ফন্ট সাইজ:
থিম:
অদ্ভুত আসক্তি

৩য় পর্ব

লেখক: Zerin Islam Mou
অদ্ভুত আসক্তি 
লেখিকা _জেরিন_ইসলাম_মৌ
পাট ৩
সকাল ১০টা। মেহেরিমা নয়ন খাওয়ার টেবিলে খাবার পরিবেশন করে সবাইকে যেতে বললেন। মারজিয়া রাইসাকে নিয়ে গেলেন খাওয়ার টেবিলে। মাহতাব নয়ন সকাল সকাল বেরিয়ে গেছেন অফিসে। বিয়ে নিয়ে ঝামেলার পর আর কিছু ভালো লাগছে না বিধায় অফিস গেলেন। অফিসে কয়দিন যাবেন না বলে ঠিক করেছিলেন, এমনকি ম্যানেজারকে সব দেখাশোনার জন্য বলেও রেখেছিলেন।
হাসি হাসি মুখে খাবার বেড়ে দিয়ে রাইসার দিকে তাকিয়ে বললেন, "দাঁড়িয়ে আছো কেন মা? বসো।"
রাইসা দুনমনা করে এক পায়ের ওপর আরেক পা আঙুল দিয়ে চেপে ধরেছে, কিছু বলছে না। এমন নীরবতা দেখে মারজিয়া বলে উঠল, "কী হলো ভাবি? বসছ না যে?"
মেহেরিমা নয়ন তড়িৎ বেগে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, "তুমি কি এসব খাবার খাও না? পছন্দ হয়নি?"
সঙ্গে সঙ্গে রাইসা মাথা তুলল, তারপর বলল, "না না আম্মু, এমন নয়।"
মেহেরিমা নয়ন বলল, "তাহলে কেমন? এসব না খেলে বলো, আমি তোমার জন্য অন্য কিছু ব্যবস্থা করি।"
রাইসার চক্ষু নিষ্পলক। এমন কথা যেন তার সমাজে বা পৃথিবীতে অষ্টম আশ্চর্য থেকে কম কিছু নয়! টেবিলে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা মাছ-মাংসের বাটিতে ভরা, যেখানে তার আপন বাড়িতে তার জন্য একটা ডিম বরাদ্দ করা ছিল না! ভাগ্য হলে জুটত, নয়তো তা-ও না। সেদিন গরম ভাতে পানি ঢেলে লবণ দিয়ে খেতে হতো। অনেক সময় লবণও মুখের সামনে থেকে কেড়ে নিয়ে বলত, "তোর দুই দিনের পান্তার লবণ আমার এক পদের তরকারি হয়ে যাবে। পেটে ক্ষুধা থাকলে এমনি এমনি গেল।"
এসব ভাবতেই কণ্ঠনালি কেঁপে উঠল। নেভানো দুই অক্ষিজোড় সাগরের ন্যায় ঢেউ খেলছে অশ্রুতে; যেন পাতা পড়লেই গড়িয়ে যাবে বিশাল সাগরের মাঝে। মাথা নিচু করে বলল, "না না, আমি খাচ্ছি।"
বলেই খাবারের প্লেট নিয়ে আলতো করে মেঝেতে বসে পড়ল। মেহেরিমা নয়ন নিজেও বসেছিল রাইসাকে বসতে বলে। নিজেও চেয়ারে বসতেই অবাক হলো—সামনে চেয়ার ফাঁকা, কিন্তু রাইসা কোথায় গেল? মারজিয়া খাবারে মনোযোগ দেওয়ায় খুব একটা গুরুত্ব করল না। কিন্তু মায়ের কথা শুনে খাবারের হাত থামিয়ে চেয়ারে দেখল, কিন্তু নেই।
তারপর বলল, "রাইসা, কোথায় গেলে তুমি?"
রাইসা বলল, "আমি এখানে আম্মু।"
আগ্রহ করে চারিদিকে তাকাল, কিন্তু পেল না। হঠাৎ করে একটা জলজ্যান্ত মেয়ে কী করে উধাও হয়ে গেল! খোঁজার চেষ্টা করে দু-চোখ চালিয়ে গেল, তারপর বলল, "ভাবি, তুমি কোথায় গেলে? আমরা তো দেখতে পাচ্ছি না।"
বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠতেই অবাকের শীর্ষে তার ভাবনা—"এ মা! তুমি এখানে কী করছ?"
মারজিয়ার কথায় মেহেরিমা এগিয়ে এসে দেখতে পেল রাইসা মেঝেতে জড়সড় হয়ে বসে আছে, সামনেই তার খাবারের প্লেট। তারপর বলল, "তুমি নিচে বসেছ কেন?"
রাইসা বলল, "আমি নিচে বসেই খাই আম্মু।"
মেহেরিমা নয়ন বলল, "কী! তুমি নিচে বসে খাও? কিন্তু কেন?"
মারজিয়ার কথায় রাইসা ইতস্তত হয়ে বলল, "আসলে আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, তাই।"
মেহেরিমা নয়ন বলল, "তুমি বাড়িতে নিচে বসে খেতে?"
মেহেরিমার চোখে সন্দেহজনক চাহনি। রাইসা বলল, "জি, আমার নিচে বসে খেতে ভালো লাগে।"
মেহেরিমা ধমকে উঠলেন, তারপর বললেন, "ওখান থেকে ওঠো, চেয়ারে বসো। আর হ্যাঁ, বাবার বাড়িতে কী করেছ না করেছ, এটা আমরা জানতে চাইব না। এখন এটা তোমার স্বামীর বাড়ি। এখন তোমাকে মাটিতে বসে খেতে হবে কেন?"
'স্বামীর বাড়ি' কথাটা শুনেই বুকে ধক করে উঠল। কোথায় সেই স্বামী? যাকে বিয়ে করেছে কাল রাতে, না দেখেই যার নামে কবুল পড়েছে, এক জীবন লিখে দিয়েছে যার নামে, সে তো তাকে ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে! সত্যিই কি অভাগা? বিয়ের পর স্বামীর মুখদর্শন পর্যন্ত হলো না!
এতে অবশ্য খুশিও হয়েছে। বোনের হবু বরকে বিয়ে করা—এটা তো ইতস্তত লাগবেই। এই জায়গায় সানজিদা থাকত, এটা ভেবেই কেমন লজ্জায় আরষ্ট হয়ে পড়েছে।
আর এদিকে দুপুরের রাস্তাটা যেন একটু ক্লান্ত আর নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। মাথার ওপর খাড়া রোদ, পিচঢালা রাস্তা থেকে গরমের তাপ উঠে আসে। দূরে তাকালে বাতাসের ঝাপটায় গরমে কাঁপতে থাকা একধরনের ঝাপসা দৃশ্য চোখে পড়ে। গাছের ছায়াগুলো ছোট হয়ে ফুটপাথে লেগে থাকে। পথচারীরা যতটা সম্ভব ছায়া ধরেই হাঁটে। রিকশাওয়ালা গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে চলে। কেউ কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। দোকানপাটের সামনে আধখোলা শাটার, চায়ের দোকানে ভিড় কম, কেবল দুই-একজন বসে অলসভাবে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। হর্নের শব্দ কম, শহরের চেনা কোলাহলও যেন দুপুরে একটু থেমে যায়। কখনো হঠাৎ কোনো বাস বা ট্রাক এলে ধুলো উড়ে চারপাশ ঢেকে ফেলে, তারপর আবার সেই নীরব গরম। দুপুরের রাস্তা মানে ব্যস্ততার মাঝখানে একটুখানি অবসাদ, যেখানে সবাই যেন ছায়া আর শান্তি খুঁজে বেড়ায়।
তপ্ত রোদ মাথার ওপর চাপিয়ে একটা ক্যাফেতে ঢুকল তিন যুবক। দুপুর দুটোয় ভার্সিটি শেষ করে তিন যুবকের গন্তব্য কিছু খাওয়া। সেই সকালে একটু নাস্তা করে বেরিয়েছে, এখনো মুখে কিছু পড়েনি।
জাহিদ চেঁচিয়ে বলল, "ভাই, আমার ফোনটা অন্তত অন করতে দে। আমার চিন্তায় তোর বোন যদি হার্ট অ্যাটাক করে, নিজেকে ক্ষমা করতে পারবি তো?"
ফাহিমেরও একই অবস্থা। নিজের সাথে সাথে বেচারা দুটোর ফোনও অফ করে ড্রয়ারে রেখে লক করে দিয়েছে, আর চাবি পকেটে নিয়ে এসেছে। পকেটে হাত দিয়ে যে চাবিটা নেবে, তারও কোনো উপায় নেই। দুজনের ফোন নিয়েছে, তবে ফাহিমের চেয়ে জাহিদের একটু বেশি কষ্ট হচ্ছে। কারণ বেচারা প্রেম করে কিনা! প্রেমিকার সাথে কথা না বলার তৃষ্ণায় যেন বুকটা হাহাকার করছে। এরকম পাষণ্ড মানুষ আগে দেখেনি! কত হতে পায়ে ধরেছে পাঁচ মিনিটের জন্য ফোনটা খুলতে দিতে, প্রেমিকাকে জানিয়ে দেবে সে এখন ব্যস্ত আছে অথবা ফোন নষ্ট হয়ে গেছে, যাতে ভুল না বোঝে।
কিন্তু মহারাজ বলে কথা! নাম যেমন তেজ, কামেও তেমন তেজ, বহু গুণ বেশি। জাহিদ অসহায় দৃষ্টি ফেলে চেয়ে বলল, "ভাই, তোর নামটা তেজ কে রেখেছিল রে? তোর তেজের কারণে প্রতিনিয়ত আমরা জ্বলতে থাকি। সূর্যেরও এত তেজ নেই। শীতের দিকে তোর তেজ দিয়ে দেশটাকে একটুখানি বাঁচিয়ে রাখিস। শীতের কারণে যে হারে মানুষ মরে যায়, অন্তত মানুষ বাঁচানোর জন্য কাজে লাগল তোর তেজ! এতে তোরও নেকি হয়ে যাবে।"
সেই একই দৃষ্টিতে চোখ দিয়ে যেন আস্ত একটা জাহিদকে গিলে খাবে তেজ! জাহিদ ভয়ে ভয়ে বলল, "দেখ, এভাবে তাকাবি না, আমার ভয় লাগে। কিন্তু নিজের জন্য নয়, তোর বোনের জন্য। বেচারা বিয়ের আগেই বিধবা হলে সাদা শাড়িতে থাকবে, সেটা তুই দর্শন করবি?"
এরকম ফাজলামিতে তেজের বিরক্তি চলে এল। রেগে বলল, "চুপ করবি?"
লম্বা ধমকে ফাহিম কাচুমাচু হয়ে বলল, "তুই এভাবে বলছিস কেন? দেখ না, বেচারা প্রেমিকের হৃদয়ে এতে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে! করতে দে না একটা ফোন!"
ব্যাস, আর বলতে পারল না, এর আগেই তেজের ধারালো হুঙ্কার ছুড়ল, "আরেকটা কথা বললে তোদের এক লাথি দিয়ে রেস্টুরেন্টের বাইরে ফেলে আসব!"
তেজের চিৎকারে ক্যাফেতে বসে থাকা আশপাশের লোকগুলোও কেমন অবাক হয়ে আছে। ভেবে পাচ্ছে না এটা কি কোনো বড়সড় মাফিয়া নাকি!
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা চলল। চোখের সামনে মোরগ পোলাও দেখে ফাহিম কারও দিকে তাকাল না, গপগপ করে খেতে লাগল। ফাহিমের এমন খাওয়া দেখে তেজ ভ্রু উঁচাল। জাহিদ চোখ ছোট করে বলল, "তুই হাত ধুয়েছিস?"
ফাহিম মুখে খাবার তুলতে তুলতে হাত থেমে গেল। আসলেই সে হাত ধুয়েছে কিনা তার নিজেরই মনে নেই। পেটের জ্বালায় সামনে খাবার দেখতে পেয়েই খেতে শুরু করেছে। অনিশ্চয়তায় কিছু ভাবার সময়ও নেই, কিন্তু এদের সামনে তো বলা যাবে না! কনফিডেন্স নিয়ে বলল, "দেখো, হাত ধুতেই হবে এমন না। আমি এমন কিছু করিনি যে হাত ধোয়া আবশ্যক, বুঝলি? মাথায় মুছলেই হয়ে যায়। একটা কথাই আছে জানিস না? আমার দাদি বলত—দাদা শালা কলা পাতা কাটতে গেছে, তুই মাটিতেই ভাত দে! এর থেকে কী বুঝতে পারলি? ক্ষুধার চেয়ে বড় কিছু নেই!"
বলেই পূর্বের ন্যায় খেতে শুরু করল। জাহিদ হুহু করে হেসে উঠতেই তেজের দিকে নজর গেল, মুহূর্তেই মুখ বন্ধ করল। সাথে হাসির আওয়াজও থেমে গেল।
খাওয়ার মাঝে হঠাৎ সামনের একটা মেয়ের দিকে নজর গেল। ফাহিমের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ভ্রুকুটিতেই মেয়েটির ইতস্তত হয়ে আসে, পাশে তাকিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। জাহিদ দাঁত কেলিয়ে বলল, "কী দেখছিস?"
ফাহিম লাজুক হওয়ার ভান করে বলল, "দেখ, মেয়েটা আমাকে মনে হয় পছন্দ করেছে। আমার দিকে তাকিয়ে কেমন করে হাসছে আর লজ্জা পাচ্ছে!"
মুহূর্তেই ফাহিমের সমস্ত চিন্তাভাবনার মাথায় বাড়ি মেরে জাহিদ বলল, "মেয়েটা তোকে পছন্দ করেছে? আজকাল তুইও মেয়েদের পছন্দ তালিকায় জায়গা পাচ্ছিস? এই শালা! তুই যে হারে খাচ্ছিস, তোর গালে পোলাও লুকোচুরি করছে! আর মেয়েটা সেটাই দেখে হাসছে, হাদারাম কোথাকার! বলে কিনা ওর প্রেমে পড়েছে!"
ফাহিমের চেহারা দেখার মতো ছিল। বেচারা তাড়াহুড়ো করে ক্ষুধার জ্বালায় রাক্ষসের মতো খেতেই এমন কাণ্ড! লজ্জায় মুখটা জ্বলে যাচ্ছে মেয়েদের মতো।
এদিকে খাওয়া শেষ হতেই বিল দিয়ে বেরিয়ে এল তিন বন্ধু। গাড়িতে উঠে বসতেই গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে যাত্রা শুরু করল।
"তেজ, তোর কী হয়েছে রে? কিছু বললি না যে? হুট করে ভোরেই এভাবে আসলি কেন? তোর তো গ্রামে যাওয়ার কথা ছিল! আন্টি ফোন করল, তুই তো আমাদের সামনেই চলে গেলি, আবার সকাল না হতেই চলে আসলি? আবার নিজের সাথে আমাদেরও ফোন বন্ধ রেখেছিস! আঙ্কেলের সাথে কোনো ঝামেলা হয়েছে? আমরা কথা বলে দেখব?"
ফাহিমের কথায় মনে পড়ল রাতের কথা। তার মাতাকে কত কী বলে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করেছেন! বেরিয়ে আসতে চাইলে নিজের মামোরা দিব্যি দিয়েছেন, তেজও কিছু বলতে পারেনি। নিজের বাড়ি হলে ভাঙচুর করে শেষ করে দিত। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে যে মেহেরিমা নয়ন ও মাহতাব নয়ন ছেলের বিয়ের জন্য জাল ফেলে রেখেছেন, তেজ জানত না। তাহলে এমন জালে ফাঁসতে নিজে থেকে আগে এগিয়ে যেত না! এমন পরিস্থিতিতে জোর করে বিয়ে হলেও যখন জানতে পারে সে মেয়ে পালিয়ে গেছে, তার জায়গায় ছোটবোনের সাথে বিয়ে হলো, তখন মেজাজ আরও তুঙ্গে! সে কি খেলার পুতুল নাকি? একটা অপশন না হলে আরেকটা নিচ্ছে! সেই মুহূর্তেই বেরিয়ে গেছে, আর যোগাযোগ করতে না পেরে ফোনও অফ করে রেখেছে।
তার ওপর ফাহিমের এমন কথা শুনে চোয়াল শক্ত হয়ে এল। রক্তচক্ষু তাকাতেই দুজন দমে গেল, তবে একেবারে শান্ত হতে পারল না। মিনমিন স্বরে বলে উঠল জাহিদ, "আরে কী সমস্যা, না বললে কীভাবে সমাধান হবে বল? তুই কিছু বলছিস না কেন?"
জোড়ে একটা ব্রেক করতেই দুজনের সিট থেকে হেলে সামনের দিকে ঝুঁকে গেল। আর একটু হলে দুজনের দম বেরিয়ে যেত! ভাগ্যিস কপাল ভালো যে দুজনেই পেছনের সিটে বসেছে, নয়তো আজ তেজের হাতেই ওদের জীবনের তেজ নিভে যেত!
মুখে মুখ বিড়বিড় করে বলল, "এই তেজপাতাকে যেদিন সুযোগ পাব, সেদিন ব্লেন্ডারে একেবারে সর্বোচ্চ স্পিডে ব্লেন্ড করব! শালা থুক্কু সমন্ধী, আমাদের জীবনটাই তেজপাতা করে দিল!"
ফাহিম মাথায় হাত বুলিয়ে দিল জাহিদের, ওর অবস্থা ভেবেই হাসি পাচ্ছে। মুখ চেপে বলল, "দুঃখ পাস না দোস্ত, ওর সাথেই তোকে চলাফেরা করতে হবে। তেজপাতার বোনের ওপর যখন ফিদা হয়েছিস, তখন তো সারাজীবন, অর্থাৎ মৃত্যুর আগপর্যন্ত তোকে সহ্য করতে হবে! তোর জন্য দোয়া রইল, যেন ভালোভাবে আগামী দিন চলতে পারিস। তেজপাতার সাথে দারচিনি হয়ে যা!"
"তোরা দুইটা যদি এমন মুহূর্তে মুখ বন্ধ না করিস, গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেব! মেয়েদের মতো গুজুর-গুজুর ফুসুর-ফুসুর করবি না আমার সামনে!"
ফাহিম বলল, "আরে আমাদের কথা..."
তেজ বলল, "এক ঘুুসিতে তোদের মুখের নকশা যদি পালটাতে চাস, শেষবারের মতো বলছি চুপ থাক!"
ভয়ে ভয়ে দুজনেই চুপ মেরে গেল।
আর এদিকে ১০টা বাজতেই মারজিয়া রেডি হয়েছে। আজ তার ভার্সিটি আছে, আর সেখানে গেলেই বুঝতে পারা যাবে তার ভাই কোথায় আছে। কারণ তেজের বন্ধু জাহিদের সাথে তার প্রেমঘটিত জটিল সম্পর্ক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিন বন্ধুরই ফোন অফ, তাহলে খুঁজে বের করবে কী করে? যদি তারা ভার্সিটিতেও না আসে, তখন?
ভাবতে ভাবতে কেমন মাথা ধরে এল। তখন এক কাপ চা সামনে ধরল রাইসা। আলতো করে জিজ্ঞেস করল, "আপু, চা খেয়ে নিন।"
মারজিয়া বলল, "ভাবি, তুমি কেন চা করতে গেলে?"
রাইসা মাথা নত করে বলল, "কেন আপু, আমার হাতের চা খারাপ হয়?"
মারজিয়া তৎক্ষণাৎ বলল, "আরে কী বলছ ভাবি! তুমি জানো, তোমার হাতের চা যে একবার খাবে, সে তোমার চায়ের প্রেমে পড়তে বাধ্য! সাথে আস্ত তুমিতারও প্রেমে পড়বে! তুমি কিন্তু সবাইকে চা করে খাওয়াবে না, এসে আমার ভাইয়ের ভাগ অন্য কেউ বসাতে চাইবে!"
রাইসা এবার একটু লজ্জা পেল। যদিও রাইসা সত্যিই অসাধারণ রান্না করে, সত্‌মায়ের ঘরে সেই ছোট থেকেই রান্না করতে করতে রান্নার হাত পাকা হয়ে গেছে। রইল বাকি ঘরের কাজ, সে সবেতেই পটু, শুধুমাত্র চঞ্চল নয়। এতটুকু বয়সেই কোনো বয়স্ক মানুষের মতো মুখ মলিন করে থাকে, চেহারায় হাস্যোজ্জ্বল কোনো ছাপ নেই, কেবল যেন পুরোটাই হাহাকারে ভরা! পুরো দেহ যেন নিভে যাওয়া প্রদীপের শিখা!
মারজিয়া চা শেষ করে যেতে যেতে বলল, "ভাবি, আমি ভার্সিটি যাচ্ছি। তুমি বাড়িতেই ভালোভাবে থেকো, আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।"
এদিকে রাইসা যখন রুমের দিকে যাচ্ছিল, মেহেরিমা নয়ন সোফায় ডেকে নিজের পাশে বসালেন। মেয়েটা কাচুমাচু হয়ে বসেছে, দুই হাত কোলের ওপর রেখে এক হাত দিয়ে আরেক হাত খুটিয়ে যাচ্ছে, মস্তিষ্ক তার সর্বদা নিচু। এটাকে ভদ্রতা বা ভয় দুটোই বলা চলে।
মেহেরিমা নয়ন রাইসার কোলের ওপর থেকে দুইটা হাত নিজের কাছে নিয়ে এলেন, তারপর নিজের দিকে ঘুরিয়ে শান্তস্বরে বললেন, "তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছ?"
রাইসা কিছু বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই, তার সত্যিই ভয় ভয় লাগছে।
মেহেরিমা নয়ন মুচকি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বললেন, "মাকে কেউ ভয় পায়?"
তড়িৎ বেগে নেত্রযুগল শাশুড়ির দিকে করলেন, পুরো মুখটা যেন আপন মায়ের মতো মায়া লাগছে! কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, "আ... আমি কি আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরতে পারি?"
বলতে দেরি হলেও মেহেরিমা নয়নের এক সেকেন্ডও লাগল না রাইসাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরতে। তার সত্‌মাকেও বলেছিল একটিবার জড়িয়ে ধরবে, কিন্তু দূর ছাই করে ঠেলে দিয়েছে দরজার চৌকাঠ থেকে! এ কেমন অদ্ভুত অনুভূতির সম্মুখীন রাইসা!
রাইসার চোখ থেকে ছলছল করে গড়িয়ে পড়ল কিছু হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি ফিরে পাওয়ার জন্য। মেহেরিমা নয়নের গায়ের গন্ধটা যেন তার অতিব কাছে মনে হলো, এই সুবাসে সে নিজের মাকে পেল। মেহেরিমা নয়ন রাইসার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "তোমার কি মন খারাপ করছে মায়ের জন্য?"
উত্তরে রাইসা হ্যাঁ-সূচক ইঙ্গিত দিল। বুকে জাপটে ধরে কবুতরের ছানার মতো লুকিয়ে রইল রাইসা, এই প্রশান্তি যেন শেষ হবার নয়! মেহেরিমা নিজেও আরেকটি মেয়ের মা হলেন, পুত্রবধূ কি মা হতে পারে না? অবশ্যই পারে। নিজের হাতে গড়ে নিলে রাস্তার সাদা পাথরকেও কোটি টাকার হিরে মনে হবে, এতে সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর—সে কীভাবে যত্ন করে আগলে নিচ্ছে, আর কে অবহেলা করে ছুড়ে ফেলছে!
বিকেলের দিকে সোফায় বসে আছে মারজিয়া আর রাইসা। মারজিয়া অনেক চেষ্টা করেও অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে কোনো খোঁজখবর পায়নি তেজের। পাবে কী করে, সে নিজ থেকে ধরা না দিলে তাকে খুঁজে বের করা অতিব সহজ নয়!
মেহেরিমা নয়ন তেলের বোতল এনে সোফায় বসলেন, অর্গানিক হেয়ার কেয়ার। মারজিয়াকে তিনি সর্বদা চুলে তেল লাগিয়ে দেন, মারজিয়া তেল দেখলেই নাক ছিটকায়! অথচ রাইসা যে কিনা মাসে একবার সুযোগ পেত চুলে তেল দেওয়ার, তা-ও নাবিলা আপা মেপে দিতেন, যা দিত তা দিয়ে হলেই হতো, না হলে পানি মিশিয়ে দিতে বলত! এমন নিচুতাই তার বেদবাক্য ছিল, কী আর করা! তেল না দেওয়ায় মাথাব্যথা প্রচণ্ড প্রকারের বেড়ে যায়।
এদিকে কত যত্ন সহকারে মারজিয়ার মাথায় তেল দিচ্ছেন মেহেরিমা নয়ন! ভাবনার মাঝেই ছেদ ঘটল মেহেরিমা নয়নের কথায়, "এসো, তোমাকেও তেল দিয়ে দিই। এই তেল দিয়ে দিলে চুল বড় হবে।"
রাইসা যেন কল্পনার জগতে উড়ে বেড়াচ্ছে এই কথা শুনেই! তারপর বলল, "কী হলো, তোমার মাথায় শ্যাম্পু করা নেই?"
হকচুকিয়ে উত্তর করল, "জি... জি।"
সেই সানজিদার বিয়ে উপলক্ষেই রাইসার মাথায় শ্যাম্পু করেছিল। রাইসাকে কাছে বসিয়ে যখন ওড়না মাথা থেকে নামাতে বললেন, রাইসা তখন মাথার ওড়না নামিয়ে কাঁধে করে রাখা লম্বা হাতখোপা খুলে দিল। মুহূর্তেই পৃষ্ঠদেশে গড়িয়ে পড়ল তার কেশ। তবে সুফাতে পড়েও চুলটা জট লেগে আছে, কারণ সম্পূর্ণ চুল মুক্তি পায়নি বন্ধন থেকে। মেহেরিমা নয়ন পিঠের চুল আলতো করে হাত উঁচু করতেই গড়িয়ে পড়ল ফ্লোরে, স্তব্ধ হয়ে বলে উঠলেন, "এ কী!"
রাইসা ভয় পেয়ে চটজলদি উঠে দাঁড়াতেই সমস্ত কেশ যেন সমানভাবে ছড়িয়ে রইল পায়ের পাতার কিছু উপর পর্যন্ত! তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন মেহেরিমা নয়ন!
ভয়ে রাইসা কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, "আ... আম্মু, কী হলো আপনার?"
মারজিয়াও দ্রুত মায়ের কাছে এসে বসল, তারপর বলল, "আম্মু, চোখ খোলো!"
ধাক্কাধাক্কি করেও যখন লাভ হলো না, তখন রাইসা টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি এনে দিল মারজিয়াকে। মারজিয়া চোখেমুখে পানির ছিটে দিতেই তড়িৎ বেগে চোখ খুললেন। সামনে এলোমেলো চুল রাইসার চোখেমুখে পড়ে আছে, আর রাইসা মেহেরিমা নয়নের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে। তখনই আবার রাইসার পানে ভালো করে দৃষ্টি দিয়ে ফের জ্ঞান হারালেন তিনি!
দুই দুইবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পর রাইসা আর মারজিয়া দুজনেই ভালো করে সোফায় শুইয়ে দিয়েছে। রাইসা রান্নাঘর থেকে সরিষার তেল এনে হাতে-পায়ে মালিশ করে দিল। এত কিছুর মাঝে মারজিয়া মাত্র লক্ষ্য করল রাইসার চুলের দিকে, তার মাথা চক্কর দেওয়ার মতো পরিস্থিতি! সে যে জ্ঞান হারায়নি, এটাই আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া!
মারজিয়া অবাক স্বরে বলল, "তোমার চুল এত বড় কীভাবে করলে ভাবি?"
রাইসা থতোমতো খেয়ে গেল, এ কেমন কথা! চুলের সাথে যুদ্ধ করে চুল বড় করেছে নাকি? এমনি সত্‌মায়ের কথা শুনে প্রায় এক হাত চুল কেটেছিল দুই মাস মতো হবে, এতেই চুল আবারও এক হাতের চেয়েও বড় হয়ে গেছে!
আর এদিকে মারজিয়াকে তার মা কত কিছু মাখিয়ে দেয়, অথচ তার মনে হয় এ এক ইঞ্চি পরিমাণ চুল লম্বা হয়নি, সব পরিশ্রম বৃথা! যদিও কোমর সমান চুল আছে মারজিয়ার, তবুও তার শখ মায়ের মতো চুল যেন লম্বা হয়। মেহেরিমা নয়নের মায়ের মাথায় ছিল এমন চুলের রাজত্ব, রাইসার মাথায় এমন একই চুল দেখতে পেয়ে কিছুটা বিস্ময়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। তার মা আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই।
তারপর বলল, "এমনি হয়েছে আপু।"
মারজিয়া বলল, "মাশাআল্লাহ! আমার ভাবি সব দিক থেকে ১০০-তে ১০০! একদম খাইরুন লোকেশ, ভাবি!"
রাইসা একটু ইতস্তত হলো।
তো ধন্যবাদ সবাইকে, এই পার্টটি এই পর্যন্তই। তো নতুন গল্পটি কেমন লাগছে সবাই কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন।  ভালো থাকবেন সবাই, আল্লাহ হাফেজ।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন