ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (২য় খন্ড)

৪১তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম🌿 

#দ্বিতীয়_খণ্ড 
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন 
পর্বঃ- ৪১
🌿🌿🌿
খান ম্যানশনের তৃতীয় ফ্লোরের সবচেয়ে বড় রুমটার মধ্যে এতদিন ধরে স্টাডি রুম হিসেবে ব্যবহার করা একটি বড় রুম—দরজা খুলতেই যেন ধুলো আর অজস্র ফাইলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু আজ সেই রুমটা সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে।
মাহাদ দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে, দু’হাত পিছনে বাঁধা, ঠোঁট চাপা, কিন্তু চোখে এমন এক অদ্ভুত আগুন—যেন সে নিজের ভিতরের অপূর্ণতা, অনুতাপ আর ভালোবাসার সবটুকু ঢেলে দেবে এই রুমটা তৈরিতে।
চার-পাঁচজন ডেকোরেটর ঢুকতেই মাহাদ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
ঃ- আমি চাই… রুমটা দেখলেই যেন বোঝা যায় দুইটা বাচ্চার পৃথিবী এখানে শুরু হবে।
একটা ছেলে, একটা মেয়ে। আলাদা আলাদা পছন্দ থাকবে। কোনো ভুল যেন না হয়।
তার কণ্ঠে কঠোরতা থাকলেও দুচোখে লুকানো ছিল এক অদ্ভুত কাঁপুনে—
একজন বাবা সবকিছু প্রথমবার করছে, তবুও নিজের মতো করে নিখুঁত করতে চাইছে।
প্রথমে দেয়ালে রঙ করার জন্য ডেকোরেটর রঙের স্যাম্পল এগিয়ে দিল।
মাহাদ এক মুহূর্ত থেমে বলল,
ঃ- এই পাশের দেয়ালটা… হালকা নীল হবে। মিরানের জন্য।
তারপর অপর পাশের দেয়াল দেখিয়ে বলল—
ঃ- আর এইটা বেবি পিংক‌। মাহিরার জন্য। ঝলমলে শান্ত রঙ। ও খুব চঞ্চল মেয়ে, রঙটা ওকে শান্ত রাখবে। 
ডেকোরেটররা দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিল। রোলার, ব্রাশ, শিট—সবকিছু নড়াচড়া করছে।
রুমে সেই রঙের নরম গন্ধ ভেসে আসে।
মাহাদ হাতের আঙুলে একফোঁটা রঙ ছুঁয়ে দেখে—
একটা মৃদু হাসি—যা তাকে কেউ কখনো দেখেনি।
এবার ঘরের মাঝখানে আসে দুটি ছোট, আলাদা কিডস বেড।
একটিতে নীল চাদরে গ্যালাক্সি ও তারার ডিজাইন—
মাহির যেন ঘুমানোর আগে আকাশ দেখে গল্প করতে পারে।
আরেকটিতে বেবি পিংক রঙের প্রিন্সেস থিম বিছানা—
মাহিরার প্রিয় রং, যেদিন তাকে হসপিটালে দেখেছিল, সেই ছোট্ট গোলাপি ক্লিপটা তার মনে পড়ে যায়।
বেড সাজানো শেষে মাহাদ নিজে হাত দিয়ে বালিশগুলো ঠিক করে।
তার গম্ভীর চোখ কিছুক্ষণ আটকে থাকে কিয়ানার বিছানায় থাকা
“Little Queen” লেখা কুশনে।
সে খুব আস্তে বলে,
“আমার আদরের ছোট রানী…”
কেউ শোনেনি। তবুও তার ঠোঁট কাঁপে।
মাহাদ নির্দেশ দিল,
ঃ- এদিকে একটা বড় শেলফ দাও। মিরানের জন্য গাড়ি, রোবট আর পাজল থাকবে।
আর ওদিকে মাহিরার জন্য বার্বি হাউস, আর্ট কিট আর কিছু কিডস স্টোরি বুক।
খেলনা সাজানো হলে পুরো রুমে রঙিন একটা জগৎ তৈরি হলো।
মাহাদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখল—
তার চোখ ধীরে ধীরে নরম হয়ে গেল।
বাচ্চারা সঙ্গে না থাকলেও, সে যেন ওদের হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
এবার জানালার পাশে ছোট স্টাডি টেবিল।‌
দুটি ছোট্ট চেয়ার—একটা নীল রঙের, একটা গোলাপী রঙের।
ডেস্কের উপর স্যাভিনির মতো শান্তভাবে সাজানো—
ক্রেয়ন, পেন্সিল, ছোট বুকশেলফ, রঙিন নোটবুক।
মাহাদ টেবিলে হাত ছুঁয়ে মৃদু গলায় বলে,
ঃ- ওরা পড়ালেখা এখানে করবে…
টেনশন করবে না… কেউ বকবে না… শুধু নিরাপদ থাকবে। 
রুমে কেউ আওয়াজ করেনি।
কারণ সবাই প্রথমবার দেখল—
গাংচিলের মতো কঠিন এই মানুষটা ভিতরে কতটা নরম।
সবকিছু ডেকরেশন শেষে 
মাহাদ নিজে গিয়ে ব্যাগ থেকে বের করল একটি ফ্রেম।
কিয়ারা আর বাচ্চাদের হসপিটালের ছবি।
খুব আস্তে, যেন ভাঙা কাচ ছোঁয়,
সে সেটি দু’জনের মাঝের দেয়ালে টাঙিয়ে দিল।
ফ্রেম লাগানোর পর কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকল।
তার চোখ লাল হয়ে উঠল—
কিন্তু সে চোখ ফিরিয়ে নিল দ্রুত।
ঝলমলে আলো, পর্দা, সুগন্ধ—সব একসাথে। রুমের লাইট জ্বলে উঠতেই পুরো ঘরটা যেন প্রাণ পেল।
নরম, উষ্ণ আলো।
বাতাসে হালকা ভ্যানিলা ফ্রাগরেন্স।
জানালায় লেসের পর্দা দুলছে হালকা বাতাসে।
এ যেন বাচ্চাদের প্রথম নিজের পৃথিবী।
সিঁড়ি বেয়ে নিজেদের রুমে ঢুকে দরজায় দাঁড়িয়েই কিয়ারা জমে যায়।
তার চোখ ভিজে ওঠে—এত কেয়ার, এত সুন্দর করে সাজানো—সবটা বিশ্বাস করা কঠিন।
কিয়ারার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু সে কথা বলতে পারে না।
মাহাদ তার দিকে তাকায় না, শুধু নিচু গলায় বলে,
ঃ- ওদের পৃথিবী… এবার থেকে এখানে। যা কিছু বাকি ছিল, আমি ঠিক করে দেব।
কিয়ারা কেবল নিঃশ্বাস টেনে চোখ মুছে ফেলে।
সবকিছু ঠিকঠাক সাজানোর পর রুমের শেষ দৃশ্য—
দুটি বিছানা।
দুটি ছোট পৃথিবী।
দুটি শিশুর স্বপ্ন।
আর মাঝখানে জমে থাকা অজস্র অমীমাংসিত অনুভূতি—
যা ধীরে ধীরে মাহাদ আর কিয়ারাকে আবার একসাথে টেনে আনবে।
— — — 
খান ম্যানশনের দুপুরটা ছিল নরম, শান্ত। বাচ্চাদের রুম নতুন সাজানো—দেয়ালে স্টারলাইট জ্বলছে, ফ্লোরে নরম কার্পেট, আর দুইটা ছোট বেডে কার্টুন থিমের বেডশিট। বাচ্চারা সেখানে খেলছিল, হাসছিল, আর দূর থেকে কিয়ারা তাদের দেখে মনে মনে শান্তি পাচ্ছিল।
ঠিক তখনই দরজায় নক।
একজন স্টাফ এসে ভদ্রভাবে খামটা এগিয়ে দিল,
ঃ- ম্যাম, আপনার বাবার বাড়ি থেকে এসেছে। 
কিয়ারার চোখ এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল। দুহাত দিয়ে খামটা খুলল—ভিতরে সুন্দর গোল্ডেন বর্ডারের কার্ড, গায়ে বাবার হাতের লেখা।
“মা, অনেকদিন হলো তোকে দেখি না। নাতিদেরও দেখার মন করছে। আজ সন্ধ্যায় চলে আয়। বাড়িতে দাওয়াত আছে।..”
কিয়ারার গলা একটু ভারী হয়ে গেল।
এতদিন পর বাবার বাড়ি থেকে ডাকে…
আর সে তো মাসখানেক হলো খান ম্যানশনে বাচ্চাদের নিয়ে আছে।
বাচ্চারা দৌড়ে এলো,
ঃ- মাম্মা, নানু বাড়ি যাব?..?..
কিয়ারা তাদের মাথায় হাত রেখে হাসল,
ঃ- হ্যাঁ, আজ যাব। নানাভাই ডাকছে। 
দূর থেকে মাহাদ সবকিছু দেখছিল—নীরবে, নিজের মতো। তার মুখে সেই চেনা ঠান্ডা ভাবটা কমে আজ একটু নরম কিছু ছিল। কিয়ারা যখন ব্যাগ গোছাচ্ছিল, মাহাদ গম্ভীর চোখে তাকিয়ে দেখছিল। আসলে ওর একটুও ওদের যেতে দিতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু কিয়ারার উৎফুল্ল মুখটা দেখে ও বুঝতে পারল যে কিয়ারা ভীষণ খুশি। তাই মাহাদ আর কোনো কিছুই বললো না। ও বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলল—
ঃ- তুমি চাইলে আমি ড্রপ করে দেব। 
কিয়ারা থমকে তাকাল।
আগের দিনের অভিমান, মনের ক্ষত—সব মিলিয়ে একটু কষ্ট জমে ছিল, কিন্তু তার গলাটা নরম।
ঃ-না… আমি চলে যাব। আপনার নিশ্চয়ই কাজ আছে। 
মাহাদ ধীরে মাথা নাড়ল। আসলেই ওর আজকে ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটবে। বেশ কয়েকটি মিটিং এ্যটেন্ট করতে হবে। 
ঃ- ঠিক আছে… আমি রাহুল কে তোমাদের সাথে পাঠাচ্ছি। আর অবশ্যই বাচ্চাদের কোন কিছুর দরকার হলে আমাকে বলবে। আর… যত তাড়াতাড়ি পারো ফিরে এসো। 
কিয়ারা চোখ নিচু করল।
ফিরে আসা শব্দটা তার কানে একটু বেশি জোরে বাজল।
বাচ্চারা ততক্ষণে ছোট ব্যাগ পিঠে নিয়ে লাফালাফি করছে—“নানুর বাড়ি! নানুর বাড়ি!”
ড্রাইভওয়েতে গাড়ি দাঁড় করানো হলো। ড্রাইভার দরজা খুলে দিল। কিয়ারা বাচ্চাদের নিয়ে গাড়িতে উঠল। জানালা নামানো ছিল একটু, হালকা বাতাস ঢুকছিল।
মাহাদ বাইরে দাঁড়িয়ে। বাচ্চাদের কপালে চুমু খেয়ে আদর করে দিল। 
বাচ্চারা হাত নেড়ে চিৎকার করল—
“বাবা বাইইই!”
মাহাদও নরম হাসল, হাত নাড়ল।
আবার সেই শান্ত, গভীর, অচেনা কোমলতা।
গাড়ি ধীরে ধীরে গেট ছাড়িয়ে বেরিয়ে গেল।
মাহাদ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল—যেন কিয়ারার চলে যাওয়া বাড়িটাকে একটু ফাঁকা করে দিল।
তার বুকের ভেতরটাও।
ও নিজেও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে গাড়ি নিয়ে পার্টি অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। এদিকে কিয়ারা বেশ মন খারাপ করে বসে আছে। ওদের সাথে মাহাদ না আসায় কিয়ারার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল।  
তবে তিনি একজন এমপি, তার নিশ্চয়ই অনেক ব্যস্ততা রয়েছে। তারপর আবার কিয়ারা নিজেও তো একবারও লোকটাকে ওদের সাথে আসার জন্য বললো না। ও ওর নিজের বাড়ি যাচ্ছে , আর সেই হিসেবে লোকটার শশুরবাড়ি। তাই লোকটা কে না সাধলে তিনি নিশ্চয়ই সেধে সেধে যেতে চাইবেন না!?... 
উফফ কিয়ারা সত্যি সত্যিই ভীষণ বোকা মহিলা। ওর অবশ্যই লোকটা কে একবার বলা উচিত ছিল। আসলে বাড়ি আসার খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওর আর কোনো দিকে খেয়াল ছিল না। কিন্তু এখন এই যে ওর দ্বারা আবার একটা ভুল হয়ে গেছে। এসব ভাবতে ভাবতেই ওরা উত্তরায় পৌঁছে গেল। 
কিয়ারা রাহুল কে বেশ কয়েক বার বাড়িতে যাওয়ার জন্য জোর করলো। কিন্তু রাহুল কে আবার গাজীপুরে ফিরে মাহাদের কাছে যেতে হবে। তাই ও অন্য একদিন আসবে বলে তাড়াহুড়ো করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এলো। 
— — — 
কিয়ারা বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই সবাই হইহই করে ছুটে ওদের দিকে এগিয়ে গেল। বাচ্চাদের নিয়ে সবাই মেতে উঠলো, কিয়ারা দেখতে পেলো কায়রাও মেয়ে কে নিয়ে এখানে রয়েছে। বাকিরাও সবাই আছে। 
ঃ- কিরে তুই একা কেন??.. জামাই বাবাজি আসলো না?!... 
কিয়ারার মা নীলাশা চৌধুরী মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি ভাবছেন ওদের মধ্যে মনমালিন্য হয়তো এখনো ঠিক হয়নি। আসলে মায়ের মন তো, তাই তিনি চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।‌
ঃ- না আম্মু, উনার আজকে কয়েকটি মিটিং এ্যটেন্ট করতে হবে। তাই আসেনি, তবে রাতে আসলেও আসতে পারে। তোমরা তো যানোই তিনি কতটা ব্যাস্ত থাকেন। 
কিয়ারার এই কথা শুনে নীলাশা চৌধুরী হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন। তারপর কিয়ারা সবার সাথে কুশল বিনিময় করে বাচ্চাদের নিয়ে উপরে চলে গেল। তারপর ওদের ফ্রেশ করিয়ে দেওয়ার পর কিরণ বাচ্চাদের নিয়ে নীচে চলে এসেছে। নামিরাও চলে এসেছে, ওকে অয়ন দিয়ে গিয়েছে। 
কিয়ারা ফ্রেশ হয়ে নীচে নেমে আসলো। তারপর আলিশা কে দেখতে পেলো, আলিশা ও সাবিহা একসাথে এসেছে। আলিশা এখন কায়রানের সাথে গাজীপুরেই থাকে। সাবিহা নীলাভ এখন এই বাড়িতেই থাকে। নীলাভ বাপ-চাচাদের সাথে ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে। 
সাবিহা এগিয়ে এসে কিয়ারা কে জড়িয়ে ধরলো। কিয়ারাও আলতো করে হেসে ওকে জড়িয়ে ধরল। 
 ঃ- কি খবর, নতুন ভাবীইইই!.. কেমন আছেন আপনি। 
কিয়ারার এমন কথায় সাবিহা বেশ লজ্জা পেল। আর বাকিরা হেসে উঠলো, সাবিহা কিয়ারার পিঠে আস্তে করে একটা কিল মেরে বলল…
ঃ- যাহ্!. ফাজিল বিয়ের মাস পেরিয়ে গেছে। এখনো নতুন বউ আছি নাকি?...?..
ঃ- আরে আছো আছো, বছর না পেরোনো পর্যন্ত তুমি নতুন বউ থাকবে। 
কিযণ হাসতে হাসতে বলে উঠলো। ওর কথা শুনে বাকিরাও হেঁসে উঠল। 
ঃ- এখানে আমরা সবাই ডাবল হয়ে গিয়েছি। কিন্তু কিরণ এখনো সিঙ্গেল, ওকে ডাবল বানাতে হবে।‌
কথাটা আলিশা বলে উঠলো। ওর এই কথা শুনে সবাই কিরণের দিকে তাকালো। 
ঃ- কি আশ্চর্য!. তোমরা সবাই এভাবে অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন??.. এখনো কিয়ান ভাইয়া বাকি আছে। ভাইয়া বিয়ে করলে তারপর তোমাদের সবকটা ভাবি কে জ্বালিয়ে তারপর আমি শশুরবাড়ি যাবো। 
কিরণের কথায় সবার মারিসা জাবিনের কথা মনে পড়ে গেল। 
ঃ- আসলেই ভাইয়া সেদিন বিয়েটা করে নিলেই ভালো হতো। কিন্তু মারিসা ভাবিও ভাইয়ার সাথে সায় দিয়ে বিয়ের ডেট পিছিয়ে দিল। আর এমনিতেও তাদের বিয়ের বিষয়টি হুট করেই হয়ে গিয়েছিল। 
নামিরা বলে উঠলো। সবাই ওর কথায় সায় জানালো। 
ঃ- আর তাছাড়া সবগুলো বিয়ে একসাথে হয়ে গেলে মজা নেই। একেক বার একেক জনের বিয়ে হলে আমরা বেশি আনন্দ করতে পারবো‌। 
আরিয়া ড্রইং রুমে আসতে আসতে বলে উঠলো। আরিয়া ও আরিফা ওরা দুজনে নিজেদের রুমে ছিল। ওরা এগিয়ে এসে সোফায় কিরণের পাশে বসে পড়লো। 
ঃ- সেসব নাহয় বুঝলাম, তোরা কবে পার্মানেন্ট মিঙ্গেল হবি। 
ঃ- পার্মানেন্ট মানেহ?..?..
নামিরার এই কথা শুনে আরিয়া ও আরিফা একসাথে বলে উঠল। সবাই ওদের দিকে বিরক্ত নিয়ে তাকালো। 
ঃ- দেখ, আমরা সবাই জানি যে তোরা দু'দিন পর পর বয়ফ্রেন্ড বদলাস। আর সেটা তো পার্মানেন্ট হয়না। তোদের বিয়ে হলে সেটা পার্মানেন্ট হলেও হতে পারে। 
কিরণ বলে উঠলো, এদিকে সাবিহা অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালো । ও জানতো না এতো কিছু, তাই হঠাৎ জেনেই বেশ শক পেয়েছে। 
ঃ- এবারের টা পার্মানেন্ট করে নিবো। এটাই ফাইনাল বুঝেছিস!. 
আরিয়া বলে উঠলো। এরপর সবাই ছেলের সম্পর্কে জানতে ওকে চেপে ধরলো। তারপর আরিয়া ওদের কে ছেলের সম্পর্কে বললো। 
 ঃ- আরিয়ার টা তো শুনলাম , এবার আরিফা তুই বল। তোরটা কি হলো?!..
কিরণ আরিফা কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো। তারপর সবার দৃষ্টি আরিফার দিকে চলে গেল। কিয়ারা ওদের আড্ডা থেকে উঠে বাহিরে চলে গেল। বাচ্চারা বাগানে কনিকার সাথে খেলা করছে। কিয়ারা আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বাগানের শেষের দিকে বকুল ফুলের গাছটার নিচে এসে দাঁড়ালো। 
তারপর ছোট্ট ছেলের কবরের উপর পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিল। বরাবরের মতই কিয়ারার চোখজোড়া ভিজে গেল। কিয়ারা নীচু হয়ে কবরের সাথে মাথার দিকটায় গাল ঠেকিয়ে উপুড় হয়ে বসে রইল। আর ভাবতে লাগলো এই বিষয়ে লোকটার সাথে ও কিভাবে বলবে?.. 
ও কিভাবে একজন বাবা কে তার অদেখা অজানা সন্তানের কবরের মুখোমুখি করবে। এগুলো ভাবতেই তো কিয়ারার কলিজা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। লোকটা এতো বড় সত্য কিভাবে মেনে নেবে। ওকে যখন জিজ্ঞেস করবে তার ছেলে কে শেষ বারের মত দেখার সুযোগ থেকে কেন ও তাকে বঞ্চিত করেছে?.. তখন ও কি জবাব দিবে?... কিয়ারার চোখ থেকে অবিরাম ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে। 
কিন্তু ওকে এটা পারতেই হবে। যত যাই হোক, ওকে সত্যি টা তাকে জানাতেই হবে। একজন বাবা কে তার মৃত সন্তানে শেষ বারের মত দেখতে না দিয়ে, তাকে তার সন্তানের খবর না জানিয়ে ও যেই পাপ করেছে। সেটার ভার কিয়ারা আর বইতে পারছে না। কিন্ত সবটা ভাবতে গেলেই ওর আত্মা কেঁপে উঠছে। লোকটা এতো বড় সত্য শোনার পর কি করবে ??.. ঠিক কিভাবে রিয়্যাক্ট করবে?..?.. কিয়ারার মাথায় যেন কাজ করছে না। তবে ওকে জানাতেই হবে, এবার আর চুপ থাকার সময় নেই। 
মিরান মাহিরা দৌড়ে মায়ের দিকে এগিয়ে গেল। ওরাও মায়ের পাশে বসে পড়লো।
ঃ- ও মাম্মা, তুমি আবার ছোট ভাইয়ের জন্য কাঁদছো?.. কেঁদো না, কেঁদো না, তাহলে ছোট ভাইয়াও আমাদের মতো কষ্ট পাবে। তুমি কাঁদলে মাহিরা আর ভাইয়ের খুব কষ্ট হয়।
ছোট্ট মাহিরা কথাগুলো বলে উঠলো। কিয়ারা বাচ্চাদের আওয়াজ পেয়ে উঠে বসলো। তারপর দুহাতে দুজন কে টেনে নিয়ে কোলে বসিয়ে দিল। মাহিরা ও মিরান মায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিল। তারপর কিয়ারা ধীরে ধীরে উঠে বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেল। 
— — —
কিয়ারা বাচ্চাদের নিয়ে চলে যাওয়ার পর খান ম্যানশনটা অদ্ভুত নিরব হয়ে গেল। মাহাদ পার্টি অফিস থেকে দশটা নাগাদ খান ম্যানশনে ফিরে এসেছে। ও নিজেদের রুমে বসে কাজ করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু মন বসছিল না।
বারবার মনে হচ্ছিল—
“ওরা ঠিক আছে তো?”
“কিয়ারা… কেমন আছে?”
“ওরা কি করছে?..?..”
শেষ পর্যন্ত সে আর থাকতে পারল না।
কিছু না বলেই নিজের গাড়ি বের করে রওয়ানা দিল কিয়ারার বাবার বাড়ির দিকে। নাঈম যাওয়ার সময় মাহাদের অফিসে এসেছিল। দুজনে একসাথে শশুরবাড়ি যাবে তাই, কিন্তু মাহাদ কিছুতেই রাজি হয়নি। তারপর ওর শশুর মশাই মানে কিয়ারার বাবা নেহাল চৌধুরী নিজে ফোন করে ওকে যেতে বলেছে। মাহাদ হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। 
 
তখন ভেবেছিল যে ও যাবে না। কিয়ারা যাওয়ার সময় ওকে একবারও সাধে নি। কিন্তু এখন আর ও এই ঘরে একা থাকতে পারছে না। রুমের আনাচে কানাচে বাচ্চাদের হাঁসির শব্দ, কিয়ারার হাঁটা চলা ও কল্পনা করছে। কিন্তু আসলে তো এখানে কেউই নেই। 
তাই মাহাদ রুম থেকে বেরিয়ে এলো, রাহুল কে নিয়ে গাড়ি নিয়ে খান ম্যানশন থেকে বেরিয়ে এলো। 
---চলবে--- 
ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন