#সবটাই_তুমিময়-২
#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-২১
গায়ের সবটুকো জোর দিয়ে ধাক্কা মেরে অঙ্কুরকে কাছ থেকে সরিয়ে দিলো অদ্রি। এই লোক এইভাবে ওর গলায় মুখ গুজে দেবে,কল্পনাতেও ছিলো না ওর। আর সেটাই ঘটেছে। রাগে জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে ও। কিছুটা চকিত হয়ে তাকিয়ে রইলো অঙ্কুর। পরে একটা ক্ষুদ্রশ্বাস ফেলে একপা এগিয়ে বললো,
-আ'ম সরি। আসলে...
-স্টে আওয়ে ফ্রম মি!
চেচিয়ে বললো অদ্রি। এবার অঙ্কুরের দৃষ্টি খানিকটা ক্ষিপ্ত। অদ্রির উচ্চস্বর ওর সহ্য হয় না,এটা অদ্রি নিজেও বুঝলো। আর কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি চাই না ওর। তাই অঙ্কুরকে পাশ কাটিয়ে খুড়িয়ে রুম থেকেই বেরিয়ে আসছিলো ও। অঙ্কুর হাত বাড়িয়ে আগে বিছানা থেকে অদ্রির ওড়নাটা নিলো। তারপর ওটা দিয়ে হাতসহ একেবারে জরিয়ে ফেললো অদ্রিকে। কাছে টেনে নিলো আবারো। হাত আটকে আছে অদ্রির। নিজেকে ছাড়ানো বা অঙ্কুরকে সরানোর উপায় নেই কোনো ওর। অঙ্কুর শক্তভাবে বললো,
-ইউ নো হোয়াট? তুমি যতোবার আমাকে এইভাবে শুনিয়ে দুরে সরে যেতে চাইবে,ততোবার আমার আরো বেশি কাছে আসতে হবে তোমাকে। নাও টেল মি! টেল মি টু স্টে আওয়ে ফ্রম ইউ! ওয়ান্স মোর! টেল মি ইফ ইউ ডেয়ার!
ধমকে বললো অঙ্কুর। ওর গলা শুনে চমকে উঠেছে অদ্রি অনেকটা। একটা শুকনো ঢোক গিলে বিস্ময়ে বললো,
-কি চান আপনি?
ওকে ছেড়ে দিলো অঙ্কুর। ওড়না ঠিকঠাকমতো নিয়ে বুকে হাত গুজে দাড়ালো অদ্রি। অঙ্কুর গিয়ে একটা ওয়েন্টমেন্ট আঙুলে নিয়ে আবারো সামনে এসে দাড়ালো ওর। শান্তভাবে বললো,
-হাত সরাও।
বড়বড় চোখে তাকালো অদ্রি। অঙ্কুর বললো,
-জোর করবো?
কেটে যাওয়া জায়গা থেকে ওড়না,হাত সরিয়ে নিলো অদ্রি। অঙ্কুর আলতোভাবে ওয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিতে দিতে বললো,
-রাগের বশে নিজের ক্ষতি করতে যাও কেনো?
-বাবাকে কি বলে আসলেন আপনি?
অঙ্কুর থামলো। সরে গিয়ে টিস্যুতে হাত মুছে বললো,
-তেমন কিছুনা।
-কিন্তু...
কিছু বলার আগেই অদ্রির ফোন বেজে উঠলো। বাবার নম্বরটা দেখে আকস্মিক ভয়ে ভেতরটা ধক করে উঠলো ওর। এ সময় ওর বাবা কেনো ফোন করলো? তবে কি অঙ্কুর সবটা বলে দিয়েছে ওর বাবাকে? ওর পরিচয়? ওর সিআইডিতে যুক্ত থাকা। তাহলে তো ওর বাবার চোখে ও এক চরম দোষী। বাবা কি তবে ওর সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দেবে? কি নিয়ে বাচবে ও? জলে ভরে উঠলো অদ্রির চোখ। একপলক অঙ্কুরের দিকে তাকালো ও। সে বেখেয়ালিভাবে হাতঘড়ি,গায়ের জ্যাকেট,টিশার্টটাও খুলে ফেলেছে। তৎক্ষনাৎ চোখ সরিয়ে ফোনটা নিয়ে রুমের জানালার দিকে এগিয়ে দাড়ালো ও। রিসিভ করে ধরা গলায় হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে আকাশ ইলিয়াস বললেন,
-আহানা? তুই ঠিক আছিস তো মা? কেমন আছিস তুই ওই বাসায়? অঙ্কুর...
বাবার মুখে পুরো বিপরীত কিছু শুনে স্তম্ভিত না হয়ে পারলো না অদ্রি। ওপাশ থেকে ওর বাবা ও কেমন আছে এটুকো জানতে ব্যস্তভাবে বলে চলেছে। অদ্রি আস্তেকরে বললো,
-আ্ আমি ঠিক আছি বাবা।
আকাশ ইলিয়াস থামলেন। তার স্বস্তির নিশ্বাসের শব্দটাও শুনতে পেলো অদ্রি। বললো,
-বাবা,অঙ্কুর...অঙ্কুর কি বলেছেন তোমাকে?
-কি বলেছে মানে? ক্ কি আর বলবে? এ্ এমনি তোর জিনিসপত্র নেবে বলে এসেছিলো।
-আর কিছু বলেনি তোমাকে?
-মানে? তুই কিসের সম্পর্কে বলছিস আহানা?
অদ্রি বুঝলো ওর পরিচয় নিয়ে অঙ্কুর কিছুই বলেনি ওর বাবাকে। গলা ঝেরে বললো,
-ত্ তেমন কিছু না বাবা। তেমন কিছু না!
-আচ্ছা। তোর মা ডিনারের জন্য ডাকছে। ভালো থাকিস আহানা। সাবধানে থাকিস।
-হুম। নিজের যত্ম নিও বাবা। মাকে দেখো।
কল কেটে পেছন ফিরতেই অঙ্কুরের বুকের সাথে ধাক্কা লাগলো অদ্রির। অঙ্কুরকে দেখে রাগ উঠলেও প্রকাশটা করলো না ও। ওর বাবাকে অঙ্কুর কিছু জানায়নি,এ নিয়ে স্বস্তি আছে ওর অনেকটাই। নাকটা ডলতে ডলতে বললো,
-এতো কাছে দাড়ানোর কি আছে?
অন্যদিক তাকিয়ে ঠোট টিপে হাসলো অঙ্কুর। তারপর অদ্রির দিকে ফিরে বললো,
-ম্যাডামের মনমতো চললে বুঝি এতো কাছে দাড়ালেও রাগ হয়না?
-মানে?
-মানে যেইনা বুঝলে তোমার বাবাকে আমি কিছু বলিনি,গলার স্বরটাই পাল্টে গেলো তোমার! ওয়াও!
নাক থেকে হাত নামালো অদ্রি। তাকিয়ে রইলো সামনের রহস্যময় অদ্ভুত মানুষটার দিকে। একদম আস্তেধীরে বললো,
-কি চান আপনি? কেনো করছেন এসব?
অঙ্কুর হাসলো। বিরক্তি নিয়ে চলে আসছিলো অদ্রি। ওর বা হাত ধরে আটকে দিয়ে অঙ্কুর বললো,
-সময় হলে বুঝবে অদ্রি। ভয়টা শুধু একজায়গায়। ভুল বুঝবে না তো? অতীতের জন্য আমার বর্তমানকে হারিয়ে ফেলবো না তো? সাজাতে চাওয়া ভবিষ্যত কি আদৌও সজ্জিত থাকবে? নাকি সে তিক্ত সত্যিগুলোর তান্ডবে ঝরে যাবে নিমিশেই? ভয় হয়!
নিরব দৃষ্টিবিনিময় হলো দুজনার। হাত ছেড়ে দিয়ে অঙ্কুর নিজেই বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। ঠায় হয়ে দাড়িয়ে রইলো অদ্রি। অঙ্কুরের চাওনিতে সত্যিই ভয় দেখেছে ও। প্রথমবারের মতো। যে মানুষটা এয়ারস্ট্রাইকের মতো এতোবড় কাজটা নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দিয়েছে,তার চোখে ভয়। এ কেমন ভয়? এ কেমন চাওনি? ইচ্ছে তো করে মানুষটাকে একদম নিজের করে নিতে,কাছে গিয়ে ওই এলোমেলো চুলগুলোয় আঙুল বুলিয়ে,জরিয়ে রেখে জিজ্ঞাসা করতে,কেনো এতোটা ভয়? কেনো এতোটা আড়াল? আচ্ছা,আমি কি পারিনা আপনার ভয়ের কালোমেঘকে সরিয়ে দিতে? আপনার বর্তমান,ভবিষ্যতকে ঠিক আপনার মনের মতো করে সাজাতে? সঙ্গীনি হিসেবে আমায় সঙ্গে নিতে পারেন না অঙ্কুর? আমি কি তার যোগ্য নই?
হাজারো ভাবনার মাঝে ফোন বেজে উঠলো অদ্রির। এসিপি স্যারের ফোন। চোখ বন্ধ করে বিছানায় বসে গেলো ও। এসব কি ভাবছিলো ও? কেনো ভাবছিলো? এইসব অদ্ভুত ভাবনার কারন কি? ও তো অঙ্কুরের কাছ থেকে বিমানহামলার প্রমান জোগাড় করবে। ওকে ওর বেআইনি কাজের শাস্তি দেবে,আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শাস্তি। তাহলে এসব ভাবনা কেনো? বিয়ে নামের এই বাধন কি তবে ওর দায়িত্বে খুত এনে দিচ্ছে? না! তা হতে দেবে না ও! এসিপি স্যারের কলটা কেটে গিয়ে আবারো বাজতে লাগলো। দ্বিতীয়বার কল বাজতেই ওটা রিসিভ করলো অদ্রি। ওপাশের কিছু কথা শুনে বললো,
-এক সপ্তাহের মধ্যে বিমানহামলা কে,কেনো,কিভাবে করেছে সব প্রশ্নের উত্তর প্রমানসহ পেয়ে যাবেন স্যার! অদ্রি প্রমিস ইউ দ্যাট!
•
আগের দু দিনের মতো আজও ড্রিংক করে বাসায় ফিরলো তিহান। টলতে টলতে এসে ড্রয়িংরুমের সোফাতেই গা এলিয়ে দিলো ও। তবে মৃদ্যু শব্দে বন্ধ চোখ খুলে ফেললো। চারপাশে অন্ধকার। কেউ নেই বাসায়। ঝাপসা চোখে টি টেবিলের উপর থেকে লাইটার নিলো ও। আগুন জ্বালিয়ে আশপাশ পরখ করতেই আচমকা অদ্রির চেহারা ওর সামনে ভেসে উঠলো। কতো সুন্দর হাসিমুখ! কতো সুন্দরভাবে হাসছে ওই হৃদয়হীনা! লাইটারের আগুনের ক্ষুদ্র শিখায় ওর মুখটা কতোনা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে! ওর জীবনের সে একমাত্র রমনী! যার মুখশ্রীর কাছে বরাবর হার মানতো বাকিসব সৌন্দর্য! তিহান দপ করে নিভিয়ে দিলো লাইটারটা। সামনের বোতল হাতিয়ে কয়েকঢোক খেয়ে,সেই লাইটারেই সিগারেট ধরালো। কয়েকটান দিয়ে কাশতে শুরু করে দিয়েছে তিহান। ড্রিংকের বোতলে গলা ভিজিয়ে চেচিয়ে বললো,
-কেনো আসো আমার সামনে তুমি? কেনো আসছো? কেনো শান্তিতে থাকতে দিচ্ছো না একমুহুর্তও? কেনো অন্যকারো হয়ে আমার হৃদয়ে দখলদারিত্ব ধরে রেখেছো এখনো? কেনো ভুলতে দিচ্ছো না? এই নেশায় নাকি মানুষের কষ্ট লাঘব হয়? তবে আমারটা আরো বাড়ছে কেনো? প্রতিবার চোখ বন্ধ করলে তুমি কেনো চোখের সামনে আসছো আমার? কেনো?
বোতল ছুড়ে মারলো তিহান। মেঝেতে পরে কাচের বোতলটা কয়েকটুকরো হয়ে গেছে। টি টেবিলে সিগারেটটা নিভিয়ে তিহান আবারো মাথা ঠেকালো সোফায়। কিছুক্ষন পর দরজায় নক পরলো। কানে আসলেও উঠলো না ও। পরে ফোনটাও বেজে উঠলো তিহানের। চোখ খুলে ফুপিমার নম্বরটা দেখে ওটা রিসিভ করে কানে তুললো তিহান। কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে বললো,
-দরজা খোলো তিহান।
চোখ বন্ধ করে রইলো তিহান। টিভিনিউজে আহানিতা সিদরাতুল আর আরিয়ান সার্ফরাজ অঙ্কুরের বিয়ের খবরটা দেশের সব প্রান্তেই পৌছেছে। আত্মীয়,কাছের মানুষ বলতে ওর শুধু একমাত্র ফুপিমা। বাবা,মা,দাদা,দাদী কেউই বেচে নেই। অদ্রির সাথে ওর বিয়ে ঠিক,এটা ওর ফুপিমা জানতেন। খবরে অঙ্কুরের সাথে অদ্রির বিয়ের বিষয়টা দেখে তাই চলে এসেছেন ওর কাছে,এটা বুঝলো তিহান। ফোনের ওপাশ থেকে আবারো আওয়াজ এলো,
-তোমাকে দরজা খুলতে বলেছি তিহান।
ফোন ছেড়ে কোনোমতে দরজা অবদি গেলো ও। ওর অবস্থা বেশ বুঝলেন মিসেস জুবাইদা। ভেতরে ঢুকে জলভরা চোখে শুধু দেখতে লাগলো সেই শক্ত ব্যক্তিত্বের উকিল,তিহান সাইয়্যিদকদ। কতোটা নুইয়ে গেছে আদালতে শক্তগলায় যুক্তিখন্ডন করতে থাকা ছেলেটা। নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো তিহান। মিসেস জুবাইদা কেদে দিয়ে বললেন,
-কেমন আছিস বাবা?
তাচ্ছিল্যে হাসলো তিহান। থামলো না। ঘরের দিকে চলতে চলতে বললো,
-কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে যাও ফুপিমা। আর কাল সকালেই যশোর ফিরে যেও তুমি। আমি ঠিক আছি।
মিসেস জুবাইদা এসে জরিয়ে ধরলেন তিহানকে। শব্দ করে কাদতে কাদতে বললেন,
-তুই ঠিক নেই বাবা! তুই ঠিক নেই! আমি বেশ বুঝতে পারছি! তুই ঠিক নেই!
ওনাকে ছাড়িয়ে কিছুক্ষন চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো তিহান। ধপ করে হাটুতে বসে পরলো ও। মিসেস জুবাইদা নিজেও বসে গিয়ে জরিয়ে ধরলেন ওকে। তিহান কাদতে কাদতে দিশেহারার মতো বলতে লাগলো,
-আমার ভলোবাসার মানুষগুলো কেনো সবসময় আমাকে ছেড়ে যায় ফুপিমা? আমি যাকেই ভালোবাসি,সবাই কেনো আমাকে একা করে দিয়ে চলে যায় বলতে পারো? কি দোষ আমার? প্রথমে বাবা মাকে হারালাম। দাদাভাই নতুন করে বাচতে শেখালো আমাকে,সেও চলে গেলো। প্রেম বুঝতে শেখার পর একজনকে নিয়েই শুধু স্বপ্ন বুনে চলেছি এতোগুলো দিন হলো। সে আজ অন্যকারো বউ ফুপিমা! সে অন্যকারো! কেনো এমন হয় আমার সাথে ফুপিমা? কেনো যাকে ভালোবাসি,সেই দুরে সরে যায়? কেনো?
মিসেস জুবাইদা নিজেও সামলাতে পারলেন না নিজেকে। এই ছেলেটাকে একটু একটু করে ভাঙতে ভাঙতে এমন হয়ে যেতে দেখেছেন উনি নিজ চোখে। শেষে অদ্রিকে দেখে স্বস্তি পেয়েছিলেন কিছুটা। তাও সইলো না ওর কপালে। কি আর বলার আছে ওনার? কি বলে শান্তনা দেবেন উনি তিহানকে? অস্ফুটভাবে শুধু বললেন,
-হয়তো যে তোকে ভালোবাসে,তার ভালোবাসায় উপরওয়ালা তোকে গুছিয়ে দেবে বলে।
তিহান শান্ত হতে পারলো না। মিসেস জুবাইদার কোলে মুখ গুজে রইলো ওভাবেই। আর যাই হোক,ভালোবাসা শব্দটা ওর জন্য নয়!
#চলবে...
[ গল্প সম্পর্কিত আড্ডা দিতে জয়েন করুন মিথিমহল। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]