহাদের বাবার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়— ভারি, ক্লান্ত।
তিনি আস্তে করে চেয়ার টেনে বসেন, তারপর মুখে হাত চেপে বলেন—
মাহাদের বাবা কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠলো…
ঃ- সব আমার দোষ… এই সব ঝামেলা, চিন্তা… আমি যদি আগে বুঝতাম বাবার ওপর এতটা মানসিক চাপ পড়ছে, তাহলে এই অবস্থা হতো না। আমি… আমি ওনাকে এই অবস্থায় এনেছি।
মাহাদ এগিয়ে গিয়ে বাবার কাঁধে হাত রাখে।
ঃ- বাবা, প্লিজ নিজেকে দোষ দিও না… দাদাভাই ঠিক হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ!...
কিন্তু মাহাদের চোখমুখ দুশ্চিন্তায় স
শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেছে ।ও নিজেও প্রচন্ড চিন্তায় রয়েছে।
ও বাবার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
ওর দুই হাত মুঠো করে রাখা — ভেতরে কিছু একটা গুমরে উঠছে।
সে জানে, এই ঘটনার পেছনে শুধু “চাপ” না, আরো কিছু আছে… এমন কিছু, যা এখনো কেউ জানে না। হয়তোবা বাবা জানেন, কিন্তু ওকে কিছুই এখনো জানাচ্ছেন না। ও এখন শুধু বাবার সবকিছু খুলে বলার অপেক্ষা করছে।
ওর দৃষ্টি ধীরে ধীরে আইসিইউর কাঁচের দিকে যায় — ভিতরে দাদাজান শ্বাস নিচ্ছেন কষ্টে, পাশে মেশিনের শব্দ।
মাহাদের নিঃশ্বাস ভারি হয়ে ওঠে, ঠোঁটে ফিসফিস —
“আমি দোষী না, কিন্তু সবাই আমাকে দোষী ভাববে…”
কিয়ারা দূর থেকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু কাছে আসে না।
দু’জনের চোখের মাঝখানে যেন একটা কাচের দেয়াল — কাঁপছে, কিন্তু ভাঙছে না।
— — —
আইসিইউর দরজার সামনে একে একে সবাই বসে আছে। বাতাস ভারি, মনিটরের টুংটাং শব্দ যেন ছুরি হয়ে বিঁধছে বুকের ভেতর।
কিয়ারা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে, হাতের মুঠোয় ফোন, চোখ শুধু এক জায়গায় — করিডরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মাহাদের দিকে।
ওর চুল এলোমেলো, মুখে দাড়ির ছায়া, চোখ দুটো গভীর আর নিঃস্পৃহ।
মনে হচ্ছে যেন এই কয়েক ঘণ্টায় মানুষটা অনেকটা বদলে গেছে — ঠান্ডা, নির্লিপ্ত, আর নির্দয়।
কিয়ারা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
গলা শুকনো, তবু কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলে—
ঃ- মি. খান!...
মাহাদ সামান্য ঘুরে তাকায়।
কিয়ারার দিকে একবার তাকিয়ে আবার ফিরেও নেয় মুখ।
চোখে কোনো চেনা উষ্ণতা নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই — যেন এই মেয়েটাকে জীবনে কোনোদিন দেখেনি। ওর সাথে যেন তার কোনো কালে কোনো সম্পর্কই ছিল না।
কিয়ারা সামান্য কাশি দিয়ে বলল…
ঃ- আমি… জানতে চাচ্ছিলাম, দাদাভাই এখন কেমন আছেন?...
মাহাদ উত্তর দেয় না।
ওর ঠোঁট শক্ত, চোখ একবারও কিয়ারার দিকে না তাকিয়ে শুধু বলে—
ঃ- ডক্টররা জানাবে।
এইটুকু বলে পকেট থেকে ফোন বের করে কিছু একটা স্ক্রল করতে থাকে, যেন আশেপাশের কেউ নেই।
কিয়ারার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়।
ওর হাত কাঁপে, চোখ জ্বালা করে ওঠে।
দূর থেকে ওদের কে নাঈম খেয়াল করছিল, ওর পাশে নাঈম এসে দাঁড়ায়, নিচু গলায় বলে—
ঃ- কিয়ারা, ও এখন অনেক চাপের মধ্যে আছে… নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পারছো বোন!... তাই এমন করছে প্লিজ তুমি কষ্ট পেওনা।
কিয়ারা মাথা নাড়ে, কিন্তু চোখ নামায় না। ওর দৃষ্টি মাহাদের মুখে স্থির থাকে — ঠান্ডা, নির্দয়, অপরিচিত মুখে। হসপিটালে এসেছে প্রায় কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। কিন্তু এই লোকটা একবারের জন্যও ওর দিকে নজর দেয়নি।
ওর মনে হয়, এই ছেলেটাই কি সেই মাহাদ?
যে একদিন ওর দিকে তাকিয়ে কন্ঠে তীব্র অধিকার নিয়ে বলেছিল…
ঃ- তুমি সম্পুর্ন আমার, আমি তোমাকে কখনো আমার থেকে আলাদা করবো না ।
অথচ এখন!... হাহ ওই হয়তো বেশি কিছু আশা করে ফেলেছিল।
আজ সেই চোখেই শুধু শীতলতা।
কোনো অনুভব নেই, কোনো আগুন নেই — শুধু যেন এক খন্ড বরফ মানব।
মাহাদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, কোটের কলার ঠিক করে বাইরে চলে যায়।
পেছনে দাঁড়িয়ে কিয়ারা নিঃশব্দে ফিসফিস করে—
আপনি এমন করে কেন হারিয়ে যাচ্ছেন, মাহাদ…?....
চোখ বেয়ে একফোঁটা পানি পড়ে মেঝেতে।
আর ঠিক তখনই হাসপাতালের লাউডস্পিকারে বাজে ঘোষণা—
“Code Blue in ICU – Patient Mr. Khan”
সবাই উঠে ছুটে যায় সেদিকে।
আর কিয়ারার ভেতরে, সেই ইগনোরের ঠান্ডা শব্দটা যেন দাদাভাইয়ের হার্টবিটের মতো থেমে যায়।
হঠাৎ স্পিকারে ঘোষণা —
“Code Blue in ICU – Patient Mr. Khan.”
সবাই দৌড়ে যায় ভেতরের দিকে।
ডাক্তার, নার্স, স্ট্রেচার, অ্যালার্মের শব্দ — পুরো করিডর এক মুহূর্তে বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
মাহাদ হঠাৎ স্থির হয়ে যায়।
চোখে আতঙ্ক, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
এক মুহূর্তে যে মানুষটা সবার সামনে বরফের মতো ঠান্ডা ছিল, সে এখন যেন ছুটে যেতে চাইছে, কিন্তু পা কাজ করছে না।
“দাদাভাই!”— গলায় এক অদ্ভুত কাঁপন।
ওর কণ্ঠে সেই আগের তেজ নেই, শুধু অসহায়তা।
ডাক্তাররা ভেতরে CPR দিচ্ছে।
মনিটরে একের পর এক লাল লাইন ভাঁজ খাচ্ছে।
মাহাদ জানালার কাঁচে হাত রাখে—
ঃ- দাদাভাই... আমি তো কসম খেয়েছিলাম আপনার কথার বাইরে কিছু করবো না... আপনি এখন চোখ খুলুন প্লিজ…।
কিয়ারা পেছন থেকে এসে থেমে যায়।
ও দেখছে মাহাদের পিঠ কাঁপছে, শ্বাস ভারি।
একটা তীব্র দুঃখে ভরা এই লোকটা কে ও প্রথমবার দেখছে — যে নিজের ভেতরটা ছিন্ন করে ফেলছে, তবুও কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না।
ডাক্তার বেরিয়ে আসে, মুখ ভার।
সবাই দাঁড়িয়ে যায়।
ডাক্তার ধীরে বলে—
“We tried our best… but he couldn’t make it.”
আবার পুরো করিডোর নীরবতায় ছেয়ে গেল।
শুধু করিডরের ঘড়ির টিকটিক শব্দ ভেসে আসছে।
মাহাদ পেছনে এক কদম যায়।
চোখ ফাঁকা। তারপর দু’হাত মাথায় দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়ে।
চোখের জল থামানোর চেষ্টা করেও গড়িয়ে পড়ে গালে।
কিয়ারা কাছে যেতে চায়, কিন্তু থেমে যায়।
ওর মনে পড়ে কয়েক ঘণ্টা আগেই নিষ্ঠুর লোকটা ওকে চেনেইনি।
তবুও বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে—
আপনি যতই দূরে থাকুন না কেন… কষ্টটা আমাকেও ছুঁয়ে যায় মাহাদ…”
নাঈম এসে মাহাদকে ধরতে যায়, কিন্তু ও হাত সরিয়ে নেয়।
গলায় হালকা গর্জন—
ঃ- সব আমার দোষ… আমি বাবার কথা শুনতে পারতাম… দাদাভাই কে বাঁচাতে পারতাম…।
ওর কণ্ঠে হতাশা, অপরাধবোধ, আর খুব মূল্যবান কিছু হারানোর অসহায়ত্ব।
কিয়ারা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।
চোখে জল, ঠোঁটে কম্পন, আর মনেই একটাই কথা—
ঃ- আপনি যতই ইগনোর করেন, আমি আপনার এই ভাঙা দিকটাও ভালোবাসি…।
হঠাৎ আবার স্পিকারে ঘোষণা এলো —
“Code Blue in ICU – Patient Mr. Khan”
সবাই দৌড়ে যায় ভেতরের দিকে।
ডাক্তার, নার্স, স্ট্রেচার, অ্যালার্মের শব্দ — পুরো করিডর এক মুহূর্তে বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। ফিরোজ খান কে আইসিইউ থেকে বের করে কেবিনে দেওয়া হয়েছে।
মাহাদ হঠাৎ স্থির হয়ে যায়।
চোখে আতঙ্ক, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
এক মুহূর্তে যে মানুষটা সবার সামনে বরফের মতো ঠান্ডা ছিল, সে এখন যেন ছুটে যেতে চাইছে, কিন্তু পা কাজ করছে না।
“দাদাভাই!”— গলায় এক অদ্ভুত কাঁপন। ওর কণ্ঠে সেই আগের তেজ নেই, শুধু অসহায়তা।
— — —
Evercare Hospital, তখন রাত প্রায় ১১টা ।
ভেতরে সবাই নীরব। কেবিনের বেডে সাদা চাদরে মোড়া এক নিথর দেহ। দাদাভাই এর এখনো হুস ফিরে আসেনি। তাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে কিনা।
চারদিকে শুধু কৃত্রিম আলো, আর হালকা স্যালাইনের গন্ধ।
মাহাদ দাঁড়িয়ে আছে দাদাভাইয়ের মাথার কাছে।
চোখের নিচে কালচে দাগ, ঠোঁট শুকনো, কণ্ঠস্বর নিঃশেষ।
বাবা পাশে বসে আছেন চুপচাপ, হাতে তসবিহ, চোখে জল।
ঃ- আব্বু… দাদাভাই সাথে আমার শেষ কবে ভালো করে কথা হয়েছে , মনে পড়ছে না।
ওর কণ্ঠ থেমে আসে, গলায় একটুকরো কাঁপুনি।
ঃ- সব সময় বলতাম পরে কথা বলব… পরে সময় দেব… কিন্তু এখন দাদাভাই নিথর হয়ে শুয়ে আছেন এই যান্ত্রিক অক্সিজেন মাস্ক পরে।
মাহাদের বাবা মুখ তুলে তাকায়— চোখ লালচে, শূন্য।
ঃ- এসবই আমার দোষ, মাহাদ। সব আমার দোষ।
গলা ভারি হয়ে আসে তাঁর,
ঃ- আমি তোকে ছোট থেকে বলেছি আমার সিদ্ধান্ত মতো চলতে, কিন্তু কখনো বুঝিনি তুই কত চাপের মধ্যে আছিস… তোর প্রতিটা সিদ্ধান্তে আমি বাঁধা দিয়েছি…।
বাবার হাত হঠাৎ বুকের কাছে।
মাথা নিচু হয়ে আসে।
মাহাদ ছুটে যায়—
আব্বু!”
এর মধ্যেই দাদাভাই এর হার্ট রেট আপ ডাউন করতে শুরু করলো। মাহাদ চিৎকার করে ডক্টর কে ডাকলো।
ডাক্তাররা আবার দৌড়ে আসে, প্রেসার চেক, ইঞ্জেকশন, ওষুধ—
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বললেন …
ঃ- He’s stable now. But no more stress.
মাহাদ বসে পড়ে কেবিনের সামনের চেয়ারে, হাত ধরে থাকে দাদাভাই এর।
চোখে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ে।
নিজের মনেই বিড়বিড় করে—
ঃ- একটার পর একটা হারাচ্ছি আমি
তোমার কথা মেনে নিবো…, দয়া করে তুমি সুস্থ হয়ে যাও। যদি আমাকে নিজের সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ ত্যাগ করতে হয় , তাহলে তাই করবো। আর তার পরিবর্তে নাহয় তোমাদের সুখ আর নিজের আত্মার মৃত্যু চেয়ে নিবো!...
কিয়ারা দূর থেকে দেখে।
ওর বুকের ভেতরটা মোচড় দেয়।
ওর মনে পড়ে সেই রাত—যখন মাহাদ বৃষ্টিতে ভিজে ওর ঘরে ঢুকেছিল, হাসি মুখে বলেছিল “তুমি থাকলেই আমি সব পারব…”
আর আজ?...
আজ সেই মানুষটা পুরো ভেঙে পড়েছে। অথচ ওর ফিরেও তাকাচ্ছে না, আর নিজের কাছেও ঘেঁষতে দিচ্ছে না। হঠাৎ করেই কি হয়ে গেল লোকটার ??!...
আলিশা…কিয়ারার ফুফাতো বোন, হাসপাতালের একদিকের করিডরে দাঁড়িয়ে।
ওর চোখে অদ্ভুত এক রহস্যময় দৃষ্টি। ঠোঁটে সামান্য হাসি।
ফোনে একটা কল রিসিভ করে নিচু গলায় বলে—
ঃ- সব ঠিক মতো হচ্ছে মামা, এবার শুধু একটু ধাক্কা দরকার। এরপর মাহাদ নিজে থেকেই রাজি হবে…।
ওপাশ থেকে এক কর্কশ গলা—
ঃ- খুব ভালো, ওর দাদার হার্ট যদি আবার ধরা দেয়, তখনই চাপটা দিবি। ও না রাজি হলে, মিডিয়ায় সব বেরিয়ে যাবে…।
আলিশা ফোন কেটে হাসে।
চোখে ঝিলিক—
ঃ- তুমি যা ভাবছ তেমনটা মোটেই নয় মাহাদ, সবই তোমার পরিবারের ভালোর জন্য করা হচ্ছে। তবে তোমার কিচ্ছু হতে দেবো না, তোমাকে পাওয়ার জন্যে এই আলিশা সবকিছু করতে পারে সবকিছু.. । আর তাতে যদি কাউকে ভাসাতে হয়?!.. তাহলে আমি আলিশা নির্দ্বিধায় তাঁতে রাজি আছি। এখন সেই মানুষটি যেই হোক না কেন। তোমার আর আমার মাঝে কাউকে আসতে দেবো না আমি… ।
— — —
রাতটা গভীরে পড়তেই এভারকেয়ার হাসপাতালের লাইটগুলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল — করিডরের নীল আলো, মেশিনের টুংটাং, নার্সদের দ্রুত পদচারনা। হাসপাতালের ওয়েটিংএর ছোট্ট রুমে পরিবারটা জমে আছে; সবাই মিমাংসাহীন, কৌতূহলে স্নায়ুযুদ্ধ করছে।
ডাক্তাররা বলেছে — এখন রোগী অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে আছে, ভিড় বাড়ালে নজর রাখা যাবে না, রোগীর বিশ্রামও কষ্ট হবে। তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো: সবাই সারারাত হাসপাতালে থাকতে পারবে না।
মাহাদের বাবার কণ্ঠে কাঁপন আছে, ওর মা মিসেস. মিতালী খান দ্রুত বললেন…
ঃ- আমরা ভাগ হয়ে যাই — যাদের সরাসরি এখানে যেকোনো মুহূর্তে দরকার হতে পারে, তাদের এখানে রেখে বাকি সবাই খান ম্যানশনে যাবেন। ফোন দিয়ে সবাই খবরাখবর রাখব নাহয়।
কিয়ারা রা সবাই উঠে দাঁড়ালো। নাঈম ফোনে কথা বলছে কায়রার সাথে, মাহাদ কেবল চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে , কারণ তাকেও বাকিদের সাথে খান ম্যানশনে ফিরে যেতে বলছে।
লোকটা গম্ভীর গলায় বলল…
ঃ- আমি এখানেই থাকবো। নাঈম, তুই ফিরে যা বাসায় কায়রা আছে। আমার সাথে অয়ন, মানাফ , মায়ান থাকবে । তুই সবাই কে নিয়ে এখন খান ম্যানশনে ফিরে যা, প্রয়োজন হলে ফোন করবো তোকে।
মাহাদ কে নিজের কথায় অনঢ় দেখে, বাকিরা কেউ আর অমত করলো না। কিন্তু মাহাদের দাদী(মাহফুজা খান) বেঁকে বসলেন। মানে তিনি কিছুতেই স্বামী কে এখানে রেখে যাবেন না।
অবশেষে সবাই বহু কষ্টে উনাকে মানিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।
মাহাদের চাচা নিজে কে সামলে নিলে বললেন…
ঃ- তাহলে আমারা বাকিরা সবাই খান ম্যানশনে যচ্ছি। সারারাত ফোনে সবাই সংযুক্ত থাকবো। আর তবুও তোদের কোনো প্রয়োজন হলে তখনই ডেকে নিবি। চলুন বেয়াই মশাই!...
কিয়ারার বাবা কে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি। তারপর সবাই একে একে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এলো খান ম্যানশনের উদ্দেশ্যে।
তাদের সিদ্ধান্তটা বাস্তববুদ্ধি ও সংস্কারের মেলবন্ধন—হাসপাতালে থাকা মানে রোগীর কাছাকাছি থাকা, খান ম্যানশনে থাকা মানে বাহিরের ঝামেলা সামলানো। যেহেতু তিনি একজন মন্ত্রী পরিবারের প্রধান সদস্য। তার সাথে সাবেক মন্ত্রী বলে কথা। প্রেস মিডিয়া তো ঘটনা কাভার করতে আসবেই। তাই সেই দিকটাও তো সামলাতে হবে!..
একটি মূহুর্ত: বিদায় এবং অজ্ঞতাবশত প্রতিশ্রুতি..
গাড়ি রওনা হওয়ার সময় কিয়ারা বাইরে এসে সবাইকে দেখে — চোখে একটা ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ় হাসি; মাহাদকে দেখে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল…
“সাবধানে থাকবেন।”
মাহাদ শুধু মাথা নেড়ে বলে,
ঃ- তোমার সেই চিন্তা না করলেও হবে।
কিয়ারা প্রচন্ড কষ্ট পেলো এভাবে বলায়, ওর কন্ঠস্বর ভারী হয়ে আসছে। কোনো ভাবে কান্না আটকে বলল…
ঃ- আমি অপেক্ষা করব।
— যেন সে জানে, কিন্তু ভেতরটা একরাশ শূন্যতা গ্ৰাস করে নিয়েছে।
গাড়ি ধোঁয়া তুলে চলে যায়, হাসপাতালে থাকা মানুষের কণ্ঠে আরেকটু নিঃশ্বাস—সময় কেটে যাচ্ছে, রাত দীর্ঘ।
— — —
হসপিটালে মাহাদ — দাদার পাশে, পুরো রাতেই সাপোর্টিং টুকনো। ওর চোখ কখনো গলায় পড়ে, কখনো মনিটরে।
মায়ান নিজের দাদাভাই এর পাশেই হাত ধরে বসে আছে, চোখের পাতা কাঁপছে; মাঝে মাঝে ঘুরে মাহাদ কে দেখছে। ভাইয়ের মধ্যে ওরাও কিছু পরিবর্তন খেয়াল করছে।
একজন ঘনিষ্ঠ নার্স রয়েছে সর্বক্ষণ— যার দায়িত্ব রাতের ভেতরে প্রাথমিক সহযোগিতা করা।
তারা সবাই হাসপাতালের ছোট একটি প্রাইভেট ওয়েটিং রুমে জড়ো হলো — যেখানে দাদার কেবিনের কাছাকাছি রাখা সম্ভব, আর রাতে নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া বেশি ভিউয়ার ঢুকবে না।
হলজুড়ে — কাঁটা কাঁটা নীরবতা; কিশোরদের কণ্ঠ কেঁপে ওঠা; মাঝে মাঝে ডাক্তারের আসা যাওয়ার শব্দ। সবাই চলে যাওয়ার পর তিন ভাই হসপিটালের নামাজের রুমে এশারের নামাজ আদায় করে নিল। তারপর মোনাজাতে প্রাণ প্রিয় দাদাভাই এর জন্য একনিষ্ঠ ভাবে দোয়া করলো।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ