ফন্ট সাইজ:
থিম:
সবটাই তুমিময় (সিজন ২)

২০তম পর্ব

লেখক: মিথিলা মাশরেকা

#সবটাই_তুমিময়-২

#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-২০
কলিং বেল শুনে দরজা খুলে দিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন অনিতা মেহরান। সুন্দর একটা হাসি ঠোটে ঝুলিয়ে অতি প্রানোচ্ছলভাবে অঙ্কুর দরজায় দাড়িয়ে। সবে আগের‌দিন ওভাবে মেয়ের বিয়েটা হয়েছে,আজই অঙ্কুরের এ বাসায় এভাবে আগমনটা অনাকাঙ্ক্ষিত হবে ওনার জন্য,এটাই স্বাভাবিক। অদ্রি সবেই ফোন করেছিলো। শুধু জিজ্ঞাসা করেছে বাবা কোথায়। বাসায়ই আছে শুনে তৎক্ষনাৎ কল কেটে দিয়েছে অদ্রি। আর কিছুই বলেনি। ঠিক তার পরপরই এভাবে অঙ্কুরের চলে আসা। সবটা নিয়ে চিন্তার মাত্রাটা বেড়েই চললো অনিতা মেহরানের। অঙ্কুর বললো,
-কেমন আছেন আন্টি?
ধ্যান ভাঙলো অনিতা মেহরানের। দরজা থেকে সরে দাড়িয়ে বললেন,
-আরে অঙ্কুর! এ্ এসো এসো। ভেতরে এসো।
অঙ্কুর ভেতরে ঢুকলো। ড্রয়িংরুমে দাড়িয়ে পুরো বাসাটায় চোখ বুলালো একবার। একতল বাসার পুরোটা আকাশ ইলিয়াস শুধুই তার পরিবারের জন্যই সাজিয়েছেন। সাজানো,ছোট্ট সংসার। অনিতা মেহরান বললেন,
-ব্ বসো না অঙ্কুর! 
-জ্বী আন্টি। তবে আপনি স্ট্রেস নেবেন না প্লিজ। আপনার মেয়ে খানম ভিলায় বেশ আছে। আমি এদিকেরই একটা কাজে এসেছিলাম,ভাবলাম দেখা করেই যাই আপনাদের সাথে। তাই....
অঙ্কুর বসে গিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললো। ওর কথায় কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন অনিতা মেহরান। জোরপুর্বক হেসে বললেন,
-খুব ভালো করেছো। তুমি বসো,আমি...
-কে এসেছে অনিতা?
ঘড়ি লাগাতে লাগাতে রুম থেকে বেরোলেন আকাশ ইলিয়াস।‌ অঙ্কুর দাড়িয়ে গেলো। ওকে দেখে আটকে গেলেন আকাশ ইলিয়াস। একপলক স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তার মুখচোখ দেখেই‌ বুঝলেন,বিষয়টা তারও অনাকাঙ্ক্ষিত। অঙ্কুর সালাম দিয়ে বললো,
-কেমন আছেন স্যার?
সালামের উত্তর নিলেন আকাশ ইলিয়াস। হাসিমুখে বললেন,
-ভালো। দাড়ালে কেনো? বসো।
-আসলে এদিকেই এসেছিলাম,ভাবলাম দেখা করে যাই আপনাদের সাথে। আপনি কোথাও বেরোচ্ছিলেন?
-আরেহ্ না! তেমন কিছু না। প্রেসক্লাবে যাবো ভাবছিলাম। তবে তুমি বাসায় এসে খুব ভালো করেছো। কিন্তু অঙ্কুর, এটা কেমন কথা বলো? প্রথমবার এ বাসায় আসলে,একটু জানিয়ে আসতে পারতে! অনিতা? ওর জন্য কিছু...
কিচেনের দিকে যাচ্ছিলেন অনিতা মেহরান। অঙ্কুর বলে উঠলো,
-আন্টি আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি খেয়েই বেরিয়েছি।
-কিন্তু...
-কোনো কিন্তু না। আমি বেশি দেরি করবো না আন্টি। সময় নেই। তাছাড়া মিডিয়া কখন,কিভাবে,কোথায় আছে,সেটাও বলতে পারি না। তাই বেরোবো এজ সুন এজ পসিবল। আসলে আপনার মেয়ের কিছু জিনিস নেওয়ার ছিলো। ও নিশ্চয়ই কল করেছিলো আপনাকে?
অনিতা মেহরান অবাক হলেন। কল করলেও এমন কিছুই বলেনি অদ্রি তাকে। অঙ্কুর বললো,
-বলেনি কিছু? শুধু বাবার খোজ নিয়েই কল কেটে দিয়েছে বুঝি?
মাথা উপরনিচ করলেন অনিতা মেহরান। অঙ্কুর এই অল্পসময়েও তার মেয়েকে বেশ অনেকটাই চিনে গেছে দেখে অনেকটা স্বস্তি মিললো তার মনে। বাকা হাসলো অঙ্কুর। ওর ধারনাই মিললো। এ বাসায় কল করেছিলো অদ্রি। এবার অদ্রি কল করতে যাবে তিহানকে। তিহানকে বলবে,ও যেনো এ বাসায় এসে অঙ্কুরকে আটকায়। ওর বাবাকে যেনো কিছু না বলতে পারে অঙ্কুর। কিন্তু অদ্রির মনমতো ঘটনা না ঘটারও ব্যবস্থা করে রেখেছে ভেবে মনেমনে আরেকটু হাসলো অঙ্কুর। পরে হাসি থামিয়ে বললো,
-আসলে ইন্জুরি আছে তো ওর,তাই ওকে আনিনি। আপনি কথা বলে নিন ওর সাথে।
-হ্যাঁ অনিতা। দেখো কি বলে আহানা।
আকাশ ইলিয়াসের কথায় মাথা নেড়ে মোবাইল হাতে রুমে চলে গেলেন অনিতা মেহরান। আকাশ ইলিয়াস সোফায় বসে বললেন,
-দেখো অঙ্কুর,তোমার আর আহানার বিয়েটা...
-কাজের কথায় আসি?
আকাশ ইলিয়াস থামলেন। কপালে সুক্ষ্ম ভাজ পরলো তার। অঙ্কুর এক অতিব সুন্দর হাসি দিয়ে বলে উঠলো,
-এসব আসলে অজুহাত আকাশ স্যার। আমি এখানে আপনার মেয়ের কিছু নিয়ে যাবো বলে আসিনি। আপনার কাছ থেকে কিছু নেবো বলে এসেছি।
বিস্ময়ে অঙ্কুরের দিকে তাকালেন আকাশ ইলিয়াস। বললেন,
-মানে?
অঙ্কুর উঠে দাড়ালো। অন্যদিক ফিরে চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো কিছুক্ষন। আকাশ ইলিয়াস নিজেও উঠে দাড়ালেন এবার। সেটা টের পেয়ে,অঙ্কুর ঘুরে উঠে,চোখে চোখ রেখে হঠাৎই শীতল চাওনি স্থির করলো তার দিকে। ধীরগলায় বললো,
-নিউমার্কেট টেরর কেইসের কাগজপত্র সবটা আমার চাই আকাশ স্যার!
পর্বতসম বিস্ময়ে তাকালেন আকাশ ইলিয়াস। এই দু বছর পুরোনো কেইসটা কেনো সামনে আনলো অঙ্কুর? এ ঘটনার কাগজপত্র যে ওনার কাছে আছে,তা কারোর জানার কথা নয়। উনি নিজেই জানান নি। বিশ্বাসযোগ্য কাউকেই পাননি বলে জানাতে পারেন নি। তবে অঙ্কুর এসব কি করে জানে? খানিকটা অস্বাভাবিকভাবে হেসে বললেন,
-ন্ নিউমার্কেট টেরর মানে? এসব কি বলছো তুমি অঙ্কুর?
-মানেটা আপনি খুব ভালো করে জানেন স্যার। প্লিজ হেয়ালি করবেন না কোনো।
-অঙ্কুর...
-আমার চাই ওই কাগজগুলো!
শক্তভাবে বললো অঙ্কুর। আকাশ ইলিয়াস হতভম্ব। কিন্তু অঙ্কুরের চেহারা দেখে বুঝলেন ও সবটা জেনেই এসেছে এখানে। নিজেকে সামলে বললেন,
-কেইসটা মিটমাট হয়ে গেছে অঙ্কুর।
-তবুও আসল সত্যিটা এখনো সবাই জানে না। 
-কি চাইছো তুমি?
...
-বলো অঙ্কুর? কেনো চাইছো ওগুলো তুমি?
-এগুলো আপনার জানার প্রয়োজন নেই। জাস্ট কাগজগুলো আমাকে দিয়ে দিন।
-তোমাকে দেবো বলে ওগুলো আড়ালে রাখি নি আমি!
-তাহলে কেনো রেখেছেন? সত্য আড়াল করতে?
আকাশ ইলিয়াস থেমে গেলেন। অঙ্কুর বললো,
-আপনি শুধুমাত্র ভরসাযোগ্য কাউকে পাননি বলে ওগুলো আড়াল করেছেন। আর আপনার এই আড়ালের জন্য গত দু দুটো বছর হলো আমি নিরব দহনে জ্বলছি মিস্টার আকাশ ইলিয়াস। তাই লুকিয়ে থাকা অভিযুক্তদের তালিকা থেকে আপনিও বাদ পরেননি।
-অঙ্কুর!
-আপনার উচ্চস্বরে আমার সৌজন্যস্বর বাধাগ্রস্থ হচ্ছে স্যার। তবুও সংবরন করছি নিজেকে। আপনার সাথে বেয়াদবির ইচ্ছে আমার নেই। তাই বলে আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেবেন না প্লিজ। আপনার মেয়ের জন্য সেটা ভালো হবে,এমন কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছি না আপনাকে।
আকাশ ইলিয়াস চমকে উঠলেন। তার মেয়ে এখন অঙ্কুরের স্ত্রী। আর শেষের কথাটা দিয়ে ঠিক‌ কি বোঝাতে চাইলো ও? অঙ্কুর বললো,
-আশ্চর্য হচ্ছেন? এতোক্ষনে? আরো আগে আশ্চর্য হওয়া উচিত ছিলো না আপনার? যখন হুট করেই এএসএ'র সাথে আপনার মেয়ের মতো কেউ এভাবে জরিয়ে যায়,ব্রেকিং নিউজ হিসেবে সে খবর হেডলাইনে বেরোয়,এমনকি এএসএ সেটাকে টাকা,ক্ষমতা দিয়ে বাকিসবার মতো ধামাচাপা দেওয়ার পরিবর্তে তাকে বিয়ে করতে যায়? ইজ'ন্ট ইট স্ট্রেইন্জ?
...
-একটা কথা বলুন তো স্যার? আপনার কি মনে হয়? আপনার মেয়ের স্কুটি আমার মায়েরই গাড়িতে এক্সিডেন্ট করলো,এটা একেবারে কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে? একচুয়ালি,ওটা তো এক্সিডেন্ট ছিলোই না! ইন্টেনশনালি ইনিশিয়েট করা প্লান ছিলো আমার। ড্রাইভারকে আমি‌ই বলে দিয়েছিলাম ঘটনাটা এভাবে ঘটানোর জন্য। যদিও তার অসতর্কতায় আমার মাও কপালে আঘাত পেয়েছে। 
...
-আপনার মেয়ে সে রাতে খানম ভিলায় থাকতে চাইনি স্যার। ওকে আমি বাধ্য করেছিলাম। পায়ে আলাদাকরে আঘাত দিয়ে আমিই ওর থেকে যাওয়ার অজুহাত করে দিয়েছিলাম।
...
-টিভিনিউজে দেখানো ছবিগুলো ক্লিক করাবো বলে আমিই কাছে গিয়েছিলাম আপনার মেয়ের। ক্যামেরাম্যান ওয়াজ মাই ম্যান! ইভেন এসবটা মিডিয়ায় ইনফর্ম করার দায়িত্বে আমি নিজেই ছিলাম।
আকাশ ইলিয়াস স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছেন শুধু। কিংকর্তব্যবিমুঢ় উনি এই মুহুর্তে। নিজের কান,চোখকে বিশ্বাস করতে চরম কষ্ট হচ্ছে তার। বিস্ময় নিয়েই বললেন,
-তারমানে এই সবকিছু তুমি করেছো শুধুমাত্র আহানাকে বিয়ে করবে বলে?
অঙ্কুর আরেকপা এগোলো। বললো,
-না। আপনার দুর্বলতা,আপনার মেয়েকে নিজের কাছে রেখে আপনাকে দুর্বল করে দেবো বলে।
আকাশ ইলিয়াস নিরব। কথা বলা যেনো ভুলে গেছেন উনি। যে ছেলে নিজের নাম বদনাম করে তার মেয়েকে বিয়ে করতে পারে,ওই কাগজগুলোর জন্য সে কতোদুর যেতে পারে,ধারনা করতে খুব একটা কষ্ট হলো না তার। অঙ্কুর সুন্দরমতো হেসে বললো,
-এতোসবকিছু করে আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করলাম। কোনো উদ্দেশ্য থাকা আবশ্যক নয় কি আমার? আপনিই বলুনতো?
রাগে হাত মুঠো হয়ে আসলো আকাশ ইলিয়াসের। তার চোখের কোনে জল চিকচিক করছে সেটা স্পষ্ট দেখতে পেলো অঙ্কুর। কিছু করার নেই ওর। বাবা-মেয়ের এই রাগ ক্ষোভ ওর ক্ষতর কাছে কিছুইনা। যে উদ্দেশ্যে এতোসবকিছু করলো,তা পুরন ব্যাতিত ক্ষান্ত হবে না ও। কোনোমতেই না!
•
পায়ে ব্যথা নিয়েও অদ্রি ঘরের ভেতর পায়চারি করে চলেছে। অঙ্কুর চলে যাবার পর তিহানকে ফোন করে বাবার ওখানে যেতে বলবে,ঠিক তখনই রুমে ঢোকেন আফরা খানম। তার কিছু আত্মীয়স্বজন নাকি বাসায় আসবেন ওকে সামনাসামনি দেখার জন্য। এজন্য নিজে হাতে উনি কিছু গয়না আর হালকা সাজে সাড়িয়েছেনও ওকে। পুরোটা দিন ভদ্রমহিলাদের সামনে বেশ ভদ্রতা দেখিয়েছে অদ্রি। ওনারা চলে যেতেই বিষিয়ে উঠলো ওর শরীর। রাত গরিয়েছে। এতোক্ষনে হয়তো অঙ্কুর ওর বাবাকে বলে দিয়েছে সবটা। রুমে ঢুকে রাগে গলার ওড়নাটা আগে বিছানায় ছুড়ে মারলো। গলায় থাকা মালাটা টান মেরে ছিড়ে ফেললো নির্বিকারচিত্ত্বে। বা হাতের পিঠে ঠোটের উপর ডলা লাগালো জোরেসোরে। মাথার চুল উল্টে ধরে জোরে শ্বাস নিয়ে সবে ফোন ধরতে যাবে,কেউ একজন হেচকা টানে দেয়ালে চেপে ধরলো ওকে। 
একহাতে কোমড়ের পেছনে চেপে ধরে আটকে দেওয়া,জ্যাকেট পরিহিত মানুষটা অঙ্কুর। তীক্ষ্মদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অদ্রি। রাগীশ্বাস ফেলতে লাগলো জোরে জোরে। অঙ্কুরের শান্ত দৃষ্টি অদ্রির গলায়। নখের আঁচড়ে কেটে গিয়ে লাল দাগ পরে গেছে ওখানে। অদ্রি কিছু বলবে,ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অদ্রির ঠোটের নিচে হাত লাগালো অঙ্কুর। থেমে গেলো অদ্রি। ঘোর লাগা দৃষ্টি অঙ্কুরের। ওর ঠোটের নিচদিকে ছড়িয়ে যাওয়া লিপস্টিক আলতোভাবে মুছিয়ে দিতে দিতে অঙ্কুর বললো,
-সেজেছিলে?
হাত ঝারা মারলো অদ্রি। কাটকাট গলায় বললো,
-বাবাকে কি বলেছেন আপনি?
একটু ওর দিকে তাকিয়ে থেকে হাত নামিয়ে নিলো অঙ্কুর। তবে অদ্রির হাত ছাড়লো না। দেয়াল থেকে সরিয়ে ওকে আরো কাছে টেনে নিজের সাথে আটকে নিলো অঙ্কুর। হাত ছোয়ালো ওর গলায় কাটা জায়গাটায়। জ্বালাপোড়ার মৃদ্যু ব্যথা অনুভব হতেই চোখ খিচে একমুহুর্তের জন্য বন্ধ করে নিলো অদ্রি। পরপর চোখ খুলে কিছু বলতে যাবে,তার আগেই আরেক শিহরনে জমে গেলো ও। ওর গলায় মুখ গুজে দিয়ে ব্যথার জায়গাটায় ঠোট ছুইয়েছে অঙ্কুর। হিমদেহে অজানা শিহরনের কম্পন তুলে দেওয়ার জন্য,শীতল সে স্পর্শ বুঝি যথেষ্ট ছিলো। হয়তো অতিরিক্তই ছিলো! 
#চলবে...
[ গল্প সম্পর্কিত আড্ডা দিতে জয়েন করুন মিথিমহল। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন