ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

৫৫তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫৫.

পরিচিত বাসকোভ প্রাসাদটা আজ বড়োই অচেনা লাগছে ক্যামেলিয়ার নিকট। প্রাসাদের সিংহদ্বার দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই সে হতবিহ্বল হয়ে যায়। তার সামনে বিশাল হলরুম জুড়ে একটা লাল রঙা আলোর আভা বিরাজ করছে। সে-ই আলোর উৎস কি তা ক্যামেলিয়ার জানা নেই। তবে সে-ই আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেলো সম্পূর্ণ হলরুম জুড়ে তার পালের সকল সদস্যরা উপস্থিত আছে। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সকলে। এতো এতো পরিচিত মুখের মধ্যে নিজের পিতার মুখটাও দেখতে পেলো ক্যামেলিয়া। এখানে ঠিক কি হচ্ছে তা এখনো ক্যামেলিয়ার বোধগম্য হচ্ছে না।

সে আগ্রহী স্বরে সবাইকে ডাকে,

“ কি হচ্ছে এখানে? “

তার কণ্ঠস্বর সকলের কানে পৌঁছালো কি-না কে জানে। কিন্তু কেউ তাকালো না তার দিকে। ক্যামেলিয়া এবার আরো অবাক হয়। সে একটু ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখতে পায় সকলেই আজ কালো পোশাক পড়েছে। হচ্ছেটা কি এখানে?

ক্যামেলিয়া অস্থির হয়ে এবার পাল সদস্যদের ভীড়ের মধ্যে দিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। এক এক করে ডাকতে থাকে সকলকে। সবাই সজাগ দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ-ই তার দিকে তাকাচ্ছে না। কেবল আপনমনে বিড়বিড়িয়ে কিছু একটা পড়ছে। কেভ তখন সবে প্রাসাদে প্রবেশ করেছে। দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এরকম অদ্ভুৎ দৃশ্য দেখে সে আপন জায়গায়ই থমকে গিয়েছে।

ক্যামেলিয়া ততক্ষণে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নেকড়ে সদস্যদের মাঝ বরাবর ফাঁকা জায়গাটায় গিয়ে পৌঁছায়। মধ্যবর্তী জায়গাটুকুতে পৌঁছাতেই সে একটা দৃশ্য দেখে ভীত ভঙ্গিতে দু কদম পিছিয়ে যায়। খালি মেঝেটার উপর সাদা রঙের কিছু একটার গুড়ি দিয়ে প্রতীকী কিছু একটা আঁকা হয়েছে। একটা গোল প্রতীকীর মধ্যে তারা আকৃতির প্রতীকী। সে প্রতীকের পাশেই কোনো একটা পশুর মস্তক, একটা পাত্রে করে তাজা রক্ত এবং কিছু জ্বলন্ত মোমবাতি রাখা আছে।

এসব! এসব তো অশুভ কিছুর পূজায় ব্যবহৃত হয়। এখানে… এখানে কি শয়তানের পূজা চলছে? প্রশ্নটা ক্যামেলিয়ার মাথায় উদয় হতেই সে ভীত দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকায়। এ-ই অস্থিরতা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে উঠে,

“ কি করছো তোমরা? “

কেভ দূরে দাঁড়িয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় কেবল দেখে যাচ্ছে সব। সে এতটাই অবাক যে কোনো প্রতিক্রিয়া দিতেও ভুলে গিয়েছে। হুট করে হলরুম জুড়ে মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করে। নেকড়েদের গোলকের ঠিক মাঝখানটায় হাওয়ায় ভেসে থাকা ওরেল রদ্রিগেজকে সাদৃশ্য হতে দেখা যায়। ওরেলের উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গেই সকলের বিড়বিড় আওয়াজ থেমে যায়। সকলেই চোখ তুলে তাকায় ওরেলের পানে।

ওরেলকে দেখতেই ক্যামেলিয়া নিশ্চুপ হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। মনে মনে কিছু একটা হিসাব মিলিয়ে নেয় সে। কি হতে চলেছে তা আন্দাজ করতেই সঙ্গে সঙ্গে সে আতংকিত স্বরে চেঁচিয়ে উঠে,

“ না। “

ওরেল চোখের ইশারায় আরোণকে অনুমতি দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আরোণ মেয়ের পানে তাকায়। দ্রুত এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। ক্যামেলিয়া ছোট্ট বিড়াল ছানার মতো নিজের বাবার বুকে গুটিয়ে গিয়ে বলে,

“ তুমি… তুমি মৃত্যুকে বেছে নিয়েছো? “

আরোণ মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে ধরা গলায় আওড়ায়,

“ আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি, জান। “

ক্যামেলিয়া নিজের পিতার কথার অর্থ বুঝতে পারে না। আরোণ মেয়েকে আরো কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে রেখে অতঃপর সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মেয়ের মুখটা দু'হাতের আগলে নিয়ে কোমল স্বরে বলে,

“ তোমাকে আর এই অভিশপ্ত নেকড়ে সত্তা বয়ে বেড়াতে হবে না, ক্যামি। আজকে থেকে তুমি সাধারণ মানুষ হয়ে বাঁচবে। শয়তানের পূজা এবং জাদুবিদ্যা দিয়ে যে-ই নেকড়েমানব জীবনের

সূচনা হয়েছিলো, তার ইতি ঘটবে আজ। প্রকৃতি অভিশাপ মুক্ত হবে। সেইসঙ্গে তুমিও। “

আরোণের কথার অর্থ বুঝতে পেরেই ক্যামেলিয়া দ্রুত দু পাশে মাথা নাড়ায়। কান্না জর্জরিত কণ্ঠে বলে,

“ লাগবে না। আমি মানুষ হতে চাই না। আমি তোমাকে চাই, বাবা। তোমাদের সবার সাথে থাকতে চাই। বন্ধ করো এসব। “

আরোণের বুকের ভেতর কিছু একটা কামড়ে ধরেছে যেনো। চোখের সামনে ক্যামেলিয়ার বেড়ে উঠার বিভিন্ন স্মৃতি ভেসে উঠছে। সে শক্ত করে আরো একবার ক্যামেলিয়াকে জড়িয়ে ধরে বুঝানোর স্বরে বলে,

“ বাসকোভ প্রাসাদে একা থাকতে হবে না তোমাকে। রাজধানীর লোকালয়ে তোমার জন্য একটা বাড়ি কিনে রেখেছি আমি। বাড়ির দলিলপত্র সব আমার কক্ষের টেবিলেই পেয়ে যাবে। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সব আছে ওখানে। বিগত বছর গুলোয় চামড়া ব্যবসায় বিনিয়োগ করে আমার যত লাভ হয়েছে, সে-ই সকল মুদ্রাও আমার কক্ষের সিন্দুকে রাখা আছে। চাবি কোথায় সেটা তুমি জানো। ও-ই মুদ্রা যথেষ্ট হবে তোমার জন্য। কখনো একা লাগলে সিবিউ প্রাসাদে যেয়ে ঘুরে আসবে। ওখানে তোমার আপনজনরা আছে। আমি যেহেতু থাকবো না সেহেতু তোমার মায়ের কবর ফলকের পাশে ফুল গাছ গুলোর দেখাশোনা তুমি করবে। এ-ই একটা কাজ আমি তোমাকে দায়িত্ব হিসেবে দিচ্ছি। সবসময় ভালো থাকবে, ঠিকাছে? এতটা ভালো থাকবে, যেনো কখনো কেউ তোমাকে দয়া দেখানোর সুযোগ না পায়। তুমি শুনছো, ক্যামি? বুঝতে পারছো আমার কথা? “

ক্যামি শুনতে চায় না কিছু, বুঝতে চায় না কিছু। কেন শুনবে সে? সে এসব কিছু চায় না। সে শুধু নিজের বাবাকে চায়। নিজের বাবার বিনিময়ে পৃথিবীর কোনো কিছু চাই না তার।

ওরেল এবার পিছন থেকে জানায় যে চন্দ্রগ্রহণের ক্ষণ শুরু হবে এক্ষুণি। আরোণ জানে ক্যামেলিয়া সহজে তাকে ছাড়বে না। সে তা-ই দ্রুত আশেপাশে তাকায়। দূরে দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কেভকে দেখতেই সে ইশারা করে ক্যামেলিয়াকে নিয়ে যাওয়ার। কেভ দ্বিধাগ্রস্ত। এ-ই মুহূর্তে ক্যামেলিয়াকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করতে গেলে ক্যামেলিয়া খুন করে ফেলবে তাকে। কিন্তু আরোণের কঠিন আদেশ দৃষ্টিও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

কেভ সাহস করে এগিয়ে আসে। ভীড়ের মাঝ দিয়ে হেঁটে এসে ক্যামেলিয়াকে জোর করে আরোণের বুক থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ক্যামেলিয়া আরো জোরে আরোণকে জড়িয়ে ধরে রেখে কান্না করতে করতে মাথা নাড়তে থাকে। সে ছাড়বে না নিজের বাবাকে। আরোণ নিজেই বাধ্য হয়ে মেয়ের হাতের বাধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে। ক্যামেলিয়াকে ঠেলে দেয় কেভের কাছে।

ক্যামেলিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়। কেভের জন্য কঠিন হয়ে যায় ক্যামেলিয়ার শক্তির সঙ্গে পেরে উঠা তবুও সে নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে ক্যামেলিয়াকে জাপ্টে ধরে পিছিয়ে যেতে থাকে। আরোণ ঠিক সে-ই মুহূর্তে ডেকে উঠে,

“ ক্যামি! “

ক্যামেলিয়া নিজেকে ছাড়ানোর জন্য জোরাজুরি থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আরোণের পানে। আরোণ সামান্য হেসে বলে,

“ বাবা তোমাকে সবথেকে বেশি ভালোবাসি। “

ঠিক এ-ই মুহূর্তে এসে কেভের বুক মোচড় দিয়ে উঠে। এ-ই করুণ দৃশ্যটা তারও মন খারাপ করে তুলে। ক্যামেলিয়া কিছু বলবে তার পূর্বেই আরোণ সঙ্গে সঙ্গে নিজের জায়গায় ফিরে যায়। ওরেল কিছু একটা মন্ত্র পড়তে শুরু করে। ক্যামেলিয়া চিৎকার করে উঠে। নিজেকে ছাড়াতে কেভকে আঘাত করে। দৌড়ে এগিয়ে যেতে নেয় আরোণ এবং নিজের পালের কাছে। কিন্তু তার পূর্বেই ওরেলের উচ্চারিত মন্ত্রে তার মস্তিষ্ক এবং শরীর জুড়ে অসহ্যকর যন্ত্রণা শুরু হয়। সে দু হাতে নিজের দুই কান চেপে ধরে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। আরোণ দূর থেকে দেখে সবই। কিন্তু আজ আর সে এগিয়ে যায় না ক্যামেলিয়ার কাছে। বরং নিজেদের কাজে মন দেয়।

আঘাতের পরোয়া না করে কেভ এগিয়ে এসে ক্যামিকে আগলে ধরে। ক্যামেলিয়া তখনও দু'হাতে নিজের কান চেপে ধরে রেখে ছটফট করছে। ইচ্ছে করছে ছুটে এখান থেকে অনেক দূরে চলে যেতে। যত দূরে গেলে এই মন্ত্রের শব্দ তার কান অব্দি পৌঁছাতে পারবে না।

প্রাসাদের সিংহ দুয়ার খোলাই ছিলো। হুট করেই প্রচন্ড বেগে বাতাস বইতে শুরু করে। খোলা দুয়ার হয়ে সে-ই বাতাস প্রাসাদে প্রবেশ করে সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস চালায়। নিভিয়ে দেয় প্রাসাদের দেয়ালের কোণায় কোণায় জ্বলতে থাকা আগুনের মশাল এবং মোমবাতি গুলোকে। পুরো প্রাসাদ ডুবে যায় আঁধারে। ঠিক যেমন আকাশের চাঁদটাও এ-ই মুহূর্তে আঁধারে ডুবে গিয়ে পৃথিবীটাকে অন্ধকার করে দিয়েছে। ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে চোখ দুটো সয়ে যেতেই কেভ লক্ষ্য করে হলরুমের মধ্যে সকল নেকড়েমানবদের কেবল ছায়া দেখা যাচ্ছে।

মন্ত্র পড়তে পড়তেই ওরেল মেঝেতে আঁকা গোলকটার মাঝে একটা মোটা মোমবাতি রেখে সেটা জ্বালিয়ে দেয়। কিছুটা আলোকিত হয় চারিপাশ। সে-ই আলোতে কেভ লক্ষ্য করে তার বুকে আগলে রাখা ক্যামেলিয়ার শরীরের পশম ভেদ করে নেকড়েদের মতো বিশাল বিশাল লোম্ব বেরিয়ে আসছে। হাত পায়ের সাধারণ নখগুলোও ধারালো এবং লম্বা আকৃতি ধারণ করছে। তবে পুরোপুরি নেকড়েতে রূপান্তরিত হচ্ছে না সে। কেভের ভয় লাগলেও সে ক্যামেলিয়াকে ছাড়ে না। ঘৃণ্য নেকড়ে পশমের রমণীটাকে আগলে ধরে রেখেই ঈশ্বরের কাছে সাহায্য চাইতে থাকে মনে মনে।

সে জানে না আরোণের বলা কথা আদৌ সত্যি হবে কিনা। সত্যিই ক্যামেলিয়া পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারবে কি-না। কিন্তু যদি এটা সত্যি হয়, তবে এবারই শেষবার ক্যামেলিয়াকে এই যন্ত্রণাটুকু ভোগ করতে হবে। এরপর আর কখনো এ-ই অভিশপ্ত অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে তাকে যেতে হবে না। কেভ নিজে সে-ই সুযোগ দিবে না।

ওরেল এবার মন্ত্র পড়া থামাতেই ক্যামেলিয়া দূর্বল ভঙ্গিতে নিজের শরীর এলিয়ে দেয় কেভের বুকে। হুট করে কি হয়েছে কে জানে! শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি অনুভব করছে না সে। কিছু বলার মতো শক্তিটুকুও যেনো নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে ভেতর থেকে। ওরেল দূর হতে কেভকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

“ নিজের গলার ক্রুশের হারটা ক্যামেলিয়াকে পড়িয়ে দাও দ্রুত। যতক্ষণ না সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে ততক্ষণ ওর গলা থেকে হার খুলবে না। একবার ওর নেকড়ে সত্তা বিলীন হয়ে গেলে ওকে পবিত্র জল এনে সেটা দিয়ে স্নান করে নিতে বলবে। “

কেভ ওরেলের কথা অনুযায়ী কাজ করে। নিজের গলার ক্রুশের হারটা শার্টের আড়াল থেকে বের করে খুলে ক্যামেলিয়ার গলায় পড়িয়ে দেয়। তবে হারের ক্রুশটা ক্যামেলিয়ার গলার কাছের ত্বক স্পর্শ করতেই ক্যামেলিয়া আবারও চিৎকার করে উঠে। তার মনে হচ্ছে যেনো তার গলার ও-ই চামড়াটুকু আগুনে ঝলছে গিয়েছে।

এবার শুরু হয় আসল প্রক্রিয়া। ওরেল ফের মন্ত্র জপতে শুরু করে। সে ইশারা করতেই একে একে সকল নেকড়ে সদস্যরা একটা খঞ্জর নিজেদের হাতে তুলে ধরে। অতঃপর ওরেল আরো একবার ইশারা করতেই সকলে খঞ্জরের সাহায্যে নিজেদের এক হাতের কব্জির কাছে ক্ষানিকটা চামড়া একটানে কেটে ফেলে। টুপটুপ করে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ওরেলের নির্দেশ মোতাবেক তারা একে একে গলকের কাছে গিয়ে সে-ই অজানা প্রাণীর মাথার উপর নিজেদের হাত ধরে রাখে। যতক্ষণ না তাদের হাতের রক্তের একবিন্দু সে-ই প্রাণীর মাথা স্পর্শ করছে।

কাজটুকু শেষ হতেই সবাই নিজ নিজ স্থানে ফিরে দাঁড়ায় গোল হয়ে। এবার সকলেই একে অপরের হাত ধরে চোখ বুজে ওরেলের সঙ্গে একই ধ্বনিতে তাল মিলিয়ে শয়তানের আহবান করতে থাকে। নিজেদের সমস্ত ক্ষমতা উৎসর্গ করে এবং নিজেদের অস্তিত্ব বলি দেওয়ার মাধ্যমে ক্যামেলিয়াকে মানব জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটা কেভকে অব্দি অসুস্থ করে তুলে। সে সহ্য করতে পারে না সে-ই ভয়ংকর নেকড়েদের কলধ্বনি। তার বুকে আগলে রাখা ক্যামেলিয়া ইতিমধ্যে ছটফট করতে করতে জ্ঞান হারিয়েছে। কেভও এ-ই পর্যায়ে ভয়ংকর মাথাব্যথা অনুভব করে। ধীরে ধীরে সে-ও জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।

কোনো মানুষই আর সাক্ষী হলো না একটা অভিশপ্ত অধ্যায়ের সমাপ্তির। কেউ-ই দেখলো না কিভাবে এক পাল নেকড়ের জীবনের ইতি ঘটলো। নেকড়েমানবদের পাল এমনভাবেই নিশ্চিহ্ন হলো যেনো তাদের কখনো কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় আলফা আরোণ রদ্রিগেজ। দীর্ঘ জীবনের শেষ টেনে সে আজ হতে মুক্ত।

__________

আজকের সকালটার অপেক্ষায় ছিলো অনেকগুলো প্রাণ। প্রত্যেকেই রাতভর জেগে অপেক্ষা করেছে দিনের প্রথম প্রহরের আলো ফোটার। কেউ কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে নিরাপদে নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে দেখতে অপেক্ষারত, কেউ নিজের অপরাধীকে শাস্তি পেতে দেখার প্রথম ঝলকের জন্য অপেক্ষারত, কেউ রাজ্যে ফিরে নিজের শাস্তির প্রহর শুরু করতে অপেক্ষারত তো কেউ এতো গুলো দিন বন্দী অবস্থায় কাটানোর পর নিজের বোনকে দেখতে অপেক্ষারত। সকলের অপেক্ষা ফুরাবে কি-না কে জানে!

নাওমি সকাল সকালই ঘুম থেকে উঠে তৈরী হয়ে নিলো। বেহজাদরা আজ নিজ রাজ্যে ফিরে যাবে! যাওয়ার পূর্বে শেষবারের মতো একবার দেখা করাটা খুব জরুরী। নিজের মনকে তৃপ্ত করার জন্য হলেও নাওমি শেষ বারের মতো দেখা করতে যাবে। উদগ্রীব সে দাসীদের তাড়া দিলো। দাসীরা ব্যস্ত ভঙ্গিতে তাকে সাজাতে ব্যস্ত। নাওমির সে-সব দিকে হুশ নেই। সে ছটফট করছে দ্রুত বেহজাদের নিকট যাওয়ার জন্য।

ভাবছে সঙ্গে করে একজন চিকিৎসক নিয়ে যাবে সে। সমুদ্র পথে বেহজাদের সঙ্গেই সে-ই চিকিৎসককে পাঠাবে। বেহজাদের হাতের যা চিকিৎসা প্রয়োজন তা পথেই দিয়ে দিবে। ক্ষতটা নিয়ে অবহেলা করা ঠিক হবে না। তুরস্কে পৌঁছাতেও ওর কয়েকদিন সময় লেগে যাবে। বেহজাদ পৌঁছে গেলে না-হয় চিকিৎসক ফেরত চলে আসবে জাহাজে করে। ফিরে এসে নাওমিকে জানাতেও পারবে যে বেহজাদ ঠিকঠাক পৌঁছেছে কি-না।

__________

অদ্ভুৎ ধরনের শরীর ব্যথা নিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকায় ক্যামেলিয়া। মাথাটা ভার অনুভব করছে সে। মনে হচ্ছে এক দীর্ঘ ঘুম দিয়ে কেবল উঠলো ও। ঘাড় কাত করে আশেপাশে তাকাতেই ক্যামেলিয়া দেখে তার মাথাটা কেভের বুকে ঠেকে আছে। কেভ কেমন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। বিশাল এই হলরুমে কেবল তারা দু'জন ব্যতীত আর কেউ নেই। মেঝে জুড়ে ময়লার ন্যায় কিসের গুড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অবহেলায় পড়ে আছে কিছু মোমবাতি।

ক্যামেলিয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেলো গতরাতের কথা। বাবা? বাবা কোথায় ওর? নেকড়ে পালের সদস্যরা? সবাই কোথায়? প্রাসাদ এতো নিস্তব্ধ লাগছে কেন?

ক্যামেলিয়া দ্রুত উঠে বসে। শরীর এখনো দূর্বল লাগছে তার। ব্যথাটাও প্রতিটা রন্ধে রন্ধে ছড়িয়ে আছে। ক্যামেলিয়া সে-সবের তোয়াক্কা করলো না। সে চারিপাশে আরোণকে খুঁজতে খুঁজতে ডাকে,

“ বাবা, বাবা… “

ক্যামেলিয়ার আওয়াজে কেভেরও হুশ ফিরে আসে। সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে চোখ মেলে তাকায়। দেখে ক্যামেলিয়া প্রাসাদ জুড়ে ছোটাছুটি করছে ক্লান্ত কদমে। খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজের আপনজনদের। কেভ তড়াক ভঙ্গিতে উঠে যায়। ছুটে যায় ক্যামেলিয়ার কাছে। ক্যামেলিয়ার দু বাহু চেপে ধরে প্রশ্ন করে,

“ ক্যামেলিয়া? ঠিক আছো তুমি? খারাপ লাগছে? “

ক্যামেলিয়া জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে,

“ আমার বাবা কোথায়? দেখছি না কেনো? সবাই কোথায়? এতক্ষণ ধরে ডাকছি। কেউ সাড়া দিচ্ছে না কেন? “

ক্যামেলিয়ার প্রশ্ন শুনে এবার কেভও চারিপাশে চোখ বুলায়। আসলেই তো! কেউ নেই চারিপাশে। সবাই কি তাহলে… সত্যি সত্যিই নেকড়েদের অস্তিত্ব মিটে গিয়েছে? কেভ বিস্মিত ভঙ্গিতে ক্যামেলিয়ার পানে তাকায়। ক্যামেলিয়া সম্পূর্ণ মানব রূপেই আছে। গতকাল রাতের গায়ের ওই পশম গুলো, লম্বা নখর কিচ্ছু নেই এখন। তারমানে? কেভ অবিশ্বাস্য স্বরে বলে,

“ ক্যামেলিয়া, তুমি আমাদের মতো হয়ে গিয়েছো! তোমার নেকড়ে সত্তা বিলীন হয়ে গিয়েছে। তুমি এখন সাধারণ মানুষ! “

ক্যামেলিয়া বিশ্বাস করতে চায় না। কি যা-তা বলছে কেভ! এ-ই সত্যিটা বিশ্বাস করতে হলে তার এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে তার পিতা আর নেই। নিজ অবিশ্বাস থেকে ক্যামেলিয়া দু কদম পিছিয়ে যায়। সে চেষ্টা করে নিজের নেকড়ে রূপ ধারণ করার। কিন্তু অদ্ভুৎভাবে সে ব্যর্থ হয়। কোনো পরিবর্তন আসে না তার মাঝে। উঁহু, এটা হতে পারে না। ক্যামেলিয়া এবার বাতাসের বেগে হলরুম জুড়ে দৌড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার দৌড়ের গতি কোনোভাবেই বাতাসের বেগের সঙ্গে তাল মিলায় না। উল্টো দূর্বলতার কারণে সে দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খেতে নেয়। কেভ তাকে সামলে ফেলে।

ক্যামেলিয়া তবুও হার মানে না। সে তো নেকড়েকন্যা! তার খুব শক্তি আছে। গতকালই তো সে কেভকে আঘাত করে কুপোকাত করে ফেলেছিল। ক্যামেলিয়া শেষ চেষ্টা চালায়। নিজের সব শক্তি দিয়ে কেভের বুকে আঘাত করে। কিন্তু কেভের কিচ্ছু হয় না। সে সটান দাঁড়িয়ে থাকে। ক্যামেলিয়ার চোখেমুখে অবিশ্বাস। সত্যি সত্যিই সে সম্পূর্ণ মানব সত্তার অধিকারী হয়ে গিয়েছে? সত্যি সত্যিই?

ক্যামেলিয়া এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। দু'হাতে মুখ ঢেকে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ে সে। চিৎকার করে কেবল কাদতে থাকে। এসব কি হলো? কেন হলো? সে তো এসব চায় নি। সে তো বাবাহীন এই জীবনটা চায় নি। তাহলে কেন হলো এসব?

কেভ হাঁটু গেড়ে বসে ক্যামেলিয়াকে আগলে ধরতে চায়। ক্যামেলিয়া সুযোগ দেয় না। গা ঝাড়া দেয়। চিৎকার করে বিলাপ করতে থাকে,

“ আমার বাবা… আমার বাবাকে এনে দাও… আমি লোকালয়ের জীবন চাই না। আমি এ-ই জঙ্গলেই থাকবো আজীবন। আমাকে শুধু আমার বাবা এনে দাও… “

বলতে বলতে ক্যামেলিয়া আবারও জ্ঞান হারায়। কেভ চিন্তিত হয়ে তাকে আগলে ধরে। কি করবে সে? এ-ই বিশাল জঙ্গলে একা ক্যামেলিয়াকে কি করে সামলাবে? কেভের তখনই মনে পড়ে পবিত্র জলের কথা। তার এখন সবার আগে পবিত্র জলের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্যামেলিয়াকে একা এ-ই প্রাসাদে রেখে রাজধানীতে যাওয়া সম্ভব না। তাই কেভ সিদ্ধান্ত নেয় সে ক্যামেলিয়াকে সঙ্গে নিয়েই সরাসরি সিবিউ প্রাসাদে যাবে। ওখানে পবিত্র পানির ব্যবস্থা সহজেই হয়ে যাবে। তাছাড়া কাউন্ট এবং রাজমাতাকে গতরাতে ঘটে যাওয়া সবকিছুর ব্যাপারে জানাতে হবে তার। রাজমাতার কাছে ক্যামেলিয়া থাকলে কেভও কিছুটা ভরসা পাবে।

__________

একজন চিকিৎসক সহ কেভের বাড়ির সামনে এসে হাজির হতেই প্রিন্সেস নাওমি কিছুটা অবাক হলো। গতকালের মতো আজ বাসার বাহিরে খুব একটা প্রহরী নেই। কেবল এক দু জনকে দেখা যাচ্ছে। নাওমি এগিয়ে যেতেই প্রহরী দু'জন তাকে সম্মান প্রদর্শন করলো। নাওমি সরাসরি প্রশ্ন করে,

“ প্রধান সেনাপতি বাসায় আছেন? “

“ না প্রিন্সেস৷ উনি গতরাতে বাসায় ফিরেন নি। সম্ভবত প্রাসাদেই আছেন। “

নাওমির কপাল কুচকে যায়। আসার সময় তো প্রধান সেনাপতিকে সে প্রাসাদে দেখে নি। তাহলে? নাওমি কেভের ব্যাপারে আর বেশি মাথা ঘামায় না। কেভ বাড়িতে না থাকাতে উল্টো সুবিধাই হয়েছে। সে বিনা বাধায় বেহজাদের সঙ্গে দেখা করতে পারবে। নাওমি খুশিমনে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে নিলেই একজন প্রহরী বলে উঠে,

“ প্রিন্সেস, বাড়িতে তো কেউ নেই। আপনি কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন? “

নাওমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,

“ কেউ নেই মানে? “

“ এইতো কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন সৈন্য এসেছিলেন। কাউন্ট পাঠিয়েছিলেন তাদের। তারা কয়েদীদের সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছে। “

নাওমি বুঝে উঠতে পারছে না তার প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত। এতো সকাল সকাল যে ওদের নিয়ে যাওয়া হবে সেটা ও একবারও ধারণা করে নি। নাওমি দ্রুত ভাবলো। কিছুক্ষণ আগে যদি সৈন্যরা এসে থাকে তারমানে ওরা এখনো জাহাজে উঠে নি। একটু দ্রুত বন্দরে গেলেই নাওমি বেহজাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে। নাওমি আর সময় অপচয় করে না। দ্রুত নিজের ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুটে বন্দরের উদ্দেশ্যে। মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকে যেনো শেষবারের মতো বেহজাদকে দেখার সুযোগ পায় সে।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন