#প্রিয়_রুহের_মাহরাম🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ৪৪
🌿🌿🌿
সকালের প্রথম আলোকে বকুল গাছের নিচে সবকিছু পাল্টে দিয়ে গেছে।
সকাল হতেই কিয়ারাদের পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ ।
এমন নিস্তব্ধতা, যেন বাড়িটি পর্যন্ত দম বন্ধ করে আছে।
মাহাদ সারা রাস্তা একটা কথাও বলেনি।
বাচ্চাদের কোলে নিয়েও তার দৃষ্টি ছিল দূরের কোথাও—
যেন সে হাঁটছে, কিন্তু শরীর ছাড়া সবকিছু থেমে আছে।
খান ম্যানশনে ফিরে আসার পরেই সবাই বুঝে গেছে, কিছু একটা ভয়ঙ্কর ঘটেছে।
কিন্তু মাহাদের মুখের দিকে তাকিয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস করছিল না।
কিয়ারা বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে নিঃশব্দে ওদের রুমে ঢুকল।
মাহাদ দাঁড়িয়ে আছে জানালার সামনে,
মুঠো শক্ত করে জানালার গ্রিল ধরে।
পিঠের পেশী টান টান—
পুরো শরীরে যেন দহন।
ঃ- মাহাদ… কথা বলবেন একবার?.?.. কাল থেকে আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না। আমি তো আমার সব ভুল স্বীকার করেছি, আপনার কাছে ক্ষমাও চেয়েছি। দয়া করে আমার সাথে কথা বলুন।
মাহাদ কোনো সাড়া দিল না।
শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকল—
এমনভাবে, যেন ভেতরে কিছু ভেঙে গিয়েছে।
কিয়ারা কাছে এসে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল—
ঃ- আমি ক্ষমা চাইছি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমাকে এভাবে ইগনোর করবেন না, মাহাদ প্লীজ!?..
মাহাদ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
তার নীল রঙের চোখজোড়া লাল—ঘুমহীন, কান্নাহীন, রাগে-ব্যথায় জমাট।
ঃ- আমি তোমার কাছে দোষী ছিলাম… কিন্তু তখন আমিও একা ছিলাম। ভীষণ বিপদে পড়েছিলাম। আর তুমি সবটা না জেনেই চলে গিয়েছিলে। আমার পাশে কেউ ছিল না, এতো কিছু সহ্য করেও সেই আমাকেই এতো বড় একটা শাস্তি পেতে হলো। এবার নিশ্চয়ই তুমি শান্তি পেয়েছো!..
লোহা কাটা কণ্ঠে আবার বলে উঠলো…
ঃ- কিয়ারা… কেন?
একটা ফোন, একটা বার্তা, একটা ডাক, কিছুই কি তোমার মনে হয়নি আমাকে বলতে?.?.. আরে আমার কি কোনো অধিকার ছিল না?!..
কিয়ারা মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল—
ঃ- আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে অস্বীকার করেছেন। আমাকে আর ভালোবাসেন না, মনেও রাখেননি। আলিশাপু কে নিয়ে সুখের সংসার করছেন। কিন্তু…
সব কিছু আমার দোষে হয়েছে, চলে যাবো, আপনাকে জোর করে আমার সাথে থাকতে হবে না।
মাহাদ এগিয়ে এসে তার ঠিক সামনে থামল।
ঃ- চলে যাবে??...
সে হেসে ফেলল—
একটা ভয়ঙ্কর, তিক্ত হাসি।
ঃ- আমি আমার সন্তানকে কবর পর্যন্ত দেখতে পাইনি।
এটার চেয়ে বড় শাস্তি একজন বাবার জন্য আর কী হতে পারে?..?..
কিয়ারা হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে লাগল—
ঃ- আমি ভাবিনি আপনি এভাবে ফিরে আসবেন। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি…!..
মাহাদ তীব্র কণ্ঠে বলল—
ঃ- তুমি একা ছিলে ঠিক, কিন্তু আমিও বাবা ছিলাম।
আমারও জানার অধিকার ছিল।
কিয়ারা মাথা তুলে তাকাল—
ঃ- আমাকে কি কখনো ক্ষমা করবেন না?..?..
মাহাদের কন্ঠ ধীর, কিন্তু শিরদাঁড়া শিউরে ওঠার মতো শীতল।
ঃ- ক্ষমা…এতোটা সহজ হবে?..
এতো বড় একটা ধোঁকা, অন্যায় কখনো ভুলতে পারবো না আমি ।
সে জানালার দিকে তাকাল—
অন্ধকারের ভেতরে বকুল ফুলের ছায়া যেন এখনো তার চোখের সামনে ভাসছে।
ঃ- কবর না তুললেও…
ওকে আমি প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখব।
প্রার্থনায়, মনের মধ্যে যত্ন করে।
কিয়ারা তার সামনে দাঁড়াল, কাঁদতে কাঁদতে হাত বাড়াল—
মাহাদ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল, তারপর ধীরে ধীরে হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
ঝড়টা পুরোপুরি থেমে যায়নি—
কিন্তু ওই মুহূর্তে তাদের দুজনের হৃদয়ের দূরত্ব হয়তো আবারও কিছুটা বেরে কমে গিয়েছে।
— — —
রাতের কান্না, তর্ক, সত্য উন্মোচন—
সব মিলিয়ে পুরো খান ম্যানশন যেন সারারাত ঘুমায়নি।
সকালের প্রথম আলো জানালা বেয়ে ঢুকতেই
ঘরের ভেতর সোনালি একটা নরম ছায়া পড়ে।
কিন্তু সেই আলোতেও ঘরটা ভারী।
কিয়ারা রাতে একটুও ঘুমাতে পারেনি।
খাটের একদিকে তিনজন—
দুটো বাচ্চা মাঝখানে আর শেষ প্রান্তে সে।
মাহাদ ছিল আচমকা চুপচাপ,
দূরের সোফায় পুরো রাত বসে ছিল—
না ঘুমায়, না কথা বলে।
তার চোখ ছিল লাল, ক্লান্ত,
কিন্তু সেই চোখে অন্য কিছু—
বাবার হৃদয় ছিঁড়ে যাওয়ার ব্যথা।
সকাল ৮টা বাজে।
মিরান আর মাহিরা দুজনেই আধো আধো ঘুম নিয়ে চোখ মেলে।
মালাই রঙা আলো বাচ্চাদের মুখে পড়ে নরম ঝিলিক দিচ্ছে।
মিরান ঘুমভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল—
ঃ- মাম্মা , তুমি কি রাতে কাঁদছিলে?.?. না কি আমি স্বপ্ন দেখেছি?!..
কিয়ারার বুক যেন থেমে গেল।
সে তাড়াতাড়ি হাসার চেষ্টা করল—
ঃ- না না বাবা, … চোখে একটু ধুলো গিয়েছিল। আর মনে হচ্ছে তোমাকে শয়তান স্বপ্ন দেখিয়েছে। মাম্মা একদম ঠিক আছি।
মাহাদ সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।
বাচ্চাদের প্রশ্ন শুনে তার চোখের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত ব্যথা।
সে এগিয়ে এসে খুব নরম স্বরে বলল—
ঃ- মাম্মা কাঁদলে তোমরা চিন্তা করবে, তাই মা লুকায়… ঠিক?.?.
মাহিরা মাথা নাড়ল। তারপর বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল…
ঃ- বাবা, তুমি রাতে ঘুমাওনি??.. তোমার সুন্দর সুন্দর চোখ লাল লাল।
মাহাদ তার মেয়ের হাতটা ধরে নিজের বুকে চেপে ধরল।
ধীরে বলল—
ঃ- যখন বাবা কিছু ভুলে যায়… তখন ঘুম আসে না। আর আজ তো বাবা অনেক বড় কিছু হারিয়ে ফেলেছি।
কিয়ারা মাথা নিচু করে ফেলে।
তার গাল বেয়ে আবার টনটনে জল নামতে থাকে। কিন্তু বাচ্চাদের জন্য সেটা কোনো ভাবে আড়াল করে নিয়েছে।
— — —
আজ খান ম্যানশনে নাস্তার টেবিলটা অদ্ভুত চুপচাপ।
সাধারণত সেখানে হাসি, কথাবার্তা, ব্যস্ততা থাকে—
কিন্তু আজ যেন বাতাস পর্যন্ত নড়ছে না।
মাহাদের চাচী কিয়ারার পাশে বসেন।
মাহাদের বাবা বাচ্চাদের নিয়ে খেলানোর চেষ্টা করছেন
কিন্তু তার মুখেও গাম্ভীর্য।
দাদীর মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। মাহাদ শুধু সামনে তাকিয়ে কফি নেড়ে যাচ্ছে—
কিন্তু একবারও মুখ তুলে কারো দিকে তাকাল না।
সবাই বোঝে—
পুরো পরিবার আজ অন্য এক যুদ্ধে আছে।
মাহাদের বাবা ধীর স্বরে বললেন—
ঃ- আজ দুপুরে একটা দোয়া হবে।
আমাদের নাতিটা—
যে সন্তানকে আমরা কখনো কোলে নিতে পারিনি—
তার জন্য।
কিয়ারা দুহাতে মুখ চেপে ফেলল।
নিস্তব্ধতায় তার কান্নার আওয়াজ আরও স্পষ্ট।
মাহাদ চুপচাপ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ ছিল ভাঙা, কাঁচের মতো ধারালো—
ঃ- সবাই দোয়া করবে।
আমি যাবো সেই জায়গায়।
সবাই বুঝল, মাহাদ বলছে—
বকুল গাছের নিচে দাফন হওয়া সেই ছোট্ট কবরের কথা।
কিয়ারার দম আটকে গেল।
ঃ- মাহাদ.. আপনার সাথে আমিও যাবো।
মাহাদ দুদিন পর প্রথমবার চোখ তুলল কিয়ারার দিকে।
সেই চোখে ছিল—
রাগ, কষ্ট, শোক, হতাশা
যেন সব মিলেমিশে এক ঝড়।
ঃ- তুমি কোথাও যাবে না।
ডাইনিং টেবিলে আবার নিস্তব্ধতা।
ঃ- ওটা আমারও ছেলে ছিল…
আমিও তার কাছে যেতে চাই।
কিয়ারা ভেঙে পড়ল।
মাহাদের দাদী নীরবে কিয়ারা কে জড়িয়ে ধরলেন—
ঃ- ওকেই যেতে দাও নাতবউ… ওর ভিতরের ঝড়টা সামলাতে দাও।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাচ্চারা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
মাহাদ হাঁটু গেড়ে বসে
দুটো বাচ্চার মাথায় হাত রাখে—
ঃ- তোমাদের ছোট ভাই খুব সুন্দর ছিল। আজ আমি তাকে দেখতে যাচ্ছি। তোমরা ভাইয়ের জন্য দোয়া করো ঠিক আছে?!..
মাহিরা জিজ্ঞেস করল—
ঃ- আমরাও যাবো??.. ছোট ভাইয়া কে দেখতে। কিন্তু ভাইকে তো দেখা যায় না, শুধু মাটি দেখা যায়।
মাহাদের চোখ এক সেকেন্ডের জন্য ভিজে উঠল।
ঃ- না বাবা…
আজ তোমরা ঘরে থাকো। আর ওই মাটিতেই তোমাদের ছোট ভাই আছে।
তারপর সে নীরবে বেরিয়ে গেল।
কিয়ারা দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে—
তার চোখ ভিজে, ঠোঁট কাঁপছে—
কেন যেন এমন লাগছে
মাহাদ আজ অন্য মানুষ হয়ে বাড়ি ফিরবে।
— — —
বাগানের শেষ মাথায় বকুল গাছটা ষমাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, কিন্তু তার নিচের মাটি যেন পাঁচ বছর আগের একটা অন্ধকার স্মৃতি ধরে রেখেছে। গাছের ডালগুলো আস্তে আস্তে দোল খায়, যেন কারও জমে থাকা কান্না বাতাসে মিশে যাচ্ছে।
খান পরিবারের সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
মাহাদ গাছের সামনে গিয়ে থেমে যায়।
তার চোখ লাল, কিন্তু কান্না ফেলছে না। যেন চোখের ভেতর একটা আগুন, আর হৃদয়ের ভেতর বরফ।
কিয়ারা একটু পেছনে দাঁড়িয়ে।
ওর হাঁটু কাঁপছে, শ্বাস কেটে কেটে আসছে। ও চায় কাছে যেতে… কিন্তু সাহস হয় না।
দাদাভাই ফিরোজ খান আস্তে বলেন…
ঃ- চলো, দোয়া পড়ি দাদাভাই। ও তো আমাদের রক্ত ছিল।
সবাই হাত তোলে।
কোরআনের আয়াত পড়ার সাথে সাথে বাতাস যেন থমকে যায়।
কিয়ারা দুই হাত তুলে চোখ বন্ধ করে, কিন্তু তার হাত কাঁপতে থাকে…
হঠাৎ মাহাদের দিকে তাকিয়ে ফেলে।
মাহাদ কয়েক সেকেন্ড চোখ খুলে কিয়ারাকে দেখে—
সেই দৃষ্টি ভরা অভিযোগ, ভরা ব্যথা…
কিন্তু তাতে এক ফোঁটা অসহায়তাও আছে।
কিয়ারা মাথা নিচু করে ফেলে।
দোয়া শেষ হলে নীরবতা নামল।
কেউ কথা বলছে না।
শুধু বকুল ফুল নরমভাবে ঝরছে মাটিতে।
হঠাৎ মাহাদ নিচু হয়ে কবরের মাটি ছুঁয়ে ফেলে।
তার বুক কাঁপে।
মাহাদ ফিসফিস করে—
ঃ- বাবা… আমি এখানে ছিলাম না।
আমি জানতাম না।
কিন্তু তোমার বাবা সবসময় তোমাকে মনে রেখেছে।
কিয়ারার বুক ভেঙে যায়।
সে আর থাকতে পারে না। এগিয়ে যেতে চাইলে নীলাশা চৌধুরী বাঁধ সাধেন। ওখানে অনেক পুরুষজন রয়েছে, তাই কিয়ারা কে কিরণ রাও ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল।
সে কাঁদতে কাঁদতে বলে—
আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম, মাহাদ।
আপনি আমাকে ঘৃণা করবেন ভেবে…
সব হারানোর ভয়ে আমি ভুল করেছি।
কিন্তু আমি এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের বাচ্চাকে একা ভাবিনি।
প্রতিদিন এখানে এসে বসেছি।
মাহাদ চোখ বন্ধ করে।
তার মুঠি শক্ত হয়ে যায়। কানে বাজে কিয়ারার বলা কথাগুলো।
রাগ?.. ব্যথা?..অসহায়তা?..—সব মিলেমিশে বিস্ফোরণের আগে শেষ মুহূর্তের মতো।
তারপর সবাই বাড়ীতে প্রবেশ করলো।
তখন দাদা ফিরোজ খান এসে দুইজনের মাঝখানে দাঁড়ালেন।
তার কণ্ঠ ভারী—
ঃ- তোমরা দুজনেই ব্যথা পেয়েছো।
কিন্তু ব্যথা ভাগ করলে হালকা হয়।
পাঁচ বছর ধরে তোমরা দুজনেই একা ছিলে। এবার একসঙ্গে থাকা শিখো, সম্পর্কের মূল্যয়ন করবে।
কিয়ারা মুখ ঢেকে কাঁদে।
মাহাদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
সে কিয়ারা দিকে তাকায়—এক দীর্ঘ, ভারী দৃষ্টি।
তার কণ্ঠ কর্কশ কিন্তু ভাঙা—
ঃ- আমি ক্ষমা করতে পারছি না, কিয়ারা , কিন্তু তোমাকে একা ছাড়তেও পারছি না। হয়তোবা একটা সময় তোমাকে ক্ষমা করে দিবো, কিন্তু বিশ্বাস কর এই নির্মম সত্য টা কখনো ভুলতে পারবো না যে, তুমি ইচ্ছে করে আমাকে পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করেছো, পাঁচটি বছর আমি গুমরে গুমরে মরেছি। আর তারপর আবার জানলাম আমার আরেক সন্তান এর কথা, যার জন্ম মৃত্যু কোনো খবর আমার কাছে আসেনি।
কিয়ারার নিঃশ্বাস থমকে যায়।
মাহাদ আরও যোগ করে—
ঃ- চলে এসো সবাই, এই বাড়িতে আর কখনো আসবো না। আমাকে উনারা সবাই মিলে ঠকিয়েছেন।
এটা যতটা কঠিন কথা,
তার ভেতরে ততটাই অদ্ভুত কোমলতা লুকানো।
পুরো পরিবার ধীরে ধীরে ফিরে যেতে থাকে।
পিছনে পড়ে থাকে বকুল গাছ,
ফুল ঝরা কবর,
আর পাঁচ বছরের গোপন ব্যথা।
হাঁটতে হাঁটতে দাদী মাহফুজা খান কানে কানে বলে—
ঃ- তোমরা দুজন একসাথে আবার ঠিক করবে, আমরা সবসময় তোমাদের সাথে আছি।
— — —
এভাবে দেখতে দেখতেই কেটে গিয়েছে এক সপ্তাহ। সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই চলছে, তবে মাহাদ ও কিয়ারার সম্পর্কের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। মাহাদ বাচ্চাদের জন্য জান প্রাণ দিয়ে দেয়। কিন্তু কিয়ারার জন্য এখন সে যেন একজন অপরিচিত ব্যক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।
কিয়ারাও নিজের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, কিন্তু মাহাদের সাথে ওর সম্পর্ক কোনভাবেই স্বাভাবিক হচ্ছে না। তবে ও এখনো হাল ছেড়ে দেয়নি, মাহাদ ওর সাথে বাচ্চাদের বিষয়ে ছাড়া আর বাড়তি কোন কথাই বলে না। কিয়ারা ওর সাথে কথা বলার অনেক চেষ্টা করে, কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছে করেই ইগনোর করে, তাহলে ও কিভাবে কথা বলতে পারে?!..
এখন রাত প্রায় বারোটা বেজে উঠল। বাচ্চাদের কিয়ারা ওদের রুমে শুইয়ে দিয়ে এসেছে। বাচ্চারা অলরেডি ঘুমিয়েও পড়েছে। বাড়ির সবাই’ই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে, কিয়ারা একা একা সারা ঘর জুড়ে পায়চারী করছে।
রাত বারোটা বেজে গেল, অথচ আজকে লোকটা এখনো ফিরছে না কেন?!.. আবার কোন সমস্যা হলো নাকি?.. তিনি তো ওর সাথে কিছুই বলেন না। কিয়ারা খানিকটা চিন্তিত হয়ে ঘর জুড়ে পায়চারী করতে লাগল।
তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে বেশ কয়েক বার ফোন দিল। কিন্তু ওপাশ থেকে কেউই রিসিভ করলো না। এবার কিয়ারা আর টিকতে না পেরে রাহুল কে ফোন করলো। এভাবে বেশ কয়েক বার ফোন করার পর অবশেষে রাহুল ফোনটা রিসিভ করল।
ঃ- হ্যালো!. ভাবী বলেন।
ঃ- আপনার ভাই কোথায়??.. বারোটা বেজে গেল, অথচ এখনো বাসায় আসলো না। কোথায় আপনারা?..
ঃ- ভাবী, ওই আসলে ভাই একটা মিটিংয়ে আটকে গিয়েছিল। তাই বাসায় ফিরতে দেরী হচ্ছে, আর আমিও ভাইয়ের সাথেই আছি।
ঃ- ওও আচ্ছা, ঠিক আছে।
এই বলে কিয়ারা ফোনটা কেটে দিলো। ওর মনটা এবার বেশ খারাপ হয়ে গেল। কিয়ারা উঠে গিয়ে বাচ্চাদের একবার দেখে আসলো। এখন রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বেজে গেছে।
কিয়ারা কিছুক্ষণ একটুখানি ভেবে আলমিরার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর আলমিরা ঘাঁটাঘাঁটি করে একটা সুন্দর গাঢ় গোলাপী রঙের পাতলা একটা জর্জেটের শাড়ি বের করলো। আর সেই সাথে প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে বিছানার উপর রাখলো।
তারপর রুমের দরজা লক করে বাচ্চাদের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বাচ্চারা আরামে ঘুমোচ্ছে , তারপর কিয়ারা বাচ্চাদের রুমের দরজা চাপিয়ে দিল। তারপর সুন্দর করে সেজেগুজে বেশ পরিপাটি হয়ে বসে রইল। আজকে ও লোকটাকে মানিয়েই ছাড়বে, যদিও ওর এখনিই ভীষণ লজ্জা লাগছে। আর অসভ্য লোকটার সামনে গেলে হয়তো লজ্জায় মরেই যাবে।
ওর এসব ভাবনা চিন্তার মধ্যেই কেউ দরজায় নক করল। কিয়ারা এতে বেশ বুঝতে পারলো যে কাঙ্খিত মানুষটি চলে এসেছে। কিয়ারা কি করবে না করবে বুঝতে পারছে না। ও তড়িঘড়ি করে একটা শাল জড়িয়ে নিল, আর তারপর নিজেকে একটু স্থীর করে দরজা খুলে দিল।
মাহাদ বেশ গম্ভীর হয়ে ওর দিকে না তাকিয়েই ভিতরে প্রবেশ করলো। কিয়ারা দেখেই বুঝতে পারলো যে লোকটার মন মেজাজ ঠিক নেই। কিয়ারা যদিও প্রথমে ওর দিকে ভালো করে খেয়াল না করায় বেশ মন খারাপ করতেই যাচ্ছিল। কিন্তু এখন লোকটার মেজাজের চিন্তায় ওর কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে।
মাহাদ ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে হাতের ঘড়ি খুলতে লাগল। তারপর গায়ের পাঞ্জাবি খুলে ফ্রেশ হতে ওয়াশ রুমে ঢুকে গেল। কিয়ারা পাঞ্জাবি টা ওয়াশিং মেশিং এ রেখে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো।
তারপর নীচে নেমে আসলো, কিচেনে গিয়ে দুজনের খাবার গরম করে ট্রে তে নিয়ে আবার উপরে উঠে এলো। রুমে ঢুকে দেখলো মাহাদ ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। কিয়ারা খাবারের ট্রে টা রেখে প্লেটে খাবার বেড়ে নিল।
মাহাদ বাথরোব পড়েই সোফায় বসে পড়লো। তারপর একা একাই খাবার খেতে শুরু করলো। এটা দেখে কিয়ারার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল, ও লোকটার জন্য এতো রাত অবধি না খেয়ে ছিল, অথচ লোকটা ওকে একবার জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না। যে ও খেয়েছে কিনা?!..
কিয়ারা চুপচাপ বসে ওর খাওয়া দেখতে লাগল। লোকটার এতে কোনো খেয়াল নেই, তিনি নিজের মতো খেয়ে বিছানায় গিয়ে বসলেন। কিয়ারা মন খারাপ করে খাবার ট্রে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
মাহাদ বাথরোব খুলে রাতের পোশাক পড়ে নিল। তারপর বাচ্চাদের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ