ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (২য় খন্ড)

৪০তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম🌿

#দ্বিতীয়_খণ্ড 
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন 
পর্বঃ- ৪০
🌿🌿🌿
কিয়ারা উঠে দাঁড়িয়েছিল জানালার দিকে। চাঁদের আলো পড়ে তার মুখটা আরো ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।
মাহাদ পিছন থেকে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল। 
যেন বুঝতে চাইছিল, সে কি আবার আগের মতো হাসবে?.?.. আবার ওকে কাছে টেনে নিবে?.. 
ধীরে ধীরে এসে পাশে দাঁড়াল।
ঃ- আজ সারাদিন কেমন ছিলো?..?..
তার গলাটা নরম… যেন শব্দ করলেই কিয়ারার মানসিক ক্লান্তি বাড়বে।
কিয়ারা খুব আস্তে বলল,
ঃ- ঠিক যেন নিভে থাকা আগুনের মতো… বাইরে শান্ত, আর ভেতরে ক্লান্ত।
মাহাদ শুনেই কাছে সরে এল।
সে হালকাভাবে কিয়ারার চুলের একপাশ পিছনে সরিয়ে দিল—
কিন্তু স্পর্শটা ছিল ভীষণ সম্মানিত, ভীষণ সাবধানী।
ঃ- তোমার ভেতরের ক্লান্তি যদি আমি কমাতে পারতাম…”
মাহাদের গলা আরও নিচু হয়ে গেল।
কিয়ারা একটু চমকে তাকাল—
সে এই মাহাদকে কম দেখেছে।
রাগী, পজেসিভ, দাপুটে মাহাদের মাঝে এমন নরম মানুষটা লুকিয়ে আছে—
তাকে সে ভুলেই গিয়েছিল।
মাহাদ এবার ধীরে ধীরে কিয়ারার হাত ধরে সোফার দিকে নিয়ে গেল।
ঃ- চলো… বসো। এতটা বেশি ভেবে ফেলো না। আমি আবার সবকিছু আগের মত করে দেবো। 
কিয়ারা প্রথমে হাত ছাড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু ছাড়াল না। মাহাদের হাতটা 
একটু উষ্ণ, একটু শক্ত, একটু নিরাপদ।
দুজনেই বসতেই মাহাদ বুক সোজা করে কিয়ারার দিকে তাকাল।
ঃ- তুমি যখন ফিরে এলে… বাচ্চাদের জন্য বললে…
আমি ভেবেছিলাম তুমি শুধু ওদের জন্য এসেছো, আমার জন্য না। তবে তোমার এমনটা বলাটাই স্বাভাবিক ছিল। 
কিয়ারার চোখ নরম হয়ে গেল।
ঃ- আমি… হারিয়েছিলাম, মাহাদ। আপনি আমার ভুল ভাঙিয়ে আমাকে ফিরিয়ে আনেননি। ইভেন আপনি আমাকে খোঁজারও কোনো চেষ্টা করেননি। আমি আপনার কাছে এতোটাই পর হয়ে গিয়েছিলাম। 
মাহাদ নিঃশ্বাস আটকে কিয়ারার কথা গুলো শুনলো।
ঃ- আসলে সবকিছু সমাধান হয়ে যাওয়ার পর সেদিন যখন তোমাকে পাগলের মত খুঁজেও কোথাও পাচ্ছিলাম না। তারপর আমি বাসায় এসে যখন তোমার দেওয়া গিফটের মধ্যে এবর্শনের রিপোর্ট পেলাম!.. তখন যেন আমার মাথায় গোটা আকাশ টাই ভেঙে পড়েছিল। তারপর তখন অতিরিক্ত রাগে ক্ষোভে তোমাকে আর খোঁজার চেষ্টা টুকুও করিনি। 
আর দেখো রাগে ক্ষোভে আমি এতোটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, ওটা আসল রিপোর্ট না নকল সেটাও যাচাই করতে ভূলে যাই। যদি সেদিন রাগ ক্ষোভ একপাশে রেখে রিপোর্ট টা যাচাই করতাম!. যদি তোমাকে আরও আগেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম!.. তাহলে হয়তো আমার বাচ্চারা আজকে আমাকে ছাড়া বড় হতো না। ওদের কাছে আমি অপরিচিত থাকতাম না। হয়তো দুনিয়াতে আমার মতো হতভাগা আর কেউই নেই। 
এই কথাটা কিয়ারাকে ভীষণ নাড়িয়ে দিল।
সে মাথা নিচু করে বলল,
ঃ- এগুলো বলে আমাকে ছোট করে দেবেন না। আমিই তখন একটু বেশি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছিলাম। ভুল আমাদের দুজনের ছিল, আর তার শাস্তিও আমরা দুজনে সহ আমাদের বাচ্চারাও পেয়েছে। অনেক হয়েছে ভুল বোঝাবুঝি, এবার আমি একটু শান্তি চাই। আর বাকি পাঁচটা পরিবারের মতো নিজেও ফ্যামিলি নিয়ে শান্তিতে বাঁচতে চাই।
 আমি হঠকারিতায় নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, আমার উচিত ছিল আরও একটু অপেক্ষা করা। আমি কেমন স্ত্রী হলাম?. যদি স্বামীকেই বিশ্বাস না করতে পারি। যদি তার বিপদ আপদে তার ঢাল হয়ে পাশে থাকতে না পারি। আমি মন থেকে সবকিছু ভুলে গিয়ে নিজের ভুলের জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি। আমি এই যন্ত্রনা আর বয়ে বেড়াতে পারছি না। এবার একটুখানি শান্তি চাই!.. 
মাহাদ খুব ধীরে এগিয়ে এল,
তার দুই হাত কিয়ারার কাঁধের দু’পাশে রেখে বলল…
না, জোর করে নয়,
এমনভাবে যেন বলতে চায়—
তুমি চাইলে আমি থাকি, না চাইলে ফিরে যাবো।
ঃ- আমার দিকে একবার তাকাও, রায়া। 
কিয়ারা তাকাতেই মাহাদের চোখ গাঢ় হয়ে এল—
রাগ না, দুঃখ না…
অপেক্ষা।
শুধু অপেক্ষা।
ঃ- আমাকে আবার তোমার মনে ঢুকতে দিবে?.?.. কথা দিচ্ছি এবার আমি আর কোনো ভুল করবো না। তোমাকে কখনো কষ্ট পেতে দেবো না, তোমার বিশ্বাস আবার ফিরিয়ে আনবো। তোমার অন্তরে চাঁপা দেওয়া পবিত্র ভালোবাসা আবার জাগিয়ে তুলবো। 
মাহাদের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। ও নিজেও ভালো নেই, দুজনে একই ঘরে থেকেও যেন ওদের মধ্যে কত হাজার মাইলের দুরত্ব। কিন্তু মাহাদ তো এতো বছরের পর এতোটা দুরত্ব একদমই মানতে পারছে না। 
কিয়ারা ধীরে মাথা নাড়ল। তবে ও যেন আরও কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু সেটা বলার মতো সাহস করে উঠতে পারছে না। কিয়ারা এবার একটু সাহস করে আমতা আমতা করে বলল…
ঃ- আমার আপনাকে আরও কিছু বলার ছিল। আসলে ব্যাপারটা ভীষণ সিরিয়াস, আপনি এটা জানার পর হয়তো আমাকে আরও ভুল বুঝতে পারেন। তাই বলার সাহস পাচ্ছি না, আমি আবারও আমার এমন গুরুতর ভুলের জন্য ক্ষমা চাইছি। 
বলতে বলতেই কিয়ারা ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললো। মাহাদ হতবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ও আসলে বুঝতে পারছে না যে, কিয়ারা আবার কোন ভুলের কথা বলছে। আর ওকেই বা কি বলতে চাইছে। তবে বিষয়টি হয়তো সত্যিই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, নাহলে কিয়ারা এভাবে কেঁদে ফেলতো না। 
মাহাদের পুরো শরীরে যেন ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। অজানা অস্থিরতায় ওর মন মস্তিষ্ক আতংকিত হয়ে গেল। 
সে খুব আস্তে, নিঃশব্দে কিয়ারার মাথায় হাত রাখল—
ঃ- এতো অস্থির হইও না, আমি তোমাকে আর কখনো ভুল বুঝবো না। কী হয়েছে?.. কি বলতে চাইছো , তুমি নির্ভয়ে বলো। 
কিয়ারা চোখ বন্ধ করে দিল।
এই প্রথমবার অনেক দিন পর তার মনে হলো সে নিরাপদ।
তবে সত্যিটা জানার পর হয়তো পরিস্থিতি আবার ওদের বিপক্ষে চলে যাবে। 
ঘরের আলো ম্লান।
দুজনের মাঝে থাকা দেয়ালটা ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে…
একটু নিঃশব্দে, একটু কোমলভাবে।
— — — 
সকালবেলার নরম আলোটা প্রথমে ছুঁলো বাচ্চাদের মুখ।
তারপর সেই আলো ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ল মাহাদ ও কিয়ারার উপর।
তারা দু’জন—
একই খাটে,
একই বিছানায়,
কিন্তু তাদের মাঝে ছোট্ট দুইটা প্রাণ নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে।
কিয়ারা ধীরে চোখ খুলতেই সবচেয়ে আগে দেখল—
তার নিজের হাত মাহাদের হাতে আটকে আছে।
কখন কীভাবে হাতটা ধরে ফেলেছে—
সে বুঝতেই পারেনি।
কিয়ারার হৃদপিণ্ড হালকা কেঁপে উঠল।
ধীরে সরে নিতে গেল—
ঠিক তখনই মাহাদও জেগে উঠল।
চোখ খুলতেই ওর দৃষ্টি সরাসরি কিয়ারার চোখে পড়ল।
চোখদুটো এখনো ঘুমঘুম, কিন্তু গভীরতা ভয়ংকর।
কণ্ঠ নিচু, গম্ভীর, 
ঃ- ফেলে দিতে যাচ্ছো?.?..
কিয়ারা থমকে গেল।
চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল—
 ঃ- হাতটা… আপনিই ধরেছিলেন।
মাহাদ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি চেপে রাখল।
ঃ- হ্যাঁ। আর আজও ধরতাম… যদি বাচ্চারা মাঝে না থাকত। তারপর তোমাকে মজা বুঝাতাম। 
কিয়ারার গলা শুকিয়ে গেল।
সে কিছু বলেনি, শুধু বাচ্চাদের দিকে ঝুঁকে দিল।
এবার বাচ্চাদের একজন কাত হয়ে কিয়ারার বুকে ঢলে পড়ল।
আরেকজন মাহাদের দিকে সরে গেল।
এ দৃশ্যটা দেখে মাহাদের পুরো মুখে একটা খুশি খুশি ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। ও ভীষণ নরম হয়ে গেল—
তার চোখ অসম্ভব কোমল, পজেসিভ, এবং অপরিচিত এক শান্তিতে ভরা।
হঠাৎ কিয়ারা দেখল—
মাহাদ খুব আস্তে হাত বাড়িয়ে
বাচ্চাদের চুলে হাত বুলাচ্ছে।
কিয়ারার চোখে বিস্ময়ের আলো।
এতদিন সে এই মানুষটাকে রাগ, অভিমান, দূরত্বেই দেখেছে।
আজ প্রথমবার দেখল—
একজন কোমল বাবা।
মাহিরা মাহাদের বুকে মুখ গুঁজে ঘুমাতে ঘুমাতে ছোট্ট আওয়াজ করতেই
মাহাদ আরও কাছে টেনে নিল।
মাহাদ গলায় ভীষণ আদর নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
ঃ- আমার মেয়েটা।
কিয়ারা তাকিয়ে রইল।
তার গলার ভেতর কিছু একটা নরম হয়ে এলো।
একটু পর মাহাদ তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল—
ঃ- রাতেও তোমার ঘুম ভেঙেছিল, জানি। তুমি বারবার উঠে বাচ্চাদের দেখে ঘুমাচ্ছিলে।
কিয়ারা চমকে উঠল—
ঃ- আপনিও জেগে ছিলেন?.?..
মাহাদ খুব আস্তে বলল—
ঃ- তোমাকে না দেখে কি ঘুম আসত?..?.
কিয়ারার গাল লাল হয়ে গেল।
কিছু বলার আগে মাহাদ আবার বলল—
ঃ- আমি বাচ্চাদের জন্য আলাদা রুম ঠিক করেছি, রায়া।
বাচ্চারা এখন বড় হচ্ছে ওদের আলাদা রুমে থাকার উপযোগী সময়। এখন পাশের স্টাডি রুমটা বাচ্চাদের জন্য ওদের পছন্দ অনুযায়ী ডেকরেশন করে দেওয়া হবে। তারপর আরও বড় হলে তখন ওদের জন্য অন্য রুম ডেকোরেশন করা হবে। আশা করি এতে তোমার কোন আপত্তি নেই। 
কিয়ারার গলা কাঁপল।
সে চাইলে তর্ক করতে পারত,
চাইলে তাকে বেরিয়ে যেতে বলতে পারত। কিন্তু… উনি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 
কিন্তু দুইটা ছোট্ট শিশু
একজন বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে যে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে…
কিয়ারা চোখ বন্ধ করে নরম স্বরে বলল—
ঃ- ঠিক আছে…আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর অবশ্যই পাঁচ বছর পরেই বাচ্চাদের আলাদা রুম দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই এটা অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 
মাহাদের মুখে প্রথমবার
একটা হালকা স্বস্তির ছাপ ফুটল।
এটাই ছিল প্রায় পাঁচ বছর পর 
দু’জনের মাঝের বরফ গলা প্রথম একটা মিষ্টি সকাল।
— — —
খান ম্যানশনের ডাইনিং রুমটা সকালবেলা সব সময়ই শান্ত থাকে।
কিন্তু আজকের সকালটা যেন অস্বাভাবিকভাবে কেমন উষ্ণ।
কিয়ারা বাচ্চাদের নাস্তা সাজিয়ে টেবিলে রাখছে—
গরম পরোটা, ডিম, ফল, বাচ্চাদের সিরিয়াল…
সবকিছু নিখুঁত।
মাহাদ বাচ্চাদের কোলে নিয়ে এসে চেয়ারে বসাল।
দু’জনের চোখ একটু মিলল, আবার দু’জনেই এড়িয়ে নিল চুপচাপ।
বাড়ির সবাই টেবিলে বসেছে—
মাহাদের মা, বোন, ফুপি…দাদা দাদী 
সবার চোখে আজ এক নতুন কৌতূহল। বাকি অতিথিরা সবাই নিজেদের গন্তব্যে ফিরে গিয়েছে। নীলাভও সাবিহা কে নিয়ে উত্তরায় ফিরে গিয়েছে। অয়ন, নামিরা ও তার পরিবারের সদস্যরা আজকে ফিরে যাবে। 
কারণ তারা আগের রাতের ঘটনাগুলো জানে—
মাহাদের চেষ্টাগুলো,
কিয়ারার ধীরে ধীরে নরম হয়ে ওঠা,
আর দু’জনের একই রুমে থাকা।
কিয়ারা মাথা নিচু করে বাচ্চাদের প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছিছিল।
তখন মুক্তা ফিসফিস করে বলল—
ঃ- ভাবী, খাবারে ঝাল কম আছে তো?.. মাহিরা তো ভাইয়ের মতো বেশি ঝালের জিনিস খেতে পারে না। একদম বাপ কা বেটি!.. 
কিয়ারা মুক্তার কথায় একটুখানি হাসল। তারপর বলল…
ঃ- হ্যাঁ , আমার সেটা মনে আছে । আর তাই ঝাল কমিয়েই রান্না করা হয়েছে। 
মাহাদের মুক্তার দিকে লক্ষ করতেই তার চোখ চকচক করে উঠল।
সে চুপ করে মাহাদের কানে কানে বলল,
ঃ- বড় ভাইয়া, তোমার জন্যই ভাবীর মুখে আজ মিষ্টি হাসি দেখতে পাচ্ছি।
মাহাদ একটু গম্ভীর হয়ে মুক্তার দিকে তাকালো, একটু অহংকারে চোখ নামালো।
কিন্তু ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসিটা লুকাতে পারল না।
সেই মুহূর্তে একটু চোখাচোখি, একটু এড়ানো, আবার একটুখানি চোখাচোখি। 
কিয়ারা যখন বাচ্চাদের সামনে চামচ বাড়িয়ে দিচ্ছিল,
মাহাদ সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বলে ফেলল—
ঃ- শোনো… তুমি কি খেয়েছো?..?. বাচ্চাদের আমি খাইয়ে দিচ্ছি, তুমি খেয়ে নাও। তুমি তো খিদে সহ্য করতে পারো না। 
কিয়ারা থমকে গেল। লোকটা এখনো ওর সবকিছু মনে রেখেছে!.. 
কিন্তু টেবিলে বসে থাকা অনেকেই শুনছে , এই ব্যাপারটা তার আরও অস্বস্তি বাড়াল।
ঃ- আমি… পরে খাবো। আপনি খেয়ে নিন, বাচ্চাদের আমিই খাইয়ে দিচ্ছি। আপনার তো আজকে মিটিং আছে শুনলাম। 
 কিয়ারা একটু গম্ভীর গলায় জানাল।
ঃ- পরে কেন?.?.. আর মিটিংয়ের কথা আমার মনে আছে। তবে তুমিও যে মনে রেখেছো, এটা জেনে ভালো লাগলো। 
মাহাদের কণ্ঠ একটু নিচু হলেও সবার কানে পৌঁছালো।
ঃ- খেতে হবে এখনই। না খেয়ে থাকলে তুমি দুর্বল হয়ে পড়বে। 
কিয়ারা চোখ করে তাকালো,
ঃ- আমি জানি আমার কখন খেতে হবে। আমাকে নিয়ে আপনার চিন্তা না করলেও চলবে। আমি পরে খেয়ে নেব। 
মাহাদ এবার সরাসরি তার প্লেট নিজের দিকে টেনে নিল। তারপর কটমট করে বলল…
ঃ- না। তুমি এখনই বসবে। আমি সার্ভ করে দিচ্ছি। আর আমার বউয়ের চিন্তা আমি করবো না তো কে করবে??.. তোমাদের বাড়িতে থাকা ঐ সাদিফ করবে?!.. 
টেবিল জুড়ে হালকা খিলখিল আর চাপা হাসি।
মাহাদের পরিবার এই দৃশ্য দেখে খুব ভিতরে ভিতরে খুশি। তারা বুঝতে পারছে যে ওদের ভিতরের মনমালিন্য ধীরে ধীরে দুর হচ্ছে। তবে রিদিতা ওদের এমন আদিখ্যেতা দেখে একটুও সহ্য করতে পারলো না। ও বিরক্তি নিয়ে ওদের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।‌
কিয়ারা বিরক্ত মুখ করে বলল,
ঃ- আপনি দয়া করে আর নাটক করবেন না তো সবাই দেখছে। আর এখানে সাদিফ কে টানছেন কেন উনি অনেক ভালো একজন মানুষ। 
মাহাদ ঝুঁকে খুব আস্তে বলল—
ঃ- সবাই দেখুক… তাতে আমার কী?.?. তুমি আমার বাচ্চাদের মা। তোমার যত্ন নেওয়া আমার দায়িত্ব। আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য পরপুরুষের প্রশংসা করা হচ্ছে?!.. এটার শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে মিসেস মাহাদ খান। 
কিয়ারা গাল লাল করে চুপ হয়ে গেল।
সে টের পেল—মনের ভেতরের বরফটা আরেকটু গলছে। যেন শীতল বরফের নিচে চাঁপা পড়ে থাকা সেই পুরোনো ভালোবাসা টা আবার জেগে উঠছে। 
কিয়ারা পাশের জুস গ্লাসটা ধরতে গিয়ে ভুল করে মাহাদের হাতেই ছুঁয়ে ফেলল।
হাতটা গরম… স্থির… আর অদ্ভুত পরিচিত।
ওরা দু’জনই এক সেকেন্ড থেমে গেল।
মাহাদের আঙুল আলতোভাবে সরে গেল না। উল্টো একটু থেমে আছে যেন।
কিয়ারা তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে বলল—
ঃ- সরি…!
মাহাদ হালকা গলায় বলল—
ঃ- এখানে সরি বলার মতো কিছুই নেই। আমি তোমার দূরের বা অপরিচিত কেউ নই যে এভাবে সরি বলতে হবে। হ্যাঁ হতেই পারে যে তুমি এখন আর আমাকে আগের মত আপন ভাবো না। কিন্তু আমি তো তোমাকে পর ভাবি নাহ !.. 
কিয়ারা মাথা নামিয়ে ফেলল।
পরিবারের সবাই এই দৃশ্য দেখে মুখচাপা হাসিতে ফেটে পড়ছে।
মাহাদের মা মিতালী খান হাসিমুখে বললেন..
ঃ- শুনলাম মাহাদ বাচ্চাদের জন্য রুম ডেকোরেশন করবে। আমি ডেকোরেটর বুকিং দিয়ে দিয়েছি। ওনারা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে। কিয়ারা, মাহাদ তো মিটিং এ চলে যাবে, তাই তুমি একটু এই দিকটায় খেয়াল রেখো। আমার দাদুভাই দাদুমনি কে দেখিয়ে ডেকোরেশন করবে। ওদের পছন্দ মতো হওয়া চাই কিন্তু!.. 
মাহাদ কিয়ারার দিকে তাকাল—
সে একটু লজ্জায় গাল লাল করে মাথা নিচু করে ফেলল। উনারা কি ভাবছেন কে জানে। কিসের জন্য বাচ্চাদের আলাদা রুমে দিচ্ছে, ওরা তো… 
ঃ- ঠিক আছে, আম্মু আমি নিজে সবকিছু দেখিয়ে দেবো। আর অবশ্যই বাচ্চা পছন্দ মতো ডেকোরেশন করা হবে। আপনি আবার কবে আসবেন আম্মু?!.. 
মিতালী খান কেসের কাজে আজকেই ঢাকায় চলে যাবেন। এই কদিনেই শাশুড়ির সঙ্গে কিয়ারার ভীষণ গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। তাই কিয়ারা মন খারাপ করে মিতালী খান কে জিজ্ঞেস করল। মিতালী খান একজন নারী হিসেবে চমৎকার মহিলা। আর শাশুড়ি হিসেবে কিয়ারার কাছে তিনি আরও বেশি ভালো। 
ঃ- আমি হাতের কাজ শেষ করেই আবার এসে তোমাদের দেখে যাবো আম্মু, তুমি মন খারাপ করো না। আর এখন আমার এই দুই রাজপুত্র ও রাজকন্যার জন্য তো আসতেই হবে। না এসে আমি থাকতেই পারবো না। কি দাদুভাই, দাদুমনি আমাকে মিস করবে তো?... মিস্ না করলে কিন্তু দাদুমনি খুব কষ্ট পাবো। 
মিতালী খানের কথা শুনে সবাই মুখ টিপে হেঁসে বাচ্চাদের দিকে তাকালো। 
মিরান আর মাহিরা দাদুমনির দিকে র
তাকিয়ে আবার সবার দিকে তাকালো।
ঃ- মাহিরা আর ভাইয়ে দাদু মনি কে খুববব মিস্ করবে। তাই না ভাইয়ে?!..
ঃ- হ্যাঁ, মিরান আর বোন দাদু মনি কে অনেক মিস করবে। 
মিতালী খান উঠে এসে বাচ্চাদের আদর করে দিলেন। তার বড় ছেলের ঘরে দুটো পুতুলের মত মিষ্টি বাচ্চা দিয়েছেন। আল্লাহ ওদের কে নেক হায়াত দান করে মানুষের মতো মানুষ বানাক। (আমিন) 
মিতালী খান মনে মনে নাতিনাতনিদের জন্য দোয়া করলেন। 
সকালের নাস্তা শেষ হলো
কিন্তু দু’জনের চোখে চোখ পড়ার সেই ছোট ছোট মুহূর্তই
আজকের দিনটার রঙ বদলে দিল।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন