#সবটাই_তুমিময়-২
#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-৫
সিডনের শান্ত নদীতীর। আবছা আধার নামতে শুরু করেছে চারপাশে। দুরের আলোগুলো উজ্জল থেকে উজ্জলতর হচ্ছে আরো তাতে। পাশের ব্রীজের উপর দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর আলো দুর থেকে মরিচবাতির মতোই দেখাচ্ছে। হিমশীতল বাতাস গা ছুইয়ে দিতেই বারবার শিউরে উঠছে স্পিডবোটের প্রত্যেকে। পাড়ে আসতেই নামতে বলা হলো সবাইকে। একধ্যানে নিচদিক তাকিয়ে বসে ছিলো অদ্রি এতোক্ষন। ক্যাপ্টেনের ডাকে আস্তেধীরে নামতে শুরু করলো সবার সাথে। পুরো জায়গাটায় প্রেস মিডিয়া। স্থানীয় প্রশাসন নিজ দায়িত্বে সরিয়ে আনলো ইউরো নাইন্টিনের প্রতিটা যাত্রীকে। কোনোরকম ফর্মালিটিজ ছাড়াই সবাইকে এক গাড়িতে করে বহুতল এক বিল্ডিংয়ের সামনে আনা হয়। আবাসিক হোটেল। তারপর সবাইকে নির্দিষ্ট রুমে পৌছে দেওয়া হয়। রুমগুলো যেনো বরাদ্দ করাই ছিলো। কোনোদিক না তাকিয়ে যেভাবে বলা হলো,তেমনটাই করলো অদ্রি।
রুমে ঢুকে বিছানায় বসে পরলো অদ্রি। টের পেলো তানহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশেই বসলো ওর। একবার পাশে তানহার দিকে তাকিয়ে আস্থার দিক ফিরলো অদ্রি। ঠোটের কাটা জায়গাটায় হাত বুলাতে বুলাতে রুমের এটা ওটা দেখছে আস্থা। ল্যাম্পশেডটায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
-ইয়ার আহানা,তানহা,ভেবেছিলাম এখানে এসে রোহিঙ্গা লাইটের মতো শরনার্থী শিবিরের টেন্ট করে থাকতে হবে রে। কিন্তু এরা তো জোশ ফাইভস্টার হোটেলে নিয়ে আসলো আমাদের।
তানহা উঠে দাড়ালো। টেবিলের ড্রয়ার খুলতেই তাতে ফাস্ট এইড বক্স চোখে পরলো ওর। সেলোটেপ নিয়ে আস্থার সামনে গিয়ে থুতনি ধরে ওকে নিজের দিকে ঘুরালো। ঠোটের কোনে ওটা লাগিয়ে দিয়ে বললো,
-ইচ্ছে তো করছে তোর মুখেই মেরে মুখ বন্ধ করে দেই।
আস্থা হেসে ওর দু কাধে দুহাত রেখে বললো,
-ওহে গুরুজন,নিজের এই কেয়ারিং ছায়া সবসময় আমার উপর বর্ষিত করিয়েন।
তানহা মুচকি হাসলো। আস্থা চেহারায় গম্ভীরতা এনে বললো,
-আই ওয়াজ জোকিং! লাগবে না তোর সমসময় এতো গুরুজন সাজা! সবসময় ভাষন!
ওর কান টেনে দিলো তানহা। হাসলো দুজনেই। কিন্তু অদ্রি তখনও চুপ। আস্থা তানহা দুজন এগিয়ে গেলো। তানহা অদ্রির কাধে হাত রেখে বললো,
-চুপ করে আছিস কেনো আহানা? যা হওয়ার,তা তো হয়েই গেছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা সবাই ভালো আছি দেখ।
অদ্রি মাথা তুললো। উঠে দাড়িয়ে ধীর গলায় বললো,
-সবই ঠিক আছে,কিন্তু এ এস এ...
আর বললো না অদ্রি। কিই বা বলবে? অঙ্কুর টেরোরিস্ট গ্যাংয়ের সাথে জরিত কিনা? পিযুশকে ছাড়ানোতে জড়িত কিনা? এয়ারস্ট্রাইকে জড়িত কিনা? কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ও। যেখানে ও নিজেই এতোটা এলোমেলো হয়ে আছে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে,আস্থা তানহাই বা কি বলবে? আস্থা বিরক্তির চেহারা নিয়ে ওর সামনে দাড়ালো। বললো,
-তুই বারবার এ এস এ কে কেনো টানছিস আহানা? কি হয়েছে একচুয়ালি? বল তো?
অদ্রি চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস নিলো। চেহারায় কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললো,
-ক্ কিছুনা। আমি ঠিক আছি।
পুরোটা সময় তানহা খেয়াল করেছে অদ্রিকে। তাই ওর এই কিছু না কথাটা মানতে পারছে না ও। কিছু বলবে,তখনই নক পরলো দরজা। আস্থা ইংরেজীতে বললো কে? ক্যাপ্টেন আওয়াজ দিলো বাইরে থেকে। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলো আস্থা দুজন সার্ভের সাথে ওদের কেবিনে ঢুকলো সে। খাবার,মোবাইল ফোন আর কিছু ব্যবহার্য জিনিস নিয়ে এসেছে ওরা। ক্যাপ্টেন বললো,
-আজকের রাতটা রেস্ট নাও,কাল বিকেলের ফ্লাইটে আমরা বিডিতে ফিরবো। এখানে কিছু জিনিস দেওয়া আছে,আরো কিছু লাগলে ওদের বলে দিও,এনে দেবে। গুড নাইট।
ক্যাপ্টেন চলে যাচ্ছিলো। অদ্রি পেছন থেকে ডাক লাগালো,
-ক্যাপ্টেন?
-হুম?
-আ্ আসলে,ইউরো নাইন্টিনের বাকিসব প্যাসেন্জার্স...
-ওরা আপাতত এই হোটেলেই আছে। কালকে সবাইকে নিজ নিজ দেশের এয়ারলাইন্সে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আর এখান থেকে ইউরো টুয়েন্টি ওয়ান আমাদের নিজস্ব এয়ারলাইন।তাই আমরা ওটাতেই যাচ্ছি।
-ও।
ক্যাপ্টেন আবারো পা বাড়ালেন। দ্বিতীয়বারের মতো পিছুডাক দিয়ে অদ্রি বললো,
-হ্ হোয়াট আবাউট বিডি ক্রিকেটটিম?
ক্যাপ্টেন শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। তানহা শুধু দেখছে। আস্থা সার্ভগার্লদের সাথে কথা বলছিলো। অদ্রির কথায় নিজের কপালে সশব্দে চড় লাগালো একটা। ক্যাপ্টেন একপলক তানহার দিকে তাকিয়ে বললো,
-ম্যাচ ক্যান্সেল হলে ওরাও যাবে আমাদের সাথে। ডিপেন্ডস্।
আর একমুহুর্ত দাড়ায় নি ক্যাপ্টেন। চলে আসলো ওদের রুম থেকে। অদ্রি নিজের মতো করে ভাবতে শুরু করে দিয়েছে,অঙ্কুরকে কোথায় কিভাবে সবটা জিজ্ঞাসা করবে। হঠাৎই ওর সামনে ফোন তুলে ধরলো তানহা। শান্তভাবে বললো,
-এতোবড় বিপদ থেকে বেচে ফিরেছিস। আঙ্কেল আন্টিকে কে একটা ফোন করে জানা তুই সুস্থ্য আছিস। জানিস তো তারা প্রত্যেকে তোকে নিয়ে কতোটা টেনশন করে।
ফোনটা হাতে নিয়ে তাই করতে যাচ্ছিলো অদ্রি। তানহা বললো,
-বিডির ক্রিকেটটিমের কথা না জিজ্ঞাসা করলে চলছিলো না আহানা? ক্যাপ্টেন এমনিতেও রাগ করেছে তোর উপর।
...
-এ এস এ কে নিয়ে না ভেবে,তোর হবু বরকে নিয়ে ভাব আহানা। ইউরো নাইন্টিনের হাইজ্যাকিংয়ের কথা শুনে আঙ্কেল আন্টির মতো এতোক্ষনে সে মানুষটাও হয়তো পাগলপ্রায়।
অদ্রি শক্ত করে মুঠো করে রইলো ফোনটা। জীবনের আরেকটা সত্য মনে করিয়ে দিলো তানহা। না চাইতেও যে সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে ও,তা কি আদৌও সুখের হবে দুজনের কারো জন্য?
•
ক্রিকেটবোর্ডের সাথে ভিডিও কল শেষ করলো অঙ্কুর। উঠে গিয়ে দুহাত পকেটে গুজে জানালার কাছে দাড়ালো। থাই গ্লাসের জানালার ওপারে রাতের ঝিকিমিকি আলোতে সাজা শহর সিডনে। শান্তি লাগছে প্রচন্ড ওর এভাবে বাইরে তাকিয়ে থাকতে। কারন বেশ কয়েকটা। এই একই বিল্ডিয়ে ইউরো নাইন্টিনের একজন বাদে বাকিসব,সুরক্ষিত। অদ্রিও সেভাবেই,যেভাবে ও চেয়েছিলো। এলোমেলো,প্রশ্নে জর্জরিত। টিভিতে নিউজে ড্রোন ক্যামেরায় তোলা সেই এয়ারস্ট্রাইকের ভিডিও বারবার দেখিয়ে চলেছে। বিস্ফোরনের ভিডিওটি ওর মনের যন্ত্রনার অনলে বর্ষনের মতো নামছে। ম্যাচ ক্যান্সেল হওয়া থেকে আটকে দিয়েছে ও। একদিন পর হচ্ছে ম্যাচ। এখানে সিডনেইতেই। দরজায় নক শুনে ওভাবে দাড়িয়ে থেকেই অঙ্কুর বললো,
-কাম ইন।
রোহান ভেতরে ঢুকলো। অঙ্কুরের কাছে এসে বললো,
-কি করছিলি?
-তেমন কিছু না। মিটিং ছিলো ক্রিকেটবোর্ডের। অপোজিট টিম বলেছে যদি বিডি চায় ম্যাচ ক্যান্সেল করতে,ওদের সমস্যা নেই। বোর্ড চেয়েছিলো ক্যান্সেল করতে,আমি আটকে দিয়েছি।
-বাকি টিম মেম্বার্স কি বলেছে?
অঙ্কুর একটু হেসে বললো,
-ওরা সবসময়ই এ এস এ'র মতকে প্রায়োরিঘি দেয় রোহান। তাছাড়া ওই বাস্টার্ড টেরোরিস্টদের জন্য আমাদের ম্যাচ বাতিলের কোনো মানেই হয়না। সবাই একমত।
রোহান একটা ছোট শ্বাস ফেলে বললো,
-ম্যাচ ক্যান্সেল হতে দিলি না,তারমানে তুই থাকছিস আরো দুদিন। তাইতো?
-হুম।
-আমি তবে কাল আহানাদের সাথেই বিডিতে ফিরি?
অঙ্কুর পেছন ফিরলো। ভ্রু কুচকে বললো,
-ওরা কাল ফিরছে?
-এমনটাই শুনলাম।
অঙ্কুর নিশব্দে ঘাড় বাকিয়ে হাসলো। রোহান বললো,
-হাসছিস কেনো?
-হুম? ও কিছুনা। তুই এটা বল এতো তাড়া কিসের তোর?
-এখানে থেকে কি করবো? এই ফ্লাইটে তোকে একা ছাড়বো না বলে এসেছিলাম। সবটা যখন মিটে গেছে,আমি চলে যাই?
অঙ্কুর ওভাবেই হেসে বললো,
-ওকে ফাইন। যদি কাল ফ্লাইট থাকে তোদের,চলে যাস। আমি আটকাবো না।
কপাল কুচকে তাকিয়ে রইলো রোহান। ওকে এভাবে যেতে দেবে অঙ্কুর,এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে ওর। পরপরই শিথিল হলো ওর চাওনি। অঙ্কুরের এমন হাসা মানে অনেক কিছু। কপাল করে বন্ধু পেয়েছে। পুরোটা জীবন যেখানে ও সোজা কথায় পার করেছে,সেখানে অঙ্কুরের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই ওকে রহস্যময় কথাবার্তার ভীড়ে পিষ্ট হতে হয়েছে। মুচকি হেসে আবারো বাইরের দিকে ফিরলো অঙ্কুর। এখনই অদ্রিকে বিডিতে ফিরতে দেওয়ার ইচ্ছা ওর নেই। একদমই নেই।
#চলবে...
[ গল্প সম্পর্কিত আড্ডা দিতে জয়েন করুন মিথিমহল। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]