#সবটাই_তুমিময়-২
#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-৬
-তুমি জানো আহানা,তোমাকে চোখের আড়াল করতে আমার ভয় হয়। দু দন্ড তোমাকে না দেখলে অস্থির হয়ে পরি। তোমার স্বর না শুনলে আমার চারপাশ অন্ধকার লাগে। আরো ঠিক কি কি হয়,সেটা আমি বলে বুঝাতে না পারলেও সবটাই বোঝো তুমি। তারপরও এই আমার সাথেই এতো উপেক্ষা কেনো তোমার বলতে পারো? তুমি যে ভালো আছো,সুস্থ্য আছো সে খবরটা কেনো আমাকে ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে নিতে হলো বলতে পারো? তোমার তরফ থেকে তোমার নিরাপত্তার খবরটা এখন,এতো দেরিতে কেনো পৌছালো আমার কাছে আহানা? এর কারন কি? কি দোষ করেছি আমি?
ফোনের ওপাশ থেকে তিহানের বলা প্রতিটি কথায় চাপা অভিযোগ স্পষ্ট। ছোট একটা শ্বাস ছাড়লো অদ্রি। হ্যাঁ জানে ও,ওকে নিয়ে কতোটা ব্যস্ত এই মানুষটা। সবই জানে। এজন্যই তো বাবা মা এই মানুষটাকেই ওর জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছেছে। তবুও ওইযে অনুভূতি বলে একটা বিষয় আছে না? মনের কোনে তিহানকে নিয়ে ভবিষ্যত জীবনসঙ্গী সম্বোধনে কোনো অনুভুতিই তৈরী হয়নি অদ্রির। কোনো একটা জায়গায় আটকে আছে ও এই সম্পর্কটাকে নিয়ে। নিজেকে সামলে অদ্রি ধীরগলায় বললো,
-আ'ম সরি মিস্টার তিহান। আসলে সবে ফোন হাতে পেয়েছি। আর....
ওপাশের তাচ্ছিল্যের হাসির আভাস পেলো অদ্রি। তিহান বললো,
-তোমায় কতোবার বলেছি,তুমি না চাইলে বিয়েটা হবে না। আমি নিজে আকাশ স্যারের সাথে কথা বলবো। কেনো বলতে দিচ্ছো না বলোতো?
-এসব কি বলছেন আপনি? আমি তো অমত করিনি বিয়েতে! বাবাকে কেনো তবে...
-বিয়েতে অমত করো নি। কিন্তু ভালোও তো বাসো না আমাকে।
....
-কি হলো? বলো? ভালোবাসো?
-ভালোবাসা বুঝি এতো তাড়াতাড়িই অনুভব হওয়ার কিছু?
-তোমাকে দুবছর হলো চিনি আহানা।
-দুবছরে আমি তো আপনাকে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী বলে চিনতাম।
-তবে বলছো? তোমার কাছে এখন অন্য কোনো পরিচয় আছে আমার?
অদ্রি চুপ করে রইলো। তিহান বললো,
-এভাবে একটু একটু করে পরিচয় করে নেবো বলে অপেক্ষা করে আছি আহানা। কোনো তাড়া নেই আমার। শুধু তুমি এভাবেই একটু একটু করে আমাকে চেনার,বোঝার চেষ্টা করো,তাতেই হবে। শুনেছি অপেক্ষার ফল নাকি খুব মধুর হয়। পরখ করে নেবো নিজের জীবনেই কথাটা।
বলার কিছু খুজে পেলো না অদ্রি। ফোনের ওপাশে থেকে আওয়াজ এলো,
-স্যার শুনানীর সময় হয়ে গেছে।
অদ্রি বললো,
-আপনার কাজে যান। আমি ঠিক আছি।
-ফিরছো কবে?
-কালই ফ্লাইট।
-হ্যাভ আ সেইফ জার্নি। টেক কেয়ার। এন্ড...আই লাভ ইউ।
কিছু না বলে ফোনটা কেটে দিলো অদ্রি। চুপচাপ একধ্যানে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো ও। তানহা বললো,
-কিরে? খুব রাগ করেছে ফোন করিসনি বলে?
....
-আহানা? বলনা?
অদ্রি তখনো চুপ। আস্থা মুখ বাকিয়ে বললো,
-আরে ওকে আর জিজ্ঞেস করিস না তো তানহা! পইপই করে বারন করেছিলাম,তিহান সাইয়্যিদের মতো এতোবড় ক্রিমিনাল লয়ারের সাথে বিয়েতে রাজি হোস না আহানা! হোস না রাজি! এদের কথায় কোনো রসকষ নাই!এরা বউ আর আসামীর সাথে একইগলায় কথা বলে। সংসার আর ক্রাইমসিন গুলিয়ে ফেলে। আর তো আর....
-এরা ভালোবাসিও বলে আস্থা।
অদ্রির কথায় তানহা মুচকি হাসলো। আস্থার চেহারায় বিরক্তি। তানহা আস্থার দিক এগিয়ে বললো,
-শোন,এই যা যা তুই বললি,কোনোটাই আহানার সাথে ঘটবে না। বরং ওর তো অশেষ ভালোবাসায় মোড়ানো একটা সুন্দর সংসার হবে। এমন একটা বর হবে,যে সীমাহিন ভালোবাসবে ওকে। তবে আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি তোকে,তোর সংসার সত্যিই ক্রাইমসিন হবে। বরটা হবে বেচারা ভুক্তভোগী। আর তুই বউ না,তুই হবি আসামী। মিলিয়ে নিস।
-আমারটার গ্যারান্টি তোকে দিতে হবে না। আর রইলো বাকি আহানার কথা? সবই হবে। তবে যদি বরটা তিহান সাইয়্যিদের পরিবর্তে অন্য কেউ হয়ে,তবেই! এন্ড আই অ্যাম নট জোকিং!
তানহা হেসে দিলো ওর কথায়। অদ্রি শেষ কথাটা শুনে ওর দিকে তাকালো। আস্থা বললো,
-জোক মারলে হাসিস না। আজকে জোক মারিনি। আজকে তো হাস?
অদ্রিও হেসে দিলো। আস্থা এসে জরিয়ে ধরলো ওকে। তানহাও এসে বাহুডোরে আটকে নিলো ওদের দুজনকে।
•
জ্যাকেটের পকেটে দুহাত গুজে করিডর দিয়ে আসছিলো অঙ্কুর। ওয়ার্ম আপ হিসেবে সিড়ি বেয়েই নিচে নামবে বলে ঠিক করেছে ও। দুতলা নামতেই সে ফ্লোরে থেমে থাকা লিফটের দিকে চোখ যায় ওর। লিফটে অদ্রি একা। পরনে হালকা গোলাপি রঙের একটা বড়হাতা গাউন। সাদা গোলাপির মেশানো ওড়না। ঝুকে দাড়িয়ে বোতামগুলো পরখ করছে না কি করছে কে জানে। খোলা চুলগুলো বারবার সামনে এসে পরায় প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে সেগুলো কানে গুজে দিচ্ছে আর কপাল কুচকে লিফটের বোতামগুলোতে কোনো কারসাজি দেখাচ্ছে। দরজাটাও বন্ধ হয়নি। বাকা হেসে এগোচ্ছিলো অঙ্কুর। তখনই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলো লিফটের। দরজায় লেখা,ইট স্টাকস্( এটা আটকে যায়)। হেসে দিলো অঙ্কুর। দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে পা ছুড়লো লিফটের দরজায়। সুইচে চাপ দিতেই খুলে গেলো দরজাটা।
হুট করে আবারো লিফট আটকে যাওয়ায় এই লিফটের উদ্দেশ্যেই কয়েকটা শব্দ ছুড়বে বলে নিজেকে প্রস্তুত করছিলো অদ্রি। কিন্তু সামনে অঙ্কুরকে দেখে থেমে গেলো ও। অঙ্কুর গম্ভীর ভাব বজায় রেখে ভেতরে ঢুকে গেলো। তবে কোনো সুইচ দিলো না। অদ্রি পেছন থেকে ওর পিঠের দিকেই তাকিয়ে রইলো। অঙ্কুর বললো,
-সম্মানিত যাত্রীবৃন্দ,কোন ফ্লোরে যাবেন,সুইচটা দিলে উপকৃত হতাম।
ভ্রুকুচকে তাকালো অদ্রি। সুইচ কি ওর দেওয়ার কথা? তবুও কিছু না বলে গ্রাউন্ড ফ্লোরের সুইচ চাপতে যাচ্ছিলো ও। অঙ্কুর আচমকাই ওর বাড়িয়ে রাখা হাত হেচকা টানে ওকে লিফটের দেয়ালে আটকে দিলো। দুহাতে অদ্রির দু হাত দেয়ালে চেপে ধরেছে অঙ্কুর। বিস্ফোরিত চোখে তাকালো অদ্রি। লিফটের দরজা লক হয়ে গেছে আবারো। নামতে শুরু করেছে ওটা। অঙ্কুর চুইংগাম চিবোচ্ছে আর অদ্ভুতভাবে অদ্রির দিকে তাকিয়ে আছে। অদ্রি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো,
-লিভ মি।
-নট সো ইজিলি মিস অদ্রি।
অদ্রি গায়ের জোর খাটিয়েই বললো,
-আমি অদ্রি নই! ছাড়ুন আমাকে!
-স্বীকার করছো না,এতেই প্রমানিত হয়,তুমিই অদ্রি! নাও টেল মি! কি করে সবার সামনে আমাকে টেরোরিস্ট বললে তুমি? কি করে? হাউ ডেয়ার ইউ টু সে দ্যাট?
অদ্রি বড়বড় চোখে তাকালো ওর দিকে। অঙ্কুর পেছনে লিফটের দেয়ালে পা ছুড়লো। লিফটটা আটকে গেলো আবারো। অঙ্কুর স্বাভাবিক গলায় বললো,
-লিসেন মিস অদ্রি,ইউরো নাইন্টিন হাইজ্যাকিংয়ে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। হ্যাঁ,ওদের বস আমিই। ঠিকই জানো তুমি। বিগেনিংটা এসব দিয়েই শুরু হয়েছিলো।
-ত্ তাহলে এ্ এয়ারস্ট্রাইক? ওটা...
অঙ্কুর বাকা হাসলো। দেয়ালে থাকা অদ্রির হাতজোড়া ওর পেছনে কোমড়ে আটকে দিলো। এতে একদম অঙ্কুরের বুকে লেগে গেলো অদ্রি। অঙ্কুর ফিসফিসিয়ে বললো,
-ওইটা ছিলো দ্যা কনক্লুশান। অঙ্কুরের স্পেশাল প্লট। যেটা না গভার্মেন্ট জানে,না টেরোরিস্টরা। শুধু পিযুশকে ছাড়ার পরিবর্তে,পিযুশসহ পুরো গ্যাঙটাই....
চোখ টিপ দিয়ে মুখে অদ্ভুত এক শব্দ করলো অঙ্কুর। যার মানে,সবাইকে মরতে হয়েছে। অদ্রি শুধু বড়বড় চোখে দেখছে ওকে। অঙ্কুর বললো,
-বলতে পারো আইনি সাহায্য কেনো নিলাম না। কারন একটাই! বিডির সিআইডি,সিবিআই,সর্বোপরি পুরো আইনব্যবস্থার কাউকে বিশ্বাস নেই আমার। কাউকে না! ওখানে তোমার মতো মুখোশধারীরা আছে যে! আর তোমরা এই মুখোশধারী মানুষগুলো বড্ড বেশি ভয়ানক! বড্ড বেশি!
শেষের কথাটা বলে অদ্রির হাত আরো শক্তিতে ধরে নিজের আরো কাছে টেনে নিলো অঙ্কুর। পরপরই ওকে ছেড়ে লিফটের সুইচে চাপ দিলো। দরজা খুলে যেতেই জ্যাকেটের পকেটে দুহাত গুজে বেরিয়ে গেলো ও। সবটা ভেবে দম মেরে দাড়িয়ে রইলো অদ্রি। তারমানে অঙ্কুর ইচ্ছে করে ইউরো নাইন্টিন হাইজ্যাকিংয়ে যুক্ত হয়েছিলো,ইচ্ছে করেই পিযুশকে ছাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করিয়েছে। আর যেইনা ওদের পুরো দলের ঘাটির খোজ পেয়েছে,এয়ারস্ট্রাইক করিয়ে একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছে পুরো দলটাকেই। এটা সম্পুর্ন নিজের মতো করে সাজিয়েছে ও। কোনো সরকারী,আইনিগত তত্ত্বাবধায়ন কিংবা অনুমতি ছাড়াই। কারন পুরো আইনিব্যবস্থাকে জড়িয়ে কোনো রিস্ক নিতে চায়নি ও। সোজা কথায়,কাউকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি ওর। সব প্রশ্নের উত্তর শেষেও আরো একটা প্রশ্ন রয়ে গেলো অদ্রির মনে। এসব ওকেই কেনো বলে গেলো অঙ্কুর? ওর অদ্রি পরিচয় জেনে গেছে বলে? নাকি অন্য কোনো কারন?
#চলবে...
[ কাহিনী কাল্পনিক। ভুলত্রুটি মার্জনীয়।
হ্যাপি রিডিং❤
গল্প সম্পর্কিত আড্ডা দিতে জয়েন করুন মিথিমহল। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]