ফন্ট সাইজ:
থিম:
সন্ধ্যার ভায়োলিন

১ম পর্ব

লেখক: বৃষ্টি ইসলাম

সন্ধ্যার_ভায়োলিন [উপন্যাস]

#লেখিকা #বৃষ্টি_ইসলাম 
#সিজন_০১
#পর্ব_০১
কংক্রিটের বিশাল প্রাচীর ঘেরা অন্দরের দেয়াল। সাদা বিছানায় রক্তের ছিটেফোঁটার দাগ। পালঙ্কের চাদরখানি ঘুচে বসে আছে এক কোনায় চাঁদের ন্যায় এক —চন্দ্রাবালা। ভয়-ভীতি মিশ্রিত তাহার উজ্জ্বল মুখখানি, কোমল উষ্ঠা জোড়া তার বারংবার কেঁপে উঠছে। আখি যুগল দ্বারা অশ্রুধারা গড়িয়ে পরছে, হেঁচকি উঠে পরেছে।
আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে চিহ্নিত করতে পারলো না, কেউ নেই কক্ষে। সমস্ত বাতি নিভানো, বাহিরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের সহিত মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বজ্রমেঘের উচ্চ ধ্বনি চন্দ্রাবালাকে নড়িয়ে তুলছে। এতো সেই সূদুর লন্ডনের মুন প্যালেস।
অকস্মাৎ দরজা ভেদ করার শব্দে ভয়-ভীত মিশ্রত নয়নে তাকিয়ে, কোন এক বলিষ্ঠ দেহের পুরুষের প্রতিচ্ছবি নজর বন্দী করলো সে। তাকে দেখে পুনরায় তার বক্ষস্থলের কম্পনের আওয়াজ তীব্রতর হয়ে উঠলো৷ কিন্তু কে সে?
“ পিছন ফেরা ”— বর্ষ~২০২১
“ সন্ধ্যার ভায়োলিন ”— ০১ [১ম খন্ড]
“পেছন ফেরা কভু দায়, স্মৃতির শিকল ভ্রমে আঁটকে থাকা যুবকের গ্লানি। কোথু হতে উড়ে আসা ধূম্রজালের ধূলিকণা করে নিঃস্ব আমায়। ব্যথাতুর বাম পাঁজরের দ্রুত গতির স্পন্দন ছারখার করে দেয় এই আমায়।”— পাপিষ্ঠ 
ঢাকা, শাহবাগ। 
সময় বেজে তখন ভোর ৪টা ৫৫ মিনিট।
পূর্ব পুরুষদের তৈরি কৃত এই খান মহল। পুরোনো কংক্রিটের দেয়াল, পুরোনো ঘষামাজা দেয়ালে ঝলসে যাওয়া রঙ। শ্যাওলার স্পর্শে গাড়ো সবুজে রঙ ছেয়ে গেছে এই দুতলা ভবনের মহল। খান মহলের আশেপাশে গজে উঠা গাছ গুলো শত-শত বছরের পুরনো। সেখান হতে পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দ মাতোয়ারা হয়ে থাকে সর্বক্ষনই এই মহল। বাগানে সদ্য জন্ম নেওয়া পুষ্পশর হতে ভেসে আসা মুগ্ধকর শীতল নতুবা গভীর সুবাস। দৈবাৎ ভোর সকালে অন্দরমহলের টেলিফোন বেজে উঠলো। ফজরের নামাজ পরার উদ্দেশ্য মাত্রই মহল থেকে বেড় হচ্ছিলেন জনাব আজমল খান। এই সাত সকালে টেলিফোন বেজে উঠায় তিনি ভ্রু যুগল কুঁচকালেন। দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেলেন সে-পানে, টেলিফোন’টা রিসিভ করতেই এক পরিচিত পুরুষালীর গম্ভীর কন্ঠঃ স্বর ভেসে আসল। আজমল খান সালামের জবাব দিলেন তার। বেশ কিছুক্ষন কথাবার্তা চালিয়ে গেলেন তিনি তার সাথে। পরিশেষে তিনি কলটা কেটে দিলেন। উষ্ঠা জোড়া প্রসারিত করে মুচকি হাসলেন ভীষণ। পরক্ষণেই চেঁচাতে লাগলেন উচ্চস্বরে, পরিশ্রান্ত ভোর সকালের সবাই জেগে উঠলো মুহুর্তেই। 
সকলে চোখ কচলাতে কচলাতে নিজ কক্ষ হতে বেড়িয়ে আসে। সবার প্রথমে ছুটে আসলেন আজমল খানের সহধর্মিণী আলিনা খান। কণ্ঠনালী দীর্ঘ করে উদ্বিগ্ন স্বরে আওড়ালেন তিনি।
“কী হয়েছে? এভাবে চেঁচাচ্ছেন কেনো আপনি?”
আজমল খান স্লান হেসে সহসা উওর দিলেন।
“ আ.. আব্র দেশে আসছে আজ।”
উপস্থিত সকলের কন্ঠরোধ হলো। নয়নে মিশ্রিত ঘুমকাতুরে আবেশ মুহুর্তেই উধাও হয়ে গেলো সবার। 
------------------------------
দীর্ঘ ৮ বছর বাদে আজ লন্ডন থেকে দেশে ফিরবে, খান বংশের বড় কর্তা আজমল খানের একমাত্র ছেলে #আররাব_খান_আব্র। যার দরুন সে-সকাল হতে ‘খান মহল’ জুড়ে চলছে অনুষ্ঠান সাজগোজের বিশাল তোড়জোড়। দীর্ঘ ৮বছরে আব্র একটি বারের জন্যও মাতৃভূমির পদধূলি তার পা স্পর্শ করে নি। করে নি স্পর্শ মমতাময়ী মায়ের আদুরে হাত। তবে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ ছিলো সকলের সাথে শুধু এক'জন ব্যতীত। যার সাথে স্বাক্ষাত হওয়ার ভয়েই দেশের মাটিতে পা রাখা হয় নি। বোধহয় কোনোদিন ফেরার ইচ্ছেও ছিল না নিজের জন্মভূমিতে।
[০১.]~
মাত্রই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হতে ক্লাস শেষ করে খান মহলে ফিরল অহু। তার পুরো নাম #আরুরা_খান_অহুজান, ডাকনাম (অহু)। সে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী।
খান বংশের প্রধান তিনজন কর্তা, চারজন ছিলেন তবে তিনি জন্মের পরপরই মারা গিয়েছিলেন। বড় কর্তা জনাব আজমল খান, তারই একমাত্র ছেলে খান পরিবারের পুরো চোখের মণি এবং অহংকার আররাব খান আব্র, যে কিনা আজ লন্ডন থেকে পড়াশোনার ইতি ঘটিয়ে নিজ ভূমিতে ফিরছে বহুদিন বাদে। আব্র লন্ডনের বিখ্যাত সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েল হলওয়ে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের এর ছাত্র ছিল। খান পরিবারের মেঝো কর্তা, জনাব আজমিন খান। তার দুই মেয়ে, বড় মেয়ে উম্মে শিফা খান, বংশের বড় মেয়ে সে এবং ছোট মেয়ে শেফা খান নিহা, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সবথেকে ছোট সে। ছোট কর্তা অহু’র বাবা জনাব আশফাক খান। এই তিন কর্তার একজন আদুরে বোন ও রয়েছে।
গ্রীষ্মের তপতপে রোদে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এক কাঁধে ঝুলছে অহুর স্কুল ব্যাগ, বুকের সাথে চেপে ধরেছে সে দু’একখানা বই। আজ ফর্সা উজ্জ্বল মুখে খানি রোদের তোপে লালচে রঙ ধারণ করেছে। কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ে পরছে কয়েক ফোটা। চিকন ভ্রু যুগল কুঁচকাল। মহলে এতো সেতো আয়োজন আর হই হুল্লোড় দেখে, অহুর মস্তিষ্ক নেতিয়ে উঠল। প্রচন্ড ব্যাথায় টনটন করে ওঠে মুহুর্তেই। কপালের দু’পাশ আঙুল দিয়ে ডলতে লাগল। সিড়ি বেয়ে দোতলায় পৌঁছতে পৌঁছতে, ব্যাথাতুর চাপা কন্ঠে বুলি ছুড়ল।
“আমার রুমে এক কাপ চা দিয়ে যাইয়েন আম্মি। মাথাটা অনেক ব্যাথা করছে।”
কিন্তু অহুর আম্মিজান মহাব্যস্ত এখন, সাথে বাড়ির অন্যান্য লোকজন এমন কী চাকর-বাকররাও। অহুর আম্মা অন্দর মহলের নিচ তলা হতে উচ্চকণ্ঠে জবাব ছুড়ে।
“তুই আজ একটু নিজেই চা বানিয়ে নে, অহু। দেখছিস তো কত ব্যস্ত আছি তোর আব্র ভাই আসছে যে আজ। তুই বরং রুমে গিয়ে বিশ্রাম নে একটু, ভালো লাগবে।”
অহু তার আম্মিজানের কথা শুনে দাঁতে দাত চেপে ধরল, বেজায় চটে গেলো সে। তাই আর কোন কথা না বাড়িয়ে রাগে ঘটঘট করতে করতে নিজের রুমে চলে গেল, চা না নিয়েই। মহলে অনেক মানুষজন আছে তর্ক করা শ্রেয় নয় আপাততঃ। কেউ অহুকে ব্যস্ততা দেখালে সেটা তার মোটেও ভালো লাগে না, মনের ভিতর কথাগুলো চেপে ধরল। পরে কখনো শুনিয়ে দেবে, নাহয়।
‘আচ্ছা, বাড়িতে তো আজ একজন মানুষই আসছে তাহলে এত আয়োজন এবং মহাব্যস্ততার কি দরকার? আস্তে ধীরে করলেই তো সব হয়। আব্র ভাই কে এমন? যে সবাই একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তাকে বরন করার জন্য। যত্তসব আদিক্ষেতা।’
এই আলাপন বকেই অহু ঠোট উল্টাচ্ছে রীতিমতো। ভার্সিটি থেকে ফিরায় অহুর বেশ ক্লান্ত লাগছে, সাথে তো মাথা ব্যাথা রয়েছেই। তাই কোনোমতন ফ্রেশ হয়ে এসে পালঙ্কে গা এলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে ব্যাথাটা সেড়ে যাবে, বোধহয়।
এদিকে খান মহল জুড়ে হইহই রইরই আমেজ,বাড়ির ছেলে আজ বাড়িতে ফিরছে। কত বছর পর, এত দিনে একবারের জন্য ও দেশে আসে নি আব্র। মহলের সবকিছু পরিষ্কার এবং সুন্দর হওয়া চাই আালিনা খানের। যার দরুন আলিনা খানের ফরমায়েশ অনুযায়ী সব কিছু সাজানো গোছানো হচ্ছে। আব্র ভাই যে অপরিষ্কার অ-পরিছন্ন কিছুই পছন্দ নয়। মহলে ফিরে কোনো কিছু অগোছালো দেখলে পুরো মহল মাথায় তুলে ফেলবে সে।
[০২.]~
❝সাদা শার্ট তার উপরে কালো ব্লেজার পড়া। পরিহিত শ্যাম বর্ণের পুরুষের পরনে সাদা শার্টের সাথে কালো প্যান্ট ইন করা। তবে শ্যাম বর্ণের চেয়ে কিছুটা উজ্জ্বল তার গায়ের রঙ। চোখে কালো সানগ্লাস, গলায় ঝুলছে লং টাই। উচ্চতা ৬ ফুট১, মুখে খোঁচা খোঁচা চাপ দাড়ি। আন্ডার কাট চুলগুলো জেল দেওয়ায় এক সাইডে করা। ঘামের জেরে কপালে আছড়ে পরছে কিঞ্চিৎ। হাতে ব্র্যান্ডের ওয়াচ এবং শরীরের মুগ্ধকর পারফিউমের গন্ধ। বাম চোখের ভ্রু'তে পুরনো অস্পষ্ট ছোট্ট একখানা কাটা দাগ।❞
আব্র দীর্ঘ অনেক বছর পরে নিজ দেশে যাচ্ছে নিজ মহলে। যেখানে সে পুরোটা শৈশব এবং কৈশর বয়স পার করছে। এত সময়ের মাঝেই অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। স্মৃতিগুলো ভীষণ কষ্ট দেয় আব্রকে। যার দরুন আব্র মহলে ফেরে নি একটি বারো এ’কটি বছরে। যখনই ভাবে বুকের ধুকধুকানি আকাশ ছোঁয় তার। দম বন্ধ হয়ে আসে মুহুর্তেই। সে-সব প্রতিচ্ছবি শুধু চোখের পাতায় স্মৃতি হয়ে ভাসে। শুধুই স্মৃতি! যার পুনরাবৃত্তি হয়তো কখনো আর হবে না।
অবশেষে প্লেন ল্যান্ডিং করছে বাংলাদেশে। বিমানবন্দর থেকে চেক আউট শেষে বেড়িয়েছে আসতেই। আব্রর নজর পড়ল পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের উপর। গম্ভীর মুখে স্লান হাসি ফুটিয়ে পা বাড়াল। মা-বাবা এবং কাকা জানদের জড়িয়ে ধরে সালাম দিল। আব্র আশপাশে তাকিয়ে একটু পরোখ করল। দেখলো কারা কারা এসেছে। অতঃপর আব্র এক গাল হসে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে কিছু একটা ভেবে। হালকা আবেগঘন কথোপকথন শেষে সবার সাথে কুশল বিনিময় করে, আব্র গাড়িতে চড়ল। গাড়ির লুকিং গ্লাসে আব্র নিজেকে দেখছে, আর নিজেকে নিয়ে ভাবছে আজ থেকে ঠিক ৮ বছর আগে একই রাস্তা দিয়ে যখন যাচ্ছিলো আব্র তখনকার হৃদয় বিদারক অনুভূতির কথা। কতই না নিষ্ঠুর ছিল ওই দিনটি। কিন্তু কী ঘটেছিল সেই বিশেষ দিনে? যারা রেশ আব্রর হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করেছে। আব্র সিট বেল্ট বেধে পেছনে হেলান দিয়ে বসলো সিটে। মাথাটা বেশ ঝিম ধরে আছে। আব্রর ভাবনার সাথে তাল মিলিয়ে আপন বেগে গাড়ি এগিয়ে চলছে খান মহলের দিকে।
[০৩.]~
“কী গো অহু আপু? তুমি আব্র ভাইয়াকে রিসিভ করতে যাওনি কাকি মণিদের সাথে?”
অহু চোখ মুখ ডলে শোয়া থেকে পালঙ্কে উঠে বসল। ঘুমিয়ে পড়েছিলো বালিশে মাথা রাখায় তখন হঠাৎই। আব্রর নাম নিহার মুখ থেকে শুনতেই অহু চেতে গেল। ঠোঁট বাকিয়ে সংলাপ করল।
“আজব,আমি কেন যাব? আমার কী খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই নাকি। উনাকে আনতে যাবো। কিন্তু তুই যাস নি কেন আব্র ভাইয়াকে রিসিভ করতে?”
নিহার কন্ঠ স্বর নেতিয়ে আসলো। মৃদু আওয়াজ করে আওড়াল।
“আমাকে তো মা কাকিয়ারা নিয়েই গেল না। বড় জেঠি বলেছে আব্র ভাইয়া নাকি অনেক রাগী এবং জেদি। আমি নাকি অনেক দুষ্টুমি করি আর আব্র ভাইয়া দুষ্টুমি পছন্দ করে না তাই।”
অহু কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই মহলের নিচ হতে চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে আসলে। মুহুর্তেই মাথায় হাত চেপে ধরে অহুু, উচ্চ সুরে শুধাল।
“উফ মাথাটা যন্ত্রণায় ফেটে গেল নিচে এত আওয়াজ হচ্ছে কিসের দেখতো নিহা?”
“আপু আব্র ভাইয়া মনে হয় চলে এসেছে এখন যাই পরে কথা বলব।তুমি ও না'হয় নিচে এসো।”
“নাহ, আমি যাব না। আমি ঘুমালাম, আমার এত শখ নেই দেখার তুই যা।”
অনেক বছর বাদে ‘খান মহলে’ পা রাখলো আব্র। অন্দরমহলে ঢোকার পূবেই আব্র খান পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানের দিকে পা বাড়ায়। দূর হতে আব্রর দাদিমার কবর দেখল। কিছু প্রহরের জন্য স্তব্ধ নয়নে সে পানেই চেয়ে রইল। মুহুর্তেই কিছু স্মৃতি হানা দিল মস্তিষ্কে। আব্র বুকের বাম পাজর চেপে ধরলো। পরক্ষণেই কবরস্থান থেকে বেড়িয়ে খান মহলের অন্দরে পা রাখলো সে। আলিনা খান এবং মহলের অন্যান্য কর্তীরা দূর্বা ঘাস আর ধান পানি ছিটিয়ে আব্রকে বরন করে নিল। প্রতুত্তরে আব্রর গম্ভীর মুখে মলিন হাসি ফুটলো শুধু। মহলে ঢুকেই আরোও আত্মীয়-স্বজনদের সহিত স্বাক্ষাৎ হলো আব্রর। সবার সাথে অন্দরমহলে নিচ তলায় দাঁড়িয়েে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে, আব্র চলে গেলো তার নিজ কক্ষে, সঙ্গে গেল আলিনা খান।
অনেক বছর পর আব্র ভাই তার নিজ কক্ষে এসেছে। কুড়ি বছর বয়সে এই কক্ষ ত্যাগ করে সুদূরে পাড়ি জমিয়েছিলো, সে-এক কালো অধ্যায়। যখন এ-মহল ছেড়ে ছিলো তখন ছিলো বসন্ত, গাছে গাছে নতুন পাতা গজিয়েছিলো। পুরোনো পাতা ঝড়ে, সে সংলাপ কারো জীবনেও একই অধ্যায় তৈরি করেছিলো নতুন। আব্র রহস্যময় হাসি হাসল, আলতো হাতে নিজের বিছানা ছুলো। পরক্ষণেই বলিষ্ঠ দেহো হতে সাদা শার্টটা খুলে পালঙ্কে ছুড়ে মারল। ওয়াসরুমে ঢুকে বেশ লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে নিল।
ফিরে এসে সুঠাম দেহে শর্ট হাতার একটা গেঞ্জি পরে নিল। যার দরুন পেশিবহুল হস্ত জোড়ায় শিরা টান টান হওয়ার দৃশ্য অনেকেরই নজর পরে। খাবার টেবিলে বসে সবার সাথে মিলে খাবার খেলো আব্র। তখনই নিহা হতদন্ত হয়ে ছুটে আসলো আব্রর নিকট।
“ভাইয়া তুমি এই চকলেট গুলো আর সুন্দর টপস গুলো। কি আমার জন্য এনেছো?”
আব্র গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল।
“হ্যাঁ এগুলো যা আছে সব তোদের জন্যই এনেছি, নিয়ে যা ভাগাভাগি করে নিস।”
নিহা আবেগ আপ্লূত হয়ে ছুটলো দুতলায়।
“আচ্ছা ঠিক আছে, ভাইয়া।”
খাবার খাওয়া শেষ করে মহলের বাগানের উদ্দেশ্য হাটা ধরলো আব্র। সন্ধ্যা নেমে আসলো বটে। বাগানের পাশেই অবস্থিত পুরোনো ঘাট বাঁধা পুকুর। আব্র ঘাটে অনেকক্ষণ যাবত বসে থাকল। বারংবার মস্তিষ্কে অতীতের বিষাদ ময়ী চিত্র গুলো ভাসতে থাকল।
[০৪.]~
অহুর আম্মিজান অহুর রুমে এসে জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়ে অহুকে ডাকতে আরম্ভ করে কর্কশ স্বরে।
“কিরে অহু তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস, সন্ধ্যা হয়ে আসলো? দেখা করতে গেলি না আব্রর সাথে?”
“উফ আম্মা বিরক্ত করছো কেন? আমি ওনার সাথে দেখা করে কি করবো?”
“আপু আপু দেখো আব্র ভাইয়া আমার জন্য কত চকলেট এনেছে । কিন্তু তোমার জন্য কোন গিফটই আনেন নি, ভাইয়া, হুহ!”
ঠোট উল্টিয়ে রুমে প্রবেশ করতে করতে বুলি গুলো ছুড়ল। নিহার কথা শুনে অহু ধপাস করে পালঙ্কে বসে পরল শোয়া থেকে উঠে। চোখ রাঙিয়ে কর্কশ ভাষায় সংলাপ করল।
“আমার জন্য উনি কেন আনতে যাবে? উনি তো আমাকে চিনেই না। দেখতি না আগে যখন ফোনে কথা বলতো, বাড়ির সকলের সাথে কথা বলতো আমি ব্যতীত।”
অহু’র ভীষণ রাগ হচ্ছে, অপমান বোধ ও কাজ করছিল কারণ আব্র- অহু ব্যতীত সকলের জন্য গিফট এনেছে। অহু কি দোষ করছিল? দাঁতে দাঁত চেপে ধরল, অহু’র ইচ্ছে করছে এখনই গিয়ে জিজ্ঞেস করতে আব্রকে। কিন্তু না অহু কেন জিজ্ঞেস করবে তার ও তো ইগো আছে,হুহ। কোন একদিন সুযোগ বুঝে এর প্রতিশোধ নিবে অহু। নিশ্চয়ই নিবে। হ্যা,
-----------------------
সন্ধ্যার পরে অহু একটু ছাদ থেকে হাটার উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। সন্ধ্যার সৌন্দর্য উপভোগ করলে হয়তো মনটা ভালো লাগবে। তাই চলে গেল ছাদে নিহার হাত ধরে। পুরো মহল ভর্তি মানুষ গজগজ করছে, সকলে আব্রকে দেখতে এসেছে। তবে অহু এখন অব্দি যায় নি আব্রকে দেখতে। আর না যাবে, আব্র দেখতে কেমন? অহু সেটাও জানে না। হয়তো ভুলে গেছে এ'কটি বছরে আব্রর প্রতিচ্ছবি এবং স্মৃতি। ছাঁদের কার্নিশ ঘেষে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চোখের পাপড়ি জোড়া নিভিয়ে দিল, বিশুদ্ধ কোমলপ্রাণ সুবাস টেনে নিল গহীনে। অনুভব করলো নিজের অস্তিত্বকে, অনুভব করলো প্রকৃতিকে। চোখ মেলে তাকাল। মহলের বাগান হতে ঝিঁঝি পোকার ঝিঝি শব্দ ভেসে আসছে। অহু মুচকি হাসে। পরক্ষণেই পাশ ফিরতে সে-হাসি উধাও হয়ে গেল। ভ্রু জোরা টেনে কুচকাল, চোয়াল চেপে ধরলো নিহার চিত্র দেখে। নিহা অহুকে দেখিয়ে দেখিয়ে চকলেট খাচ্ছে।বেচারির গাল মুখে চকলেট লেগে আছে। এরকম ভাবে খাচ্ছে। অহু মুখ ফিরিয়ে নেয়। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আওড়ায় আজেবাজে চিন্তা ভাবনা। এই হতচ্ছাড়ার আনা কোন কিছুই খাবে না বলে পণ আটলো অহু তার অন্তরিন্দ্রিয়ে। ভীষণ অভিমান চেপে ধরলো কলবে। ভাবল কালকেই ফুপির বাসায় রওনা দিবে। 
এদিকে আব্র নিজের কক্ষে বসে ছিল। হঠাৎ কী মনে করতেই যেনো সে উঠে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। লকার খুলে ভেতর থেকে একটা পুরনো রিভলভার বের করল। এটা অনেক পুরনো রিভলভার, ধুলোবালি জমা ঠিকঠাক কাজ করছে কি না তা বোঝার জন্য আব্র সাইলেন্সার লাগিয়ে একটা শট করল পুরনো দেয়ালের দিকে। ফট—একটা শব্দ , আর দেয়ালে ছোট্ট একটা গর্ত। হঠাৎই এই দৃশ্য দেখে রুমে ঢুকতে যা-ওয়া শিফা। হতচকিত হয়ে উঠল, চোখ দুটো বিস্ফারিত। চিৎকার ছাড়তে যাবে ঠিক তখনই আব্র তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিল।
“ভয় পাস না। শুধু চেক করছিলাম, ঠিক আছে কি না।”
শিফা মাথা নেড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তৎক্ষণাৎ কফির মগটা টেবিলে রেখে সেখান থেকে কেটে পড়ল, পা দ্রুত করে দরজার দিকে। আব্র হাসল ক্ষীণভাবে। সে রিভলভারটা নিয়ে আবার আলমারির লকারে সাবধানে রেখে দিল। হঠাৎই আলমারির ভেতর আরেকটা জিনিস নজরে পড়ল, একটা ভায়োলিন! পুরনো, কিন্তু তার সোনালি স্ট্রিংগুলো বোধহয় আজ-ও কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
#চলবে #পাঠক?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন