#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
#প্রাপ্তমনস্ক_এলার্ট 🔞
পর্বঃ- ৪৮
🌿🌿🌿
এখন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঘড়ির কাঁটা। ওরা সাত বান্ধবী যার যার বাসা থেকে বেরিয়ে কলেজের সামনে এসে জড়ো হয়েছে। অবশ্য ওরা সাত জন বললে ভুল হবে, সাথে আবার আরো তিনজন ছেলে যোগ হবে।
মেঘলা কে যেই সিনিয়র ভাইয়া টা প্রপোজ করেছিল, উনি আজকে ওদের সবাইকে ট্রিট দিবেন। মেঘলা এতো দিন ওনাকে নিজের পিছনে চড়কির মত ঘুরিয়ে, অবশেষে প্রপোজাল এক্সেপ্ট করেছে সেটা খুশিতে। উনার সাথে উনার কাছের আরো দুজন বন্ধ আসবে।
ওরা কলেজের সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
এর মধ্যেই এ সিনিয়র ভাইয়া টা তার দুই বন্ধু কে নিয়ে ওদের কাছাকাছি চলে এসেছে। তারপর ওরা সবাই একসাথে দুজন দুজন করে রিকশায় উঠে বসল। তারপর রিকশা নিয়ে ধারেকাছেই কোনো এক নিরিবিলি ক্যাফের দিকে এগোলো।
ক্যাফে শহরের নতুন এক ঝকঝকে জায়গা— গ্লাসের দেয়ালে আলো ঝলমল করছে, টেবিলে ছোট ছোট মোমবাতির মতো লাইট সাজানো। কিয়ারা আর ওর বান্ধবীরা দলে দলে ঢুকলো। হাসাহাসি, ফটোশুট, খাবারের অর্ডার— সব মিলিয়ে উৎসবের মতো পরিবেশ।
কিয়ারার পরনে হালকা প্যাস্টেল কালারের থ্রি-পিস, চুল খোঁপা করে মাথায় সুন্দর করে হিজাব করা। ঠোঁটে হালকা লিপগ্লস। বাকি সবাই খেয়াল না করলেও, ওর ভেতরে একটা অজানা ধুকপুকানি কাজ করছিল— যেন কেউ ওকে লক্ষ্য করছে। কিন্তু সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়।
কিন্তু কিয়ারা তখনো জানতো না যে, ওর অনুভব সত্যি হতে যাচ্ছে। আর সত্যিই তাই হলো।
ক্যাফের কর্নারের ভিআইপি সেকশনে বসেছিল মাহাদ খান। তার সামনে দু’জন রাজনীতিবিদ আর কয়েকজন বডিগার্ড দাঁড়িয়ে। কালো শার্টের উপর গ্রে ব্লেজার, হাতে কফি মগ— অথচ চোখদুটো যেন অন্য কোথাও আটকে আছে।
ওর দৃষ্টি গিয়ে গেঁথে গেল সরাসরি কিয়ারার উপর।
চোখে অদ্ভুত আগুন, ঠোঁটে শক্ত চেপে ধরা রেখেছে অধিকারী জেলাসি।
বাকি সবাই মেতে আছে গল্পে, কেবল কিয়ারা হঠাৎ শিহরন নিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই চোখে চোখ পড়লো মাহাদের।
মুহূর্তেই নিঃশ্বাস কেঁপে উঠলো, শরীর জমে গেল।
ওর ঠোঁট নড়লো, কিয়ারা পরিষ্কার শুনতে পেল না, কিন্তু ঠোঁট পড়েই বুঝলো—
“তুমি এখানে…?”
পরের মুহূর্তে মাহাদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
বডিগার্ডরা সরাসরি রাস্তা ছেড়ে দিল।
আর কিয়ারা বুঝে গেল, ঝড় নামতে যাচ্ছে।
— — —
ক্যাফের ভেতরে তখন হাসি-আড্ডার উৎসব। কিয়ারার বান্ধবী মেঘলা বারবার লাজুকভাবে রিফাত ভাইয়ার দিকে তাকাচ্ছিল, আর বাকিরা খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত।
কিয়ারা সবার সাথে হেসে চললেও ভেতরে ভেতরে যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কারণ কর্নার থেকে সেই দৃষ্টি… সেই জ্বলন্ত চোখদুটো ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল।
মাহাদ খান আস্তে আস্তে ভিআইপি সেকশন থেকে উঠে দাঁড়ালো। চারপাশ যেন মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ওর প্রতিটা পদক্ষেপে এক অদ্ভুত শীতলতা নামছিল ক্যাফের ভেতরে। লম্বা, ভারী চেহারা, চোখে আগুনের দৃষ্টি— যেন এই শহরের বাতাসও তার ইশারায় চলে।
কিয়ারার বুক ধকধক করছিল।
“আল্লাহ… এখন যদি কেউ কিছু বুঝে ফেলে…”
ও মাথা নিচু করে পানীয়ের গ্লাসটা নাড়ছিল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই ওর চেয়ারের পাশে এক জোড়া শক্ত হাত ধরা পড়লো।
মাহাদ ওর পাশে দাঁড়িয়ে।
ঠোঁট কষে চেপে ধরা, চোখ সরাসরি কিয়ারার উপর।
ঃ- কি সুন্দর মেলা বসিয়েছো দেখি…।
গভীর গর্জনের মতো কণ্ঠে ঠাণ্ডা কটাক্ষ।
কিয়ারার বান্ধবীরা চমকে উঠলো, উনি এই সময়ে এখানে কী করছেন??.!...
রিফাত ভাইয়া করে জিজ্ঞেস করলো—
ঃ- এই লোকটা এখানে কেন?... উনাকে চেনো নাকি?... তোমার পরিচিত কেউ?..!...
কিয়ারা কেঁপে উঠলো। মুখ শুকনো হয়ে গেছে।
ঃ- আ… না… মানে…।
মাহাদ তীক্ষ্ণভাবে তাকালো।
ঃ- না?...
ওর ঠাণ্ডা দৃষ্টি যেন সরাসরি কিয়ারার আত্মা ভেদ করে গেল। কিয়ারা এক মুহূর্তে মাথা নিচু করে ফেললো।
মাহাদ কোনো তোয়াক্কা না করেই কিয়ারার হাত চেপে ধরলো। এত জোরে যে কিয়ারার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
ঃ- চলো।…
ঃ- কোথায়?...
— ভয়ে ভরা কণ্ঠ কিয়ারার।
ঃ- আমার সাথে, এখনই।…
ওরা সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। রিফাত ভাইয়া বললো—
ঃ- এই যে! আপনি কে?... এভাবে ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?...
মাহাদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকালো।
ঃ- আমি ওর কে, সেটা জানার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একথা মনে রাখবে— এই মেয়েটি কারো সাথে ক্যাফেতে বসার অনুমতি পায় না। ও শুধু আমার। আর তোমরা মনে হচ্ছে এখানে নতুন এসেছো , কারো কাছ থেকে জেনে নিবে আমি কে!...
সবাই অবাক! কিয়ারা তো আগুনে পুড়ে মরছিল ভেতরে।
ঃ- মি. খাঁন প্লিজ… এমন করবেন না…।
কিন্তু মাহাদ তো মাহাদ।
ও কিয়ারাকে একটুও সময় না দিয়ে প্রায় টেনে তুললো চেয়ার থেকে। কিয়ারার হাত আঁকড়ে ধরে ওকে নিজের বুকের কাছে চেপে রাখলো, তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেল ক্যাফের দরজা দিয়ে।
— — —
বাইরে রাতের বাতাস কিয়ারার হিজাব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।
মনে হচ্ছে প্রচন্ড ঝড় আসবে, ঝড় তো আসবেই প্রকৃতির উপর না আসলেও ওর উপর আসবে নিশ্চিত। কিন্তু মাহাদ থামলো না। গাড়ির দরজা খুলে কিয়ারাকে ভেতরে বসিয়ে দিল।
দরজা বন্ধ করতেই মাহাদ এক ঝটকায় ওর দিকে ঝুঁকে পড়লো।
চোখ দুটো লালচে, নিঃশ্বাস ভারী।
ঃ- তুমি সাহস পেলে কিভাবে আমাকে না জানিয়ে এখানে আসার?....
কিয়ারার গলায় কাঁপন—
ঃ- আমি… আমি তো শুধু বান্ধবীদের সাথে…।
মাহাদ ওর মুখ চেপে ধরলো হাত দিয়ে।
ঃ- চুপ! আর একটা শব্দ নয়, রায়া। আমি তোমাকে কোথাও কারো সাথে ভাগাভাগি করবো না। তোমার শ্বাস, তোমার হাসি, তোমার সময়—সব শুধু আমার জন্য।
ওর চোখে যেন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।
ঃ- বান্ধবীদের সাথে বেরিয়েছো ??... তাহলে ঐ ছেলেগুলো তোমাদের টেবিলে কি করছিল ??....
কিয়ারা ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বললো—
ঃ- মি. খাঁন… কেউ দেখে ফেলবে…।
মাহাদ গর্জে উঠলো—
ঃ- আমাকে কেয়ার করছো, নাকি অন্যদের?.?...
পরের মুহূর্তেই ওর ঠোঁট ঝড়ের মতো নামলো কিয়ারার ঠোঁটে।
কিয়ারার শরীর একদম শিহরে উঠলো। কন্ট্রোলের বাইরে গিয়ে ওর হাত মাহাদের শার্ট আঁকড়ে ধরলো।
গাড়ির ভেতরে বাতাস ঘন হয়ে উঠলো।
ভালোবাসা আর অভিমানের মিশ্রণে সময়টা দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো।
গাড়ি মাহাদের এপার্টমেন্টের নিচে এসে থামলো। বাইরে তখনো বজ্রসহ ঝড়ো বৃষ্টি চলছে। কিয়ারা জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বসে ছিল, মাহাদ তখন ওর মাথায় থাকা হিজাব এলোমেলো করে খুলে ফেলেছিল। যার কারণে এখন অপ্রস্তুত হয়ে অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেছে। মাহাদ এক ঝলক ওর দিকে তাকালো—চোখে ঠান্ডা অথচ অদ্ভুত আগুন জ্বলছিল।
গাড়ির দরজা খুলতেই ঝড়ের ঝাপটা ভেতরে ঢুকে দু’জনকেই ভিজিয়ে দিলো। কিয়ারা ভয়ে আঁকড়ে ধরলো মাহাদের হাত। মাহাদ মুহূর্তেই তাকে টেনে নিজের বুকে চেপে ধরলো।
ঃ- তাড়াতাড়ি এসো, নাহলে পুরোপুরি ভিজে যাবে।
মাহাদের কণ্ঠ ছিল নিচু, কিন্তু ভেতরে একধরনের দমবন্ধ করা কেয়ারনেসের তাগিদ।
দু’জনে গাড়ি থেকে নামতেই মুহূর্তের মধ্যে বৃষ্টির জলে ভিজে একেবারে জবজবে হয়ে গেল। কিয়ারার থ্রিপিসের পাতলা কাপড় শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে গেল যে মাহাদের চোখে রক্তচক্ষু নেমে এলো। সে কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে হাত শক্ত করে কিয়ারার কোমরে রাখলো, আর ঝড়ের বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সোজা টেনে নিয়ে চললো তৃতীয় তলায় ফ্ল্যাটের দিকে।
আজকে পার্টি অফিস বন্ধ ছিল বিধায় তেমন কেউ ছিল না। দলের ছেলেদের মাহাদ অন্য একজায়গায় কাজে পাঠিয়েছে। আর রাহুল তো এতক্ষন ক্যাফেতে ওর সাথেই ছিল। পুরো ব্লিডিংয়ে এখন শুধু ওরা দুজনে উপস্থিত আছে।
বজ্রপাতের আলোয় ভিজে ওঠা কিয়ারার মুখে জল গড়িয়ে পড়ছিল, ঠোঁট কাঁপছিল, চোখে ভয় আর নিষিদ্ধ উত্তেজনা মিলেমিশে ছিল।
মাহাদ হঠাৎ থেমে গেল দরজার সামনে। তার গলা ভিজে কর্কশ হয়ে উঠলো—
ঃ- এই ভেজা শরীর নিয়ে যদি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াও… তবে রায়া, আমি নিজেকে একদম কন্ট্রোল করতে পারবো না।
কিয়ারা হাপরের মতো নিঃশ্বাস ফেলছিল, চোখ নামিয়ে বললো—
ঃ- তাহলে…আমি কি করবো?... আমি তো পোশাক নিয়ে ক্যাফেতে আসিনি।
মাহাদ ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। উনাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিয়ারা হাঁসফাঁস করে বলল…
ঃ- না মানে.. আমি বুঝিয়েছি যে, আমি এক্সট্রা কোনো পোশাক নিয়ে আসিনি, ক্যাফেতে।
ঝড় যেনো আরো জোরে গর্জে উঠলো। আর সেই শব্দকে অমান্য করে মাহাদ ওকে দরজার ভেতর টেনে নিলো, যেনো এই রাতটা শুধু তাদের দুজনের জন্য তৈরি হয়েছে।
— — —
ফ্ল্যাটে ঢুকতেই ঝড়ের শব্দ জানালার কাঁচে তীব্রভাবে বাজছিল। ভেতরে পুরো নীরবতা। বাইরে ভিজে যাওয়ায় কিয়ারা একেবারে অস্বস্তিতে কুঁকড়ে আছে। চুল থেকে বৃষ্টির জল টপ টপ করে গাল বেয়ে নামছে।
মাহাদ দরজা ভেজিয়ে দিলো, একপাশে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকালো হিংস্র অথচ আকুল চোখে। তারপর গম্ভীর গলায় বললো—
ঃ- চেঞ্জ করে নাও। এইভাবে থাকলে তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে।
কিয়ারা আস্তে আস্তে মাথা নাড়লো। ভিজে হিজাবটা আঁকড়ে ধরে ঘরের ভেতর হাঁটতে লাগলো। ও এখন পোশাক পাবে কোথায়??!.. মাহাদ আলমিরার দিকটা দেখিয়ে দিলো—
ঃ- ওই আলমিরাটা খোলো… সেখানে যা চাইবে, পাবে।
কিয়ারা অবাক চোখে তাকালো। “আলমিরা?” মনে হলো, এত বড় আলমিরা খোলা কি সত্যিই প্রয়োজন? কিন্তু দ্বিধা ভেঙে হাত বাড়িয়ে দরজা খুলতেই শ্বাস আটকে গেল ওর।
ভেতরে রঙিন স্বপ্নের মতো সাজানো কাপড়—দশকের পর দশক শাড়ি, ঝলমলে গাউন, আকর্ষণীয় থ্রিপিস। প্রতিটি পোশাক যত্ন করে সাজানো, যেনো কারো জন্য অপেক্ষা করছিল।
কিয়ারার গলা শুকিয়ে গেল। প্রচন্ড রকমের অবাক হয়ে ফিসফিস করে বললো—
ঃ- এগুলো… সব আমার জন্য??...
মাহাদ ধীরে ধীরে পেছন থেকে এগিয়ে এলো, তার ঠোঁটে বিপজ্জনক হাসি।
ঃ- আলমিরার তৃতীয়াংশ পুরো তোমার। আমি অনেক আগেই ভরিয়ে রেখেছি… জানতাম, একদিন তুমি আসবেই।
কিয়ারা ঘুরে তাকালো, চোখে বিস্ময় আর অশ্রুর মিশ্রণ। সে কিছু বলার আগেই মাহাদ কাছে এসে কানের পাশে ফিসফিস করে বললো—
ঃ- এগুলো শুধু কাপড় না, রায়া… এগুলো আমার অপেক্ষা, আমার অধিকার।
কিয়ারা ভিজে কেঁপে উঠলো, আলমিরার রঙিন শাড়ি-গাউনের ঝলক মিলেমিশে যেনো পুরো ঘরটাই নতুন এক স্বপ্নে ভরিয়ে তুললো।
কিয়ারা ভিজে পোশাক আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে, বুকের ভেতর ধকধক করছে। আলমিরার ভেতর রঙিন স্বপ্নের মতো সাজানো এত পোশাক দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। কিন্তু মুখ গম্ভীর করে বললো—
ঃ- কিন্তু আমি এগুলো পড়বো না।
তার ঠোঁট কাঁপছে, দৃষ্টিতে একরাশ জেদ।
মাহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। চোখদুটোতে তীব্র শীতলতা, অথচ ভেতরে উষ্ণ আগুন। কিয়ারার হাত থেকে ভিজে আঁকড়ে ধরা ওড়নার আঁচল আলতো করে সরিয়ে নিলো।
ঃ- পড়বে না?… তুমি কি তাহলে আমাকে সিডিইউস্ করতে চাইছো??...
কিয়ারা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। বুকের ভেতর কেমন যেনো কাঁপুনি ধরলো। মাহাদ আরও কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো—
ঃ- রায়া, তুমি যতই না বলো… আমি জানি, এই পোশাকগুলো তোমার জন্যই বানানো। তুমি আমার জীবনে না আসলেও আমি তোমার ছায়া নিয়ে বেঁচে ছিলাম। আজ তুমি সামনে দাঁড়িয়ে আছো, অথচ না বলছো?...
কিয়ারা চোখ নামিয়ে নিলো, শ্বাস ভারী হয়ে এলো।
ঃ- আমি… মানে… আমি ঠিক এটা বলিনি… ।
মাহাদ ঠোঁটে তীক্ষ্ণ হাসি টেনে নিয়ে বললো—
ঃ- ঠিক বা ভুল আমি ঠিক করবো। আর তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে না বলার সাহস রাখো কিভাবে, রায়া?...
হঠাৎ করেই সে আলমিরা থেকে একটা গাঢ় মেরুন সিল্ক শাড়ি বের করে কিয়ারার সামনে ধরলো।
ঃ- এটা তোমার জন্য। তুমি না চাইলে আমি নিজেই তোমাকে পরাবো।
কিয়ারা চোখ মেলে তাকালো, ভেতরে জেদ আর ভয় মিশে আছে, কিন্তু শরীর যেনো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছে মাহাদের আগুনঝরা দৃষ্টির সামনে।
কিয়ারা ঠোঁট কামড়ে ধরে শাড়িটা মাহাদের হাত থেকে টেনে নিলো।
ঃ- আপনার সাহায্য আমার লাগবে না। আমি নিজেই পড়তে পারবো।
মাহাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে দিলো, চোখে সেই ভয়ঙ্কর দৃষ্টি—যেটা কিয়ারার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
ঃ- হুমম … তাই করো। কিন্তু মনে রেখো, আমি আছি ঠিক পাশেই।
কথাটা অসমাপ্ত রেখেই ও পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, হাত গুটিয়ে বুকের ওপর।
কিয়ারা শাড়িটা নিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে এগিয়ে গেল। আঙুল কাঁপছিল, বুকের ভেতর ঘনঘন শ্বাস পড়ছিল। ওয়াশ রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো বটে, কিন্তু মাহাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেনো ভেতর পর্যন্ত ঢুকে যাচ্ছে।
মিনিট কয়েক পর দরজা খুলে বেরোল কিয়ারা। গাঢ় মেরুন সিল্কে মোড়া, মাথার ভিজে চুল খোলা, ঠোঁট কাঁপছে, অথচ চোখ নামিয়ে রেখেছে। শাড়ির সোনালি বর্ডার তার গায়ের গাঢ় উজ্জ্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
মাহাদ তাকিয়ে রইলো, একটুও চোখ না সরিয়ে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বললো—
ঃ- দেখেছো?!... আমি যেমন ভেবেছিলাম, তেমনই হয়েছে… তুমি আমার কল্পনার থেকেও সুন্দর। আমার রায়া, আমার হুঁরপরি!..
কিয়ারা মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো, কিন্তু তবুও তার গালে যেন একটা উষ্ণ টকটকে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছিল।
— — —
বাইরে ঝড় তাণ্ডব চালাচ্ছে। বাতাসে জানলার কাঁচ কাঁপছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি ঘর আলোকিত করে আবার আঁধারে ঢেকে দিচ্ছে। বাইরে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই, তাই খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে ভেতরেই।
মাহাদ কিয়ারার দিকে তাকিয়ে কণ্ঠ নিচু করলো,
ঃ- তুমি বসো, আমি দেখছি।
কিয়ারা অবাক হয়ে তাকালো,
ঃ- মানে আপনি রান্না করবেন নাকি??...
মাহাদ ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলালো,
ঃ- কেন?... আমি শুধু বন্দুক চালাতে জানি বুঝি..?.. তোমার জন্য রান্না করতে পারবো না?...
ওর কথায় কিয়ারার ঠোঁটের কোণে অজান্তে হাসি ফুটে উঠলো।
কিচেনে গিয়ে মাহাদ ফ্রিজ থেকে কিছু বের করলো—চিকেন, সবজি, ডিম আর নুডলস। ঝড়ের রাতে বিলাসী খাবার নয়, বরং তাড়াতাড়ি তৈরি করা গরম গরম কিছু। কিয়ারা প্রথমে চুপচাপ দেখছিল, তারপর এগিয়ে এলো,
ঃ- না, আমি একা বসে থাকবো না। আমি আপনাকে সাহায্য করবো।…
দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রান্না করতে লাগলো। ভেজা চুল বারবার কিয়ারার গালে এসে পড়ছিল, মাহাদ হাত বাড়িয়ে বারবার সরিয়ে দিচ্ছিল। আগুনে ফুটতে থাকা হাঁড়ি থেকে ভেসে আসা গন্ধের সাথে তাদের দু’জনের নিঃশ্বাস মিলেমিশে যাচ্ছিল।
অবশেষে টেবিলে সাজানো হলো গরম ধোঁয়া ওঠা চিকেন নুডলস আর অমলেট। কিয়ারা প্লেটে তুলে মাহাদের দিকে বাড়িয়ে দিলো, চোখ নামানো অথচ ঠোঁটে মৃদু হাসি।
মাহাদ ওর হাত ধরে প্লেটটা নিলো, চোখ নামাতে দিলো না।
ঃ- ঝড় থামুক বা না থামুক, আজকের রাতটা মনে থাকবে শুধু তোমার জন্য।
বাইরে ঝড়ের গর্জন, ভেতরে গরম খাবারের সাথে দুইটা হৃদয়ের নীরব ধুকপুকানি—এই দুই মিলেই মুহূর্তটা অন্যরকম আবেগে ভরে উঠলো।
ওদের খাওয়া প্রায় শেষ, হঠাৎ “ঠাস” করে বিদ্যুৎ চলে গেলো। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকারে ডুবে গেল। শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে বিদ্যুতের ঝলকানি আর ঝড়ের গর্জন ঢুকছে।
কিয়ারা চমকে উঠলো,
ঃ- আচ্ছা! এটা কি হলো?!.. কারেন্ট গেলো?...
মাহাদ সাথে সাথে ওর হাত চেপে ধরলো।
ঃ- ভয় পেয়ো না, আমি আছি।
অন্ধকারে তাদের দু’জনের নিঃশ্বাস যেন আরও কাছে এসে মিলেমিশে যাচ্ছিল। টেবিলে রাখা খাবারের গন্ধ, জানালার বাইরে ঝড়ের আওয়াজ—সবকিছু মিলিয়ে ভয় আর রোমাঞ্চ মিশ্র এক অদ্ভুত পরিবেশ।
মাহাদ ধীরে ধীরে ওর গাল ছুঁয়ে ফিসফিস করলো—
ঃ- দেখছো রায়া, অন্ধকারে শুধু তোমার চোখই জ্বলছে… যেন আমার পথ দেখানোর জন্য।
কিয়ারা লজ্জায় গলা নামিয়ে ফিসফিস করলো,
ঃ- মি. খাঁন…কেউ যদি জেনে যায়…।
মাহাদ হেসে উঠলো, ঠোঁট কাছে এনে বললো—
ঃ- ঝড়ে কারেন্ট চলে যেতে পারে, কিন্তু আমার ভালোবাসা কোনোদিন যাবে না। আর আমি কাউকে ভয় পাই নাকি??!..
তারপর হঠাৎ আলিঙ্গনে টেনে নিলো ওকে। অন্ধকারে কিয়ারার বুকের ধড়ফড় আরও জোরে বাজতে লাগলো, যেন বাইরের ঝড়ও তার সাথে তাল মেলাচ্ছে।
— — —
ফ্ল্যাটের অন্ধকার, শুধু ঝড়ের আওয়াজ আর জানালার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা বাতাস। মাহাদ কিয়ারার শরীরের প্রতিটি নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছিল। ধীরে ধীরে কিয়ারার কোমর আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। কিয়ারার হৃদয় এমনভাবে তীব্র হয়ে উঠল যে মনে হলো, বাইরে ঝড়ের সাথে মিলেমিশে ভেতরের প্রতিটি স্পন্দনও তাণ্ডব করছে।
কিয়ারা প্রথমে একটু পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু মাহাদের চোখে সেই জেদমিশ্রিত আগুন দেখে সে অনায়াসে নিজেকে তার চাপে ছেড়ে দিল। মাহাদ হাত বেয়ে কিয়ারার কোমর থেকে ধীরে ধীরে উপরের দিকে এগিয়ে আসল, স্পর্শ করল কাঁধ আর পিঠে। কিয়ারার শরীর অচেতনভাবে ধীরে ধীরে মিলেমিশে যাচ্ছিল, শ্বাসের তাল আরও অস্থির হয়ে উঠলো।
ঃ- রায়া…আমার হুঁরপরি, তুমি জানো না, এই মুহূর্তের জন্য আমি কতটা অপেক্ষা করেছি। এখন আসলেই মনে হচ্ছে আমি বিবাহিত!.. আমার একটা পরির চেয়েও সুন্দরী বধু আছে।
মাহাদের গলা ভয়ঙ্কর কোমলতার সঙ্গে কাঁপছিল।
কিয়ারা হালকা কাঁপুনি সহ চোখ বন্ধ করলো, শরীর তার দিকেই ঝুঁকে পড়লো। মাহাদ ধীরে ধীরে ওর গালের কাছে ঠোঁট আনল, হাওয়ার মতো স্পর্শ। কিয়ারা চুপচাপ, কিন্তু শরীরের প্রতিটি কোণিকায় শিহরণ জাগছে।
মাহাদ স্পর্শের তীব্রতাকে বাড়িয়ে দিলো—হাত বেয়ে কিয়ারার পিঠ আর কোমর জুড়ে আলতো ছোঁয়া, ধীরে ধীরে হাত উঁচু হয়ে বুকে স্পর্শ করছে। কিয়ারা নিঃশ্বাস আটকে ধরে মাহাদের দিকে মিলেমিশে গেছে, চোখ বন্ধ থাকলেও মনে হচ্ছে পুরো শরীর কথা বলছে।
ঃ- তোমার জন্য… আমি আর কোনো নিয়ম রাখি না।
ফিসফিস করে বললো মাহাদ, ঠোঁট কিয়ারার গাল আর চুলের কাছে ঘুরছে, স্পর্শ করছে, শিহরণ জাগাচ্ছে।
ঝড়ের আওয়াজ বাইরে, ভিজে চুল, কাঁপা শরীর আর গভীর নীরবতা—সব মিলিয়ে রাতটা একেবারে বেপরোয়া, নিষিদ্ধ ভালবাসায় ভরে উঠল। মাহাদের প্রতিটি স্পর্শ কিয়ারার ভেতর থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, শরীরের প্রতিটি কোণে উত্তেজনার ছাপ ফেলছে।
কিয়ারা আর বিরত থাকলো না। ধীরে ধীরে দু’জনের নিঃশ্বাস মিলেমিশে, শরীরের তাপ ছড়িয়ে পড়ে, অন্ধকার ঘরকে আরও গভীর ও উন্মাদ করে তুললো।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ