প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
১. ( অবতরণিকা )
শেষ বলতে কি আদৌ কিছু আছে? যার শুরু আছে তার অন্ত অনিবার্য। কিন্তু সেই অন্ত হতেই কেবল নতুন কিছুর সূচনা সম্ভব। রাতের অন্ধকার শেষ হলেই যেমন কেবল নতুন ভোরের আলো ফুটতে পারে। স্থলপথ যেখানে গিয়ে শেষ হয় সেখান থেকেই যেমন জলপথের শুরু হয়। একইভাবে মহাপ্রয়াণ শেষেই কেবল নব্য প্রণয়তিথি সম্ভব।
__________
সাল ১৬৩৬,
সমুদ্রের অস্বাভাবিক স্রোত পেরিয়ে তীরে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তবুও প্রাণপণে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তীরে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে সাঁতরে যাচ্ছে রমণী। আর একটু কষ্ট করতে হবে। তারপরই সে পৌঁছে যাবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। ট্রান্সিলভেনিয়ায়! রোমানিয়ায়!
সমুদ্র তীরের কাছাকাছি আসতেই সে ধীরে ধীরে সাঁতার কাটা ছেড়ে সমতলে পা রেখে উঠে আসে তীরে। তখনই সে দেখতে পায় দূর হতে একজন পুরুষ তার দিকে এগিয়ে আসছে। মেয়েটা কিঞ্চিৎ অবাক হয়। ট্রান্সিলভেনিয়ায় মানুষের আনাগোনা? তার জানামতে এখানে তো শাবক হরিণও ভয়ে পা মাড়ায় না। তবে এই পুরুষ কে?
মেয়েটা ভয়ে দু কদম পিছিয়ে যায়। হাত মুঠো করে ফেলে শক্ত করে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ কিংবা আক্রমণ মোকাবেলার প্রস্তুতি হিসেবে। রোমানিয়ান ভাষা তার ভালোই রপ্ত আছে। তাই পুরুষটির চোখে চোখ রেখে রোমানিয়ান ভাষায় প্রশ্ন করে,
" কে তুমি? "
ছিমছাম লম্বা কালো রঙের ক্লক পড়া পুরুষটির তরফ থেকে জবাব আসে,
" এন্ড্রু। "
পরমুহূর্তেই আবার পাল্টা প্রশ্ন করে,
" তোমার নাম? "
এতক্ষণ ঠান্ডা পানিতে থেকে আর এখন এই ফিনফিনে শীতল হাওয়ার দাপটে মেয়েটা কাঁপতে কাঁপতে জবাব দেয়,
" মাহশা। "
তার নামটা শুনে এন্ড্রু নামক পুরুষটির ভ্রু কুচকে আসে। তা দেখে মাহশা বলে উঠে,
" আমি তুরস্ক থেকে এসেছি। আমাকে অপহরণ করে অন্য দেশে নিয়ে যাচ্ছিলো সমুদ্র পথে। কিন্তু জাহাজ রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের কাছাকাছি আসতেই আমি সুযোগ বুঝে সবার চোখের আড়ালে জাহাজ থেকে ঝাপিয়ে পড়ি নিজেকে বাঁচাতে। অনেক কষ্টে সাঁতরে এখানে এসে পৌঁছেছি। "
তার কথা শুনে যেনো এন্ড্রু অবাক হয় বেশ। বিস্মিত সুরে প্রশ্ন করে,
" তুমি মুসলিম? "
মাহশা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। এন্ড্রু কিছুক্ষণ সতর্ক দৃষ্টিতে তাকে পরখ করে নিজের গায়ের ক্লকটা খুলে মাহশার দিকে এগিয়ে দিয়ে এটা পরে নিতে বলে। সাথে এখান থেকে জলদি প্রস্থান করার তাগিদও দেয়। মাহশা এন্ড্রুর বাড়িয়ে দেওয়া ক্লকটাকে প্রত্যাখ্যান করে না। বরং সাথে সাথে হাত থেকে সেটা নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নেয়। এটার প্রয়োজন ছিলো তার। একে তো গা কাপানো ঠান্ডা তার উপর আবার ভেজা গায়ের সাথে লেপ্টে থাকা গাউনটা পায়ের একদিক দিয়ে কিছুটা ছিড়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় একজন অপরিচিত পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ অস্বস্তি অনুভব করছিলো সে।
ক্লক গায়ে জড়িয়েই মাহশা দেখতে পায় এন্ড্রু এগিয়ে গিয়ে একটা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেছে। ঘোড়াটা নিশ্চয়ই এন্ড্রুর হবে? মাহশা সেদিকে এগিয়ে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনের ভয় বুঝতে পেরেই হয়তো এন্ড্রু আশ্বাসের সুরে বলে উঠে,
" আমাকে ভরসা করা যায়। তোমার ক্ষতি হবে না। "
মাহশা আপাতত সেই আশ্বস্ত বাণীকে উপেক্ষা করে এন্ড্রুর দিকে বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে হাতের ইশারায় কিছু একটা দেখিয়ে প্রশ্ন করে,
" এটা দেওয়া যাবে? "
এন্ড্রু লক্ষ্য করে মাহশার হাত তার গলার কালো কাপড়ের দিকে তাক করা। সে কোনো কথা না বলে সেই কাপড়টা খুলে মাহশার দিকে এগিয়ে দিতেই মাহশা তা দিয়ে নিজের মাথা এবং বুক ভালো করে ঢেকে নেয়। এন্ড্রু একহাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে,
" যাবে? "
মাহশা এন্ড্রুর চেহারা পর্যবেক্ষণ করে। দেখে তো ভালো মানুষই মনে হচ্ছে। কিন্তু তবুও যদি কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থেকে থাকে তবে মাহশা ভালো করেই জানে প্রতিকূল পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে। আপাতত তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই ট্রান্সিলভেনিয়া ছেড়ে বের হওয়া। রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তরীক্ষে প্রবেশ করা। সে মাথা নেড়ে একহাত বাড়িয়ে এন্ড্রুর হাতে হাত রাখতেই এন্ড্রু তাকে টেনে তুলে নিজের সামনে ঘোড়ার পিঠে বসায়।
মাহশা ঘাড় ঘুরিয়ে এন্ড্রুর দিকে তাকায়। এন্ড্রুর চোখের মণির রঙ উজ্জ্বল সবুজ। এতক্ষণ অন্ধকারে সে দূর থেকে ভালো করে এটা লক্ষ্য করে নি। অথচ এই চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেই সে অকপটে কি সুন্দর কিছু মিথ্যা কথা বলে ফেললো এতক্ষণ! যেমন নিজের আসল পরিচয়!
অপরিচিত কাউকে নিজের পরিচয় জানানো তার নীতি বিরোধী কাজ। ঠিক যেমন এই এন্ড্রু নামক পুরুষটার দিকে এতক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকাটাও তার নীতির বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। কথাটা মাথায় আসতেই মাহশা নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। রোমানিয়ায় এক বিশেষ উদ্দেশ্যে এসেছে সে। সেই উদ্দেশ্যই আপাতত তার একমাত্র লক্ষ্যবস্তু।
__________
তুরস্কের বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ নিজের কক্ষে বসে দরবারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল পর্যবেক্ষণ করছেন। ঠিক তখনই তার কক্ষের দরজায় করাঘাতের শব্দ হয়। বাদশাহ দলিল দেখতে দেখতেই স্ব শব্দে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে একজন দ্বার প্রহরী মাথা নত করে ভেতরে প্রবেশ করে বলে,
" যুবরাজ আপনার দিদারের অপেক্ষায় আছেন বাদশাহ। আপনার অনুমতি থাকলে উনি কি আসতে পারেন? "
বাদশাহ কামরান হাতের কাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। কক্ষে থাকা সিংহাকৃতির বিশাল আসনে গিয়ে বসে প্রহরীকে উদ্দেশ্য করে বলে,
" আসতে পারে। "
সাথে সাথে প্রহরী মাথা নত করে একইভাবে দরজার বাহিরে চলে যায়। পরপরই কক্ষে প্রবেশ করেন বাদশাহর পুত্র। কক্ষে প্রবেশ করতেই যুবরাজ সর্বপ্রথম পিতার উদ্দেশ্যে সালাম জানায়। বাদশাহ সালামের জবাব দিয়ে বলে,
" বলো। তোমার কি বলার আছে? "
যুবরাজ বেহজাদ বলে,
" আমি আপনার কাছে অনুমতি চাইতে এসেছি বাবা। আমার বোন সেখানে সম্পূর্ণ একা। ভাই হয়ে তাকে বিপদে ফেলে আমি রাজধানীতে বসে থাকতে পারি না। "
একমাত্র বোনের প্রতি যুবরাজ বেহজাদের ভালোবাসা বরাবরই বেশি। তা নিয়ে সবসময়ই বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ সন্তুষ্ট। তার পূর্ব পুরুষেরা যেখানে ক্ষমতার জন্য নিজেরাই নিজেদের রক্তের শত্রু হয়ে গিয়েছিলো সেখানে তিনি নিজের সন্তানদের ব্যাপারে সর্বদা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। কারণ প্রয়োজনে এরা একে অপরের জন্য জীবন দিতেও সদা প্রস্তুত। তিনি সামান্য হেসে বলে,
" তোমার চোখে রাজকুমারী এখনো ছোট বাচ্চাই রয়ে গিয়েছে। তাই তোমার এতো চিন্তা হচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝে শুনেই ওকে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছি। প্রথমে আমার নিজের মনও সায় দিচ্ছিলো না তাকে এভাবে যেতে দিতে। কিন্তু যখন আমি একজন পিতা নয় বরং বাদশাহ হিসেবে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা ভেবে দেখি তখন উপলব্ধি করতে পারি যে কেবল সে-ই এই কাজের জন্য উপযুক্ত। আর তাছাড়া এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যের সকলের কাছে এটাও প্রমাণ হয়ে যাবে যে তাদের রাজকুমারীও এই সাম্রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী। "
বাদশাহর কথায় যে যুবরাজ সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত হতে পারে নি তা তার মুখশ্রীতে স্পষ্ট ফুটে আছে। বাদশাহ তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে,
" আমার নিজের মেয়ের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। তুমিও একই বিশ্বাস রাখো। সে একবার যা প্রতিজ্ঞা করে তা পূরণ করে তবেই দম নেয়। "
__________
সন্দিহান দৃষ্টি মেলে মাহশাকে পরখ করছে কেভ। মেয়েটার অতিরিক্ত বোকাসোকা দৃষ্টি তার খুব একটা সুবিধার লাগছে না। এই রাত্রি বেলায় সমুদ্রের তীর ঘুরতে গিয়ে যে তাদের কাউন্ট এরকম একটা আপদকে তুলে আনবে তা কে-ই বা জানতো? কেভ কাউন্টকে উদ্দেশ্য করে সতর্ক গলায় বলে,
" কাউন্ট, এই মেয়ে গুপ্তচরও হতে পারে। তার কোনো গোপন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আমাদের ওর কথায় বিশ্বাস করা উচিত হবে না। "
ইয়ান আড়চোখে তাদের থেকে কিছুটা দূরে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা মাহশার দিকে তাকায়। তারপর চোখ গরম করে ফের কেভের দিকে তাকিয়ে বলে,
" আপাতত যা আদেশ দিচ্ছি তা পালন করো প্রধান সেনাপতি। মনে রাখবে, আমার নাম এন্ড্রু। সাধারণ একজন সেনা আমি। ভুলেও ওর সামনে আমাকে কাউন্ট ডেকে বসবে না। তুমিও আমার সাথে সেনাবাহিনীতে কাজ করো। আর ক্যামেলিয়া, তুই আমার বোন। এইটুকু পরিচয়ই যথেষ্ট। "
ক্যামেলিয়া ইয়ানের কথা শুনতে শুনতে মাটি থেকে একটি গাছের ডাল তুলে তা নাড়াচাড়া করতে থাকে। ইয়ানের কথা শেষ হতেই সে ডালটি অনেকটা কেভের মুখের সামনে নিয়ে দু'হাতের সাহায্যে ভেঙে আচ্ছা বলে উঠে।
আচমকা ক্যামেলিয়ার এমন কান্ডে কেভ বেশ ভয় পেয়ে যায়। এভাবেই এই মেয়ে তার আশেপাশে থাকলে ভয়ে তার অন্তরাত্মা পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। মনে হয় কখন না বুঝি তার গর্দান দেহ থেকে আলাদা করে ফেলে। শত্রুদের গর্দান নেওয়ার সময় কখনো হাত না কাপা কেভ কি-না নিজের গর্দান যাওয়ার ভয়ে তটস্থ থাকে একজন নেকড়ে কন্যার সামনে।
ক্যামেলিয়া কেভের ভয়ার্ত মুখশ্রী দেখে সামান্য হাসে। তারপর ইয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,
" মেয়েটা বেশ সুন্দর কিন্তু! নসিবে থাকলে বুঝলি, সমুদ্র থেকেও মেয়ে উঠে আসে? এখন চল। মেয়েটা আমাদের আড়চোখে লক্ষ্য করছে। এতক্ষণ এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে সন্দেহ করবে। "
ইয়ান সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলেই কেভ আবার পিছন থেকে বলে উঠে,
" কিন্তু কাউন্ট এই মেয়েকে আমরা রাজ প্রাসাদে তো নিয়ে যেতে পারবো না। এতো রাত করে কোথায় নিয়ে যাবো? "
ইয়ান উত্তর দেয় না। সে জানে কোন জায়গা সবথেকে সুরক্ষিত হতে পারে।
__________
জোসেফ বিরক্তিকর চেহারা নিয়ে বসে আছে খাবার টেবিলে। তার পাশের চেয়ারেই বসে আছে স্ত্রী জোয়ান্দ্রা। তাদের দুই মেয়ে জুন এবং জেনি বিয়ে করে নিজের ঘরে যাওয়ার পর থেকেই বাড়িটা অনেক নীরব ও শান্ত হয়ে গিয়েছে। ছোট এবং একমাত্র ছেলে ক্লাডিয়াস নব্য সেনা সদস্য হিসেবে সৈন্য শিবিরে যোগদান করেছে। তাই সে-ও বেশিরভাগ সময় শিবিরেই কাটায়।
এমতা অবস্থায় কাউন্ট ইয়ানের নিয়ে আসা এই মাহশা নামক মেয়েটাকে দেখেই সে বিরক্ত হয়ে আছে। সে বার কয়েক কাউন্টকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে এরকম এক অপরিচিত মেয়ের মনগড়া কাহিনীতে বিশ্বাস না করতে। কিন্তু ইয়ান তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়ে গিয়েছে যে মাহশার দিকে যেন কড়া নজর রাখা হয়। এছাড়া মাহশার তার বাড়িতে থাকা সম্পর্কে যেন রাজমাতা আনাস্তাসিয়াকে না জানানো হয়।
একদিকে রাজমাতার কড়া নির্দেশ যেন ইয়ানের ব্যাপারে সব খবর তাকে জানানো হয়, তো অপরদিকে কাউন্টের রাজমাতাকে এই সম্পর্কে কিছু জানানোর নিষেধাজ্ঞা। জোসেফ কার আদেশ পালন করবে? এই মা ছেলের আদেশের প্যাঁচে পড়েই বুঝি একদিন তার প্রাণ যাবে।
জোয়ান্দ্রা পাশ থেকে বলে উঠে,
" মেয়েটা খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমিও অনেক ক্লান্ত। এখন বিশ্রাম করো। মাহশার কোনো প্রয়োজন হলে সেদিকে আমি খেয়াল রাখবো। "
জোসেফ চিন্তিত সুরে বলে,
" তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আজ রাতে আমার দু চোখের পাতা এক হবে না। "
জোসেফের কথা শুনে আচমকা জোয়ান্দ্রা সামান্য হেসে উঠে। জোসেফ প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকায়। জোয়ান্দ্রা নিজের হাসি থামিয়ে বলে উঠে,
" আজ থেকে একুশ বছর আগেও এরকমই এক ঘটনা ঘটেছিলো। মনে আছে? কাউন্ট রিকার্ডো যখন প্রথমবারের মতো কাউন্টেস আনাস্তাসিয়াকে আহত অবস্থায় আমাদের বাসায় নিয়ে আসে। তুমি সারারাত চিন্তায় জেগে পাহাড়া দিয়েছিলে। কারণ তোমার কাউন্টেস আনাস্তাসিয়ার প্রতি বিশ্বাস ছিলো না এবং অপরদিকে কাউন্ট রিকার্ডোর ভয়েও তটস্থ ছিলে। "
কাউন্ট রিকার্ডোর নাম শুনতেই জোসেফের মুখ মলিন হয়ে যায়। সে বিষাদ স্বরে বলে উঠে,
" ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে জোয়ান্দ্রা। আলবার্টদের উপর যেন নতুন করে আর কোনো অভিশাপ নেমে না আসে। কাউন্টের উৎসর্গের ফল যেন কখনো বিফলে না যায় এটাই আমার চাওয়া। নিজের শেষ নিঃশ্বাস দিয়ে এই সাম্রাজ্য এবং কাউন্ট ইয়ানের জন্য লড়ে যাবো আমি। কেবল এজন্যই আমার এতো সতর্ক থাকা। "
জোসেফের কথা শুনে জোয়ান্দ্রা আশ্বাস দেওয়ার জন্য তার হাতের উপর হাত রাখে।
__________
সকাল সকাল নিজের কক্ষে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছিলো ইয়ান। তখনই তার কক্ষের দরজা খোলার শব্দ ভেসে আসে পিছন থেকে। ইয়ান না দেখেও বুঝে যায় কে এসেছে। তার কক্ষে অনুমতিবিহীন প্রবেশের অধিকার কেবল একজনেরই আছে। তার মা আনাস্তাসিয়ার। তাই সে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে পিছনে না ফিরেই বলে উঠে,
" শুভ সকাল মা। আমি এখন তৈরি হয়ে তোমার কাছেই আসছিলাম। "
আনাস্তাসিয়া ইয়ানের কথাকে পাত্তা দেয় না। সে রাগী সুরে প্রশ্ন করে,
" কাল সারারাত কোথায় ছিলে তুমি? "
" কোথায় থাকবো মা? রাজ্যের কাজে বেড়িয়েছিলাম। "
" ট্রান্সিলভেনিয়ায় তোমার রাজ্যের কোনো কাজ থাকতে পারে তা আমার জানা ছিলো না। "
এবার ইয়ান আনাস্তাসিয়ার দিকে ফিরে। প্রশ্ন করে,
" তোমার গুপ্তচর তাহলে তোমাকে খবর পৌঁছে দিয়েছে? "
ছেলের এমন নির্লিপ্ত কথার ধরনে আনাস্তাসিয়ার রাগ আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সে ইয়ানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
" তুমি যদি সব আমাকে জানাতে তাহলে আমার তোমার পিছনে গুপ্তচর লাগানোর প্রয়োজন পড়তো না। "
" আমি তোমার থেকে কখনো কিছু লুকিয়েছি? এই বিষয়টা কেবল লুকিয়েছি কারণ তুমি কখনোই আমাকে ট্রান্সিলভেনিয়া যাওয়ার অনুমতি দিতে না। "
" অবশ্যই দিতাম না। "
ইয়ান এবার কিছুটা অধৈর্য্য হয়ে প্রশ্ন করে,
" ট্রান্সিলভেনিয়াকে তুমি কেনো এতো অপছন্দ করো? আমার বাবার যেখানে জন্ম এবং মৃত্যু সেই জায়গার প্রতি কি আমার আগ্রহ থাকতে পারে না? যেই শহরে আমার জন্ম সেই শহরে কি একবার আমি যেতে পারি না? "
আনাস্তাসিয়া শান্ত হয়। একহাতে ইয়ানের গাল সামান্য ছুঁয়ে থমথমে গলায় বলে উঠে,
" ট্রান্সিলভেনিয়ার প্রতি তোমার আগ্রহ দেখলে আমার ভয় হয়। ওই শহর অভিশপ্ত। কাউন্ট লিও, কাউন্টেস ম্যারি, আমার রিক সবাই ওই শহরে নিজেদের জীবন হারিয়েছে। আমি তোমাকে হারাতে চাই না। এইজন্যই ওই অভিশপ্ত শহরে তোমাকে যেতে দিতে চাই না। "
ইয়ান চুপ হয়ে যায়। নিজের মায়ের দুশচিন্তা উপলব্ধি করতে পেরে অনুতপ্ত হয়। নিজের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আনাস্তাসিয়া হেসে বলে,
" আমি তোমার উপর কখনো রাগ হতে পারি? "
ইয়ান বেরিয়ে যেতেই আনাস্তাসিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার হুট করে কেন যেনো মনে হচ্ছে ইয়ান তার থেকে কিছু একটা লুকাচ্ছে। কে জানে এইটা কেবল তার অযথার দুঃশ্চিন্তা কি-না? তবুও তার চিন্তা হয়। মনে মনে প্রার্থনা করে সে-ই অভিশপ্ত ট্রান্সিলভেনিয়া শহর যেনো কখনো তার ছেলের জীবনে কোনো অভিশাপ বয়ে না আনে।
__________
প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার জন্য কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট সবে ঘোড়ায় চড়তে নিবে। এমন সময়ই সে জোসেফের চিন্তিত সুরের ডাক শুনতে পায়।
" কাউন্ট! কাউন্ট! "
ইয়ান ভ্রু কুচকে পিছনে ফিরে তাকায়। জোসেফ দৌঁড়ে তার দিকেই আসছে। জোসেফকে এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে ইয়ানের কপালে ভাজ পড়ে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তাগিদে জোসেফের এ-ই ছুটে আসা তা সে বুঝতে পারে। জোসেফ ইয়ানের কাছাকাছি আসতেই ইয়ান প্রশ্ন করে,
" কি হয়েছে জোসেফ? "
জোসেফ আশেপাশে তাকিয়ে দেখে আরো কিছু সৈন্যও সেখানে উপস্থিত। তাই সে ইয়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
" ওই মেয়েটা নেই। পালিয়েছে। "
সাথে সাথে ইয়ানের কুচকানো ভ্রু জোড়া শীতল হয়ে আসে। হাতে থাকা তলোয়ার শক্ত করে ধরে সে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসতে বসতে তার থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান সেনাপতি কেভকে উদ্দেশ্য করে বলে,
" কেভ, কেবল তুমি আমার সাথে চলো। "
জোসেফ ইয়ানকে কি বলেছে তা শুনতে পায় নি কেভ। কিন্তু দূর থেকে তাদের মুখশ্রী দেখে বুঝতে পারে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়। আন্দাজ করে সেই বিষয়টা কোনোভাবে গতরাতের ওই মাহশা নামক মেয়েটার সাথে জড়িত। সে আর একদন্ড অপেক্ষা করে না। ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে রওনা হয় কাউন্টের পিছু পিছু এই রহস্যমানবীকে খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে।
চলবে…
[ কপি করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ]