ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (১ম খন্ড)

২২তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

পর্বঃ- ২২

🌿🌿🌿

ঘরটা নিঃশব্দ, শুধু বাতাসে মৃদু ফুলের ঘ্রাণ ভাসছে। বিছানার একপাশে বসে কায়রা, লাল শাড়ির আঁচল মুখের একপাশে ছড়িয়ে রেখেছে। নাঈম ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করে, এক পা এক পা করে এগিয়ে যায় তার জীবনের নতুন দিগন্তের দিকে।

নাঈম আলতো গলায় বলে উঠলো…

ঃ- তোমার কি ভয় লাগছে?"

কায়রা নিজ ভাবনায় এতোটাই বিভোর হয়ে ছিল যে, নাঈম ঘরে প্রবেশ করেছে সেটা ও টেরই পায়নি। ও কারো কন্ঠস্বর শুনে চমকে তাকিয়ে দেখলো নাঈম এসে দাঁড়িয়েছে ওর সামনে। কায়রা নিঃশব্দে চোখ নামিয়ে ফেলল… ।‌

ঃ- আমি… মানে… একটু। সবকিছু খুব অচেনা লাগছে।"

মৃদু কন্ঠে বলে উঠলো কায়রা।

নাঈম হালকা হেসে বিছানার পাশে এসে বসল। আর তারপর বললো…

ঃ- অচেনা হলেও তুমি একা নও, কায়রা। আমরা দুজনেই নতুন এই পথে।আর ভয় পাওয়ার একদমই কোনো দরকার নেই।

কায়রা ওর কথা শুনে বলে উঠলো…

ঃ- আপনি… মানে আপনি, রাগ করবেন না, কিন্তু এত অচেনা লাগে... আপনি তো পুরোই অপরিচিত ছিলেন আমার কাছে। এখনো… পুরোটা বুঝতে পারছি না।

নাঈম আস্তে করে কায়রার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল…

ঃ- তুমি চাইলে আমি সারাজীবন সময় দেবো—তোমার কাছে নিজেকে পরিচিত করে তুলতে। কোনো তাড়াহুড়ো নয়। শুধু একসাথে পথ চলবো, একটু একটু করে।

ওর এই কথা শুনে কায়রার চোখে জল জমে উঠেছে। ও উত্তরে বলল…

ঃ- সবাই ভাবে বিয়ে মানেই একরাশ স্বপ্নপূরণ, কিন্তু আমার ভেতরে কেমন একটা দোটানা... ভয় আর ভালো লাগার মাঝখানে আটকে আছি।

ঃ- ভালো লাগাটা যে এসেছে, এটাই তো প্রমাণ, আমরা একে অপরকে বুঝতে পারব। ভয়টাকে আস্তে আস্তে মুছে দেব। আজ শুধু আমরা কথা বলি। কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে, শুধু একে অপরকে শুনি। একে অপরকে বুঝি, একে অপরকে নিজেদের বলে জানি।

কায়রা আলতো করে হেসে বলল…

ঃ- আপনি এতটা নরম স্বভাবের হবেন ভাবিনি। বাইরে থেকে তো আপনাকে গম্ভীর, আর খুব রুক্ষ মনে হয়। বলে উঠলো কায়রা।

নাঈম কায়রার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠলো…

ঃ- বাহিরে থেকে তো আর সবাইকে চেনা যায় না।‌সবকিছু জানা যায় না, কায়রা। আমি আমার ভেতরটা শুধু তোমার জন্য রেখে দিয়েছি। আমি যেমন রুক্ষ, তার চেয়ে বেশি ভালোবাসি। আর সেটা তুমি টের পাবে ধীরে ধীরে।

কায়রা ওর এই কথা শুনে নিঃশব্দে হেসে উঠলো।

ঃ- তাহলে আমি সেই অপেক্ষায় রইলাম। আমারও সবটা জানবেন ধীরে ধীরে। কারণ আমিও সহজ নই। আমার ভিতরেও অনেক কিছু জানার আছে আপনার জন্য।

নাঈম ওর কথার্য় সায় দিয়ে বললো …

ঃ- আমিও নাহয় তোমায় ধীরে ধীরে, একটু একটু করে চিনে নেবো। একটু একটু করে পুরোটা পড়ে নেবো তোমায়। ধীরে ধীরে নাহয় বুঝে নিবো তোমার না বলা সব কথাকল্প।আজ না হোক, কাল, তুমি যদি আমার পাশে থাকো… তাহলে আমি হয়ে যেতে পারি তোমার মনের মতো করে।

কায়রা: আমিও!... মায়ের কোলে মাথা রেখে গল্প শুনে ঘুমাতাম, আজ আপনি গল্প দেবেন কিনা জানি না—তবুও আপনার ঘর, আপনার চেনা জগতে আমি যেন এক নতুন অথচ অচেনা ছায়া।

নাঈম চোখে নম্রতা নিয়ে বলে উঠল…

ঃ- না, তুমি ছায়া না... তুমি আলো হয়ে এসেছো।

(একটু থেমে) আমাকে ভয় করছো?...

কায়রা মাথা নাড়ে

ঃ- ভয় না... তবে একটু দমবন্ধ লাগছে। এত কিছু একসাথে... এত সম্পর্ক, এত নতুন মানুষ... আমি তো সব হারিয়ে ফেলছি আজ।

নাঈম কায়রার হাত ছুঁয়ে দিয়ে বললো…

ঃ- তুমি কিছু হারাওনি... তুমি পেয়েছো। আমি জানি, সময় লাগবে। আমি জোর করবো না। তোমার পাশে থাকতে চাই—তোমার মতো করে। যদি তুমি চাও তো!..

কায়রার চোখে জল চিকচিক করে উঠে

ঃ- যদি বলি, আজ শুধু একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিন?... আজ শুধু একটু গল্প শোনান—আমার ছোটবেলার মতো?...

নাঈম হাসে‌, আর বলে…

ঃ- আমি গল্প শোনাতে পারবো না, তবে আমি তোমার মাথায় হাত রাখতে পারি, যতক্ষণ না তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।

এই বলে হালকা করে ছুঁয়ে দেয় ওর কপাল। আর তারপর বলে উঠলো…

ঃ- এক যে ছিল রাজকন্যা, তার ছিল কাঁচের বুক... কেউ ছুঁলেই দাগ পড়ত। একদিন সে রাজ্য ছেড়ে চলে আসে, অচেনা এক রাজ্যে, আর সেখানে এক রাজা তাকে শুধু বুঝতে চায়... ছুঁতে নয়।

কায়রা চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল…

ঃ- সেই রাজা তাকে ভালোবাসে?...

নাঈম নরম স্বরে বলে উঠলো…

ঃ- ভালোবাসে!... কারণ তার চোখে, রাজকন্যার কষ্টের ছায়াও সবচেয়ে সুন্দর।

কায়রা একটু হাসে ।

ঃ- আমি তাহলে আজ ঘুমাতে পারবো।

নাঈম তার কপালে চুমু দিয়ে বলে উঠলো…

ঃ- ঘুমাও, কায়রা। স্বপ্নে দেখা হবে!…

কায়রা নাঈমের কাঁধে মাথা রেখে বলল…

ঃ- নাহ!.. এই রাতটা আমি শুধু মনে রাখতে চাই, কোনো ভয় না রেখে, কেবল ভালোবাসার একটা শুরু হিসেবে। আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। আর তাই চাইনা আমাদের আজকের এই রাতটা এভাবে পার হয়ে যাক‌।

নাঈম তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল…

ঃ- তবে আজ রাত থেকে শুরু—তুমি আমার, আর আমি শুধু তোমার… কোনো মুখোশ ছাড়াই। আমরা সবসময়, সর্বদা একে অপরের হয়ে থাকবো।

ঘরটায় একটা নিঃশব্দ কোমলতা নেমে আসে। নতুন করে দুটো হৃদয় ধীরে ধীরে এক সুতোয় বাঁধা পড়ে। পরস্পরকে বোঝার এই যাত্রা শুরু হলো এক দৃষ্টির ছোঁয়ায়, এক শব্দহীন চুক্তিতে।

~~~

ওরা সবাই একসাথে কথা বলতে বলতে উপরে তৃতীয় তলায় উঠে এলো। ওদের সবাইকে থাকতে দেওয়া হয়েছে তৃতীয় তলায় গেস্ট রুমে। আলিশা আর নামিরা এক রুমে। তারপর আরিয়া ও আরিফা একটি রুমে এবং কিয়ারা ও কিরণ একটি রুমে। উপরে তৃতীয় তলার মাহাদ খানের পাশের তিনটি রুমে ওদের ছয় জন কে থাকতে দেওয়া হয়েছে। আর বাকি রুম গুলোতে অন্যান্য গেস্ট রা রয়েছে যারা ইতিমধ্যেই ঘুমিয়ে পরেছে। কিয়ারা যেই শুনেছে ওটা মাহাদ খানের বেডরুম। যখনই বেচারি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। তবে পরে মীরা বলল যে উনি নাকি বাড়িতে নেই। জরুরী কোনো কাজে ঢাকায় গিয়েছে।

যাক এটা শুনে কায়রা মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত হলো। মাহাদ খান ফেরার আগেই পারলে ও ওদের বাড়িতে চলে যাবে। কোনো ভাবেই ঐ নীল চোখজোড়া দেখতে চায় না ওহ । কোন ভাবেই ঐ লোকটার রাগের স্বীকার হতে চায় না। গতবারের কথা ওর এখনো মনে আছে।‌ তবে ওর কেন যেন ঐদিনের পর থেকে মনে হচ্ছে যে মাহাদ খানের সাথে ওর অচেনা অজানা স্বামীর কোনো না কোনো কানেকশন আছে।‌ কিন্তু ও এখনো নিশ্চিত ভাবে কিছু বুঝতে পারছে না। আবার ঐ গম্ভীর, বদমেজাজি তিতা করোলা কে যে জিগ্গেস করবে, তার ও কোনো উপায় নেই। এমনিতেই ওকে সবসময় অপমান করার তালে থাকে।

আর তার মধ্যে যদি এই গোপন সংবাদটা উনার কাছে ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে তো আর কোন কথাই নেই। উনি তখন ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাই কে নিজ দায়িত্বে অবগত করবেন যে ও কীভাবে সবাইকে না জানিয়ে এতবড় একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। আবার এতো দিন ধরে সেটা চুপচাপ হজম করে বসে আছে।

তাই ঐ লোকের সাথে এটা কোন ভাবেই বলা যাবে না। আর বেশি ভাবছে না ও যদিও ভূল করে দেখা হয়ে যায় তাহলে ও কোন কথাই বলবে না। একদম চুপ করে থাকবে। কথা বললেই লোকটা ওকে অপমান করার সুযোগ পেয়ে যায়।

তারপর সবাই নিজেদের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল।

মাঝরাতে কিয়ারার হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। তখন ঘড়িতে তিনটা বাজে প্রায়। কিয়ারার প্রচন্ড পানি পিপাসা পেয়েছে। ও শোয়া থেকে উঠে বিছানায় বসল। ছোট টেবিল থেকে পানির জগ টা নিয়ে দেখলো জগ খালি। এখন কি করবে?.. পানি না খেলে তো ওর এখন আর ঘুমই হবে না। আর সকাল হতেও এখনো অনেক দেরি। কিরণ ও হয়তো গভীর ঘুম পরেছে। এখন ডাকলেই একটা ঝাড়ি মারবে ওকে। কি করবে এখন ও সেটাই ভাবছে। পানি না খেলে যেহেতু এখন আর ঘুমই আসবে না, তাই ভাবলো তাহলে এখন নিচতলায় পানি আনতে যাওয়া যাক।

এই বলে কিয়ারা রুমের দরজা খুলে করিডোর দিয়ে সোজা হেঁটে সিঁড়ির কাছে চলে এলো। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলো। দোতলায় এসে দেখলো করিডোরে হালকা আলোর ডিম লাইট জ্বলছে। কিয়ারা পানির জগ হাতে নিয়ে দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচতলায় নেমে আসলো। তারপর কিচেনে ঢুকে গেল। কিচেনের লাইট অন করে দিল। তারপর কিচেনের ডানদিকের ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে জগে পানি ভরে নিল।

তারপর যেই উপরে যাওয়ার জন্য পিছনে ফিরল, ওর হঠাৎ মনে হল সিঁড়ি বেয়ে কেউ এইমাত্র উপরে উঠে গেল। কিয়ারা কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আস্তে করে সাহস নিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। কিন্তু ও তেমন কাউকেই দেখতে পেল না। তাই নিজের মনের ভূল ভেবে ভয়ে ভয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল‌। তারপর সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে তৃতীয় তলার সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো। ওর মনে হলো কেউ যেন ওকে দেখছে। কিন্তু এখন এই সময়ে, এতো রাতে কে এমন লুকোচুরি করবে। এতো রাতে তো কারো ঘর থেকে বেরোনোর কথা নয়।

তাহলে কি তেনারা কিয়ারা কে ফলো করছে?.. এটা ভাবতেই কিয়ারার গাঁয়ে কাটা দিয়ে উঠল। এবার কিয়ারা প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে। কেন যে এই অচেনা বাড়িতে, এতো রাতে একা একা ঘর থেকে বের হতে গেল। এখন ভয়টা কে পাচ্ছে?... কিয়ারা তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে এলো। তারপর করিডোর পেরিয়ে এসে ঠাস করে একটা ঘরে ঢুকে পরলো।

কিয়ারা এতোটাই ভয় পেয়েছে, যে ও ঠিক কোন রুমটায় তড়িঘড়ি করে ঢুকে গেল, সেটা একটুও খেয়াল করলো না। কিয়ারা রুমে ঢুকতেই দরজা টা অটোমেটিক ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। যেন কেউ অদৃশ্য ভাবে দরজা টা বন্ধ করে দিল। কিয়ারা যে পিছনে ফিরে দেখল, ও ভীষণ অবাক হয়ে গেল। এটা কার রুমে ঢুকেছে ওহ?... এতো সুন্দর একটা রুম!... কিয়ারার মনে হচ্ছে এটা স্বপ্নে দেখা কোন অংশ‌। ও হয়তো স্বপ্ন দেখছে।

ঘরের ভেতরের আবহ তাকে এক মুহূর্তে গ্রাস করল।

ঘরটা যেন নিঃশব্দে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

চারপাশে ছড়িয়ে আছে ওউধ, স্যান্ডালউড পুরুষালি পারফিউম, আর হালকা ধোঁয়ার গন্ধ। বাতাস ভারী, অভিজাত, কিন্তু গা ছমছমে।

একটা অ্যাম্বার শেডেড ঝাড়বাতি ছড়িয়ে দিচ্ছে ম্লান আলো। আলোটা চোখে লাগে না, কিন্তু হৃদয় কাঁপিয়ে তোলে।

ঘরের একদম মাঝখানে

বিশাল এক রাজকীয় বিছানা—কালো ওক কাঠের ফ্রেম, মাথার দিকে গাঢ় চামড়ায় মোড়ানো হেডবোর্ড, আর তাতে খোদাই করে রাখা সোনালি একটি ইংরেজি অক্ষর: ‘M’।

চারপাশে ভারী মখমলের পর্দা ঝুলছে—গাঢ় লালচে বর্গান্ডি রঙের—এমন রং যা ঘরের মালিকের ব্যাক্তিত্ব বুঝাতে সক্ষম।

বিছানায় সিল্কের নেভি ব্লু চাদর আর পেছন দিকে কুশন—সব অতিরিক্ত গোছানো, অথচ যেন কেউ সদ্য উঠেছে।

ডানদিকে রাখা একটা কালো লেদারের রিক্লাইনার—নরম, কিন্তু তার ভাঁজে চাপা কোনো ক্লান্তি লুকানো।

পাশেই মার্বেল টপের ছোট টেবিলে একগুচ্ছ সামগ্রী:

কিছু বিদেশি পারফিউমের ছোট্ট বোতল, আর আর কয়েক জোড়া সোনালি রিমের ঘড়ি। মিনিট কয়েক আগেও যেন এখানে কেউ ছিল।

ঘরের বাঁদিক জুড়ে বিশাল বুকশেলফ—কালো কাঠের, শেলফ জুড়ে চামড়ার বাঁধাই করা বই সামগ্রী।

তার নিচে কয়েকটা ড্রয়ার—তালাবদ্ধ।

এক কোণে কয়েকটা ফটো ফ্রেম, কিন্তু সবগুলোই ফাঁকা। বা হয়তো এমন যা কিয়ারা ছুঁতেই পারছে নাহ।

শুধু একটা ফ্রেমে একটা খুব সুন্দর পেইন্টিং — সুন্দর এক জোড়া চোখের পেইন্টিং। চোখজোড়া কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে কিয়ারার কাছে। কিয়ারা থমকে যায়।‌

জানালার পাশের অংশে একটা এল-শেপ বেঞ্চ বসানো—মাখন রঙা কুশনে ঢাকা। সামনে ভারী পর্দা, জানালা ঢাকা, বাইরের আলো ঢোকে না।

আশপাশের নীরবতা এত ঘন যে মনে হয়, এখানে সময়টা আটকে আছে।

এক কোণে রাখা ফ্লোর লেংথ আয়না। গাঢ় সোনালি কার্ভ ফ্রেমে বাঁধানো।

কিয়ারা নিজের ছায়া দেখে, কিন্তু তার চোখে ভয় জমে। কারণ আয়নায় তার পাশে কার ছায়া পড়ে সেটা বুঝতে পারে না।

ড্রেসিং টেবিলের ঠিক পাশেই দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা ম্যাট ব্ল্যাক মিনি ফ্রিজ। বাইরে থেকে দেখে সেটা ফ্রিজ বলে বোঝাই যায় না।

ফ্রিজের কাচের দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাসের ধাক্কা লাগে কিয়ারার মুখে।

ভেতরে সাজানো কয়েক বোতল বিদেশি মিনারেল ওয়াটার,

ক্যান কফির তিনটি রকম, কিছু ডার্ক চকোলেটের বার,

আর এক কোণে ছোট্ট সাদা কাচের একটি প্যাকেট, যেটার লেবেল নেই। কিয়ারা বুঝতে পারলো না যে ওটা ঠিক কী…

নিচে আছে একটা ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রটেক্টেড ড্রয়ার—

সেটা যেন বলছে: “এই জিনিস তোমার দেখার নয়।”

ও ঠাস করে ফ্রিজের দরজা টা বন্ধ করে দিল। এই ফ্রিজে ওর পছন্দের কোনো কিছুই নেই। যেটার জন্য এই ফ্রিজটি ওর একটুও পছন্দ হয়নি।

সবচেয়ে শেষ কোণে রাখা ওয়ার্ক ডেস্ক। মার্বেল টপ, সুশৃঙ্খল।

একপাশে স্কেচপ্যাড, সরকারি কাগজপত্র, ফাইল, আর পাতলা একটি ল্যাপটপ।

ড্রয়ার অল্প খুলতেই কিয়ারা দেখতে পায় একটি কালো চামড়ার কেস—মাঝে সিলভার হুক, এবং গায়ে ছোট করে খোদাই করা নম্বর: .45

তার কাঁধে যেন ঠান্ডা শিরশিরে একটা ছায়া ছুঁয়ে যায়—রিভলভার?...

এই লোক খুনখারাবিও করে নাকি?...

কিয়ারা রিভলবার দেখে আরো ভয় পেয়ে যায়। এখন থেকে ওকে আরো সাবধানে থাকতে হবে এই লোকের থেকে।

ঘরের শেষ দেয়ালে ঝুলছে একটি ডিজাইনার দেওয়াল ঘড়ি—চুপচাপ, শুধু সময় গুনে চলেছে।

আর ঠিক তার নিচে রাখা আছে একটি ধুলোমাখা লকড ট্রাঙ্ক। সেটা থেকে কিয়ারা চোখ ফেরাতে চায়, পারে না। ওর মনে সন্দেহ জাগে যে এটায় কী আছে।

লোকটার ঘরেই এতো রহস্য তাহলে তার নিজের মধ্যে না জানি কত রহস্য লুকিয়ে আছে।

এই ঘর কোনো সাধারণ ছেলের নয়। এটা এক মন্ত্রীর পুত্রের ব্যক্তিগত দুর্গ।

এটা এক পুরুষের গোপন জগত—

যে বাইরের জগতে মুখোশ পরে চলে, আর এখানে সবকিছু খুলে রাখে… নিজের মতো করে।

তবে যাই হোক, কিয়ারার কাছে এই ঘরটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এই গম্ভীর তিতা করোলা নিজের ঘরটা এতো সুন্দর করে সাজিয়েছে।

উফফফ ওর তো এখানেই থেকে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এটা তো ভূলেও করা যাবে না। ঐ লোকটা এখন বাড়িতে উপস্থিত নেই বিধায় ও এখানে এই ঘরে ঢুকতে পেরেছে। আর এই ঘরে ঢুকতে যে পেরেছে, সেটাই অনেক বাবাহ। ও তো হরিণ হয়ে হিংস্র বাঘের গুহায় ঢুকে বসে আছে। যা দেখেছে এই ওর জন্য অনেক। লোকটা যদি কোন রকমে টের পেয়ে যায়,যে কেউ তার কামরায় ঢুকেছে। তারউপর আবার সেই মানুষটি ও তাহলে আর রক্ষে নেই।

তাই যতো দ্রুত সম্ভব এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। এই ভেবেই কিয়ারা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ঘরটা নীরব।‌অস্বস্তিকর, ভারী এক নিস্তব্ধতা যেন মূহুর্তেই ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে।

কিয়ারা ধীরে পেছন ফিরে আসে। বেরিয়ে যাবে ঠিক তখনই—

ক্লিক। দরজার ল্যাচ ঘুরলো। মুহূর্তের মধ্যে সময় থেমে গেল।

দরজা খুলে ভিতরে ঢোকে মাহাদ।

কালো শার্ট, হাতা গুটানো, চোখে হালকা ক্লান্তি... কিন্তু মুখে তার চিরচেনা জমানো অভিব্যক্তি নেই। চোখদুটো ঠাণ্ডা। খুব ঠাণ্ডা।

তার চোখ সরাসরি গিয়ে ঠেকে কিয়ারার চোখে। একটা চুপচাপ তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে ঘরে। একটু হিমশীতল, একটু ধ্বংসাত্মক।

ঃ- তুমি এখানে কী করছ?..—

মাহাদের কণ্ঠ নিচু, ধীরে উচ্চারিত। কিন্তু প্রতিটি শব্দ ছুরি ছুরির মতো শোনায়।

কিয়ারা উত্তর দিতে চায়, গলা শুকিয়ে গেছে। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়‌। প্রবাদ বাক্যটা যেন ওর সাথে একদম মিলে গেল এই মুহূর্তে। এখন কী হবে?.. লোকটার কাছে তো রিভলবার ও আছে। যদি ওর উপর রেগেমেগে সুট করে দেয়?.. কিয়ারা ভয়ে ভয়ে বলে উঠলো…

ঃ- দরজা খোলা ছিল... আমি…

ঃ- তাই ভেতরে ঢুকে পড়লে?...‌ এত সহজ ছিল আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে সব ঘাঁটাঘাঁটি করা?...

তার গলার নিচে যেন বিষ মেশানো। কিয়ারা এখন আরো ভয় পাচ্ছে। রীতিমত ওর হাত পা কাঁপছে।

মাহাদ সেটা দেখে। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি।

কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই—ছিল তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ।

ঃ- তোমার মতো মেয়েরা ভাবে, আমাদের মতো ছেলেরা অনুভব করে না, তাই না?”

“কিন্তু এই ঘরের প্রতিটা জিনিস আমি চোখ বন্ধ করেও চিনে নিতে পারি। কার স্পর্শ লেগেছে, কোথায় কৌতূহল থেমে গেছে—সব। তুমি জানো না আমি ঠিক কতটা খেয়াল রাখি।”

মাহাদ এক পা এক পা করে এগিয়ে আসে কিয়ারার দিকে।

মেঝেতে তার জুতোয় চাপা পড়ে, কিয়ারা চমকে উঠে যায়।

মাহাদের চোখ সরে না তার ওপর থেকে।

ঃ- “তুমি কি সত্যিই জানতে চাও... এই ঘরের সবকিছু?”

“তবে এসো,”

“তোমাকে আমি সব দেখাবো—কিন্তু আমার মতো করে।”

তার কণ্ঠ এবার নরম, কিন্তু ভয়ংকর। কন্ঠে তীব্র অধিকারবোধ সুস্পষ্ট।

কিয়ারা বুঝতে পারলো —সে ভুল জায়গায় ঢুকে পড়েছে। শুধু একজন ছেলের ঘরে না… একটা মনস্তত্ত্বের বনের গভীরে ঢুকে গেছে, যেখানে শিকারী কখনো দ্বিধা করে না।

মাহাদ কিয়ারার হাত ধরে টেনে এনে বুকের উপর ফেললো। তারপর এক হাতে ওর কোমড়টা পেঁচিয়ে ধরে বললো…

ঃ- আগে আমার সম্পর্কে জানতে হবে। তারপর নাহয় আমার বাড়িঘর। আমি কে ?... আমি কেমন?...

তারপর কিয়ারার কোমড়টা জোরে চেপে ধরল আর বলল…

ঃ- কোনটা আমার পছন্দ?.. কোনটি আমার অপছন্দ?.. কোনটাতে আমি প্রচন্ড রেগে যাই?.. কোনটাতে আমি প্রচন্ড শান্তি পাই?... এগুলো সব জানতে হবে তো ..

কিয়ারা ধাক্কা মেরে মাহাদ কে নিজের থেকে সরিয়ে দিল।

ঃ- দূরে সরুন আমার থেকে। আপনার মতো লোকের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। থাকতে পারে না। হ্যাঁ আছে বোনের সুবাদে আমাদের মধ্যে বেয়াই বেয়াইনের সম্পর্ক। আর সেটা এতোটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো সম্পর্ক নয়। যে আমাকে আপনার সবকিছু জানতে হবে।

আর এভাবে যখন তখন চেপে ধরার মানে কি?.. আমার ছোঁয়ার কোনো অধিকার নেই আপনার। আমি জানি যে যারা রাজনীতি করে তাদের চরিত্র বেশি সুবিধার নয়। তাই বলে সেটা আমার কাছে ফলাতে আসবেন না দয়া করে। আবার এমন কিছু হলে আমি কিন্তু আপনার এই আচারণ বড়দের জানাতে বাধ্য হবো। বারবার আমি এভাবে আপনাকে সহ্য করবো না।

কিয়ারার কথা শুনে মাহাদ প্রচন্ড গম্ভীর হয়ে গেল।

ঃ- আমি বুঝি ভয় পাচ্ছি!.. যে আপনি বড়দের বলে দিবেন। আর আমি ছুঁলেই আপনার মত সমস্যা। অন্য পরপুরুষের ছোঁয়ায় আপনার কোনো সমস্যা নেই। তাইনা?..সম্পূর্ণ অধিকার থাকা সত্ত্বেও আমি তোকে ছুঁতে পারবো না, কিন্তু অন্য পরপুরুষ ছুঁলে তখন তোর কোনো সমস্যা নেই।

দাঁত কিরমিরিয়ে বলে উঠলো মাহাদ।

ঃ- আশ্চর্য তো!... আপনি বারবার সেই একই কথা বলে যাচ্ছেন। কে আমাকে ছুঁয়েছে। কোন পরপুরুষ?... আর আমার উপর আপনার অধিকার আছে বলতে কী বোঝাতে চাইছেন আপনি ?....

ঃ- ওওও এখন তাহলে তোর ফুফাতো ভাই পরপুরুষ নয়?.. আপন পুরুষ?... বল বল কেমন আপন?..

কিয়ারার চোয়াল চেপে ধরে বলল মাহাদ।

ঃ- উফ্ লাগছে আমার!.. ছাড়ুন আমাকে।

নিজের চোয়াল থেকে মাহাদ এর হাত সরাতে সরাতে বলে উঠলো কিয়ারা।

ঃ- বারবার কিসের অধিকার এর কথা বলছেন আপনি?.?... স্পষ্ট করে বলেছেন না কেন?..

মাহাদ কিয়ারার এই কথা শুনে এবার প্রচন্ড রেগে গেল। ওর মনে পড়ে গেল যে, কিভাবে ওকে অসুস্থ জ্ঞানহীন অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল কিয়ারা। তাই মাহাদ প্রচন্ড রেগে গিয়ে বলল….

ঃ- আমি কেন বলবো?... যখন অসুস্থ জ্ঞানহীন অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলি তখন মনে ছিল না তোর?..?... তখন মনে ছিল না যে তোর কোন দায়িত্ব আছে।‌

কিয়ারা মাহাদের এই কথা শুনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী বলছেন এই লোকটা এসব??... উনি এগুলো কীভাবে জানবেন??... না না অসম্ভব এটা হতে পারে না। উনি?.. উনি কি তাহলে সেই মানুষটি?.. ও বিশ্বাস করতে পারছে না।

ঃ- সত্যি করে বলুন তো আমার আর আপনার মধ্যে ঠিক কী সম্পর্ক আছে??... আপনি…. আপনি এগুলো কি বলছেন?..

ঃ- আমি কোনো দায়িত্ব জ্ঞানহীন, অবাধ্য নারী কে কিচ্ছু বলতে চাইনা। আউট!.. আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া হোক।

এই বলে মাহাদ কিয়ারার হাত টেনে ঘরের বাইরে বের করে দিয়ে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল।

—চলবে—

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন