ফন্ট সাইজ:
থিম:
সন্ধ্যার ভায়োলিন

৪র্থ পর্ব

লেখক: বৃষ্টি ইসলাম

“ সন্ধ্যার ভায়োলিন ”— ০৪

#লেখিকা #বৃষ্টি_ইসলাম 
#সিজন_০১
#পর্ব_০৪
[০১.]~
খান মহল, মধ্যে নিশীথ।
চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। অমাবস্যা নেমে এসেছে বোধহয় ধরণীর বুকে। শশীর লুকিয়েছে মেঘ কুঞ্জে'র গহীনে।
মাঝরাতে ঘুম থেকে সজাগ হল আব্র। নিভু নিভু দৃষ্টি মেলে চাইল। পালঙ্ক ছেড়ে বসল আধশোয়া থেকে। দেয়ালে ঝুলে থাকা টিংটিং আওয়াজ করা ঘড়ির দিকে নজর বুলাল। পরোখ করলো রাত ১টা বাজে। আওড়াল অন্তরালে মহলের সবাই খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পরেছে বোধহয়। আব্র'র রুমে টেবিলের উপরে রাতের খাবার রেখে গেছে আলিনা খান। কিন্তু আব্র'র এখন খাবার নয় সিগারেটের প্রয়োজন। যার দরুন পা বাড়ালো ব্যালকনির দিকে। প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করলো জ্বালাবে। পরক্ষণেই দেখলো লাইটার নেই সাথে। ব্যালকনির থেকে বেরুলো, রুমের অন্দরে আসলো। টেবিলের পানে পৌঁছালো, লাইটার'টা হাতে নিলো। পা বাড়াবে ব্যলকনির দিকে, হঠাৎ পদচারণ রুদ্ধ হলো। পিছন ফিরলো ভ্রুকুটি কুঁচকাল। 
টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে তুল নিল। মাত্রই কেউ মেসেজ করেছে। নোটিফিকেশনের টুং শব্দ আব্রর কানের গহীনে পৌঁছলো। কৌতূহল বশত আব্র ফোনটা হাতে নিলো।
মেসেজ চেক করে কিছুটা ঘাবড়ালো। এসময় এ-মেসেজ এক্সপেক্ট করিনি বোধহয় আব্র। কপালে আব্রর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। অচিরেই উৎকন্ঠার ভাজ পরলো কপালে। আব্র কিছু একটা ভাবলো ,ফোন থেকে সিমটা খুলে ফেলে দিলো মুহুর্তেই। একটা কালো শার্ট পরলো ইন করে। উপরে কালো ব্লেজার পড়লো। হাতে ব্রান্ডের ওয়াচ। আন্ডার কাটিং চুল গুলো আঁচড়ানোর সময় হলো না। পারফিউম স্প্রে করলে বডিতে। আব্র পুরোপুরো তৈরি হয়ে নিলো। এখন বেরোতে হবে আব্রকে , সাথে নিল পাসপোর্ট এবং দরকারই কিছু জিনিসপত্র।কারের চাবি নিতেও ভুলল না সাথে।
"কিন্তু আব্র হঠাৎ এত রাতে যাচ্ছে কোথায়?"
আব্র তার কক্ষ থেকে বেড়িয়ে নৈঃশব্দে নিচে নামছে অন্দরমহলের। সবাই ঘুমাচ্ছে বোধহয় আব্র মোটেও চায় না কেউ এখন সজাগ হোক।যার দরুন আব্রকে যেন কারো প্রশ্নের মুখোমুখি না হতে হয়। আব্র অন্দর মহলের মেইন দরজা আস্তে আস্তে খুললো, কোন বিকট শব্দ যেন সৃষ্টি না হয়। অন্দর মহল থেকে বেড়িয়ে পুনরায় বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দিল।
আব্র গাড়ির ভিতরে বসবে, ঠিক তখনই এক অদৃশ্য টানে চোখ আটকে গেলো কোথাও। তড়িৎগতিতে ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে ফিরে তাকালো আব্র। কপালের মাঝ বরাবর ভ্রু জোড়া কুঁচকে উঠলো। বিস্ময়ের তীব্র রেখা ফুটে উঠল মুখজুড়ে। আব্রর দৃষ্টি গিয়ে স্থির হল মহলের দোতলার এক বারান্দায়। নিশুতি রাতে মহলের বাহিরে টিমটিমে বাতির আলোতে আবছাভাবে ফুটে উঠেছে রহস্যময় অবয়ব। কারো উপস্থিতি নিঃশ্বাসহীন এই রাতের আকাশে অশরীরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যালকনির প্রান্তে স্থির সেউ ছায়ামূর্তি। আব্র’র চোখ অনড় হয়ে আটকে গেলো সেখানে। মনের গভীর থেকে ধ্বনিত হলো একটাই প্রশ্ন,“কে... এত রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে?”
চোখের পলকে আব্র’র আখি যুগল বন্দী করে নিলো সেই অবয়বকে। মনে হলো আকাশের গগনে ঝুলে থাকা চাঁদের নিচে দাঁড়িয়ে আছে তারই প্রতিচ্ছবি এক জীবন্ত ‘চন্দ্রাবালা’। রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে এক অলৌকিক রূপকথার জন্ম হলো। আব্র ভাবলো, “শশীর মতোই সে আরেক চন্দ্রাবালা দুজনেই একে অপরের ছায়া, একে অপরের পরিপূরক।”
তবে, মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। আব্র পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে, শরীরজুড়ে নিস্তরঙ্গ এক নিঃসঙ্গতা। কাঁধ অবধি এলোমেলো চুল হিম বাতাসে আলতো দুলছে। পরনে সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ। আব্র গভীর মনোযোগে পরখ করল সেই প্রতিচ্ছায়া। চোখে ভেসে উঠলো মহলের প্রতিটা নারীর মুখ। আব্র দেখেছে সবাইকে কারও চুল এমন খাটো নয়। কারও কেশ এমন ঘাড় ছোঁয়া নয়। কেবল একজনই ছিলো যার কেশ ছিলো এভাবে, যার পরিধানে ছিলো সাদার স্পষ্টতা, যার অস্তিত্ব আজও মনের অলিন্দে ধ্বনিত হয় অনাহূত ঝংকারে। আব্র ভাইয়ের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে একটা নামই উঠে এলো, “অহুজান!”
এই একটা নামই উচ্চারিত হতেই আব্রর বুকের পাঁজরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি মুহূর্তেই অস্থির হয়ে উঠল। এক অজানা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়লো শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মনে হলো এই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে গোপন, নিঃশ্বাসরুদ্ধ, বেদনাঘন অতীত। এক অন্ধকার অধ্যায়, যাকে আব্র বহু আগেই মনের পাতা থেকে ছিঁড়ে ফেলেছিলো, যাকে সে গলাটিপে দাফন করেছিল চিৎকারে। যে স্মৃতি আজও চুপচাপ পাশে বসে থাকে, রক্ত ঝরায় তার স্নায়ু জুড়ে।
অহু বারান্দা ছেড়ে কক্ষে ঢুকে গেল। যার দরুন সেখানে আর দাঁড়াল না আব্র। দ্রুত গাড়িতে বেড়িয়ে পরলো। মহলের দুজন পাহারাদার কে বলল গেট খুলে দিতে। একজন পাহারাদার গম্ভীর কন্ঠে কন্ঠে সুধাল, 
“ ছোট সাহেব আপনে এত রাতে কই যান? ” 
কিন্তু এই কথা আব্রর কর্ণ পর্যন্ত পৌঁছালো না।
“কিভাবে পৌছাবে?”
আব্র মস্তিষ্ক জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে অহুর স্মৃতি। মিশে থাকা অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। ভাবছে মনে মনে, আর নিজেকে নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে রীতিমতো। আচ্ছা আজ কি অহু আব্রকে রেসে দেখেছিলো? আব্রকে দেখে অহুর কী অনুভূতি হয়েছিলো? চিনতে পেরে ছিলো কি সে আব্রকে? কিন্তু আব্র তো জানেনা, আব্রকে দেখার পর চন্দ্রাবালার পৃথিবিটাই থমকে গিয়েছিল খানিক প্রহরের জন্য!"
আব্র তার অন্তরিন্দ্রীয়ে আওড়াতে থাকলো,
“ অহু তোর স্মৃতি থেকে তো আমি একেবারেই মুছে গেছি কত সহজে তাই নারে? আমি একেবারেই মুছে গেছি তাই না? আমার কথা তো তোর মনেই নেই।ভুলে গেছিস আমার স্মৃতি চিরদিনের জন্য তুই।কে আমি? কি ছিলাম তোর অতিত জীবনে?কোন জায়গা ছিল তোর অতিত জীবনে আমার?সবই তো ভুলে গেছিস?হারিয়ে ফেলেছিস আমার স্মৃতি!তাই,হারিয়ে গেছি আমি। #সন্ধ্যার_ভায়োলিন সুরের মতো অতলে হারিয়ে গেছি আমি অহু!হারিয়ে গেছি আমি!
 সবাইকে কে মনে করতে পারলেও এই আব্রকে তুই আদৌ মনে করতে পারলি না অহু!
তুই কী কখনো আমাকে মনে করতে পারবি অহু,কখনো,কোন একদিন,কয়েক মুহূর্তের জন্য হলে ও মনে করিস আমায় ?তবে একটাই আফসোস অহু হয়তো অতীতের পাতায় আর কখনো ফেরা হবেনা তোকে নিয়ে নতুন করে! নতুন কোনো স্মৃতি জমে না আর আমাদের মনে। আর যদি জমে ও তাহলে এর পরিণতি হয়তো ভয়ঙ্কর হবে। ” 
এবারও হলো না অহু আর আব্রর শুভ্র দর্শন।কবে ফিরবে আব্র? কি লেখা ছিলো সেই মেসেজে? আর কবেই দেখা হবে তাদের দুজনের আদো তে ?
~
~
ঘুম আসছিলো না অহু'র যার দরুন ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। অহুর যখন ঘুম আসে না তখন অহু ব্যলকনিতে গিয়েই দাড়িয়ে থাকে, রাতের সৌন্দর্য আলাপন করে। মহলের বাগান থেকে ভেসে আসা ঝিঝি পোকার ডাক অহু কান পেতে শুনে। অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে অহুর! কিন্তু কি কারনে?সেটা অহু জানে না। অনেক রাত হয়ে গেছে বিধায় ব্যলকনি থেকে নেমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। দুজনে দু প্রান্ত থেকে একে অপরের কথা ভাবছে,কিন্তু কেউ সেটা জানে না! অহু জানে না যার প্রতিচ্ছবি ভেবে অস্বস্তি অনুভব করছিলো। সে একটু আগেই, তাকেই স্মরণ করছিলো।
আব্র ও জানে না,সে যখন অহুর স্মৃতির কথা ভাবছিল তখন অহু ও তাকেই স্মরণ করছিল! 
একজন অশান্ত মন নিয়ে অন্যজনের কথা স্মরণ করতে করতে ড্রাইভিং করে চলছে।অন্যদিকে আরেকজন তার কথা ভুলে তাকে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। দুজনের মন'ই উতলা!
 
[০২.]~
রাত পেরিয়ে ভোর সকালের সূচনা হলো।
ভোর সকালে অহু'র ঘুম তন্দ্রা ছুটে গেলো চেঁচামেচিতে। পালঙ্ক ছেড়ে উঠলো, কপালের দু'পাশ চেপে ধরলো। পা বাড়ালো নিচে তলার দিকে। 
নিচ''তলায় পৌঁছতেই পরোখ করল আজমল খান পাহারাদারদের সাথে রাগারাগি করছে। অহু অন্দরমহল পেরিয়ে বাহিরে গেলো। দেখলো সবাই একসাথে সেখানে জড়ো হয়েছে। একজন পাহারাদারে'র আকুতিভরা কন্ঠ স্বর ভেসে আসছে, 
“ বড় সাহেব আমি তো ওনারে জিগাই ছিলাম। কই যায় উনি তো আমার কথার কোন উত্তরই দিল না।আমিতো ভাবছি ছোট সাহেব সকালের মধ্যেই চইলা আসবো। ” 
আজমল খানের কর্কশ কন্ঠ স্বর, 
“আব্র যখন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল তুমি আমাকে জানাও নি কেন? ” 
অহু বুঝতে পারলো আব্র মাঝ রাতে কোথাও গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে গেছে। তাই বড়ো জেঠু রাগারাগি করছে। আজমল খান আব্রকে একের পর পর এক ফোন দিচ্ছে কিন্তু আব্রর ফোন বন্ধ।
অনলাইন অফলাইনে কোথাও আব্র নেই।আশাফ আজমল খানকে সান্ত্বনা দিয়ে মহলের ভিতর নিয়ে গেল। অহুও চলে গেলো তার রুমে ফ্রেশ হতে।
~
~
সকাল ৯টার দিকে সবাই মিলে নাস্তা করতে বসলো। আজমল খান ব্যতিত, তিনি অনেক রেগে আছেন আব্রর এরূপ কান্ডে। খাওয়া শেষ করে অহু নিহা এবং আশফি মিলে ছাদে চলে গেলো আড্ডা দিতে।
শিফার এক্সাম চলছে তাই ভার্সিটিতে যাবে। আড্ডার মাঝখানে নিহা বলে উঠে।
“আচ্ছা আব্র ভাইয়া,কোথায় গেছে?রাতের মধ্যে চলে আসবে তো!আমাদের ট্রিটটা যেন মিস না হয়।” 
অহু ঠোঁট উল্টিয়ে বুলি ছুড়ল।
“তুই এত পেটুক হলি কবে থেকে নিহা?” 
পরক্ষণেই আশফি সংলাপ করে উঠে উদ্বিগ্ন হয়ে।
“আচ্ছা অহু তুই কাল রেস পুরো শেষ না করে চলে এসেছিলে কেন?” 
অহু আসফির প্রশ্নে হঠাৎ ঘাবড়ে গেল।
“তেমন কিছু না মাথা ব্যথা করছিল তাই।” 
অনেকক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পর সবাই চলে গেল নিজেদের রুমে।
[০৩.]~
আব্র ইংল্যান্ড এর ফ্লাইট থেকে নামলো সবেমাত্র। চেকিং শেষে সামনে পা বাড়াতেই দেখলো, জিসা আর ডেভিড আব্রর জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। ডেভিড আব্রর পার্টনার তারা লন্ডনে একই অ্যাপার্টমেন্টে থেকেছে। আব্র সামনে এগিয়ে এল। তাদের সন্নিকটে যেতেই ডেভিড জড়িয়ে ধরে বলল।
“ hey yrear,whats up. There was no problem coming. I missed you so much these past two days.” 
আব্র সংক্ষিপ্ত প্রতুত্তর করলো,
“ I Missed you too... ” 
জিসা আব্রকে দেখে অনেক খুশি হলো। পরক্ষণেইর সবাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দুবাই এর উদ্দেশ্যে একটি ফ্লাইটে উঠে চরলো।
একই সময়ের সাথে দুটা ফ্লাইট জার্নি করছে আব্র। যার দরুন অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আব্র।
ফ্লাইটে নিজের কেবিনে বসলো চোখ বুঁজে। হঠাৎ চোখটা লেগে আসল। চোখ বুজতেই কিছুক্ষণ পর আব্র অনুভব করলো তার মস্তিষ্কের কল্পনাতে কিছু ভাসছে। কোন এক অবয়ব, কোনো ঘোলাটে প্রতিচ্ছবি। যে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ছোট এলো কেশ তার কাধ অব্দি। অন্ধকারে অবয়ব না বুঝা গেলেও বুঝতে পারা যায় তার যায় তার উপস্থিতি। যা আব্রর ঘুমন্ত মস্তিষ্ক জুরে বিচরণ করছে। আঁকড়ে ধরেছে তার স্মৃতি। 
#চলবে #পাঠক?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন