ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

৫৬তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫৬. ( উপসংহার )

বন্দরের ঠিক কোন দিক এটা কে জানে! এদিকে কোনো লোকের ভীড় নেই। কেবল বিশাল একটা জাহাজ তীর ঘেঁষে প্রয়োজনীয় দূরত্ব রেখে সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়ে আছে। সে-ই জাহাজের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে দু'জন যুবক এবং যুবতী। তুরস্কের যুবরাজ এবং রাজকুমারী খেতাবপ্রাপ্ত দুটো ব্যক্তিকে ঘিরে হাঁটছে একঝাঁক সৈন্য। কাউন্টের বুঝিয়ে দেওয়া দায়িত্ব পালনে তারা সচেতন।

ক্লান্ত এবং নগ্ন কদমে হেঁটে যাওয়া বেহজাদ আড়চোখে বোনের মুখপানে তাকায়। প্রধান সেনাপতির বাড়ি থেকে বের করার পরই দু'জন মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু এখনো দু'জনের মধ্যে কোনো বাক্য বিনিময় হয় নি। অজানা কারণে জেইলান চোখ তুলে তাকাচ্ছেও না নিজের ভাইয়ের পানে।

বেহজাদ ভেবেছিলো যে একেবারে জাহাজে উঠে একান্তে বোনের সঙ্গে কথা বলবে সে। কিন্তু অপরাধবোধ এতটা তীব্রভাবে তাকে তাড়া করছে যে সে আর জাহাজে উঠার অপেক্ষা করলো না। চলতে চলতেই নিজের শিকল দিয়ে বাঁধা হাতজোড়া বাড়িয়ে জেইলানের বেঁধে রাখা হাত জোড়া ছুঁলো। নতমস্তকে তীব্র অপরাধবোধ নিয়েই বললো,

“ বাদশাহ বেগম এই নোংরা খেলাটা কেবল আমাকে সিংহাসনে বসানোর জন্য খেলেছে, নাকি তোমাদের প্রতি ঘৃণা থেকেও তা আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু কোনো না কোনো ভাবে ভাইজানের মৃত্যুর পিছনে আমিও দায়ী। ক্ষমার যোগ্য নই, তবে ক্ষমা না চেয়েও শান্তি পাচ্ছি না। আমাকে ক্ষমা করবে কি করবে না সেটা তোমার সিদ্ধান্ত। তবে আমি সকল কিছুর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। “

জেইলান নিষ্প্রাণ দৃষ্টি মেলে নিজের ভাইজানের পানে তাকায়। ভাইজানের চোখেমুখে অনুতাপের ছাপ দেখতে পেয়ে সে বলে,

“ রাজ্যে ফিরে বাবাকে জীবিত পাবো তো আমরা? “

এবার বেহজাদ দেওয়ার মতো কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। কি বলবে সে? তার জানা নেই তাদের মহামান্য বাদশাহ এখনো জীবিত আছেন কি-না। বাদশাহ গত হলে আশেপাশের রাজ্যে এ-ই খবর ছড়িয়ে পড়ার কথা ইতিমধ্যে। তবে নিজের ধূর্ত মায়ের উপর থেকে আস্থা হারিয়েছে বেহজাদ। হতে পারে বাদশাহর গত হওয়ার খবরটা উনি গোপন রাখছেন বেহজাদের অপেক্ষায়। কিন্তু যদি বাদশাহ মারা যেয়ে থাকেন? তাহলে? তাহলে কি ও-ই সিংহাসনটা এখনো বেহজাদের প্রতিক্ষায় আছে?

বেহজাদ হুট করেই নিচুস্বরে বলে উঠে,

“ জেইলান। ও-ই রক্তাক্ত সিংহাসনে আমি কখনো আরোহণ করবো না। ও-ই সিংহাসনে আমি বসা মানে মা'য়ের উদ্দেশ্য সফল করা। আমি উনাকে কোনো মূল্যেই সফল হতে দিবো না। আমার ক্ষমতা পাওয়াটা ভাইজানের সঙ্গে বেঈমানীর সমতুল্য হবে। আমি তো বেঈমান না। ভাই-বোনদের সঙ্গে আমি কখনো বেঈমানী করি নি এবং করবো না। “

জেইলান কিছু বলতে পারে না। কেন যেনো হুট করে তার ভাইজানকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। দু-হাত বাঁধা না থাকলে সে হয়তো এক্ষুণি ভাইজানকে জড়িয়ে ধরতো। একটু বোধহয় কেঁদেও নিতো। কেরেমের মুখে এতো বড় প্রতারণার ঘটনা জানার পর থেকেই তার খুব হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো। বেহজাদকে সামনে পেয়ে সে-ই ইচ্ছা যেনো আরো তীব্র হলো। পৃথিবীতে এখন এ-ই একজনই তো আছে তার আপন এবং নিজের বলতে। বাদশাহ বেগমের প্রতারণার জন্য সে যতই নারাজ থাকুক না কেন, তার অন্তর তো জানে বেহজাদ ভাইজান নির্দোষ।

জেইলান নিজেকে সংযত করে। মনে মনে ভেবে রাখে যে জাহাজে উঠে একান্তে পরে ভাইজানকে জানানো যাবে যে সে ভাইজানকে বিশ্বাস করে। তখন না-হয় জেইলান ভাইয়ের সঙ্গে নিজের এই জঘন্য ক্ষত এবং দুঃখ ভাগাভাগি করে একটু কেঁদেও নিবে।

__________

জেইলান এবং বেহজাদ জাহাজের কাছাকাছি পৌঁছাতেই হঠাৎ পিছন থেকে ঘোড়ার খুড়ের শব্দ শুনতে পায়। দু'জনেই চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। ফিরে তাকায় সৈন্যরাও। অদূরে ঘোড়ার পিঠে করে প্রিন্সেসকে এসে থামতে দেখে প্রত্যেকেই অবাক। প্রিন্সেসের কি এখানে আসার কথা ছিলো? কাউন্ট তো এরকম কিছু সৈন্যদের জানায় নি!

বেহজাদ তখনও অবাক নয়নে দেখছে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ানো নাওমিকে। সে ভেবেছিলো নাওমির সঙ্গে বোধহয় আর তার দেখা হবে না। কিন্তু এই মেয়ে যে বিদায়বেলায়ও এভাবে এসে হাজির হবে তা কে জানতো! বেহজাদ মনে মনে কিছুটা হাসে বোধহয়। জেদি এবং বোকা নাওমি! প্রতারকের জন্য ছুটে এসেছে!

বেহজাদ জানে নাওমি একান্তে তার সঙ্গেই কথা বলতে এসেছে। তা-ই সে নিচুস্বরে জেইলানকে বলে জাহাজে উঠে দাঁড়াতে। সে একটু পরই চলে আসবে। জেইলান কিছুটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দেখে নাওমিকে। তার ধারণা ইয়ানের এ-ই বোনটা তার ভাইজানের প্রতি দূর্বল। এ-ই ধারণাটা যেনো এ-ই মুহূর্তে এখানে ছুটে এসে নাওমি আরো কিছুটা জোরালো করে দিলো। জেইলান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রোমানিয়ান ভাইবোন দুটোরই ভুল মানুষদের উপর পিছলে পড়ার স্বভাব দেখে সে হতাশ।

নাওমির সঙ্গে আরেকটা ঘোড়ায় করে একজন চিকিৎসক এসেছেন। সে-ই চিকিৎসক নাওমির আদেশ মতো বিনা বাক্য ব্যয়ে জাহাজের দিকে অগ্রসর হয়। নাওমি নিজ জায়গা থেকে নড়ে না। বরং দূর থেকেই সৈন্যদের আদেশ দেয় বেহজাদকে তার নিকট আসতে দিতে। সৈন্যরা ভদ্রতার সহিত আপত্তি জানিয়ে বলে,

“ প্রিন্সেস, কাউন্টের অনুমতি নেই কয়েদীকে ছাড়ার। আপনার আদেশ পালন সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। দুঃখিত। “

নাওমি দু কদম এগিয়ে গিয়ে বলে,

“ ছাড়তে বলেছে কে? আমি কেবল কথা বলতে চাইছি। হাত পা তো শেকল পড়ানোই। তোমরা ওখান থেকে নজর রাখো অসুবিধা নেই। আমি কথা বলে চলে যাবো এখনই। “

সৈন্যরা তবুও রাজি হয় না। নাওমি এবার কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলে,

“ অদ্ভুৎ! আমাকে অপহরণ করার দায়ে ওকে বন্দী করা হয়েছিলো। ও রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার আগে কি আমি নিজের মনের খায়েশ মেটাতে ওর নাক বরাবর একটা ঘুষি মারতে পারবো না নাকি? “

বেহজাদ না চাইতেও মৃদু হাসে নাওমির কথা শুনে। নাওমি তাকে ঘুষি মারবে? এ-ও সম্ভব? এসব তো জেইলানের কাজ! কিছু না বলে সোজা এক ঘাতে শত্রুকে কুপোকাত করে দেওয়া। উঁহু! আগের নাওমিও সুযোগ পেলে বোধহয় তাকে সত্যি সত্যিই একটা ঘুষি মারতো। কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই রমণীটা তো প্রিন্সেস নাওমি নয়। বরং বেহজাদের নজরকাড়া রূপে মুগ্ধ হওয়া নাওমি। এ-ই নাওমি বেহজাদকে মারতে জানে না। উল্টো বেহজাদের প্রেমে বোকার মতো মরতে জানে।

সৈন্যরা এবার অসন্তোষ নিয়েই বেহজাদকে অনুমতি দিলো কেবলই পনেরো কদম এগিয়ে গিয়ে প্রিন্সেসের সঙ্গে কথা বলার। তবে, সতর্ক করে দিলো যেনো কোনো চালাকি না করে। তাহলে একদম ভালো হবে না। বেহজাদ কিছু না বলে গুণে গুণে পনেরোর বদলে ষোল কদম এগিয়ে যায় নাওমির পানে। নাওমিও চার কদম এগিয়ে আসে। দু'জনের মাঝে এখন কেবল এক কদমের দূরত্ব। সেটা আর কেউ-ই ঘুচায় না।

বেহজাদ কিছু বলে না। নাওমিই প্রথম কথা বলে,

“ যে-ই লোকটাকে পাঠিয়েছি সে একজন চিকিৎসক। জাহাজে উঠেই সর্বপ্রথম নিজের হাতের ক্ষত পরীক্ষা করাবে৷ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে নাকোচ করবে না। “

বেহজাদ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

“ ঋণ করছো। “

“ ফিরিয়ে দিও। “

“ কি চাই? “

“ চিঠি দিও। “

“ ক্ষমতা নেই। “

“ মিথ্যে বলছো। “

“ উমহু। “

“ সত্যি জানি। “

“ কোন সত্যি? “

“ যুবরাজ তুমি। “

বেহজাদ কয়েক পলের জন্য থমকায়। চোখে মুখে বিস্ময়তা তার। তাদের কথা আশেপাশের কারো কান অব্দিই পৌঁছাচ্ছে না। জেইলান ইতিমধ্যে জাহাজে উঠে জাহাজের ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দেখছে সবকিছু। দূর থেকেই সে লক্ষ্য করছে নিজের ভাইজান এবং ও-ই প্রিন্সেসকে। ভাইয়ের প্রতি মনযোগী সে লক্ষ্যই করলো না যে ওদিকে সৈন্যরা জাহাজে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে যে যার অবস্থান গ্রহণ করেছে।

বেহজাদ বুঝতে পারে বাদশাহ বেগমের পাঠানো সে-ই চিঠিটা তবে নাওমির হাতেই পড়েছে। সে আর অহেতুক অস্বীকার করে না সত্যিটা। কেবল বলে,

“ ক্ষমতা থাকলেও, ইচ্ছে নেই। “

নাওমি বোধহয় কিছুটা আহত হয়। সে অভিমানী দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে। নাওমির সে-ই অভিমানী দৃষ্টি দেখে কেনো জানি মায়া হয় বেহজাদের। সিদ্ধান্ত নেয়, নাওমিকে সত্যিটা জানিয়েই যাবে সে। বলে দিবে যে সে ভালোবাসার ছলনা করেছিলো কেবল নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। কারণ এ-ই সত্যটা ন্স জানলে এ-ই মেয়েটা আশায় বাঁচবে। অহেতুক কারো মনে আশা রয়ে যাক, বেহজাদ সেটা চায় না। তাই সে স্পষ্ট গলায় বলতে নেয়,

“ আমার তোমাকে কিছু বলার আছে… “

বেহজাদের কথা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। হুট করেই জাহাজের শব্দ ভেসে আছে পিছন থেকে। বেহজাদ চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। খুবই ধীর গতিতে জাহাজটা বন্দর তীর হতে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। জাহাজের ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা জেইলানও বিস্মিত ভঙ্গিতে চেঁচাচ্ছে,

“ জাহাজ ছাড়লো কেন? ভাইজান এখনো জাহাজে উঠে নি। থামো। ভাইজান উঠে নি এখনো। সবাই দাঁড়িয়ে আছো কেন? “

অবাক নাওমিও হয়েছে। সে বিস্মিত নয়নে পরিস্থিতি বুঝে উঠার চেষ্টা করছে। কি হচ্ছে এসব? সে দ্রুত কদমে এগিয়ে যায় বন্দরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের পানে। তাদের প্রশ্ন করতে থাকে জাহাজ কেন ছেড়ে দিলো। সৈন্যরা কাউন্টের আদেশ অনুযায়ী মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে।

জেইলান জাহাজের ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বেহজাদকে ডেকে চলেছে। অজানা কারণে দু'জন সৈন্য এসে শক্ত করে তার দু-হাত চেপে ধরে রেখেছে। নাওমিও ব্যস্ত সৈন্যদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে। এতো কিছুর মধ্যে কেউ লক্ষ্যই করলো না বন্দরের উত্তর দিকে মাঝারি আকৃতির একটা পাহাড় চূড়ার কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে। তার সঙ্গেই দাঁড়িয়ে আছে প্রধান সেনাপতি এবং ক্লাডিয়াস।

ক্লাডিয়াসকে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত দেখাচ্ছে। সে দুঃসাহস দেখিয়ে প্রশ্ন করে,

“ প্রিন্সেসের উপস্থিতিতে কাজটা করা কি ঠিক হবে, কাউন্ট? “

ইয়ান চোয়াল শক্ত করে জাহাজের ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা জেইলানের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির রেখে বলে,

“ নাওমি এবং ও-ই মেয়েটার চোখের সামনেই এ-ই কাজ করবে তুমি। “

ও-ই মেয়েটা দ্বারা যে ইয়ান মাহশাকে বুঝিয়েছে তা উপস্থিত দু'জনের বুঝতেই অসুবিধা হয় নি। তবুও ক্লাডিয়াস দ্বিধাগ্রস্ত। দূর হতে প্রিন্সেসের ও-ই অপহরকারীর প্রতি উদারতা এবং অস্থিরতা তার নিকট খুবই দৃষ্টিকটূ লাগছে। হুট করেই সে দৃষ্টিপাত করে বেহজাদের উপর। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে যায় এ-ই লোকটাই প্রিন্সেসকে এতোদিন বন্দী করে রেখেছিল। তার অন্তরের রাগ টগবগ করে ফুটতে শুরু করে। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের আদেশ পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

__________

থম মেরে পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা বেহজাদ যেনো হুট করেই পুরো হিসেবটা বুঝে গেলো। সে ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ ক্রমশ দূরে যেতে থাকা জাহাজের ছাদে থাকা জেইলানকে দেখলো। অতঃপর তাকালো রাগে সৈন্যদের আঘাত করতে থাকা প্রিন্সেস নাওমিকে। সে কি রাগ নাওমির! বেহজাদের হয়ে সৈন্যদের ঘুষি মেরে আদেশ দিচ্ছে এক্ষুণি জাহাজ ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে।

বেহজাদ হুট করেই হাসলো সামান্য। নাওমি আলগোছে পিছনে ফিরে তাকাতেই লক্ষ্য করলো বেহজাদের ঠোঁটের কোণের সে-ই হাসিকে। এ-ই হাসিটা দেখতে কেনো যেনো একটুও ভালো লাগছে না নাওমির। হাসিতে বিষাদের ছাপ কেন খুঁজে পাচ্ছে সে? কি হচ্ছে এসব?

নাওমি নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায়। চোখের পলকেই কোথা থেকে একটা তীর ছুটে এসে বেহজাদের বুকে বিঁধে। বেহজাদের হাসি ম্লান হয় কিছুটা। নাওমির অস্থিরতাও থেমে যায়। পরপর আরো দুটো তীর ছুটে এসে বেহজাদের বুকে বিঁধে। তীরের গতির সঙ্গে নাওমির শরীরের লোমকূপ কেমন শিরশিরিয়ে উঠলো। সে দিশেহারার মতো দেখছে একটা গোটা রাজ্যের যুবরাজের অন্তিম সময়টা। বুকে বিঁধে থাকা তিনটা তীর, বেহজাদের ঠোঁটের কোণের হাসি, বেহজাদের ধপ করে পড়ে যাওয়া সব দেখে ও।

অদূরের জাহাজটা হতে জেইলানের দুনিয়া ভাসিয়ে নেওয়া চিৎকার এবং আর্তনাদ ভেসে আসছে। সে পাগলের মতো ছটফট করছে। চেষ্টা চালাচ্ছে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার। কিন্তু শিকলে বাঁধা হাত পা এবং তার দু হাত ধরে রাখা পালোয়ানদের মতো সৈন্য দুটো তাকে সে-ই সুযোগ দিচ্ছে না। চরম আহাজারির মাঝেই জেইলানের চোখ পড়ে মাঝারি আকৃতির পাথরের পাহাড়টার চূড়ার দিকে। সে দেখতে পায় বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকা কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে, এ-ই খেলার শেষ বাজিটা মেরে যে আজ বিজয়ী।

ইয়ান দেখছে শাস্তিপ্রাপ্ত জেইলানকে। এইতো, ঠিক এই জেইলানকেই তো সে দেখতে চেয়েছিলো! ভঙ্গুর জেইলান! পরাজিত জেইলান! অসহায় জেইলান! উঁহু, জেইলান নাকি মাহশা! কি ডাকবে এ-ই মেয়েকে? ছলনাময়ী? হ্যাঁ, এই নামটাই উপযুক্ত।

ইয়ানের বুকে প্রশান্তির হাওয়া বইছে নাকি অনলের দহন বইছে কে জানে! সে কেবল জানে আজ থেকে জেইলানের পৃথিবীতে নরকবাস শুরু হতে চলেছে। সে-ই সঙ্গে ইয়ান এটাও জানে, আজ থেকে আর কেউ কখনো তার সঙ্গে প্রতারণা করতে পারবে না। এ-ই ইয়ান আলবার্টের সঙ্গে কেউ আর কখনো ছলনা করতে পারবে না। না কেউ হৃদয়ে উঁকিঝুঁকি দিতে পারবে। সে-ই দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছে ইয়ান৷

বেহজাদকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখেই নাওমি ছুটলো বেহজাদের পানে। ঠিক সতেরো কদম দৌড়ে সে এগিয়ে এসে বেহজাদের শিয়রে বসে। বেহজাদের ভারী মাথাটা আগলে নিজের কোলে নিয়ে ডাকে সৈন্যদের,

“ চিকিৎসক ডাকো এক্ষুণি। তাড়াতাড়ি। ফিটনের ব্যবস্থা করো। “

সৈন্যরা আজ প্রিন্সেসের আদেশের তোয়াক্কা করলো না। কাউন্টের কঠোর আদেশ। আজ কাউন্ট ব্যতীত অন্য কারো আদেশ মেনে নেওয়া মানেই মৃত্যুদণ্ড।

নাওমি রাগে সৈন্যদের বকতে থাকে। তার কোলে মাথা এলিয়ে রাখা বেহজাদের চোখ জোড়া দেখে যায় নাওমিকে। নীরবে, নিভৃতে। একজন গুপ্তচর এবং অপহরণকারীর শাস্তি কি ভয়ংকর হওয়ার কথা ছিলো না? হ্যাঁ, তাই তো! তাহলে বেহজাদের পরিণতি এতো চমৎকার কিভাবে হলো? কোনো প্রিন্সেসের কোলে মাথা রেখে মৃত্যুর সৌভাগ্য ক'জনের হয়? বেহজাদের জানা নেই। সে কেবল জানে সে সে-ই সৌভাগ্যবান।

নাওমি তখনও চেঁচামেচি করে যাচ্ছে। বেহজাদ এবার ক্ষীণ স্বরে ডাকে,

“ নামি… “

নাওমি থমকে বেহজাদের পানে তাকায়। বেহজাদ নাওমিই উচ্চারণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারলো না। বুকে বিঁধে থাকা তীরের কারণে তার মুখ দিয়ে স্পষ্ট কথা বের হতে পারছে না। নাওমি মাথা নেড়ে বলে,

“ একটু ধৈর্য্য ধরো। চিকিৎসকের ব্যবস্থা করছি আমি। কিচ্ছু হবে না। সুস্থ হও। আমি নিজে তোমাকে তোমার রাজ্যে ফিরতে সাহায্য করবো। “

বেহজাদের বলতে ইচ্ছে করছিলো,

“ আমি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করেছি। “

কিন্তু বেহজাদ সে-ই সুযোগ পেলো না। তার আগেই তার নিঃশ্বাস ফুরালো। চোখ জোড়া খোলা রেখেই দেহ থেকে রূহ কবজ হয়ে গেলো তার। নাওমি কেবল ফ্যালফ্যাল করে দেখলো। কি হলো? বেহজাদ কি মারা গেলো? কই না তো! এইতো চোখ মেলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তাহলে কিছু বলছে না কেন? মৃত্যু কি এমন হয়? এভাবেই হয়? চোখের পলকেই হয়?

পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ইয়ান এতটুকু দৃশ্য দেখলো নীরবে। অতঃপর শেষবারের মতো দেখে নিলো বন্দর হতে বেশ অনেকটা দূরে চলে যাওয়া জাহাজের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা জেইলানকে। চোখে নমনীয়তা দেখা দিলো না তার। চোয়ালও শক্ত রইলো। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে প্রস্থানের পূর্বে কেবল বললো,

“ নাওমিকে ফিটনে করে প্রাসাদে নেওয়ার ব্যবস্থা করো। ওর এই স্থিতি যদি রাজ্যের একটা প্রজাও দেখেছে তবে আমি নিজে তোমাদের গর্দান নিবো। কথাটা মাথায় রেখো। “

ইয়ান চলে যায়। রয়ে যায় কেবল কেভ এবং ক্লাডিয়াস। দু'জনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। হুট করেই কাউন্টকে তারা চিনতে পারছে না। কাউন্টের দৃষ্টি, কথার ধরণ এবং আচরণ সবকিছুই কেমন অতিরিক্ত কঠোর মনে হচ্ছে তাদের। আগের কাউন্টকে কি আর কখনো ফিরে পাবে না তারা?

__________

পৃথিবীর আয়ুষ্কাল থেকে চলে গেলো চারটা বছর। রোমানিয়া রাজ্যের বুকে এক গহীন জঙ্গলের অন্তরালে থাকা বুখারেস্ট প্রাসাদের দৃশ্য। প্রাসাদের দো তলায় একটা কক্ষের ভেতর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে এক রমণী। নিজের ফুলো পেটের উপর রাখা কাঁচের প্লেট হতে আপেলের টুকরো তুলে তুলে মুখে দিচ্ছে সে। কক্ষের দরজায় হতে থাকা অনবরত করাঘাত তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করছে না।

দরজার অপর প্রান্ত হতে ভেসে আসছে একটা পুরুষালি কণ্ঠস্বর,

“ ক্যামেলিয়া! জান! দরজাটা খুলো দয়া করে। আর কতক্ষণ রাগ করে থাকবে? চলো, বাড়ি ফিরি। “

ক্যামেলিয়া একটুও তোয়াক্কা করে না। বাহির হতে পুরুষটা আবার অসহায় স্বরে ডাকে,

“ মাফ করে দাও দয়া করে। এখন থেকে ভুল করেও কখনো অন্য কাউকে জান ডাকবো না। আমার একমাত্র জান তুমি। “

ক্যামেলিয়া এবার নড়ে-চড়ে বসে। ভেতর থেকে প্রশ্ন করে,

“ সত্যি বলছো? “

“ সত্যি মানে? আলবাদ সত্যি বলছি। আমি কখনো তোমার সঙ্গে মিথ্যা বলি? “

ক্যামেলিয়া এবার ফলের প্লেটটা বিছানায় রেখে, আপেলের টুকরোগুলোর পাশ থেকে ছোট চাকুটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ধীর কদমে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে। কেভ সঙ্গে সঙ্গে হাফ ছাড়ে। তবে তার খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ক্যামেলিয়া তার আগেই তার শার্টের কলার টেনে তাকে সম্পূর্ণ কক্ষের ভেতর এনে তার গলার কাছটায় চাকু ধরে ক্রোধ এবং অভিমান নিয়ে বলে,

“ প্রেমের সময় তো দুটো বছর চরকির মতো পিছনে ঘুরে বলেছিলে, আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা কখনো কম হবে না। এখন বিয়ের দুই বছর না যেতেই নিজের কথাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছো। আমার থেকে বেশি এখন তুমি আমার পেটে থাকা এই আনারের দানাকে ভালোবাসো। “

কেভের কপালে চিন্তার ভাজ দেখা যায়। সে প্রশ্ন করে,

“ আনারের দানা কে? “

“ কে আবার? তোমার বাচ্চা। আনারের দানার সমান বাচ্চাকে আর কি ডাকবো? “

কেভ ভালো করে ক্যামেলিয়ার পেটের দিকে লক্ষ্য করে। এক মাস হয়েছে পেট উঁচু হতে শুরু করেছে। পেটের ভেতর বাচ্চার আকৃতিকে আনারের দানা তুল্য বলে মনে হলো না কেভের। সে ক্যামেলিয়াকে চিন্তিত স্বরে বলে,

“ আমার মনে হয় ও এখন আঙুরের সমান হয়েছে। “

ক্যামেলিয়ার কপালে ভাজ পড়লো। সে ভ্রু নাচিয়ে বলে,

“ তুমি কি আমার বাচ্চাকে মাত্র আঙুর বললে? “

কেভকে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত এবং ভীত দেখায়। সে জবাব দেয়,

“ তুমিও তো একটু আগে ওকে আনারের দানা বলেছো। “

ক্যামেলিয়া রেগে যায়,

“ আমার বাচ্চাকে আমি যা ইচ্ছা বলবো। তুমি বলার কে? পেটে আমি রাখবো আর নাম তুমি দিবে? “

ক্যামেলিয়া এবং কেভের কথা কাটাকাটি লেগে যায়। তাদের এই সাংসারিক খুনসুটিতে এবং প্রণয়তিথিতে মুখোরিত হয় বাসকোভ প্রাসাদের প্রতিটা দেয়াল। শত বছর ধরে যে-ই প্রাসাদের আনাচে কানাচে বিচরণ চলতো হিংস্র নেকড়েমানবদের, আজ সে-ই প্রাসাদের দেয়ালেই ঝংকার তুলে মনুষ্য এক সুখী দম্পতির হাসির স্বর।

__________

সিবিউ প্রাসাদ জুড়ে শোরগোল লেগেছে। আজ আবারও প্রিন্সেস নাওমি কাউকে না জানিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে। কোথায় গিয়েছে কারো জানা নেই। স্যাফিরা বিরক্তি নিয়ে আনাস্তাসিয়াকে বলছে,

“ খোঁজার দরকার নেই ওকে। দু'দিন পর পর ও এ-ই নাটক করে। এভাবে সবাইকে হয়রানি করিয়ে ও মজা পায়। “

রাজমাতা আনাস্তাসিয়া বিরক্তি নিয়ে বলে,

“ কাউন্ট প্রাসাদে ফেরার পূর্বে ওকে খুঁজে বের করা জরুরী, স্যাফিরা। ইয়ান যদি ফিরে জানতে পারে নাওমি আবারও কাউকে না জানিয়ে নিখোঁজ হয়েছে তবে এবার আর রক্ষা নেই। গতবার ও সতর্ক করে দিয়েছিলো, আর একবার নাওমি এরকম কিছু করলে ওকে কামরাবন্দী করে দিবে। “

স্যাফিরা বলে,

“ ভুল কিছু তো বলে নি কাউন্ট৷ ওর এই ডানা কাটার জন্য ওকে কামরায় বন্দী করা ছাড়া আর উপায় দেখছি না। ও কি চায় আমি কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছি না। জগতের কোনো কিছুর প্রতি ওর আগ্রহ নেই। একমাত্র প্রকৃতি না-কি ওকে টানে। কি আছে প্রকৃতিতে? আমি কেন খুঁজে পাই না? “

আনাস্তাসিয়া উদাস গলায় বলে,

“ ছেলেমেয়ে দুটোর এ-ই পরিবর্তন আমি এখনো মেনে নিতে পারি না, স্যাফিরা। ওদের সরাসরি কিছু বলতেও কেমন ভয় করে। আমার নরম স্বভাবের ছেলেটা এরকম মনুষ্য রূপের রক্তচোষাদের মতো কিভাবে হয়ে গেলো? ওর দিকে তাকালে ওর চোখে কোনো মায়া খুঁজে পাই না আমি। দুই চোখ ভর্তি কেবল সন্দেহ। আর নাওমি… ওর চোখ জোড়া আমার নিষ্প্রাণ লাগে। ঈশ্বর জানে, কার নজর লেগেছে ওদের দু'জনের! ওদের দু'জনের মধ্যে চলমান নীরব দ্বন্দ্বটা কি নিয়ে সেটা আজও জানা হলো না… “

ছেলেমেয়েদের বদলে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত দুই মা যখন নিজেদের কথায় ব্যস্ত, তখনই কক্ষের দরজায় করাঘাতের শব্দ হয়। আনাস্তাসিয়া অনুমতি দিতেই কক্ষে প্রবেশ করে দক্ষ সৈন্য ক্লাডিয়াস। রাজমাতা এবং লেডি স্যাফিরাকে সম্মান প্রদর্শন করেই সে বলে উঠে,

“ রাজমাতা, আপনি বাবাকে ডেকে পাঠিয়েছেন? বাবা আসলে অসুস্থ বোধ করায় অনুমতি নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। কোনো কাজ থাকলে আমায় বলুন। “

আনাস্তাসিয়া চিন্তিত স্বরে বলে,

“ ক্লাডিয়াস, নাওমিকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও গিয়েছে কেউ জানে না। অস্থবলের কোনো ঘোড়াও সাথে করে নেয় নি। কাউন্ট প্রাসাদে ফিরে এ-ই খবর জানলে তুলকালাম কাণ্ড হবে। সৈন্যদের বলো কাউকে কিছু না জানিয়ে প্রিন্সেসের খোঁজ করতে। কাউন্ট ফিরে আসার পূর্বে আমি নাওমিকে প্রাসাদে দেখতে চাই। “

ক্লাডিয়াসকে চিন্তিত দেখালো। সে রাজমাতার আদেশ মাথা পেতে নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। সৈন্যদের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথেই হঠাৎ করে থেমে গেলো সে। তার মন বলছে, সে জানে প্রিন্সেস কোথায় থাকতে পারে। নিজের অনিশ্চিত আন্দাজের উপর আস্থা রেখেই ক্লাডিয়াস রওনা হয় উক্ত স্থানের উদ্দেশ্যে।

__________

শীতকালের এই সকালটায় তুষারপাত হয়েছিলো। যার দরুন সম্পূর্ণ আঙিনা শুভ্র রঙা তুষার কণা দিয়ে আচ্ছাদিত হয়ে আছে। সে-ই তুষারের বুকেই গাউন কিছুটা উঁচু করে ধরে ধীর কদমে হেঁটে যাচ্ছে প্রিন্সেস নাওমি। তুষারের স্তুপে সে প্রতি কদম ফেলছে এবং তার প্রিয় জুতা জোড়া সঙ্গে সঙ্গে বরফের ভেতর আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

নাওমির কাছে এই কাজটাকে খুব মজার বলে মনে হচ্ছে। নিজেকে আজাদ এবং মুক্ত অনুভব করছে সে। ও-ই প্রাসাদে প্রতিটা মুহূর্ত তার দমবন্ধ হয়ে আসে। নিজের ভাই কম কাউন্ট বেশি লোকটার সঙ্গে একই প্রাসাদে থাকার প্রতি তীব্র অনিহা সৃষ্টি হয়েছে তার। কারণটা বোধহয় বেহজাদ নামক ওই মানুষটার মৃত্যু। নাওমির মনে হয় ভাই তার সঙ্গে খুব বড়ো মিথ্যাচার করেছে।

ভাই বলেছিলো যে তিনি কয়েদীদের নিজ রাজ্যে ফেরত পাঠিয়ে দিবেন। অথচ তিনি কি করলেন? কেবলমাত্র নিজের প্রাণের জেইলানকে যেতে দিলেন। আর শাস্তি দিলেন কাকে? বেহজাদকে! মিথ্যাবাদী ভাই!

ভাবনায় ডুবে থাকা নাওমির হুট করেই পা পিছলে যায়। তবে পড়ে যাওয়ার পূর্বেই কেউ তার হাত ধরে ফেলে। ঘটনার আকস্মিকতায় নাওমি চোখ বুজে নিয়েছিলো। এক মুহুর্তের জন্য তার মনে হয় তার হাত ধরে রাখা ব্যক্তিটা বেহজাদ। কিন্তু চোখ মেলে তাকাতেই তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। তাকে বাঁচিয়ে নেওয়া ব্যক্তিটা বেহজাদ নয় বরং ক্লাডিয়াস।

নাওমিকে ঠিকঠাক দাঁড় করিয়ে দিয়েই ক্লাডিয়াস তাকে ছেড়ে দিয়ে মাথা নত করে বলে,

“ দুঃখিত প্রিন্সেস। পড়ে যাচ্ছিলেন। তা-ই সাহায্য করতে বাধ্য হয়ে হাত ধরেছি। “

নাওমি নিজের হাত ঝাড়া দিতে দিতে প্রশ্ন করে,

“ আমাকে প্রাসাদে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠিয়েছে? “

ক্লাডিয়াস বাধ্য সৈন্যের মতো জবাব দেয়,

“ রাজমাতা আপনাকে শীঘ্রই প্রাসাদে ফিরতে বলেছেন প্রিন্সেস। “

নাওমি কোনো তাড়াহুড়ো দেখালো না। না সে রাজমাতার আদেশ মানলো। উল্টো ধীর কদমে হেঁটে গিয়ে তুষ দূর্গের সিংহ দুয়ারের সামনে সিঁড়ির উপর বসলো। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বলে উঠে,

“ রাজমাতাকে গিয়ে বলে দাও, আমার যখন ইচ্ছে হবে আমি ফিরবো। “

ক্লাডিয়াসকে বিচলিত দেখালো। প্রিন্সেস সময়মতো প্রাসাদে না ফিরলে খুব বড়ো একটা অঘটন ঘটবে। কাউন্ট প্রিন্সেসের জন্য কোন শাস্তি ঘোষণা করে বসেন কে জানে! উঁহু, ক্লাডিয়াস প্রিন্সেসকে বুঝানোর উদ্দেশ্যে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,

“ প্রিন্সেস, দয়া করে জেদ করবেন না। কাউন্টের রাগ সম্পর্কে আপনার ধারণা আছে। উনি দণ্ড দিবেন আপনাকে। “

নাওমি ঘাড়ত্যাড়ামির সুরে জবাব দিলো,

“ কি দণ্ড দিবে? মৃত্যুদণ্ড? পরোয়া করি না। “

ক্লাডিয়াস এবার নাওমির সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে অনুনয় করে,

“ কেন আপনি নিজের জীবন ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন? ফিরে চলুন প্রাসাদে। নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনবেন না। “

নাওমি এবার অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলে,

“ চার বছর পূর্বে আমি তোমাদের কাউন্টকে অনুসরণ করতে করতে এ-ই জঙ্গলে এসে হারিয়ে গিয়েছিলাম জানো? তখন আমি ঘুরতে ঘুরতে এই তুষ দূর্গের সামনে এসে হাজির হয়েছিলাম। সেদিনও আমি নিজেই নিজের জন্য বিপদ ডেকে এনেছিলাম। সবাই ভাবে ও-ই লোকটা আমাকে অপহরণ করেছিলো। অথচ দেখো, আমি নিজের ভুলের কারণেই ও-ই লোকের হাতে বন্দী হয়েছিলাম… তখন এ-ই দূর্গ থেকে আমি সবসময় পালানোর কথা ভাবতাম। সবসময় ভাবতাম কখন প্রাসাদে ফিরতে পারবো। অথচ আজ দেখো, আমি নিজ প্রাসাদ থেকে পালাতে চাই। “

ক্লাডিয়াস কিছুক্ষণ ফ্যাকাশে মুখে দেখে নাওমিকে। অতঃপর কি ভেবে যেনো বলে উঠে,

“ আপনি হয়তো খুব শীঘ্রই ও-ই প্রাসাদ থেকে মুক্তি পাবেন। “

নাওমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টি মেলে তাকায় ক্লাডিয়াসের পানে। ক্লাডিয়াস বলতে থাকে,

“ আপনার পিতা আপনার জন্য একজন পাত্র পছন্দ করেছেন শুনেছি। খুব শীঘ্রই বোধহয় আপনার বিবাহের আয়োজন হবে। আপনি ও-ই প্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ার উছিলা পাবেন। “

নাওমি কিছুক্ষণ ক্লাডিয়াসের দিকে তাকিয়ে থেকে ছোট্ট করে ‘ওহ’ বলে। ক্লাডিয়াস ক্ষানিকটা অবাক হয়। প্রশ্ন করে,

“ আপনার আপত্তি নেই? “

“ আমার কেন আপত্তি থাকবে? আমি তো ও-ই প্রাসাদ থেকে পালাতেই চাই। বিয়ে করে একেবারের জন্য চলে যাওয়ার উপায় থাকলে সেটা কেন হাতছাড়া করবো? “

“ পাত্র কে সেটা আপনার কাছে কোনো ব্যাপার না? “

নাওমি অবহেলার সহিত জবাব দেয়,

“ না। “

উত্তরটুকু দিয়েই নাওমি ঘাড় ঘুরিয়ে দূর্গের আঙিনার পানে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সত্যিই তো পাত্র কে সেটা দিয়ে তার কিচ্ছু যায় আসে না। যার জন্য মনে অনুভূতি জন্মেছিলো, তাকেই যেহেতু আর পাওয়া হলো না তাহলে অন্য কাকে পাচ্ছে, সেটা দিয়ে কি-ই বা আসে যায়? সে চোখ বুজে বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস টেনে নেয়। এ-ই ট্রান্সেলভেনিয়া তার একটা না হওয়া প্রণয়ের গল্পের সাক্ষী। সে-ই প্রণয়ের প্রতিটা তিথির সাক্ষী। সে কেবল মাঝেমধ্যে এই ট্রান্সেলভেনিয়ায় এসে একটু ঘুরে যেতে চায়।

ক্লাডিয়াস হতাশ ভঙ্গিতে দেখতে থাকে নাওমির চোখ বুজে রাখা ওই মুখখানি। তার সামনে বসে থাকা এ-ই মানুষটাকে সে দূর থেকে চাঁদ ভেবে ভালোবেসেছিল। কখনো পাওয়ার আশা করে নি। অথচ তার ভাগ্যরেখা যখন এই চাঁদতুল্য মানুষটার সঙ্গে জুড়তে চলেছে, তখন কি-না এই মানুষটার তা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথাই নেই! কি ভাগ্য তার! নাওমিকে পেয়েও যেনো তার পাওয়া হলো না।

__________

তুরস্ক সাম্রাজ্যের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদের সবথেকে উঁচু কক্ষের ঝুল বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখছে জেইলান। উঁহু, শুধু জেইলান নয় সে। তার নামের আগে ‘মালিকা’ পদবীটাও তো যুক্ত হয়েছে। মালিকা জেইলান! গোটা একটা রাজ্যের রাণী। নিজ বংশে প্রথম নারী শাসক।

কি বিশাল এক প্রাপ্তি! অথচ এ-ই প্রাপ্তিটাই যেনো তার সবথেকে বড়ো বোঝা। রোজ নিজের দুই ভাইজানের রক্তে রঞ্জিত ও-ই সিংহাসনটায় বসে গোটা রাজ্যের ভার বয়ে চলাটা যেনো তার সবথেকে বড়ো শাস্তি। নিজ রাজ্যের মানুষ গুলো এবং নিজের দায়িত্বদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে না পারাটা যেনো তার জন্য খুব বড়ো কোনো শাস্তি।

কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট ঠিকই বলেছিলো। সেদিন জেইলানের জীবন ভিক্ষা দেওয়াটাই আজ জেইলানের সবথেকে বড়ো দূর্ভাগ্য। প্রতিনিয়ত সে আফসোস করে, কেন ইয়ান সেদিন তাকে মারলো না। নিজ চোখে নিজের ভাইয়ের মৃত্যু দেখার থেকে সেদিন মরে যাওয়াটা জেইলানের জন্য সহজ হতো। এতো বড়ো প্রতারণার আঘাত সয়ে বেঁচে থাকার তুলনায় সেদিন মরে যাওয়াটা জেইলানের জন্য সহজ হতো। প্রতি মুহূর্তে এভাবে দমবন্ধ অনুভব করে বেঁচে থাকার তুলনায় সেদিন মরে যাওয়াটা জেইলানের জন্য সহজ হতো।

ইয়ান নিজের কথা রেখেছে। সে জেইলানকে প্রতারণার বিনিময়ে সবথেকে কষ্টদায়ক শাস্তিটাই দিয়েছে। এমনকি আজও জেইলানকে শাস্তি দিয়ে চলেছে সে। প্রতিমুহূর্ত জেইলানের রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বারংবার অস্থিতিশীল করে তুলে জেইলানকে দৌড়ের উপর রেখে সে শাস্তি দিয়ে চলেছে। গ্রীক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গোটা গ্রীককে নিজের মুষ্টিতে নিয়েও সে জেইলানকে শাস্তি দিয়েছে। জেইলানের শত্রু গ্রীক কাউন্ট এবং প্রিন্সকে খুন করে দিয়ে জেইলানকে শত্রুমুক্ত করে দেওয়ার মাধ্যমে সে জেইলানের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগটুকু অব্দি ছিনিয়ে নিয়েছে।

জেইলানের বাকিটা জীবনও যে এই শাস্তির মধ্যে দিয়েই যাবে তা জেইলান ভালো করেই জানে। ইয়ান আলবার্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জেইলানকে এভাবেই জ্বালিয়ে মারবে। এ-ই ইয়ান আলবার্টের ভয়ংকর শাস্তিতে প্রতিনিয়ত পুড়তে হবে জেইলানকে।

__________

মধ্যরাতে প্রবল তুষারপাত হচ্ছে রাজ্য জুড়ে। নিজের কক্ষের বারান্দায় থাকা ডিভানে গ্লাস হাতে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে আছেন কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। একটু পর পরই গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে সে। হুট করেই কাধে নরম দু'হাতের স্পর্শ অনুভব করলো সে। কানের কাছে আকর্ষণীয় একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠলো,

“ ঘাড় ব্যথা করছে? একটু মালিশ করে দেই? আরাম পাবেন। “

ইয়ান জবাব দিলো না। এক চুমুকে গ্লাসের সবটুকু পানীয় শেষ করলো। অতঃপর আচমকাই হাতের মালকিনকে পিছন থেকে হ্যাচকা টানে নিজের কোলে এনে ফেললো সে। বারান্দার দুই পাশে জ্বলতে থাকা মশালের আলোয় দেখলো নিজের স্ত্রী এথেনার মুখখানা। গ্রীক দেবীদের সৌন্দর্যের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখা এ-ই নারীর আরেকটা পরিচয় হলো সে গ্রীক সাম্রাজ্যের প্রিন্সেস ছিলো এককালে। তার পরিবারকে যুদ্ধে পরাজিত করে এবং তাদের প্রাণ নিয়ে প্রিন্সেস এথেনাকে রোমানিয়াতে তুলে এনেছিলো কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। অতঃপর সবার মতের বিপক্ষে গিয়ে জোরপূর্বক বিয়েও করে এথেনাকে। প্রথম প্রথম এথেনা এ-ই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলো। কিন্তু বিয়ের পর ধীরে ধীরে নিজের ভাগ্য মেনে নেয় সে। একটা সময় ইয়ানের প্রতিও আকর্ষিত হয়ে পড়ে।

এথেনার এ-ই সুন্দর মুখখানাকে সবসময়ই কোনো ছলনার ফাঁদ বলে মনে হয় ইয়ানের। সে ছলনায় পা দেয় না। উল্টো সন্দেহ নিয়ে বলে,

“ ঘাড় মালিশ করার নাম করে গলা টিপে হত্যা করতে এসেছো? “

এথেনা জবাব দেয়,

“ তোমাকে খুন করার হলে কি বিগত তিন বছরে আমি কম চেষ্টা করতাম? “

ইয়ান অবিশ্বাসের সহিত বলে,

“ নারী তুমি, বিশ্বাস নেই কখন ঘাত করো। “

এথেনা ক্ষানিকটা গা ঘেঁষে ইয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করে,

“ আমি বুঝে উঠতে পারি না তুমি কোনটাকে বেশি ভয় করো। নারীকে? নাকি প্রতারণাকে? “

ইয়ানের চোখের সামনে হুট করেই এক ছলনাময়ী নারীর ছবি ভেসে উঠে। সে সঙ্গে সঙ্গে রেগে যায়। এক ঝাটকায় এথেনাকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গমগমে স্বরে আদেশ করে,

“ আমাকে বিরক্ত করবে না। খুন করে ফেলবো একদম। গিয়ে ছেলেকে সামলাও। “

এথেনা অপমানিত বোধ করে। ইয়ানের এ-ই অনাগ্রহ প্রতিনিয়ত তাকে অপমানিত অনুভব করায়। এ-ই অমানুষ কোন মাটির তৈরী তার জানা নেই। এথেনা এ-ই রাজ্যকে একজন উত্তরাধিকার দেওয়ার পরও ইয়ানের আচরণ এখনো সে-ই আগের মতোই রয়ে গিয়েছে। এথেনার মাঝেমধ্যে মনে হয় তার স্বামী হলো মানুষ রূপী কোনো রক্তচোষা। যার অন্তর জুড়ে কেবল সন্দেহ এবং সন্দেহ। বিন্দুমাত্র মায়া অবশিষ্ট নেই সেখানে।

রাগ নিয়ে এথেনা বারান্দা থেকে প্রস্থান করতেই ইয়ান আকাশে চাঁদ খোঁজার চেষ্টা করলো। কিন্তু তীব্র তুষারপাতের কারণে আকাশে চাঁদের দেখা পাওয়া দুষ্কর। ঠিক যেমন ইয়ানের জীবনে এখন ভরসার খোঁজ পাওয়া দুষ্কর। এ-ই সবকিছুর পিছনে দায়ী একমাত্র মাহশা! প্রতারিত হয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ঘুরে আসাটাই ইয়ানকে বদলে দেওয়ার পিছনে দায়ী। সে এখন কাউকে ভরসা করতে পারে না। সর্বক্ষণ সন্দেহ মনে নিয়ে ঘুরে। ইয়ানের অজান্তেই এ-ই সন্দেহ এবং অবিশ্বাস এক প্রকার মানসিক রোগে রূপান্তরিত হয়েছে। কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে বানিয়ে তুলেছে ইতিহাসের পাতায় সকলের আতংকের কারণ। এ-ই বিধ্বংসী ইয়ান আলবার্ট কেবল প্রতিনিয়ত একটাই বাক্য আওড়ায়,

“ তোমাকে কক্ষনো ক্ষমা করবো না, মাহশা। “

সমাপ্ত

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন