ফন্ট সাইজ:
থিম:
সবটাই তুমিময় (সিজন ২)

১৯তম পর্ব

লেখক: মিথিলা মাশরেকা

#সবটাই_তুমিময়-২

#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-১৯
অঙ্কুর ডাইনিংয়ে দুটো প্লেটে খাবার সাজাচ্ছিলো নিজ হাতে। আফরা খানম সোফায় বসে বই পড়ছিলেন। চশমার উপর দিয়ে সোজাচোখে একবার তাকালেন উনি অঙ্কুরের দিকে। নিজের কাজে হঠাৎই থেমে গেছে অঙ্কুর। ওর দৃষ্টি সিড়ির দিকে আটকে আছে। ওর দৃষ্টি অনুসরন করে আফরা খানম নিজেও তাকালেন পাশে। সিড়িতে হালকা গোলাপি গাউন,বা কাধ আর বা হাতে পরে থাকা সাদা জরজেটের ওড়নায় অদ্রি। একেবারে আস্তেধীরে নামতে নামতে ভেজা চুলগলো বা হাতেই ঘাড় থেকে সামনে এনে দিলো ও। অঙ্কুরের জন্য যেমনটা চেয়েছিলেন,ঠিক তেমনটাই স্নিগ্ধ,মিষ্টি মেয়ে অদ্রি। ওর আগমনে চারপাশটায় এক আলাদাই মুগ্ধতা তৈরী হয়ে গেছে যেনো। মুচকি হেসে আবারো বইয়ে মনোযোগ দিলেন আফরা খানম। চোখ তুলে তাকাতেই অঙ্কুরের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো‌ অদ্রির। অঙ্কুর তৎক্ষনাৎ চোখ সরিয়ে নিলো। অদ্রি নিচে নেমে আসলে আফরা খানম বললেন,
-গুড মর্নিং আহানা।
-গুড মর্নিং আন্টি।
-আন্টি?
অদ্রি একটু থেমে গেলো। আফরা খানম বললেন,
-শাশুড়ি মা হইতো তোমার। মা বলে ডাকবে না?
একপলক অঙ্কুরের দিকে তাকালো অদ্রি। ও নিজের কাজে ব্যস্ত। অদ্রি বললো,
-জ্বী। চেষ্টা করবো।
-ঠিকাছে। আগে ব্রেকফাস্ট শেষ করো,তারপর চেষ্টা করো কেমন?
অদ্রি ডাইনিংয়ে এগোলো। চেয়ারে বসে যেতেই‌ অঙ্কুর না তাকিয়ে বলে উঠলো,
-আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
-আমি পারবো।
অঙ্কুর চোখ তুললো না। প্লেট নিয়ে ডানহাতে চামচ নাড়ানোর চেষ্টা করলো অদ্রি। পারলো না। টান লাগছে আঁচড়ে যাওয়া আঘাতে। অঙ্কুর বললো,
-আর ইউ ডান? ট্রায়াল দেওয়া শেষ?
বা হাতেই এবার খাওয়ার চেষ্টা করলো অদ্রি। অঙ্কুর প্লেটটা কেড়ে নিয়ে খাবার মুখের সামনে ধরলো ওর। চোখ তুলে না তাকিয়ে বললো,
-আই ডোন্ট হ্যাভ হোল ডে ফর ইউ!
খাবার মুখে নিলো অদ্রি। অঙ্কুর নিজের মতো করে ওকে খাওয়াতে লাগলো। কিন্তু একবারও তাকালো না ওর দিকে। বিষয়টা খেয়াল করে শুধু কপাল কুচকালো অদ্রি। খেয়ে‌ নিলো বিনাবাক্যে। খাওয়ানো শেষে অঙ্কুর বললো,
-হাতে ওয়েন্টমেন্ট লাগিয়েছো?
অদ্রি চুপ। উঠে গিয়ে হাতটা ধুয়ে মেডিসিন বক্স নিয়ে আসলো অঙ্কুর। ঔষুধ খাইয়ে সুন্দরমতো ব্যান্ডেজ খুলে,ওয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিতে লাগলো। এরমাঝেই টেবিলে থাকা অদ্রির ফোন বেজে উঠলো। সেদিকে তাকালো দুজনেই। মিস্টার তিহান লেখাটা আলোতে চকচক করছে একদম। অঙ্কুর নিজে ওটা রিসিভ করে অদ্রির কানে ধরলো। বিস্ময়ে ওর নতদৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলো অদ্রি। ওপাশ থেকে তিহান বললো,
-কেমন আছো আহানা?
-জ্ জ্বী ভ্ ভালো। আপ্....
-আমি কেমন আছি,জিজ্ঞাসা করো না প্লিজ। না সত্যি বলতে পারবো,না মিথ্যে। 
ওড়না খামচে ধরলো অদ্রি। হঠাৎই গলায় দলা পাকিয়ে আসছে যেনো কথাগুলো। তিহান বললো,
-কিছু বলার ছিলো তাই কল করা। আসলে আহানা,নিউমার্কেট টেরর ইস্যুটা...
কলটা কেটে গেলো। ফোন সরিয়ে নিলো অঙ্কুর। ওটার দিকে তাকালো অদ্রি। অঙ্কুর বললো,
-তো‌মাদের একান্ত কথাগুলোতে আমার কানে আসুক,এমনটা চাইনা আমি। পরে কথা বলে নিও।
অদ্রি বুঝলো কলটা কেটে যায়নি। অঙ্কুর নিজে কেটে দিয়েছে। অবশ্য ভালোই হয়েছে তাতে। যে বিষয়ে কথা বলতে যাচ্ছিলো তিহান,তা অঙ্কুরের আড়াল থাকা আবশ্যক। অঙ্কুর ততোক্ষনে উঠে দাড়িয়েছে। অদ্রি বললো,
-আমি বেরোবো।
অঙ্কুর থামলো। অদ্রি বেরোবে-ওই দুটো শব্দে যেনো এতোক্ষনের জড়তা পুরোটা কেটে গেছে ওর। অদ্রির দিকে তাকালো ও পেছন ফিরে। এগিয়ে একদম সামনে এসে দাড়ালো ওর। এতে বেশ অনেকটা অবাকই হয়েছে অদ্রি। অঙ্কুর জ্যাকেটের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে খানিকটা ঝুকে বললো,
-টিপিকাল বাঙালী বধুর মতো বরের অনুমতি নিচ্ছো মিসেস পর্বতশৃঙ্গ?
অদ্রি শুধু স্বাভাবিকদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। ওর সব ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে ওকে রাগানোর জন্যই এসব বললো লোকটা। অঙ্কুর সোজা হয়ে দাড়িয়ে ঠোটে কিঞ্চিত হাসির রেখা টেনে বললো,
-অনুমতি দিচ্ছি না। নেক্সট পাঁচদিন এই খানম ভিলার বাইরে বেরোবে না তুমি। 
ধপ করে যেনো গায়ে আগুন ধরে গেলো অদ্রির। মানুষটা সত্যিসত্যিই অনুমতি দেখাচ্ছে ওকে। ও কেনো অনুমতি নেবে এই লোকের? বেরোবে কথাটা শুধুমাত্র ফর্মালিটি দেখাতে বলেছে। আর সেটাকে অনুমতি বানিয়ে দিলো? অদ্রি খিচে উঠে দাড়িয়ে বললো,
-হোয়াট ডু ইউ‌মিন বাই অনুমতি দিচ্ছি না? আপনার কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই‌ আমার অঙ্কুর!
-বেরোচ্ছি। দুপুরে মায়ের সাথে খেয়ে নিও। মেডিসিন নেই কোনো। আমার আসতে রাত হবে। এসে একসাথে ডিনার করবো ওকে?
-আমিও বেরোবো!
-লিসেন অদ্রি,আমি যেমন সভ্য বরের মতো বেরোনোর সময় তোমাকে বলে বেরোচ্ছি,সেভাবে তুমিও সভ্য বউয়ের মতো আমার অনুমতি ছাড়া তুমি বেরোবে না। 
-আপনি আমাকে আটকানোর কেউ নন!
অঙ্কুর তেড়ে এগোতে যাচ্ছিলো অদ্রির আরো কাছে। কিন্তু ওর পেছনে কিছু দেখে চোখ বন্ধ করে সামলালো নিজেকে। ওইভাবে এগিয়ে আসতে চেয়েও থেমে গিয়ে অঙ্কুরকে তপ্ত নিশ্বাস ফেলতে দেখে ভ্রু কুচকালো অদ্রি। অঙ্কুর চোখ মেলে শান্তভাবে বললো,
-বর হই তোমার অদ্রি। কিন্তু বিয়েটা যেভাবে হয়েছে,বাইরের প্রেস মিডিয়াকে হ্যান্ডেল করতে পারবে না তুমি। এখানে তোমার সেইফটির একটা বিষয় আছে। কিছুদিন যেতে দাও,সবটা ঠান্ডা হোক,তারপর যেখানে খুশি যেও। এই মিডিয়ার জন্য তুমি কোনোভাবে অস্বস্তিতে পরো,এমনটা চাই না আমি। তোমার ভালোর জন্যই‌ বলছি।
অঙ্কুরের বদলে যাওয়া স্বর শুনে বিস্ময়ে তাকালো অদ্রি। কিছু বলতে যাবে,পেছন থেকে আফরা খানম বলে উঠলেন,
-অঙ্কুর ঠিকই বলেছে আহানা। 
আফরা খানমকে দেখে অঙ্কুরের মিষ্টিভাষার কারন খুজে পেলো অদ্রি। বললো,
-কিন্তু মা...
-কোনো কিন্তু না আহানা! কিছুদিন বাসায়ই থাকো তুমি! নাই গেলে বাইরে! হাজারটা কথা শুনতে হবে তোমায় এসব নিয়ে! দেখছোই তো বাসায় বসেই,টিভি,নিউজ,পেপার,অনলাইন,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম...
হতাশার শ্বাস ছাড়লেন আফরা খানম। অদ্রি বললো,
-ওরা যা তা বলছে,তাই বলে আমি বাইরে বেরোবো না? এভাবে কতোদিন? কোনো দোষ না করেও এভাবে গা ঢাকা দিয়ে থাকবো কেনো আমি?
-এটাকে গা ঢাকা বলে না। প্রেসমিডিয়ার নেটওয়ার্কের বাইরে বলে ডাফার সিআইডি!
বিরবিরিয়ে অঙ্কুরের বলা পুরো কথাটা শুনলো অদ্রি। রক্তচক্ষু করে তাকালো ও‌ অঙ্কুরের দিকে। ওর দিকে তাকিয়ে হচকিয়ে গেলো অঙ্কুর। আমতা আমতা করে বললো,
-আব্...মা? আ্ আমি বেরোচ্ছি হুম?
আফরা খানম উকি দিয়ে অদ্রির দিকে তাকিয়ে বুঝলেন ছেলে অতিদ্রুত বউয়ের চাওনি এড়াতে চাইছে। ঠোট টিপে হাসি আটকে বললেন,
-তুই আবার কোথায় বেরোচ্ছিস?
-ওই একটু কাজ...
-যতো গনমাধ্যম আমাকেই ধরবে! ওনাকে তো ধরবে না!
অঙ্কুরকে বলতে না দিয়ে রাগ নিয়ে বললো অদ্রি। অঙ্কুর একটা বড়সর হাসি দিলো। পকেট থেকে মাস্কটা বের করে পরে নিয়ে,জ্যাকেটের হুডি মাথায় তুলে দিয়ে বললো,
-ক্রিকেটিং আমার ন্যাশনাল ডিউটি বলে নেটওয়ার্কের বাইরে যেতে পারিনা। কিন্তু আমি যে গা ঢাকা দিতে এক্সপার্ট,সেটা তোমার এটলিস্ট অজানা নয় অদ্রি।
আস্তে করে কথাটা বলে মায়ের দিকে তাকালো অঙ্কুর। এবার মাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-আসছি মা!
-সাবধানে যাস। আর তাড়াতাড়ি ফিরিস।
মাথা নাড়লো অঙ্কুর। উনি সিড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেন। অদ্রি আফরা খানমের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। অঙ্কুর ঘুরে সামনে এসে দাড়ালো ওর। একেবারে স্বাভাবিক গলায় বললো,
-শশুরবাড়ি যাচ্ছি। তুমি তো তোমার শশুড়বাড়ির আদর খাওয়ার সাথে সাথে আমাকে উল্টেপাল্টে দিতে ব্যস্ত। আমিও তবে যাই আমার শশুড়বাড়ি? সেখানকার আপ্যায়ন গ্রহন করে শশুড়মশাইকে খানিকটা ঝটকা প্রদান করে আসি? কি বলো?
অদ্রি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো যেনো। অঙ্কুর এক অমায়িক হাসি হেসে বললো,
-দেখেছো? কতো সভ্য বর তোমার! মাকে বললাম না কোথায় যাচ্ছি,তোমাকে ঠিকই বললাম! আবার অনুমতিও নিচ্ছি! যদিও বারন করলে শুনবো না,সেটা আলাদা বিষয়!
-আ্ আপনি...
-আসছি। টেক কেয়ার অফ ইউরসেল্ফ বউ। সদ্য হওয়া মেয়েজামাইয়ের প্রথমবার বাসায় আগমন,আকাশ ইলিয়াসের জন্য অবিস্মরনীয় হয়ে থাকবে। আই'ল মেক শিওর অফ দ্যাট! বাই!
এটুকো বলেই অঙ্কুর চলে আসলো ওখান থেকে। অনেক ডেকেছে অদ্রি। পেছন পেছন পা নিয়ে খুরিয়ে এসেছেও অনেকটা। শোনেনি অঙ্কুর। চলে গেছে। ওকে চোখের আড়াল হতে দেখেই অদ্রির চোখ ভরে উঠলো। ও যা ভাবছে,অঙ্কুর যে ইঙ্গিত ওকে দিয়ে গেলো,যদি তাই হয়,ওর বাবা কোনোদিনও ক্ষমা করবে না ওকে। আজীবনের মতো মুখ ফিরিয়ে নেবে ওর থেকে। আজীবনের তরে!
#চলবে...
[ গল্প সম্পর্কিত আড্ডা দিতে জয়েন করুন মিথিমহল। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন