ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (১ম খন্ড)

২৩তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

পর্বঃ- ২৩

🌿 🌿 🌿

পরের দিন সকালে

আলিশা ও নামিরা আগেই ঘুম থেকে উঠে পরেছে। আলিশা আরিয়া ও আরিফা কে ডাকতে গিয়েছে। আর নামিরা কে কিরণ কিয়ারা কে ডাকতে পাঠিয়েছে। নামিরা গিয়ে দেখলো কিয়ারা আগেই উঠে ফ্রেশ হয়ে রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।

ঃ- কিরে , বাড়িতে তো তোকে দশটার আগে খুঁজেই পাওয়া যায় না। আর এখানে এতো তাড়াতাড়ি উঠে গেলি কিভাবে?... তাও আবার কারো ডাকাডাকি ছাড়াই।

রাতে ঘুমাসনি নাকি?..

ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো নামিরা।

কিয়ারা কি বলবে?.. ও তো আসলেই মাঝরাতের পর থেকে আর ঘুমোয় নি। গতকাল রাতে মাহাদ ওর ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পর, কিয়ারা রুমে এসে আর ঘুমোতেই পারে নি। বার বার ওর মাহাদের বলা কথাগুলো মনে পড়ছিল। ঐ নীল চোখের লোকটা ওকে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন??... সেটাই রুমে এসে সারারাত ধরে ভেবেছে কিয়ারা। আর লোকটার সাথে ওর দেখা হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত সবকিছু মিলিয়ে কিয়ারা যেটা সন্দেহ করছে। এখন সেটার সত্যিটা জানার পালা। তবে কিয়ারা মনে প্রাণে চাইছে ও যেটা ভাবছে সেটা যেন সত্যি না হয়।

যদি ওর সন্দেহ সত্যি হয়ে যায়। তাহলে ঐ নীল চোখের লোকটা এবার আর ওকে রেহাই দিবে না। একদম ছাড় দিবে না… একটুখানিও না। আর ও ঐ লোকটাকে সবটা বুঝিয়ে এক্সপ্লেইন করতে পারবে না। ঐ গম্ভীর, বদমেজাজি লোকটা হয়তো ওকে কোনো এক্সপ্লেইন করার সুযোগই দিবে না।

ঃ- কিরে চুপ করে আছিস কেন??... কথা বলছিস না কেন??... এতো কী ভাবছিস তুই?...

নামিরার কথায় কিয়ারার ধ্যান ভাঙল।

ঃ- না তেমন কিছু ভাবছি না। আসলে নতুন জায়গা তো তাই রাতে ভালো ঘুম হয়নি। এজন্য তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে।

এই কথা বলেই কিয়ারা রুমে এসে খাটের উপর বসল। এতোক্ষণ ওদের কথাবার্তা শুনে কিরণের ও ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে।

ঃ- ধুর বাবা!.. তোমাদের জ্বালায় শান্তিতে একটু ঘুমোতেও পারলাম না।

ঘুমুঘুমু কন্ঠে বলে উঠলো কিরণ।

ওর কথা শুনে আলিশা দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলে উঠলো…

ঃ- আহারে নবাবজাদী!.. বেলা বাজে নটা’র উপরে। এখনো নাকি ওনার ঘুমই শেষ হয়নি।

ঃ- যাহ তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়। আমাদের নিচে যেতে হবে তো !...নাঈমা একবার এসে ডেকে গিয়েছে। এদিকে এখনো তোরা ফ্রেশই হতে পারিস নি। ওরা কি ভাববে বল তো!!...

ঃ- হয়েছে আপু!.. যাচ্ছি.. যাচ্ছি। উফ্ তোমাদের সামনে কোনো কথা বলে ছাড় পাওয়া যায় না। আমি এই যাবো আর এই আসবো।

এই বলে কিরণ ওয়াশ রুমের দিকে ছুটলো। নামিরা বলে উঠলো…

ঃ- তা আর এক জোড়া কোথায়??.. ওরা কী উঠেছে?.. আসছে না যে !..

ঃ- আর এক জোড়া কেও আমি গিয়ে দেখলাম পরে পরে ঘুমোচ্ছে এখনো। আমি ঠেলেঠুলে উঠিয়ে দিয়ে এলাম। আমরা যাওয়ার সময় ওদের কে নিয়ে চলে যাবো।

ঃ- ওও আচ্ছা!.. তাহলে ঠিক আছে।

ওদের কথাবার্তার মধ্যেই কিরণ ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো…

ঃ- দেখেছো !.. আমি এই গেলাম আর এই এলাম। হুহহহ!..

ঃ- হ্যাঁ সেই তো!.. আপনি এই গেলেন আর এই আসলেন। তা আরো আগে গেলেই তো আমার কথা শুনতে হতো না আপনাকে। জনাবা!...

ব্যঙ্গ করে বলে উঠলো আলিশা।

ঃ- হয়েছে…হয়েছে এখন তোমরা থামো। আর বের হও নাহলে মানইজ্জত আর অবশিষ্ট থাকবে না। সবাই বলবে বউয়ের বোনেদের অবস্থাই এই। তাহলে আমাদের বউ না জানি কেমন হয়।

বলে উঠলো নামিরা।

ঃ- হ্যাঁ… ঠিকই বলেছো তুমি।

এখন তাড়াতাড়ি চলো, এখন আবার ন্যাকারানীদের দাঁড়াতে হবে।

বলে উঠলো কিয়ারা।

তারপর ওরা সবাই ঘর থেকে বেড়িয়ে আরিয়াদের রুমের সামনে এসে দাড়ালো। কিরণ উঁকি দিয়ে দেখলো তাঁরা দুজন এখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লিপস্টিক মাখছে।

ঃ- দেখ… দেখ.. এখন এই সকল বেলায় ও এদের সাজতে হয়।

বলে উঠলো কিরণ।

ঃ- হ্যাঁ তো কী হয়েছে?.. তোর সাজতে ইচ্ছে হলে তুই ও সাজতে পারিস। মানা করেনি কেউ তোকে।

বলে উঠলো কিয়ারা।

ঃ- তোর আবার কি হলো?.. সকাল.. সকাল আমার সাথে মেজাজ দেখাচ্ছিস। রেগে আছিস কেন?..

বললো কিরণ।

ঃ- কিছু হয়নি আমার। কী হবে আবার। আর তোকে কে বললো যে আমি রেগে আছি। ফাও বকিস না তো।

ঃ- যাব্বাবা… আমি আমার কী ফাও বকলাম। ঝাড়ি মারছিস কেন ?..

ঃ- এই তোরা দুজনে এখন আমার শুরু করে দিস না প্লিজ। আমরা এখন নিজেদের বাড়িতে নেই। বোনের শ্বশুরবাড়িতে আছি। সেটা ভূলে যাস না তোরা প্লিজ!..

বলে উঠলো আলিশা।

এরই মধ্যে আরিয়া ও আরিফা ওদের রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে।

ঃ- ওরা ঝগড়া করুক। তোমরা চলো তো!..

বলে উঠলো আরিফা।

ঃ- ওও এখন আমরা ঝগড়া করছি। আর এতক্ষণ যে তোদের জন্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সেটার কী হবে?.. বলে উঠলো কিরণ।

ঃ- ধুর !.. একটায় ও কথা শুনে না। তোরা বরং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করতে থাক । আমরা নিচে চলে যাই। তোদের নিয়ে কোথাও বেড়াতে গিয়েও কোনো শান্তি নেই।

এই বলে আলিশা নামিরা কে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ওদের দেখাদেখি বাকিরাও ঝগড়া থামিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

ওরা তৃতীয় তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় নেমে আসলো। এসে দেখলো মুক্তার ঘরে সব মেয়ে কাজিন রা দল বেঁধে কি সব আলোচনা করছে। ওদের কে দেখে নাঈমা বলে উঠলো…

ঃ- আরে বেয়াইন রা যে…!..

আসেন… আসেন এখানে বসেন।

আলিশা কে বসতে বললো নিজের পাশে জায়গা দেখিয়ে।

ঃ- তোমরা সবাই এখানে কী আলোচনা করছ?...

বলে উঠলো আলিশা।

ঃ- আজকে তো ভাবির রিসেপশন পার্টি রাখা হয়েছে। তো সেটা নিয়েই আলোচনা করছিলাম আর কী।‌

বলে উঠলো মুক্তা।

ঃ- ওও‌ আচ্ছা!..

ওর কথার উত্তরে বলে উঠলো আলিশা।

ঃ- আরে তোমরা বসছো না কেন?.. বসো… বসো!..

বলে উঠলো মীরা। এই বলে ও উঠে কিয়ারার হাত টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দিল।

বাকিরাও একে একে সবাই রুমের খাটের উপর বসল।

ঃ- তো কি কি প্লান করলে আজকের জন্য। বলে উঠলো নামিরা।

ঃ- না , আমরা আর কী প্লান করবো সব কিছু তো বড় ভাইয়া ঠিক করে রেখেছে। আমরা তো নিজেরা কে কী পোশাক পরবো, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করছিলাম।

বললো নাঈমা।

ঃ- ওও আচ্ছা তাই। তা কী ডিসাইট করলে কে কী পোশাক পরবে??..

বলে উঠলো নামিরা।

ঃ- সবাই একরকম পোশাক পরবো ও একরকম সাজবো। শুধু নতুন ভাবি ছাড়া।

বলে উঠলো মীরা।

ঃ- তা তো বুঝলাম কিন্তু কী পরবে একরকম?.. শাড়ি?. নাকি গাউন?. গাড়ারা?.. নাকি সাড়ারা ?.. না লেহেঙ্গা?..

বলল আরিফা!.

ঃ- হুমম আর আমরা কিভাবে মিলিয়ে পরবো?. আমাদের ড্রেসের সঙ্গে যদি ম্যাচ না করে?..

বললো আরিয়া।

ঃ- তার আর কোনো চিন্তা নেই। সবার জন্য একরকম শাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে বড় ভাবি।

এই কথা বলতে বলতে রুমে প্রবেশ করলো মুক্তার মা।

ওনার হাতে অনেক গুলো শপিং ব্যাগ। উনি ব্যাগ গুলো এনে বিছানার উপর রাখলেন। আর তারপর ওদের উদ্দেশ্যে বললেন….

ঃ- এগুলো তোদের বড় মা আনিয়েছেন!.. আজকে সবার পরার জন্য। খুলে দেখ তোদের পছন্দ হয় কিনা।

ঃ- বড়মার পছন্দ সব সময় বেস্ট হয়। পছন্দ না হয়ে যাবে কোথায়?.. পছন্দ হবেই। দাও.. দেখি তো!.. বলে উঠলো মুক্তা।

খাঁটি মোহের সিল্ক দিয়ে শাড়ি গুলো তৈরি—মসৃণ, নরম, কিন্তু প্রতিটি ভাঁজে ঝরে পড়ছে হালকা চকচকে আভা। রঙটা হচ্ছে গভীর মরচে গোলাপি, যার সাথে মিশে ছিল হালকা কপারি আভা, যেন রোদ পড়ে থাকা শুকনো গোলাপের পাপড়ি।

পাড়জুড়ে ছিল সূক্ষ্ম মিনাকারি জরির কাজ—সোনালি আভা আর কপারি সুতোয় ফুটে উঠেছে কাশ্মীরি ফুল ও লতাপাতার নকশা। আঁচলের অংশে ছড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁচের পাথর, যেগুলো আলো পেয়ে হাজার রঙে ঝলমল করছে। শাড়িগুলোর ওজনটা হালকা, যাতে তারা সহজেই বহন করতে পারে।‌

ওরা সবাই শাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। শাড়ি গুলো এত্ত সুন্দর, যে ওদের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।

ঃ- ওয়াও!.. আসলেই শাড়ি গুলো অনেক টা সুন্দর!.. আন্টির পছন্দ আসলেই ভীষণ ভালো।

বলে উঠলো আলিশা। ওর কথার সাথে তাল মিলিয়ে বাকিরাও বললো… শাড়িগুলো সত্যিই ভীষণ সুন্দর হয়েছে। ওদের ও খুব পছন্দ হয়েছে।

ঃ- যাক তাহলে ভালোই হলো!.. যাদের জন্য এনেছে, তাদের পছন্দ হয়েছে। তাতেই ভালো। বলে উঠলো মুক্তার মা।

ঃ- এবার তাহলে তোমারা সবাই নিচে চলে এসো। অনেক বেলা হয়েছে, এখনো সকালের নাস্তা করা হয়নি। তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু… ।

ঃ- হ্যাঁ…হ্যাঁ ঠিক আছে।মামুনি তুমি যাও, আমরা সবাই আসছি। বলে উঠলো নাঈমা।

তারপর মুক্তার মা নিচে চলে গেলেন। নাঈমা সবাই কে তাদের শাড়ি দিয়ে দিল।

ঃ- আমরা নাহয় একসাথেই রেডি হই??... বলে উঠলো কিয়ারা।

ঃ- হ্যাঁ…হ্যাঁ!... কিয়ারা আপু অবশ্যই। কেন নয়?.. বলে উঠলো অয়ন্তি।

ঃ- তাহলে এগুলো তোমাদের গুলোর সাথেই থাকুক। আমরা যেহেতু একসাথেই রেডি হবো। তাহলে আর নিয়ে গিয়ে কী করবো এখানেই থাকুক।

বলে উঠলো নামিরা। ওর কথা শুনে মুক্তা সবার গুলোই একসাথে ওয়ারড্রবের ড্রয়ারে রেখে দিল।

ঃ- এখন সবাই নিচে চলো। নিচে গিয়ে নাস্তা করে আসি। তারপর ভাবী কে সাজাতে পার্লার থেকে লোক আসবে। বলে উঠলো মুক্তা।

ঃ- তাহলে তো আমরাও পার্লারে সাজগোজ করতে পারবো। খুশীতে গদগদ হয়ে বললো আরিফা।

ঃ- হ্যাঁ…. অবশ্যই পারবে। বলে উঠলো মুক্তা।

আলিশা রা সবাই ওর দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে।

ঃ- কী হয়েছে??... তোমরা সবাই এভাবে তাকিয়ে আছ কেন??... বলে উঠলো আরিফা।

ঃ- নাহ কিছু না। এমনিতেই তাকিয়ে আছি। আজ তোকে অনেক চুন্দর লাগছে তো তাই। ব্যঙ্গ করে বলে উঠলো কিরণ।

আরিফা ওর কথা শুনে ভেংচি কেটে অন্য দিকে ফিরে গেল।

ঃ- হয়েছে.. হয়েছে সবাই চলো এখন।

এই বলে নাঈমা রুম থেকে বেরিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ওর পিছু পিছু বাকিরাও সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

রাতভর রিসেপশনের প্রস্তুতির কোলাহল পেরিয়ে সকালটা এসে দাঁড়িয়েছে এক অদ্ভুত মিষ্টি নীরবতায়। বাড়ির ভেতর সকালের আলো ঢুকে সবকিছুকে সোনালি করে দিয়েছে—পর্দার ফাঁক দিয়ে পড়া রোদে ভাসছে ধুলো কণা।

ওরা সবাই নিচে ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

ঃ- কীরে এখন সময় হয়েছে তোমাদের?... নাস্তার জন্য সেই কখন ডাক পাঠিয়েছি। ওদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো মাহাদ এর মা।

ঃ- বড় মা তুমি কখন এসেছ!.. জিজ্ঞেস করল মুক্তা।

ঃ- আমি রাতে মাহাদ এর সাথে এসেছি। তোমরা এখন তাড়াতাড়ি নাস্তা করতে বসো। বড়দের সবার খাওয়া শেষ। এখন শুধু তোমরাই বাকি আছো। কায়রা আর নাঈম কে একজন গিয়ে ডেকে নিয়ে এসো। ওরা এখনো নাস্তা করেনি।

মীরা কায়রা ও নাঈম কে ডাকতে গেল। আর এদিকে আলিশা রা মাহাদের মায়ের সাথে কথা বলছিল।

ঃ- আসসালামুয়ালাইকুম আন্টি!.. ভালো আছেন!... আপনার সাথে তো আমাদের আর দেখা হয়নি।

বলে উঠলো আলিশা। ওর সাথে বাকিরাও সালাম দিল। মাহাদের মা সালামের জবাব দিয়ে ওদের কে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করল।

ঃ- ওয়ালাইকুমুস সালাম। তোমরা সবাই কেমন আছো?.. তোমাদের বাসার সবাই কেমন আছেন?.. বলে উঠলো মাহাদের মা।

ঃ- জ্বী আলহামদুলিল্লাহ!.. সবাই ভালো আছেন। বলল আলিশা।

ঃ- আচ্ছা এখন সবাই টেবিলে বসো। মালা ওদের কে নাস্তা দাও।

কাজের মেয়ে মালার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো মাহাদের মা।

ডাইনিং টেবিল ইতিমধ্যেই সাজানো হয়েছে। সাদা টেবিলক্লথের ওপর নাস্তার সারি—টোস্ট, মধু, তাজা ফল, নরম স্ক্র্যাম্বলড এগ, আর এক কোণে সুন্দর করে রাখা ক্রিমি মাশরুম স্যুপ ও মাশরুম-স্টাফড ক্রসঁ। ভাপ ওঠা সেই স্যুপের গন্ধে ঘর ভরে গেছে—হালকা মাখন, রসুন আর মাশরুমের মাটির গন্ধ মিলেমিশে এক নরম আবেশ তৈরি করছে।

কিয়ারা চেয়ারে বসতেই মাহাদের মা হেসে তার সামনে প্লেট এগিয়ে দিল—প্লেটে সোনালি-বাদামি রঙের গরম ক্রসঁ, যার ভেতর থেকে ক্রিমি মাশরুমের ফিলিং উঁকি দিচ্ছে।

কিয়ারা চুপ করে তাকিয়ে রইল। বাদামের মতোই, মাশরুমও তার জন্য খুবই বিপজ্জনক—শরীরের এক অদ্ভুত অ্যালার্জি, যা এখানের কেউ জানে না।‌ আন্টি নিজের হাতে দিয়েছে। এখন ও কীভাবে ফিরিয়ে দিবে। কী করবে বুঝতে পারছে না কিয়ারা। না খেলে উনি যদি কষ্ট পায় বা অন্য কিছু মনে করে?.?.. ওদিকে ওরা সবাই কথা বলতে বলতে খেয়ে চলেছে। কেউ ওর দিকে খেয়াল করছে না।

ঃ- একি আম্মু!.. সবাই খাচ্ছে আর তুমি চুপচাপ বসে আছ কেন?.. কোনো সমস্যা হচ্ছে?..

উনার কথায় সবার দৃষ্টি এবার কিয়ারার দিকে পড়ল।

ঃ- এতোক্ষণ কেউ আমার দিকে তাকালে না। নিজেরা বসে বসে গিলছিলে। আর এখন সবাই তাকিয়ে আছ কি একটা অবস্থা। এভাবে যদি সবাই তাকিয়ে থাকে তাহলে আমি কিছু বলবো কিভাবে?..

মনে মনে ভাবলো কিয়ারা।

এর মধ্যেই কায়রা এসে বসল কিয়ারার পাশের চেয়ারে। ও তাকিয়ে দেখলো কিয়ারার প্লেটে বাদাম,মাশরুম দিয়ে তৈরি খাবার দেওয়া। কায়রা তাড়াতাড়ি প্লেট টা ওর সামনে থেকে সরিয়ে দিল।

ঃ- কিরে তোরা এতো জন মানুষ এখানে। ওনারা নাহয় জানে না কিন্তু তোরা সবাই তো জানিস যে ওর বাদামে প্রচুর এলার্জি আছে। আর মাশরুমের ঘ্রাণ ও ওর জন্য কতটা বিপদজনক।

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো মাহাদ। কালো সাটিন শার্ট, হাতা গোটানো, চোখে আধো-ঘুমের ঘোলাটে ছায়া, কিন্তু দৃষ্টিতে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। তার চোখ কিয়ারার প্লেটে পড়তেই মুহূর্তে জমে গেল। ও এইমাত্র কায়রার বলা কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। আর ততক্ষণাৎ ব্রেনের মধ্যে সেট করে নিয়েছে যে কিয়ারার কিসে এলার্জি আছে। যেটা কখনো ভুলে যাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে তো এগুলো ওকেই খেয়াল রাখতে হবে। তাই ভালো ভাবে ব্রেনে সেট করে নিল।

মাহাদ ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো।

মাহাদ এসে কিয়ারার অপজিট চেয়ারে বসল। আর তারপর মালাকে বললো ওর জন্য ব্লাক কফি করে দিতে, আর সাথে ওর স্পেশাল স্যালাড।

মাহাদের মা টেবিল থেকে ফলের প্লেট টেনে নিল, কয়েক টুকরো আপেল আর আঙুর কিয়ারার সামনে রাখল। এক হাতে মধু মাখা টোস্ট এগিয়ে দিয়ে বললো..

ঃ- তুমি তাহলে এগুলো খাও আম্মু!..

কিয়ারা এক টুকরো আপেল হাতে নিয়ে আস্তে করে একটা কামড় বসিয়ে মুখে নিয়ে চিবোতে শুরু করল।‌ তারপর সবাই আবার খেতে শুরু করলো। মাহাদ কফিতে চুমুক দিতে দিতে কিয়ারার দিকে তাকালো। আর কিয়ারাও তখন আপেলের টুকরো চিবোতে চিবোতে সামনে তাকালো।

আকস্মিক দুজনের মধ্যে চোখাচোখি হয়ে গেল। কিয়ারা তড়িঘড়ি করে চোখের দৃষ্টি নিচে নামিয়ে নিল। কিছুক্ষণ পর আবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো মাহাদ ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। কিয়ারা তাড়াতাড়ি খেয়ে রুমে চলে যাবে। এই লোকের সামনে আর পরতে চায়না ও । এই ভেবে যেই না তাড়াহুড়ো করে আপেলের টুকরো মুখে পুরলো ওর গলায় বেঁজে কাশি উঠে গেল।

কায়রা তাড়াতাড়ি করে ওর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল…

ঃ- কী হয়েছে?.. আস্তে আস্তে খেতে পারছিস না?.. এতো তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার কী দরকার শুনি?...

কিয়ারা চুপ করে বসে রইল। ও কিভাবে বলবে যে তোমার ভাসুর আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এভাবে কেউ একটানা তাকিয়ে থাকলে ধীরে সুস্থে খাওয়া যায়?..

মাহাদ কিয়ারার দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। ওদিকে আরিয়া তো মাহাদের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। মাহাদ যখন থেকে টেবিলে এসে বসেছে, তখন থেকেই ও তাকিয়ে আছে মাহাদের দিকে। বাকি রা যে তাকায়নি এমনটা নয়। তবে আরিয়া এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। কিয়ারা ওকে হঠাৎ দেখে বলল…

ঃ- কীরে তুই এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন??...

ওর কথা শুনে সবাই আরিয়ার দিকে তাকালো। আরিয়া কটমট করে কিয়ারার দিকে তাকালো। সবখানে এই মেয়েটাকে নাক গলাতে হবে।

ঃ- এমনি তাকিয়ে আছি। কেন তোর কোনো সমস্যা?..?... বলে উঠলো আরিয়া।

কায়রা বুঝে গেল যে এখন আবার এদের ঝগড়া বেঁধে যাবে। আর সেটা নিশ্চয়ই ভালো দেখাবে না। এখানে ওর ভাসুর ও উপস্থিত আছে। তাই ও তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো…

ঃ- এই তোদের খাওয়া শেষ হয়েছে না!.. এখন তোরা সবাই উপরে যা।

ওর কথায় আলিশা রা সবাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওদের আসলেই খাওয়া শেষ। তারপর আরিয়া কে টেনে নিয়ে, ওরা সবাই মুক্তার ঘরের উদ্দেশ্যে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। টেবিলে এখন কায়রা, কিয়ারা আর মাহাদ বসে আছে। এরই মধ্যে মাহাদের মা কায়রা কে জিজ্ঞেস করল…

ঃ- কায়রা!.. নাঈম নাস্তা করতে আসেনি??...

ঃ- না মামী!.. উনি নিচে নামেনি।

ঃ- আচ্ছা ঠিক আছে!. তাহলে তুমি দুজনের খাবার নিয়ে নিজেদের রুমে চলে যাও। এই বলে তিনি ড্রইং রুমের দিকে চলে গেলেন। এদিকে কায়রা নতুন বউ উনার কথা অমান্য করে এখানে বসে থাকতে পারবে না। আবার ও উপরে চলে গেলে কিয়ারা এখানে একা হয়ে যাবে। কি করবে বুঝতে পারছে না।‌ কিয়ারা বোনের মনভাব বুঝতে পেরে নিজেই বলে উঠলো…

ঃ- আপাই !... তুমি যাও আমি আসছি। ওর কথায় কায়রা স্বস্তি পেয়ে উপরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। এখন টেবিলে শুধু মাহাদ আর কিয়ারা উপস্থিত আছে। কিয়ারা তড়িঘড়ি করে খাবার শেষ করল। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। পুরোটা সময় মাহাদ ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। কিয়ারা তড়িঘড়ি করে হেঁটে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। পিছনে শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখলো মাহাদ ও ওর পিছন পিছন সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। কিয়ারা তড়িঘড়ি করে দোতলায় এসে এক দৌড়ে মুক্তার রুমে ঢুকে গেল।

মাহাদ ওকে এভাবে দৌড়ে যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওর যাওয়ার দিকে । তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের রুমে চলে গেল।

---চলবে---

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন