ফন্ট সাইজ:
থিম:
অদ্ভুত আসক্তি

২য় পর্ব

লেখক: Zerin Islam Mou

অদ্ভুত আসক্তি 

লেখিকা _জেরিন_ইসলাম_মৌ
পাট ২

ভোরে হঠাৎই ঘুম ভেঙে যায় রাইসার। জানলার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া ফীকে আলোটা চোখে লাগে প্রথমে। ঘরটা তখনও আধো অন্ধকার, তবে রাতের গাঢ় ভাবটা আর নেই। দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দটা এই নীরব ভোরে অদ্ভুতভাবে অস্পষ্ট শোনা যায়। দূরে কোথাও আজানের শেষ ধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে, তার সাথে মিশে আছে ভোরের ঠান্ডা হাওয়ার মৃদু স্পর্শ। খাটের পাশে রাখা টেবিলের ওপর অগোছালো বই-খাতা, আধখোলা কলমের ঢাকনা—সবকিছুতেই যেন রাতের ক্লান্তির ছাপ। পর্দাটা একটু নড়ে উঠছে, বাতাসে হালকা দুলে দুলে। বাইরে থেকে মাঝে মাঝে পাখির ডাকে ভোরের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
ঘরের কোণে রাখা আলমারিটা ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ, তার ওপর রাখা ছোট আয়নায় আবছা প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে। রাইসা কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে। বুকের ভেতর একটা অজানা অস্থিরতা, আবার সেই সাথে ভোরের শান্ত পরিবেশেও এক ধরনের নীরব প্রশান্তি। চারপাশে এই নিস্তব্ধ ঘর, ধীরে ধীরে জেগে ওঠা ভোর—সব মিলিয়ে তার মনে হয় দিনের শুরু।
রাইসা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে অজু করে আসলো। রুমের এক কোণে বিছানা ছিল, সেটা ফ্লোরে পাতিয়ে নামাজ পড়ে নিল। কারো প্রতি তার কোনো অভিযোগ নেই; থাকবেই বা কি করে? বেঁচে আছে, এর চেয়ে বড় বিষয় কোনো এতিমের থাকতে পারে? অন্ধকার কাটিয়ে ফর্সা হতেই রাইসা ঘর থেকে বের হয়ে গেল—যদি নিচে তাকে প্রয়োজন হয়, কিছু করতে হয়। সিঁড়ি বেয়ে পিপঁড়ের মতো পিলপিলিয়ে হেঁটে চলল।
মেহেরিমা নাওয়ান সবে হাড়িতে চাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে গ্যাস অন করেছেন। রান্নাঘর থেকেই সিঁড়ির দিকে নজর এলো একটি মেয়ের, যার চলন-ধরন বলে দেয় এত নরম মেয়ে! সফেদ নীল একটা থ্রি-পিস যেন পড়েছে, কারো কাজ খুব কম হলেও শরীরে ফুটে উঠেছে একশতে একশ। এমন মেয়ের রূপ দেখে মেহেরিমা নাওয়ান কিছুক্ষণ কল্পনার জগতে বস্তি বানিয়েছেন। হঠাৎ রাইসার কাঁপা-কাঁপা মিনমিনে গলার স্বর সেই স্বপ্নের অনুভূতি সমুদ্রের জোয়ারে এসে ভেঙে দিল। নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী, কিছু বলবে?”
রাইসা আলতো করে বলল, “জি, আমাকে বলুন কী করতে হবে, আমি করে দিচ্ছি।”
নতমস্তকে কথাগুলো বলে ওড়নার আঁচলে দুই হাত যুদ্ধের ন্যায় চালালো। মেহেরিমা এবার বাতির আলোয় কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন রাইসাকে। মেয়েটা এত সুন্দর, বলার বাইরে! অবশ্য অনেকেই আছে ধবধবে সুন্দর, কিন্তু ধবধবে সুন্দর হলেই যে চেহারা ভালো হবে এমন নয়। কিন্তু এই মেয়ের চেহারা একদম আকর্ষণীয়। মায়াময় পুরো চেহারায় সবাইকে সম্মোহন করার ক্ষমতা রাখে। মেহেরিমা যে ছেলের বউ পরিবর্তন হয়েছে তাতে তার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ হলো না। যে পরিস্থিতিতে বিয়ে হলো, চেহারা দেখার সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই ছিল না। অনিচ্ছায় নামও জিজ্ঞেস করা হয়নি, তাই আস্তে করে বলল, “তোমার নাম কী?”
রাইসা বলল, “রাইসা শিকদার ঋতু।” এখনো মাথা নিচের দিকেই করে রেখেছে।
মেহেরিমার বুকটা প্রশান্তিতে ভরে গেল। মেয়েটা নিশ্চয়ই জাদু জানে! ভাবতে ভাবতেই বলল, “তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে যাও, আমি কাজ করে নিচ্ছি।”
রাইসা বলল, “জি, আমি ফ্রেশ হয়েছি।”
মেহেরিমা নাওয়ান বলল, “তাহলে শাড়ি পরোনি কেন?”
প্রশ্নে থতমত খেয়ে বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে বলল, “আসলে আমি শাড়ি পরতে পারি না,” বলে আবারও মাথা নোয়ালো।
মেহেরিমা নাওয়ান মনে মনে ভাবল, শাড়ি পরতে পারে না বুঝল, কিন্তু তার সামনে এমন মাথা নামিয়ে রাখার কী আছে? তিনি বললেন, “ঠিক আছে, আমি মারজিয়াকে বলব যেন তোমাকে শাড়ি পরায়। আসলে প্রতিবেশীরা দেখতে আসবে, তাই আজকের দিনটা একটু কষ্ট করো, কেমন?”
রাইসা থিতু হয়ে পড়ল মানুষটার কথা শুনে। কত নরম কণ্ঠে তাকে অনুরোধের ন্যায় কথাটা বলল! যেখানে ছোট থেকে ঝাড়ি খেয়ে খেয়ে এত বড় হয়েছে। উত্তরে রাইসা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “জি আন্টি।”
‘আন্টি’ ডাকটা শুনে মেহেরিমা গুলগুল চোখে তাকাল। তারপর বলল, “কী বললে তুমি?”
হঠাৎ করেই এমন জোর জোর কণ্ঠে হকচকিয়ে গেল, বুকের ভেতর জেগে উঠল তার সৎমায়ের আচরণ—যেখানে তাকে মা বলতে গেলেই কত চরম রসিকতা আর হেয় করত! সেখানে ইচ্ছের বিরুদ্ধে একজনের পরিবর্তে আরেকজনকে ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে, হয়তো আন্টি ডাকটা পছন্দ হয়নি। হবেই বা কী করে? ভয়ে ভয়ে মুখ ফুটে বলল, “আ... আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না আপনাকে কী বলে ডাকব, তাই আন্টি বলেছি। আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি চাইলে আমি মালকিন বলে ডাকব।”
মেহেরিমা স্তব্ধের ন্যায় অক্ষে যুগল মেয়েটার পানে দিল। সামান্য একটা কথায় কীভাবে এতটা ঘাবড়ে ক্ষমা চাচ্ছে! নিজেকে সামলে বলল, “ক্ষমা করলাম, তবে এমন ভুল যেন আর দ্বিতীয়বার না হয়।”
মাথা নাড়াল রাইসা। তারপর বলল, “জি মালকিন।”
মুহূর্তেই আবারও জোর জোর কণ্ঠে বলল, “এই মেয়ে, আমি তোমাকে আন্টি ডেকেছ বলে ক্ষমা করেছি, মালকিন ডাকার অনুমতি দিই নাই।”
ভয়ে জুবুথুবু রাইসার মেহেরিমার জটিল কথা বোঝার সাধ্য হলো না। তারপর বলল, “মারজিয়া আমাকে আম্মু ডাকে। আজকের পর থেকে তুমিও ডাকবে। তুমি আমার বোনের মেয়ে নও যে আন্টি ডাকবে, তুমি আমার মেয়ের মতো। মনে থাকবে?”
বিস্ময়ে পায়ের পাতা ফেলানো দৃষ্টি তুলে তাকাল সামনের মানুষটির দিকে। চোখের টলমলো পানি যেন বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়বে। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করল। এই ভালো লাগার মনে অন্যরকম—যেখানে নাবিলা বেগমকে মা ডাকতে চাইত সারাদিন কাজ করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে, সেখানে এই ভদ্রমহিলা অনায়াসে কী সুন্দর করে বাক্য ছুড়ল—*‘মারজিয়া আমাকে আম্মু ডাকে, আজকের পর থেকে তুমিও ডাকবে। তুমি আমার বোনের মেয়ে নও যে আন্টি ডাকবে, তুমি আমার মেয়ের মতো। মনে থাকবে?’*
রাইসা কথা বলার শক্তিটুকু পেল না আনন্দে। উৎফুল্ল হয়ে বলল, “সত্যি? আপনাকে আম্মু বলে ডাকতে পারব?”
মেহেরিমা অবাক নয়নে দেখল রাইসাকে। সামান্য ‘আম্মু’ বলার অনুমতি দিলে কেউ এতটা উৎফুল্ল হয়, আগে কাউকে দেখেনি। আকাবারি আর কিছু বলতে গেল না, এখন তার রান্না করতে হবে। আত্মীয়-স্বজন কাউকে দাওয়াত করেননি বলতে গেলে করতে পারেননি। প্রথমে গিয়েছিল বেড়াতে, সেখানে প্রস্তাব রেখেছিলেন মেয়েকেও দেখেছেন। যাই হোক, পছন্দ হয়েছে বলেই ছেলেকে বিয়ে দেয়ার তাড়া দিয়ে এমন দুর্ঘটনা ঘটে গেল। তবে তিনি এখন এটাকে দুর্ঘটনা বলে মনে করেন না, এটা তার নসিব এবং উত্তম নসিব। তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তুমি এখন যাও। কাল থেকে না খাওয়া, নিশ্চয়ই অনেক খিদে পেয়েছে। ছেলেটার চিন্তায় আছি, কোথায় গেল কে জানে! তাই তোমার খোঁজ রাখতে পারিনি।”
রাইসা বলল, “এভাবে বলবেন না আম্মু, আমি কিছু মনে করিনি। আর আমিও আপনাকে সাহায্য করে দেই, দয়া করে না করবেন না।”
মেহেরিন বিপরীতে একটু হাসলেন। কোথায় তার মেয়ে নাকি সরষের তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে, আর এদিকে কালকেই বিয়ে আর আজকেই সাহায্য করার জন্য সকাল সকাল উঠে এসেছে!
আর এদিকে, মেহেরিমা বেগম ফোনের উপরে ফোন করছে, কিন্তু তার মহান ছেলে ফোন অফ করে রেখেছে। কাল থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। দুশ্চিন্তায় জাহিদার ফাহিমকেও কল করেছে, কিন্তু সবারই একই কেস! এটাই বুঝতে পারছে না তিনজনের ফোনই একসাথে কীভাবে অফ। বলতে বলতে মাহতাব নাওয়ান এসে পিছু দাঁড়ালেন, তারপর বলল, “গিয়ে দেখো তোমার ভদ্র-সভ্য ছেলেটার কাজ! ওদের ফোন থেকে খোঁজ পাবে বলে ওই দুইটার ফোনও অফ করে রেখেছে।”
স্বামীর কথায় মেহেরিমা কিছুটা দুশ্চিন্তার দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিবেশীরা বউ দেখতে বাড়িতে আসবে, তখন যদি জানতে পারে ছেলে রাগ করে বউয়ের মুখখানা না দেখেই পালিয়েছে, তাহলে বিষয়টা দৃষ্টিকটু দেখায়। বাড়িতে যাই চলুক না কেন, সমাজে বা বাইরের সামনে তুলে ধরা বিষয়টা মেহেরিমার মোটেই পছন্দ নয়। এদিকে যে ছেলেকে নাগাল পাওয়া তার হাতের বাইরে! মাহফুজ নাওয়ান বললেন, “চিন্তা করো না, সে কতদিন পারে থাকুক সেখানে খুশি, এমনি চলে আসবে। বাইরের হাওয়া ওর জন্য এখন উপকারী।” হাফ ছেড়ে ফোন রেখে দিল ড্রেসিং টেবিলের কর্নারে। এই ছেলেটা এত জ্বালায় যে তার চিন্তায় মায়ের হাই প্রেসারের দম!
আর এদিকে, মারজিয়াকে শাড়ি পরিয়ে দিতে বললে মায়ের কথায় রাইসার রুমে টোকা মারে। অমনি যে বড় বড় ঝটকা খেয়েছিল, এখন মনে হয় স্বপ্ন দেখছে! বিশ্বসুন্দরী এখন তার ভাবি—এটা ভাবতেই গর্বে বুক ফুলে উঠল। নিজেকে সুন্দরী ভাবির একমাত্র ননদিনী ভাবতে একরাশ ভালো লাগা ছড়িয়ে গেল অন্তরের গহীনে। মারজিয়া দেখে কাচুমাচু করা রাইসা যেন দম বেরিয়ে গিয়েছিল। এসে থেকেই একটু একটু করে সাজিয়ে দিচ্ছে আর রাইসার সৌন্দর্যের বর্ণনায় আকাশ-পাতাল এক করে ফেলেছে। তারপর বলল, “ভাবি, তুমি কি কোনোভাবে আমাকে দেখে অস্বস্তি ফিল করছ?”
রাইসা আমতা আমতা করে বলল, “আপু, আমি তোমার অনেক ছোট। তুমি আমাকে নাম ধরেই ডাকো।”
মারজিয়া বলল, “উহু, সেটা হচ্ছে না তো! ছোট হয়েছ তো কী হয়েছে? তুমি জানো আমার ভাইয়া আমার থেকে গুনে গুনে ১১ বছরের বড়! ভাইয়ার বউকে অবশ্যই সম্মান দিতে হয়, আর আমিও তাই দেব। সম্ভবত আমাদের বয়স তেমন দীর্ঘ নয়, দুই-তিন বছর ছোট-বড়, আর এটা স্বাভাবিক, বুঝেছ?”
মারজিয়ার সব কথার মাঝে একটা কথাই কানে বাজল—*‘তুমি জানো আমার ভাইয়া আমার থেকে গুনে গুনে ১১ বছরের বড়!’* রাইসা স্তব্ধ-বিমূঢ়! তাহলে রাইসার চেয়ে ১৩ বছরের বড়? তাহলে তো ২৯ চলে! এই সময় মানুষ কত বয়স্ক হয়ে যায়! ভাবতেই যেন কষ্টে দলা পাকছে। শুনে তার সৎমা তাকে জোর করে একটা বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল! হঠাৎ করেই মেহেরিমা নাওয়ানের ব্যবহার মনে হতেই সব খারাপ লাগা শেষ হয়ে গেল। এই তো মারজিয়াও বড় হয়ে ‘ভাবি ভাবি’ মুখে খই ফুটছে। সামান্য বড় বয়সে বড় বলে চিন্তাভাবনা পাল্টাতে পারে না? দুনিয়ার জীবন আর কয়দিন, হোক না বুড়ো স্বামী, তাতে কী!
শাড়ি পরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করাতেই রাইসার চোখ কপালে! কণ্ঠায় নেমে এলো বিস্ময়কর ভাব, কিংকর্তব্যবিমূঢ় তার চাহনি। নিজেকে এমনভাবে কোনোদিন আয়নায় দেখেনি। এত বড় আয়না দেখে মনে পড়ল, তার রুমে ছোট এক হাতি একটা আয়না আছে, সেখানে চোখ-মুখ সম্পূর্ণটা প্রতিফলিত হয় না। সৎমায়ের রুমে আছে ড্রেসিং টেবিল, সে আয়নায় মুখ দেখার সৌভাগ্য কেন, সে রুমে প্রবেশ তার জন্য নিষিদ্ধ পল্লী! সেখানে এত বড় একটা রুম তাকে থাকার জন্য দিয়েছে। চোখ থেকে অজান্তেই দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। হয়তো এই একবেলা ভালোবাসার ভেতরটা স্বপ্নের চেয়েও বেশি মনে হলো।
বসার ঘরটা আজ একটু আলাদা রকম ব্যস্ত। পরিপাটি করে পাতা সোফাগুলোতে একে একে বসছেন প্রতিবেশী মহিলারা। কারো হাতে পানদানি, কারো মুখে চাপা কৌতূহলের হাসি। ফিসফিস করে কথা চলছে, মাঝে মাঝে হালকা হাসির শব্দে ঘরটা ভরে উঠছে। চোখগুলো বারবার দরজার দিকেই যাচ্ছে—যে মেয়েটিকে দেখতে এসেছেন, সে কখন আসবে? ঘরের কোণে সাজানো ফুলদানি আর পরিষ্কার পর্দা যেন মুহূর্তে গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একজন আরেকজনকে কানে কানে বলছেন, “শুনেছি মেয়েটা খুব শান্ত।” কেউ আর মাপজোখের চোখে চারপাশ দেখছেন—ঘর, আসবাব, পরিবেশ। চা আসতেই কথা একটু থামে, কাপের শব্দে নীরবতা ভাঙে। এই অপেক্ষার ভেতরেই জমে উঠেছে বউ দেখার সেই চেনা আবহ।
একজন বলে উঠল, “কী গো মেহেরিমা ভাবি, কই তোমার ছেলের বউ? আর কত অপেক্ষা করাবে? আমাদের তো বসিয়ে রেখে মাথা ধরিয়ে দিলে! এদিকে তোমার ছেলের বউয়ের মুখদর্শন করার ভাগ্য কি আছে আমাদের?”
সবাই আবারও ফিসফিস করে বলছে, “দেখো গিয়ে মেয়েটা হয়তো কালো, তাই চড়া মেকআপ করতেই এত দেরি হচ্ছে।”
কথাটা ধীর হলেও মেহেরিমার সুক্ষ্ম কানে পড়ল। মুচকি হাসল, তার চাঁদের টুকরো বউকে কিনা মেকআপের আস্তরণ বলছে! তবুও সবার উদ্দেশ্যে বলল, “আর ভাবিরা একটু অপেক্ষা করুন, এখনই আসবে।”
বলতে বলতেই চোখ পড়ল সিঁড়িতে—ওই যে আমার ছেলের বউ এসে গেছে! মেহেরিমার কথা ও ডাক অনুযায়ী সবাই নজর রাখল সিঁড়ি দিয়ে আসা কপাল পর্যন্ত ঘুমটা দেওয়া, লাল টুকটুকে শাড়িতে হেঁটে আসা এক দৃষ্টিকাড়া পরী। সবার চোখ রসগোল্লার ন্যায় বড় বড়, সাথে ঠোঁট খুলে হাঁ করে আছে! মেহেরিমা হালকা কেশে সোয়াবের উদ্দেশ্যে জোর করে বলে উঠল, “তোমরা এভাবে হাঁ করে আছো কেন? মশা তো অনায়াসেই মুখের ভেতর যাবে, তাহলে মিষ্টি খাবে কী করে?”
সবাই চমকে যে যার মতো করে নড়েচড়ে বসল। এতক্ষণ অনেকেই অনেক কথা বলেছে, যার অল্প কিছুই মেহেরিমা শুনেছে। নিজেদের কথায় নিজেরা আরেকটু শক্ত রাখতে বলল, “দেখো গিয়ে কত কী যে ময়দা মেখেছে, তাহলেই বুঝতে পারবে!”
তাল মিলিয়ে আরেকজন বলল, “হ্যাঁ, আগে কাছে আসুক, তারপর দেখব কোনটা সত্যি আর কোনটা মুখোশ।”
রিনরিনে হেঁটে ওদের সামনে গিয়ে আলতো করে সালাম দিল। কাছাকাছি দুই-একজন শুনল কিনা সন্দেহ। সামনের একজন সালামের উত্তর নিয়ে বসতে বলল। রাইসার হাত ধরে সোফায় বসাল মারজিয়া। অনেকেই ‘মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ’ বলে উঠল। তার মধ্যে কয়েকজন আছে যারা এর কথা ওকে লাগায়। গানেই তো আছে—*‘এক জাতের নারী আছে শুধুই পান খায়, এই বাড়ির কথা নিয়ে ওই বাড়ি লাগায়!’* ঠিক সেইরকম আছে কয়েকজনের স্বভাব। একজন তো উঠে দাঁত বের করতে করতে রাইসার পাশে গিয়ে বসল। তারপর বলল, “তা তোমার নাম কী, মেয়ে?”
রাইসা বলল, “জি, রাইসা।”
মহিলাটি বলল, “বাহ, ভারী মিষ্টি নাম তো, ঠিক তোমার মতোই!” বলতে বলতে গালে হাত দিল। হাত এনে সামনে রাখতেই হতাশ! সামান্য ক্রিমও মুখে লাগায়নি মনে হলো। হতাশ হয়ে রেগে নিজের স্থানে গেল। ঠিক আগের ন্যায় ফিসফিস করে জবাব দিল, “মেয়ে মেকআপ তো দূরে, মুখে পাউডারও দিয়েছে কিনা সন্দেহ!”
সবার চোখে বিস্ময়। হাসি হাসি কয়েক কথা বলে ধরফড়িয়ে বের হলো। যাবার সময় কয়েকজন মেহেরিমাকে বলল, “তুই রত্ন পেয়েছিস মেহেরিমা, যত্ন করিস।”
উত্তরে মেহেরিমা শুধু হাসল। ফিরে তাকাল সোফার এক কোণে লেগে থাকা ভয়-ভয় চেহারার রাইসার পানে। সে মারজিয়াকে বলেছিল যাতে কোনো প্রকার বাহ্যিক আস্তরণ না লাগায় মুখে। তার ছেলের বউ এমনি চাঁদ, তাতে অন্য কিছু লাগিয়ে চাঁদে দাগ না লাগাতে! আর প্রতিবেশীরা কেমন সেটা জেনেই এভাবে এই কাজ আরও বেশি করা।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন