#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ৪৫ + ৪৬
🌿🌿🌿
এক সপ্তাহ!..
এক সপ্তাহ ধরে মাহাদ ঠিকই কথা বলেছে, দায়িত্ব নিয়েছে, বাচ্চাদের আগলে রেখেছে—
কিন্তু সেই আগুনটা, সেই ছোঁয়া, সেই অধিকারবোধের উষ্ণতা…
কিয়ারা কোথাও খুঁজে পায়নি।
আজ রাতে তাই সে চুপচাপ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিয়ারা রুমে এসে মাহাদ কে কোথাও দেখলো না। ও বুঝতে পারলো যে লোকটা প্রতিদিনের মতোই বাচ্চাদের কাছে গিয়েছে। কিয়ারার তো এমনিতেই মন খারাপ ছিল, কিন্তু লোকটার এমন নিষ্ঠুরতা দেখে ওর আরও মন খারাপ হয়ে গেল। লোকটা একা একাই খেয়ে নিল, ওকে একবার জিজ্ঞেসও করলো না।
কিয়ারা গায়ে জড়িয়ে থাকা শাল টা ছুড়ে সোফার থেকে ফেললো। তারপর ঠাস করে ওয়াশ রুমে ঢুকে গেল। এদিকে মাহাদ বাচ্চাদের রুম থেকে বেরিয়ে এসে সোফায় বসলো। তারপর সোফার উপরে পড়ে থাকা শাল টা তুলে নিল।
আজকে পার্টি অফিসে একটু ঝামেলা হয়েছে। আর তারপর বিরোধী দলের সাথে ওর ছেলেদের বেশ মারপিট হয়েছে। ওর দলের দুজনের অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়, আর তাদের কে নিয়ে হসপিটালে যাওয়া হয়। মাহাদ এতোক্ষণ সেখানেই ছিল। এজন্যই আজকে আসতে এতো লেট হয়ে গেছে।
মাহাদ কপালের উপর হাত রেখে সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল। হঠাৎ ওয়াশ রুমের দরজা খোলার আওয়াজ শুনে চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। কিয়ারা ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছে।
মাহাদ বেশ ঠান্ডা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ওও আচ্ছা, ম্যাডাম তাহলে শাড়ি পরে সেজেগুজে অপেক্ষা করছিল?!.. কিন্তু কার জন্য?. ওর জন্য কি ?..
কিয়ারা হাতে মুখে লোশন লাগিয়ে ধুপধাপ শব্দ করে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। লোকটা ওর সুন্দর মুডটাই নষ্ট করে দিয়েছে। মাহাদ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কিছু একটা ভেবে ওর মুখে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো।
ও সোফা থেকে উঠে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর লাইট অন রেখেই বিছানায় কিয়ারার পাশে শুয়ে পড়ল। এতো দিন ওরা দুজনে একই বিছানায় থাকলেও দু'জনেই আলাদা আলাদা কম্বল ব্যবহার করেছে। কিন্তু আজকে মাহাদ নিজের কম্বল রেখে দিয়ে পাশেই শক্ত হয়ে শুয়ে থাকা কিয়ারার কম্বলের নিচে ঢুকে গেল। কিয়ারা নিজের উদরে একটা ঠান্ডা হাতের শক্তপোক্ত স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঘরের লাইট নরম করে জ্বালানো।
বাচ্চারা পাশের রুমে ঘুমাচ্ছে।
সে জানে, মাহাদের রাগ কথায় ভাঙে না। ভালোবাসার ছোঁয়ায় ভাঙে। কিন্তু মনে হচ্ছিল যে ওর এই বুদ্ধিটাও লোকটার কাছে টেকেনি।
কিন্তু… কিন্তু এখন!..
মাহাদ পিছন থেকে কিয়ারা কে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ে মুখ গুজে দিল।
তারপর…তারপর…
হালকা একটা সুগন্ধ—
চেনা, খুব চেনা… ভীষণ প্রিয়।
মাহাদ মাথা তোলে।
এক সেকেন্ডের জন্য সে থেমে যায়।
এই কিয়ারা নয়—
এই সেই কিয়ারা, যাকে সে ছুঁলে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়।
“এইভাবে…?”
গলা শক্ত, কিন্তু চোখ নরম।
কিয়ারা কিছু বলে না।
শুধু শরীর টা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় পড়ে রইলো।
শুধু ওর আঙুলটা মাহাদের কন্ঠনালিতে ছুঁয়ে দিল।
একদম হালকা।
কিন্তু মাহাদের শরীর শক্ত হয়ে যায়।
ঃ- রাগ ভাঙানোর জন্য করেছি,
যদি এখনও অধিকার থাকে…।
কিয়ারা মৃদু স্বরে বলে উঠলো।
এই কথাটাই মাহাদের শেষ বাঁধটা ভেঙে দেয়।
সে কিয়ারার হাতটা টেনে নিয়ে এক টানে কাছে আনে।
শাড়ির আঁচল গড়িয়ে কোমর টা শক্ত করে চেপে ধরলো।
ঃ- অধিকার?.?..
সে ফিসফিস করে।
ঃ- তুমি জানো না—
আমি কতটা কঠিন ভাবে আটকে রেখেছি নিজেকে?..?...
মাহাদের এমন কথা ও কন্ঠস্বর শুনে
কিয়ারার শ্বাস টা যেন কেঁপে উঠলো।
ঃ- তাহলে আর আটকানোর দরকার নেই।
কিয়ারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলে উঠলো।
মাহাদ আর সময় নষ্ট করে না। তার দীর্ঘ পাঁচ বছরের জমানো ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ এসেছে যে।
সে কিয়ারাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়—
কিন্তু জোরে নয়,
একটা সুক্ষ্ম যত্ন নিয়ে।
তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়।
তারপর চোখে।
তারপর ঠোঁটে—
ধীরে, গভীর, দাবিহীন কিন্তু দখলদার।
কিয়ারা তার শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে।
“মাহাদ…”
নামটা উচ্চারণেই যেন সব অভিযোগ গলে যায়।
মাহাদ কপাল ঠেকিয়ে বলে—
ঃ- আমি রাগ করে ছিলাম না, রায়া।
আমি ভয় পেয়েছিলাম—
তোমাকে আবার হারাবো বলে। তাই নিজেকে একটু সময় দিচ্ছিলাম, যাতে আর কোনো ভুল না হয়।
কিয়ারার চোখ ভিজে ওঠে।
ঃ- আমি কোথাও যাচ্ছি না।
সে বলে।
ঃ- এইযে এতো বাঁধা পেরিয়ে এক হয়েছি, এরপর থেকে সবসময় আপনার কাছেই আছি। আর কখনো দূরে যাবো না, যতো যাই হোক, আমি সবসময় আপনার সঙ্গে থাকবো।
মাহাদ এই নিষ্পাপ স্বীকারোক্তি শুনে কিয়ারা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
শব্দ কমে আসে।
শ্বাস গাঢ় হয়।
দুই শরীরের দূরত্ব মিলিয়ে যায়—
ভালোবাসা আর অপরাধবোধের মাঝখানে জন্ম নেয় নতুন বিশ্বাস।
রাতটা আর নীরব থাকে না।
কিন্তু সকালে—একই বিছানায়,
একই খাটে,দু’জন মানুষ একটু হালকা হয়ে ঘুমায়।
রাগ ভাঙে না এক রাতে।
কিন্তু ফিরে আসা শুরু হয় ঠিক এভাবেই।
— — —
পরদিন সকাল আটটা , খান ম্যানশন!..
ভোরের আলোটা ধীরে ধীরে পর্দার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছে।
বিছানার একপাশে মাহাদ জেগে আছে অনেকক্ষণ ধরেই। ফজরের নামাজের পর আর ঘুমই আসেনি।
তার বুকের ভেতর ঘুমিয়ে কিয়ারা,
চুল ছড়ানো, শ্বাস ধীর, মুখে অদ্ভুত এক শান্তি।
অনেক গুলো বছর পর—
এই প্রথম সে কিয়ারাকে এমন নিশ্চিন্ত দেখছে। নাহলে এতো গুলো দিন যেন কিয়ারা পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়া একটা গাছের মতোই ছিল।
মাহাদ আঙুল তুলে খুব সাবধানে কিয়ারার কপাল থেকে চুল সরিয়ে দেয়।
এই ছোঁয়াটা আগের রাতের মতো আগ্রাসী নয়—
এটা ফিরে পাওয়ার ছোঁয়া।
কিয়ারা এতে একটুখানি নড়েচড়ে ওঠে। চোখ খুলে প্রথমেই মাহাদকে দেখে।
এক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থাকে দু’জনেই।
কোনো অস্বস্তি নেই।
শুধু হালকা একটা বাস্তবতা—
ওরা আবার একসাথে।
ঃ- শুভ সকাল…।
কিয়ারা আস্তে বলে।
মাহাদ মাথা নাড়ে।
ঃ- ঘুম ঠিক মতো হয়েছিল?..?..
কিয়ারা হালকা হাসে।
ঃ- ভীষণ ভালো, আপনার বুকে ছিলাম যে!.. তাই হয়তো।
এই একটা লাইন মাহাদের বুকের ভেতর অনেকদিনের জমে থাকা ভারটা নামিয়ে দেয়।
ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে নরম একটা আওয়াজ—
ঃ- মাম্মা?..?..
বাচ্চাদের একজন।
কিয়ারা দ্রুত উঠে বসে।
মাহাদ আগেই উঠে দরজা খুলে দিয়েছিল।
দুইটা ছোট মানুষ দৌড়ে এসে বিছানায় ওঠে।
ঃ- মাম্মা আজ তুমি হাসছো!.. কি জন্য বলো, তাহলে আমিও হাসবো।
মাহিরা কিয়ারার মুখ ধরে বলে।
কিয়ারা বাচ্চাদের জড়িয়ে ধরে।
মাহাদ পাশে দাঁড়িয়ে দেখে—
এই ছবিটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
ঃ- তেমন কিছু না সোনা, তোমাদের বাবা রাগ করেছিলেন। এখন মাম্মা তার রাগ ভ্যানিশ করে দিয়েছি। তাই হাসছিলাম কলিজা!..
এরপর কিয়ারা উঠে বাচ্চাদের একে একে ফ্রেশ করিয়ে দিল। তারপর মাহাদ ওদের নিয়ে নীচে নেমে আসলো।
কিয়ারা নিজেও ফ্রেশ হয়ে তারপর ওদের পিছু পিছু নীচে নেমে আসলো।
নিচে নাস্তার টেবিলে পুরো খান পরিবার একসাথে বসেছে।
আজ টেবিলের পরিবেশ টাও যেন অন্যরকম হয়ে আছে।
কিয়ারা নিচে নামতেই মাহাদের দাদী উঠে দাঁড়ান।
নাতবউ… আজকে তোমার শরীর কেমন?..?.. মাথা ব্যাথা কমেছে??...
তার কথার ভেতরে আলাদা একটা আদর।
কিয়ারা বুঝে যায়—
বেশ অনেক দিন পর পরিবারটাও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।
মাহাদ নিজের হাতে কিয়ারার প্লেটে খাবার তুলে দেয়।
কেউ অবাক হয় না।
সবাই যেন অপেক্ষায় ছিল।
একসময় মাহাদের দাদী আস্তে বলে—
ঃ- আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। সব মিথ্যা, ভুল, পাপ—
সব ভেঙে সত্যটাই টিকে থাকে।
কিয়ারা মাথা নিচু করে নিল।
মাহাদ টেবিলের নিচে তার হাতটা ধরে।
এই ধরা হাতটা রাগের নয়,
অধিকারের নয়, দায়িত্বের আর ভীষণ ভালোবাসে ধরা বিশস্ত হাত।
নাস্তা শেষে মাহাদ কিয়ারাকে একপাশে নিয়ে যায়।
ঃ- আজ বিকেলে বাচ্চাদের নিয়ে একটু ঘুরিয়ে আনতে চাইছি।
সে শান্ত গলায় বলে। আমি ফোন করলে বাচ্চাদের নিয়ে তৈরি থাকবে।
কিয়ারা তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
ঃ- এইটা কি অনুরোধ?..?.. নাকি আদেশ।
মাহাদ খুব ধীরে বলে—
ঃ- যেটা তুমি মনে কর সেটাই।
এটা আমার বাড়ী আর তুমি… এই ঘরের মানুষ। আমার বাচ্চাদের মা, আর আমার মনে হয়েছে যে তোমাকে বলা উচিত। তাই আমি বলেছি, এখন এতে তুমি যা ভাববে সেটাই।
কিয়ারার চোখ ভিজে ওঠে।
কিন্তু এবার সে কাঁদে না।
সে শুধু মাথা নেড়ে মাহাদের কথায় নীরব সম্মতি জানালো।
— — —
বিকেল গড়িয়ে আসছে।
আকাশে হালকা কমলা রোদ, বাতাসে অদ্ভুত এক শান্তি।
খান ম্যানশনের সামনে কালো SUV গাড়িটা দাঁড় করানো।
ড্রাইভার দরজা খুলে রেখেছে।
বাচ্চারা একে একে দৌড়ে এসে উঠছে—
ঃ- আমরা কোথায় যাচ্ছি?..
ঃ- আইসক্রিম খাবো?..
বড় পার্কে যাবো, তাই না?..
মাহাদ প্রথমে কিছু বলে না।
তারপর হালকা হাসি দিয়ে বলে—
ঃ- সবই হবে। আর একসাথে।..
এই একসাথে শব্দটাতে কিয়ারার বুকটা কেঁপে ওঠে।
সে বাচ্চাদের সিটবেল্ট ঠিক করে দেয়।মাহাদ পাশ থেকে চুপচাপ দেখে।
তারপর গাড়ি ছাড়ে।
শহরের রাস্তা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে।
গাছপালা, খোলা আকাশ—সবকিছু যেন আজ একটু বেশি সুন্দর।
বাচ্চারা জানালা দিয়ে মুখ বের করে চিৎকার করে—
ঃ- দেখো দেখো পাখি!...
ঃ- ওই যে কত সুন্দর ফোয়ারা!..
মাহাদ সামনে বসে থেকেও বারবার পেছনে তাকায়।
যেন বিশ্বাস করতে পারছে না—
এই দৃশ্যটা তার। এটা তার নিজের পরিবার!.. তার নিজের সন্তানদের নিয়ে সে আজ ঘুরতে বেরিয়েছে!...
আগে মাহাদ প্রায় প্রায়ই কনিকা কে নিয়ে ঘুরতে বের হতো। তখন ওর ভীষণ খারাপ লাগতো এই ভেবে যে, ওর নিজের কবে একটা সন্তান আসবে?!. আবার মনে হতো ওর সন্তান কে কিয়ারা মেরে ফেলেছে।
ড্রাইভারের কথায় মাহাদের ভাবনার ঘোর কেটে যায়। একসময় গাড়ি থামে।
খোলা পার্ক।
চারদিকে সবুজ, মাঝখানে বড় ফোয়ারা, পাশে ছোট একটা ক্যাফে।
বাচ্চারা নেমেই দৌড় দেয়।
কিয়ারা চেঁচিয়ে বলে—
ঃ- আস্তে!... পড়ে যাবে!...
মাহাদ বাচ্চাদের এতোটা খুশি দেখে নিজেও খুব খুশি হয়। ওদের এই খুশির জন্যই তো এতো গুলো মিটিং ক্যান্সেল করে সময় বের করেছে। মাহাদ হালকা হেসে বলে—
ঃ- পড়লেও উঠতে জানে। আর না পড়লে উঠতে শিখবে কিভাবে?!.. আমার বাচ্চারা সব কিছুতেই পারদর্শী হবে, ইনশাআল্লাহ।
এই একটা লাইনে কিয়ারা বুঝে যায়—
সে বাবার মতো ভাবতে শুরু করেছে।
পার্কের বেঞ্চে কিয়ারা বসে।
মাহাদ পাশে এসে দাঁড়ায়, বসে না।
বাচ্চারা ফোয়ারার পাশে পানি নিয়ে দুষ্টুমি করছে , হাসছে।
কিয়ারা তাকিয়ে থাকে।
চোখ ভিজে আসে।
মাহাদ খুব নিচু গলায় বলে—
ঃ- কানাডায়…এভাবেই কি ওরা খেলতো?..?..
কিয়ারা মাথা নাড়ে।
ঃ- হ্যাঁ। কিন্তু সেখানে…আমি একা ছিলাম। তাই ওদের নিয়ে খুব কমই বের হতাম।
মাহাদ আর কিছু বলে না।
শুধু পাশে বসে পড়ে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
দুষ্টু মাহিরা দৌড়ে এসে বলে—
ঃ- বাবা! তুমি দেখোনি আমি কত দূর দৌড়ে এসেছি!..
এইযে কথার মধ্যে প্রথম শব্দটাই “বাবা” এটা শুনলেই মাহাদের কলিজা শীতল হয়ে আসে।
মাহাদের শরীরে শীতল হাওয়া বয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে ও আবার শান্ত হয়ে আসে। যখনই বাচ্চারা বাবা বলে ডাকে, মাহাদের তখনই মাহিরানের কথা মনে পড়ে। আর তখন অদেখা মৃত সন্তানের জন্য ওর কলিজা টা জ্বলে পুড়ে যায়।
মাহাদ বাচ্চাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে—
ঃ- আচ্ছা, এবার বাবা দেখছি।
আরও দূরে দৌড়ে দেখাও, কিন্তু সাবধান!.. আবার পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেওনা যেন। তাহলে কিন্তু মাম্মা খুব বকবে।
বাচ্চারা খুশিতে চেঁচিয়ে ওঠে। ওরা মোটে বাবা কে কাছেই পায় না। তবে যখন পায়, তখন বাচ্চাদের সকল ধ্যান জ্ঞান বাবার দিকেই থাকে।
কিয়ারা তাকিয়ে থাকে চুপচাপ। ও তাকিয়ে দেখতে থাকে বাচ্চাদের সাথে দুষ্টুমি করতে থাকা একজন আদর্শবান বাবা কে।
এই মুহূর্তে কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো হিসাব নেই।
শুধু—
একজন পুরুষ, একজন নারী,
আর তাদের দুইটা ছোট প্রাণ—
যারা জানে না, কত যুদ্ধ পেরিয়ে তাদের মাম্মা বাবা একসাথে দাঁড়িয়ে আছে।
ওদের ঘুরাফেরা করতে করতেই সূর্য ডুবে যায়। আস্তে আস্তে ধরণীতে রাত নেমে আসে।
মাহাদ আইসক্রিম কিনে আনে।
সবাই একসাথে খায়।
কিয়ারার হাতে আইসক্রিম গলে পড়ে।
মাহাদ ন্যাপকিন এগিয়ে দেয়—
কোনো কথা ছাড়াই।
এই ছোট ছোট কাজেই
একটা ভাঙা সম্পর্ক
আস্তে আস্তে শ্বাস নিতে শেখে। এবার ভালোবাসা টা হয়তো বেশ পাকাপোক্ত হবে। যেন কোনো বাধাই সেটা ভাঙ্গতে বা কমাতে না পারে।
— — —
গাড়িটা যখন খান ম্যানশনের ভেতরে ঢোকে, তখন চারপাশে নীরবতা।
দিনের কোলাহল অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে।
বাচ্চারা আধঘুমে ঢুলছে।
একজন কিয়ারার কাঁধে মাথা রেখেছে,
আরেকজন মাহাদের কোলে—অজান্তেই।
গাড়ি থামতেই মাহাদ নড়ে না।
কিয়ারা ফিসফিস করে বলে..
ঃ- দু'জনেই ঘুমিয়ে পড়েছে…।
মাহাদ নিচু স্বরে বলে,
ঃ- থাক, তাহলে আর ওদের জাগানোর দরকার নেই। আমি ওদের রুমে নিয়ে যাচ্ছি।
এই আমি শব্দটা কিয়ারার বুকের ভেতর কোথাও যেন খোঁচা দেয়।
মাহাদ মিরান কে কোলে তুলে নেয়।
হালকা আলোতে তার মুখটা নরম দেখায়—
রাগী নয়, কঠিন নয়,
শুধু… ক্লান্ত এক বাবা।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে সোজা সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে এলো। আর তারপর নিজেদের রুমে ঢুকে বাচ্চাদের ঘরে যায়।
বিছানায় শুইয়ে দিতে গিয়ে বাচ্চাটা ঘুমের ঘোরে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে মাহাদের শার্ট।
ঃ- যেও না বাবা…।
মাহাদ স্থির হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে বলে—
ঃ- বাবা কোথাও যাচ্ছি না। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও।
কিয়ারা দরজায় দাঁড়িয়ে সবটা দেখে।
চোখ নামিয়ে ফেলে।
মাহাদ কম্বলের কোণ ঠিক করে দেয়।
কপালে আলতো হাত বুলিয়ে দেয়—
খুব সাবধানে, যেন বাচ্চাদের ঘুম না ভেঙে যায়।
দুজনেই গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়লে ঘরের আলো নিভিয়ে দরজা টেনে দেয়।
নিজেদের রুমে ঢুকেই কিয়ারা চুপচাপ বিছানার একপাশে বসে পড়ে।
আজ কথা বলার শক্তি নেই।
মাহাদ আলমারি খুলে ঘড়ি খুলে রাখে। টাই খুলে রাখে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মাহাদ হঠাৎ বলে—
ঃ- আজ…বাচ্চারা হাসছিল। ওরা ঘুরতে খুব ভালোবাসে , তাইনা?!..
কিয়ারা মাথা নাড়ে।
ঃ- হ্যাঁ।
মাহাদ গলা নামিয়ে আনে—
ঃ- আমি সেটা মিস করেছি, কিয়ারা। আর তুমি তো বলোনি যে ওরা ঘুরতে খুব ভালোবাসে।
এই কথাটা যেন ভীষণ ভারী।
এতোটাই ভারী যে কিয়ারা এটার ভার সহ্য করতে পারলো না। ওর চোখ দুটো মুহূর্তেই ভিজে উঠলো।
কিয়ারা তাকায় না।
শুধু বলে—
ঃ- সবকিছুই তো মিস করেছেন। আর আপনার সময় হয়না, তাই বাচ্চাদের ঘোরার কথা বলিনি।
মাহাদ আর তর্ক করে না।
ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়ে—
কিয়ারার দিকেই মুখ করে।
কিয়ারা আলো নিভিয়ে দেয়।
অন্ধকারে দুজনের শ্বাসের শব্দ আলাদা আলাদা,
কিন্তু একই ঘরে। আর একই বিছানায়, মাহাদ এগিয়ে গিয়ে প্রায় ছয় বছর পর কিয়ারার বুকে মুখ গুজে শুয়ে পড়লো। ওর চোখ দুটো লাল হয়ে গিয়েছে, ও কতকিছুই না মিস্ করে ফেলেছে।
কিছুক্ষণ পর—
মাহাদের হাত অজান্তেই কিয়ারা কে চারপাশে থেকে পেঁচিয়ে ধরল।
কিয়ারা নড়ে না, আর হাতটাও সরায় না। এইটুকুই আজকের অগ্রগতি।
তবে এতো বছরের দূরত্বের পর এটাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে , ওদের ক্ষেত্রে এটাই অনেক। তাই কিয়ারাও ধীরে ধীরে লোকটাকে পরম আবেশে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। আর এতেই যেন ওর বুকে মুখ গুজে পড়ে থাকা মাহাদের ঠোঁটের কোণে হাঁসি ফুটে উঠেছে।
#পর্বঃ- ৪৬
--- --- ---
রাত অনেকটা পেরিয়ে গেছে।
খান ম্যানশনের করিডোরে আলো কম, ঘুমন্ত বাড়ির ভেতর শুধু এসির মৃদু শব্দ।
বাচ্চাদের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিয়ারা আরও একবার শোনে—
দুইটা নিঃশ্বাস।
সমান।
নিরাপদ।
এই নিঃশ্বাসগুলোর জন্যই সে ফিরে এসেছে। এই নিঃশ্বাসগুলোর জন্যই সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে।
নিজের ঘরে ঢোকার আগে
এক মুহূর্ত থেমে যায়।
ভয় হয়।
ভেতরে যদি মাহাদের চোখে এখনো শুধু অভিযোগ থাকে?..?..
তবু দরজা খুলে ফেলে।
মাহাদ জানালার পাশে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কাঁধ দুটো অস্বাভাবিকভাবে শক্ত।
এই মানুষটাই একদিন
তার পৃথিবী ছিল।
এই মানুষটাই আবার
তার সবচেয়ে বড় ভয়।
কিয়ারা খুব ধীরে বলে—
“মাহাদ…”
নামটা শুনেই
মাহাদের শ্বাস আটকে যায়।
সে ঘুরে তাকায় না।
কারণ জানে, তাকালে ভেঙে পড়বে।
কিয়ারা কাছে আসে।
একদম কাছে।
তবু ছোঁয় না।
ঃ- আমি জানি,
তার গলা কাঁপে,
তোমার রাগের অধিকার ছিল।
কিন্তু আমি… আমি একা ছিলাম। আর…আর সবকিছু তখন আমার বিপরীতে ছিল। আমি এতো কিছুর মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
মাহাদের মুঠো শক্ত হয়।
ঃ- একটা সন্তানের মৃত্যু,
সে চাপা গলায় বলে,
আমি বাবা হয়েও জানলাম পাঁচ বছর পরে।
কিয়ারার চোখ বেয়ে জল পড়ে।
সে কিছু লুকোয় না।
ঃ- আমি প্রতিদিন ওর জন্য কাঁদতাম।
সে ফিসফিস করে,
কিন্তু তখন আপনাকে বলার মতো সাহস বা সুযোগ পাইনি। আর এখানে এসে আমি আর কিছু হারানোর সাহস পাইনি। তবুও আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আপনাকে বলে দিবো। কিন্তু তার আগেই আপনি সবকিছু জেনে ফেলেছেন।
এইবার মাহাদ ঘুরে তাকায়।
চোখে আগের সেই আগুন নেই।
শুধু গভীর ক্লান্তি।
সে ধীরে কিয়ারার সামনে দাঁড়ায়।
দুজনের মাঝখানে
শূন্যতা।
ঃ- তুমি কি জানো, আমি এই পাঁচ বছরে নিজেকে মানুষ ভাবতে শিখিনি।
কারণ আমি জানতাম না, আমি বাবা। আমি সবসময় ভেবেছি তুমি আমার সন্তান কে মেরে ফেলছো। আমি যখনই কোন বাচ্চা কে দেখতাম, আমার কলিজা টা তখন ফেঁটে যেতো।
এই শব্দটা, বাবা!.. এই কথাগুলো যেন ঘরের বাতাস বদলে দেয়।
কিয়ারা ভেঙে পড়ে।
সে আর শক্ত থাকতে পারে না।
মাহাদ হাত বাড়ায়, এইবার আর থামে না। কিয়ারার কপালটা এসে ঠেকে
তার বুকের মাঝখানে।
দুজনেই কাঁদে, চুপচাপ। নিঃশব্দে।
এটা কোনো ন্যাকা কান্না নয়।
এটা হারানো সময়ের কান্না। দুজন মা বাবা তাদের সন্তান হারোনোর ব্যাথায় কান্না করছে।
এর বেশ কিছুক্ষন পরে যখন তারা দুজনেই বিছানায় শুয়ে আছে।
দূরে দূরে না, কাছাকাছিই আছে।
মাহাদের হাতটা কিয়ারার পিঠে রাখা আছে, চেপে ধরা নয়।
কিয়ারা ফিসফিস করে—
ঃ- আমি এখনো ভয় পাই, মাহাদ।
মাহাদ চোখ বন্ধ রেখেই বলে—
ঃ- আমিও।
একটু থেমে যোগ করে—
ঃ- কিন্তু আজকে আমি পালাবো না। আমি আর কখনো তোমাদের কে ছেড়ে কোথাও যাবো না।
কিয়ারা ধীরে তার দিকে ফিরে তাকায়। এই মানুষটার চোখে আজ আর অহংকার নেই। শুধুই ভালবাসা, আর যত্ন। কিয়ারা নিশ্চিত হয়ে মাথা রাখে মাহাদের বুকে।
— — —
আজকের ভোরটা যেন আলাদাভাবে হলো। সূর্যের আলো ঢোকে ঘরে,
কিন্তু কেউ তাড়াতাড়ি উঠে না।
মাহাদ প্রথম জেগে উঠে। আর তারপর
পাশে তাকিয়ে কিয়ারাকে দেখে।
এইবার সে নিশ্চিত—
এটা ভালোবাসার সম্পর্ক!..
এটা আদর, যত্ন, বিশ্বাস দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এবার থেকে আর কোনো ভুল নয়।
সে খুব আস্তে বলে—
ঃ- আজ থেকে আমরা চেষ্টা করবো।
সব ঠিক করার… আর একসাথে থাকার।
কিয়ারা চোখ খুলে তাকায়।
ও মুচকি হেসে হালকা মাথা নাড়ে।
কিছু সম্পর্ক শুধু ভালোবাসায় টেকে না। টেকে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে।
কিছুক্ষণ পরে বাচ্চাদের আওয়াজ শোনা গেল। মাহাদ উঠে ফ্রেশ হতে গেল, আর কিয়ারা বাচ্চাদের রুমে ঢুকে গেল। তারপর বাচ্চাদের নিয়ে ফ্রেশ করিয়ে দিল।
প্রতিদিনের মতোই সকালের নাস্তা করে যে যার মতো নিজেদের কাজে চলে গেল। মাহাদ একটু আগেই বেরিয়ে গিয়েছে, তবে আজকে একটু আলাদা ছিল, আর সেটা হলো মাহাদ যাওয়ার আগে বাচ্চাদের সাথে সাথে কিয়ারা কেও আদর করে বলে গিয়েছে। আর যেকোনো প্রয়োজনে ওকে যখন তখন ফোন দিতে বলেছে। কিয়ারা এতেই ভীষণ খুশি হয়েছে, অবশেষে ওদের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
— —
কিয়ারা তড়িঘড়ি করে বাচ্চাদের নিয়ে তৈরি হয়েছে। বাসা থেকে ফোন এসেছে যে কিয়ান ভাইয়া কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। কিয়ারা আশ্চর্য হয়ে কতক্ষন দাঁড়িয়ে রইল। ওর ভাই যে পরিমাণ গম্ভীর, তাতে সে যে এমন একটা কাজ করতে পারে, এটা যেন কিয়ারার বিশ্বাসই হচ্ছে না।
ও বাচ্চাদের নিয়ে নীচে এসে দাদী কে বলে বেরিয়ে এলো। তারপর বাড়ির একটা গাড়ি নিয়ে সোজা উত্তরার দিকে রওনা দিল। রাস্তায় আসতে আসতে মাহাদ কে বেশ কয়েক বার ফোন করলো, কিন্তু লোকটা রিসিভ’ই করলো না।
কিয়ারা প্রায় কয়েক ঘণ্টা পর বাবার বাড়িতে পৌঁছে গেল। ড্রাইভার ওদের পৌঁছে দিয়েই আবার ফিরে গিয়েছে। কিয়ারা বাড়িতে ঢুকতেই মিরান ও মাহিরা দৌড়ে গিয়ে কিরণ কে জড়িয়ে ধরলো। কিরণ ওদের নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল।
ঃ- কিরে?.. কি হয়েছে??.. আমি যা শুনলাম সেটা কি ঠিক?..
কিয়ারা ড্রইং রুমের সোফায় বসে থাকা বাকিদের কে জিজ্ঞেস করল।
ঃ- হ্যাঁ, প্রথমে আমরাও বেশ চমকে গিয়েছিলাম। পরে জানতে পারলাম আসল কাহিনী।
নামিরা মিটি মিটি হেঁসে বলে উঠলো। এদিকে মারিসা ওদের এমন দুষ্টু হাসি দেখে বেশ লজ্জা পাচ্ছে। ইস্ মেয়েগুলো ভীষণ পাঁজি তো।
ঃ- কিয়ান ভাইয়া যদিও এভাবে বিয়ে করতে চায়নি। কিন্তু আমাদের ভাবির নাকি ড্রিম ছিল একা একা প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করার। কিন্তু বেচারির প্রেমটা তো আর সেভাবে করা হলো না। তাই ভাইয়া কে চেপে ধরে একারাই বিয়েটা করে নিয়েছে।
কিরণ এক নিঃশ্বাসে বলে উঠলো। কিয়ারা সবকিছু শুনে কিয়ারাও মিটি মিটি হাসছে। এমন অদ্ভুত ড্রিম কারো হতে পারে?..
ঃ- কি হয়েছে, তোমরা সবাই এমন করে হাসছো কেন?..?.
মারিসার কথায় এবার সবাই বেশ জোরেই হেসে ফেললো। মারিসা লজ্জা পেয়ে ওখান থেকে উঠে চলে গেল।
ঃ- আচ্ছা তুই তো ফ্রেশ হলি না, যা গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। বাচ্চাদের আমি ফ্রেশ করিয়ে দিচ্ছি। তারপর সবাই একসাথে দুপুরের খাবার খাবো।
কিরণের কথায় কিয়ারা খুশি হয়ে উপরে চলে গেল। তারপর গোসল করে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলো ওর ফোন বাজছে। কিয়ারা ফোনটা রিসিভ করতেই..
ঃ- কখন থেকে ফোন দিচ্ছি?!..?.. কোথায় ছিলে?..
ঃ- আমি তো গোসল করতে গিয়েছিলাম। আর আমিও তো আপনাকে কতগুলো ফোন
করেছিলাম।
কিয়ারা আমতা আমতা করে বলে উঠলো। ওপাশ থেকে কোনো সাড়া শব্দ এলো না।
ঃ- বাচ্চারা কোথায়?.. কি করছে?.. আর তুমি এতো বার ফোন দিয়েছিলে কিসের জন্য?.. মানে জরুরী কিছু?..
ঃ- আমি আসলে বাসায় এসেছি। মানে আপনাকে বলার জন্যই ফোন করেছিলাম। কিন্তু আপনি তো…
ঃ- কখন গিয়েছো?.. বাড়ির গাড়িতে গিয়েছো?.. বাচ্চাদের কোনো সমস্যা হয়নি তো?..
কিয়ারা চিন্তিত হয়ে পড়ল। লোকটা যে ওকে কিছুই বললো না। কি ব্যাপার?!...
ঃ- আব.. মানে আপনি যে কিছু বলছেন না। আপনাকে না বলেই এসে পড়েছি।
কিয়ারা মিটি মিটি হেঁসে বলে উঠলো। ওদিকে মাহাদের কুঁচকানো ভ্রু আরও কুঁচকে গেল।
ঃ- আশ্চর্য!.. তোমার বাবার বাড়ি, তোমার ইচ্ছে হয়েছে তুমি গিয়েছো। এখানে আমি কি বলবো?..?.. মানে তুমি কি শুনতে চাইছো?..?..
ঃ- না.. না কিছু না। আমি ভেবেছিলাম আপনি রাগ করবেন।
আসলে ভাইয়া বিয়ে করে ফেলেছে। সেজন্য বাড়ি থেকে ফোন দেওয়ায় আমি তড়িঘড়ি করে চলে এসেছি।
ঃ- হুমম, আমাকে আগেই শশুর মশাই জানিয়েছেন। আর আমি তখন মিটিং এ ব্যাস্ত ছিলাম, তাই তোমার ফোন ধরতে পারিনি।
আচ্ছা গিয়েছো ভালো কথা, রাতে আমি গিয়ে যেন বাসায় পাই।
কিয়ারা এই কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল। আবার ভালোও লাগছে যে লোকটা ওকে মিস করবে।
ঃ- কিন্তু আমি তো এই একটু আগেই এসে পৌঁছেছি। আবার আজকেই কিভাবে ফিরে যাবো?.. কালকে যাই?.. এখন আজকে আবার জার্নি করলে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
মাহাদ ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু ভাবলো। তারপর বললো…
ঃ- আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি কালকেই এসো। এখন রাখছি, পরে ফ্রি হয়ে আবার ফোন করবো।
এই বলে কলটা কেটে দিল। কিয়ারা ভাবলো লোকটা কী রাগ করেছে?.. তারপর এই চিন্তা বাদ দিয়ে দিল। রাগ করলে তার রাগ ভাঙানোর টনিক কিয়ারার জানা আছে।
কিয়ারা হাতে পায়ে লোশন লাগিয়ে ওড়না টা ঠিক করে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। বাচ্চারা কিরণের ঘরে রয়েছে, কিয়ারাও কিরণের ঘরেই গেল।
ঃ- এসেছিস অবশেষে, তাড়াতাড়ি নীচে চল। বাকিরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
এই বলে কিরণ বাচ্চাদের নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। কিয়ারাও ওদের পিছন পিছন নীচে নেমে আসলো। আজকে বাড়িতে ইলিশ মাছের ঘ্রাণে খাবারের খিদে যেন বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। কিয়ারা বাচ্চাদের রেখেই লাফিয়ে গিয়ে টেবিলে বসে পড়ল।
ঃ- আম্মু, আজকে ইলিশ মাছ রান্না হয়েছে?.. আহা ঘ্রাণেই খিদে বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আমাকে তাড়াতাড়ি দেও, খেয়ে দেখি।
কিয়ারার মা মেয়ে কে এতোটা হাসিখুশি দেখে মনে অনেক শান্তি পেলেন। মেয়ের খুশি দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে কিয়ারা শশুরবাড়িতে কতটা সুখি রয়েছে। বাকিরাও অনেক দিন পর কিয়ারার এমন চঞ্চলতা দেখে ভীষণ খুশি হয়েছে।
ঃ- কিরে কিরা, তুই বাচ্চাদের রেখেই আগে আগে খেতে বসে পড়লি।
কিরণের কথায় বাকিরা হেসে উঠলো। আর কিয়ারা জিভে কামড় দিয়ে লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিল। তারপর সবাই একে একে খাবার খেতে শুরু করলো।
কিয়ানের সাথে যেহেতু আগে থেকেই মারিসার বিয়ের এনাউসমেন করা ছিল, তাই এই বিয়েটা নিয়ে কারো কোনো সমস্যা হয়নি। যদিও কিয়ারার বাবা একটু রেগে আছেন। কিন্তু কিয়ান সবটা সবাইকে বুঝিয়ে বলেছে। আর পড়ে মারিসা কেও বকাঝকা করেছে।
ঃ- আচ্ছা আমরা কিরণের জন্য পাত্র দেখেছি। আর ছেলে আমাদের সবারই পছন্দ হয়েছে। তাই আমরা এবার এই শুভ কাজ টা তাড়াতাড়ি সেড়ে ফেলতে চাইছি। তোমরা সবাই কি বলো??...
নামির চৌধুরী সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন। মেয়েরা সবাই কিরণের দিকে তাকালো। কিরণ লজ্জা পেয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঃ- কিরণের যদি সম্মতি থাকে, তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।
যেহেতু বোনেদের মধ্যে সবার বড় কায়রা। তাই ও খুব সাবলীল ভাবে বলে উঠলো। আর বাকিরাও ওর কথায় সম্মতি জানালো।
তারপর খাবার খেয়ে যে যার মতো রেস্ট নিতে চলে গেল। এখন ডাইনিং টেবিলে কেবল মাত্র বোনেরা উপস্থিত আছে। আর ওদের সাথে আলিশা, মারিসা ও সাবিহা তিন জা’য়েরাও রয়েছে।
ঃ- তারপর বল, তোর অনুভূতি কেমন?.. আমাকে তো কিছুই জানালি না। চাচ্চু না বললে তো জানতেই পারতাম না।
কিয়ারা কটমট করে কিরণের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো। বাকিরাও জানালো যে ওরাও আগে থেকে জানতো না।
ঃ- আরে কুল!. কুল!. আমি তো এইজন্যই তোদের জানাইনি। কারণ আমি তোমাদের কে যেভাবে জ্বালিয়েছি, তোমরাও আমার থেকে সেগুলোর সোধ তুলবে। এখন আমি যাই রাহুল ফোন করবেন। টাটাহ বোনু গনস!..
কিয়ারা একটু চমকে উঠলো। রাহুল মানে?.. কোন রাহুল??..
ঃ- হ্যাঁ তুই যা ভাবছিস সেটাই। মাহাদ জিজুর সঙ্গে যে সবসময় ছায়ার মতো লেগে থাকে, ওটাই আমাদের নতুন জিজু হতে চলেছে।
আলিশার কথা শুনে কিয়ারা খানিকটা হকচকিয়ে গেল। মানে সেই ঘুরেফিরে সবকটা ওখানেই?..
তারপর একে একে সবাই খাবার শেষ করে নিজেদের রুমে চলে গেল। কিয়ারা এসে বাচ্চাদের নিয়ে শুয়ে পড়ল। এখন একটু ঘুমিয়ে আসরের সময় উঠে পড়বে। যদিও প্রতিদিন এটা বললেও ওর উঠতে উঠতে মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে যায়। কিয়ারা বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়লো।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ